ভাব তরঙ্গ - পর্ব ০৯ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
“সত্যিই কিছু বলার নেই? কিছুই না?” আনিকা উৎসুক চোখে চায়।

অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বলে, “আই লাভ ইয়্যু।”

খানিকটা নিস্তব্ধতা এসে ছুঁয়ে দিলো। অরুণাভ শ্বাস আটকে রাখে। আনিকার চাহনিতে আপনে আপ হাত দুটো দু গালে ঠেকে। আনিকা চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখায়। দাঁত কটমট করে বলে,

“কি বললি আবার বল?”

অরুণাভের জান গলায় আটকায়। নাকের পাটা ফুলিয়ে মিনমিনে সুরে বলে, “শুনিস নি?”

না শুনলেই ভালো। অরুণাভ গাল হতে হাত সরায় নি। যেকোনো সময় থাপ্পড় জুটতে পারে। আনিকা দৃঢ়তার সাথে জবাব দিলো, “অভ্যিয়াসলি শুনেছি। কিন্তু ‘আই লাভ ইয়্যু টু’ কাকে বললি বুঝতে পারি নি। আমাকে বললি কি? হাউ ডেয়ার ইয়্যু?”

তাঁর কথার মারপ্যাঁচ বুঝতে অক্ষম অরুণাভ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। আনিকা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। টাইয়ের নট টাইট করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে বলল, “কোথায় পালাচ্ছিস? লজ্জা করে না?”

অরুণাভের কাশি উঠে যায়। আনিকা পায়ে ভর দিয়ে উঁচু হয়। মুখটা মুখের কাছে নিয়ে রাগী রাগী সুরে ফিসফিস করে, “আই হেইট ইয়্যু এন্ড আই ওলসো কিল ইয়্যু বাড্ডি।”

বলেই টাইয়ের নট টাইট করে। এবার অরুণাভ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শান্ত চাহনি ওই অশান্ত চাহনিতে আঁটকে যায়। গোলগাল ঝলমলে চোখযুগ্মের পাপড়িতে মাসকারা ব্যবহার করেছে, সবসময়ই করে। মেয়েটার ধারনা ওর চোখের পাপড়ি পাতলা তাই মাশকারা ব্যবহার করা কখনোই ভুলবে না। সুচারু তেল চিটচিটে নাক, লিপবামে ঘষা চিকন ওষ্ঠাধর, নব কিশলয়ের মতো থুতনিতে ছোট্ট গর্ত। সবসময়ই চোখের সামনেই ঘুরঘুর করে বিধায় নতুন করে মুগ্ধ করার মতো কিছুই নেই। কিন্তু অরুণাভ সরকার এই মেয়েটাতেই বাজেভাবে ফেঁসে আছে। এই চিরচেনা মুখাবয়ব তাঁর হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। তাদের মধ্যে কোনোকালেই মিঠা মিঠা সম্পর্ক ছিলো না। 

এই দখিনা অম্বরে মেঘ আসে, 
 কখনো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। 
এই ঝলমলে রৌদ্দুরকে দেখা যায়, 
 কখনো বৈরাগী ঝড়ে তছনছ করে যায়। 

অরুণাভ মুচকি হাসলো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওয়ালেট বের করে। কিছু খুঁজবে তখনই তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি ঠাহর করা গেলো।

“উঁহু উঁহু উঁহু! পাপা ইজ কামিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং!”

অরুণাভ সচকিত ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকায়। উত্তরের বারান্দায় দন্ডায়মান বোন অরুণিতার সাবধানি চাহনিতে সিঁড়ির দিকে তাকায়। প্রহরকে কোলে নিয়ে বাবা এদিকেই আসছে। সে সন্তর্পণে আনিকাকে সরিয়ে দেয়। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে ক্ষীণ। আনিকা চোখ পাকিয়ে শাসন করলো যেন। গলায় ঝুলায়মান ওড়না উড়িয়ে চলে যায় গুনগুনিয়ে। অরুণাভ বাঁকা চোখে তা দেখে সামনে অগ্রসর হয়। অরুণিতার মাথায় টোকা দিয়ে মিষ্টি হাসি উপহার দিলো।

“থ্যাঙ্কস ভাবুক চড়ুই।”

“মেনশন নট ব্রো।”

“কখন থেকে ছিলি?”

“শুরু থেকেই!” 

অরুণিতার স্পষ্ট জবাবে অরুণাভ লজ্জিত হয়। তাঁকে অস্বস্তি থেকে তুলতে অরুণিতা প্রসঙ্গ বদলায়। গম্ভীর মুখে বলল,

“অফিসে প্রথম দিন কিভাবে কাটলো তোমার? পাপা কি বেশিই কাজ করিয়েছে? টায়ার্ড লাগছে তোমাকে!”

অরুণাভ হাঁফ ছাড়লো। বোনের কাঁধ জড়িয়ে স্বীয় ঘরের দিকে পা বাড়ালো। চঞ্চলা সুরে বলল, 

“বেশি মানে অনেক বেশি। দৌড়ের উপর ছিলাম । সে বাদ দে! জানিস এতো সুন্দর সুন্দর গয়নার কালেকশন। দেখলেই নিতে মন চাইবে। আমি তো পকেটে ফেলে দু’জোড়া ঝুমকো, আরেকটা ব্রেসলেট এনেছি। পাপাকে বলিস না যেন।”

অরুণিতা ভাইয়ের পায়ের সাথে পা মেলায়। কৌতুহলী দৃষ্টিতে ঘার ফিরিয়ে জানতে চায়, “আনিপু জন্য?”

“না তোর জন্য।”

অরুণাভ পকেট থেকে সত্যিই দু’জোড়া ঝুমকো আর একটা ব্রেসলেট বের করে। অরুণিতা তব্দা খেয়ে যায়। বিস্ময়ে তাকিয়ে বলে, “পাপার অফিস থেকে লুকিয়ে এনেছো?”

“হ্যাঁ, পাপার কানে যেন না যায়।”

অরুণাভ হেসে বোনের গাল টিপে দিলো। অরুণিতা ঝুমকো হাতে মুচকি হাসলো, “একজোড়া এয়ারিং আনিপুকে দিবো।”

“দরকার নেই। টের পেলে পাপার কানে দিবে। তখন আমার মান সম্মান শেষ! প্রথমবার অফিসে গিয়ে চুরি! সবাই ছিঃ ছিঃ করবে।”

অরুণাভ হাসতে হাসতে বলল। অরুণিতা মুচকি হাসিতেই আঁটকে। অরুণাভ ঘরে ঢুকে কাপড় চোপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে ফ্রেশ হতে যায়। অরুণিতা বিছানায় বসে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালো। একছুটে কিচেনে চলে আসে। কিচেনে সুফিয়া পান চিবোচ্ছিলো। অরুণিতাকে দেখে লাল টকটকে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসি উপহার দিলো।

“কিছু কইবা পিচ্চি খালাম্মা?”

“আমি চা বানাবো। আপনি একটু আদা কুঁচি করে দিন।”

সুফিয়া ‘জে পিচ্চি খালাম্মা’ বলে আদা হাতে নেয়। অরুণিতা ঝটপট চা বানিয়ে ফেলে। এক কাপে চা ঢেলে নিয়ে সুফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আমি ব্রো’র জন্য নিয়ে যাচ্ছি। আপনি বাকি চা সবাইকে দিয়ে দিবেন।”

“পিচ্চি খালাম্মা, আপনের খাড়ুস বাপের মতো আপনের রান্ধোনের হাত পাক্কা আছে। আপনের হাতের চা খাইলে মনডাই জুইড়্যা যায়।”

অরুণিতা দরজা অবদি গিয়ে ফিরে চাইলো সুফিয়ার দিকে। কপালে ভাঁজ ফুটিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “অনেকটা বানিয়েছি আপনিও নিতে পারেন।”

অরুণিতার রসকষহীন কণ্ঠ ভালো লাগে না সুফিয়ার। এই বয়সের মাইয়া মানুষ সবসময় হাসিখুশি থাকবো, গুনগুনাইবো, ছটফট করবো। অথচ এই বেডি বাপের মতোই রাম গরুরে ছানা। 

অরুণাভ গোসল সেরে সদ্যই বিছানায় গা ছেড়েছিল। অরুণিতাকে চা সমেত ফিরতে দেখে হাসি উপহার দিলো।

“আমি ভাবছিলাম চায়ের আবদার করবো। কিন্তু তুই তো আগেই চা নিয়ে হাজির। এগেইন থ্যাংকস মায় লিটল সুইট সিস।”

অরুণিতা চায়ের কাপ হাতে দিয়ে গমগমে সুরে বলল, “চাচিমনি আজ পাত্রপক্ষকে ফাইনাল ডেইট দিবে বলেছে। আজ ডিনারের পর এ নিয়ে আলোচনা বসবে শুনলাম।”

অরুণাভ চায়ের কাপে ঠোঁট ভিজিয়ে মন মরা হয়ে বলল, “আমি আসলে বুঝতে পারছি না কি করবো। চাচিমনি এখনি আনিকার বিয়ে দেওয়ার জন্য এতটা উতলা কেন হলো!”

“তোমার জন্য।”

অরুণাভ ব্যথিত বদনে চা সেবন করে। অরুণিতা ভাইয়ের পাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “চাচিমনি তোমাকে এতোটা অপছন্দ কেন করে বলোতো?”

অরুণাভের মুখটা বিতৃষ্ণায় ভরে যায়। স্বাদে গন্ধে ভরপুর চাও পানসে লাগে। সে বলল, “পাপাকে আনিকার কথা তুই জানিয়েছিলি?

অরুণিতা মাথা নাড়লো। অরুণাভ অসহায়ের সাথে বলল, “এখন আমার কি করা উচিত বলতো ভাবুক চড়ুই? আনিকা ওর মায়ের হাতের পুতুল। মাকে ছাড়া ও এক পাও নড়বে না আমি জানি। আর এও জানি চাচিমনি আমাকে কখনোই মানবে না। তাঁর উপর দিন দুয়েকের মাঝেই আমাকে মাঠে ফিরতে হবে। এসবের মাঝে আমি খেলায় ফোকাস করবো কিভাবে? আমার মাথা কাজ করছে না।”

অরুণাভ চায়ের কাপ রেখে দিলো। গলা দিয়ে নামছে না। রাগে সব তছনছ করে দিতে ইচ্ছে করছে। অরুণিতা ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, 

“পাপা দেখে নিবে সব। তুমি রিল্যাক্সে থাকো ব্রো।”

কারো পদচারণার শব্দে অরুণাভ, অরুণিতা দরজায় নজর ফেরায়। প্রহর দাঁড়িয়ে আছে। মুখে লেগে আছে মুক্তঝরা হাসি। হাতে লাচ্ছির গ্লাস। স্ট্র ডুবিয়ে লাচ্ছি খাচ্ছে জনাব। তাঁর পেছন দাঁড়িয়ে অরুণ সরকার। ভদ্রলোক এগিয়ে আসে। মেয়ের কপালে হাত ছুঁয়ে নরম সুরে জানতে চায়,

“জ্বর আর এসেছিল চড়ুই সোনার?”

অরুণিতা মাথা নাড়লো, “না পাপা।”

“পাপা জ্বর কিসে চড়ে আসে? গাড়িতে চড়ে? ওহ্ আচ্ছা বুঝেছি হেলিকপ্টারে চড়ে আসে জ্বর!”

অরুণ ঘার বাঁকিয়ে ছোট ছেলের দিকে ফেরে। ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল, “ছোট সরকার মুখটা একটু বন্ধ রাখুন। লাচ্ছি খান।”

“পাপা, আমি লাচ্ছি খান নই তো! আমি প্রহর খান!”

থামে প্রহর। চোখ পিটপিট করে আবার বলল, “না না মিশটেক হয়েছে পাপা। আমি খান না। আমি তো সরকার, প্রহর সরকার। তোমাদের ওলাফ। ঠিক বলেছি না বলো?”

“ছোট সরকার, এতো কথা কেন বলেন আপনি?”

প্রহরের মুখটা অভিমানে টইটম্বুর। একটা কেউ তাঁর কথা শুনতে চায় না। সবাই চুপ থাকতে বলে। সে মন খারাপ করে চলে যায় সেখান থেকে। 

প্রহরকে যেতে দেখে অরুণাভ ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটে যায় তাঁর পিছু পিছু। যেতে যেতে বাবাকে কথা শোনাতে ভুলে না। অরুণ সেদিক গুরুত্ব না দিয়ে মেয়ের ম্লান মুখটার দিকে তাকালো। থুতনি ধরে কোমল গলায় বলল, “পাপার চড়ুই, মুখটা কালো রে রেখেছে কেন? কি হয়েছে?”

অরুণিতা মুখটা আরেকটু গম্ভীর বানিয়ে বলল, “কিছু না পাপা।”

“তোমার মাম্মাম বলে, ‘কি হয়েছে?’এর জবাবে যদি মেয়েরা ‘কিছুই হয় নি’ বলে তবে বুঝে নিতে হবে মামলা ক্রিটিক্যাল।”

অরুণিতা ঘার তুলে বাবার মুখের দিকে তাকায়। অরুণ মেয়ের পাশে বসে বাহুতে জড়িয়ে নিলো। মাথার অগ্রভাগে চুমু দিয়ে বলল, “পাপাকে বলবে না?”

অরুণিতা কতক্ষণ স্থবির হয়ে পড়ে রয়। মাম্মাম নিশ্চয়ই পাপাকে সব বলে দিয়েছে। এখন পাপা কি তাকে বাজে ভাবছে? ভাবলে ভাবুক! সে তো ভুল কিছু বলে নি। লতা আন্টির কথা তাঁর খুব একটা বিশ্বাস হয় নি। তাই মাম্মামের কাছে এনশিওর হতে চেয়েছিল। কিন্তু মাম্মাম এতোটা রেগে যাবে সে বুঝতে পারে নি। এখানে রাগের কিছুই সে দেখছে না। মাম্মাম একটু বেশি বেশিই করে। 

“ওই মা?”

“আমি কারো মা নই।”

অরুণিতা রাগ দেখিয়ে বাবার বাহু বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁটা দেয়। অরুণের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে কাল বিলম্ব না করে মেয়ের পিছু আসে। 

“কারো না, তুমি শুধু আমার মা।”

অরুণিতা পিছু ফিরলো না। কাঠখোট্টা সুরে বলল, “স্টপ ফলোয়িং মি।”

“আই’ম নট, আনটিল ইয়্যু টেল মি এভরিথিং।”

“হোয়াই, ডিডন্ট ইয়োর পাতাবাহার টেল ইয়্যু? অ্যাজ ফার অ্যাজ আই নো, শি টোল্ড ইউ এভরিথিং ইন ডিটেইল।”

“শি ডিডন্ট টেল মি এনিথিং। হোয়াই আর ইয়্যু গেটিং এংরি সোনা?”

অরুণিতা দাঁত কটমট করে বললো, “আ’ম নট এংরি!”

“অফ কোর্স ইয়্যু আর!”

অরুণিতা থেমে যায়। রাগান্বিত দৃষ্টি ফেলে বাবার উপর। গম্ভীর অরুণ সরকার একটু ভড়কালো বৈ কি। খানিকটা আমতা আমতা সুরে বলল, “ইয়্যুর নোস হ্যাজ টার্নড রেড, দ্যাটস হুয়াই আই সেইড!”

অরুণিতা স্বীয় বোচা নাকের পাটা ফুলিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “আ’ম নট এংরি। স্টপ বদারিং মি।”

অরুণ সরকার কপাল চুলকায়। মেয়ের রাগকে প্রচন্ড ভয় পায় সে। আবার কি হয়েছে মা মেয়ের? সকালে তো ঠিকই দেখে গেলো। এক বেলায় কি এমন হলো? পাতাবাহার তো তাঁকে কিছুই বলে নি। সে মিনমিন করে বলল,

“আ’ম সো স্যরি। মায়ের মন খারাপ থাকলে ছেলের ভালো লাগে বলো? বলো না মা, কি হয়েছে?”

“তোমার মাথা আর তোমার পাতাবাহারের মুন্ড হয়েছে।”

অরুণিতা রাগ দেখিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল নিজ ঘরে। সপাটে দরজা লাগানোর শব্দে অরুণ শুকনো ঢোঁক গিলে। দুনিয়ায় সবার সামনে গর্জে ওঠা বাঘ তার বাঘিনীর কাছে এসে ভেজা বেড়ালের মতো মিউমিউ করবে স্বাভাবিক। অস্বীকার করার কিছুই নেই। দাম্ভিকতায় ঠাসা নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকটাকে এই বাঘিনীই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারে। আর কেউ না, মানে কেউই না। 

—————

“বললাম তো কিছুই হয় নি। বারবার এক কথা বলে বিরক্ত কেন করছেন?”

অরুণ এবার ক্লান্ত বোধ করে। হাল ছেড়ে বিছানায় ছেলের পাশে গা এলিয়ে দেয়। কনুই ভাঁজ করে চোখের উপর মেলে সটান হয়ে শুয়ে থাকে। প্রহর অধরা পাজেল ফেলে বাবার গায়ে কম্বল টেনে দেয়। নিজেও কম্বলের ভেতরে ঢুকে বাবার বুকের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। ফিসফিস করে বলে,

“পাপা, মাম্মাম কি হাল্ক?”

অরুণ হাসলো। চোখের উপর থেকে হাত নামিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে পাশ ফিরে শোয়। কপালে চুমু দিয়ে বলে, “ছোট সরকার, ফরফর না করে ঘুমান। আপনার মাম্মাম কিন্তু রেগে আছে।”

প্রহর মুখ কালো করে বলল, “আমি কি ব্যাড বয়?”

অরুণ সরকার ছোট ছোট চোখে চায়, “না।”

“তাহলে সবসময় আমাকে চুপ থাকতে বলো কেন? আমি কি বোবা?”

অরুণ ছেলের ঠোঁটের ডগায় টুপ করে আদর করে দেয়। বুকে শক্ত করে চেপে ধরে বলে, “তুমি এমন অদ্ভুত কথা বলো যা শুনে আমরা টাশকি খেয়ে যাই। জবাব খুঁজে পাই না। তাই চুপ থাকতে বলি।”

“টাশকি কি জিনিস? কিভাবে খায়?”

পাতার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা যায়। অরুণ ঘার তুলে দেখে একপল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে আর হাসছে। আচ্ছা, মহিলা বুড়ি কেন হচ্ছে না? মনে হয় বয়স বাড়ার বদলে কমছে। দেখে বোঝা দায়, এই মহিলা তিন ছানার মা! অরুণ নিজ কাঁচা পাকা মিশেলের দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ছেলের দিকে তাকায়।

প্রহর চোখ বড় বড় করে চেয়ে। অরুণ সরকার ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে, “টাশকি খায় না রে বাবা। টাশকি…”

“তাহলে তুমি যে বললে আমার কথা শুনে টাশকি খাও!”

প্রহর ভ্রুযুগল উঁচিয়ে পরপর প্রশ্ন ছুঁড়ে। অরুণ ঠোঁটে ঠোঁট চাপে। কি জবাব দিবে বুঝে উঠতে পারে না। এই ছেলের সাথে কথা বলার সময় একশ একবার ভাবতে হয়। সে একটু ভেবেচিন্তে বলল,

“টাশকি খাওয়া মানে হত বিহ্বল হয়ে পড়া।”

প্রহর বলতেই নিয়েছিল, হত বিহ্বল আবার কি জিনিস? কিন্তু অরুণ তাঁর আগেই বিপদের আঁচ করে ছেলের মুখ চেপে ধরে বলল, “আমার মানিক সোনা, আমার অবেলার প্রহর। এখন পাপার বুকে চুপটি করে ঘুম দাও। এ বিষয়ে আমরা কাল কথা বলবো, কেমন?”

প্রহর গাল ফুলিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। অরুণ হেসে তাঁকে আদর করে। পিঠে আলতোভাবে চাপড় মেরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ভারী শ্বাস টের পেতেই মাথাটা যত্ন সহকারে বালিশে রাখে। কপালে চুমু দিয়ে উঠে যায়।

উদাসী চিত্তে বেলকনিতে বসে পাতা। কোমড় সমান চুল গুলো উত্তরী ঠান্ডা হাওয়ায় বরপ হয়ে আছে। অরুণ সরকার পিঠ পেছনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে দেয়। ঝুটিতে টিপে দিলে প্যাপু শব্দ হয়ে কান খাঁড়া হয় না? সেই টুপি মেয়ের জন্য এনেছিল সে। মেয়ে নাক মুখ কুঁচকে ‘বাচ্চাদের খেলনা’ বলে উপহাস করেছিল। তাই মেয়ের মাকেই পড়িয়ে দেয় সে। মহিলাকে কিউট লাগে এই টুপিতে। অরুণ গাল টিপে দিয়ে সামনের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ায়। 

পাতা কোণা চোখে গম্ভীর মুখখানি দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অরুণ ছোট ছোট চোখে চায়। রাশভারী সুরে বলে,

“মেয়ে চুপ, তুমিও চুপ। আর অরুণ সরকার তো অন্তর্যামী। আচ্ছা কাউকে কিছুই বলতে হবে না।”

পাতা রাগী চাহনিতে সাবধান করলে অরুণ অবাক হয়ে বলে, “আশ্চর্য ওভাবে তাকাচ্ছো কেন? আমি কি করেছি?”

পাতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। দাঁত কটমট করে বিড়বিড়ালো কিছু। অরুণ তা শুনে হাসলো। কিছু পল নীরবে নিভৃতে বোঝার চেষ্টা করলো পাতাকে। এক সময় নীরাবতার বেড়াজাল ছিঁড়ে পকেট থেকে ফোন বের করে। একটা ভিডিও বের করে পাতাকে দেখায়।

পাতা থমকালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে বারবার দেখে। অবিশ্বাস্য মনে বলে, “নিশ্চয়ই এডিট করা ভিডিও!”

“এডিট না। আপনার গুনধর ছেলের কাজ। আপনার কথায় ফুঁসলিয়ে ফাসলিয়ে নবাব পুত্তুরকে অফিস নিয়ে গেলাম, ব্যবসার হালচাল শেখাতে। কিন্তু এ ছেলে ব্যবসায় লাল সেলাম ঠুকে এলো। সবার সামনে আমার নাক কাঁটা গেলো।”

পাতার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। তবুও ছেলেকে রক্ষার্থে আদর্শ মায়ের মতো বলল, “অফিসের যা কিছু সব ভোর সোনার। পছন্দ হয়েছে নিয়েছে। এখানে নাক কাটা যাওয়ার কি আছে শুনি?”

“পছন্দ হয়েছে আমাকে বলে নিতো। এরকম ছেলে মানুষী করার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। আমি আরো সুজনকে বলছিলাম স্টাফদের চেক করতে। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ আমার চোখ খুলে দিলো। ওয়াও দারুণ!”

পাতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে অরুণের দিকে। অরুণ বিরক্ত মুখে বলল, “ওকে বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে। একটা না একটা কান্ড ঘটাবেই। রুবি ভুল কিছু বলে না। অতিরিক্ত লাট দেখিয়ে বিগড়ে দিয়েছি আমি। এন্ড আই রিগ্রেট!”

“আর আপনার কথার টোনে মনে হচ্ছে ভোরকে চোর বলছেন।”

“চুরি করলে চোর বলবো না?”

“অফিসটা তো ওরই।”

“অফিসটা স্টিল আমার।”

অরুণ দৃঢ়তার সাথে প্রতিবাদ করে। পাতা মুচকি হেসে বলল, “অফিসটা ভোরের বাবার।”

“তো? চুরিকে ‘বাবার অফিস’ বলে ঢাকতে পারবে না। সাধে কি ফোর টোয়েন্টি বলি? ওই ছেলে পুরো বিগড়ে গেছে। আমি শিওর ওই গয়না গুলো গার্লফ্রেন্ডকে দিবে।”

পাতা সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, “গার্লফ্রেন্ড?”

অরুণ সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “অবাক হওয়ার কিছু নেই। তোমার ছেলে সাধু মোটেই না। আমি খোঁজ খবর রাখি তাই আমি জানি। কোথায় কি করে, না করে সব আমার কানে আসে, বুঝেছো?”

পাতা হাসে। ‘আমার ছেলে’ কনভার্ট হয়ে ‘তোমার ছেলে’ হয়ে গেছে অনেক আগেই। বাপেরা খুব স্বার্থপর মা*ল। যখন ছেলে ভালো থাকে, বাপের কথা শুনে, তখন ছেলে বাপেরই থাকে। যখন নাগালের বাইরে চলে যায় তখন মায়ের ছেলে হয়ে যায়। পাতা মুচকি হেসে বলল, 

“ওর গার্লফ্রেন্ডকে চিনেন আপনি? আমাকে দেখাবেন? ছবি আছে?”

“ওর স্কুল টিচারের মেয়ে রামিশা, কোচিং সেন্টারে আরো দুটো মেয়ের সাথেও বেশ ভাব ছিলো। প্রেমের গুঞ্জনও শোনা গেছে। এখন অবশ্য ওদের সাথে যোগাযোগ নেই। তবে ভার্সিটিতে এক সিনিয়র মেয়ে, নাম নীলা। থার্ড ইয়ারে পড়ছে। তাঁর সাথেও বেশ ভাব নবাব পুত্তুরের। রেস্টুরেন্টে হা হা হি হি করতে দেখেছি আমি। তাও স্বচোক্ষে। একবার, দুবার না বরঞ্চ তিন তিন বার। গার্লফ্রেন্ডের অভাব আছে নাকি ওর। বাড়িতেও একজন আছে!”

“আশ্চর্য রেস্টুরেন্টে গেলেই গার্লফ্রেন্ড হয়ে যায় নাকি? আর বাড়িতে একজন আছে মানে?”

পাতা অবাক হয়ে বলে। অরুণ সন্দিহান চিত্তে শুধায়, “জানো না? তোমাকে বলে নি?”

পাতা অবুঝ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। অরুণ সরকার তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “ফোর টোয়েন্টিটা আনিকাকে পছন্দ করে। আমিও জানতাম না। সেদিন অরুণিতা বললো বলেই না জানলাম।”

পাতা বুঝি বৈদ্যুতিক শক খেলো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বড় বড় চোখ বানিয়ে বলল, “কি বলছেন ভোরের বাবা! আনির না বিয়ের কথাবার্তা চলছে? রুবি আপু তো খুব আগ্রহী। তাই আমি মন থেকে কত দোয়াই না করলাম বিয়েটা যেন হয়েই যায়।”

অরুণ বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পাতা মুহূর্তেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। হাত পায়ের তালু জ্বলছে। আকস্মিক শক হজম করতে কষ্ট হয়। ভোর আনিকে পছন্দ করে। আর এদিকে আনির বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত। এখন ভোরের কি হবে? চিন্তায় পাতার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অরুণের বাহু ঝাঁকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,

“আপনি সব জেনেও চুপ করে আছেন কেন ভোরের বাবা? কিছু করছেন না কেন?”

“আমি কি করবো?”

“কি করবেন মানে? আনির বিয়েটা ভেঙ্গে দিন। আরিয়ান ভাইয়া আর আপুর সাথে কথা বলুন। ওদের চারহাত এক করার ব্যবস্থা করে দিন।”

অরুণ পাতার কাঁধ জড়িয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একে একে সব খুলে বলে। পাতা সব শুনে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

“রুবি আপু যে ভোরকে পছন্দ করে না তা বোঝা কঠিন কিছু না। কিন্তু আরিয়ান ভাইয়ার কি সমস্যা? উনি কিভাবে পারলো মুখের উপর প্রস্তাব নাকচ করে দিতে? আমার ছেলে কি এতটাই পচে গেছে? কি এমন পাপ করেছে যে তাঁকে মেয়ে দিবে না। বড় ভাই প্রস্তাব রেখেছে। তুই কিভাবে পারলি মুখের উপর মানা করে দিতে? আরিয়ান ভাইয়ার সাথে কালকে আমার লেগে যাবে।”

“রিল্যাক্সড পাতাবাহার। তুমি কিছু বলতে যেওনা না। যেচে অপমান হওয়ার কোনো দরকার নেই।”

“দরকার নেই মানে? ভোরের বাবা, কাল এংগেজমেন্টের ডেইট দিবে। বিয়ের দিনটাও সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ফালাবে। আর আপনি হাত গুটিয়ে বসে আছেন?”

অরুণ পাতাকে শান্ত হতে বলে। বাহুতে হাত বুলিয়ে নরম সুরে বলে, “তোমার ওই ‘House of পাতাবাহার’ আমাকে ভাড়ায় দিবে? আমি মাসে পঁচিশ হাজার করে দিবো। ছয় মাসের বাড়ি ভাড়া এডভান্স দিতেও রাজি।”

পাতার সমস্ত উত্তেজনা ফিকে হয়ে আসে। গম্ভীর মুখ পানে চেয়ে অবিশ্বাস্য সুরে বলে, “আপনি কথা ঘোরাচ্ছেন। আর ওই বাড়ির কথা কেন উঠছে?”

“উঠছে কারণ তুমি তোমার বাড়িতে ওঠার অনুমতি দিলে আমরা খুব শিঘ্রই সেখানে শিফট হচ্ছি। কারো বিষফোঁড়া হয়ে এ বাড়িতে থাকার মানেই হয় না। আশাকরি তুমি বুঝতে পারবে আমি কেন সরকার বাড়ি ছাড়তে চাইছি।”

পাতা বুঝি চিন্তায় জ্ঞান হারাবে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চাইলো, “ভোরের বাবা, ভোর আনির বিষয়টা?”

“আমি প্রস্তাব রেখেছিলাম। ওঁদের যুতসই লাগে নি তাই মানা করেছে। কথা সেখানেই শেষ। যা কিছু হয়ে যাক আমি অরুণ সরকার দ্বিতীয়বার তাদের দ্বারপ্রান্তে যাচ্ছি না।”

পাতা শ্বাস নিতেও ভুলে যায়, “এখানেও ইগো!”

অরুণ কিছু বলে না। ইগো বললে ইগো! সে নত হবে না মোটেই। পাতা শক্ত কিছু বলার জন্য হা করে। অরুণের ইশারায় থেমে যায়। ঘার ঘুরিয়ে বেলকনির দরজার দিকে তাকায়। প্রহর দাঁড়িয়ে চোখ কচলাচ্ছে। হামি তুলে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলে,

“পাপা, মাম্মাম তোমরা কি লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছো?”

—————

কুয়াশায় ঘেরা, শীতের রাতে, বিলীন জোছনা। ছাদের রেলিংয়ের উপর বসে আঁধারে ডুবেছে এক যুবা। হাতে ধোঁয়া ওড়ানো কফির মগ। কাঁধে চড়ে সঙ্গী অ্যানা মিউ মিউ ডেকে চলেছে বিরামহীন। তাঁর ডাকে বিরক্ত হয়ে যুবা বলে,

“অ্যানা চুপ থাকো, নয়তো চলে যাও এখান থেকে। আমাকে বিরক্ত কোরো না।”

অ্যানা এক পা বাড়িয়ে অরুণাভের গালে খোঁচায়। অরুণাভ বিরক্ত হয়ে তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে দেয়। অ্যানা কতক্ষণ মিউমিউ করে চলে যায় লেজ নাড়িয়ে। অরুণাভ একাই বসে থাক।

মিনিটক্ষণ পর কেউ আসে ছাদে। পা টিপে টিপে অরুণাভের পেছনে এসে দাঁড়ায়। বাঁকা হেসে পিঠে হাত রেখে ‘ভাউ’ বলে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। অরুণাভ ভয় পেলো না। আলগোছে ঘার ফিরিয়ে শান্ত গলায় বলল, “মেয়ে মানুষের বুদ্ধি যে হাঁটুতে থাকে তাঁর জলজ্যান্ত প্রমাণ তুই।”

“কেন? আমি কি করলাম?”

আনিকার মাথায় ঠাস করে চড় মেরে অরুণাভ দাঁত কটমট করে বলে, “রেলিংয়ের উপর বসে আমি। পেছন থেকে ভাউ দিলি। যদি আমি তোর আগমন টের না পেতাম? সোজা নিচে পড়তাম! গাঁধার বাচ্চা।”

আনিকা মুচকি হাসলো, “পড়লে পড়তি। আমার কি হতো? তোর জন্য নিশ্চয়ই হাউমাউ কান্না জুড়ে দিতাম না।”

অরুণাভ আবারও মাথায় চাটা মেরে বলল, “আমার জন্য তুই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদবি। আমি তোকে সারাটা জীবন কাঁদাব।”

আনিকা ফোঁস করে উঠলেও মুচকি হেসে প্রত্যুত্তরে বলবো, “আমি তবে হাসিমুখে কাঁদবো।”

“গাধার বাচ্চা, হাসিমুখে কাউকে কাঁদতে দেখেছিস?”

“খবরদার গাঁধার বাচ্চা বলবি না।”

“তো কি বলবো? কুটনি বুড়ি?”

“তবে তুই ফোর টোয়েন্টি!”

অরুণাভ মুচকি হাসলো। আনিকা মুখ মুচড়ায়। বাহু ধরে টেনে বললো, “নামছিস না কেনো?”

“এখানেই বসি। ভালো লাগছে।”

অরুণাভ পাশে বসতে ইশারা করলো। আনিকা নাকচ করে, “পাগল তুই? আমার ভয় লাগে। চেয়ারে বসি চল।”

“ভয় কিসের ভাই? আমি আছি তো নাকি?” 

অরুণাভ অভয় দেয়। আনিকা বলে, “ভয় তো তোকেই। কখন ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিস তাঁর গ্যারান্টি আছে?”

“না নেই। উঠলে উঠ নয়তো ফুট।”

আনিকা চলে যেতে নেয়। অরুণাভ পেছন থেকে গায়ের চাদর টেনে ধরে বললো, “রাগিস ক্যান ভাই? উঠে বস না? আমি ধরে রাখবো শক্ত করে।”

আনিকা চোখ ভরা অবিশ্বাস নিয়ে উঠে বসে। পা নিচে ঝুলছে। অন্ধকারে গভীরতা ঠাহর করা মুশকিল হলেও আনিকার গা ছমছম করে ওঠে। যদি নিচে পড়ে যায়? না মরলেও হাত পা ভাঙবে সুনিশ্চিত। সে অরুণাভের বাহুতে শক্তপোক্ত কিল বসিয়ে বলল, “বললি ধরে রাখবি শক্ত করে! ধরছিস না কেন?”

অরুণাভ কফির মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে গলা ভিজিয়ে নেয়। শান্ত সুরে বলে, “লজ্জা পাবি না তো আবার?”

আনিকার চোখের আকার বড় হয়।‌ অরুণাভ বাম হাত মেলে দিয়ে সম্মোহনী কণ্ঠে বলে, “আয়?”

আনিকা মুচকি হেসে কাছ ঘেঁষে বসলো। একটুও লজ্জা পেলো না। অরুণাভ কাঁধে হাত রাখলে আনিকা স্বীয় হাত বাড়িয়ে তাঁর পিঠে রেখে কোমড়ের কাছটার হুডি খামচে ধরে বলল,

“কি খাচ্ছিস?”

“কফি, উইদাউট সুগার। খাবি?”

“উঁহু, চিনি ছাড়া কিভাবে খাস?”

“এভাবেই!” বলে আবারও কাপে চুমুক দেয় অরুণাভ। আনিকা মুখ বিকৃত হয়ে বলল, “তিতা লাগে না? নাকি তোর মুখটাই তিতা!”

“কি জানি। আমার কাছে তো তিতা লাগে না। মনে হয় সয়ে গেছে।”

আনিকা ঠোঁট চোখা করে ‘ওহ্ আচ্ছা’ বলে। শীতকালীন মুখ নিসৃত উষ্ণ সফেদ ধোঁয়া বাতাসে বিলীন হয়। অরুণাভ আনিকার দিকে নিষ্পলক চেয়ে ছিলো। আকস্মিক তাঁর হাত ফস্কে কফির মগ ইন্তেকাল ফরমায়। হয়তোবা ইট পাটকেলের উপর পড়ে চুর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। শব্দ তো সেরকমই আসলো। অরুণাভ সে শব্দে ধ্যান দেয় নি। সে বিস্ফোরিত চোখে আনিকার দিকে তাকিয়ে আছে। ওষ্ঠ ও অধরের মাঝে ঈষৎ ফাঁক বলে দিচ্ছে সে অন্য জগতের মোহ মায়ায় ফেসে গেছে। আনিকা চোয়াল ধরে তাঁর মুখ ঘুরিয়ে দিলো। বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে খিলখিল সুরে হেসে বলল, 

“ভোর, তুই সিগারেট খাস?”

অরুণাভ তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারলো না। ঘোর থেকে বেরুতে সময় লাগে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। আশ্চর্য গলা শুকিয়ে গেল কেন? শুকনো ঢোঁক গিলতেই কৎ শব্দ শোনা যায়। নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, “প্রয়োজন পড়ে নি খাওয়ার!”

আনিকা হাসতে হাসতেই বলল, “খেলে বল, চাচ্চুকে বলবো না। আর এমনিতেও সিগারেটে আমার কোনো ইস্যু নেই। বরং আই লাইক দ্যাট। আমাকেও একদিন টেস্ট করাস! আমার খুব শখ সিগারেট টেস্ট করার! কি এমন নেশা আছে যে ছেলেদের খেতেই হবে।”

“পাগল তুই!” অরুণাভ ভর্ৎসনা করে।

আনিকা গায়ে মাখলো না। উৎসাহের সাথে বলল, “তুই কখনো ড্রিঙ্কস করেছিস?”

অরুণাভ ঘোর সন্দেহভাজন গলায় বলে, “তোর হাবভাব ভালো না।”

“আরে ভয় নেই। নির্ভয়ে বল, চাচ্চুকে বলবো না।”

“উঁহু, আ’ম গুড বয়।”

আনিকা আবারও শরীর দুলিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়। অরুণাভ চাঁপা স্বরে ধমকায়। আনিকা গায়ে মাখে না। হাসতে হাসতে বলে, “ঠিক বলেছিস। তুই তো ভোর দা টাইনি বয়!”

অরুণাভ খুব একটা গায়ে মাখলো না। আনিকা হাসি থামিয়ে দিলো ধীরে ধীরে। ফিসফিসিয়ে বললো, “আমরা দুজন একদিন চুপিচুপি ড্রিঙ্কস করবো। শুনেছি ড্রিঙ্কস করলে হুঁশ থাকে না। মানুষ শুধু হাসে আর আকাশে ভাসে। ব্যবস্থা করতে পারবি না? তোর ওই বন্ধু টুটুলকে দাওয়াত দিবি না খবরদার। শুধু তুই আর আমি, হুঁ?”

“আচ্ছা।”

“সো সুইট ওফ ইয়্যু, ভোর। বিয়ের পরেও এমনই থাকবি কিন্তু?”

“থামবি তুই?”

“ভোর, তুই লজ্জা পাচ্ছিস?”

“একটু একটু।”

অরুণাভ ঘার ডলে জড়তার সাথে জবাব দিলো। আনিকা আবারও হাসলো শব্দ করে। হাসির প্রকোপ কমতেই কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে নিলো। কিছুপল নীরব থেকে বলল,

“আম্মুকে কিভাবে ম্যানেজ করবি? 

অরুণাভের কপালে সুদৃঢ় ভাঁজ খেলে যায়, “ওনাকে ম্যানেজ করবো কেন?”

“আম্মু তোকে পছন্দ করে না, এটা কি তুই বুঝি না?”

“কচি খোকা না আমি!”

“তাহলে বল কিভাবে সব ম্যানেজ করবি?”

“তোকে ম্যানেজ করে নিয়েছি দ্যাটস এনাফ। চাচিমণি বাড়াবাড়ি করলে সোজা কাজি অফিস। আমি আমার ফ্রেন্ডসদের বলে রেখেছি। সব বন্দোবস্ত করাই আছে শুধু কবুল বলে সাইন করা বাকি!”

আনিকা কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল, “তুই ভাবলি কি করে আমি নাচতে নাচতে তোর সঙ্গ দেবো!”

“বলতে ভুলে গিয়েছি আমি ক্লোরোফরমের শিশি কিনেছি একটা।”

অরুণাভ খুবই শীতল গলায় প্রত্যুত্তর করলো। আনিকা মুচকি হাসছিলো। হঠাৎ হাততালির আওয়াজ ভেসে আসে। আনিকা উত্তেজনার ঠেলায় নিজ অবস্থান ভুলে বসে। পড়ে যেতে নেয় রেলিং থেকে। তবে পড়ে না। সে ভাগ্য প্রসন্ন অরুণাভ সামলে নেয়। 

রুবি মেয়ের বাহু ধরে রেলিং থেকে নামায়। অরুণাভকে নামাতে হয় না। সে একাই নেমে আসে। কপালে আঁছড়ে পড়া চুল পেছনে ঠেলে হুডির টুপি মাথায় চাপিয়ে নেয়। অস্বস্তি আর লজ্জায় ভেতরটা বুঁদ হলেও বাইরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। 

রুবির সহ্য হয় না তার স্বাভাবিক ভঙ্গিমা। ঠাস করে দুটো চড় বসিয়ে দিতে পারলে শান্তি পেতো। অসভ্য বেয়াদব নির্লজ্জ ছেলে! সে দাঁত কটমট করে বলে, “লজ্জা করে না? অরুর মতো আনিকাও বোন হয় তোমার। আর তাকে নিয়ে এই মাঝরাতে ছাদে… একা..”

রাগে গা রি রি করে রুবির। কথারা দলা পাকিয়ে আসে। কি লজ্জাজনক ঘটনা! মাঝ রাতে দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে ছাদে বসে… ভাবতে পারে না সে। আনিকা প্রতিবাদী সুরে বলে,

“আম্মু প্লিজ সিনক্রিয়েট কোরো না। আমার ঘুম আসছিলো না। তাই ওকে ডেকেছিলাম। এমনিই কথা বলছিলাম দুজন।”

রুবি মেয়ের দিকে শাণিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “বেকুব ভাবো আমাকে?”

“তোমার মতো ধুরন্ধর দুটো নেই, বেকুব কেন ভাববো আম্মু?”

“মজা হচ্ছে?” 

“আম্মু, তুমি চলো আমার সাথে। আমি সব খুলে বলছি। আরে চলো না”

আনিকা মাকে একপ্রকার টেনেই নিয়ে যায়। আড়চোখে অরুণাভকে চোখ রাঙাতে ভোলে নি। অরুণাভ ঘার ডলে। প্রথমবার প্রেম করতে এসেই এভাবে হাতেনাতে ধরা খেলো সে! তার প্রেমকাহিনী তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা উচিত! মুচকি হেসে মাথা দোলালো সে। চাচিমণি যতই হম্বিতম্বি দেখাক না কেন আনি তো তাঁর সাইডে দাঁড়িয়ে। আর কোনো চিন্তা নেই। আনিকা সরকার তো অরুণাভেরই হবে। 

—————

“আনি, আমার তরফ থেকে এটাই লাস্ট ওয়ার্নিং। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি শুধু আমার মেয়ের সুন্দর আর সুনিশ্চিত একটা ভবিষ্যত চাই।”

“সেই ভবিষ্যতটা ভোরের সাথে হলে সমস্যা কি বলো আমায়? প্লিজ ওসব লেইম কথাবার্তা বলবে না। ওসব শুনে শুনে কান পচে গেছে আমার!”

রুবি ক্লান্ত চোখে চায়। সেও বোঝাতে বোঝাতে অতিষ্ট হয়ে গেছে। এই মেয়েকে কিভাবে বোঝাবে ভোর সরকার ওর জন্য ঠিক না। সে হতাশ হয়ে বলল,

“আমার কথা মন দিয়ে শোন আনি। আমার মরহুম শ্বশুর মশাই দু'টো বিয়ে করেছে। অরুণ ভাইয়াও দুটো বিয়ে করেছে। আর…”

“আর তুমি ভাবছো ভোর সরকারও দুটো বিয়ে করবে।”

আনিকা ব্যঙ্গ করে বলে। মুখে কৌতুকের আভাস। রুবির রাগ হয়।

“হ্যাঁ আমি ভাবছি। আর আমি শতভাগ নিশ্চিত ভোর ওর বাপ দাদার ভাগ্যকেই সালাম জানাবে।”

আনিকা চরম মাত্রায় বিরক্ত বোধের সাথে বলল, “আম্মু তুমি বড্ডো বেশি বেশি করছো। ছোটবেলার ইস্যু নিয়ে ভোরকে তুমি জাজ করে বেড়াও। কথায় কথায় অপমান করো।”

“আমি অপমান করি না। আমি মুখের উপর সত্যিটা বলি যা হজম করতে না পারলে অপমানিত বোধ জন্মাবে।”

“তোমার সমস্যা টা কি?”

“আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু চাই না তুমি ভোরের সাথে নিজেকে জড়িয়ে কলঙ্ক ডেকে আনো। আমি তোমার মা। দিন দুনিয়া তোমার থেকে বেশি দেখেছি।”

আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রুবি মেয়েকে বোঝানোর চেষ্টা করে। আনিকা বিরক্ত হলেও চুপচাপ শুনে তাঁর কথা। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp