কামিনী - পর্ব ৭৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          ক্যামিলাসের প্রাসাদ জুড়ে আবারও ঝুপ করে নেমেছে নিস্তব্ধতা। প্রাক্তন রাজার বিদায়ের শোক পালন করে যে যার মতন ফিরে গিয়েছে আপন স্থলে। কেবল স্মৃতিরা ফিরে যেতে পারেনি। প্রাসাদের কোথাও থেকে গিয়েছে চলে যাওয়ার ছাপ, দুঃখ। 
   
 সন্ধ্যাবাতির সাথে সাথে যথারীতি ঢাক বাজছে। যা বাজতো আগেও। সেই সাথে ঘুঙুরের শব্দ তাল মিলিয়ে নৃত্য করছে। নৃত্য করতে করতে যেন দিশেহারা শব্দ সেই সুরের। 
রানি দাঁড়িয়ে ছিলেন হেমলকের চিত্রশালার বাহিরে। দোরের কাছটায় দাঁড়িয়ে নীরবে হেমলকের ধ্যানমগ্ন আঁকিবুঁকিতে চোখ বুলাচ্ছেন। হেমলক একটি নারীমূর্তি আঁকছে। হাতে বিরাট তলোয়ার নারীটির। তবে চোখে জল। তলোয়ার হাতে থাকা নারীর চোখে জল মানায় আদৌ? যার হাতে সমগ্র ক্ষমতা তার চোখে কীসের এত অসহায়ত্ব, কীসের এত কান্না? কত মায়া সেই কান্নামাখা মণি দু'টোতে। হেমলকের না জানি কত প্রিয় নারীই হবে চিত্রের মানুষটি! না-হলে কি আর এত নিখুঁত ভাবে আঁকা যেত? 

 রানি রয়েসয়ে চিত্রটি দেখলেন। শুনলেন ঢাকের শব্দে মিলিয়ে যাওয়া নুপুরের নৃত্যের ধ্বনিটি। ধূপের ঘ্রাণে প্রাসাদটিকে তার মন্দির মনে হলো। মোহনীয় সন্ধ্যায় যে মন্দিরে আটকে আছে কোনো চঞ্চলা দেবী। তবে কোথায় আটকে আছে সেই দেবীটি? হেমলকের চিত্রে নাকি ঘুঙুরের সেই শব্দে? 

 “ছবিটি কার? আপনার মাতার?”

 ঢাকের শব্দ ছাপিয়ে রানির কণ্ঠ কর্ণগোচর হতেই হেমলকের হাত থেমে গেলো। চিত্র থেকে চোখ ঘুরিয়ে একপলক কপাটের দিকে তাকিয়ে পুনরায় সে ফিরিয়ে নিলো নিজের দৃষ্টি। মাথা নাড়ালো নিশ্চুপে। অর্থাৎ, তার মাতারই। 

 রানি এক পা এগুলেন। হেমলকের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, “উনি কার মতন ছিলেন? মনে হচ্ছে ভীষণ সাহসী।”

  হেমলক চিত্রে থাকা রানি বেশের নারীটির মুকুটে রঙ লাগাতে লাগাতে বলল, “তোমার মতনই ছিলো। তেজস্বিনী, প্রলয়ঙ্কারী অথচ মায়াময়ী।”

রানির বহুদিনের শখ ছিলো হেমলকের মাতা সম্পর্কে জানার। এবং মোক্ষম সময় এটা অনুভব হতেই তিনি আরও আগ্রহ দেখালেন। 

 “আপনার মাতার কী হয়েছিলো? এবং রাজমাতা প্রাচী কীভাবে আপনার পিতার জীবনে এলেন?”

“মাতার সাহস তার কাল হয়েছিলো। তোমার মতনই তাকে দমানো দায় ছিলো। তলোয়ার থেকে বার্শা, ঘোড়া ছুট থেকে যুদ্ধের ময়দান… কারো সাধ্য ছিলো না তাকে দমানোর। তাই শেষমেশ তাকে দমিয়ে ছিল তারই চরিত্র। যেই বৃক্ষে তুমি ঝুলিয়েছিলে মামাশ্রীকে, সেই বৃক্ষেই ঝুলেছিলেন মাতা। ঘৃণায়, অপমানে, লজ্জায়।”
 শেষবেলাতে কেঁপে উঠে হেমলকের কণ্ঠ। শ্বাস নেয় চোখ বন্ধ করে। ক্রমশ ভারি হয়ে আসে তার শ্বাসের আদান-প্রদান। 

  রানির কাছে সবটাই অস্বচ্ছ, ধোঁয়াশা। তবুও তিনি এই বোধহয় প্রথমবার হেমলকের বিষণ্ণ বেলায় একটি হাত এগিয়ে দিলেন। হেমলকের বাহুর রগ গুলো টানটান, শক্ত হয়ে আছে। রানি হাত রাখতেই হেমলক নিজেকে সামলে নিলো চট করে।
 
“কে করেছিলেন এটা? কেন করেছিলেন?”
 হেমলকের চোখগুলো রক্তজবার মতন লাল দেখায়। কণ্ঠ কাঁপে বার কয়েক। কথা গিলে নেয় পর পর। রানির প্রশ্নকে অনায়াসেই উপেক্ষা করে তুলি তুলে নেয় হাতে। অকপটেই একের পর এক রঙ মিশিয়ে চিত্রটিকে রক্তাক্ত করে তুলে চোখের সামনে। 

   রানি সেই উপেক্ষায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। আর যাই হোক উপেক্ষা সহ্য করার ক্ষমতা তার ভেতরে নেই। 
ঢাকের শব্দ তখন তুঙ্গে। ধূপের ধোঁয়ায় ঘোলাটে হয়ে যায় চারপাশ। সুঘ্রাণে মিশে যায় অর্ধসত্য। রানির মনে খচখচ করে। খুব করে তার মনে হয় হেমলক যেন কী লুকানোর চেষ্টা করে মাঝে মাঝে। হুট করেই যেন কথা বলতে বলতে কেমন হয়ে যায়। আলাদা একটা ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়। 

 প্রাসাদের ডান দিকের প্রাচীর ধরে হাঁটেন রানি। হাঁটতে হাঁটতে প্রাসাদের একের পর এক কক্ষে ফেলে কীসের টানে যেন ছুটেন কেবল ঘোরগ্রস্তের মতন। মাথায় ঘুরপাক খায় কেবল ভাবনারা। এই প্রাসাদের কাউকেই তার বিশ্বাস হয় না মোটেও।

  সন্ধ্যা আরতি হচ্ছে যেখানটায় সেখান থেকে কিছুটা দূরেই নিজের কক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে লিলি। চোখে-মুখে তেমন আনন্দ নেই। তার পুরো জীবনে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল নিজের ভ্রাতা হ্যাভেনকে। ছোটোবেলায় ও ঘোড়ায় উঠতে চাইলে হ্যাভেন নিজে ঘোড়া হতো। ও নাচতে চাইলে হ্যাভেন গান ধরতো। হয়তো পাখি হতে চাইলে ওর ভ্রাতা আকাশ হয়েও দেখাতো। সেই ভ্রাতা আজ নেই কতদিন কেটে গেলো। চোখের নিমিষেই একটা মানুষ মিলিয়ে গেলো এই সমগ্র পৃথিবী থেকে। সমস্ত টান, মায়া ভালোবাসা রেখে চলে গেলো সে। কীভাবে? কেমন করে? এমনটা হওয়ার কি কথা ছিলো? মৃত্যু এমন তিক্ত সত্য কেন! এমন বিদঘুটে, অসহনীয় কেন?
লিলির দিকে গরম দুধের পাত্র এগিয়ে দিলো রাজবৈদ্য। লিলির ধ্যান চ্যুত হলো। রাজবৈদ্যকে দেখে ভ্রু আপনা-আপনি কুঁচকে এলো। কথায় তার রসকষ বিশেষ ছিলো না আগেও। তাই কর্কশ গলায় বলল,
“রাঁধুনির কাজ নিয়েছ না দাসীর?”

  রাজবৈদ্য লিলির অকারণ রাগে কপাল ভাঁজ করল কেবল, “জড়িবুটি আছে এটায়। আপনার সেবা করার বিশেষ আগ্রহ নেই আমার।”

 চোখ ঘুরিয়ে তাকায় লিলি। এতে চোখে চোখ পড়ে দু'জনার। রাজবৈদ্য খেয়াল করল লিলির চোখগুলোর ভেতরে জল গঙ্গার মতন বহমান। কণ্ঠে তেজ থাকলেও চোখে মোটেও তেজ নেই। অমাবস্যার দুঃখ যেন ভার করেছে সেখানে।
“জড়িবুটি জড়িবুটি করে সবসময় পাড় পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা না? কে এত খেয়াল রাখার দায়িত্ব দিয়েছে তোমায়?”

  রাজবৈদ্য লিলির ঠোঁটের সামনে পাত্রটি এগিয়ে ধরে। চোখের ইশারায় দুধটুকু পান করার অনুরোধ করে। মুখে বলে,
“আর কে? রাজ্যের রানি। প্রতিদিন খোঁজ নেন আপনার স্বাস্থ্যের।”

  লিলি ঠোঁট ডুবায় পাত্রের পানীয়টিতে। এরপর উদাস দু'নয়নে বলল,
“আমি জানি উনি অন্যায় করেননি কোনো। আমি করেছিলাম অন্যায়। কিন্তু কোথাও গিয়ে আমি উনাকে মেনে নিতে পারি না, জানো? উনাকে দেখলেই নিজের অপূর্ণতার কথা মনে পড়ে বার বার। কোথাও একটা চলে যেতে ইচ্ছে হয় বড়ো। এই রাজ্য, এই ক্ষমতা আমায় আর টানে না। আমার শান্তি প্রয়োজন। দুঃখ ছাড়া একটি দিনের খুব শখ।”

 “কোথায় যাবেন?” রাজবৈদ্য এমন করে আহ্লাদে বলল যেন সে এখুনিই রাজকন্যাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে স্বর্গ। যে দিনটির শখ তার সেই দিনটি দেখিয়ে আনবে। 

  রাজকন্যাও খুব অকপটে, আবদারে বলল, “যেখানে নিয়ে যাবে। তবে এই প্রাসাদ থেকে দূরে।”

“এই আলোর ঝলকানি, এই আনন্দের চারপাশ, এই হাতের নাগালে সব পাওয়ার মায়া আপনি ছাড়তে পারবেন, রাজকন্যা লিলি? সবাই কিন্তু এসব পারে না। বিলাসবহুল জীবনের মায়া ছাড়া সবার কাম্য নয়।”

 লিলি দমে আসে। কিন্তু হাত ধরে রাখে রাজবৈদ্যর। শক্ত করে। যেন সে খুব সিদ্ধান্তহীনতায় ভরসা চাচ্ছে একটু। 

  রানি প্রাসাদের সর্বশেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন। এত বৃহৎ প্রাসাদ যে এত দিনেও তিনি পুরো প্রাসাদটি একটিবার ঘুরে দেখতে পারলেন না। শেষ অব্দি কখনো আসাই হয়নি। আজ প্রাসাদের শেষ কক্ষের দিকটিতে এসে তার অদ্ভুত লাগল। এত বড়ো প্রাসাদটা তিনি একটু ঘুরেও দেখলেন না কেন এতটা দিন! এবং খেয়াল করলেন এই শেষ দিকটায় একটা বারান্দাও নেই। খোলামেলা একটা জানালাও নেই। একটু বাহিরের আলো এসে যে পড়বে সেই পথটুকু রাখা হয়নি। এজন্য হয়তো এই দিকটা তাকে কখনো টানেইনি।
 আচ্ছা, ইচ্ছেকৃত ভাবেই কি লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো দিকটা? এমনও তো হতে পারে, কেউ চেয়েছে এই দিকটাকে মানুষ তেমন বিশেষ ভাবে না দেখুক। সেজন্য হয়তো একটা খোলা বারান্দা কিংবা জানালা রাখা হয়নি। একটু কৃত্রিম আলোর ছিটেফোঁটা নেই শেষ সীমানায়। যেন অন্ধকারে এই দিকটাকে সবার মন থেকে ভুলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে! 

  রানির মনে আচমকা আসা ভাবনায় তিনি নিজেই বিস্মিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন হয়তো বেশিই ভাবছেন তিনি। যেই না বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেন তখনই দেখলেন ওপাশ থেকে আসা আবছা আলোয় প্রাসাদের এপাশে এবড়োখেবড়ো প্রাচীর। রানির সন্দেহ হলো। তিনি ভ্রু কুঞ্চিত করে হাতে কয়েকবার টোকা দিতেই ফাঁপা শব্দ পেলেন। মনে হলো তার ওপাশটায় জানালা কিংবা দরজা কিছু একটা ছিলো যা বহু আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন?

  শেষদিকে থাকা কক্ষটিতে রানি প্রবেশ করার চেষ্টা করলেন। অথচ বিরাট দোর আটকানো বাহির থেকে। শেকলে বন্দী সেই কপাটের ছিটকিনি। সকল প্রশ্ন একে একে এসে ঘনীভূত হলো রানির মনে। তার পিঠ বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। শেকলে জং পড়েছে। 
 রানি কিছু না ভেবেই ছুটে গেলেন আলোর দিকে। সেখানে তলোয়ার লাগানো ছিলো প্রাচীরে। সেই ভারি তলোয়ার নিয়ে এসে আঘাত বসালের পর পর। ঢাকের শব্দ সেই লোহার ঝঙ্কারকে গিলে নিলো। রানিকে সাথ দিতে লাগল প্রকৃতি। 
 প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রহারের পর লোহার শেকল ছিটকে রানির পায়ে এসে পড়ল। ঢাকের শব্দ থেমে গেলো। কাঠের পুরোনো, ধূলোপড়া দরজা খুলতেই ফুরফুরে বাতাস এসে রানিকে ভরিয়ে তুলল। গা কাঁপল তার মৃদু। ঢাকের শব্দ থামাতেই বোধহয় শরীরটা কেমন ভুতুড়ে আবহাওয়ায় কেঁপে উঠল। রাজপ্রাসাদও যেন বিজ্ঞাপন বিহীন নীরবতায় ডুবে গেলো। 

   দূরের আলোটা খুব ক্ষীণতর ভাবে প্রবেশ করছে সেই অন্ধকারে নিমজ্জিত কক্ষটিতে। কোথাও এক ফোটা খোলা জায়গা নেই তবুও ঘরটি শীতল। রানি তার বাহু শক্ত করেন। এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন যে হাত বাড়িয়ে কাউকে ডাকাও যাবে না। একটি চিৎকার করলেও প্রাসাদের মাঝ অব্দি পৌঁছাবে না। তবুও তিনি ঝুঁকি নিলেন। পা রাখলেন অন্ধকার কক্ষটিতে। খেয়াল করলেন পায়ের নিচে কিছু শক্ত ধরণের কাঠ। কক্ষটি কাঠের তৈরি। অদ্ভুত! এবং আরেকটু এগুতেই তিনি সেই কাঠ সরে ছিটকে পড়লেন কোথাও একটা। মাথায় আঘাত পেলেন তীব্র। কানে তার স্পষ্ট হলো ঘুঙুরের শব্দটি। আগের চেয়ে বেশি স্পষ্ট। যেন তার আশেপাশেই নৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে কেউ। অবিরাম, অবিরত…
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp