ভোরবেলায় মিষ্টি ঘুম ছুটে গেলে সচরাচর বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আসে। কিন্তু আজ তেমনটা হলো না। বরঞ্চ মিষ্টি হাসিরা দোলা দিলো। ঘুম ছুটলেও অরুণাভ বিছানা ছাড়লো না। বাবার এক হাত তাকে জড়িয়ে রেখেছে। সে কিছুক্ষণ পড়ে রইলো কিন্তু একটু হাঁসফাঁস লাগা শুরু করে। বাবার হাতটা আলগোছে সরিয়ে উঠে গেলো। ফ্রেশ হয়ে এসে দেখে বাবা উঠে পড়েছে।সেই ভাব জমানোর চেষ্টা করলো,
“গুড মর্নিং আব্বু!”
অরুণ সরকার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ থেকে আমার সাথে অফিসে যাবে তুমি।”
অরুণাভ বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, “আব্বু আমি এখনো গ্র্যাজুয়েট হই নি।”
“হবেও না। তোমার পড়ালেখার যা শ্রী গ্র্যাজুয়েশন করা তোমার কপালে লেখা নেই।”
অরুণ বিছানা ছাড়তে ছাড়তে ছেলের গুন গায়। অরুণাভ মুখ কালো করে বলল, “তোমার মেয়ের মতো টপ না করতে পারলেও পাশ নাম্বার আনতে পারি। আর গ্র্যাজুয়েট আমি হয়েই ছাড়বো।”
“সে দেখা যাবে। আজ অফিস যাচ্ছো তুমি। আর কোনো কথা নয়!”
অরুণাভ বিরোধীতা করার জন্য হা করছিলই অরুণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উঠে এসে ছেলের কাঁধ চাপড়ে বলে, “আগে হোক আর পরে আমার ব্যবসা তোমাকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি নিজ হাতে তোমাকে সব শেখাতে চাইছি। আমি আজ আছি হয়তো কাল নাও থাকতে পারি। আমার অবর্তমানে তোমাকে পেরেশানিতে পড়তে না হয় তাই সব শিখে নাও কলিজা।”
অরুণাভের গম্ভীর মুখ বানিয়ে বলে, “তুমি আজ আছো কাল নেই মানে কি আব্বু? আমি বলেছি না এসব আজেবাজে কথা বলবে না। আমার কাছে তুমিই সব।”
অরুণ ম্লান হেসে কাঁধ চাপড়ে দিলো, “অফিসের জন্য রেডি হও।”
“আমি বললাম তো যাবো না!”
“কেন?”
অরুণাভ কাঁধ থেকে বাবার হাত নামিয়ে বলল, “চাচিমনি বলল তুমি নাকি অফিসের সব শেয়ার আমার নামে করে দিয়েছো। কেন আব্বু? ওলাফ, ভাবনা, আম্মুর ভাগের অংশ কই? তুমি জানো এ নিয়ে চাচি আমার সাথে কেমন বিহেভ করেছে! তাঁর কথা দ্বারা মনে হচ্ছিলো আমিই জোর করে সব আমার নামে করে নিয়েছি। অথচ আমি কিছুই জানতাম না যদি চাচিমনি না বলতো।”
অরুণ সরকারের গাম্ভীর্যে আঁকা কপালে গাঁঢ় ভাঁজ। অরুণাভ আবারও বলে, “আব্বু এটা তো ঠিক না, তাই না? আজ চাচিমনি বলেছে কাল সবাই বলবে, তুমি আমার কথা ভাবলে অথচ আম্মু, ভাবনা আর ওলাফের কথা ভাবো নি। যখন ওরা জানতে পারবে কি ভাববে? কাজটা মোটেই ঠিক করোনি।”
“তোমার আম্মু জানে। আর হ্যাঁ আমি তোমার কথা ভেবেছি। আর তোমার আম্মু আর ভাই-বোনদের কথা তুমি ভাববে। আমি শুধু অফিসের শেয়ার না; সবের দায়িত্ব তোমাকেই দিয়ে যাবো। আর তুমি তাদের দায় দায়িত্ব পালন করবে। বাড়ির বড় ছেলে তুমি, অন্নেক দায়িত্ব তোমার কাঁধে। ফোর টোয়েন্টি স্বভাব তোমাকে মানায় না। ওলাফকে মানাবে।”
অরুণ স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যুত্তর করলো। অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল, “আমি যদি সব সহায় সম্পত্তি একাই ভোগ করতে চাই?”
অরুণ হাসলো শুধু, কিছু বললো না। অরুণাভ জোর গলায় বলল, “তুমি খুব চালাক আব্বু। আমি পারবো না কারো দায়িত্ব পালন করতে। আমি এখনও ছোট। আমাকে এসবে বাঁধবে না মোটেই।”
অরুণ হাসতে হাসতে ঘর ছাড়ে। অরুণাভ ধপাস করে বিছানায় বসে। গালটা ফুলিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। চা খেতে গিয়ে যে জিভ পুড়িয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে সেই নাকি পুরো বাড়ির দায় দায়িত্ব পালন করবে। হাউ ফানি!
“ভোর বাবা, এই নাও তোমার সব স্যুট। দর্জি মাত্রই দিয়ে গেলো।”
আভারি কাকার হাত থেকে ব্যাগগুলো নেয় অরুণাভ। ব্যাগে নতুন সেলাই করা ফর্মাল ড্রেস। নিশ্চয়ই আব্বুর কাজ। সব বন্দোবস্ত করেই রেখেছে। সে ব্যাগ গুলো বিছানায় রেখে ডাকলো,
“কাকা একটু দাঁড়াও তো।”
আভারি দাঁড়ায়, “কিছু বলবে ভোর বাবা?”
অরুণাভ এগিয়ে আসে। আভারির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। ছোটবেলায় মোটা গোছের কাকার বিশাল ভুড়িতে মাথা ঠেকতো তার। এখন টাক মাথা দেখতে পায়। অরুণাভ বলল, “আমি আসার পর থেকেই খেয়াল করছি মিনু খালা আমার সাথে কথা বলছেন না। এমনকি আমি উপস্থিত থাকলে কেমন গা লুকিয়ে চলে। নয়নকেও দেখতে পাওয়া যায় না। তুমিও কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছো। আচ্ছা আমি কি ভুল কিছু করেছি?”
আভারী নজর লুকায়। ইনি বিনি সুরে বলে, “তুমি কি কইতেছো বুঝতে পারতেছি না ভোর বাবা।”
“আভারী কাকা?”
অরুণাভের কাঁচা গুরুগম্ভীর ডাকে আভারী নতমুখে বলে, “ওরে তো চিনোই। বেডি একসের বেশি বুঝে। তুমি কি নয়নরে ছুটোলোক কইছিলে? তাই গোস্বা করছে।”
অরুণাভ আশ্চর্যের সাথে বলে, “আমি কখন নয়নকে ছোটলোক বললাম? কে বলেছে তোমাকে? আমি বলতে পারি এ কথা?”
আভারী কাঁচুমাচু মুখে বলে, “তুমি কইছিলে। নয়ন তো মিছে কথা কওনের ছেড়া না।”
অরুণাভ থমকায়। আভারী কাকার কণ্ঠের দৃঢ়তা তাঁকে ব্যথিত করে। বোঝা যাচ্ছে তাঁর প্রতি মিনু খালা আর আভারী কাকার বিশ্বাস কতটা ঠুনকো!
“ডাকো তোমার ছেলেকে। আমিও শুনি আমি কখন বললাম একথা।”
আভারী ঘাবড়ালো, “থাক নে এসব কথা। আমি বা নয়ন কিছু মনে নিই নেই। নয়নের মায়ে একটুখানি গোস্বা করছে। তুমি আর ঘাইটো না ভোর বাবা। আমি মিনুর হয়ে মাফ চাইতেছি। আর ওরে কইয়ে দিমু নে তোমার লগে ভালো কইরে কথা কইতে।”
“থাক কাউকে কিছুই বলতে হবে না। আমি ঘাটবো না। শুধু এটুকু বলো আমি কখন বলেছি একথা?”
“তুমি খেলতে যাওনের আগের দিন রূপ বাবা আর নয়নরে নিয়ে শপিং করতে গেলে যে। দামি জুতার দিক চোখ পড়ছিলো ওই ছেড়ার। দাম জিগাইলে তুমি কইলে বারো হাজার। তহন কইছিলে! মনে পড়ছে?”
আভারি কাকা সহজ সরল। তাঁকে চেপে ধরলেই সব বেরিয়ে আসে। অরুণাভের মনে পরে সবই। পরের টুকু নিজেই শোনালো,
“আমি বলছি পরের টুকু। তোমার ছেলের পছন্দ হয়েছিল স্নিকার জোড়া। বারংবার হাতে নিয়ে দেখছিল। আমি খেয়াল করেছিলাম। ওকে বলেছিলাম পছন্দ হয়েছে কি-না। ও মানা করে। সেম স্নিকার আমার কাছেই ছিলো। একেবারেই নতুন, দুই তিনবার পড়েছিলাম শুধু। এখন সাইজে ছোট হওয়ায় পড়তে পারি না। তাই ওকে বলেছিলাম আমার জোড়াই নিস। ও মানা করেছিল বারবারই। আমি ভাবলাম আমার ব্যবহৃত বলে নিতে চাইছে না। তাই ওটাই কিনে দিতে চেয়েছিলাম। ও তাও মানা করছিল। তখন ধমকে বলেছিলাম ছোট মানুষ ছোট মানুষের মতোই থাক। বড়দের কথা না শুনলে থাপড়ে কানে তালা ঝুলিয়ে দিবো। ও তাও নিলো না। আমি রাগ করে আর কথাই বলি নি। ব্যস এইটুকুন।”
অরুণাভ থামলো। খুব দ্রুত তাঁর বিড়াল চোখে শিশির কণা জমতে শুরু করে দিয়েছে। আভারি কাকা এখনও নজর লুকানোয় ব্যস্ত। অরুণাভ মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল, “ওরা সবাই ভাই ডাকে আমাকে। বড় ভাই আমি ওদের। সেই সুবাদে বলেছিলাম ছোট মানুষ। কিন্তু তোমার ছেলে তো উল্টো বুঝে মিনু খালার কাছে আমাকে কালারিং করে দিলো। যাইহোক কোনো ব্যাপার না। তুমি আসতে পারো এখন!”
আভারি কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলো। কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারলো না। একটু পরেই গুটি গুটি পায়ে চলে গেলো। অরুণাভ বৃদ্ধাঙ্গুলে জমায়িত শিশির বিন্দু অতি সন্তর্পণে মুছে নেয়। আশ্চর্য সে বাকি পুরুষদের মতো চোখের জল কেন লুকিয়ে রাখতে জানে না!
—————
দু’হাত সমানতালে কচলায় পত্রলেখা। এটা তাঁর বদ অভ্যাস। ভয় কিংবা অস্বস্তিতে পড়লেই হাত দুটো কেমন অসাড় হয়ে আসতে চায়। সে শুকনো ঢোঁক গিলে দরজায় টোকা দিলো। ভেতর থেকে সাঁড়া পেতেই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে থমথমে মুখে বসে পত্রলেখার একমাত্র মামা রাফসান চৌধুরী।
“পত্র, এখানে বস?”
মামার দেখানো জায়গাটিতেই পত্রলেখা বসে। সে বরাবরই বাধ্য মেয়ে। মামার চোখে চোখ পড়তেই পত্রলেখার মাথা নুইয়ে যায়। চোখ পিটপিট করে আশেপাশে মামীকে খোঁজে। এরই মাঝে ওয়াশ রুম থেকে মামী সায়লা বেগমকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো। ঘরে পত্রলেখার উপস্থিতি নজরে আসতেই বলেন,
“চায়ের কাপ চোখে পড়ছে না যে? খালি হাতে আসছিস?”
পত্রলেখা চলে গেল চা আনতে। রাফসান চৌধুরী স্ত্রীর দিকে শক্ত চোখে চায়। সায়লা বেগম বিরক্ত মুখে বললেন, “বাকী মামীদের মতো বাড়ির কাজ করাই না। চায়ের হাত ভালো তাই একটু চা খাই ওর হাতের।”
রাফসান চৌধুরী কিছু বললেন না। সায়লা পত্রলেখাকে পছন্দ করে না ঠিক কিন্তু কখনোই পত্রলেখার উপর জুলুম করতে তাঁর চোখে পড়ে নি। কটুক্তি বা ঠেস দিয়ে কথা বলতেও কখনো শোনে নি। আবার কখনোই পত্রলেখার সাথে দুটো মিষ্টি কথা বলতেও দেখা যায় নি তাঁকে। তার স্বামী যে পত্রলেখার ভোরন পোষণ করছে এ নিয়েও বাকবিতন্ডা হয় নি। সর্বোপরি পত্রলেখার সাথে তাঁর ভালো কিংবা মন্দ কোনো সম্পর্কই গড়ে ওঠে নি। তিনি স্ত্রীকে বসতে ইশারা করে বললেন,
“কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না সায়লা!”
সায়লা বেগম হামি তুলে বললেন, “সে তুমি জানো। আমার কোনো দিকেই প্রবলেম নেই। রবিন পত্রলেখাকে বিয়ে করলেও না, তুমি পত্রলেখাকে বাড়ি থেকে বের করলেও না।”
রাফসান চৌধুরী দ্বিধায় ভুগছেন। রবিনের সাথে বাক প্রতিবন্ধী পত্রলেখাকে কখনোই মানতে পারবেন না। এমনিতেই তাঁর ভোরনপোষণ টুকুই গলার কাঁটা হয়ে আছে। এখন ছেলে আরেক সুর গাইছে। রবিনকে বোঝানো যাবে কিন্তু তারজন্য পত্রলেখাকে দূরে সরাতে হবে। তিনি মনে মনে জল্পনা কষেন।
দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে পত্রলেখা। ট্রে টি টেবিলে রেখে মামা ও মামীর হাতে চায়ের কাপ তুলে দেয়। রাফসান চৌধুরী পত্রলেখার দিক দৃষ্টি অনড় রেখে চায়ের কাপে চুমুক বসায়।
“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বস?”
পত্রলেখা ট্রে বুকে জড়িয়ে মাথা নাড়লো বসবে না। রাফসান চৌধুরী চায়ের প্রশংসা করলেন। একতরফা একটু খুচরো আলাপ চালালেন। বোবার সাথে আবার আলাপচারিতা! ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। শূন্য চায়ের কাপ রেখে সরাসরি বললেন,
“পত্র তোর বাপ ম*রলো তখন তুই সারে তিন বছরের হবি। তোর দাদা দাদি আগেই হাত গুটিয়ে নিলেন। তুই, তোর মা আমার ঘারে এসে পড়লি। তোর মায়ের বিয়ে দিলাম সেবছরেই। কথা ছিলো কারিম তোকেও মেনে নিবে। বিয়ের দিন নিরালায় বলা হলো, এখন না, দুই তিন মাস পর তোকে নিয়ে যাবে। এতদিন আমিই যেন দেখাভাল করি। করলাম, এক যুগের বেশি সময় ধরে। আমি বুঝি না বাপু। কারিম তোকে নিতে চায় না; নাকি তোর মায়ে চায় না তুই ওর সুখের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি কর। যাইহোক, অনেক সহ্য করেছি মা। এখন আমার সহ্য সীমার বাহিরে। আমি ওতটাও ভালো মানুষ নই যে এক বোবাকে ছেলের বউ বানিয়ে আমার ছেলের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিবো। আমি খুবই দুঃখিত এভাবে মুখের উপর বলার জন্য। কিন্তু আমার কিছু করার নেই পত্র।”
পত্রলেখা ট্রে বুকে জড়িয়ে শান্ত চোখে তাকিয়ে। প্রতিবারের মতোই তাঁর চাহনি প্রতিক্রিয়া বিহীন। সায়লা বেগম চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে পত্রলেখাকে বললেন, “তোমার মামার কথার সারমর্ম তুমি ব্যাগপত্র বেঁধে কেটে পড়ো।”
বলতে বলতে সায়লা বেগম হাসিতে ফেটে পড়লেন। তাঁর হেতু বিহীন হাসির মানে পত্রলেখা বুঝলো না। সে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল শুধু। রাফসান চৌধুরী ওয়ালেট থেকে হাজার টাকার দুটো নোট বের করে টি টেবিলে রাখলেন।
“ড্রাইভার রেখে আসবে তোকে। আমি পপির সাথে কথা বলে নিবো। তোর কোনো চিন্তা করতে হবে না। আর হ্যাঁ রবিন বা মাকে এ বিষয়ে কিছুই জানাবি না।”
পত্রলেখা মাথা কাত করে সম্মতি দিলো। এঁটো কাপ আর টাকা গুলো নিয়ে বেরিয়ে আসে। টাকা সহ ট্রে কাজের মেয়ের হাতে ধরিয়ে ঘরে এসে লাগেজ গুছিয়ে নেয়। চোখে মুখে তাঁর মাত্রাতিরিক্ত উদাসিন ভাব। তবে এরই ফাঁকে আলোয় পদ্মপুকুরের জল ছলছল করে ওঠে। পত্রলেখা কাউকেই কিছু না বলে বেরিয়ে যায়। কারো মুখোমুখিও পড়তে হয় না। ড্রাইভার এগিয়ে এসে লাগেজ, ব্যাগ ডিকিতে তুলে পত্রলেখাকে নিয়ে বের হয়। পত্রলেখা পিছু ফিরে দেখে বাড়িটি। বুঝ হওয়ার পর থেকে এখানেই তাঁর বসবাস। হুট করে মামার নিষেধাজ্ঞায় বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। কারণটাও তাঁর ভালোমতোন জানা। রবিন ভাই গতরাতেই ভালোবাসার প্রকাশ করেছিল। আর সকাল বেলা তাকে নির্বাসনে পাঠানে হলো। তাঁর দুঃখ হচ্ছে না। যে বাড়িটা ছাড়ছে, সেটা তার বাড়ি না। আবার যে বাড়িতে যাওয়ার জন্য বেরুচ্ছে, সেটাও তাঁর বাড়ি হবে না। তবে সে খানিকটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। নতুন বাড়ির পরিবেশ কেমন হবে? সে নীরবে নিভৃতে মানিয়ে নিতে পারবে তো? উইন্ড্রস্ক্রিণে মাথা ঠেকিয়ে ভেবে যায় পত্র লেখা। নোটবুক বের করে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে,
“এই দক্ষিণা হাওয়া, তোমার ছোঁয়ায় হাজারো পত্রবৃন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে ভূমিতে পতিত হয়। তারপর তাঁরা ছাই হয়; নয়তো মিশে যায় মাটির বুকে। গুরুত্বহীনা এ পত্রকে কবে জমিনে ফেলতে সক্ষম হবে? আমিও ঝরে যেতে চাই। চাই মাটির বুকে চিরতরে মিশে যেতে। এ যাতনা যে পরাণে সহে না আর।” ~পত্রলেখা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও উইন্ড্রস্ক্রিণে মাথা নোয়ায়। আকস্মিক ব্রেক কষায় মাথায় আঘাত পায়। অদ্ভুত গোঁ গোঁ শব্দে গুঙ্গিয়ে কেঁদে ওঠে পত্রলেখা। বাহ্যিক ক্ষতে নাকি অন্তঃস্থলের পীড়ায়?
“পত্র মা, ব্যাথা পেয়েছো?”
ড্রাইভারের সহানুভূতিশীল কণ্ঠে পত্রলেখার কান্নার উদ্রেক বাড়ে। ড্রাইভার ঘাবড়ালো।
“আমার দোষ নেই সামনের গাড়িওয়ালার দোষ। দাঁড়াও আমি দেখছি। শালার গাল লাল না করেছি তো আমার নাম রহমত আলী না। তুমি কিন্তু গাড়ি থেকে বাড়াইও না।”
ড্রাইভার বেরিয়ে গেলে পত্রলেখার কান্নার বেগ বাড়ে। কপাল ছেড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে ডুঁকরে ডুঁকরে কাঁদে। পাতলা দেহ খানি সমানতালে কেঁপে চলছে। সামান্য আঁচড়ে এতটা ক্ষত? বাইরে গন্ডগোলের আভাস কানে ঠেকলো। লোকজন জমেছে বেশ। পত্রলেখা ওড়নায় গাল মুখ মুছে ড্রাইভারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রাইভারের কলার চেপে এক যুবক নিজ বেগতিক রাগ জাহির করছে। পত্রলেখা চেনে সে যুবককে। এগিয়ে গিয়ে যুবকের হাত ধরে বাঁধা দেয়।
অরুণাভ পত্রলেখাকে দেখে কিঞ্চিত অবাক হয়। রাগটা একটু কমলো বৈ কি! ভ্রু কুঁচকে শুধালো, “তুমি এখানে কি করছো? এই হাদারাম পরিচিত তোমার?”
হাত তাঁর এখনো অজ্ঞাত ব্যক্তির কলার চেপে রেখেছে। পত্রলেখা অরুণাভের হাত ঠেলে দেয়। উপরনিচ মাথা নেড়ে ইশারায় কিছু বলে। অরুণাভ তা বুঝতে পারলো না। তবে ড্রাইভারের কলার ছেড়ে দ্বেষ ভরা কণ্ঠে বলে, “গাঁজা খেয়ে গাড়ি চালাবেন না। নিজে ট্রাফিক রুলস ব্রেক করেছেন উপরন্তু অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে গালিগালাজ করছেন। এই মেয়ের জন্য বেঁচে গেলেন। নয়তো আমার আব্বুকে কটুক্তি করা জিহ্বটাই ছিঁড়ে নিতাম। বয়স টয়স কিচ্ছু দেখতাম না। ”
ড্রাইভারের চোখ মুখ রাগে অপমানে লাল হয়ে গেছে। ছেলের বয়সী যুবকের হাতে অপদস্থ হয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। তাঁর ভুল ছিলো, তারচেয়ে বড় ভুল নিজ ভুলটা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। যার ফল সে পেলো। পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে এক কান ধরে নীরবে ক্ষমা চাইলো।
“ওকে চিনো তুমি?”
অরুণাভ তাৎক্ষণিক বাবার প্রশ্নের জবাব দিতে পারলো না। পেছনে ফিরে আলতো মাথা দোলালো শুধু। অরুণ সরকার পত্রলেখা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছেলের দিকে তাকায়। পত্রলেখা অরুণ সরকারকে প্রথমবার খেয়াল করলো। গন্ডগোলের সময় এই ভদ্রলোকটাই রাগী প্রাণীটিকে আটকাচ্ছিলো। এখনও হাত ধরে রেখেছে। হঠাৎ পত্রলেখা অরুণ সরকারের চোখাচোখি হয়। পত্রলেখা এখনো কান ধরে রেখেছে। চোখ পিটপিট করে ক্ষমার আর্জি জানাচ্ছে। অরুণ সরকার তাঁকে উপেক্ষা করে ড্রাইভারকে বলল,
“এভাবে গাড়ি অভারটেক করলে কোন দিন নিজেই অভারটেক করে উপরে চলে যান। ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাতে না চাইলে বি কেয়ারফুল। আব্বু, উই আর গেটিং লেইট। যাস্ট টেইক ওফ।”
অরুণাভ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। ছেলের হাত টেনে গাড়িতে বসিয়ে তবেই ক্ষান্ত হয় অরুণ। এ ছেলের রগে রগে এতো রাগ কোত্থেকে এসেছে?
শাঁ শাঁ করে ছুটে যায় বিলাসবহুল গাড়িটি। যতক্ষণ দেখা পত্রলেখা চেয়ে দেখে গাড়িটি। বুকে অভিমানেরা কুন্ডুলী পাকায়। চলে গেল? কিছু না বলেই? সে তো বলতে অপরাগ কিন্তু ওই মানব তো কিছু বলতে পারতো!
অরুণাভের গম্ভীর চোখে মুখে রাগের চ্ছটা। ফর্সা মুখ রাগে আরক্ত হয়ে আছে। কপালের নীলচেকার শিরা উপশিরা জাগ্রত। অরুণ আড়চোখে দেখে ছেলেকে। কাঁধে হাত রেখে শান্ত হতে সময় দেয়।
“মেয়েটা কে ছিল?”
“পরিচিত”
“কেমন পরিচিত?”
অরুণাভ বাবার দিকে ফিরলো। অরুণ সামনে দৃষ্টি সজাগ রেখে আবারও প্রশ্ন করল, “তোমার এক্স গার্লফ্রেন্ড রামিশা?”
অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলে, “রামিসা আমার গার্লফ্রেন্ড ছিলোই না এক্স গার্লফ্রেন্ড কিভাবে হবে?”
“তারমানে রামিশাই ওটা। যাইহোক মেয়েটা কিন্তু সুইট ছিলো। ব্রেকআপ কেন করেছিলে?”
অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলল, “এসব আলতু ফালতু নিউজ কোত্থেকে পাও?”
অরুণ মুচকি হাসলো। অরুণাভ হতাশ হয়ে বলল, “রামিশার সাথে কিছুই ছিলো না আমার। রামিশা তপন স্যারের মেয়ে। তপন স্যার বলেছিলেন, ক্লাসে যা করিয়েছে তার মধ্যেই পেপার বানাবে। ফেল করলে ন্যাড়া করে ছাড়বে। আমাদের জুনিয়র ছিল রামিশা। তাই দুটো দিন খাতির জমিয়েছিলাম। মেয়েটা বোকাসোকা, প্রশ্ন এনে দিয়েছিল। তারপরেই না ফিজিক্সে পাশ করলাম। আইডিয়া কিন্তু টুটুলের ছিল।”
অরুণাভ শেষে এসে বন্ধুর ঘাড়ে দোষ চাপায়। অরুণ কতক্ষণ কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। দাঁত কটমট করে বলে, “বাহ্ গর্বে আমার ছাতি কয়েক ফুট চওড়া হয়ে গেলো।”
অরুণাভ মুখ লুকিয়ে উইন্ড্রস্ক্রিণে ধ্যান দেয়। এটুকুতেই দাঁত কটমট করেছে? তার স্কুল লাইফের বিস্তারিত পাঠ করলে সরকার সাহেব চৈতন্য হারাবেন। সাহেবের নজর বাঁচিয়ে কত কাহিনী রচনা করা হয়ে গেছে !
—————
“তোমার বায়োলোজিক্যাল প্যারেন্টস নানুমা নানু হলেও তুমি তোমার খালা খালুর ফ্যামিলিতে বড় হয়েছো। তাঁরা তোমাকে এডপ্ট করেছিলেন। আচ্ছা তোমার কেমন লেগেছিল যখন তুমি জানতে পারলে যাদের তুমি মা বাবা জানো তাঁরা তোমার মা বাবা নয় বরং তোমার খালা খালু? আবার যাদের তুমি খালা খালু ডেকেছো তাঁরাই তোমার মা বাবা!”
পাতা ম্লান হাসলো। কিছু বললো না। অরুণিতাও দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করলো না। মা কেন নানু বাড়ি যায় না সেই রহস্য উদঘাটন করা গেলো।
“মাম্মাম, ক্যান আই আস্কড এনাদার কোশশেন?”
পাতা মেয়ের মাথায় তেল ঘঁষে বিরক্ত মুখে বলে, “কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়বি না।”
অরুণিতা ঘার বাঁকিয়ে মাকে দেখে নেয় একপল। পাতা তাঁর গম্ভীর চাহনিতে হাসে। গাল টিপে বলে, “নয়মাস পেটে ধরলাম আমি অথচ বাপের মতো স্বভাব পেলি। একটু রসকষ নেই। আমি কতটা সয়ে তোর বাপের সংসার করছি। আর তুই তো তোর বাপের এককাঠি উপরে। তুই মেয়ে যার কপালে আছিস তাঁর মতো হতভাগা পৃথিবীতে দুটো নেই। আহারে বেচারা।”
অরুণিতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “আমি কিন্তু পাপাকে বলে দিবো তুমি বিয়ের কথাবার্তা বলে আমাকে উল্টোপাল্টা উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করছো।”
পাতা মেয়ের কথায় হেসে বলে “নিজ সযত্নে পোষা চড়ুই পাখি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া কতটা হৃদয়বিদারক এখন বুঝতে পারছি রে আম্মু। তোর পাপা তো এখনই কাঁদে। রোজ মোনাজাতে বলে, ‘আল্লাহ আমাকে কেন মেয়ে দিলে? দিয়েছো যখন তখন আমি বলে রাখছি, আমি তাঁকে অন্যের ঘরে পাঠাতে পারবো না। তাই নেক দিলের একটা ঘরজামাইও পাঠিয়ে ধন্য করো।’ আমি প্রথম প্রথম হাসতাম তার মোনাজাত শুনে। কিন্তু এখন তোকে দেখলেই বুকের ভেতর মোচড় দেয় রে আম্মু!”
“ওহ হো আমি তো জানতাম আমার মাম্মামের ধ্যানে, জ্ঞানে, সাধনে, স্বপনে সর্বজুড়ে শুধু পাপাই ঘুরঘুর করে। এখন দেখছি মেয়ের জন্যেও তাঁর বুকের ভেতর মোচড় দেয়। পাপা জানলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করে বসবে।”
অরুণিতা গম্ভীর মুখে বিড়বিড় করে বলে। শেষোক্ত কথায় পাতা আঁতকে উঠলো, “এসব কেমন কথা অরু? মুখ আছে বলে যা কিছু বলবি?”
অরুণিতা হামি তুলে মায়ের কোলে মাথা রেখে কার্পেটের উপরেই শুয়ে পড়লো। গম্ভীর গলায় আওড়ালো, “আমি সিরিয়াসলি বলি নি। স্যরি।”
পাতার মনটা কু ডাকে। এমনিতেই লোকটার শরীর ভালো যাচ্ছে না। প্রেসারটা কোনোমতেই কন্ট্রোলে আনা যাচ্ছে না। যাবে কিভাবে? নাই বাত নিয়ে লোকটা চিন্তায় রাতভর জেগে থাকে। অহেতুক চিন্তায় মগ্ন থাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাতা মেয়ের মাথা সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, “বিছানায় শুয়ে থাক। আমি ওলাফকে ধরে বেঁধে খাওয়াই। ছেলেটা একদম খেতে চায় না।”
অরুণিতা সিনা টান টান করে বসে থাকে। কোলে মাথা রেখেছিল মিনিটও হয় নি! মুখটা থমথমে হয়ে আসে। মাকে থামিয়ে দেয় তৎক্ষণাৎ।
“মাম্মাম আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। তুমি কি শুনবে?”
“শুনছি তো। বল জলদি।” পাতা দরজার দিকে যেতে যেতে বলল। অরুণিতা রাখ ঢাক না রেখে সরাসরিই বলল,
“ব্রো তোমার আপন ছেলে না, তাই না মাম্মাম? ব্রো পাপার প্রথম স্ত্রীর ছেলে। তুমি তাঁর সৎ মা। এম আই রাইট মাম্মাম?”
পাতা ঘরের চৌকাঠ পেরিয়েছে সদ্য। মেয়ের কথা পা দুটো আগায় না। মস্তিষ্ক জুড়ে একটাই শব্দ আলোড়ন তোলে ‘সৎ মা’। শব্দটিকে পাতা খুব ভয় পায়। মেয়ে একথা কিভাবে জানলো জিজ্ঞাসা করে না পাতা। শুকনো ঢোঁক গিলে মেয়ের উদ্দেশ্যে শক্ত কিছু শুনিয়ে চলে যায় নিজ কাজে। অপমানে অরুণিতার মুখটা আরও থমথমে হয়ে আসে।
স্টাডি রুমে প্রহর একাকী বসে ছিলো। আরিয়ান সরকার গুনগুনিয়ে স্টাডি রুমে প্রবেশ করে। ভাতিজাকে দেখে একগাল হেসে বলল, “ওলাফ যে! একা বসে আছিস কেন?”
“চাচ্চু আব্বুর মতো তুমিও চশমা কেন নিচ্ছো না?”
প্রহর অত্যন্ত বিনয়ী সুরে বলল। আরিয়ান হেসে ভাতিজাকে বগলদাবা করে টেবিলের উপর বসিয়ে নিজে কাউচে গা এলিয়ে দেয়। বলে, “আমি কি তোর পাপার মতো কানা নাকি যে চশমা পড়বো?”
“কানাই তো।”
“আমি কানা?”
“হ্যাঁ, এখানে যে একটা ক্যাট বসে আছে তুমি তো সেটা দেখতে পাচ্ছো না।”
প্রহর মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বসে থাকা অ্যানাকে দেখায়। অ্যানা মিউ মিউ করে নিজ উপস্থিতি জানান দিলো। আরিয়ান শু শু করে তাড়িয়ে দেয়। তবে ঘারত্যাড়া অ্যানা পূর্বের মতোই শরীর ছেড়ে গড়াগড়ি খায়। আরিয়ান তাঁর লেজে পাড়া দিয়ে বলে, “ওলাফ আমি তো ক্যাটটা দেখতে পাচ্ছি।”
“তাহলে বললে কেন আমি একা বসে আছি?”
প্রহরের প্রশ্নে আরিয়ান আহম্মক বনে যায়। দুই হাত জোর করে অনুরোধ করে, “মাফ কর। শরীরে এক ফোঁটাও এনার্জি নেই বাপ।”
প্রহর কিটকিটিয়ে হেসে বলল, “তোমার যে মা নেই সে কথা ভুলে যাও কেন?”
আরিয়ান চোখ ছোট ছোট বানালো। প্রহর পা ভাঁজ করে বাবু হয়ে বসে। গাল ফুলিয়ে বলে, “তোমরা আমাকে বিয়ে করিয়ে তোমাদের জন্য মা আনছো না কেন?”
আরিয়ান মুচকি হেসে বলল, “আগে বুড়ো বাপটাকে মুসলমানি করিয়ে দিবো তারপর বিয়ে করাবো।”
“মুসলমানি কি চাচ্চু?”
আরিয়ান জানতো এমন ভয়নক প্রশ্ন তাঁর দিকে ছোঁড়া হবে। আফসোস হয় কেন আগবাড়িয়ে কথা বলতে গেলো। এই ছেলে একবার ধরলে নাস্তানাবুদ করিয়ে ছাড়বে। সে হে হে করে বলল,
“মুসলমানি হলো ব্যাটাছেলের একটা সেরেমানি। তোমার যখন হবে বুঝতে পারবে। আগেই বলা যাবে না। বললে সারপ্রাইজড নষ্ট হয়ে যাবে।”
“তুমি ব্যাটাছেলে?”
আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে রাখলো। আরেকটা জবাব দিলে সে নিজের নাম বদলে রাখবে।
“তুমিও কি সেরেমানি পালন সেলিব্রেট করেছো? ও ব্যাটাছেলে, কথা বলছো না কেন?”
“আমি তো বলতেই ভুলে গেছিলাম। তোর মা ডাকছিল তোকে। যা যা জলদি যা ওলাফ?”
আরিয়ান তাঁকে তাড়ানোর ফন্দি আঁটে। প্রহর গালে তর্জনী আঙ্গুল ঠেকিয়ে কিছু ভেবে নিয়ে বলে, “চাচ্চু, তুমি কি গাজনী?”
আরিয়ান হতাশ হয়ে বলে, “তুই গাজনী মুভি দেখেছিস?”
প্রহর উপরনিচ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়, “দেখেছিতো, সেও তোমার মতো সব ভুলে যায়।”
আরিয়ান একটা বই বের করে মুখের সামনে ধরে ভাতিজার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখলো। প্রহর গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। একটু পর পর চোরা চোখে দরজার দিকে তাকায়।
পাতাকে দুধের গ্লাস হাতে আসতে দেখেই সে লাফ দিয়ে নামে। চাচার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নেয়। পাতা এসে প্রহরকে না পেয়ে আরিয়ানকে বলে, “ভাইয়া ওলাফকে দেখেছেন?”
পেছন থেকে ভাতিজার ফিসফাস সুরে আরিয়ান মিটিমিটি হেসে বলল, “না দেখিনি তো। সে আমার পেছনেও লুকিয়ে নেই।”
পাতা প্রহরকে দেখতে পায়। কাউচের পেছনে বসে দুই হাত মুখ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। পাতা দাঁত কটমট করে বলে, “ত্যাড়ার বংশধর! এদিকে আয়?”
আরিয়ান তেলে বেগুনে জ্বলে পুড়ে ওঠে। “এই আম পাতা জোড়া জোড়া খবরদার বংশ তুলে কথা বলবে না।”
“একশবার তুলবো। আপনাদের রগে রগে রক্ত কণিকার বদলে রাগ, স্বার্থপরতা আর ঘারত্যাড়ামি মিশে আছে। একটা যদি ভালো বেরুতো!”
পাতা ঠাঁঠ দেখিয়ে গলাবাজি করে। আরিয়ান তেতে বলল, “আমরা তো ভালো না। খারাপের একসের খারাপ। আমাদের ঘরে কেন এলে শুনি?”
“আমি কি অন্তর্যামী নাকি? কিভাবে বুঝতাম আপনাদের বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। মুখে মধু ঝরে অথচ অন্তরে বিষ!”
“তোমরা তো একেকটা ফেরেশতা। পীরের ঘরের পীর সাহেবান।”
“হ্যাঁ তাই।”
“লজ্জা হওয়া উচিত!”
পাতা মুখ কষে। আরিয়ান দাঁত কটমট করে বলে, “ভাই আসুক তোমার এই দুঃসাহসের কথা তাকে না বলছি। কতবড় স্পর্ধা তুমি বংশ তুলে কটুক্তি করো! দু ফুটের মেয়ে আবার বড় বড় কথা!”
আরিয়ান পাতাকে দমানোর চেষ্টা করে। পাতা দমে না, আরও জোরদার সুরে বলে, “আপনার ভাইকে কে ভয় পাচ্ছে? আর দু ফুটের মেয়ে কে? চোখে চশমা লাগান। নিজে খাম্বা হলে অন্যকে দু ফুটই লাগবে। কানা কোথাকার!”
“তুমি আমাকে কানা বললে? তুমি হলে বিচুটি পাতা।”
পাতা কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেলো কি মনে করে। এই সরকারদের কিভাবে শায়েস্তা করা হয় তাঁর জানা আছে। সে তাঁর কথা উপেক্ষা করে প্রহরকে বলল,
“অনেক হয়েছে বাঁদরামি। ভদ্র ছেলের মত দুধ টুকু খেয়ে নাও নইলে একটা মারও মাটিতে পড়বে না।”
আরিয়ান সইতে পারলো না উপেক্ষা। তাদের বংশের আরেক রোগ। তাঁরা প্রায়োরিটি চায়। একটু উপেক্ষিত হলেই তাদের ইগোতে লাগে।
“কি হলো সত্যিটা শুনে মুখে তালা লাগলো? তোমার নাম শুধু পাতা না রেখে বিচুটি পাতা রাখা উচিত ছিলো।”
পাতা আবারও উপেক্ষা করে। প্রহরের সামনে দাঁড়িয়ে ধমক দিলো। প্রহর মুখ থেকে হাত সরিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “আমি দুধ খাবো না, আমার দুধ খেতে ভালো লাগে না।”
“তুই খাবি তোমার চৌদ্দ গুষ্টি শুদ্ধ খাবি।”
“আবার গুষ্টি টানছো? তোমার সমস্যা টা কি হ্যাঁ? ভালো করে বুঝিয়েও তো খাওয়ানো যায় নাকি?”
আরিয়ান আবারও ফোড়ন কাটলো। পাতা শব্দ করে টেবিলের উপর গ্লাস রেখে চলে যায়। প্রহরের মুখটা কালো হয়ে গেলো। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে, “আবার কি হলো?”
প্রহর গাল ফুলিয়ে বলে, “মাম্মাম এংরি বার্ড হয়ে গেছে।”
“তোর পাপা আসলে লাভ বার্ড হয় যাবে। এখন তুই বাপ দুধটুকু খেয়ে নে।”
প্রহর নাক কুঁচকে চায়। আরিয়ান হেসে নাক চেপে ধরল। প্রহর মিষ্টি হেসে গ্লাসটা চাচ্চুর মুখে ধরে। আরিয়ান হেসে দুধে আঙুল চুবিয়ে প্রহরের মুখে মোছ আঁকে। তারপর এক চুমুকে সাবার করে দুধ।
“বড় ভাবী কি হয়েছে তোমার? মুখটা থমথমে লাগছে।”
“কিছু না।”
পাতা একটু হাসার চেষ্টা করে। রুবি কাঁধে হাত রেখে বলল, “অরুর জ্বর কমে নি?”
“জ্বর নেই। রুবি আপু, তুমি চা খাবে? আমি নিজের জন্য বানাচ্ছি তুমি খেলে তোমার জন্যে আনছি।”
“ভাবী আমি বানিয়ে আনছি। তুমি বসো। কোথাও যেও না। কথা আছে তোমার সাথে!”
রুবি নিজেই যায় চা বানাতে চলে যায়। পাতা সোফায় গা ছেড়ে বসলো। রুবি দুই কাপ কফি নিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে আসছিলো। প্রহর দুই হাত মেলে বাঁধা দেয়।
“চাচিমনি তুমি কি এংরি বার্ডকে দেখেছো?”
রুবি চোখ বড় বড় করে বলে, “এভাবে কে ভূতের মতো উদয় হয়? একটুর জন্য ধাক্কা লাগে নি। কফি গরম ছিলো তো। গায়ে পড়লে ফোস্কা পড়তো।”
প্রহর উঁচু হয়ে কফির মগ দেখে বলল, “ওহ্ হো চাচিমনি তুমি আগে বলো এংরি বার্ড কোথায়?”
“এংরি বার্ড টা আবার কে?” রুবি ভ্রু নাচায়।
প্রহর একটু এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, “মাম্মাম এংরি বার্ড হয়ে আছে। তুমি কি দেখেছো? দেখলে জলদি বলো না?”
“ওই তো ড্রয়িং রুমে বসে।”
প্রহর ড্যাং ড্যাং করে মায়ের সামনে হাজির হয়। উপর ঠোঁটের উপরি সীমান্তে লেগে থাকা দুধের উচ্ছিষ্টাংশ দেখিয়ে বলে, “আমি সবটুকু দুধ খেয়েছি মাম্মাম। তুমি আর এংরি বার্ড হয়ে থেকো না। আমার সুইট মাম্মাম হয়ে যাও। প্লিজ মাম্মাম?”
পাতা স্মিত হেসে হাত বাড়ায়। প্রহর সুর তুলে ‘মাম্মাম’ ডেকে মায়ের বুকে মিশে গেছে। রুবি কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বলল, “ওলাফটা পুরো তোমার উপর গেছে ভাবী। বাকি বাচ্চাদের নাকের ডগায় নাখরা আর নাখরা। শুধু হুকুম তামিল করতে জানে তাঁরা। আনি, রূপ, ভোর, অরু সবকটাকে এর পা ধোঁয়া পানি খাওয়াবা। তুমি না খাওয়াও আমিই খাওয়াবো।”
পাতা ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলে, “দুধে ধোয়া তুলসী পাতাও না। এর সাথে কেউ ঘণ্টা খানেক থাকুক আর অভিযোগ না দিক, তবেই আমি মানবো। বাঁচাল তো আছেই সাথে এতো পাকা পাকা কথা বলবে শুনে টাশকি না খেয়ে উপায় নেই।”
রুবি হাসলো, “জানো সেদিন কি বলেছে? চাচিমনি আমিই সবার ছোট। আমার কোনো ছোট ভাই বোন নেই। তুমি আরেকটা বেবি আনো। আমি তাকে খুব আদর করবো। শুনছো পাকার কথা? সেকথা শুনে তোমার দেবর আমার পিছনেই পড়ে আছে।”
রুবির চোখে মুখে লজ্জা। পাতা কফিতে ফু দিয়ে ছেলের মুখে ধরে বলে, “তো প্ল্যানিং শুরু কেন করছো না আপু? আরেকটা সরকার আসলে মন্দ হয় না।”
“তুমিও না ভাবী! বুড়ো বয়সে এসে… না না না! অসম্ভব!”
রুবি হাসে। এবার পাতা নড়েচড়ে বসলো। রুবি আপু কি তাঁকে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করছে? সে তো আর বুড়ো না। তাছাড়াও ভোরের সাত বছরে অরু এলো, অরুর সাতে ওলাফ তাদের মাঝে হাজির। অরুর সে কি রাগ! তাঁর ভাই বোন চাই না। তবে ভোর খুব খুশি হয়েছিল।
“ভাবী তুমি তো আমার কথা শুনছোই না!”
“তুমি বলছোই না। বলো কি বলবে শুনি?”
রুবি কফির মগ রেখে দেয়। হাসিমুখে বলে, “বিকেলে তৈমুরের মা ফোন করেছিল। ওঁরা আনুষ্ঠানিক ভাবে আসতে চাইছে। আর সেদিনই রিং পড়াবে বললো। আরিয়ানকেও ফোন করেছিল। অরুণ ভাইয়ার সাথে কথা বলে তাদের একটা ডেইট দিবে। আজকেই!”
“এটাতো দারুণ খবর। তুমি আগে কেন জানাও নি। আচ্ছা তুমি কি আনিকার সাথে কথা বলেছো? ও কি রাজি এই বিয়েতে?”
“না করে নি। আবার হ্যাঁও করেনি। আমি আরিয়ানকে বলেছি। আগে ওর সাথে কথা বলো তারপর যা করার করো।”
“ওর পছন্দ টছন্দ আছে নাকি কোথাও? একটু ফ্রিলি কথা বলে দেখিও আপু।”
রুবি মাথা নাড়লো। কফির মগ পুনরায় তুলে নেয়। পাতা তাঁর দিকে তাকায়। রুবি আপুর চোখে মুখে উপচেপড়া আনন্দ দেখে বলে, “আপু মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছো। যখন পরের ঘরে চলে যাবে খারাপ লাগবে না?”
রুবির হাসিরা জানালা দিয়ে পালায়। পানশুটে মুখে বলে, “এখনি তো তুলে দিচ্ছি না। মেয়ের গ্র্যাজুয়েশনের আগে চো প্রশ্নই আসে না। যুগ জামানা ভালো না। মেয়ে বড় হচ্ছে কখন কোন পথে হাঁটে বিশ্বাস নেই। আজকালকার মেয়েদের রুচি নেই। বখাটেদের দিকে ঝুঁকে বেশি। তৈমুর খুব ভদ্র ছেলে ভাবী। তাঁর একটা গুন আমার এত্তো ভালো লেগেছে। সে মেয়েদের সম্মান করতে জানে।”
পাতা মুচকি হেসে বলল, “ভালো হলেই ভালো। আল্লাহ পাক আমাদের আনি বুড়ির ঝুলিতে সব খুশি ঢেলে দিক। তৈমুরের সাথে সুন্দর একটা সংসার গড়ে উঠুক!”
অরুণাভের পদচারণা থেমে যায়। শক্ত হওয়া হাতের মুঠো আলগা হয়ে আসে আপনে আপ। ড্রয়িংরুম থেকে ফিরে এনে হনহনিয়ে উপরে যায়।
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে। তাঁকে দেখেই প্রহর ‘পাপা’ বলে হাঁক ছাড়ল। অগত্যা অরুণ ড্রয়িংরুমের দিকেই এগিয়ে যায়।
অরুণাভ রাগে ক্ষোভে দিকবিদিক ভুলে হাঁটছিলো। হঠাৎ কিছু একটার সাথে ধাক্কা খায়। আনিকাকে মাথা ডলতে দেখে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। আনিকা কপাল ডলে বিরক্ত সুরে বলে, “চোখে কি ছানি পড়েছে তোর? দেখে হাঁটতে পারিস না?”
অরুণাভ থেমে যায়। হাতের মুঠো শক্ত করে ছোট্ট পরিসরে ‘স্যরি’ বলে আবারও পা চালায়।
আনিকার চোখ রসগোল্লার মত আকার ধারণ করে। মুখটা হা হয়ে যায়। সত্যিই স্যরি বলল নাকি সে ভুল শুনেছে? অরুণাভের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে আনিকা। কি মনে করে দৌড়ে গিয়ে সম্মুখে দুই হাত মেলে দিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। অরুণাভের আপাদমস্তকে চোখ বুলিয়ে নেয়।নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে বলে,
“স্যুট ব্যুটে হেব্বি লাগছে তো তোকে। পুরাই জেন্টলম্যান! তা কোথায় যাওয়া হয়েছিল শুনি? গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে বেরিয়েছিলি বুঝি? হুঁ হুঁ?”
অরুণাভ নিরুত্তর। আনিকা সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, “কিন্তু চোখ ভেজা কেন? কাঁদছিলি নাকি? গার্লফ্রেন্ড ধোঁকা দিয়েছে বাবুটাকে?”
অরুণাভ তবুও নিরুত্তর। আনিকা হেসে ভোরের থুতনি ধরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলল, “ওলে লে বাবুতা কেঁদে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে। কি হয়েছে বাবুতা?”
অরুণাভ ঝটকায় সরিয়ে দিলো হাত। আনিকা দমলো না। হেসে বলল,
“তুই ছোটবেলাতেও ছিঁচকাদুনে ছিলি এখনও আছিস। চোয়ালে দাঁড়ি এসেছে আর উনি এখনো বাচ্চাদের মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদে। ছিঃ ভোর ছিঃ! শেম অন ইয়্যু!”
“বিরক্ত করিস না। পথ ছাড় আনিকা?”
তাঁর থমথমে কণ্ঠে আনিকা দমে গেলো। বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে, “কি হয়েছে রে? চাচ্চু আবারও বকেছে নাকি? ভূত হয়ে আছিস কেন? কিছু তো বল!”
“কিছু না। সর!”
অরুণাভ তাঁকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। আনিকা দুই হাতে বাহু ধরে আটকায়। উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “কি হয়েছে? বেস্ট ফ্রেন্ডকেও বলবি না?”
অরুণাভ বাহু হতে আনিকার হাত আলগোছে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “তুই আমার বেস্ট এনিমি, নট ফ্রেন্ড।”
আনিকা অরুণাভের আঙুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে বলে, “তো বেস্ট এনিমিকে কিছু বলার নেই?”
অরুণাভ স্বীয় হাতের ভাঁজে থাকা আনিকার হাতটার দিকে তাকায় তো, আরেকবার আনিকার দিকে তাকায়। কণ্ঠরা গলা অবদি এসেও ফিরে যায়। রিংটা কোথায় রেখেছে যেন? পকেটে হাত দিলে বেরুবে কি? তাঁকে কি মনে খবর জানাবে? যদি খালি হাতে ফিরতে হয়? অরুণাভ ব্যর্থ হৃদয়ে বলে, “না।”
“সত্যিই কিছু বলার নেই? কিছুই না?” আনিকা উৎসুক চোখে চায়।
অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে, “আই লাভ ইয়্যু।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………