“প্রথমবার অনুভব করলাম বোবা হওয়াও একটা নিয়ামত। অচেনা অজানা লোকটাকে অন্তত ‘বাবা’ ডাকতে হচ্ছে না। আমার মায়ের হাসবেন্ড অর্থাৎ তথাকথিত ‘সৎ বাবা’ মানুষটা ভালোই। আমার সব ভয়-ভীতি আর ভাবনার উর্ধ্বে সে। এক কথায় জেন্টলম্যান। আমি অহেতুক ভয়ে ছিলাম। দিন গুলো কিন্তু মন্দ কাটছে না।” ~পত্রলেখা
নোটবুক বন্ধ করে পত্রলেখা। মোল্লা বাড়িতে আজ তৃতীয় দিন চলমান। গত দুদিনে পত্রলেখা ঠাহর করতে পেরেছ এ বাড়ির মাথা কারিম মোল্লা গুরুগম্ভীর লোক। তাঁকে বাড়ির প্রতিটি সদস্য মান্য করে চলে। তাঁর কথার হেরফের করা মানে জমের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা। সবাই বেশ ভয় পায় ওনাকে। তবে পত্রলেখার কেন যেন মনে হয় লোকটা নারিকেলের মতোন। বাইরে শক্ত হলেও ভেতরে ভেতরে মিঠা পানি। সে বাড়িতে আসলে লোকটা সস্নেহে মাথায় হাত রেখে বলেছিল,
“পুষ্প, কামিনীর মতো তুমিও আমার আরেক মেয়ে। নিজের বাড়ি মনে করে থাকবে এখানে। কোনো জড়তা নেই। যা কিছু প্রয়োজন তোমার মা অথবা আমাকে জানাবে। আবারও বলছি নিজের বাড়ি মনে করেই থাকবে।”
পত্রলেখার মনে কথাগুলো খুব একটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় নি। তবে পরবর্তী কথায় সে স্থবির হয়ে পড়েছিল। ভদ্রলোক বলেছিলেন,
“তোমার তো এখানেই বড় হওয়ার কথা ছিলো। আমি তোমার মাকে বারবার বলেছি মেয়েটা কে এনে তো দেখো। দুদিন থাকলেই সবার সাথে মিলেমিশে যাবে। কিন্তু তুমি নাকি আসবে না বলে জেদ দেখাতে। তাই আমিও জোর করি নি।”
পত্রলেখা মায়ের দিকে তাকিয়েছিল একবার। মায়ের নজর লুকানোতে যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। মামার কথাই ঠিক। মা চাই নি পত্রলেখা নামক বোঝা তাঁর পিছু পিছু আসুক।
“পত্র, আপু? জারিফ চাচ্চু তোমাকে ডাকছে। এক্ষুনি যেতে বললো। দেরি কোরো না।”
পুষ্পর ডাকে পত্রলেখা কলম রেখে উঠে আসে। এ বাড়ির সবার মাঝেই ভদ্রতাবোধ বিরাজমান থাকলেও দুটি মানবের মাঝে সে নূন্যতম ভদ্রতা দেখতে পায় নি। প্রথমজন পুষ্পের দাদি। যে কি-না অহেতুক চেঁচামেচি করতে পছন্দ করে। পত্রলেখার এ বাড়িতে থাকা নিয়ে বৃদ্ধা ঘন্টায় ঘন্টায় চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি এক করে ফেলে। তবে হ্যাঁ কারিম মোল্লা বাড়িতে উপস্থিত থাকলে বুড়ি চুপটি মেরে যায়। আর দ্বিতীয়জন পুষ্পের চাচা জারিফ মোল্লা। লোকটাকে দেখলেই তাঁর গা হিম হয়ে আসে। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাঁর ভয়টা একটু বেশিই, কারণ লোকটা অবিবাহিত। তারচেয়েও বেশি ভয়ংকর কথা হলো লোকটা নাকি নারী বিদ্বেষী। মেয়েদের সহ্যই করতে পারে না। কিন্তু তাঁর তো উল্টো মনে হয়। লোকটা নির্ঘাত চরিত্রহীন। সারাদিন বাড়িতে শুয়ে বসে কাটাবে আর একটু পরপরই হুকুম তামিল করবে, চা পাঠাও। আর সেই চা কে নিয়ে যাবে? পত্রলেখা! অদ্ভুত না? পত্রলেখার কাছেও অদ্ভুত লাগে। শুধু পত্রলেখা না, মোল্লা বাড়ির সবাই কেমন বাঁকা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। যা পত্রলেখাকে ভয় পাইয়ে দেয়।
চা বানিয়ে পত্রলেখা জারিফ মোল্লার দরজায় করাঘাত করে। ভেতর থেকে পুরুষালি গলার ডাক ভেসে আসে। পত্রলেখা ভেতরে প্রবেশ করে। জারিফ মোল্লা রকিং চেয়ারে বসে ছিলো। হাতে উন্মুক্ত ম্যাগাজিন। চশমা চোখে সেগুলোই পড়ছে। মুখ খানিতে বেশ রাগী রাগী ভাব বিদ্যমান। বয়স খুব করি সাতাশ আটাশ। কম হলেও হতে পারে। তাঁর কি? পত্রলেখা চা বাড়ায়। কিন্তু জারিফ মোল্লা চায়ের কাপ নিলো না। ম্যাগাজিন বন্ধ করে পত্রলেখার দিকে মাথা তুলে তাকালো।
“পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে এতো কিসের ঢলাঢলি? বাড়িতে এসেছিস দুদিনও হয় নি। এরমধ্যেই ভাব জমে গেলো?”
পত্রলেখার চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠলো। হাতের চায়ের কাপ নড়েচড়ে উঠলো। জারিফ ভ্রু কুঁচকে পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে ধমকে বৃলো, “কথা বলছিস না কেন?”
পত্রলেখার হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেলো। সত্যিই পড়ে গেলো? নাকি ইচ্ছে করে ফেলে দেওয়া হলো? জারিফের কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হয়। মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, “মায় মিসটেক। তুই তো বোবা। কথা বলতে পারিস না। এটা অবশ্য আমার জন্য ভালোই। কথা বলার দরকার নেই। শুধু শুনবি। যাইহোক পাশের বাড়ির ছেলেটার সাথে যেন আর না দেখি। ওকে চিনিস তুই?”
গাঢ় ভাঁজ এবার পত্রলেখার কপালে উদিত হয়। জারিফ মোল্লা পুনরায় ম্যাগাজিন মেলে ধরে বলল, “আবারও চা বানিয়ে আন। যাহ?”
জারিফ মোল্লা ম্যাগাজিন থেকে চোখ সরিয়ে পত্রলেখার গমন পথে তাকিয়ে থাকে। পত্রলেখা বেরিয়ে যায়। রান্নাঘরে না গিয়ে সোজা সদর দরজা পেরিয়ে গেলো। বাম পাশের দোতলা বাড়িটির সদর দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ে।
দরজা খুলে দেয় এক মধ্যবয়সী মহিলা। পত্রলেখাকে দেখেই ভেতরের মমতা ঠিকরে বেরিয়ে আসে। কি ফুটফুটে মেয়ে! তাকালে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করবে না এমনই সৌন্দর্য তার। অথচ মেয়েটা নাকি বোবা!
“পত্রলেখা যে! ভেতরে আসবে? টুটুল তো বাড়িতে নেই। বন্ধুর সাথে বেরিয়েছে।”
হামিদা বানু হাসিমুখে জানান। পত্রলেখার মুখটায় আঁধার নামে। ফিরে আসতে নিবে হামিদা বানু পিছু ডেকে বলেন,
“আচ্ছা তুমি কি সত্যিই অরুণাভের বোন হও?”
পত্রলেখার কপালে নাখোশ ভাব দেখা দিলো। ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে অস্বীকার করে। হামিদা বানু হাসলেন। যদিও হাসির আড়ালে ছেলের গুষ্টি উদ্ধার করতে ব্যস্ত। হারামজাদা এতো বড় মিথ্যেটা বলতে পারলো? আজ ওর একদিন কি আমার যে কয়দিন লাগে। বিড়বিড় করে ভদ্রমহিলা দরজা লাগান। ডানে বামে না তাকিয়ে সোজা ছেলের ঘরে হাজির হন। এদিক ওদিক তাকিয়ে বিছানা ঝাড়ার প্লাস্টিকের ঝাড়ু হাতে তুলে নেয়।
টুটুল হেডফোন কানে ফোন টিপছিল। হঠাৎ মায়ের আক্রমণে ‘লা হাউলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (لا حول ولا قوة إلا بالله) বলে লাফিয়ে ওঠে। মাকে ঝাটা হাতে তেড়েফুঁড়ে আসতে দেখে দৌড়ে বেলকনিতে আশ্রয় নেয়। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বুকে থুতু দেয়। আতংকিত হয়ে বলে,
“মা সত্যি কথা বলো তো? আমাকে ড্রেনেই কুড়িয়ে পেয়েছিলে তাই না?”
হামিদা বানু দাঁত কটমট করে দরজা ধাক্কিয়ে বলেন, “তেমন হলে কবেই ড্রেনে ফেলে আসতাম তোকে। পেটের তাই সহ্য করছি। তুই দরজা খোল আজ তোর পিঠে ঝাটা না ভেঙেছি তো আমি আয়নাল হকের মেয়ে না।”
টুটুল মনে করার চেষ্টা করে কি আকাম করেছে যার জন্য মা জননী চেতে আছে। কিন্তু মনে করতে পারে না। আজ তো সে বাড়িতেই ছিলো।
“কি করেছি আগে সেটা তো বলো?”
“তুই কি করিস না সেটা আগে বল?”
টুটুল মনে করার চেষ্টা করে। মনে পড়েও যায়। দাঁত কেলিয়ে বলে, “পড়াশোনাটাই করি না। তাছাড়া কিন্তু সব করি। থালাবাসন মাজা, কাপড় কাঁচা, ছাদে কাপড় মেলে দেওয়া, ঘর মোছা, বাজার করা, গোল গোল রুটিও বানিয়ে দিই কিন্তু তোমাকে?”
হামিদা বানুর সমস্ত রাগ গায়েব হয়ে যায়। ছেলে তাঁর লাখে একটা। এ যুগে কোন ছেলেই বা এমনটা করে? তিনি ঝাড়ু ফেলে দিয়ে বলেন,
“তুই বলেছিলি পত্রলেখা অরুণাভের বোন হয়। তাই ওর সাথে কথা বলিস।”
টুটুলের কান খাঁড়া হয়, “হ্যাঁ বলেছিলাম তো।”
“কিন্তু পত্রলেখা যে অস্বীকার করলো? ও অরুণাভের বোন নয়। তোর মিথ্যে ফাঁস হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই মেয়েটার সাথে চক্কর চলছে তোর।”
মায়ের গলায় পুনরায় তেজ ফিরে এসেছে। টুটুল দরজা খুলে উঁকি দেয়। কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “মা কি সব নাঊজুবিল্লাহ মার্কা কথা বলছো! আমি চক্কর চালাতে পারি? এই বিশ্বাস তোমার ছেলের উপর?”
“বিশ্বাস? তার তোর উপর? সকালে আমার পার্স থেকে টাকা চুরি করেছিলি ভুলে গেছিস?”
টুটুল মুখ বিকৃত করে। মিনমিনে গলায় বলে, “ওটাকে চুরি বলে না। আমি আমার মায়ের পার্স থেকেই তো নিয়েছি পাশের বাড়ির আন্টির ব্যাগ থেকে নিই নি।”
“তোকে যা বলেছি তার উত্তর আগে দে! পত্রলেখার সাথে কি তোর ইটিশপিটিশ চলে?”
“মাআআআ” টুটুল ন্যাকাস্বরে ডাকে। হামিদা বানু বোঝানোর সুরে বললেন, “দেখ বাপ, মেয়েটা বোবা না হলে আমারও সমস্যা ছিলো না। বরং খুশির ঠেলায় পাগল হয়ে যেতাম। কিন্তু সমস্যাই ওইটা! তোর মনে ওসব কিছু থাকলে ঝেড়ে ফেল।”
“আরে মা জননী ওসব কিছুই নেই। তুমি গিয়ে চিল মারো।”
টুটুল হাসিমুখে বলল। হামিদা বানু ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “আমার কথা মাথায় রাখিস কিন্তু? সৌন্দর্যই কিন্তু সব না। ওর সৌন্দর্য ওর প্রতিবন্ধকতা ঢেকে রাখতে পারবে না বাপ।”
“বললাম তো তেমন কিছুই নেই। ভোর যেমন আমার বেস্টেস্ট ফ্রেন্ড ওর বোন পত্রলেখা আমার যাস্ট ফ্রেন্ড। মেয়েটা খুবই লক্ষীমন্তর বুঝলা? ওর কোন বন্ধু বান্ধব নেই। সবসময়ই একা থাকে। আগে ওর নানু বাড়ি থাকতো এখন এখানেই থাকবে।”
“তোর বাপ আর আমিও এককালে যাস্ট ফ্রেন্ডই ছিলাম।”
টুটুল কানে হেডফোন লাগিয়ে মুচকি হেসে বলল, “তোমার পোড়া কপাল মা। দুনিয়ায় হ্যান্ডসাম ছেলের অভাব ছিলো? প্রেম করার জন্য আমার ভুঁড়িওয়ালা টাকলা বাপটাকেই চোখে পড়লো? তাও যদি মুখে রষকষ থাকতো। আফসোস তোমাকে বলতে পারছি না, মা তুমি জিতছো।”
হামিদা বানুর আফসোস করা শুরু হয়ে গেলো। এ বেলা জুড়ে তিনি আফসোসই করে যাবেন। টুটুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পত্রলেখাকে পাশের বাড়ির ছাদে দেখে টাশকি খেয়ে ছিলো। ভেবেই বসেছিল সিনেমার মতো পত্রলেখার ভ্রম আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু পত্রলেখা যখন তাদের দোরগোড়ায় হাজির হয় তাঁর ভ্রম মুছে যায়। অবাক হয়েছিল বটে। সাথে খুশিও। তাঁর খুশিতে চার চাঁন লাগে পত্রলেখার চিরকুটে। গোটা অক্ষরে লেখা ছিলো,
‘আমরা কি বন্ধু হতে পারি?’ ~পত্রলেখা
—————
“ওই ফোর টোয়েন্টি? কখন থেকে ফোন করছি। আমার ফোন কেন ধরছিস না?”
NSU ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসেছিল অরুণাভ। টেবিলে দুই মগ কফি, চিজ বার্গার আর চাউমিন। আর অপর পাশে বসে ডিপার্টমেন্টের এক সিনিয়র মেয়ে। নাম নীলাশা চৌধুরী। কিছু অ্যাসাইনমেন্ট কালেক্ট করতেই এখানে তার সাথে ক্যান্টিনে আসা। হঠাৎ আনিকার আগমণে একটু ভড়কালো। নীলাশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আমার কাজিন আনিকা, ফ্রেশার, ফার্মেসিতে আছে।”
নীলাশা মুচকি হেসে বলল, “হাই আনিকা! মায়সেলফ নীলাশা চৌধুরী। অরুণাভের সিনিয়র আমি।”
আনিকা জোরজবরদস্তি হাসি ফুটিয়ে তুললো। মেয়েটাকে পছন্দ হলো না তার। হবারও নয়। একে তো সুন্দরী তার উপর অরুণাভের সাথে প্রায়শই দেখা যায়। কি সম্পর্ক ওদের মধ্যে? সে কাঁধের ব্যাগ দিয়ে অরুণাভের বাহুতে আঘাত করে বলে, “সরতো, বসতে দিবি না? নাকি আমি থাকলে ডিস্টার্ব হবি, হলে বল চলে যাই।”
অরুণাভ সরে বসে জায়গা করে দিলো। আনিকা বাহু ঘেঁষে বসলো। নীলাশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “আপু, আপনাকে চেনাজানা লাগছে। কোথাও দেখেছিলাম মনে হলো!”
নীলাশা মুচকি হাসলো। তারপর বলল, “আমি এক ক্ষুদে অভিনেত্রী। ছোট পর্দায় কাজ করি। ছোটখাটো বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছি। সম্প্রতি একটা নাটকে অভিনয়ের কাজ পেয়েছি। যদিও নাটকটা এখনো টেলিকাস্ট করা হয় নি।”
আনিকা প্রত্যুত্তরে মুচকি হাসলেও ভেতর ভেতর রাগে রি রি করে ওঠে। অরুণাভকে কনুই মেরে খোঁচা দেয়।
“জিজ্ঞেস করলে না নাটকের নাম কি?”
“আমি জিজ্ঞেস করতেই চাচ্ছিলাম আপনি বলে ফেললেন। কি নাম নাটকের?”
“মেঘের দেশে।”
“খুব সুন্দর তো। রোমান্টিক?”
“তা একটু!”
“তাহলে তো দেখতেই হচ্ছে।”
“আশা করি ভালো লাগবে।”
“আপনি দেখতে অনেক সুন্দর। এখন নায়ক যদি হ্যান্ডসাম হয় ধরে নিন নাটক হিট।”
নীলাশা হঠাৎ অরুণাভের দিকে তাকায়। আনিকার ঘোর সন্দেহ হয়। অরুণাভের দিকে তাকালো কেন? তাকাবে কেন? সে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে, “ওর দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? না মানে বলছিলাম আপনার তাকানো দেখে ধারনা জন্মালো ‘মেঘের দেশে’ নাটকের নায়ক ভোর। এ্যাই ভোর, তুই ক্রিকেট ছেঁড়ে এসবে ঢুকে যাস নি তো আবার?”
অরুণাভ বিরক্ত প্রকাশ করে চুপ থাকতে বললো আনিকাকে। আনিকার রাগ হলো খুব। এই সুন্দরী নায়িকাকে দেখে তাঁকে পাত্তাই দিচ্ছে না। নীলাশা হেসে বললো, “তেমন কিছুই না। তবে তোমার ধারনাও মিছে নয়। রিসেন্ট এক বিজ্ঞাপনে অরুণাভ কাজ করছে। সেখান থেকেই পরিচয় আমাদের।”
আনিকা অবিশ্বাস্য চোখে চায়। অরুণাভ নীলাশার উদ্দেশ্যে বলল, “কাকে কি বললেন আপনি! এখন রঙ মশলা মাখিয়ে ঢাকঢোল পেটাবে।”
আনিকা নাকের পাটা ফুলালো। কৌতুহল থাকলেও এ বিষয়ে আর কোনো কথা তুললো না। অরুণাভ, নীলাশাই টুকটাক কথা বলে গেলো।
পুরোটা সময় সে চুপ থাকলো। নীলাশা চলে গেলে অরুণাভ হাঁফ ছাড়লো। সাথে আনিকাকে সাবধান করলো,
“চাচ্চুর চামচিকা, আগেই আব্বুর কানে দিবি না। আব্বু কেন, কারো কানেই না।”
“হুঁ”
“গুড, কিছু খাবি? নিয়ে আসবো।”
“না।”
“তোর আবার কি হলো?”
“কিছু না।”
অরুণাভ মুচকি হেসে বলল, “আরে ভাই, সেভেন আপের বিজ্ঞাপন। আমার সিনিয়র মেট ফাহিম ভাইও আছে। উনিই মেইন লিভ। আমাকেও জোর করে ঢুকিয়ে দিলো। ছোট্ট একটা এড।”
“আমি কিছু বলেছি?”
“তাহলে মুখটা পেঁচার মতো বানিয়ে রেখেছিস কেন?”
“আমার মুখ আমি যেমন বানাই তোর কি?”
“আমার কিছু না?”
“না।”
আনিকা থমকালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে জবাব দেয়। অরুণাভ মুচকি হেসে মাথায় চাটা মেরে বলল, “তুই আস্ত পাগল।”
ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আসে তাঁরা। অরুণাভ এটা ওটা বললেও আনিকা চুপ করে তাঁর পাশে হাঁটে। তাঁর পরিবর্তন না দেখে অরুণাভ পাশ বদলে আনিকার হাত নিজ আয়ত্তে নেয়। আনিকা প্রতিক্রিয়া দেখালো না। অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোরা মেয়েরা এতো হিংসুটে কেন?”
আনিকা অরুণাভের দিকে তাকালো। ভর্ৎসনার সুরে বলল, “তুই এই কথা বলছিস? তোর মতো হিংসুটে পুরো বাংলাদেশে দুটো নেই।”
“আ’ম গ্ল্যাড।”
আনিকা হাত ছাড়িয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। রাগত স্বরে বলে, “তুই আস্ত মেয়েবাজ। তোকে একেক বেলা একেক মেয়েদের সাথে দেখা যায়।”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকালো, “দেখ আনি, একদম ফালতু কথা বলবি না। তুই ব্যতিত কোনো মেয়েদের দিকে ভালোমতোন তাকাই অবদি না।”
“আচ্ছা তাহলে বলছিস, শুধু আমার দিকে ভালোমতোন তাকাস?”
“হ্যাঁ।”
“আমি কোন রঙের লিপস্টিক পড়েছি বলতে পারবি?”
আনিকা তৎক্ষণাৎ মুখ ঢেকে নেয়। অরুণাভ অতি সহজেই আত্মসমর্পণ করে, “না।”
“তা পারবি কেন? তুই বয়ফ্রেন্ড নামের কলঙ্ক।”
আনিকার রাগের পারদ আকাশ ছোঁয়া। অরুণাভ হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলল, “আমি তোর বয়ফ্রেন্ড নই।”
তাঁর কথায় আনিকা ঝটকা খেলো। ক্যাট্যাটে স্বরে বলল, “ওহ্ আচ্ছা তুই আমার বয়ফ্রেন্ড নস। তো তুই কার বয়ফ্রেন্ড? ওই নীলাশার নিশ্চয়ই!”
“আমি কারো বয়ফ্রেন্ড নই।”
অরুণাভ পূর্বের চেয়েও গম্ভীর গলায় আওড়ালো। যার দরুন আনিকা ভাবতে বাধ্য হলো। শুধালো,
“তাহলে তুই আমার কি হস?”
“বেস্ট এনিমি।”
আনিকা প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়ে। অরুণাভের বাহু জড়িয়ে হাঁটতে থাকে। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে আনিকা হুট করেই বলল,
“তুই ঠিক বলেছিস ভোর। আমরা কিন্তু ভেরি গুড এনিমি। সেই ছোট্ট থেকে ঝগড়া করে আসছি। মারামারি, চুলোচুলি, রক্তারক্তি কোনোটাই বাদ যায় নি। কত সিন ক্রিয়েট হয়েছে আল্লাহ। একসাথে থাকলে লাগতোই। কিন্তু দূরেও থাকতে পারতাম না। একে অপরকে মিস করতাম। আমিই বেশি মিস করতাম।”
অরুণাভ হাসলো, “ঝগড়ার শুরু তোর তরফ থেকেই হতো। চাচিমণি তো সরাসরি বলেছিল আমি যেন রূপ আর তোর থেকে দূরত্ব বজায় রাখি। আমার জন্য তোরা বারবার বিপদে পড়িস। আমি দূরে থাকার চেষ্টায় থাকতাম আর তুই এসে আমাকে রাগিয়ে দিতি। আর আমি রাগটা সামলাতে পারতাম না। স্টিল পারি না।”
মায়ের কথা ওঠার আনিকার মুখটা থমথমে হয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আম্মুর কথা বলিস না তো। বিরক্ত লাগে। সবসময় কানের কাছে প্যান প্যান করবে। তৈমুরের গুনগান গাইবে আর…”
“আর আমার বদনাম, হুঁ?”
“হুঁ” আনিকার মন খারাপ হয়।
“আগে বিয়েটা হোক তারপর চাচিমণিকে বোঝাবো কত ধানে কত চাল। উনি সবসময়ই আমার পেছনে পড়ে থাকেন। উনার কথামতে দুনিয়ায় যা গন্ডগোল হয় সব অরুণাভের জন্যেই সংঘটিত হয়।”
অরুণাভ মনে পুষে রাখা ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাঁর কথা শুনে আনিকা বলল, “তুই যে সাধু! শা*লা ঝামেলাকে গলার মালা বানিয়ে পড়িস। তুই যতটা ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিস তার চেয়ে বেশি বিচার এসেছে চাচ্চুর কাছে। স্কুল থেকে তো রোজ কমপ্লেইন আসতো। কোন ছেলের মাথা ফাটিয়েছিস, কার ঠ্যাং ভেঙেছিস, কাকে হুমকি দিয়েছিস। অতিষ্ট হয়ে চাচ্চু নিজেই একটা স্কুলের স্পন্সরশীপ নিয়ে নিলো। তোকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দিলো। তাও সুধরালি না । এটা বলতেই হবে বাপের অতিরিক্ত লাটে বখে যাওয়া লাট সাহেব তুই। আর আম্মুর সব কথা ফেলে দেওয়ার মতো না। তোর রাগ, উগ্রপনা, লড়াকু, ছন্নছাড়া ভাবে মাঝে মাঝে আমিই বিরক্ত হই। চাচ্চু এতো কথা শোনায় গায়েই মাখিস না। তখন মন বলে ঠাস ঠাস করে চড়াই। আমার সাথে ওরকম ত্যাড়ামি করতে আসবি তো মার খাবি বলে দিলাম।”
অরুণাভ কিছু বললো না। কাঁধে স্পোর্টস ব্যাগ নামিয়ে পাশে রাখলো। এক রিকশাওয়ালাকে থামতে ইশারা করে। আনিকার উদ্দেশ্যে বলল, “আমি রিকশায় যাবো। তুই?”
“আমি? আমি তো তোর সাথে ফিরবো বলে গাড়ি আনি নি।”
“আমি বাড়ি ফিরবো না। ম্যাচ আছে আমার।”
রিকশায় স্পোর্টস ব্যাগ রেখে বলল অরুণাভ। আনিকা নাক মুখ কুঁচকে বলল, “সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু আজ আর ম্যাচ খেলা হচ্ছে না তোর। আমরা কোথাও একটা যাবো। এবং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
অরুণাভ আনিকার কথা অগ্রাহ্য করে রিকশায় উঠে বসে। হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলে, “আজ সম্ভব না রে। আমাকে যেতেই হবে।”
“ভোর, রিকশা থেকে নাম। ইম্পোর্টেন্ট কথা আছে তোর সাথে।” আনিকা নিজ কথায় জোর দিলো।
অরুণাভ নামলো না। নিজ ব্যস্ততার জানান দিয়ে বলল, “সন্ধ্যায় ফিরে সব শুনবো। আপাদত হাতে সময় খুব কম। টস হয়ে গেছে, আমাদের ব্যাটিং। আমি তিন নাম্বারে নামছি। দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাতে হবে।”
“ফোন করে জানিয়ে দে তুই খেলছিস না। আমার সাথে যাবি। ইটস ইমার্জেন্সি ইয়র।” আনিকা দৃঢ়তার সাথে বলল।
অরুণাভ তাঁর দিকে সুক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রিকশা ওয়ালাকে রিকশা ছাড়তে বলে। হাত নাড়িয়ে বিদায় সংবর্ধনা জানালো। আনিকা নাকের পাটা ফুলিয়ে ছুটে যাওয়া রিকশার দিকে তাকিয়ে থাকে। আকস্মিক বিনা মেঘে অক্ষিকোটরে অশ্রুরা ভিড় জমায়। নিরেট হয়ে দাঁড়িয়ে রয় সেখানে। মিনিট পাঁচেক গড়াতেই এক বিলাসবহুল গাড়ির দেখা মিলে। ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে যায়। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে এক যুবক। নাম তাঁর তৈমুর নেওয়াজ। সে আনিকার উদ্দেশ্যে বলে,
“হেয় মিস আনিকা, উঠে পড়ুন ঝটপট।”
আনিকা কাট পুতুলের মতো উঠে বসে ফ্রন্ট সিটে। তৈমুর উঁকি ঝুঁকি দিয়ে বলে, “কোথায় আপনার রাগী বয়ফ্রেন্ড? দেখতে পাচ্ছি না তো! আমি তো খুব এক্সাইটেট ছিলাম তাকে দেখবো বলে।”
আনিকা থমথমে মুখে জবাব দিলো, “চলে গেছে।”
“এ বাবা কেন? আমার সাথে দেখা না করেই চলে গেলো?”
আনিকা জবাব দেয় না। তৈমুর ঠোঁট টিপে হাসে। উইন্ড্রস্ক্রিণ উঠিয়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত ঘুরায়। ফিসফিসিয়ে বলে, “থাক মন খারাপ করবেন না। ভাড়া করা জিনিস তো! যেকোনো সময় পল্টি খেতে পারে। আপনি বরং আমাকেই পার্মানেন্ট করে নিন। কথা দিচ্ছি কখনোই ছেড়ে যাবো না।”
অপমানে আনিকার ফর্সা মুখটা রক্তিম হয়ে আসে। দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাদের আটকায়। অরুণাভ তাঁর কথা শুনলো না! সে ইমার্জেন্সি বলে চিল্লাচ্ছিলো কিন্তু ওর কাছে খেলাই আগে!
বিকেলে হতাশ বদনে আনিকা বাড়ি ফিরলো। সে বুঝতে পেরেছে তৈমুর নেওয়াজ লোকটা হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। আদা জল খেয়েই নেমেছে। তাঁর থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ হবে না। সহজ হতো যদি অরুণাভ তাঁর সঙ্গ দিতো। এক ঘুষিতে নাক ফাটালে ওটার শিক্ষা হতো। আনিকা কোনোদিক না তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা নিজ ঘরের দিকেই হাঁটছিল। হঠাৎ অরুণ সরকারের ডাকে চমকে কয়েক কদম পিছনে ফিরে এলো। স্টাডি রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“চাচ্চু, কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ। চাচ্চুর পাশে এসে বসো তো আনি বুড়ি!”
আনিকা এগিয়ে এসে বসে। তাঁর আনি বুড়ি ডাকটা চাচ্চুর মুখ থেকেই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
“বলো।”
“ফোর টোয়েন্টি, ভার্সিটিতে গিয়েছিল কি?”
অরুণ হাতের ফাইল বন্ধ করে আনিকার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে চায়। আনিকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। অরুণ ভাতিজির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে বলল,
“তোমাকে ক্লান্ত লাগছে। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও পরে কথা বলবো না হয়।”
“কি বলবে এখনি বলো। না শুনলে বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করবে। আমি কি কিছু করেছি? করে থাকলেও আগেই বলে রাখছি সব দোষ তোমার বদ ছেলেটার।”
অরুণ সরকার হাসলো। একটু নীরব থেকে বলল,
“তোমার মনে আছে? ছোটবেলায় একবার তুমি বলেছিলে তুমি ভোরের লাল টুকটুকে বউ হবে!”
আনিকার চোখ মুখ নিমিষেই লজ্জায় ছেয়ে যায়। মনে নেই আবার? খুব মনে আছে। তবে আনিকা অস্বীকার করে। অরুণ সরকার হেসে বলল,
“মনে না থাকাই স্বাভাবিক। তখন তোমরা খুব ছোট ছিলে।”
“চাচ্চু তুমি আমাকে লজ্জা দিচ্ছো। আমি যাচ্ছি!”
আনিকা উঠে চলে যেতে নেয়। অরুণ সরকার থামায় তাকে। হাত ধরে পাশে বসিয়ে দেয়। কাঁধ জড়িয়ে অতিশয় শান্ত গলায় বলে,
“তুমি আমার বদ ছেলেটার ব্যাপারে সিরিয়াস? ভেবেচিন্তে উত্তর দাও আনিকা।”
আনিকার মুখটা নত হয়। অরুণ বলল, “চাচ্চুর সাথে ফ্রিলি কথা বলো আনি। আমার ছেলেটা একটুও ভালো না। তুমি তো জানোই তাকে। বড়কথা, তোমার মা তাঁকে পছন্দ করে না। তোমার বাবাও না। মাঝখান থেকে তুমি ওকে পছন্দ করতে শুরু করলে। এটা নিয়ে কত বড় ঝামেলা হবে তুমি ভাবতে পারছো?”
আনিকার নত মস্তক আরও নত হয়ে আসে। চোখে আবারও জলধারা হানা দেয়। নাক টানার শব্দ আসে। অরুণ সরকার বলল
“আমি একবার প্রস্তাব রেখেছিলাম আমার চাচ্চুটাকে আমার কাছেই রেখে দিবো। কিন্তু তোমার আম্মু আব্বু দিলেন না। তাদের দিক থেকে তাঁরা ঠিক আছে। আমার ছেলেটা তো ভালো না। উগ্র স্বভাবের, গুন্ডাদের মতো হাবভাব। পুরাই বখে গেছে। আমি মেনে নিলাম। কিন্তু ছেলে তো মানছে না। বলছে তুমি রাজি। তোমার আব্বু আম্মু ভালোয় ভালোয় না মানলে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে। সোজা হুমকি দিয়েছে। কতটা বেয়াদব ভাবতে পারো?”
আনিকা টু শব্দটি করতে পারে না। লজ্জা আর কান্নার সংমিশ্রণে কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত ভেবে পায় না। ইচ্ছে করে এই অস্বস্তিকর মুহূর্ত থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে।
“কিছু বলো?”
আনিকা অসহায় বোধ করে। ঘোলাটে দৃষ্টিতে চাচাকে দেখে নিয়ে বলল, “কি বলবো?”
“এটা বলো, তুমি কি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার ছেলেটার হাত ধরে রাখতে পারবে? বদরাগী হলেও আমার ছেলেটার মনটা আর পাঁচটা ছেলেদের তুলনায় খুবই নরম। তুমি আশা দিয়েছো তাই আকাশে উড়ছে। আশা ভাঙলে মুখ থুবড়ে পড়বে। নিজেকে সামলাতে পারবে না ও। আমি চিনি তো ওকে। পাতাবাহারের মৃত্যুতে কিভাবে কাঁদছিল নিজের চোখেই তো দেখলে। ও যাকে ভালোবাসে জান প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এখন তুমি বলো তুমি কি চাও?”
আনিকা দম আটকে বসে থাকে। চাচ্চুর কথায় কি জবাব দেবে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………