আলো গুলানো ধূসর অন্ধকার। ম্রিয়মাণ চাঁদটা পর্যন্ত নিষ্প্রাণ হয়ে গা ঢাকা দিয়েছে পশ্চিমাকাশে। সাব্বিরের অনাধুনিক ভাড়া বাসার জীর্ণ ফটকের পাশে হলদে বাতিটা যেমন মন খারাপ করে জ্বলছে ঠিক তেমনই নিস্তেজ অসহায়ত্বে পাথরের মতোন স্তব্ধ হয়ে বসে আছে সাব্বির। কিছুক্ষণ আগেই মিথিকে সে চূড়ান্ত অপমান করে এসেছে৷ অপমানটা করার সময় অবশ্য ব্যাপারটা বোধগম্য হয়নি। দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছুটে এসে যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, তার অনেকক্ষণ পর বোধোদয় হয়েছে। সত্যি বলতে, সাব্বিরের আজ আর অনুশোচনা হচ্ছে না। তার বদলে গাঢ় এক ক্লান্তিতে অবসন্ন লাগছে দেহ। মিথির মন খারাপ, মান-অপমানের কথাও ভাবতে ইচ্ছে করছে না। সহস্রবার মিথিকে একই কথা বুঝিয়েছে সাব্বির। অনুরোধ করেছে তাকে একলা ছেড়ে দিতে। সাব্বির কিছুদিন চুপিচুপি বেঁচে থেকে নীরবে বিদায় নিতে চায় এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে। এতোকিছু জেনে বুঝেও যদি মিথি শিশুদের মতোন জেদ করে তাহলে তার কী করার আছে? সে তো কোনো বস্তু নয়, মানুষ। হোক তার জীবন জটিলতায় ভরপুর। তারপরও সে মানুষ। অন্যান্য সকলের মতো তার বুকেও একটা হৃদয় আছে। তাতে ব্যথা হয়, ক্লান্তি আসে। কাঠের পুতুলের মতোন চাইলেই তাকে নাড়াচাড়া করা যায় না। চাইলেই সে হুট করে সমস্ত কিছু ভুলে নতুন মানুষ হয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে দুই হাতে মুখ ঢেকে চুপ করে বসে রইল সাব্বির। কত সময় পেরুলো, রাত্রি কখন ভোর হলো কিছুই টের পেল না। অনেকক্ষণ পর আচ্ছন্নতা ভুলে হঠাৎ মিথির গায়ের খুশবু পেল দরজার কাছে। জীবনে প্রথমবারের মতো মিথির খুশবু বিরক্ত লাগল তার। মিথির অস্তিত্ব, উপস্থিতি সমস্ত কিছু কারাগারের মতোন দমবন্ধকর মনে হলো। সাব্বির ভেবেছিল এই ভয়ংকর অপমানের পর মিথি চলে যাবে। তারপর আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
‘ সাব্বির?’
ডাকটা শুনে তিক্ততায় ভরে গেল সাব্বিরের বুক। আগের মতোই বসে থেকে আপ্রাণ চেষ্টায় নিজের বিরক্তি দমন করে মুখ তুলে তাকাল। সন্ধ্যার শাড়িটাই পরিপাটি করে পরেছে মিথি। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দেওয়ার ছাপ। চেহারায় কোনোরূপ মালিন্য নেই। একটু আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি যেন কেবলই সাব্বিরের অলীক কল্পনা এমন ভান করে সে বলল,
‘ সাহরির সময় তো শেষ হওয়ার পথে। আপনি এখনও বসে আছেন। রোজা রাখবেন না?’
সাব্বির দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে রইল। সাহরির কথা মনে পড়ে বাকশক্তিহীনের মতো উঠে দাঁড়াল। রোজার কথাটা তার মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। মিথি বলল,
‘ আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি টেবিলে খাবার গুছাচ্ছি।’
সাব্বির কিছু বলল না। মিথি চলে যেতেই কলের পুতুলের মতো নীরবে নিজের ঘরের দিকে এগুলো। ওয়াশরুমের ঝরনাধারার নিচে দাঁড়িয়ে, শীতল জলে শরীর ধুয়ে ফেলতে ফেলতে ফের মিথির জন্য ভারি মন খারাপ হলো তার। মেয়েটা কেন যে চলে যাচ্ছে না– ভেবে বুক চিরে বেরিয়ে এলো তপ্ত দীর্ঘশ্বাস। মিথি ততক্ষণে টেবিল গুছিয়ে ফেলেছে। খুব সমান্য আয়োজন। শিউলি ফুলের মতোন ঝরঝরে গরম ভাত, আলু করলা দিয়ে কাতলা মাছের ঝোল, চ্যাপা শুটকি ভর্তা আর ঘন ডাল। সাব্বির একটা চেয়ার টেনে বসে মিথির দিকে তাকাল। মিথি যে পুরো ঘটনাটাকে চেপে যাওয়ার অসাধারণ অভিনয় করছে। সেই অভিনয়কে ভন্ডুল করতে একটু সময় নিয়ে ডাকল,
‘ মিথি?’
মিথি পাতে খাবার তুলতে তুলতে সাব্বিরের দিকে না তাকিয়েই বলল,
‘ বলুন।’
সাব্বির বরফ শীতল কণ্ঠে বলল,
‘ আপনার মনে হচ্ছে না একটু আগে ঘটে যাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের কথা বলা উচিত?’
মিথি এবার চোখ তুলে তাকাল। ওই পদ্মফুলের মতোন সুন্দর চোখদুটো দেখে সাব্বিরের শক্ত চোয়াল না চাইতেও সহজ হয়ে গেল। রুক্ষ কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এল। বিরক্তির জায়গায় ভর করলো কাতরতা। অসহায় গলায় বলল,
‘ এভাবে সংসার হয় না মিথি।’
‘ কীভাবে হয় না সাব্বির? আমার তো খুব হচ্ছে।’
‘ একা একা সংসার হয়?’
‘ একা!’ অবাক হয়ে তাকাল মিথি। জানতে চাইল,
‘ আমার পাশে আপনি নেই বলছেন?’
সাব্বির প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
‘ আমি না থাকার মতোই মিথি।’
‘ তাহলে থাকার চেষ্টা করুন।’
সাব্বির অধৈর্য হয়ে বলল,
‘ আপনি কেন বুঝতে পারছেন না মিথি? এটা আমার চাওয়া পাওয়ার ব্যাপার না। আজ আপনি নিজেই দেখলেন, আমি চাইলেও এখান থেকে বেরুতে পারব না।’
মিথি হাসল। জিজ্ঞেস করলো,
‘ আপনি কখনো মন থেকে বেরুতে চেয়েছেন, সাব্বির?’
সাব্বির ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘ মানে?’
‘ আপনি বিশ্বাসই করে নিয়েছেন, আপনি একটা ভয়ংকর অভিশপ্ত জীবন কাটাচ্ছেন। এই অভিশাপ আপনাকে বয়ে বেড়াতে হবে মৃত্যুর আগপর্যন্ত। সেই অভিশাপ থেকে বেরুনোর কোনো চেষ্টা আপনি কোনোদিন করেননি। চাননি কোনোদিন। বলুন চেয়েছিলেন?’
সাব্বির কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলো৷ তারপর মিথির দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,
‘ চেয়েছিলাম। আজ আমি আপনাকে চেয়েছিলাম মিথি।’
মিথি খাওয়া থামিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকাল। তারপর তাকিয়েই রইলো কয়েক মুহূর্ত। নরম গলায় বলল,
‘ কেবল আজই চেয়েছিলেন? আর কখনো চাননি?’
সাব্বির সে কথার উত্তর না দিয়ে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। মিথি বসেছিল সাব্বিরের মুখোমুখি চেয়ারে। একটা হাত বাড়িয়ে সে হাত রাখল সাব্বিরের বাম হাতের ওপর। খুব কোমল চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ আমি আপনাকে ভালোবাসি সাব্বির। আমার ভালোবাসার চাইতে বড় হয়ে উঠবে এরকম কোনো ঘটনা আজ ঘটেনি। ঘটা সম্ভবও নয়। বিশ্বাস করুন, এই পৃথিবীতে যাই ঘটুক না কেন সবই আপনার প্রতি আমার ভালোবাসার কাছে নগন্য।’
সাব্বির চোখ ফিরিয়ে তাকাল। মিথির অসীম ভালোবাসা দু'হাত পেতে না নিতে পারার বেদনায় টলমল করে উঠল তার চোখ। রুদ্ধ গলায় বলল,
‘ আমার আজন্ম আফসোস মিথি। আপনার ভালোবাসা গ্রহণ করবার মতো যোগ্যতা আমার নেই।’
মিথির ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্ত গলায় বলল,
‘ বাংলা সিনেমার ন্যাকা ডায়লগ বলবেন না তো, সাব্বির। অসম্ভব বিরক্ত লাগে। আপনি তো নাটক-সিনামা দেখেন না। তারপরও এসব শিখলেন কোথা থেকে, বলুন তো?’
অকস্মাৎ মিথির আবেগের এই পরিবর্তনে হকচকিয়ে গেল সাব্বির। নির্বোধের মতো সে তাকিয়ে রইল মিথির মুখের দিকে। মিথি অসন্তুষ্ট হয়ে বলল,
‘ একটু আগে যা ঘটেছে তা নিয়ে এতো কাব্য করার কিছু নেই সাব্বির। একটা দীর্ঘ ট্রমা থেকে কেউ সিনেম্যাটিক ওয়েতে বেরিয়ে আসবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। আপনি তারপরও অনেকদূর এগিয়েছেন। আমি এতোদূর আশা করিনি। আমি ভেবেছিলাম চুমু খাওয়ার পরই আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন।’
এতোক্ষণের আবেগের বুদবুদ কাটিয়ে বাস্তবে ফিরে এলো সাব্বির। মিথি তার চিরপরিচিত রূপে ফিরে গিয়েছে। এই মিথি অপ্রতিরোধ্য। সাব্বির মিথির কথাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে অপ্রতিভ চেহারা নিয়ে নীরবে খাওয়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। মিথি তাকে কয়েক সেকেন্ড নিরীক্ষণ বলল,
‘ ইউ আর আ গুড কিসার। প্রথম এক্সপেরিয়েন্সেই এতো ভালো কী করে করলেন? ট্রমাতে থেকেই এমন দারুণ পারফরম্যান্স। ট্রমা কাটিয়ে উঠলে আপনার পারফরম্যান্সের সঙ্গে তো কেউ টক্করই দিতে পারবে না, সাব্বির।’
এই অপ্রত্যাশিত প্রশংসায় কেশে উঠল সাব্বির। অবাক বিস্ময় নিয়ে সে এই ঠোঁটকাটা রমণীর দিকে তাকাল। মিথি নির্বিকার গলায় বলল,
‘ একজন রোমান্টিক নারী হিসেবে আমার তো আপনাকে কোনোভাবেই ছাড়া উচিত না।’
সাব্বির কথা বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। ইতোমধ্যেই তার কান লাল হয়ে উঠেছে। মিথি তার লালচে ভাব বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ আপনি খেয়াল করেছেন? আপনার চুমুর ট্রমাটা কিন্তু কেটে গিয়েছে সাব্বির। আজ ঠোঁটে চুমু খাওয়ার পরও আপনি কমপক্ষে আধাঘন্টা বিভিন্ন জায়গায় চুমু খেয়েছেন। কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। তারমানে আপনার ট্রমা চুমুকে এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখছে না। আপনি এখন মাঝেমধ্যেই আমাকে চুমু খাবেন।’
সাব্বিরের বুকে ভাত আটকে গেল এবার৷ ডাঙায় খাবি খাওয়া মাছের মতোন হাঁসফাঁস করে বলল,
‘ মিথি প্লিজ!’
মিথি ভ্রু বাকিয়ে তাকাল। জানতে চাইল,
‘ প্লিজ ফর হোয়াট? এখনই চুমু খেতে চাচ্ছেন?’
সাব্বির কেঁশে উঠল আবার। মিথিকে চোখ রাঙাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে অসহায় গলায় বলল,
‘ আমরা কি চুপচাপ, মুখবন্ধ করে সাহরিটা শেষ করতে পারি মিথি? প্লিজ!’
মিথি অকৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বলল,
‘ আপনিই তো বললেন, একটু আগে যা হয়ে গেল তা নিয়ে আমাদের কথা বলা উচিত!’
সাব্বির হতাশ গলায় বলল,
‘ ভুল বলেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, এই ব্যাপার নিয়ে আমাদের কথা বলার আর কিছু বাকি নেই মিথি। আমরা চাইলেই আলোচনাটা থেকে সরে আসতে পারি।’
মিথি কাঁধ ঝাঁকাল। নিঃস্পৃহ গলায় বলল,
‘ এজ ইউর উইশ!’
ক্যালেন্ডারের পাতা বছর ঘুরে ফের এসে দাঁড়িয়েছে গ্রীষ্মের দোরগোড়ায়। তারপরও প্রকৃতিতে থেমে থাকেনি কুয়াশার মঞ্চায়ন। ভোরের বাতাসের সঙ্গে টিপটিপ করে ঝরে পড়ছে শিশিরবিন্দু। প্ল্যাটফর্ম ঝাপসা হয়ে আছে ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশায়। ঋতি একটি টং দোকানের বেঞ্চে বসে আছে। ফরসা চেহারায় অস্বস্তির লালিমা। ভদ্রলোক দুই হাতে দুই কাপ চা নিয়ে ঋতির থেকে বেশ অনেকটা দূরত্ব রেখে পাশের বেঞ্চটাতে বসল। হাত বাড়িয়ে ঋতির কাপটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘ আপনার চা।’
ঋতি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিলো। স্নায়ুবিক দুর্বলতা আর তীব্র অস্বস্তিতে সাথে সাথেই চুমুক দিলো চায়ের কাপে। সিরাপের মতো মিষ্টি চা। ঋতির মিষ্টি চা পছন্দ। বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন সে অসীম ধৈর্য নিয়ে মৌনির মতো তেতো চা খাওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেকদিন বাদে মিষ্টি চা পেয়ে সে যারপরনাই আনন্দিত হলো। গরম চা'ই এক চুমুকে অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল। তারপর যখন মুখ তুলে তাকাল আবিষ্কার করলো ভদ্রলোকটি চিত্রার্পিত ছবির মতোন তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঋতি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। ভদ্রলোক তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলো,
‘ আপনি মুসলিম?’
ঋতি যে মুসলিম এটা তাকে মুখে বলে দিতে হচ্ছে, মুখ দেখেই চট করে বুঝে ফেলা যাচ্ছে না – এতে যেন সে খুবই অপমানিত বোধ করলো। রুষ্ট গলায় বলল,
‘ মুসলিম হবো না কেন?’
ভদ্রলোক সে কথার উত্তর না দিয়ে বললেন,
‘ আপনি রোজা রাখেননি?’
ঋতি বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল মুহূর্তেই। সে অবশ্যই রোজা রেখেছে। ট্রেনে সাহরি খেতে হবে বলে বাড়ি থেকে খাবারও এনেছে। আর সকালে ঘুম থেকে উঠেই কি-না! ঋতি ব্যথিত চোখে তাকাল। জিজ্ঞেস করলো,
‘ আপনি মুসলিম নন?’
ভদ্রলোক ঠোঁট টিপে হেসে হাতের কাপটা নামিয়ে রাখল পাশে। ঋতি দেখল তার কাপে টইটম্বুর করছে চা। অর্থাৎ সে একবিন্দুও মুখে নেয়নি। রাগে ক্ষোভে কান্না পেয়ে গেল ঋতির। নিজের কাপটা নামিয়ে রেখে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
‘ আপনি.. আপনি তো খুব খারাপ মানুষ! নিজে খাননি অথচ আমার রোজাটা ঠিক ভেঙে দিলেন।’
এটুকু বলতেই চোখে প্রায় জল চলে এলো ঋতির। এই এক সমস্যা তার। অধিক রাগে মানুষ অগ্নিশর্মা হয়, ঋতি হয় জল। সে নিজের ক্রোধ ধরে রাখতে না পেরে রুদ্ধ গলায় বলল,
‘ আমার রোজা হয়নি। আপনার রোজাও হবে না। আল্লাহ দেখেছেন। যারা খারাপ কাজ করে তাদের রোজা হয় না।’
ভদ্রলোক ঋতির দুঃখকে সম্মান করে এতোক্ষণ হাসি চাপার অসীম চেষ্টা করলেও এবার হো হো করে হেসে উঠলেন। ঋতি রাগে কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে সরে গেল। ভদ্রলোক চায়ের দাম মিটিয়ে তার পিছু পিছু এসে বললেন,
‘ আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে। আমারও চা মুখে নেওয়ার আগমুহূর্তেই মনে পড়েছিল। আপনাকে বলার জন্য তাকাতেই দেখলাম অর্ধেক খেয়ে ফেলেছেন। আমি আসলে বুঝিনি, আপনি এতো ক্ষুধার্ত।’
ভদ্রলোকের ব্যাখ্যায় মনটা কিছুটা নরম হয়ে এলেও শেষ কথাতে ফের চটে গেল ঋতি। চোখ গরম করে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল৷ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন,
‘ খেয়েই যখন ফেলেছেন তখন আর রাগ করে কী হবে? চলুন আপনাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভারী কিছু খাওয়াই।’
ঋতি ফের রাগ নিয়ে তাকাল। ভদ্রলোক ঋতির ছেলেমানুষি রাগ দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। জানতে চাইলেন,
‘ কোন ক্লাসে পড়েন আপনি?’
ঋতি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
‘ আপনাকে কেন বলব?’
ভদ্রলোক হেসে ফেলে বললেন,
‘ আমার পাপের পরিধিটা বুঝার চেষ্টা করছিলাম আরকি। যদি প্রাইমারিতে পড়েন তাহলে দুটো রোজার হিসেবে রোজাটা করে ফেলতে পারেন। সেভাবে ভাবলে আমার পাপ হবে না, পুণ্যিই হবে।’
ঋতি ফের রাগ নিয়ে তাকাল। ভদ্রলোক হেসে পেছন ফিরে উল্টোপাশের প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকালেন। সেই প্ল্যাটফর্মের ট্রেনটা রওনা দেওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছে। ভদ্রলোক সেখান থেকে চোখ সরিয়ে একবার ঋতির দিকে তাকালেন। হেসে বললেন,
‘ থাকুন তাহলে।’
তারপর দ্রত পায়ে হেঁটে চলে গেল উল্টো পাশের প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উঠে গেল নির্দিষ্ট কামরায়। ঋতির দিকে তাকিয়ে ফের একটু হেসে হারিয়ে গেল রেললাইনের বাঁকে। এই মাত্র অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ট্রেনটির দিকে তাকিয়ে থেকে রাগ পড়ে গেল ঋতির। একটু শূন্য লাগল বুকের ভেতর। একজনকে জিজ্ঞেসা করে জানল, এটি ঢাকাগামী গাড়ি। লোকটি কি তবে ঢাকায় থাকে? নাম কি? কিছুই তো জানা হলো না আর!
—————
মিঠে মিঠে সকাল কাটিয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরের কোলে হেলে পড়েছে বেলা। নাহিদ তাদের কাওরানবাজারের অফিসে বসে আছে। অফিসের নামের সঙ্গে কাজের মিল না থাকলেও সাজসজ্জার অপূর্ব মিল রাখা হয়েছে। দেওয়ালে দেওয়ালে রং-তুলির কারুকার্য। চমৎকার সব গ্রাফিতি। হঠাৎ ঢুকে পড়লে মনে হবে এ যেন উৎসাহী ছেলেপেলেদের তৈরি নয়নাভিরাম সাংস্কৃতিক মঞ্চ। অফিসে ঢুকতেই বসার ঘরের মতোন প্রশস্ত একটা ঘর। সেই ঘরে কোনো আসবাব নেই। মেঝেতে সাধারণ কার্পেট বিছানো। অফিসের ছেলেরা সেখানে বসেই কাজকর্ম করছে। আদিব হোসেনের অফিসরুম, একটি আর্কাইভ রুম আর একটা কনফারেন্সরুম ছাড়া এই অফিসের কোনো ঘরেই বাড়তি কোনো আসবাব নেই। ডেস্ক নেই। ঘরের একপাশে রঙে কাজ করা কাঠের কিছু ফোল্ডিং টেবিল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ছেলেরা সে সকল টেবিল টেনে নিয়ে অখণ্ড মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করে চলেছে। বৈঠকখানার পাশে ছোট্ট একটা টেবিলে চা-কফির সারঞ্জম রাখা আছে। সেখানে সারাদিনব্যাপি চায়ের ব্যবস্থা চলতে থাকে। তার পাশে একটি টেবিলে রাখা আছে পিন্টার, একটি কম্পিউটার, সাউন্ড বক্স আর টুকিটাকি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। নাহিদ একটা টেবিলের কাছে বসে নতুন আর্টিকেলের কাজ গুছাচ্ছিল। সৌধ তার হাতের ফাইলটা গুটিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
‘ তুই কী করতে চাইছিস বল তো? এদের সঙ্গে সখ্যতা বাড়ানো এক কথা। আর ঝামেলার ফ্রন্টে চলে যাওয়া আরেক কথা। সেদিন চকবাজারে যে ঝামেলাটা হলো তুই ছিলি ফ্রন্টে। এর অর্থ কী? পুলিশি চক্করে পড়ার শখ হয়েছে খুব?’
নাহিদ জবাব না দিয়ে একবার কেবল মুখ তুলে তাকাল। সৌধ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ কথা বলছিস না কেন? আমার কিন্তু ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।’
নাহিদ অন্যমনস্ক চোখে সৌধর দিকে তাকাল। সৌধর চেহারায় বিরক্তি থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে শঙ্কিত। নাহিদ আজকাল অনেকখানি বদলে গিয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ একদম অন্যরকম মানুষ হয়ে উঠে সে। তখন তার ভাবনাচিন্তার কিছুই ঠাওর করতে পারে না সৌধ। নাহিদ যেন সর্বদা একটা ছাঁচ খুঁজে বেড়াচ্ছে। যে ছাঁচে সে নিজেকে ঢেলে দিয়ে ভাসিয়ে দিবে ভবিষ্যৎ। সেটা ভালো নাকি মন্দ সে ব্যাপারে নাহিদকে বিশ্বাস করার উপায় নেই। সৌধর ভয় হয় এসবের চক্করে পড়ে নাহিদ কোনো নষ্ট ছাঁচে নিজেকে বেঁধে না ফেলে। সৌধ নাহিদের দিকে ফিরে বসে একটু বুঝানোর সুরে বলল,
‘ দেখ ভাই! এখন টেকনোলজির যুগ। কোথায় কী হচ্ছে সব নথিভুক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্যামেরায়। চকবাজারের ঝামেলাটার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে চলছে। ওই ভিডিওতে যারা আছে তারা সকলেই সামাজিক দিক থেকে অপরাধী। আমরা অপরাধ নিয়ে কাজ করবো বলেছিলাম, অপরাধী হয়ে উঠব এরকম কথা ছিলো না।’
নাহিদ এবার মুখ খুলল। বলল,
‘ ওই ভিডিওতে আমাকে দেখা যায়?’
সৌধ একটু থমকাল। ভেবে দেখল আসলেই সেই ভিডিওতে নাহিদের মুখ আসেনি। একটি ভিডিওতে এক ঝলকের জন্য পেছন দিকটা এলো তাতেই চিনে ফেলেছে সৌধ। তাছাড়া সৌধ জানতো নাহিদ ওখানে আছে। নাহিদ কতটা ক্ষিপ্র ভেবে মনে মনে কিছুটা বিস্মিত হলেও ফুঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
‘ তারপরও এতো ফ্রন্টে যাওয়া উচিত না, বন্ধু। আজকে লাক ফেভার করেছে কাল নাও করতে পারে।’
‘ লাক!’ বলে হাসল নাহিদ। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
‘ আমি একটা জিনিস উপলব্ধি করেছি জানিস?’
সৌধ জানতে চাইল,
‘ কী জিনিস?’
‘ প্রেমকে জানতে হলে যেমন প্রেমের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়। অপরাধকে বিশ্লেষণ করতেও অপরাধের ভেতরে পৌঁছানো জরুরি। প্রত্যেকটা অপরাধের ভেতরে ঢুকে তার রহস্যভেদ না করলে তাকে বুঝার ক্ষমতা তোর হবে না। তাই অপরাধের খুব কাছে যেতে হবে। প্রেমিকার বুকের তিল দেখতে হলে যতটা কাছে যেতে হয়, ঠিক ততটা। এতোখানি ঘনিষ্ঠ হলে গরম নিঃশ্বাসের খানিকটা তাপও তো নিতেই হবে, সৌধ।’
সৌধ নাহিদের এমন গাঢ় দার্শনিক কথাবার্তায় অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ মানে!’
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে ফিরে গিয়ে বলল,
‘ মানে, কিছু না। এই সুহানা মেয়েটা তো বেশ ভালো কাজ করছে৷ তার বিশ্লেষণ পড়ে বেশ মজা পাচ্ছি। কয়েকটা এঙ্গেল ঠিক করলে একদম টপনচ কোয়ালিটি হবে। এই বিষয়গুলো ওকে ইনফর্ম করে দে তো সৌধ।’
সুহানার প্রসঙ্গ আসায় নাহিদের আগের কথার রেশ থেকে বেরিয়ে এলো সৌধ। মনে পড়ল সুহানার সেদিনের আচরণ। বলল,
‘ তুই নক কর। তুই আরও ভালো এক্সপ্লেন করতে পারবি বিষয়টা। আমি তোরটা শুনে বলব। আর তুই নিজে জানিস কোথায়, কতটুকু দরকার।’
নাহিদ কয়েক সেকেন্ড ভেবে মাথা নাড়ল। বলল,
‘ ঠিক আছে। দেখছি।’
নাহিদ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে সিভি থেকে নাম্বার নিয়ে সরাসরি কল করলো সুহানার মোবাইলে। ফোন রিসিভ হলো একটু সময় নিয়ে। ওপাশে ফোন তুলতেই নাহিদ গমগমে গলায় বলল,
‘ হ্যালো, আমি নাহিদ বলছি। সুহানা বলছেন?’
হঠাৎ নাহিদের ফোন পেয়ে কিছুটা হকচকিয়ে গেল সুহানা। কণ্ঠে তার বিন্দুমাত্র ছাপ না ফেলে বলল,
‘ নাহিদ! ম্যাগাজিন থেকে?’
নাহিদ বলল, ‘জি।’ তারপর খুবই স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
‘ আপনার লেখা পড়ছিলাম। চমৎকার কাজ করছেন।
কয়েকদিনেই এতো দারুণ ইমপ্রুভমেন্ট এনেছেন যে আমি বিস্মিত।’
অকৃপণ প্রশংসার সাথে সংশোধনের জায়গাগুলোও খুব সাবলীলভাবে বলে গেল নাহিদ। সুহানা যারপরনাই মুগ্ধ হলো। নাহিদকে সে খুবই নাকউঁচু ধরনের ছেলে ভেবেছিল। ধারণা করেছিল নাহিদ সুহানার সঙ্গে একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা আরম্ভ করেছে। নিজের বুদ্ধিমত্তাকে সুহানার যোগ্যতার চাইতে উপরে রাখতে চাইছে। কিন্তু নাহিদের ভানহীন, নিরহংকার কথায় সে ধারণাও ভুল প্রমাণিত হলো। এই আত্ম-উপলব্ধিতে একটুও মন খারাপ হলো না সুহানার। রাগ হলো না। বরং ভেতর ভেতর খুবই আরামবোধ করল। ছেলেটাকে অযথা ঈর্ষার চোখে দেখেছে বলে কিছুটা অনুশোচনা থেকেই তার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হলো। বলল,
‘ আপনি কিছু না মনে করলে একটা প্রস্তাব দিতে পারি?’
নাহিদ বলল,
‘ জি, অবশ্যই। বলুন।’
‘ লন্ডনের ইউনিভার্সিটিতে আমার কিছু বাঙালি বন্ধু আছে। কয়েকজন ব্রিটিশ বন্ধু ও ক্রিমিনোলজি নিয়ে গবেষণা করা প্রফেসরের সঙ্গে পরিচয় আছে। ওরা সবসময়ই নতুন কিছুর খোঁজে থাকে। আপনাদের ম্যাগাজিনটা আদতে সাধারণ হলেও এর কাজের ধরনটা আমার কাছে বেশ চমকপ্রদ লাগছে। আমি যদি ওদের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি তারা খুব আগ্রহের সঙ্গে এখানে কাজ করতে রাজি হবে বলে আমার বিশ্বাস। আপনারা যদি চান তাহলে আমি তাদের এপ্রোচ করার চেষ্টা করতে পারি।’
নাহিদ এরকম কোনো প্রস্তাব আশা করেনি। সে একটু ভেবে বলল,
‘ শিওর। তবে তারা যদি কাজ করতে রাজি হয় সেক্ষেত্রেও আমাদের অফিসাল ফর্মালিটিস একই থাকবে। আমরা আগে তাদের সঙ্গে কথা বলব। আমাদের কাজের ধরনের সঙ্গে মিললেই কেবল আমরা তাদের কনফার্ম করতে পারব। এই প্রসেসে আপনি কোনোভাবে তাদের কাছে অপ্রস্তুত হবেন না তো?’
সুহানা বলল,
‘ না, না। তারা খুবই চমৎকার মানুষ। অফিসিয়াল ফর্মালিটিসের ব্যাপারে তারা খুবই রেসপেক্টফুল।’
‘ গ্রেট। থেংকিউ সুহানা। আপনি তাহলে কথা বলে দেখুন।’
কোনো এক অজানা কারণে মনে মনে খুবই উচ্ছ্বসিত বোধ করলো সুহানা। ফোন রেখে দেওয়ার আগমুহূর্তে ফের বলল,
‘ আরেকটা কথা।’
নাহিদ শান্ত গলায় বলল,
‘ জি, বলুন।’
সুহানা একটু ইতস্তত করে বলল,
‘ আমি কি আপনাদের অফিসে আসতে পারি? টিমের বাকিরা কেমন কাজ করছে সেসব এক্সপেরিয়েন্স করে, তাদের সাথে সখ্যতা হলে সম্ভবত আমি আমার কাজের সঙ্গে আরও ভালো রিলেট করতে পারব।’
নাহিদদের অফিস সম্পর্কে সুহানার কোনো কালেই কোনো আগ্রহ ছিলো না। তারপরও এই অদ্ভুত আবদার সে কেন রাখল– নিজেকে সেই প্রশ্ন করার আগেই নাহিদ হেসে ফেলে বলল,
‘ অবশ্যই আসতে পারেন। এটা তো আপনারও অফিস সুহানা। এখানে আসতে আপনার কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। আপনি প্লিজ আসুন।’
নাহিদ এতো আন্তরিক কণ্ঠে কথাটুকু বলল যে খুশিতে ঝুমঝুম করে উঠল সুহানার মন। কেন সে অফিস যেতে চাইছে, কেন সে ময়ুরের মতোন পেখম মেলতে চাইছে অধিক আনন্দের বর্ষণে– সে কথার উত্তর সুহানা জানে না। সে কী নাহিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে? নাকি এটা তার প্রাথমিক বিজয়ের আনন্দ?
·
·
·
চলবে……………………………………………………