কামিনী - পর্ব ৮৫ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          ভোরের আলো ফুটছে কেবল। কমলা রঙের আলো হাসছে নব্য বধূবেশে। পুরো রাজপ্রাসাদ জুড়ে তীব্র নীরবতা। মৃদু হাওয়ায় ফুলদানির ফুলগুলো, বাতায়ন ঘেঁষে থাকা পর্দাগুলো যে উড়ছে তারই ধীর শব্দ ভেসে আসছে। রানি দেখলেন হ্যাব্রোর নিস্তেজ শরীরটা। মাটিতে লুটিয়ে আছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সাড়াশব্দ নেই বাকিদের। সবাই যে মৃত তেমনটা নয়। কেউ কেউ এখনো শ্বাস নিচ্ছে তবে মুখ দিয়ে এক বিন্দু শব্দ করার আর সাহস নেই তাদের। 
 রানি রাজবৈঠকের সাথে লাগোয়া উন্মুক্ত বারান্দাটির দিকে তাকান। আকাশের ঢিমে রঙ দৃশ্যমান হয়। তিনি নিবিড়ে হেঁটে যান সেই বারান্দায়। মুখের রক্তগুলো শুঁকিয়ে আটকে আছে মুখের সাথে। প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের পর পরিবেশ যেমন শীতল হয়ে যায় ঠিক তেমনই লাগছে তাকে। ঝড়ে বিধ্বস্ত প্রকৃতির মতনই শূন্য, ধ্বংসাত্মক। 

  রানি বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বিস্তৃত জায়গাজুড়ে কেবল মানুষ আর মানুষ। সকলে হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সকলের দৃষ্টি বিস্মিত সাথে কিছুটা আনন্দিতও বোধহয়। বহু বহু লোক সংখ্যা। হিসেব করারও উপায় নেই। এত লোক! এত মানুষ! রানি সংশয়ে পড়েন। মানুষগুলোকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে খেয়াল করলেন সেই তীব্র লোকের সমাগমে দাঁড়িয়ে থাকা সামনের একটি মেয়েকে তিনি চেনেন। মেয়েটি তার পরিচিত। কাছের। রানি অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলেন, "ফ্রেয়া..!"

 —————

মনোরঞ্জন অঞ্চলের বিশাল নাট্য প্রাসাদের ভেতর বসে আছেন রানি আসনে। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কত নানান ধরণের মানুষ। সবাইকে রানি চেনেন না। অল্প কয়েকজনকেই চেনা তার। এর ভেতর দুজনকে বেশ ভালো করে চেনা হয়েছে। একজন হরিতকীজি। অন্যটা ফ্রেয়া। হ্যাব্রোকে চিকিৎসার অধীনে দেওয়া হয়েছে সেই কখনই। প্রাসাদের বাহিরে অপেক্ষারত বহু মানুষ। সবই রানির রাজ্যের। রানিকে নিয়ে তারা এক বিন্দুও নড়বে না। 

  "আমার রাজ্যের এত প্রজাকে এখানে তুমিই এনেছো তা আমি ভালো করেই বুঝেছি। কিন্তু তুমি এখানে কেন? এতদিন যাবত ছিলেই বা কোথায়? আমার বিপদের কথা জানলেই বা কীভাবে?"

 রানির পরপর করা প্রশ্নের বিপরীতে ফ্রেয়া নীরবে একবার হরিতকীজির দিকে তাকালো। তার ভেতর ভেতর কিছু একটা যে চলছে তা স্পষ্টই। হরিতকীজির মুখটিও চুপসানো। গুরুগম্ভীর। রানি আসার পর এ অব্দি তিনি টু শব্দও করেননি। 
"আমি এক কথা বার বার বলি না, তা তো তুমি অবগত তাই না?"

 ফ্রেয়া এবার মাথা নাড়াল। বুক ভরে শ্বাস নিলো কিছু সময়। পরক্ষণেই মুখ খুলল,
"আমিতো এখানটাতেই থাকি, রানি। আপনাকে যখন রাজার সৈন্যসামন্ত ধরে নিয়ে গিয়েছিলো তার কিছুক্ষণ পরেই আমি এই রাজ্যের সীমান্ত পেরিয়ে আপনাদের রাজ্যে পৌঁছাই। রাজপ্রাসাদ অব্দি পৌঁছাতে বহু সময়সাপেক্ষ বিষয় বলে আমি সীমান্তের কাছেপিঠে সমস্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাহায্য চাইলাম। আপনার প্রজারাই তখন ছুটে এলো। তারাই একটি দল হয়ে উঠল। নিজেদের প্রাণ নিয়ে ছুটল আপনাকে বাঁচাতে।"

 "এখানটাতেই থাকো? তবে কি হরিতকীজি তোমাকে পাঠিয়েছিলো আমার খোঁজের জন্য?"
রানির দ্বিতীয় প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো হরিতকীজি। ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধীর মতো কাচুমাচু করল মুখটি।
  "হ্যাঁ। তবে আপনার খারাপ করতে নয়।"

রানির মুখটি এত ঝড়ের পরেও শক্ত, কঠিন। কণ্ঠ এখন দৃঢ়। 
"খারাপ করতে পাঠাক আর ভালো করতেই, সবশেষে তোমরা আমার সাথে ছল করেছো এটাই কি একমাত্র সত্যি নয়।"

  "যে ছলে ক্ষতি হয় না তা বোধহয় অপরাধের নয়।" ফ্রেয়া মুখটি নত করে বলল। হরিতকীজি এক পলক ফ্রেয়ার দিকে তাকাল। ফ্রেয়া আপ্রাণ চেষ্টা করছে রানির কাছে হরিতকীজির উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে। 
ফ্রেয়ার এই আপ্রাণ চেষ্টা দেখে শেষমেশ হরিতকীজি মুখ খুলল। বেশ ধীরেই বলল,
"আপনার বোধহয় এখন রাজ্যে ফেরা উচিত, রানি কামিনীকাঞ্চন। আপনার প্রজারা অপেক্ষায়।"

 রানি হরিতকীজির দিকে তাকিয়ে আছেন। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বললেন, "সে তো ফিরবোই কিন্তু আমার মনে হয় যে সত্য জানার জন্য আজ এত কিছু হলো সেই পুরো সত্যটা আমার জেনে যাওয়া উচিত। আপনি হয় আমাকে মিথ্যে বলেছেন নয়তো অর্ধসত্য। পুরোটা বলেননি।"

  যেই ভয়টা এতক্ষণ যাবত হরিতকীজির মনে হাসফাস করছিলো সেই ভয়টাই শেষমেশ সত্যি হতেই হতাশ হলো সে। নিজের আশেপাশে থাকা বাকি মেয়েদের সরে যাওয়ার ইশারা করল আলগোছেই। পুরো কক্ষ জুড়ে থাকল কেবল তিনজন। 
রানি এবার প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন, "আমার জন্মদাত্রী সবসময় রাজা কেশবচন্দ্রের ভালোবাসা পেতে চেয়েছিলেন কিংবা চেয়েছিলেন কেশবচন্দ্র খানিক মুগ্ধ হোক। আপনার ভাষ্যমতে কেশবচন্দ্র তা করেননি। তাইতো? তবে আমি আমার রাজ্যের পুরোনো নথিপত্রে যেই আমন্ত্রণপত্রটি পেয়েছিলাম সেটিতে তো স্পষ্টই উল্লেখ ছিলো উনি বিশেষ করে আপনাকে নর্তকী সুরসুন্দরীকে নিয়ে যাওয়ার আকুতি করেছিলেন। তার বিনিময়ে স্বর্ণমুদ্রাও দিয়ে ছিলেন। তবে আপনি কেন সেই তথ্য আমার মাতা অব্দি পৌঁছাতে দেননি?"

  হরিতকীজি আর ভঙ্গিমা করল না। মিথ্যা বলার প্রয়াসও করল না। তার মনে কোথাও তীব্র ভয় জেঁকে আছে। রাজ প্রাসাদের সেই খণ্ডবিখণ্ড দেহগুলো তার মনে কম্পন তৈরি করেছিলো। তাছাড়া কোথাও একটা সুরসুন্দরীর জন্য তার খারাপ লাগাতো ছিলোই! যতই হোক, সুরসুন্দরীকে কম স্নেহতো সে করেননি। কিন্তু ক্ষমতার লোভ ভালোবাসার চেয়েও বড়ো হয়ে উঠে যে মাঝে মাঝে। 

 "আপনি ঠিক ধরেছেন। আমি অর্ধ সত্যই বলেছি। হ্যাঁ সুরসুন্দরীকে রাজা কেশবচন্দ্র নিতে চেয়েছিলেন। বাকি পুরুষদের মতো তিনিও সেই রূপে মজেছিলেন। তবে আমিই তাকে বলেছিলাম সুরসুন্দরীকে পাওয়া এত সহজ নয়। তাকে পেতে হলে আগে তার সামনে দেখাতে হবে যে তাকে আপনি পেতে চান না। এবং এজন্যই সর্বপ্রথম আমি লুকিয়ে ছিলাম সেই আমন্ত্রণপত্রের কথা। আমি ভেবেছিলাম আমার এতটুকু কথাতে রাজা কেবল তাকে অর্জন করে নিবেন কিন্তু সুরসুন্দরীর এতটা ক্ষতি রাজা করবেন তা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। পেলে হয়তো এতটা খারাপ হতে দিতাম না।"

   "আপনি কেনই বা চেয়েছিলেন সুরসুন্দরীকে যেন রাজা পান? আপনার এই অঞ্চলের নিয়ম তো ছিলো ভিন্ন! নর্তকীরা এইখানে কেবল মনোরঞ্জন করবে কিন্তু কারো কাঙ্ক্ষিত মানুষ হতে পারবে না। তবে? তার বেলাই কেন ঘটিয়ে ছিলেন ভিন্ন নিয়ম?"
 রানির প্রশ্নে মুখ নেমে যায় হরিতকীর। অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে উঠে তার চোখ। রানি হাসেন,
"লোভ তাই না? আপনি ক্ষমতার মায়ায় পড়ে সুরসুন্দরীর সাথে এই অন্যায়টি করেছিলেন। আমি ভুল নই। আমি একদম ঠিক বলছি তাই না?"

  মাথা নাড়ায় হরিতকী, "হ্যাঁ, আমিই করেছিলাম এটা এবং ক্ষমতার লোভে করেছিলাম। আমার ক্ষমতার লোভ হওয়া কি ভুল ছিলো? যেই অঞ্চলটা আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে রাজা দান করে ছিলেন সেই রাজ্যে কিনা রাজত্ব করছে অন্যকেউ। আপনি মেনে নিতে পারতেন? আপনার সখী যখন আপনার আসন নিয়েছিল আপনি তাকে মেনে নিয়েছিলেন? আমি কীভাবে মেনে নিই তাহলে বলুন? প্রথমে সুরসুন্দরীর এত হইহই রইরই আমাকে আনন্দ করেছিলো ঠিকই কিন্তু বছরের পর বছর যখন এটা বাড়তে লাগল তখন নর্তকীশালার বাকিদের মতোই আমারও ঈর্ষা হয়েছিলো। হীনমন্যতায় ডুবে গিয়েছিলাম। সব পুরুষ, সব রাজ-রাজারা কেবল সান্নিধ্য চাইল তার। আমাদের কী কম ছিলো বলুন? আমরা কম সুন্দরী ছিলাম না। তবুও সুরসুন্দরী প্রতিটা মুহূর্ত আমাদের নিচু করতো। অহংকারে তার পা পড়তো না মাটিতে। সবসময় আমাদের খুব বাজে কথা শোনাতো। হয়ত নাম উল্লেখ করতো না কিন্তু কথাতো সবার গায়েই লাগতো তাই না? তাই ভেবেছিলাম রাজা কেশবচন্দ্রের মাধ্যমে যদি তাকে এই অঞ্চল ছাড়ানো যায়৷ হ্যাঁ, আমার পদ্ধতি ভুল ছিলো কিন্তু আমি তার ক্ষতি চাইনি। আমি জানতাম না রাজা কেশবচন্দ্র তাকে নিয়ে এমন খেলা খেলবেন। জানলে কখনোই আমি এত পাষাণ হতে পারতাম না। কোনোভাবেই না। আমি বহুবার তাকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলাম কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো বারংবার। শেষ দিকে তো আমাকে সেই রাজ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কত গুপ্তচর পাঠিয়ে ছিলাম কিন্তু সুরসুন্দরী সেই একজন পুরুষের জন্য বাকি পৃথিবীকে ছেড়ে দিলো। আমি কী করতে পারতাম বলুন?"

  "এখন কোথায় তিনি?"

হরিতকীজি শ্বাস নিলো। পুনরায় বলল,
"আপনাকে আমি চাইনা সবটা জানাতে। আমার নিষেধাজ্ঞা আছে। আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।"

 "প্রতিজ্ঞাবদ্ধ? কার কাছে? তার মানে আমি ব্যতীতও অন্য কেউ আমার মাতার খোঁজে আপনার নিকট উপস্থিত হয়েছিল?"

"ছিলো।"

 "আপনার প্রতিজ্ঞা ভাঙতেই হবে। আমার মাতার খোঁজ আমি জানব না তা হতে পারে না। পুরোটা জীবন আমি কেবল আমার মাতার খোঁজ করে গিয়েছি। আজ শেষ খোঁজটুকু ছাড়া আমি যে যাচ্ছি না।"

"আমি অপারগ, রানি। আপনি আমাকে শাস্তি দিতে পারেন কিন্তু আমি একবার প্রতিজ্ঞা করলে সেই প্রতিজ্ঞা ভাঙিনি কখনো আর না ভাঙ্গবো।"

 "আচ্ছা! তাহলে তা-ই হোক? শাস্তির জন্য প্রস্তুত হোন। আমি এখন এই পৃথিবী ভেঙে গুড়িয়ে দিতেও রাজি আমার মাতার খোঁজ পেতে। আমি কতটা হিংস্র হতে পারব তা আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না।"

 হরিতকীজি রানির এই তীব্র শাসনেও মৌন রইল। রানিও এক কথায় আটকে গেলেন। বাহির থেকে প্রহরী ডাকার জন্য উদ্যত হতেই ফ্রেয়া আচমকা গিয়ে রানির পায়ের কাছে বসে পড়ল। আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল,
"দয়া করে এমনটা করবেন না। হরিতকীজি আমাদের মাথার উপর ছায়া। তার কিছু হলে এই অঞ্চলের এতগুলো নারীর জীবন ভেসে যাবে এক লহমায়। আমি বলবো আপনাকে সব। আমি বলবো।"

  হরিতকীজির নত মস্তক তড়িৎগতিতে উঠে গেলো। চোখগুলো তার বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। তীব্র চিৎকারে আজ্ঞা করে বলল,
"না, বলো না। ফ্রেয়া, আমার আজ্ঞা তুমি অমান্য করতে পারো না। আমি তোমার অবিভাবক। আমাকে অশ্রদ্ধা করতে পারো না।"

 এবার ফ্রেয়ার চোখ অশ্রুসিক্ত হলো। হাত জোড় করে বলল,
"আপনাকে অশ্রদ্ধা করার মতো শক্তি আমার নেই। তবে আজ্ঞা অমান্য করছি। আপনার প্রাণের চেয়ে আজ্ঞা বড়ো নয় কোনো ক্রমেই।"

 রানি ফ্রেয়ার হেঁচকি দেওয়া কান্না দেখে ফ্রেয়ার মাথায় হাত বুলালেন। মৃদু হেসে বললেন,
"কেঁদো না। আমায় তুমি নির্ভয়ে বলো। আমি কথা দিচ্ছি উনাকে ছেড়ে দিবো। বলো, আমার আগে কে এসেছিলো এখানে আমার মাতার খোঁজে? কিংবা কেই-বা বলেছে আমার মাতার কথা আমাকে অবগত না করতে। তার নামটা কেবল বলো।"

  হরিতকীজি অনুনয় করল ফ্রেয়ার কাছে ভীষণ। কিন্তু সেই অনুনয়কে ফ্রেয়া ফিরিয়ে দিয়ে ক্রন্দনরত অবস্থাতেই বলল,
"চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স এসেছিলেন। তিনিই নিষেধ করেছিলেন।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp