আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে - পর্ব ৬৯ - সালমা চৌধুরী - ধারাবাহিক গল্প


          মেঘের অসুস্থতার কথা শুনামাত্র তানভির আঁতকে উঠে। তার অক্লিষ্ট মন দৌর্মনস্যে ছেয়ে গেছে। দ্রুত রওনা দিল। ততক্ষণে বন্যারা মেঘকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেছে। তানভিরকেও জানিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার মেঘকে চেক করছেন, বন্যা মেঘের পাশে বসে আছে। তারমধ্যে তানভির ছুটে এসে রুমে ঢুকে ডাক্তারকে দেখেই থমকালো। দরজার সামনে মিনহাজরা থাকায় রুমটা চিনতে অসুবিধা হয় নি। ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই তানভির মেঘের কাছে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শীতল কন্ঠে আর্তনাদ করে বোনকে ডাকতে শুরু করল। বন্যা চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে আছে। অকস্মাৎ তানভিরের ফোনে কল আসছে। তানভির পকেট থেকে ফোন বের করে আঁতকে উঠে বলল,
"সর্বনাশ!"

বন্যা চোখ সরু করে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভির নিজের চোখমুখ মুছে গলা খাঁকারি দিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশ থেকে আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
"আমার বউ কোথায়? কতগুলো কল দিচ্ছি, কল রিসিভ করছে না কেনো?"

তানভির কি বলবে বুঝতে পারছে না। চোখের সামনে বোনের নিথর দেহ পড়ে আছে এ অবস্থায় ফোনের অপর পাশের মানুষটাকে মিথ্যা বলার সাধ্যও তার নেই। আগের বার অসুস্থতার কথা লুকাতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেতে হয়েছে। এবার সে সত্যি নিরুপায়। তানভির অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে আস্তে করে জবাব দিল,
"বনু আমার সামনেই আছে।"

আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
"ফোনটা ও কে দে। "

পরপর ঢোক গিলে তানভির শীতল কন্ঠে বলল,
" বনু কথা বলার অবস্থাতে নেই। "

আবির আর্তনাদ করে উঠল,
"কেনো? কি হয়েছে ওর?"

"সেন্স হারিয়ে ফেলছিল। এখনও...."

এটুকু বলার আগেই আবিরের হুঙ্কার শুরু হলো। মুহূর্তেই মাত্রাতিরিক্ত রেগে গেছে, আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তানভির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নাকে মুখে হাত চেপে আবিরের ঝারি খাচ্ছে। বন্যা নির্বাক চোখে তানভিরের অভিমুখে তাকিয়ে আছে। ফোনের অপর পাশের মানুষটা আবির ভাইয়া এটা বুঝতে বন্যার খুব বেশি সময় লাগলো না । মেঘের অসুস্থতার কথা শুনে টানা ১৭ দিন মেঘের সাথে কোনো কথা বলেনি। অনেক চেষ্টার পর সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এখন আবারও অসুস্থতার কথা শুনলে, আবির ঠিক কি করবে এটা ভেবেই বন্যা ভয় পাচ্ছে। আবির যদি আবারও কথা বন্ধ করে দেয় তখন মেঘের ই বা কি হবে! তানভির আর একটা শব্দও বলে নি। আবির নিজের মতো বেশকিছুক্ষণ চেঁচিয়ে কল কেটে দিয়েছে। এ অবস্থায় আবিরের করণীয় কিছুই নেই। তানভির চোখ মুখ মুছে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,

"বনুর কি হয়েছিলো? "

বন্যা শান্ত স্বরে সব বলল। কিছুক্ষণ পর মেঘের জ্ঞান ফিরেছে। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে নিল। তবে তানভিরকে দেখেই আতঙ্কিত হলো। তানভির আবিরকে বললে আবির আর কথা বলবে না এই ভয়ে মেঘও সিঁটিয়ে গেছে। তানভির কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধালো,
"এখন শরীর কেমন? ঠিক আছিস?"

মেঘ আস্তে করে বলল,
"হ্যাঁ"

কিছুক্ষণের মধ্যে মিনহাজ রিপোর্ট নিয়ে আসছে। তানভির রিপোর্ট টা হাতে নিয়ে ভালোভাবে পড়তে লাগলো। প্রেশার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। সিস্টোলিক রক্তচাপ ১২০ মিলিমিটার মার্কারি থাকার জায়গায় ১০০ তে নেমে গেছে অন্যদিকে ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৮০ মিলিমিটার মার্কারির পরিবর্তে ৬০ এ চলে আসছে। শরীরে হিমোগ্লোবিনও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কমে গেছে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম, শরীরের প্রতি অযত্ন তার সাথে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তো লেগেই আছে। সবকিছুর চাপেই সেন্স হারিয়ে ফেলেছিল। তানভির মেঘকে এক পলক দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

" তোকে আমার আর কিছুই বলার নেই।"

মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,
"বাসায় কাউকে কিছু বলো না, প্লিজ।"

তানভির রাগী স্বরে বলল,
" আমার তো ইচ্ছে করছে...."

এটুকু বলেই থেমে গেল। সামান্য কথাতেই মেঘের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। তানভির মেঘের চোখ মুখে তপ্ত স্বরে বলল,
"ঠিক আছে। বাসায় বলবো না। কিন্তু তোকেও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে হবে। করবি তো?"

"করবো।"

মেঘের শরীর কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর মেঘকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছে। তানভির আর বন্যা দুজন মেঘের দু'পাশে হাঁটছে। মিনহাজ, তামিম আর সাদিয়া তাদের পেছনে। ক্লিনিকের সামনে এসে তানভির মিনহাজ আর তামিমকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
"বাইকটা বাসায় দিয়ে আসতে পারবে?"

"জ্বি ভাইয়া।"

তানভির পকেট থেকে চাবি বের করে মিনহাজকে দিয়ে দিল৷ বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
"আপনারা কিভাবে যাবেন?"

"আমরা রিক্সায় চলে যাব, সমস্যা নেই। "

আচমকা আয়েশার সঙ্গে দেখা। আয়েশা এদিকেই যাচ্ছিল। তানভিরের কন্ঠ শুনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
"কি হয়েছে তানভির? "

মিনহাজরা বাইকের কাছে যেতে গিয়েও থমকালো৷ মেঘ কপাল গুটিয়ে মেয়েটাকে দেখছে। প্রথমদিন কেবল চোখ আর হাত-পা দেখা গেলেও আজ তার মুখও খোলা। অনেক বছর পর দেখায় আয়েশাকে চিনতে মেঘের বেশ কিছুটা সময় লাগলো। বন্যা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে, মুখে গাম্ভীর্যের ভাব। আয়েশা নিজের মতো কত কি বলছে, মেঘের খোঁজ নিচ্ছে। এদিকে মেঘ তেলে বেগুনে জ্বলছে। গায়ের জোরের অভাবে কিছু করতেও পারছে না। আয়েশা ধীর কন্ঠে বলল,
"কার কি হয়েছে?"

তানভির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"বনু অসুস্থ।"

এই কথা শুনে মেয়েটা একদম উতলা হয়ে গেছে। মেঘের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

"হায় হায়, আমার ননদের আবার কি হয়েছে?"

মেঘ রাগে ফোঁস করে উঠল,
"আমাকে একদম ননদ বলবেন না। এর পরিণাম ভালো হবে না বলে দিলাম। "

মেয়েটা আর একটু এগুতেই তানভির হুঙ্কার দিল, "আমার বোনকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবে না। "

বন্যা মুখ গোমড়া করে নিরেট দৃষ্টিতে দুই ভাই বোনের কর্মকাণ্ড দেখছে। আয়েশা এবার মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,
" আমি মেঘকে ধরলে কি হবে? জান.......!"

শব্দটা বলতে দেরি হয়েছে আয়েশার গালে তানভিরের শক্তপোক্ত হাতের থা*প্পড় পড়তে দেরি হয় নি। থা*প্পড়ের শব্দে উপস্থিত সবাই খানিকটা কেঁপে উঠেছে। তানভির রাগান্বিত কন্ঠে চিৎকার করল,

" আজকের পর আর কোনোদিন আমার সামনে নাটক করতে আসবা না। শুধুমাত্র মেয়ে বলে আর আমি মেয়েদের সম্মান করি বলে আজ পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি করি নি, নয়তো বহু আগেই তানভিরের ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়ে দিতাম। আমায় খারাপ হতে বাধ্য করো না।"

আয়েশার গালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ হয়ে গেছে। গালে হাত ঘষতে ঘষতে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। তামিম মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,

" মেয়েটার আজ খবর আছে। তানভির ভাইয়ার হাতের থা*প্পড় যে একবার খেয়েছে একমাত্র সেই বুঝে। তুই কি বলিস?"

মিনহাজ কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে তপ্ত স্বরে বলল,
"অতীত খুব ভয়ানক জিনিস, মনে করাতে যাস না। তার থেকে বরং চল।"

তানভির রিক্সার জন্য কিছুটা সামনে চলে গেছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
" খুব তো গাল ফুলাইয়া রাখছিলি, এখন দেখছিস আমার ভাইকে? ভাইয়ার জীবনে জলজ্যান্ত এক ডানাকাটা পরী থাকতে ভাইয়া ডানাকাটা পেত্নীর প্রেমে পড়বে? জীবনেও না।"

বন্যা মুচকি হেসে বলল,
"এখন এত কথা না বলে নিজের যত্ন নিয়েন৷ আবির ভাইয়া কিন্তু ওনাকে খুব ঝাড়ছে।"

মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,
" আমার অসুস্থতার কথা আবির ভাই শুনে ফেলছেন? আমি আরও না করছি যেন বাসার কাউকে না বলে। "

"আবির ভাইয়া যখন কল দিয়েছে তখন তোর সেন্স ছিল না। "

"আমি শেষ। আর একটা সপ্তাহ পরে সেন্স হারালে কি এমন ক্ষতি হতো। উফফফ! ভালো লাগে না।"

এরমধ্যে তানভির রিক্সা নিয়ে হাজির। বন্যার থেকে বিদায় নিয়ে তানভিরের সাথে বাসার দিকে চলে গেছে। মালিহা খানরা তখনও ড্রয়িংরুমে বসে পিঠা বানাতে ব্যস্ত। মেঘকে দেখে হাসিমুখে বললেন,

"মেঘ, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আয়। পিঠা বানাতে হবে। "

মেঘ কিছু বলার আগেই তানভির পেছন থেকে বলল,
"বনুকে পিঠা বানাতে বলো না বড় আম্মু। ওর এখন ঘুমানো প্রয়োজন। "

আকলিমা খান প্রশ্ন করলেন,
"তোমার হাতে কি তানভির? "

তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
" তেমন কিছু না। ফল আর কিছু খাবার।"

"ফল তো বাসায় আছে।"

"এগুলো শুধু বনুর। এখানে কেউ যেন হাত না দেয়। আর হ্যাঁ এগুলো যেন দুদিনের মধ্যে শেষ হয়।"

শেষ কথাটা মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেছে। মেঘ চোখ সরিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই শুয়ে পরেছে। শরীর এখনও বেশ দূর্বল। সারাক্ষণই মাথা ঘুরাচ্ছে। ফোন হাতে নিয়ে আবিরকে কল দিতে গিয়েও থেমে গেছে। ২-৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে প্রায় ৪ টার দিকে সজাগ হয়েছে। ঘুম ভাঙতেই সবার আগে ফোন চেক করল কিন্তু আবিরের মেসেজ,কল কিছুই আসে নি। মেঘ বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে ভয়ে ভয়ে কল দিল। ১০ থেকে ১২ সেকেন্ড রিং হওয়ার পর আবির কল রিসিভ করল। মেঘ অত্যন্ত মৃদু স্বরে বলল,

"আসসালামু আলাইকুম। "
"ওয়ালাইকুম আসসালাম।"
"কি করছেন?"
"কিছু না।"
"খেয়েছেন?"
"না।"
"কেনো?"
"খেতে ইচ্ছে হয় নি।"
"আপনি কি রাগ করেছেন?"
"জানি না।"
" বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে সেন্স হারায় নি। "
"জানি।"
"তাহলে এমন করছেন কেনো?"
"এমনি।"

মেঘ এবার শীতল কন্ঠে শুধালো,
"আবির ভাই, আপনি কবে আসবেন?"
"জানি না।"

মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
"ঠিক আছে, রাখি।"

আবিরের নিরুদ্বেগ জবাব,
"ইচ্ছে।"

বন্যা বিকেলে টিউশন শেষ করেই তানভিরকে কল দিল। অনেকদিন যাবৎ তানভিরের সাথে ঠিকমতো কথায় হয় না বন্যার। দেখা হলেও রেগে থাকে সবসময়। আজ আয়েশার প্রতি তানভিরের এমন আচরণ দেখে বন্যার মনে কিছুটা আশার আলো ফুটেছে। বন্যা এতদিন পর নিজে থেকে কল দিয়েছে এই খুশিতে তানভির শুয়া থেকে লাফিয়ে উঠেছে। তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করল। বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করল,
"এইযে ভিলেন, আপনি কি ফ্রী আছেন?"

তানভির নিঃশব্দে হেসে বলল,
"৫০০% ফ্রী আছি। বলো.."

বন্যা মুচকি হেসে বলল,
" আপনার বোনকে ফোনে পাচ্ছি না। তার খোঁজ নিতে কল দিয়েছি।"

তানভিরের হাসিমুখ পুনরায় গম্ভীর হয়ে গেছে। শ্বাস ছেড়ে বলল,
" এজন্যই কল দিয়েছো?"

বন্যা ঠোঁটে হাসি রেখে উল্টো প্রশ্ন করল,
" কল দেয়ার আর কোনো কারণ আছে নাকি?"

তানভির গুরুতর কন্ঠে জবাব দিল,
"না, আচ্ছা বাদ দাও। ওয়েট বনুকে ডেকে দিচ্ছি।"

"আপনি কি করছিলেন?"

তানভির মৃদু হেসে ঠাট্টার স্বরে বলল,
" কল্পনা করছিলাম।"
"কি?"
" বলা যাবে না। নাও বনুর সাথে কথা বলো।"

মেঘকে ফোন দিয়ে তানভির চলে গেছে।

 ২-৩ দিন যাবৎ আবিরের সঙ্গে মেঘের তেমন কথায় হয় না। মেসেজ দিলে আবির হ্যাঁ,হু, আচ্ছা, জানি না বলেই রিপ্লাই করে। কল দিলে এমনভাবে কথা বলে যেন তার কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। মন খারাপ করে মেঘও তেমন কল দেয় না। সারাদিন খাওয়া আর ঘুম ছাড়া মেঘের আর কোনো কাজ ই নেই। মাঝে মাঝে বন্যার সাথে একটুআধটু দুষ্টামি করে। সন্ধ্যার দিকে তানভির বাসা থেকে বের হলেই মেঘ রান্না করতে চলে যায়। টুকটাক রেপিসি ট্রাই করে আর মীম, আদিকে নিয়ে খায়। 

আজ সকাল থেকে আবিরকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে কিন্তু আবির নেটে নেই, ফোনও বন্ধ। এদিকে তানভিরও বাসায় নেই। মেঘ একে একে সবার নাম্বার থেকেই চেষ্টা করেছে কিন্তু আবিরের নাম্বার বার বার বন্ধ বলছে। 

ঘড়িতে তখন বিকেল ৪ টা বেজে ২৬ মিনিট। মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন, নিঃশ্বাস এলোমেলো। বুকের উপর রাখা ফোনটাকে জড়িয়ে ধরে স্বপ্নদেশে পারি দিয়েছে। মলিন চেহারা, চোখের কার্নিশে স্পষ্ট পানির দাগ দেখা যাচ্ছে। আবির মায়াবী দৃষ্টিতে মেঘের ঘুমন্ত আদলে চেয়ে আছে, বুকের ভেতর অনবরত ধ্রিম ধ্রিম কম্পন হচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস পর আবিরের বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদয়টা স্বস্তি পেয়েছে। এতদিন পর নিজের প্রেয়সীকে এত কাছে পেয়েছে। আবির এক দৃষ্টিতে মেঘকে পরখ করছে, আপাদমস্তক দেখে ঘুমন্ত মেঘের পাশে বসে অতি সন্তর্পণে বুকের উপর থেকে আলতোভাবে ফোনটা তুলে নিল। হোম স্ক্রিনে নিজের ছবিটা দেখে মলিন হেসে ফোনটা এক পাশে রেখে দিয়েছে। চোখের কার্নিশে জমে থাকা অশ্রু মোলায়েম হাতে মুছে পরপর মেঘের কপালে, গলায় হাত রেখে জ্বর পরীক্ষা করছে। কিছুটা সময় নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে জাগ্রত প্রেমানুভূতিতে আর চাপিয়ে রাখতে পারছে না। আনমনে মেঘের অদৃষ্টে ঠোঁট ছোঁয়াল। গাল ভর্তি আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শে মেঘের ঘুমন্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসায় আবিরের গা থেকে এক অন্যরকম সুঘ্রাণ মেঘের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে। মেঘ ঘুমের মধ্যেই নড়েচড়ে উঠল। আবির সঙ্গে সঙ্গে সরে গেছে, বসা থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সুস্থির কন্ঠে ডাকল,
"মেঘ..."

মেঘের উত্তর না পেয়ে আবির ঠোঁট কামড়ে হেসে আবারও ডাকল,
" স্প্যারো...."

ঘুমন্ত মেঘ আদো আদো কন্ঠে বলল,
"হুমমম!"

আবিরের আঁখি যুগল প্রশস্ত হলো। ঠোঁটে হাসি রেখে এবার শক্ত কন্ঠে বলল,
" এইযে ম্যাডাম....!"

মেঘ ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই তার স্বপ্নের রাজকুমারকে চেখের সামনে আবিষ্কার করল।আবিরকে দেখেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। দু-চোখ যেন এখনি কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে। মেঘ মুগ্ধ আঁখিতে প্রিয়মানুষটার মুখের পানে তাকিয়ে আছে। বরাবরের মতো হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। সত্যি কি কল্পনা বুঝার আগেই শুয়া থেকে এক লাফে উঠে বসলো।অকস্মাৎ এমন কান্ডে আবিরের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, পরপর বুকটান করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঘুমের ঘোরে মেঘ অবাক চোখে আবিরকে দেখছে। আচমকা বসা থেকে এক লাফে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। ঠিক জড়িয়ে ধরা বলেনা এটাকে। মেঘের দু পা মাটি থেকে প্রায় এক হাত উপরে। আকস্মিক ঘটনায় আবির এক পা পিছিয়ে সহসা সর্বশক্তি দিয়ে মেঘকে আঁকড়ে ধরল। আবিরের একহাত মেঘের পিঠে আরেক হাত কোমড়ের উপরে, শক্ত করে ধরে আছে। মেঘ অর্ধ ঘুমে থাকলেও আবির পুরোপুরি সজ্ঞানে আছে। আবিরের শিরা-উপশিরায় তুফান চলছে, উষ্ণ শ্বাস মেঘের উন্মুক্ত ঘাড়ে পড়ছে। দু'জনের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তীব্র থেকে তীব্র হতে শুরু করেছে, গাত্র জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ জাগছে। মেঘের দুচোখ ছলছল করছে। ঘন ঘন শ্বাস ছেড়ে অকস্মাৎ কাঁদতে শুরু করেছে। আবির তখনও শক্ত হস্তে মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মেঘ কোন ঘোরে আঁটকে আছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে নিজের মনিকোঠায় জমে থাকা অভিযোগগুলো ব্যস্ত কন্ঠে জাহির করছে। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে উঠল,
" আপনি এত নিষ্ঠুর কেনো?"

মেঘ কি ভেবে হঠাৎ আবিরকে ছেড়ে দিয়েছে। আবিরও আস্তে আস্তে ছাড়লো। মেঘের দুপা আবিরের বৃহৎ পদযুগলের উপর পরলো। আবির মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেই সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে মেঘকে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড় করালো। তাৎক্ষণিক ঘটনায় মেঘের মস্তিষ্ক পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে গেছে। আবির ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মেঘের চোখের পানি মুছে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,
" সরি, আর কখনো নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করব না।"

কাঙ্খিত ব্যক্তি কোমল কন্ঠের জবার শুনে মেঘ নিশ্চুপ হয়ে গেছে। মেঘের পা তখনও আবিরের পায়ের উপর। আবির এগুতেই মেঘ পেছাতে চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক ইঞ্চির গ্যাপ মুহুর্তেই ফুরিয়ে গেল। আবির মাথা নিচু করে মেঘের কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে পাতলা অধর নেড়ে বিড়বিড় করে বলল,
" খুব তো মিস ইউ, মিস ইউ করছিলেন । তা ঠিক কতটুকু মিস করেছেন দেখি?"

মেঘের ঠোঁট কাঁপছে ফিনফিন করে, মুখ দিয়ে কোনো কথায় বের হচ্ছে না। ক্ষণিকের জন্য ভেতরটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাস মেঘের ঘাড়ে পড়ছে। আবির মুখ তুলে মেঘের নিরুদ্বেগ চেহারার পানে তাকালো। আবিরের এক হাত তখনও মেঘের পিঠ আঁকড়ে ধরে আছে। অন্য হাতে দিয়ে মেঘের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে, মেঘের ডানহাতটা আবিরের বুকের বা পাশে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
" তোর শূন্যতায় আমার অনুভূতির দেয়াল ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। আমার ভগ্ন হৃদয়ের কম্পন কি তুই টের পাচ্ছিস? বুঝতে পারছিস কতটা মিস করেছি তোকে?"

আবিরের হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক তীব্র, আবিরের বক্ষঃস্থলে হাত রাখায় মেঘের সর্বাঙ্গে কম্পন শুরু হয়ে গেছে। চিরচেনা মানুষটার গায়ের গন্ধ, স্পর্শ, মায়াবী কন্ঠ, নেশাক্ত দৃষ্টি সবেতে মেঘ মাতাল প্রায়। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার অশ্রু রূপে গড়িয়ে পরলো। মেঘের হাত আর পিঠ ছেড়ে আবির এবার শান্ত হস্তে মেঘের দু’চোখ মুখে কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
"আজকের পর আমার কারণে তোর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়তে দিব না আমি, প্রমিস।"

কথাটা বলতে বলতে মেঘের কপালে দীর্ঘ এক চুমু দিল। ওমনি মেঘ পাথর বনে গেছে। আবিরের পায়ের উপর থেকে মেঘের পা সরে গেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মেঘের শ্বাসনালীতে তুফান শুরু হয়ে গেছে। দুচোখ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। প্রায় দুই বছরের জমে থাকা অনুভূতিগুলো এলোপাতাড়ি ছুটছে। মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস আবিরের বুকে লাগছে। প্রায় মিনিট খানেক পর আবির কিছুটা সরে দাঁড়ালো। মেঘ নিস্তব্ধ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আবির শেষবারের মতো মেঘের চোখ মুখ মুছতে মুছতে শক্ত কন্ঠে বলল,

" আজ এই মুহুর্ত থেকে তোর চোখে সুখের অশ্রু ব্যতীত আমি আর কিছুই দেখতে চাই না। "

মেঘকে ছেড়ে চলে যেতে নিয়ে আবার থমকালো। কোমল কন্ঠে বলল,
"তোর গিফট টেবিলে রাখা আছে।"

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে গুনগুন করতে করতে বেড়িয়ে গেছে,
"সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি
রূপকথার রাজকুমার হয়ে
আমায় তুমি ভালবাসতে যদি।"

মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের পানে তাকিয়ে আছে। মেঘ দেয়ালে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো স্বপ্ন, কল্পনা নাকি বাস্তব কিছুই বুঝতে পারছে না। কয়েক মুহুর্ত হতবাক থেকে আচমকা বিছানায় শুয়ে পরলো। শরীরের দূর্বলতার কারণে কিছু সময়ের মধ্যে আবারও ঘুমিয়ে পরেছে। 

ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দে মেঘের ঘুম ভাঙে। শুয়া থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে চোখ পরে টেবিলের দিকে। টেবিলের উপর একটা গিফ্ট বক্স রাখা। মেঘ হকচকিয়ে উঠে বক্সটার কাছে এগিয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ এক ঘন্টা আগের ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো। মেঘ আনমনে বলে উঠল,

"আবির ভাই কি সত্যি চলে আসছেন?"

এক দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে, মুখ ঠিকমতো না মুছেই ছুটলো। আশপাশ না তাকিয়ে অন্তহীন পায়ে ছুটে আচমকা সিঁড়ি এসে থামলো।আবির নিচ থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আবিরের এমন দৃষ্টি দেখে মেঘ হতভম্ব হয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে ধীর গতিতে নামতে শুরু করল।মীম আর আদি গিফট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। 
মেঘ কাছাকাছি আসতেই আবির সস্নেহে জিজ্ঞেস করল,
" কেমন আছিস?"

কিছুটা দূরেই হালিমা খান আর মালিহা খান দাঁড়ানো। মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আবিরের দুচোখে শাণিত প্রেমানুভূতি, যা লুকাতে অক্ষম সে। মেঘ মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?"

"আলহামদুলিল্লাহ। "

হালিমা খান বলে উঠলেন,
"সেই কখন আসছিস, এখনও কিছু খাস নি। আগে থেকে জানিয়েও আসিস নি।। কি খাবি বল"

আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই শান্ত স্বরে বলল,
" শুনলাম তোমার মেয়ে পাকোড়া বানাতে এক্সপার্ট। জিজ্ঞেস করো আমাকে বানিয়ে খাওয়াবে কি না!"

হালিমা খান হেসে বললেন,
"এ আবার কেমন কথা, তোকে খাওয়াবে না কেনো! এই মেঘ আয়।"

মালিহা খান তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
" রাতে কি খাবি?"

আবির সরল কন্ঠে বলল,
"তোমার যা ইচ্ছে তাই রান্না করো। "

মালিহা খান আবারও বললেন,
"তুই আসবি এটা আগে জানাস নি কেনো?তোর রুমটা পরিষ্কার করা হয় নি৷ সেদিন তানভির দেখলাম কোনোমতে পরিষ্কার করেছে।"

আবির মলিন হেসে বলল, 
"সমস্যা নেই। আমি সবকিছু পরিষ্কার করেছি।"

আবির সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। মেঘকে পাকোড়া নিয়ে আসতে দেখে ইচ্ছেকৃত গান শুরু করল,
"সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি..."

মেঘ মুখ ফুলিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবির অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
" আজ আসবেন এটা আগে জানালেন না কেনো?"

"জানালে কি সারপ্রাইজ থাকতো?"

মেঘ ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে বলল,
" সারপ্রাইজ দিতে কে বলছিল আপনাকে?"

আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
"দুদিন পর পর অসুখ বাঁধাতে কে বলছিল আপনাকে?"

এরমধ্যে আলী আহমদ খান বাসায় আসছেন৷ ওনাকে দেখেই মেঘ দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেছে। আবির এগিয়ে গিয়ে আব্বুকে সালাম করল। ঘন্টাখানেক পর তানভির আসছে। আবিরকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল,
"ভাই আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। "

আবির মুচকি হেসে জানাল,
" অফিসিয়ালি দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত আর একটু সহ্য করে নে।"

আজ অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। যদিও মোজাম্মেল খান বাসায় নেই। ইকবাল খান আজই বাসায় এসেছেন। আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
"তোমার না আরও তিনদিন পর আসার কথা ছিল?"

"জ্বি আব্বু। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেছে তাই চলে আসছি। "
"সব কাজ শেষ নাকি আবারও যেতে হবে?"
"শেষ।"

আবির প্রশ্ন করল,
"সিফাতের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?"

" আগামীকাল জয়েন করবে৷ "

আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
" আপনি কি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন?"

 কাকামনি আবিরের দিকে একপলক তাকিয়ে শান্তস্বরে বললেন,
"ভাইজান, আমারও মনে হচ্ছে এই কাজটা করা ঠিক হচ্ছে না৷ "

আলী আহমদ খান খাওয়া শেষ করে উঠে যেতে যেতে বললেন,
" মানুষকে ভালো হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়।"

আবির এবার ঠান্ডা কন্ঠে হুঙ্কার দিল,
" যদি তার কারণে কখনো কোম্পানির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তখন কেউ আমাকে বাঁধা দিতে আসবেন না। "

আলী আহমদ খান চলে গেছেন। ইকবাল খান দু একটা কথা বলে নিজেও ওঠে গেছেন। আবির আর তানভির নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে। মেঘ খেতে খেতে বার বার আবিরকে দেখছে। আগের তুলনায় আবির একটু মোটা হয়েছে। দেখতেও কিছুটা ফর্সা লাগছে। মেঘ মিটিমিটি হাসছে আর খাচ্ছে। হঠাৎ আবিরের নজর পড়তেই ভ্রু নাচালো। মেঘ থতমত খেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। খাওয়াদাওয়া শেষ করেই আবির ঘুমাতে চলে গেছে। 

আজ সিফাত নামক ছেলেটা জয়েন করবে। আবির, আলী আহমদ খান আর ইকবাল খান তিনজন ই অফিসে আছে। সিফাত এসে আলী আহমদ খান আর ইকবাল খানের সাথে কথা বলে আবিরের মুখোমুখি হলো। আবির কপাল কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে। সিফাত গুরুগম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

"আপনি ই তাহলে সাজ্জাদুল খান আবির?"

"জ্বি। কোনো সমস্যা? "

সিফাত হেসে বলল,
" না৷ আংকেলের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি তাই জিজ্ঞেস করলাম।"

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"অফিসে স্যার বলতে শিখুন।"

"সরি, স্যার।"

আবির ভ্রু কুঁচকে বলল,
" নিজের কাজে মনোযোগ দেন।"

আবির চলে গেছে। সিফাত নিরেট দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে মোজাম্মেল খান একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছেন। আবির নিজের কেবিনে গিয়ে কল রিসিভ করতেই মোজাম্মেল খান রাশভারি কন্ঠে শুধালেন,
"আটকাতে পেরেছো?"

"না।"

"আমি জানতাম। তোমার আব্বুকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি। ওনি যা বলবেন তাই করবেন। কিন্তু তাই বলে শত্রুর সাথে হাত মেলাবেন?"

আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে জবাব দিল,
"কিছু করার নেই চাচ্চু। এখন আমাদেরকেই সাবধানে থাকতে হবে। "

আবির বিকেল দিকে নিজের অফিসে আসছে। রাকিব, রাসেলের সাথে অনেকদিন পর দেখা। অফিসের কাজ শেষে সবাইকে ছুটি দিয়ে তিন বন্ধু গল্প করতে বসেছে। অনেকদিনের জমানো কথা, অফিসের বিভিন্ন কাজ, পার্সোনাল লাইফ সব বিষয়েই গল্প চলছে। রাসেল হঠাৎ প্রশ্ন করল,
"আবির, বিয়ে কবে করছিস?"

আবির মলিন হেসে জবাব দিল,
" করবো করবো।"

"সেটা কবে? আর তোর শ্বশুর আসবে কবে?"

"আমার শ্বশুর আসলেই ধামাকা হবে।"

"কোনো? "

"৬ মাস সময় যে ঘনিয়ে আসছে।"

রাকিব উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
"তুই কি ভেবেছিস? বাসায় আগে কথা বলবি? নাকি মেঘকে আগে জানাবি?"

" মেঘকে জানিয়ে তারপর বাসায় বলব। তবে সেটা একই দিনে। আমি ওকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিব না। ডিরেক্ট বিয়ের অফার দিব আর ঘুম থেকে উঠলেই বাড়িতে বিয়ের আমেজ থাকবে। "

এরমধ্যে মেঘের কল আসছে। রাসেল উঁকি দিয়ে নামটা দেখে একগাল হেসে বলল,
"ওনার নাম নিতেই কল চলে আসছে। ওনি অনেকদিন বাঁচবেন। "

আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,
"বাঁচতে তো হবেই। ওর কিছু হলে আমি যে বেঁচে থেকেও ম*রে যাব। "

আবির কল রিসিভ করে মৃদুস্বরে বলল,
"সারাদিনে এই মনে পড়ল?"

মেঘ গাল ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
"আপনিও তো কল দেন নি। ফুপ্পিরা বাসায় এসে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আপনার কি আসতে দেরি হবে?"

"না। এখনি আসতেছি।"

আবির তাদের থেকে বিদায় নিয়ে যেই উঠতে যাবে রাকিব আনমনে ডাকল,
"আবির.."

"বল"

"তোর আব্বু যদি সত্যি সত্যি মেনে না নেয় তখন কি করবি?"

আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাশভারি কন্ঠে জবাব দিল,
" ম*রে যাব।"

রাসেল বলল,
"ফাজলামি করিস না। সিরিয়াসলি বল"

আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"তোদের কি মনে হচ্ছে আমি ফাজলামি করতেছি? আব্বু চাচ্চু সহজে মেনে নিলে ভালো, যদি বলে মেঘকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যেতে তাহলে আরও ভালো। কিন্তু যদি বলে মেঘকে রেখে একা বেড়িয়ে যেতে তারপর কি হবে আমি জানি না। তবে এটায় সত্যি যে মেঘকে না পেলে, আমি ম*রে যাব।"

আবির বাসায় ফিরতেই আবিরের ফুপ্পি আবিরকে ডেকে নিয়ে গেছেন। মাহমুদা খান চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,
"কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস? বাসায় কবে বলবি?"

"৮-১০ দিনের মধ্যেই বলল।"

"তোর আব্বু কিন্তু তোর উপর ভীষণ রেগে আছেন। সেদিন অনেককিছু বলতেছিল, সাবধান।"

"তুমি কিসের জন্য এত ভয় পাচ্ছো? বাড়ি থেকে বের করে দিবে এই ভয়?"

"সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয় পাচ্ছি।"

আবির মলিন হেসে বলল,
" ওনি যতবার সম্পর্ক ছিন্ন করবেন আমি ততবার নতুন করে সম্পর্ক মজবুত করব। প্রয়োজনে সুপার গ্লু দিয়ে সম্পর্ক জোড়া লাগাবো। যাই হয়ে যাক না কেন, গ্লু নষ্ট হবে না।"

"সিরিয়াস বিষয় নিয়েও তুই মজা করছিস?"

আবির ফুপ্পির দিকে তাকিয়ে গুরুভার কন্ঠে ডাকল,
"ফুপ্পি"

"হ্যাঁ বল।"

"আমি যদি মা*রা যায় তুমি কি আমায় মিস করবা?"

মাহমুদা খান আবিরের কান চেপে ধরে রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,
"তোর সাহস কতটুকু হয়ছে যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে মরা*র কথা বলিস।"

আবির আর্তনাদ করে উঠল,
"সরি ফুপ্পি, সরি। আর বলবো না।"

★★★

আবির বাসায় ফিরেছে তিনদিন হলো। মোজাম্মেল খান এখনও বাসায় ফিরেন নি। আজ শুক্রবার হওয়ায় তানভির, আবির দু'জনেই বাসায়। গত ৫ মাসে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে বৃহস্পতিবারের রাত জাগার অভ্যাস টা একদম কেটে গেছে। আবির সকালের নাস্তা করে সেই যে রুমে গেছে, আর বের হওয়ার নাম নেই৷ বাড়িতে আসার পর থেকে মেঘের সাথে কথাও কমে এসেছে। চোখের ইশারায় টুকটাক দুষ্টামি করলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করে না। ১১ টার দিকে মেঘ আবিরের রুমের সামনে আসছে। আবির দুচোখ বন্ধ চুপচাপ শুয়ে আছে। মেঘ পা টিপে টিপে রুমে ঢুকে আবিরের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে। অকস্মাৎ আবির বলে উঠল,
" একটা অবোধ বালকের দিকে কুনজর দিতে আপনার লজ্জা লাগে না?"

মেঘ ভেঙচি কেটে জবাব দিল,
"কে অবোধ? আপনি?"

"তা নয়তো কে? কেনো আসছিলেন?"

মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
" আসার পর থেকে দেখছি যতক্ষণ বাসায় থাকেন ততক্ষণ আপনি রুম থেকে বের ই হোন না, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেন না। কি হয়েছে আপনার?"

আবির শুয়া থেকে উঠে বসে মুচকি হেসে বলল,
" ভাবছি ঘরে বসে থেকে কয়েকদিনেই আপনার মতো একটু সুন্দর হয়ে যাব।"

মেঘ স্ব শব্দে হেসে বলল,
" পারবেন না। "
"কেনো?"
"এমনি।"

আবির বসা থেকে উঠে রুম থেকে বের হতে হতে বলল,

"ওয়েট, আজ রূপচর্চা করে হলেও সুন্দর হয়েই ছাড়বো । "

মেঘ হাসতে হাসতে বলল,
"আপনাকে সুন্দর হতে হবে না। আপনি এমনেই সুন্দর আছেন।"

আবির ঠোঁট চেপে হেসে বেড়িয়ে গেছে। তানভিরের রুম থেকে তানভিরকেও টেনে নিয়ে গেছে। ফ্রিজ থেকে দুটা শসা বের করে ঠান্ডা শসায় কেটে চোখে দিয়ে বসেছে। সাথে একটা ন্যাচারাল প্যাক বানিয়েও মুখের লাগিয়েছে। সামনে প্লেটে আবির আরও কিছু শসা কেটে রেখেছে। তানভির চোখের শসা রেখেই হাত বাড়িয়ে একটা একটা করে সব খেয়ে ফেলছে।ওদের কান্ড দেখে মেঘ আর মীম হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। ভিডিও করে বন্যাকেও পাঠিয়েছে। এরমধ্যে আদি আসছে। ওদের চোখ মুখ দেখে আদিও উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
"ভাইয়া তোমরা কি দিয়েছো? আমিও দিব।"

মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,
"আয়, আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি।"

আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,
"আজ আমাদের যত্ন নেয়ার কেউ নেই বলে। "

মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
" আপনারা চাইলে আমি আপনাদের ফেসিয়াল করে দিতে পারি। "

হঠাৎ বাহিরে আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির আর তানভির উঠে যে যার মতো দৌড়। যেতে যেতে তানভির বলল,
" থাক বাবা, আরেকদিন। আজকের মতো পালায়।"
          তানভির নিজের রুমে পড়তেছে, যদিও পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল বিতৃষ্ণা কিন্তু কিছু করার নেই। আবিরের সাপোর্ট, মেঘের জেদ, বন্যাকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছে, আর এই সবকিছু পূরণ করতে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। আগামী সপ্তাহে কোচিং এ ভর্তি হবে তাই আগে থেকেই বই গুলো একটু দেখে নিচ্ছে। হঠাৎ আবির দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,
"আসবো?"
"আসো। তোমার আবার অনুমতি নিতে হয় নাকি!"

আবির দরজা চাপিয়ে বিছানায় বসে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,
" এই পড়াশোনা কতদিন চলবে? "

তানভির চোখ নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
" আমি সরকারি চাকরি করতে চাই।"

"চাকরি করতে তোকে বারণ করছি না। কিন্তু চাকরি পেতে গেলে যতটা শ্রম আর চেষ্টা করতে হবে, ততটা পরিশ্রম করার ধৈর্য কি তোর আছে?"

"আমি চেষ্টা করব।"

আবির চাপা স্বরে বলতে শুরু করল,
"দেখ তানভির, আমি আজ পর্যন্ত তোকে কোনোকিছুতে বারণ করি নি। তুই যখন যা চেয়েছিস নিজের সামর্থ্য না থাকলেও কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে দিয়েছি। রাজনীতি করতে চেয়েছিস আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোর খুশির জন্য রাজি হয়েছিলাম। ইদানীং তুই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস রাজনীতি করবি না, আমি তাতেও সম্মতি দিয়েছি। এখন তুই পড়াশোনা করতে চাচ্ছিস, আমার এতেও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কথা হলো তোর নিজের উপর কনফিডেন্স আনতে হবে। যতবার ভেঙে পরবি ততবার নিজেকে নিজের সাহস দিতে হবে। পারি না, মনে থাকে না, পারবো না এগুলো কমন কথা কিন্তু এগুলোর সাথে আরেকটা কথা আছে,' আমাকে পারতেই হবে' যদি এই কথাটা মাথায় রাখিস তবেই তুই সফল হতে পারবি। ধৈর্য আর পরিশ্রম একদিন সফলতা এনে দিবেই। "

তানভির গুরুভার কন্ঠে বলল,
" আমার সিদ্ধান্ত আর নড়চড় হবে না। আল্লাহ সহায় থাকলে আমি সরকারি চাকরি নিয়েই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। "

"ইনশাআল্লাহ। আরেকটা কথা বলব?"

"বলো।"

"বন্যার প্রতি তোর ইমোশন কি সত্যি নাকি এতেও দুটানা আছে? এখনও সময় আছে তুই ভেবে দেখতে পারিস। পড়াশোনা, রাজনীতি, ক্যারিয়ার, জব এগুলো তোর মন পছন্দে পরিবর্তন করতে পারলেও ভালোবাসা, ইমোশন কখনো পরিবর্তন করা যায় না। বন্যার প্রতি প্রেমানুভূতি যদি না থাকে তাহলে আগেই দূরে সরে যা। নষ্ট করলে নিজের জীবনটায় নষ্ট করিস, আরেকটা নিষ্পাপ জীবনকে জরিয়ে তাকে কষ্ট দিস না। "

তানভির চিবুক নামিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
"আমি সত্যি সত্যি বন্যাকে ভালোবাসি৷ তুমি বিশ্বাস করো। হয়তো তোমার মতো এত ভালোবাসতে পারি না কিন্তু আমার জায়গা থেকে আমি ওকে সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে চাই।"

আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,
" অতীত এসে মানসিকভাবে বিরক্ত করবে না তো?"

"আমার জীবনে অতীত বলতে কিছু নেই। আমি বর্তমান নিয়ে ভালো আছি আর আমি বর্তমান নিয়েই ভালো থাকতে চাই। "

"গুড। শুনলাম সেদিন তোর এক্সকে থা*প্পড় মে*রেছিস। তারপর কি দেখা হয়েছিল?"

তানভির আঁতকে উঠে বলল,
"তুমি কিভাবে জানো? আমি তো বনুকে জানাতে বারণ করেছিলাম। বলে দিয়েছে তোমায়?"

"ওহ আচ্ছা। তাহলে তোর বোনও জানে? এখন থেকেই আমার কাছে কথা লুকানো শেখাচ্ছিস?"

"তুমি ভুল বুঝো না প্লিজ। ঐ মেয়ের কথা শুনলে তুমি রাগ করতা তাই বলি নি। আর আমি নিজেও এই বিষয়টাকে পাত্তা দিতে চায় নি। কিন্তু সেদিন হাসপাতালে বন্যার সামনে জান ডাকছিল, তাই রাগে থা*প্পড় মেরেছিলাম।"

আবির ভ্রু কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,
"জান..! সম্পর্ক এতদূর চলে গেছিলো?"

"ছিঃ নাহ। এই মেয়ে জীবনেও জান ডাকে নি আমায়। তুই তোকারি করেই সময় কাটতো না আবার জান৷। বন্যাকে দু'দিন আমার সাথে দেখেছে হয়তো সন্দেহ করছে তাই এমনভাবে কথা বলছিল। "

আবির শান্ত স্বরে বলল,
"তুই কি জানিস বন্যাকে রাস্তায় ডেকে ঐ মেয়ে একদিন তোর সম্পর্কে কথা বলেছে?"

"কি? কবে? আমি কিছু শুনি নি তো। বন্যাও কিছু বলে নি। তুমি কিভাবে জানো?"

"বন্যা কেনো তোকে বলবে? বন্যা কি তোর গার্লফ্রেন্ড? প্রপোজ করেছিস ওকে?"

"সাহস ই পায় না। যদি রিজেক্ট করে দেয়। কিন্তু তোমাকে ঐ কথা কে বলছে?"

"সানি বলছে। সানির বাসার কাছেই বন্যা টিউশন পড়াতে যায়। বন্যার সাথে ঐ মেয়ে কথা বলার সময় সানি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো তখন তোর কথা শুনে দাঁড়িয়েছে আর যতটা শুনেছে সবটায় আমায় বলেছে। "

"এটা তুমি আমায় আগে বললা না কেনো? ঐ মাইরারে এখন মাটিতে কু*পতে ইচ্ছে করছে। একেই বন্যাকে মানাতে পারছি না তারউপর আরেক যন্ত্রণা হাজির। আমি এখন কি বলবো?"

"তোর এক্সের কথা জানে সে?"

"বনু বলেছে কি না জানিনা কিন্তু আমি এখনও কিছু বলি নি।"

"তোর উচিত বন্যাকে সবকিছু জানানো। তারপর তোর প্রতি তার কি অনুভূতি প্রকাশ পায় সেটায় দেখার বিষয়। "

"আচ্ছা, ঠিক আছে।"

আবির উঠে যেতে যেতে আবারও বলল,
"লাস্ট বার বলছি, ডিসিশন নেয়ার আগে আবারও ভাব। একটা মেয়ের জীবন সম্পূর্ণ তোর হাতে। তুই ভালো হলে মেয়েটা সুখী হবে আর তুই খারাপ মেয়ে দুঃখী। ভাব ভাব সারারাত ভাব, প্রয়োজনে দুরাত না ঘুমিয়ে তারপর ভাব।"

★★★

আজ শনিবার, মোজাম্মেল খান বাসায় ফিরেছেন। চাচ্চুর সাথে দেখা করতে আবির আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরেছে। মূলত চাচ্চুর মনের অবস্থা বুঝতেই আগেভাগে এসেছে আবির। কিন্তু মোজাম্মেল খান তেমন কোনো বিষয়ে আলোচনায় করেন নি। ওনার আলোচনার টপিক প্রজেক্ট, লাভ-লস আর সিফাত। চাচ্চুর সাথে কথা শেষ করে আবির নিজের রুমে চলে গেছে। এই সময়ে অফিসে গেলেও তেমন কোনো কাজে আসবে না তাই আর বের হয় নি। নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। কিছুক্ষণ কাজ করার পর বেশ ক্লান্ত লাগছে। তাই কফি করতে নিচে যাচ্ছিলো। মেঘের রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেঘের ফোনের রিংটোনের শব্দ শুনতে পায়। বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে আবির নিচে চলে গেছে। কফি করে নিয়ে আসার সময় আবারও শুনতে পেল, মেঘের ফোনে কল বেজেই যাচ্ছে। আবির মেঘের রুম পেরিয়ে গেছে কিন্তু অনবরত ফোনের শব্দে আবির অবচেতন মনে ঘুরে আসলো। মেঘ রুমে আছে কি না দেখার জন্য উঁকি দিল৷ রুম সম্পূর্ণ ফাঁকা, টেবিলের উপর ফোনটা আপন গতিতে বেজেই চলেছে। আবির রুমে ঢুকে ফোনের দিকে তাকাতেই স্ক্রিনে বন্যার ছবি আর Baby লিখে সেইভ করা নাম্বারটা ভাসলো। আবির ভাবলো রিসিভ করে বলবে যে, মেঘ রুমে নেই। আবির স্বাভাবিক ভাবে কল রিসিভ করে বলতে নিলো তার আগেই বন্যা উত্তেজিত কন্ঠে বলতে শুরু করল,

"হাই ননদীনি, কি করতেছো তুমি? কতগুলো কল দিচ্ছি রিসিভ করছিলা না কেনো? আমার ছোট ননদ আর দেবর কি করছে?"

আবির উষ্ণ স্বরে বলল,
"তোমার ননদীনি সম্ভবত ছাদে, আমি তোমার ভাসুর বলছি।"

বন্যা থতমত খেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
"আ.. আবির ভাইয়া"

"জ্বি।"

বন্যা নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে। মুখের উপর কল কাটতে পারছে না আবার কিছু বলতেও পারছে না। বন্যা উদাসীন কন্ঠে বলল,
"আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।"

"ওয়ালাইকুম আসসালাম।"

"ভালো আছেন ভাইয়া?"

"আমি ভালো আছি তবে অন্য কারোর টা জানি না। ননদীনির খোঁজ খবর নেও ভালো কথা। কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের বেপরোয়া জামাইয়ের খোঁজ খবরও একটু নিও।"

বন্যা মনে মনে নিজেকে ইচ্ছেমতো বকছে। প্রকাশ্যে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,
" ভাইয়া আসলে ঐরকম কিছু না।"

আবির শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
" ভালোবাসলে নিজের মানুষের যত্ন নিতে শিখতে হয়। আর হ্যাঁ তোমাদের ননদ-ভাবির সম্পর্কের মাঝে ঢুকে পড়ার জন্য সরি। আল্লাহ হাফেজ। "

"আল্লাহ হাফেজ। "

আবির কল কেটে সরাসরি ছাদে গেল। মেঘ গান গাইতে গাইতে গাছের ঘাস পরিষ্কার করছে। আবির কিছুটা পেছনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
" কেউ একজন বলেছিল আমি ফিরলে আমাকে সারপ্রাইজ দিবে। কিন্তু আজও দিল না! সে কি ভুলে গেছে?"

মেঘ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"সে ভুলে যায় নি কিন্তু... "

"কিন্তু কি?"

"আপনি যদি কিছু মনে করেন"

"আমি কিছু মনে করব না। বলুন..."

মেঘ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,
"আগে এটা বলুন, ভাইয়া যে বন্যাকে পছন্দ করে এটা কি আপনি জানেন?"

আবিরের চিরচেনা কন্ঠস্বরের জবাব,
"জানি।"

মেঘ আঁতকে উঠে প্রশ্ন করল,
"কবে থেকে জানেন?"

"প্রায় আড়াই বছর হতে চললো।"

মেঘ হতবার হয়ে তাকিয়ে থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
"ভাইয়া এতবছর যাবৎ বন্যাকে পছন্দ করে?"

"হ্যাঁ। এখন বল কি করেছিস?"

"আমি তেমন কিছু করি নি। ভাইয়া বন্যাকে পছন্দ করে এটা কয়েকমাস হলো আমি জানতে পেরেছি। তাই বোন হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।"

আবির রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
"কি দায়িত্ব? "

মেঘ আস্তে করে বলল,
"আমি আর মীম বন্যাকে ভাবি হওয়ার জন্য প্রপোজ করেছি আর ভাগ্যক্রমে বন্যাও রাজি হয়ে গেছে। আপনাকে ভিডিও দেখাবো নে।"

আবির নিরেট কন্ঠে বলল,
"এজন্যই ফোনে এত যত্নের সহিত ননদীনি বলে ডাকছিল। "

মেঘ ভারী কন্ঠে বলল,
"আপনি কিভাবে জানেন?"

আবির স্ব শব্দে হেসে বলল,
"তোকে কল দিয়েছিল। আমি কল রিসিভ করে শুধু বলতে চেয়েছিলাম, তুই ছাদে। কিন্তু তার আগেই সে সব বলে ফেলছে। "

"তারপর? "

"তারপর আর কি, সে যেহেতু ননদ-দেবরের খোঁজ নিচ্ছে তাই ভাসুর হিসেবে আমারও তো পরিচয় টা দিতে হয়। তাই দিয়ে আসছি পরিচয়। "

"এটা কি করলেন আপনি?"

আবির ঠাট্টার স্বরে বলল, 
"আমি তো কিছু করলাম ই না।"

মেঘ কপাল গুটিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবির মুচকি হেসে নিচে চলে গেছে।

★★★

দু'দিন কেটে গেছে। আবির বন্যার ব্যাপারে তানভিরকে কিছুই জানায় নি কারণ তানভিরকে ভাবার জন্য দুদিন সময় দিয়েছিল। তানভির দুদিন পর সুন্দর ভাবে তার মতামত জানিয়েছে, সে বন্যাকে ছাড়া সে আর কাউকে পছন্দ কিংবা ভালোবাসতে পারবে না। বন্যার জন্য সে সবকিছু করতে পারে আরও অনেক কিছু বলেছে। আবির সব শুনে শান্ত কন্ঠে বলল,
" তুই চাইলে বন্যাকে তোর মনের কথা বলতে পারিস।"
তানভিরকে বিস্তারিত কিছু না বললেও কিছু কথাতে টুকটাক বুঝিয়েছে।

আজ সকাল থেকে খান বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম। মোজাম্মেল খানের শরীর খারাপ তাই অফিসে যাবেন না। তানভির একটা কাজে বেড়িয়েছে। আবিরের আব্বুর অফিসে ছোটখাটো একটা মিটিং আছে তাই আবিরও দ্রুত রেডি হয়ে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ খেতে গিয়ে দেখে টেবিল সম্পূর্ণ ফাঁকা তাই না খেয়ে আবিরকে দেখতে গেল। আবির রুমে নেই দেখে মেঘের মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেছে। আজ সকালে কল পর্যন্ত দেয় নি আবির। আবিরের খোঁজ নিতে মেঘ বেলকনিতে দাঁড়িয়েই আবিরের নাম্বারে কল দিল। আচমকা রুমের ভেতর থেকে রিংটোন বাজছে।

"পাগল তোর জন্যে রে পাগল এ মন, পাগল
মুখে বলি, দূরে যা মন বলে, থেকে যা
দূরে গেলে মন বোঝে তুই কত আপন।"

কল বাজতে বাজতে কেটে গেছে। আবির রিসিভ করে নি। মেঘ দ্বিতীয়বার আবিরের নাম্বারে কল দিল। পূর্বের ন্যায় রুম থেকে একই গান বাজতেছে। মেঘ কপালে ভাঁজ ফেলে আনমনে রুমে দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার উপর আবিরের ফোনটা পড়ে আছে। সেই ফোনেই এই গান বাজতেছে। মেঘ এগিয়ে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই রীতিমতো আশ্চর্য বনে গেল। মেঘ আর আবির একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজছে এমন একটা ছবি ভাসছে সাথে 🖤Soulmate🖤 নামে সেইভ করা নাম্বার। মেঘ আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে আছে। মস্তিষ্কের নিউরন গুলো ছুটছে দ্বিকবিদিক। বুকের বা পাশটা অদ্ভুত অনুভূতিতে মেতেছে। অনেকদিন আগে আবিরের ফোনে নিজের নাম দেখার ইচ্ছে হয়েছিল মেঘের তবে সেটা কেবলমাত্র ইচ্ছেই ছিল৷ এখন তার এক বিন্দুও মনে ছিল না। গত পরশুদিন রাতেও মেঘ বন্যাকে কল দিয়ে মন খারাপ করে বলছিলো, আবির ভাই দেশে ফিরেছে তবুও তাকে ভালোবাসার কথা বলছে না, প্রপোজ পর্যন্ত করছে না। বন্যা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘুমাতে বলেছে। আজ সেই আবির ভাইয়ের ফোনে নিজের নাম, ছবি আর গানের রিংটোন শুনে মেঘ নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।আনন্দে মেঘের দুচোখ টলমল করছে, ভেতরটা আনন্দে ভরে গেছে। প্রকাশ করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আচমকা আবিরের বাইকের শব্দ শুনে ফোন ফেলে মেঘ দ্রুত নিজের রুমে গেছে। আবির নিজের রুম থেকে ফোন নিয়ে মেঘের রুমের সামনে এসে থমকালো। দরজা থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,

"কল দিয়েছিলি কেনো?"

মেঘের দুচোখ ভেজা, চিকচিক করছে পানি। মেঘ আবিরের দিকে না তাকিয়েই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
" খেয়েছেন কি না জিজ্ঞেস করতে কল দিয়েছিলাম।"

"সত্যি? নাকি অন্য কিছু বলতে কল দিয়েছিলি?"

মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
" এমনিতেই কল দিয়েছিলাম। অন্য কোনো কারণ নেই।"

আবির মেঘের দিকে ভালোভাবে তাকালো। মাথায় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। আবির মৃদু হেসে বলল,
"হঠাৎ লাজুকলতা সাজার কারণ কি?"

"এমনি। আপনি অফিসে যান।"

এদিকে আলী আহমদ খান বার বার কল দিচ্ছেন। ১১ টায় মিটিং টাইম। যত দ্রুত সম্ভব যেতে হবে। আবির মেঘের থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত চলে গেছে। আবির বাসা থেকে বের হতেই মেঘ বন্যার নাম্বারে কল দিলো। প্রথমবার রিসিভ হয় নি, এরপর থেকে নেটওয়ার্ক বিজি, ব্যস্ত বলছে৷ অনেকক্ষণ ট্রাই করার পর একবার কল ঢুকেছে। বন্যা কল রিসিভ করে উত্তেজিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
"বেবি, তুই জিতে গেছিস।"

এপাশ থেকে মেঘও বলে উঠল,
"বেবি, আমি ওনার ভালোবাসার প্রমাণ পেয়ে গেছি।"

বন্যা আর মেঘ একসঙ্গে চিল্লাচিল্লি শুরু করেছে। মেঘ বলছে সে আগে বলবে ওদিকে বন্যা বলছে বন্যা আগে বলবে। বাধ্য হয়ে মেঘের কথায় আগে শুনতে হলো। মেঘের কথা শেষ হতেই বন্যা বলে উঠল,

"তুই একবার বলছিলি না,হয়তো আবির ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার আগে থেকে তোকে ভালোবাসে? এটা মিথ্যা না, একদম সত্যি। আবির ভাইয়া তোকে তখন থেকেই ভালোবাসেন।"

"তোকে কে বলছে?"

"তোর ভাই গতকাল রাতে কল দিয়েছিল। আপু বাসায় নেই তাই এই সুযোগে ওনার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলতে পেরেছি। তোকে বিস্তারিত ঘটনা পরে বলল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোর ভাই সবকিছু জানতো।"

মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,
" আমি এতদিন যে প্রমাণ খোঁজছিলাম আজ সেই সব প্রমাণ পেয়ে গেছি৷"

"এখন কি করবি?"
 
মেঘ একটু ভেবে শান্ত কন্ঠে বলল,
" এই জীবনে ওনার প্রপোজ আশা করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই হবে না। যেহেতু আমি প্রমাণ পেয়ে গেছি তাই আমি আজই ওনাকে প্রপোজ করব।"

"কিভাবে?"

মেঘ মুচকি হেসে বলল,
"তুই একটা হেল্প করতে পারবি?"

"কি হেল্প?"

"আমার জন্য একটা নীল শাড়ি কিনে আনতে পারবি? "

"তুই ওনাকে প্রপোজ করতে যাবি?"

"হ্যাঁ যাব। আমি এতদিন প্রমাণ খোঁজেছিলাম৷ কিন্তু শক্তপোক্ত কোনো প্রমাণ পায় নি তবে আজ পেয়েছি। তাই আর ছাড়তে পারবো না। ওনি বলেছিলেন, ওনি বাসায় ফিরলে আমি যা চাই তাই হবে। আমি আজ ওনাকে চাইবো। আশা করি ওনি আমাকে ফেরাবেন না। তুই শুধু শাড়িটা কিনে নিয়ে আয়, প্লিজ। "

"আচ্ছা, ঠিক আছে। আসতেছি।"

"লাভ ইউ বেবি "

"লাভ ইউ আমায় না বলে আমার ভাসুর কে বলিয়ো।"

মেঘ লাজুক হেসে বলল,
"উফ! আমার না ভাবতেই লজ্জা লজ্জা লাগছে। "

বন্যা হেসে বলল,
"তুই রেডি হ, আমি শাড়ি কিনে নিয়ে আসছি।"
          মেঘের হৃদয়ের অন্তঃস্থল অনবরত কম্পিত হচ্ছে। হৃদপিণ্ডের দিগবিদিক ছুটাছুটিতে শরীর জুড়ে অস্থিরতা কাজ করছে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে আবিরের ফোনের স্ক্রিনে দেখা নাম আর শ্রাবণের বৃষ্টিতে জলসিক্ত দুজনার ছবিটা। গত দুবছরে জমে থাকা প্রেমানুভূতিগুলো আজ যেন স্বস্তি পেল। মেঘ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আনমনে ভেবে যাচ্ছে, ঠোঁটজুড়ে তার লাজুক হাসি লেগেই আছে। বন্যা মেঘদের বাসায় আসতে আসতে দুপুর হয়ে গেছে । অনেক দোকান ঘুরে মেঘের জন্য একটা নীল রঙের শাড়ি নিয়ে আসছে। বন্যা আসতেই মেঘ হুটোপুটি করে শাড়ি বের করে দেখতে লাগলো। মূলত সেদিন পার্কে শাড়ি পড়া মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই মেঘের মনে সেটা স্থির হয়ে আছে। মেয়েটা অন্য রঙের শাড়ি পড়লেও মেঘ নীল রঙের শাড়ি পড়ছে। কারণ সাদা, কালো ব্যতীত আবিরের প্রিয় রঙের তালিকায় নীল রঙটায় আসে। তাছাড়া মেঘ আগেও খেয়াল করেছে, সে নীল রঙের জামা পড়লে আবিরের অভিপ্রায় সম্পূর্ণ বদলে যায়, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ তাই আজ ইচ্ছে করে নীল রঙের শাড়ি পড়ছে যেন আবির ভাই মেঘকে দেখে ফিদা হয়ে যায় আর মেঘ যা বলে সব মেনে নেয়।বন্যায় মেঘকে সাজিয়ে দিচ্ছে বিশেষ করে শাড়িটা বন্যায় পড়িয়ে দিচ্ছে। খুব ভালো না পারলেও বন্যা টুকটাক শাড়ি পড়াতে পারে। মেঘ হঠাৎ প্রশ্ন করল,
"ভাইয়া কল দিয়ে তোকে কি বলছে রে?"

"তোর ভাই তো অনেককিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমি সেসবে পাত্তা দেয় নি।"

"কেনো?"

"সেদিন আমার কল আবির ভাইয়া রিসিভ করার পরেই বুঝেছিলাম, আবির ভাইয়া তোর ভাইকে বলবে আর তোর ভাই আমাকে কল দিবেই দিবে। তাই আমি মনে মনে প্রশ্ন সাজিয়ে রেখেছিলাম। তোর সঙ্গে এত বছর যাবৎ চলছি আমি, আজ পর্যন্ত তোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ওনাকে একা নিতে দেখি নি। প্রথম প্রথম ভাবতাম আবির ভাইয়া ওনার বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো, বড় ভাইও তাই হয়তো বলেন বা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা বাড়লো, আবির ভাইয়ার প্রতি তোর ক্ষোভ ছিল এতবছর তাই আমি তোকেও ঐভাবে কিছু বলি নি। তবে ইদানীং ওনার সাথে আমার বেশ কয়েকবার আলাদাভাবে দেখা হয়েছে, বিভিন্ন টপিকে কথা হয়েছে কিন্তু তোর টপিক আসলে ওনার মুখে আবির ভাইয়ার নাম এমনিতেই চলে আসে। ভাইয়া বলেছে এটা করতে, ভাইয়া এটা করতে বারণ করেছে, ভাইয়াকে বলে দেখি । হয়তো মুখ ফস্কে বলে ফেলেন পরে বুঝতে পেরে কথা কাটিয়ে বলেন, বাসায় কথা বলতে হবে। তুই একদিন আবির ভাইয়ার কলেজ ফ্রেন্ডদের বিষয়ে বলেছিলি এই সবগুলো বিষয়ই আমায় মাথায় ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় সেদিন হাসপাতালে তুই যখন অজ্ঞান ছিলি তখন আবির ভাইয়া ফোনে ওনাকে যেভাবে ঝারছে, তুই বিশ্বাস করবি না ওনার চোখ-মুখ একদম অন্ধকার হয়ে গেছিল। তারপরও ওনি একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেন নি। সেদিন ই সিউর হয়েছিলাম ওনি কিছু না কিছু হলেও জানেন । আমি শুধু ওনাকে জিজ্ঞেস করার সুযোগ খোঁজছিলাম। গতকাল ওনি কল দিলেন, আপুও বাসায় নেই এই সুযোগে রাত ৩ টার উপরে পর্যন্ত শুধু তোর বিষয়েই কথা বলেছি। তোকে কথাগুলো জানানোর জন্য আমার ভেতরটা ছটফট করছিল, কিন্তু ঘুমে চোখও টানতেছিল। ওনার সাথে কথা বলতে বলতে কখন জানি ঘুমিয়ে পরছিলাম৷ সকালে সজাগ হয়েই আগে তোকে কল দিয়েছি।"

মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
"ভাইয়া কি বলছে?"

"আমি প্রথমেই ওনাকে জিজ্ঞেস করেছি, সেদিন হাসপাতালে কি আবির ভাইয়া কল দিয়েছিলেন? ওনি উত্তরে 'হ্যাঁ' বলেছেন। আমি আবারও জিজ্ঞেস করেছি, "আবির ভাইয়া কি মেঘকে পছন্দ করেন?"
ওনি এর উত্তরেও "হ্যাঁ" ই বলেছেন। তখন আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করি, 'আবির ভাইয়া কি বাহিরে পড়তে যাওয়ার আগে থেকেই মেঘকে পছন্দ করেন? হ্যাঁ কি না৷' ওনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন 'হ্যাঁ' তারপর আরও কয়েকটা প্রশ্ন করেছি, ওনি সবগুলোতেই ঠিকঠাক উত্তর দিয়েছেন।"

"তুই জিজ্ঞেস করিস নি ভাইয়া কবে থেকে জানে?"

"জিজ্ঞেস করেছি, ওনি বলেছেন ওনি অনেক আগে থেকেই সবকিছু জানেন।"

মেঘ চেঁচিয়ে উঠল,
"হোয়াট? ভাইয়া আমার সাথে এত বড় ধোঁকাবাজি টা করতে পারলো?"

বন্যা শান্ত স্বরে বলল,
"গতকাল রাতে এই কথা শুনামাত্র আমিও চিৎকার করেছিলাম৷ রাগে কটমট করে বলেছিলাম, আপনি সবকিছু জানার পরও মেঘকে এত কষ্ট কেনো দিচ্ছেন? আপনি জানেন মেঘ আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তারপরও আপনি এটা কিভাবে করতে পারলেন? তখন ওনি বলছেন, ওনি আবির ভাইয়ার কথার উপর কিছু বলতে পারতেন না আর কখনো পারবেনও না। আমার মেজাজ আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছিল, আমি মুখ ফস্কে বলে ফেলছিলাম,

"আবির ভাইয়ার মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ববোধ থাকতো তাহলে মেঘকে এত কষ্ট দিতো না। "

মেঘ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"ভাইয়া ধমক দেয় নি তোকে?"

"না ধমক দেন নি তবে রাগে রাগে বলছেন, তুমি ভাইয়ার সম্পর্কে কতটা জানো যে ভাইয়াকে নিয়ে এসব কথা বলছো। ভাইয়া বনুকে যতটা ভালোবাসে আর বনুর ব্যাপারে যে পরিমাণ পসেসিভ আমি সারাজীবনেও তার একাংশ হতে পারব না।"

মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
" এই অফুরন্ত ভালোবাসা কোথায় ছিল এতদিন?"

বন্যা মুচকি হেসে বলল,
"তারথেকেও বড় শকিং নিউজ শুনবি?"

"কি?"

" আবির ভাইয়ার অবর্তমানে ৭ বছর তুই যে রিলাক্স জীবন কাটিয়েছিস সেই সবটায় ছিল আবির ভাইয়ার প্ল্যান। তুই হয়তো প্রকাশ্যে বা স্বইচ্ছায় আবির ভাইয়ার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলিস নি কিন্তু ওনি ঠিকই তোর কথা শুনেছে। এমন একটা দিন বাদ যায় নি যে তোর কন্ঠ না শুনে ভাইয়া ঘুমিয়েছেন। তুই রাগ করলে মাঝরাতে তোর ভাই ঘুম থেকে ডেকে নিজে রান্না করে বা তোর পছন্দের খাবার এনে তোকে সামনে বসিয়ে খাইয়ে তোর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতো ঠিকই কিন্তু তখন ফোনের ওপাশে আবির ভাইয়া থাকতেন। শুধুমাত্র তোর কথা শুনার জন্য ওনি আলাদা ফোন ইউজ করতেন, ঘন্টার পর ঘন্টা তোর ভাইয়ের সঙ্গে অডিও কলে থাকতেন। তোর ভাইয়া আরও যা যা বলেছেন তা শুনে আমি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। তোর অভিমানের তোপে পড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওনি, অথচ দূরে থেকেও পাগলের মতো ভালোবেসে গেছেন৷ তুই বোন অনেক লাকি। দোয়া করি, যেন সারাজীবন আবির ভাইয়ার স্প্যারো হয়ে থাকতে পারিস।"

মেঘ মিষ্টি করে হেসে শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
" ইনশাআল্লাহ। এখন বল আমায় কেমন লাগছে? ওনাকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট না?"

বন্যা হিজাব ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
" মাশাআল্লাহ, তোকে খুব সুন্দর লাগছে। আবির ভাইয়া ছাড়া আর কারো নজর যেন না লাগে।"

দুপুরের পর থেকে ড্রয়িং রুম ফাঁকায় থাকে তবুও মেঘ আর বন্যা চুপি চুপি বাসা থেকে বেড়িয়েছে। মেঘের আব্বু আজ বাসায় আছেন। মেয়ে এত সেজেগুজে বের হচ্ছে দেখলে নিশ্চিত শখানেক প্রশ্ন করতে শুরু করবেন। মুহুর্তেই তানভির, আবির সবাইকে জড়ো করে ফেলবেন। এই ভয়ে লুকিয়ে বের হতে হয়েছে। বাসা থেকে বেড়িয়ে দুজন দুই রিক্সা নিয়ে আলাদা আলাদা গন্তব্যে রওনা দিল। বন্যা সরাসরি বাসায় যাচ্ছে। মেঘ পার্কে যাচ্ছে, যাওয়ার সময় একগুচ্ছ লাল আর হলুদ গোলাপও সঙ্গে নিয়েছে। জ্যাম পার করে পার্ক পর্যন্ত আসতে মেঘের অনেকটায় সময় লেগেছে। আজ অফিস ডে হওয়ায় পার্কে খুব বেশি মানুষের ভিড় নেই আবার একেবারে ফাঁকাও না। শাড়ি পড়ে একা একা হাঁটতেও খুব বিরক্ত লাগছে, কিছুদূর গিয়ে গাছের নিচে একটা ব্রেঞ্চে বসলো। ফুলগুলো পাশে রেখে ফোনটা হাতে নিলো। আবিরকে ফোন দেয়ার খুব চেষ্টা করছে কিন্তু ভয়ে হাত কাঁপছে। বাসা থেকে খুব সাহস নিয়ে বের হলেও পার্ক পর্যন্ত আসতে আসতে সাহসের ছিটেফোঁটাও বেঁচে নেই। হাতের কম্পনের কারণে কাঁচের চুড়ি গুলো একে অন্যের সঙ্গে বারি খাচ্ছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ফোন পাশে রেখে চুড়ি খুলতে শুরু করলো। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, শরীর ঘামছে, লাল টকটকে রঙের লিপস্টিকে রাঙা ওষ্ঠদ্বয় তিরতির করে কাঁপছে। অকস্মাৎ বন্যার কল আসছে। কল রিসিভ করতেই বন্যা বলল,
"আবির ভাইয়াকে কল দিয়েছিস?"

"সাহস পাচ্ছি না ।"

"আমি জানতাম তুই এমন কান্ড করবি। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে কল দে ওনাকে। যা হওয়ার হবে।"

মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
"ঠিক আছে, দেখছি।"

মেঘ পার্কে এসেছে প্রায় ২০ মিনিট হয়ে গেছে। এখনও আবিরকে কলই দিতে পারছে না। বারবার ফোন হাতে নিচ্ছে আবার রেখে দিচ্ছে। সূর্য পশ্চিমা আকাশে অনেকটায় হেলে পড়েছে। পল্লবিত আঁখিতে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। মেঘ আচমকা নড়েচড়ে বসলো। এরমধ্যে মেঘের থেকে কিছুটা দূরে একটা বাইক এসে থামলো কিন্তু মেঘের সেদিকে নজর নেই। মেঘ দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ফোন হাতে নিয়ে আবিরের নাম্বারে কল দিল। হাঁটুর উপর হাত রেখে ঝুঁকে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মেঘ বারবার ঢোক গিলছে। আবির কল রিসিভ করলে কি বলবে মনে মনে তাই সাজাচ্ছে। অকস্মাৎ মেঘের ঠিক সামনে কেউ একজন দাঁড়াতেই মেঘ আঁতকে উঠল, নীল রঙের একটা আবছায়া চোখে লাগতেই মেঘ মেরুদণ্ড সোজা করে বসতে বসতে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতে নিল। ততক্ষণে আবির মেঘের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরেছে। আবিরকে দেখেই চমকে উঠল মেঘ। মেঘের অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে আবির মুচকি হাসলো। আবিরের পড়নে নীল পাঞ্জাবি, সানগ্লাসটা বুকের উপর পাঞ্জাবিতে ঝুলানো, চুল দেখে বুঝায় যাচ্ছে বাইক থেকে নেমে হাতেই ঠিক করেছেন, ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবির একমুহূর্ত দেরি না করে মেঘের সামনে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ ধরে নেশাক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,

❝তুই আমার মন পিঞ্জরে
নিপট অপ্রমাদীতে থাকা 
এক অন্ত:শীল ক্ষীণত্ব, 
অনুভূতির রাজ্যের 
তৃষ্ণার্ত কাব্য।
এলোকেশীর এলো চুল,
উত্তাল উদধির তরঙ্গের ন্যায় 
কুহকিনী হাসি,
প্রণয়ীনীর নিখুঁত আত্ততা,
মৃগনয়নার মতো বিমুগ্ধ চোখে
বারংবার 
হারিয়ে খোঁজেছি নিজেকে। 
তুই আমার প্রণয়ের প্রদাহের সেই পূর্ণতা,
অপ্রমেয় নীলাম্বরের অসীমত্ব
 ছাড়ানো স্নিগ্ধতা।
 তুই কি আবিরের হৃদয় রাজ্যের 
রাজ্ঞী হবি?❞

মেঘ দু'হাতে মুখ চেপে ডাগর ডাগর চোখে আবিরের অভিমুখে তাকিয়ে ছিল৷ হার্টবিট বেড়েছে কয়েকগুণ, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আবিরের প্রশ্নে চক্ষুদ্বয় প্রশস্ত করে অবচেতন মনে চেঁচিয়ে উঠল,
"না। আমি মানি না। "

মেঘের চোখে মুখে অল্প বিস্তর ক্রোধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আশেপাশে বসা ২-৪ জন মেঘ- আবিরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মেঘ আর একটা চিৎকার দিলেই ছুটে আসবে। আবির আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিল। মেঘের মায়াবী দুই আঁখি আবিরের চোখে মুখে নিবদ্ধ। সকাল থেকে নেয়া মানসিক প্রিপারেশন, সাজগোজ সব যেন বৃথা হয়ে গেল। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,

" আপনি আমার সব প্ল্যান ধ্বংস করে দিতে পারলেন?"

আবির তখনও হাঁটু গেড়ে বসে আছে। হাতে থাকা সাদা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে আবারও বলল,
❝ আমি রূপকথার রাজকুমার হতে চাই না,
শুধু 
তোর মনের রাজ্যের রাজা হতে চাই।
Will you be my queen? ❞

মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। আবির বিরক্ত হয়ে ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিল,
" No problem. If you don't take the flowers, I will give them to another girl. Will I?"

কথাটা বলতে দেরি হয়েছে কিন্তু আবিরের হাত থেকে মেঘের ফুল টেনে নিতে দেরি হয় নি। ফুলগুলো আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

"ফুলও আমার আর আপনি সহ আপনার রাজ্যও আমার। আপনার মনের রাজ্যে কেউ উঁকিও দিতে পারবে না। এই আমি বলে রাখলাম। "

মেঘ রাগে ফোঁস ফোঁস করছে, মাথা নিচু করে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবির নিঃশব্দে হেসে নিজের দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে মেঘের উরুতে মাথা রেখে মেঘের চোখের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই মেঘের রাগ আর অভিমান উধাও হয়ে গেছে, মেঘের হৃদপিণ্ডের গতি অস্বাভাবিক, জোরালো হৃৎস্পন্দনের শব্দ বাহির থেকে শুনা যাচ্ছে। আনমনেই হাতের ফুলগুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আবিরের দিকে তাকালো। আবিরের নেশাক্ত হাসিতেই মন্ত্রমুগ্ধ মেঘ। আবির অত্যন্ত মায়াবী কন্ঠে বলল,

" মনের রাজ্যে উঁকি দেয়া তো দূর, আমার দিকে কেউ তাকানোর আগেই বলে দিব,
প্লিজ খালা, আমার দিকে তাকাবেন না। আমার ঘরে একটা পরী মতো বউ আছে। বউটা যেমন কিউট তেমন হিংসুটে৷"

আবিরের মুখে বউ শব্দটা শুনে মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। অজানা শিহরণে মন উড়ুউড়ু করছে। 
বার বার কানে বাজছে,
"আমার ঘরে একটা পরীর মতো বউ আছে।" অদ্ভুত অনুভূতি মনকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। লজ্জায় আবিরের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই তবুও বক্ষস্থলের ইতস্ততা কাটাতে পারছে না। আবির মেঘের উরু থেকে উঠে মেঘের ডানহাতটা নিজের কাছে টেনে নিল। আবিরের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে মেঘের হাত সহ সম্পূর্ণ শরীর কম্পিত হচ্ছে। আবির হাতটাকে শক্ত করে ধরে মৃদুভাবে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"আজ থেকে আমি শুধু তোর। আমার উপর তোর অধিকার সবচেয়ে বেশি। তুই যখন যা বলবি তাই হবে। খুশি?"

আবিরের চুমুতে মেঘের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সেদিন অর্ধ ঘুমে থাকায় আবিরের কপালে দেয়া চুমুটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারে নি। তবে আজ মেঘ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আছে। মেঘ নির্বাক হয়ে বসে আছে, বহু চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কথা বের করতে পারছে না। যেই আবির ভাইয়ের প্রণয়ের স্রোতে সর্বক্ষণ ভেসে যেতে চাই সেই আবিরের প্রেমিক সুলভ আচরণ, আবেগময় কথার কোনো প্রতিত্তোর করতে পারছে না। মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। চোখ নামাতেই নিজের কেনা লাল আর হলুদ গোলাপের দিকে নজর পরলো। সহসা মনে পড়ে গেছে নিজের করা পরিকল্পনার কথা। মেঘ গুরুতর কন্ঠে বলে উঠল,

" আপনি এটা কেন করলেন? আমি সকাল থেকে প্ল্যান করে ভাবিকে দিয়ে শাড়ি কিনিয়ে সেজেগুজে আসছি আর আপনি আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনি খুব পঁচা। "

আবির মেঘের হাত ছেড়ে বসা থেকে উঠে সরাসরি মেঘের দুপাশের ব্রেঞ্চে হাত রেখে মেঘের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো। মেঘ ঠোঁট উল্টে মনমরা হয়ে আবিরের দিকে চেয়ে আছে। আবির প্রশস্ত আঁখিতে তাকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,

" আমার এতবছরের অনুভূতি, আসক্তি আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আপনি কেবল কয়েক ঘন্টায় তছনছ করে দিয়েছেন। তবুও আমি চুপচাপ বসে দেখবো? আপনি ভাবলেন কিভাবে?"

মেঘ নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে শুধালো,
" আমি এখানে আসছি এটা আপনি কিভাবে জানেন?"

আবির মুচকি হেসে বলল,
"সকালে আপনার হাবভাব দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। তানভিরকে কলও দিয়েছিলাম কিন্তু ও ফোন রিসিভ করে নি। ২ বেজে ৩৭ মিনিটে আপনি শাড়ি পড়ে বাসা থেকে বের হতেই আমার কানে খবর চলে গেছিলো। তানভিরকে কল দিতে দিতে অতঃপর জানতে পারলাম যে, আমার সন্দেহ ঠিক ছিল। তানভির বন্যাকে বলে ফেলছে মানে আপনার কানে কথা চলে গেছে। ৩:১৬ তে ফুলের দোকানে ফুল কিনছিলেন আর আমি তখন শপিং মলে আপনার শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং পাঞ্জাবি খোঁজতে ব্যস্ত। আপনি এখানে এসে বসেছেন ঠিক ৪:২২ এ। তখন আমি রেডি হয়ে বেড়িয়ে ফুল কিনতে যাচ্ছি। ফুল নিয়ে আসতে আসতে তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।"

"আপনি এতকিছু কিভাবে জানেন?"

"ম্যাম, আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনাকে ছাড় দিয়েছি কিন্তু ছেড়ে দেয় নি। তাছাড়া আপনি যার তার মনের মানুষ না। মনে রাখবেন, আবিরের পৃথিবী আপনি। আর সেই পৃথিবীকে আগলে রাখতে আবির সবকিছু করতে পারে। খান বাড়িত চারপাশ ঘিরে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নিজের কাজের পাশাপাশি সর্বক্ষণ বাসার দিকে নজর রাখে। খান বাড়িতে কখন কে আসছে, কে যাচ্ছে, কেনো আসছে সব আপডেট আমাকে পাঠায়৷ এমনকি এইযে আমি আপনি এখানে আছি, এখানেও আমার লোক আছে।"

মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,
"অ্যাহ! বললেই হলো। মজা করেন আমার সাথে?"

 আবির মেঘের চোখে চোখ রেখে বলল,

"আমার ডানপাশে কিছুটা দূরে কালো টিশার্ট পড়া ছেলেটাকে দেখ, তার পেছন দিকে কফি কালার শার্টের ছেলে আর ঐদিকে বাইকে বসা ছেলেটাকে দেখ।"

মেঘ তিনজনকে এক পলক দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
"তারা আপনার লোক?"

"হুমমমমম। বিশ্বাস হয় না?"
"না।"

"ওকে, ওয়েট।"

আবির ফোন বের করে মেসেজ পাঠাতেই ছেলেগুলো যে যার মতো চলে যাচ্ছে। মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
"ওনারা সত্যি আপনার লোক? আপনার কথায় সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেছে। কিভাবে সম্ভব?"

"আপনার জন্য সব সম্ভব।"

মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
" তারা এখানে কেনো আসছিল? "

"আমার অবর্তমানে কেউ যেন আমার স্প্যারোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে তারজন্য।"

"তাই বলে তিনজন? আর ওনারা আপনার কি হয়?"

"দুজন ছোট ভাই, একজন ফ্রেন্ড। তিনজনের বাসা কাছাকাছি তাই বলেছিলাম আমি আসার আগ পর্যন্ত কেউ যেন আশেপাশে থাকে। এসে দেখি তিনজন ই উপস্থিত। "

মেঘ নিজের কেনা ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
" ওনাদের জন্য আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল।"

আবির ব্রেঞ্চ থেকে মেঘের খুলে রাখা চুড়িগুলো তুলে মেঘের হাতে পড়াতে পড়াতে বলল,
" আর আপনার জন্য আপনার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেছে।"

"মানে?"

"কিছু না। চলুন।"

মেঘ নিজের ফুলগুলো আবিরের সামনে ধরে হিমশীতল কন্ঠে বলে উঠলো,
" I Love You "

আবির ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
"লাল ফুল গুলো সরিয়ে শুধু হলুদ গোলাপগুলো দেন।"
"কোনো?"
"লাল গোলাপ ছুঁতে চাই না তাই।"

মেঘ যথারীতি হলুদ গোলাপ গুলো আলাদা করে ধরতেই আবির ফুল গুলো হাতে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
"থ্যাংক ইউ।" 

মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
"কেউ আই লাভ ইউ বললে প্রতিত্তোরে থ্যাংক ইউ বলে না, আই লাভ ইউ টু বলতে হয়। "

আবির কথাটা শুনলো কি না কে জানে। কয়েকটা পিচ্চি ছেলেকে ডেকে লাল গোলাপ গুলো দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলল। পরপর মেঘকে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিল, নিরুদ্দেশের পথে ছুটলো। মেঘ দু একবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু আবির তেমন কিছুই বলে নি। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, মেঘ চুপচাপ বাইকে বসে আছে। আবির বাইকের স্প্রীড কমিয়ে হঠাৎ ডেকে উঠল,
" ম্যাম...! "
"জ্বি। "
"এত চুপচাপ কেনো?"
"এমনিতেই।"

আবির রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে ঘাড় কাত করে মেঘকে খানিক দেখে নিলো। আবির মেঘের দু'হাত এনে নিজের পেটের উপর রেখে রাশভারি কন্ঠে বলল,
" আজ থেকে এই হাতের অবস্থান এখানে।"

মেঘ আনমনে হেসে আবিরের গা ঘেঁষে বসলো৷ পেছন থেকে আলতোভাবে আবিরের পেট আঁকড়ে ধরল। আবির যথারীতি আবারও বাইক স্টার্ট দিল, শহর থেকে বেড়িয়ে অনেকটা রাস্তা গিয়ে আবির বাইক থামালো। আশেপাশে কয়েকটা দোকান ছাড়া তেমন বাড়িঘর নেই। একদম কোলাহল শূন্য পরিবেশ। আবির মৃদু হেসে বলল, 

" ৫ মিনিটের জন্য আপনার চোখ বেঁধে দিলে আপনি কি রাগ করবেন?"

"চোখ কেনো বাঁধবেন?"

"সেটা ৫ মিনিট পর বুঝবেন, প্লিজ।"

মেঘ আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। একে অপরিচিত জায়গা, তারউপর আশেপাশে মানুষও তেমন নেই। আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,

"ঠিক আছে। "

আবির এক গাল হেসে মেঘের চোখ বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে মেঘকে কোলে তুলে নিল। মেঘ আবিরের বুকে মাথা রেখে চুপ থেকে আবিরের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনছে। ২-৩ মিনিট পর মেঘকে একটা জায়গায় নামালো।মেঘের চোখ তখনও বন্ধ। চোখ থেকে কাপড় সরতেই মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকালো। এটা একটা বাসা, যার গেইটের উপরে লেখা, 
"Sparrow's Dreamhouse." 

আবির অনুচ্চ স্বরে বলল,
" ম্যাম, আপনার গিফট। "

মেঘের বিষ্ময় যেন কমছেই না। আবির মেঘের হাত টা শক্ত করে ধরে দরজার সামনে দাঁড়ালো। আবির চোখের ইশারায় মেঘকে দরজা খুলতে বলল। মেঘ বাম হাতে আস্তে করে দরজা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেছে। অকস্মাৎ বাড়ির ভেতরে সাউন্ড বক্সে গান বাজতে শুরু করল,
 
”শোন বলি তোমায় না বলা
কথাগুলো আজ বলে দিতে চাই,
বল কি বলতে চাও,
সারাটি জীবন ধরে শুনে যেতে চাই

ভালবাসি আমি যে তোমায়
এই কথাটাই ছিল শুধু বলার
ভালবাসি আমিও তোমায়
সব কথা কি মুখে বলে দিতে হয়"

দরজা খুলামাত্র মেঘের চোখ পরে ড্রয়িং রুম সাথে বিশালাকৃতির সিঁড়ির দিকে যা গাদাঁ ফুলে সজ্জিত, ফ্লোর জুড়ে গাঁদা ফুলের পাপড়িতে ছেয়ে আছে। সিঁড়ির উপর জ্বলমল করছে আবির আর মেঘের একটা ছবি যেটা কোন এক রেস্টুরেন্টে তোলা। ছবি দেখে মনে হচ্ছে যেন দুজন দু'জনের চোখে চোখ রেখে নিজেদের অব্যক্ত অনুরক্তি জাহির করছে। মেঘ চারপাশে চোখ ঘুরাতেই এমন আরও কয়েকটা ছবি চোখে পড়লো। দেয়ালে ছবি লাগানো টা খান বাড়ির কেউ ই তেমন পছন্দ করে না, তাই শখেও কেউ কখনো নিজের ছবি ফ্রেমবন্দি করে নি। মেঘ অবাক চোখে ছবিগুলো দেখছে আর ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করছে। কারণ ছবিগুলোর প্রায় সবই মেঘের অগোচরে তোলা হয়েছে। আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
"চিন্তা করিস না, ছবিগুলো সরিয়ে দিব। এগুলো শুধু স্পেশাল দিনের জন্য করিয়েছি।"

ছবিগুলোর থেকে মেঘের দৃষ্টি সরলো। আবির মেঘের হাতটা আর একটু শক্ত করে ধরে পা বাড়ালো। মেঘ আজ নির্বাক, এ জীবনের সেরা সারপ্রাইজটা পেয়েছে সে। বাকরুদ্ধ মেঘ এক হাতে আবিরের দেয়া গোলাপগুলো শক্ত করে ধরে আবিরের অভিমুখে চেয়ে তাকে অনুসরণ করল। সাউন্ডবক্সে তখন গান বাজছে,

"আকাশের ঐ নীল ঠিকানায়
মেঘেরা সাদা ডানা ছড়ায়
ও দেরি সেই ভালবাসা
এ মনে আজ পেয়েছে ঠাই

জড়াবো আদুরে 
তোমাকে অনুভবে
আকাশের চেয়ে বেশী
তোমাকে ভালবাসি"

কিছুটা সামনে এগুতেই সিঁড়ি উপরে প্রায় ২০-৩০ জন হাতে ফুলের পাপড়ি সমেত উপস্থিত হলো। সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
"Welcome to your dreamhouse, Madam."

আকস্মিক ঘটনায় মেঘ কিছুটা ভড়কালো, সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল মেঘের ছোট্ট দেহ। মেঘ কয়েকজনকে মোটামোটি চিনে তবে বেশিরভাগই আবিরের অফিসের স্টাফ। মেঘ আনমনেই রাকিব ভাইয়া,রাসেল ভাইয়াদের খোঁজলো কিন্তু তারা এখানে নেই। আবিরের কর্মকাণ্ডে মেঘ পদে পদে আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মনের ভেতর চলমান অস্থিরতা এখন আরও বেশি কাজ করছে। আবির মেঘের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে সিঁড়ির পাশে রেখে অকস্মাৎ মেঘকে কোলে তুলে নিল। ওমনি মেঘের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, আতঙ্কিত হয়ে মেঘ অতর্কিতেই আবিরের পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরলো, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিল। আবির মুচকি হেসে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য আবেগশূন্য হয়ে গেছে। গাঁদা ফুলের পাপড়ি মেঘের চোখে মুখে বারি খাচ্ছে, আকাশচুম্বী লজ্জা আর ইতস্তততায় মেঘ চোখ খুলতে পারছে না, ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে কোনো এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভূখন্ডে পদার্পণ করতে। আবির যেতে যেতে তার পিএসকে উদ্দেশ্য করে থমথমে কন্ঠে বলল, 
"মিরাজ, সবার খাবারের ব্যবস্থা করো।"

"জ্বি ভাইয়া।"

মেঘের হুট করে নেয়া সিদ্ধান্তে আবিরের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। না পারতেছিল মেঘকে আটকাতে আর না পারছিল নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। তাই বাধ্য হয়ে অফিসের স্টাফদের দিয়েই সবকিছু গুছাতে হয়েছে। তাদের খুব ইচ্ছে ছিল মেঘকে ফুল ছিটিয়ে ওয়েলকাম করবে, তাই আবিরও তেমন আপত্তি করে নি। আবিরের নিষ্পলক দৃষ্টি আঁটকে আছে মেঘের লজ্জায় ললিত ধৃষ্টতায়। মেঘের চোখ তখনও বন্ধ, আবিরের উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে মেঘের গায়ে। আবির ছাদের দরজার পাশে এসে থামলো। মেঘকে নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল, 
" চাইলে এবার তাকাতে পারেন।"

মেঘ মিটমিট করে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের আঁখি যুগল প্রশস্ত হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ছাদ লাইটিং করা, রঙবেরঙের আলোতে সজ্জিত সবকিছু। রাকিব এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
" সরি ভাবি, সময়ের অভাবে আজ ঠিকমতো সাজাতে পারি নি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাদের বাসরঘর আমি নিজের হাতে সাজাবো। এমনভাবে সাজাবো যেন বাসরঘর দেখতে দেখতেই রাত পেরিয়ে যায়।"

রাকিবের মুখে ভাবি ডাক শুনে মেঘ খুশি হবে নাকি বাকি কথার জন্য লজ্জা পাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। আবির শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,
"শুধু শুধু আমার বউটাকে লজ্জা দিচ্ছিস কেনো?"

"ওহ হো। আমরা কিছু বললেই লজ্জা দিচ্ছি। আর তুই যে এখানে বাসর করার প্ল্যান করছিলি এটা বললে কি হবে!"

আবির চোখ রাঙিয়ে পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
" বিয়ে করে রাকিবের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, তুই কিছু মনে করিস না। চল ঐদিকে ।"

সাউন্ডবক্সে একই গান বার বার বাজতেছে,
"সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি
রূপকথার রাজকুমার হয়ে
আমায় তুমি ভালবাসতে যদি"

ছাদের একপাশে যেতেই মেঘ আরেক দফায় বিস্মিত হলো। লাইটিং করা ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে লেখা,
" Marry Me?"

মেঘ দু'হাতে মুখ চেপে সেই লেখাটা দেখছে। রাসেল, লিমন, মোবারক ভাইয়া সহ আবিরের আরও ৪-৫ জন ফ্রেন্ড এখানে উপস্থিত। এই অপরূপ মুহুর্তের কথা মেঘ কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। ছাদের এই কর্ণার টা কাঁচা ফুল দিয়ে এমন সাজানো যা দেখে মেঘের চোখ ই সরছে না। রাসেলরা সবাই আতশবাজিসহ আরও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। 
 মেঘ আবিরকে দেখার জন্য আলতোভাবে চোখ ঘুরালো। আবির হাঁটু গেড়ে বসে মেঘের দিকে একটা আংটি ধরে ক্ষীণ স্বরে বলল,

"তুই আমার অবসন্ন হৃদয়ের
অস্ফুট প্রফুল্লতা, 
আমার প্রণয়ের একমাত্র 
পরিণীতা।"

আবিরের ধারালো ছুরির ন্যায় চাহনি। পুনরায় নেশাক্ত কন্ঠে বলল,
"Will you be my soulmate?"

মেঘ আবেগময় কন্ঠে ঝটপট বলল,
"Yes."

আশেপাশে রাকিব,রাসেলদের দিকে তাকানোর মতো অবস্থা নেই মেঘের। সে এখন অন্য দুনিয়ায় আছে। আজকের এই দিনটা মেঘের কাছে স্বপ্নের মতো। 
আবির হাত বাড়াতেই মেঘ নিজের ডানহাতটা আবিরের হাতের উপর রাখলো। আবির সেই হাত সরিয়ে মেঘের বামহাত সামনে এনে মৃদুগামী হস্তে খুব যত্ন নিয়ে আংটি টা পড়িয়ে দিল৷ মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। গতবছর মেঘের জন্মদিনে আবির বামহাতের আঙ্গুলে আংটি পড়িয়ে দিয়েছিল বলে মিনহাজরা কত কি বলেছিল। মেঘও সেসব কিছু মেনে নিয়েছিল, ভেবে নিয়েছিল বিয়ের আংটি ডানহাতে পড়তে হয়,সেজন্য ই আজ ডানহাত বাড়িয়েছিল। আবির আংটি পড়িয়ে মেঘের হাতে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

"লোকে বলে, বামহাতের অনামিকা আঙুলের সঙ্গে নাকি হৃদয়ের সরাসরি যোগ রয়েছে। তাই বিয়ের আংটি বামহাতে পড়াতে হয়। "

মেঘ আনমনে শক্ত কন্ঠে শুধালো,
" আপনি গতবছরও আমার বাম হাতে আংটি পড়িয়েছিলেন। তখন লোকের কথা জানতেন না?"

"জানতাম। আর জানতাম বলেই বাম হাতে পড়িয়েছিলাম। কারণ তুই আমার প্রেমিকা নস আমার বউ তুই।"

মেঘ অপলক দৃষ্টিতে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। কতটা শক্ত কন্ঠে আবির বার বার মেঘকে বউ বলে সম্বোধন করছে অথচ গত দুই বছরে এই মানুষটার মুখ থেকে একটা টু শব্দ পর্যন্ত বের হয় নি। 

লিমন স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,
"এখন কি আতশবাজি ফুটাতে পারি?"

আবির ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল। পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে মেঘের হাতটা উপরে তুলে মৃদুস্বরে বলল, 
"আংটিটা পছন্দ হয়েছে? "

আংটির দিকে না তাকিয়েই মেঘ বলে দিল,
"আপনার দেয়া প্রতিটা জিনিস আমার কাছে উত্তম আর অমূল্য।"

আবির মুচকি হেসে বলল,
" একটু দেখে তো নে।"

মেঘ এবার আংটির দিকে তাকালো। স্বর্ণের আংটিটা খুব বেশি বড় না হলেও ডিজাইনটা খুব সুন্দর। আংটির ঠিক মাঝ বরাবর অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে A লেখা। আবির শান্ত কন্ঠে বলল,
"আংটিটা সবসময় হাতে রাখবি।"

মেঘ তৎক্ষনাৎ আংটিতে চুমু খেয়ে বলে উঠল,
"আমি এই আংটি কখনো খুলবোই না।"

মেঘের কান্ড দেখে আবিরের ঠোঁট চেপে হাসছে। রাকিবরা ছাদের অন্যপাশে গিয়ে আতশবাজি ফুটাচ্ছে। বাজির শব্দে মেঘ সেদিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
"আমিও বাজি ফুটাবো।"

"ওকে। "

 মেঘ দু-একটা ফুটানোর চেষ্টা করেছে। অতঃপর দূরে সরে এসেছে। দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তাদের হৈ-হুল্লোড় দেখছে আর হাসছে। এখনও আরও অনেক বাজি ফুটানো বাকি আবির আচমকা মুখ ফুলিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
"তোরা এখন নিচে যা। আমার ওর সঙ্গে কথা আছে। "

মোবারক হেসে বলল,
" শেষ করেই চলে যাব।"

" কয়টা বাজে দেখছিস? এক্ষুনি যা।"

তারাও আর কোনো কথা বলে নি। জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা লাগাতে গেল। রাকিব আচমকা ঘুরে দরজায় উঁকি দিয়ে বলল,
" প্রয়োজনে রুম সাজিয়ে দিচ্ছি তবুও ছাদে বাসর করার প্ল্যান করিস না যেন!"
আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচাল, 
" যাবি... "

রাকিব হাসতে হাসতে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা বন্ধ করে মেঘের কাছে এগিয়ে আসলো। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
"ওনারা কত আনন্দ করছিল। আপনি ওনাদের ওভাবে তাড়িয়ে দিলেন কেনো?"

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
"ওদের আনন্দের থেকেও তোর সাথে কথা বলাটা জরুরি। "
মেঘ সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে শুধালো,
"কি কথা?"

ভয়ে মেঘের বুক কাঁপছে। বিকেল থেকে এখন পর্যন্ত ঘটা প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। আনমনে বলে উঠল,
" আপনি আবারও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন না তো?"

আজকের এই স্পেশাল দিনে মেঘের মুখে এমন আজগুবি প্রশ্নে আবির খুব বিরক্ত হলো। কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট করে বলল,
" তোর চোখের পাতায় কি লাগছে? দেখি, চোখটা বন্ধ কর তো।"

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে শুধালো,
"কি লাগছে?"

আবির এক সেকেন্ড দেরি না করে মেঘের লাল রঞ্জকে সুশোভিত ওষ্ঠে নিজের অধর ছোঁয়াল। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে সহসা চোখ মেলল মেঘ। স্বাভাবিকের তুলনায় দু’চোখ তিনগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। মেঘের হৃদয়ে তোলপাড় করা রঙবেরঙের অনুভূতিগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শ্বাসনালীতে ভয়ানক ঝড় চলছে । আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির আমর্শে মেঘের শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস মেঘের নাকে-মুখে লাগছে। মেঘ দু'হাতে আবিরের বুকের ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো। সরাতে তো পারলোই উল্টো আবির মেঘের উদর আঁকড়ে ধরে মেঘের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। আবিরের ঘনিষ্ঠতায় মেঘের প্রশস্ত আঁখি আরও বেশি প্রশস্ত হলো৷ আবির অন্য হাত দিয়ে মেঘের দু'চোখ বন্ধ করে দিল। আবিরের নিগূঢ় সংস্পর্শে মেঘের গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। ঘামে জবজবে মেঘের শরীর বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছে বারবার, মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস, কোনোকিছুই যেন আবিরের থেকে ছাড়াতে পারলো না মেঘকে। এভাবে কত মিনিট কেটেছে জানা নেই। আবির মেঘের অধর থেকে অধর সরিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেঘকে। মেঘের কানের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"এখন থেকে বাজে কথা বললে এভাবেই শাস্তি দিব। মনে থাকবে?"

মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,
"হু।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp