কামিনী - পর্ব ৮৩ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          হুট করে তীর্যক আলো চোখে প্রবেশ করতেই জ্ঞান ফিরল রানির। ঘাড়ে হওয়া তীব্র ব্যথা নিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখলেন তিনি শুয়ে আছেন এবড়োখেবড়ো মেঝেতে। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন তিনি মূলত আছেন কোথায়। ধীরে ধীরে তার মনে পড়তে শুরু করল অতীতের দৃশ্য। তাকে তো প্রখাণ্ড রাজ্যের সেনাপতি আটক করে ছিলেন। এরপর তিনি হ্যাব্রোকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে ছিলেন তার কাছে। তারপর ওরা কি ছেড়েছিল হ্যাব্রোকে? ঠিক মনে করতে পারছেন না তিনি। 

  চোখের ঝাপসা ভাব কাটতেই উঠে বসলেন। সরাসরি দৃষ্টি প্রাচীরে পড়তেই চমকে উঠলেন কিছুটা। হ্যাব্রো এক দিকে হাঁটু বুকের সামনে চেপে বসে তারই দিকে তাকিয়ে আছে। তাকেই দেখছে। 
রানি বলে উঠলেন,
“তুমি রাজ্যে ফিরে যাওনি! ওরা তোমাকে ছাড়েনি?”

 হ্যাব্রো চোখ নামিয়ে ধীর স্বরে উত্তর দিলো,
“ওরা চলে যেতে বলেছিলো।”

 “তাহলে যাওনি কেন?” রানির চোখে-মুখে বিস্ময়। হ্যাব্রোর সেই উত্তর দিতে গিয়ে মুখটি আরও ঝুঁকে গেলো,
“আপনাকে ছেড়ে আমার তো কোথাও যাওয়ার কথা ছিলো না।”

 “কীসব আবেগি কথা বলছো তুমি! এই আবেগ দিয়ে বাস্তবতা চলে?”

“আবেগ কি-না জানি না। কিন্তু রাজ্যে যখন সেনাপতি হয়ে শপথ গ্রহণ করেছিলাম তখন বলেছিলাম, যেকোনো মূল্যে, যেকোনো গন্তব্যে আমি রানির পাশে থাকব। তার শেষ নিঃশ্বাস অব্দি তাকে রক্ষা করব। সেই শপথ ভেঙে কোথায় যাবো? আমার ভুল মার্জনা করবেন। আমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার মতন বেইমান নই।”

 হ্যাব্রোর উদার মানসিকতা সম্পর্কে রানি অবগত ছিলেন। তাই বলে এতটা উদার হবে? নিজের জীবন এভাবে ঝুঁকিতে ফেলবে? না, রানি তা কখনোই হতে দিবে না যে। এমন যোগ্য সেনাপতি যদি এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সিংহাসনে বসে তবে তার প্রজারা যোগ্য শাসক পাবে। রাজ্য সঠিক মানুষের হাতে থাকবে। তার সাথে সাথে হ্যাব্রোরও যদি কিছু হয় যায় তবে রাজ্যের প্রজাদের অবিভাবক কে হবে? কে ওদের পরিচালনা করবে?

  রানি এবার বেশ রাগান্বিত হলেন, “তোমাকে তো আমি আজ্ঞা করেছিলাম চলে যেতে। আমার আজ্ঞা অমান্য করার সাহস দেখালে কীভাবে?”

 “রাজ্যের বিধিমালাতেই ছিলো, সবকিছুর উর্ধ্বে রানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। এরপর সব। তাই আপনার আজ্ঞার চেয়েও রাজ্যের বিধিমালাকে আমি গুরুত্ব দিয়েছি। আপনার যা শাস্তি দেওয়ার দিবেন তাতে কোনো নিষেধ নেই আমার।”

 রানি আপত্তি করতে গিয়েও আর আপত্তি করতে পারলেন না। ঝিম কেটে বসে রইলেন বহুক্ষণ। তারা দু'জন প্রখাণ্ড রাজ্যের কারাগারে বন্দী। প্রখাণ্ড রাজ্যের রাজা ননীকান্তের সাথে তাদের বহুদিনের বিরোধ। ননীকান্তের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ করে দিয়েছিলেন রানি। কেবল তা-ই নয়, বেশ কিছু রাজ্যের সাথে ননীকান্তর বিরোধ তিনিই তৈরি করেছিলেন। তা-ও অকারণে নয়। রানিকে তিনি কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে। আজ রানি তার হাতের মুঠোয়, চাইলেই ননীকান্ত অনেককিছুই করতে পারে। রানির জন্য না হ্যাব্রোর প্রাণটা যেতে বসে!

  “আপনি কেন স্বেচ্ছায় ওদের কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন, রানি? আপনি তো চাইলেই এই সামান্য কিছু সৈনিকদের সাথে লড়াই করতে পারতেন। আপনাকে বন্দী করা যে এতটা সহজ নয়। তাহলে কেন ধরা দিলেন!”
 মাথা নত করে প্রশ্নবাণে রানিকে বিদ্ধ করল হ্যাব্রো। রানি নিশ্চুপ রইলেন। তিনি কেন নিজেকে সমর্পণ করে ফেলেছিলেন সেই মুহূর্তে তা এখন তারও ভেতর প্রশ্ন জাগাচ্ছে যে। একান্তই তার যদি সবকিছু ছেড়ে কোথাও নিরুদ্দেশ হওয়ার হতো তাহলে তিনি যেকোনো স্থানে চলে যেতে পারতেন। অন্য কারো কাছে শেষমুহূর্তে কেনই বা নিজেকে বন্দীনি করলেন! তার নামের সাথে কি সেই সমর্পণ আদৌ মানানসই?

 তার ভেতরে থাকা দুর্বল সত্তাটি তখন যেন চিৎকার করে উঠল। বারংবার মনে করিয়ে দিলো, নাম? কীসের নাম? কোন পরিচয়ের কথা ভাবছে সে? যে পরিচয় গড়ে উঠেছিলো একটি মিথ্যের উপর সেই পরিচয়? যেই রাজা কেশবচন্দ্রকে নিজের পিতা বলে জানতো তিনি তো আদতে তার কেউ নন! সেই রাজার রাজ্য তার কী করে হয়? সে রাজার পরিচয় তার কী করে হয়?

  রানি হ্যাব্রোর মুখের দিকে তাকান, ভগ্ন স্বরে বলেন,
“আমার হার স্বয়ং স্রষ্টা লিখেই রেখেছেন। আর যুদ্ধ করবো কীসের জন্য? যার গোটা জন্ম ভুলে গড়া তার আর কীসের লড়াই?”

 “সামান্য পিতৃ পরিচয়ের বিভ্রান্তিতে এতটা ভেঙে পড়লেন আপনি, রানি? সত্যি করে বলুন তো, রাজা কেশবচন্দ্র আপনার পিতা- সেই পরিচয়টি কি আদৌ আপনাকে স্বস্তি দিতো? আপনার সেই পরিচয়ে কখনো গর্ব হয়েছিলো?”
 হ্যাব্রোর পর পর করা প্রশ্নে দমে আসেন রানি। সত্যিই তো, কেশবচন্দ্রের পিতৃ পরিচয় তো কখনোই তিনি স্বীকার করেননি। সবসময় ঘৃণা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও, একটা তো পরিচয় ছিলো!

  “গর্ব হয়নি। কিন্তু একটা গতিতো ছিলো। একটা ভিত্তি তো ছিলো আমার। আজ আমার কী আছে বলো? পায়ের নিচের মাটিটাতেও ভয় হচ্ছে দাঁড়াতে।”

“আপনি কবে থেকে লোক, সমাজের ভাবনা নিয়ে এত ভাবতে লাগলেন? যদি ধরিও আপনার পিতৃ পরিচয় নেই, তাতে আপনার তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না। আপনি ভীত হচ্ছেন কেবল এই ভেবেই যে লোকে জানলে কী হবে। প্রজারা যদি জানে তাদের রানির জাত, কুল নিয়ে সংশয়, ধোঁয়াশা তাহলে তারা আপনাকে অশ্রদ্ধা করতে পারে, অসম্মান করতে পারে। কেবল এতটুকু ভাবনায় কি-না নিজেকে ভেঙেচুরে ফেললেন? রানি কামিনীকাঞ্চনের বৈশিষ্ট্য কি এই ছিলো? এক লহমায় সব ভুলে গেলেন? আপনি কোথা থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কীভাবে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলেন নিজের গুণে তা সব ভুল হয়ে গেলো নিছক কিছু কথা, কিছু বিবৃতিতে? একটাবার ভালো করে ভাবতে ইচ্ছে হয়নি? মনে হয়নি তাদের কথাতেও কোনো মিথ্যে থাকতে পারে?”

 হ্যাব্রোর পর পর বলা প্রতিটি যৌক্তিক বাক্য রানির অন্তরে গিয়ে তীরের বেগে বিঁধল। সত্যিই তো! আজ হ্যাব্রো যেসকল প্রশ্ন তাকে করছে তা তিনি একটিবার কেন নিজে ভাবলেন না? সত্যিই কি তিনি কেবল পিতৃ পরিচয়ের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন? না তো। তিনি নিজেকে নিজে গড়েছিলেন এমন করে। নিজের স্বামীকে হত্যা করে, নিজের পিতাকে হত্যা করার মতন ঘটনা সবার ভেতর গেঁথে দিয়ে তিনি এমন ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবার কাছে অদ্ভুত একজন রানি হয়েছিলেন। তাহলে আজ সেই পরিচয় তিনি ভুলতে বসলেন কীভাবে? তা-ও সব কথাগুলো বিশ্বাস করে?

  তার মাথা ফেটে যায় চিন্তায়। কূল খুঁজে না পেয়ে পুনরায় হ্যাব্রোর দিকে তাকিয়ে শুধালেন, “বিশ্বাস কেনই বা করব না তাদের কথা? বড়ো কক্ষ জুড়ে আমার মাতার চিত্র টাঙানো। জন্মের পর মাতাকে দেখিনি। আদৌ আছে কোথায় জানি না। সমস্তই তো যেন একের সাথে অপরে সংযোগ আছে।”

 “যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে আপনি তাদের কাছে আপনার মাতার খোঁজ করতেন। নিজের মাতার থেকেই জানতেন সবটা! আপনার পিতার খোঁজ আপনার মাতার চেয়ে ভালো আর কেউ কি দিতে পারতো? তাহলে আপনি নিজের মাতার খোঁজ চাইলেন না কেন?”
 রানি এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। তাই তো! তিনি নিজের মাতার খোঁজই তো করলেন না। এক লহমায় নিজের ভাবনাতে একটি জগৎ তৈরি করে সেই জগতের দুঃখে ভেঙে পড়লেন। এমন অযৌক্তিক কাজ কেমন করে করলেন? তার যা করার কথা ছিলো সেটি না করে কি-না শেষমেশ বন্দী হয়ে পড়ে রইলেন? এ কেমন কাজ হলো? এতটা নির্বোধের মতন ভাবনা তার? কীভাবে জন্ম নিলো সেই নির্বোধের ভাবনা?

 রানিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে হ্যাব্রো উঠে দাঁড়াল। ভরসা দিলো অভিজ্ঞ ভঙ্গিমায়। বলল,
“আমি জানি তখন আপনি জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সময়ে ছিলেন। তাই হয়তো এতটা ভেঙে পড়ে ছিলেন। কিন্তু আমরা চাইলে তার শেষ অব্দি যেতে পারব।”
 রানিও এবার উঠে দাঁড়ালেন হ্যাব্রোর সাথে। শরীরটা বেশ দুর্বল লাগলেও তেমন গা করলেন না সেই অসুস্থতা। বরং এক বুক সঞ্চিত সাহস নিয়ে বললেন কেবল,
“অবশ্যই যেতে হবে আমাদের, হ্যাব্রো। পুরো সত্য না জেনে যে আমি কোথাও যেতে পারব না। এমন অস্বচ্ছ রাখতে পারি না আমি নিজের জীবনের একটি অধ্যায়। তুমি আমাকে সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছ, হ্যাব্রো। তুমি আমাকে পথ দেখিয়েছ।” 

 “এত ক্ষমতা আমার হয়নি যে, রানি। আপনার পথ আপনার সামনেই ছিলো কিন্তু আপনি সাময়িক ভাবে এতটা দুঃখে নিজেকে জর্জরিত করে নিয়ে ছিলেন যে, সেই পথ দেখতে পাননি। আমি তো সামান্য মানব।”

  রানি হ্যাব্রোর প্রতি আরও বেশি কৃতজ্ঞ হলেন অথচ প্রকাশ করতে পারলেন। অনুভূতি দমিয়ে রাখতে রাখতে আজ এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছেন যে, অনুভূতি আর চাইলেও তিনি প্রকাশ করতে পারেন না। 

 তাদের কারাগারের নিস্তব্ধতা বহুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর হুট করে সেই স্থান সরব করে, সেখানে উপস্থিত হলো প্রখাণ্ড রাজ্যের রাজা। কেবল সে একা নয়, তার আশেপাশে তার সেনাপতি, মন্ত্রী, সৈন্যদের অভাব নেই। রানি তখন বসে ছিলেন এক কিনারায়। হ্যাব্রো ছিলো দাঁড়িয়ে। যেন এই বন্দী কারাগারও দমাতে পারেনি তার দায়িত্ব। 

  রাজা ননীকান্ত এসে দাঁড়াল কারাগারের ঠিক সামনে। মুখে কুটিল হাসিটি লেগেই আছে। সেই হাসি দিয়েই অস্বস্তিতে ভরিয়ে ফেলল পরিস্থিতি। রানির চোখ-মুখ শক্ত। একটি বারের জন্যও উঁচু পাথরটি থেকে উঠলেন না। ঠাঁই বসে রইলেন। যেন কোনো রাজা এসেছে তা তাকে কোনো প্রভাবই ফেলেনি।

 “সেই তেজ, সেই অহংকার আজও?” রাজার তাচ্ছিল্য করা প্রশ্নে রানি সরাসরি তাকালেন রাজার চোখে চোখ রেখে। বাঁকা হাসলেন রাজাকে বিব্রত করতে,
“অহংকার থাকবে না-ই বা কেন?”

 “তুমি আমার কাছে বন্দী। তা কি ভুলে যাচ্ছ?”

“তুমি নয়, আপনি সম্বোধন করুন।” হ্যাব্রো খ্যাপে উঠল। রাজা কপাল কুঁচকে ফেলল। রানি এবং রানির সেনাপতি এই কারাগারে বন্দী থাকার পরেও তার সাথে আগের মতোই তুচ্ছতাচ্ছিল্য আচরণ করাতে তার রাগ হলো অধিক। 

 “আপনি সম্বোধন না করলে কী করবে?”

 “জিভ ছিঁড়ে ফেলব।” রানি এবার পাথরে টান টান হয়ে বসে বললেন। সেই একই রকম টান টান বাহু, বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছেই না তিনি বন্দীনি। মনে হচ্ছে যেন রাজসিংহাসনেই বসে আছেন। হ্যাব্রো মনে মনে রানির এই ভঙ্গিমা দেখে মুগ্ধ হয়। যেই মানুষটা পাথরে বসলেই রাজসিংহাসন মনে হয়, কারাগারে থাকলেও রাজবৈঠকখানার মতো তীব্র তেজ ধারণ করেন কণ্ঠে সেই মানুষটা কি-না সামান্য একটা পরিচয়ে এতই ভেঙে পড়েছেন? সামান্য পিতার পরিচয়ে আজ তিনি রাজত্বের, নিজের রানিত্বের অহংকার নিয়ে দ্বিধান্বিত? 
 স্বয়ং স্রষ্টা তাকে রাজমুকুট দিয়ে পাঠিয়েছেন অথচ তিনি মানব জনম নিয়ে কি-না নিজেকে যাচাই করছেন? 

ক্রোধে গর্জন করে উঠে রাজা ননীকান্ত, “এক বিন্দুও তেজ কমাননি! আমার জিভ ছিঁড়ে ফেলবেন? তার আগে আপনারই না প্রাণনাশ হয়।”

  “রানি কামিনীকাঞ্চনের প্রাণ নেওয়ার মতন বুকে সাহস নিয়ে এই পৃথিবীতে কেউ জন্মায়নি। তুমি কোন ছাড়!”
রানির জ্বালাময়ী কথায় আর টিকতে পারল না ননীকান্ত। সে পারে না এখুনি রানির গর্দান নিয়ে নেয়। কিন্তু তার মন্ত্রী তাকে থামিয়ে দিল। থেমে কিছুক্ষণ নিজেকে সামলে নেয় সে। কণ্ঠে এবার ক্রোধের জায়গায় ধরা দেয় বিজয়ীশক্তি। হাসতে হাসতে বলে,
“কাল আপনার মৃতদেহ আপনার রাজ্যে পাঠাবো। তারপরেই নাহয় দেখব আপনার এত তেজ থাকে কোথায়। এই রাত্রিটুকু কাটতে দেন কেবল।”

  হ্যাব্রো এবার লোহার শিকের নিকটে এসেই শিকের ফাঁকা গলিয়ে চেপে ধরে রাজার টুটি। আচমকাই। 
হুট করে হওয়া এই আক্রমণে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সকলে। দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে হ্যাব্রো,
“তুই রানির মৃতদেহ পাঠাবি? ঠিক মতো নিজেকে পুরুষ দাবী কর তারপরতো! রানি তোর রাজ্যে নিজে এসেছেন, নিজে তোর কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছেন আর সেই রানিকে বন্দী করে তুই নিজেকে পুরুষ ভাবছিস? তোর পুরুষত্বে থু রইল। পারলে রানিকে ছেড়ে দেখা। রানিকে তার রাজ্যে ফেরত পাঠিয়ে এরপর সেই রাজ্য থেকে তাকে নিয়ে আয়। দেখব তোর ক্ষমতা কতটুকু।”

  হ্যাব্রো এতটাই জোরে রাজার টুটি চেপে ধরেছে যে রাজার চোখ প্রায় উল্টে এলো। মন্ত্রী দিক্বিদিক ভুলে দ্রুত কারাগার খুলে সেনাপতি আর সৈন্যদের পাঠাল। রানি বসে রইলেন। হ্যাব্রো তার ব্যাপারে টু শব্দও সহ্য করতে পারে না তা তিনি জানেন। সেনাপতিসহ তিনজন সৈন্য মিলে হ্যাব্রোকে টেনে ছাড়ালো বহু কষ্টে। ছাড়িয়ে নিয়ে এলো বাহিরে। কারাগার আটকে দেওয়া হলো পুনরায়।

  রাজা যেন মরতে মরতে বাঁচল। হ্যাব্রোর থেকে ছাড়া পেয়ে কাশতে লাগল অনবরত। এই বুঝি প্রাণই চলে যাচ্ছিলো। এদের এত সাহস!
কাশতে কাশতে নিজের ক্রোধ দমন করে রাখতে পারল না আর। তলোয়ার বের করে আঘাত বসিয়ে দিল হ্যাব্রোর বাহুতে। রানি এবার উঠে দাঁড়ালেন। উৎকণ্ঠা আর রাগ মিলেমিশে গেলো তার কণ্ঠে,
“এই ননীকান্ত, আমার সেনাপতি গায়ে আর একটা আঘাতও করবি না। তুই বুঝতে পারছিস না তোর অবস্থা কী হতে পারে। কাপুরুষের কাজ পেছন থেকে আঘাত করা আর অস্ত্রবিহীন মানবদের আঘাত করা। তুই বরাবরই কাপুরুষ ছিলিস আজ তা আবার প্রমাণ করছিস। পুরুষত্ব থাকলে আমাদের হাতে তলোয়ার দে এরপর আঘাত কর। তলোয়ারেরও প্রয়োজন নেই আমাকে কেবল এখান থেকে বের কর এরপর তোদের রাজ্যে দাঁড়িয়ে তোদের সমস্তদের গর্দান নিয়ে সেই র ক্তের উপর দিয়ে আমি আমার রাজ্যে যাব, প্রতিজ্ঞা করছি। আমাকে একবার বের হতে দে।”

  রানির সেই ভয়ঙ্করী কণ্ঠে রাজার সাহস হয় না তাকে মুক্ত করে যুদ্ধের আহ্বান করার। সে বরং রানির শক্তির আঁধার হ্যাব্রোকে বেছে নেয় রানিকে দুর্বল করার জন্য। 
“বন্দী যেহেতু হয়েছেন একেবারে মৃত্যুর পর মুক্তি পাবেন, রানি কামিনীকাঞ্চন। এই, এর সেনাপতিকে নিয়ে চলো। প্রথম মৃতদেহটা না-হয় এর সেনাপতিরই পাঠাবো। তারপর দেখবো রানির তেজ থাকে কোথায়। তড়পে তড়পে মারবো।”

  রানি উৎকণ্ঠা ও আক্রমণাত্মক হয়ে পড়েন। লোহার শিকে ক্রমান্বয়ে আঘাত করতে করতে বলেন,
“আমার সেনাপতির যদি কিছু হয় তাহলে আমি একটাকেও ছাড়ব না। তোর এই রাজ্য ধূলোয় মিশিয়ে দেবো। ওর বিন্দুমাত্র ক্ষতি হলে তোদের আগামী সাত পুরুষ অব্দি আর এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারবে না। যেখানে যত সম্পর্কের শেঁকড় আছে তোদের সেই সমস্ত রাজ্যসহ ভেঙেচুরে চুরমার করে দেবো। তোদের বংশীয় নামও থাকবে না পৃথিবীতে এমন ভাবে সব ধূলিসাৎ করব। আমাকে একটিবার কেবল বের হতে দে।”

 রাজা ননীকান্ত হা হা করে হেসে উঠল, “আর বের হতে পারলে তো! পরের বার জন্ম নিয়ে না-হয় করবেন সেসব।”

  “আমি একবারই জন্মাই। আর পৃথিবীর ধ্বংসের অন্তিম মুহূর্ত অব্দি বাঁচি। রানি কামিনীকাঞ্চনের নাম কখনো মরে না। তার ক্ষমতা কখনো মরে না। তুই ভুল করছিস। ননীকান্ত, তুই জানিসও না তোর জন্য কী অপেক্ষা করছে।”

“ঠিক আছে। দেখি তাহলে কী করতে পারেন আপনি। সেনাপতি কাটা মস্তকটা না-হয় সর্বপ্রথম আপনাকেই দেখাব।”
 কথা শেষ করেই সকলকে ইশারা করে বেরিয়ে গেলো রাজা। সেনাপতিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলো সৈন্যসামন্ত। হ্যাব্রো ছোটার অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু এতজন মিলে তাকে ধরেছে যে ক্রমশই সে চেষ্টা বৃথা হলো। 

 রানি কারাগার থেকে চিৎকার করতে লাগলেন, “ননীকান্ত তুই ভুল করছিস। তুই জানিস না তোর অন্তিম সময় লিখা হয়ে গিয়েছে। আমার সেনাপতির কিচ্ছু হলে তোরা একজনও প্রাণে বাঁচবি না।”

  হ্যাব্রো রানির সেই অসহায়ত্ব ভরা চোখ, উৎকণ্ঠায় আর রাগে ভরা কণ্ঠকে আশ্বস্ত করল। যেতে যেতে বলল, “আমার যা-ই হোক তাতে আপনি নিজের এক পা-ও পিছু নিবেন না। এই রাজা ননীকান্ত আজ আপনাকে যে যে অপমান করেছে তার সমস্ত কিছুর হিসেবে নিবেন। তাকে মাটিতে মিশিয়ে দিবেন, রানি। তার শেষ চিহ্ন অব্দি মুছে দিবেন।”

 রানি চিৎকার করতে লাগলেন কেবল হ্যাব্রোর নাম নিয়ে। হ্যাব্রোকে হারানোর ভয় ঝেঁকে ধরেছে তাকে। হ্যাব্রোর ক্ষতি করে ফেলবে ওরা। নির্ঘাত করবে। কারণ ওরা জানে হ্যাব্রো রানির শক্তিরই একটা অংশ। 
চিন্তায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে রানির। তার ঠিক মনেও পড়ছে না কতক্ষণ তিনি জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন। তিনদিন কি হয়ে গিয়েছে? হয়ে গিয়ে থাকলে হেমলক অব্দি তো পথ্র পৌঁছানোর কথা। না-কি হয়নি?
 যদি নাহয় তবে তো তিনি হ্যাব্রোকে হারিয়ে ফেলবেন। গোটা পৃথিবীতে তার একমাত্র বিশ্বাসের মানুষ ছেলেটি, তার শক্তি ছেলেটি।

এই প্রথম রানির নিজের কাজের জন্য আফসোস হচ্ছে। তিনি যদি হ্যাব্রোকে না নিয়ে আসতেন এই রাজ্যে কিংবা নিজেকে সমর্পণ না করতেন স্বেচ্ছায় তাহলে হ্যাব্রোর কিচ্ছুটি হতো না। তার জন্য আজ হ্যাব্রোর এত বিপদ হয়ে গেলো। হ্যাব্রোকে কী করে বাঁচাবেন তিনি! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp