ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১৪ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
          আগামীকালের ম্যাচকে কেন্দ্র করে টিম মিটিং বসেছে। এগারো জন কাল মাঠে নামলেও দলের পনেরো সদস্যই উপস্থিত। তন্মধ্যে একজন অরুণাভ সরকার। সে কর্ণারে বসে চুপচাপ কোচ আর সিনিয়র মেটদের আলাপ আলোচনা শুনছে। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে কোচ মঈনুল হোসেন অরুণাভকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“খালি মুখে আলাপ জমছে না। যা কফি নিয়ে আয় সবার জন্য। সাথে চাওমিন বাগেরা কিছু পাস তো আনিস।”

অরুণাভকে নড়তে না দেখে মঈনুল হোসেন একটু উঁচু গলায় বলল, “কি রে অরুণাভ, কানে ঢুকে নি? জলদি যা!”

অরুণাভ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অলস ভঙ্গিতে হেলতে দুলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মোহন আমতা আমতা করে কোচকে বলে অরুণাভের পেছনে ছুটে যায়। কোচ মঈনুল হোসেন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল, 

“এসির ঠান্ডা হাওয়ায় আয়েশ করা গতর তাঁর। চোট পাওয়ার আগেই বাড়িতে ডাক্তার এসে হাজির হয়। ওলিতে গলিতে খেলার রিপোর্ট ভালোই। তবে মেজাজ আছে লাট সাহেবের। সাম্প্রতিক সোসাল মিডিয়ায় এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখলাম দুটো ছেলেকে বেধরক মেরেছে। ঘটনা পুলিশ অবদি চলে গিয়েছিল। বাপের টাকার অভাব নেই। রাতারাতি সব সামলে নিয়েছে। এখন দেখি লাট সাহেবের মেজাজের বাঁধ কতটা প্রেসারে ভাঙে!”

অরুণাভ আগে হাঁটে। মোহন ট্রে নিয়ে পেছনে আসে আর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, “ইচ্ছে তো করছে কফিতে এক্সট্রা সুগার মিশিয়ে দিই।”

“এক্সট্রা সুগার বলতে?”

“ওয়াক থু!”

অরুণাভ নাক মুখ বিকৃত করে বলে, “ইয়ু!”

মোহন দাঁত কেলায়। কাঙ্খিত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অরুণাভ ট্রে নিজ হাতে নেয়। মোহনকে ইশারা করে দরজা খুলতে। মোহন দাঁত কটমট করে বলে, “তোকে সহ্য করি কারণ তুই আমার একমাত্র ক্রাশের ছেলে।”

“তুই আব্বুর হাতে কেলানি খাবি তবেই শুধরাবি!”

“পাতাবাহারের জন্য আমি কেলানি খেতেও প্রস্তুত! টুরু লাভ! বুঝলি বাডি?”

“অসহ্য!” অরুণাভ বিড়বিড় করতে ভেতরে প্রবেশ করে। সেন্টার টেবিলে ট্রে রাখতে না রাখতেই মঈনুল হোসেন পরবর্তী আদেশ প্রদান করে, “হাতে হাতে দে সবার। আর প্লেটে চাওমিন সার্ভ কর!”

অরুণাভ বিনয়ের সাথে সবার হাতে কফি তুলে দেয়। যে ছেলে একগ্লাস পানি ঢেলে খায় নি, নিজ প্লেটে নিজে খাবার সার্ভ করে নি সে অন্যকে খাবার সার্ভ করে দিল। টিম মিটিং শেষ হলে অরুণাভ নিজেদের রুমে ফিরে আসে। মোহন বন্ধুকে ফিসফিস করে বলল, “কোচ স্যারের সাথে কি তোর কোনো ঝামেলা হয়েছে?”

অরুণাভ মুচকি হাসলো। তাঁর হাসি বলে দিচ্ছে ঘাপলা আছে। মোহন নড়েচড়ে বসে, “আবার কি ঝামেলা টেনে এনেছিস?”

অরুণাভ কিছু বললো না। বিছানায় উঠে বালিশের বর্ডার বানায়। মোহন লাফিয়ে বিছানায় উঠে বর্ডার ভেঙে দিয়ে বলল, “বলবি নাকি তোর নাক ফাটাবো?”

“প্রথম দিন প্র্যাকটিসের পর কোচের বাড়িতে আমাদের দাওয়াত ছিলো মনে আছে?”

“হ্যাঁ আছে! তুই আগে বল!”

“কোচের দেখাদেখি সবাই জুতো খুলে রেখে বাড়ির ভেতরে গিয়েছিল। অথচ আমি শু পরেই বাড়িতে ঢুকেছিলাম।”

মোহন হা করে তাকিয়ে। অরুণাভ হামি তুলে বলল, “কোচের মা পান মুখে নিয়ে আমার সাথে কথা বলছিলো। মুখের লালা ছিটে লাগছিলো গায়ে। তাই বলেছিলাম আন্টি পান ফেলে কথা বলুন, লালা ছিটকে লাগছে।”

মোহন কম্ফোর্ট মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। অরুণাভ হেসে বলল, “চা খেলাম না? কাপ থেকে ডিমের বিদঘুটে গন্ধ আসছিলো।‌ আমি এবার আর বললাম না। তবে চা-ও খেতে পারি নি। অবহেলায় কাপ সেন্টার টেবিলে পরেছিল। কোচ শুধু দাঁত কটমট করছিলো। কাহিনী এখানেই শেষ হলে পারতো। কিন্তু...”

মোহন কম্ফোর্ট সরিয়ে কৌতুহলী হয়ে বলে, “কিন্তু?”

“কোচের মেয়ের সাথে একটু হেসে হেসে গল্প করেছিলাম। ওরই বাগানের ফুল ছিঁড়ে দিয়েছিলাম। স্যার দেখে নিয়েছে বাডি!”

মোহন কম্ফোর্টে নিজেকে ঢেকে নিয়ে বলল, “তুই আমার বন্ধু টন্ধু না বুঝলি? কোচের সামনে ভুলেও আমার আশেপাশে থাকবি না।”

অরুণাভ হাসলো। বিছানার মাঝ বরাবর বর্ডার দাঁড় করিয়ে সাবধান করে, “ভুলেও যদি এপাশে আসার চেষ্টা করিস এক শটে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিবো।”

“চোর নিজেই চুরিবিদ্যার নিন্দে করছে।”

“কি বলতে চাচ্ছিস তুই?”

“এটাই যে, আমার ঘুমের সুযোগ নিয়ে উল্টোপাল্টা কাজ করিস। অথচ এখন বর্ডার বানিয়ে সাধু সাজছিস।”

অরুণাভ ক্ষ্যাপাটে বাঘের মতো হামলে পড়ে। মোহন নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখে বলে, “আমি মিথ্যে বলছি না। তুই ঘুমের ঘোরে মুখ হাতাস। বিড়বিড় করে কি যেন বলিসও! তবে শুধু মুখ হাতাস বলে আমি কিছু বলি না। অন্যকিছু হাতালে…”

অরুণাভ মোহনের মুখে বালিশ চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে, “শা*লা তোর চরিত্রে ঘাপলা আছে। আমি কালকেই রুম চেঞ্জ করে নিবো।”

মোহন মুখের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে স্বভাবে বাংলা সিনেমা মিশিয়ে বলে, 

“নাআআআ এ হতে পারে না! তুমি এমনটা করতে পারো না বাডি। তুমি চলে গেলে আমার কি হব্বে? এমন কথা বলো না। রাগ কোরো না, সোনা। আসো তোমাকে চুমু খাই… উমম…”

মোহন ঠোঁট চোখা করে চুমু দিতে চায়। অরুণাভ ছিটকে সরে যায়। বালিশ ছুড়ে মেরে বলে, “গু খা!”

মোহন ঝলমলে হাসিতে ফেটে পড়ে। অরুণাভ হাসলো না। বিছানা থেকে ফোনটা নিয়ে কাউচে গা এলিয়ে দিল। মোহন কতক্ষণ নিজে নিজেই হাসলো। বন্ধুর বিমর্ষ মুখ খানি দেখে হাসি থামিয়ে বলল, 

“আসার পর থেকেই খেয়াল করছি কেমন মনমরা হয়ে থাকিস! কারো সাথে সেভাবে কথা বলিস না। প্র্যাকটিসেও আগের মতো জোশ ভাবটা নেই। কি হয়েছে রে?”

“তেমন কিছু না। এই ছোটখাটো ফ্যামিলি ইস্যু!”

মোহন দাঁত আর কথা বাড়াল না। পার্সোনাল বিষয় গুলো পার্সোনাল থাকাই ভালো। সে শুয়ে পড়লো। অরুণাভ ফোনে মত্ত হয়। বাবার নাম্বারে কল লাগায়, উদ্দেশ্য মায়ের সাথে কথা বলা। রিসিভ হতেই ডাকলো,

“আব্বু?”

সাঁড়া দিলো না কেউ। অরুণাভ আবারও ডেকে বললো, “ও আব্বু? ঘুমিয়ে পড়েছো নাকি? হ্যালো হ্যালো?”

অরুণাভ উঠে বেলকনিতে চলে যায়। হয়তো সিগন্যাল পাচ্ছে না। 

“হ্যালো আব্বু, কিছু শুনতে পাচ্ছি না! হ্যালো?”

“তোমার আব্বু যে কোথায় গেল! দাঁড়াও ডেকে দিচ্ছি!”

পাতার গলায় অরুণাভের হাত পা হিম হয়ে আসে। কান্নারা গলায় কুন্ডলী পাকায়। পাতা গা হতে উষ্ণ কম্বল সরিয়ে উঠে বসলো। হামি তুলে আলো জ্বালায়। পাশে তাকিয়ে দেখে প্রহর হা করে ঘুমোচ্ছে। পাশের বালিশ ফাঁকা! এই মাঝরাতে কোথায় হাওয়া হলো লোকটা?

“আম্মু?”

“হুঁ?”

অরুণাভ কৎ করে ঢোঁক গিলে বলল, “কেমন আছো?”

“ভালো।”

পাতার স্বাভাবিক সুর। অরুণাভ পরবর্তী প্রশ্নের জন্য কয়েক মুহুর্ত অপেক্ষা করে। কিন্তু পাতা ভালোমন্দ কিছুই জানতে চাইলো না। 

“উনি বোধহয় বেলকনিতে। আমি ডেকে দিচ্ছি।”

“থাক, ডেকো না। আমি তোমার সাথেই কথা বলতে ফোন করেছিলাম। আমার ফোন কেন ধরছো না? কি হয়েছে?’’

অরুণাভ হুট করেই উত্তেজিত হয়ে উঠল। পাতা নিরেট হয়ে বলল, “তেমন কিছুই না।”

“তাহলে কেমন কিছু? আমি এখানে আসার পর থেকেই লাগাতার ফোন দিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে তো রিং হয়, পরে নট রিচেবল বলে। তুমি ইচ্ছে করে করছো তাই না?”

“আমি ইচ্ছে করে কেন করবো?”

অরুণাভ যতটা আবেগঘন কণ্ঠে প্রশ্ন করলো তাঁর চেয়ে কয়েকগুণ শান্ত সুরে পাতা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলো। অরুণাভ কয়েক মুহুর্তের জন্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যিই তো! ইচ্ছে করে কেন তাঁর কল ইগনোর করবে, ফোন বন্ধ করে রাখবে? এর পেছনে তো যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। অরুণাভ শান্ত হয়ে গেলো নিমিষেই। বলল,

“তাও ঠিক!”

পিনপতন নীরবতা। পাতা ফোন কানে রেখেই বালিশে মাথা রাখে। উষ্ণ কম্বল আবারও গায়ে টেনে নেয়।

“তুমি কি ঘুমিয়ে ছিলে?”

পাতার চোখ লেগেছিলো। অরুণাভের প্রশ্নে চকিত ভঙ্গিতে চোখ মেললো। বলল,

“হ্যাঁ! রাত তো অনেক হয়েছে। তুমি ঘুমাও নি?”

“ঘুম আসছে না।”

‘কেন?’ প্রশ্নের আশা করলেও প্রশ্ন মিললো না। অরুণাভ হতাশ হলো খুব। তবে আশা ছাড়লো না। সে জোশের সাথে বলতে শুরু করলো,

“আম্মু, আমার বন্ধু মোহনের কথা বলেছিলাম কি তোমাকে? ও সবসময় তোমার কথা বলে। তোমার সাথে কথা বলতে চায় হরদম। মিরপুরে যেদিন খেলা হবে সেদিন কিন্তু তুমি খেলা দেখতে আসবে! ওঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিব তোমাকে। এর আগেও করিয়েছিলাম একবার। তোমার কি মনে আছে?”

“না”

“আরে ওই যে শ্যামলা করে ছেলে! মাথায় কোঁকড়া চুল। তুমি হাত বুলিয়েও দিয়েছিলে ওঁর মাথায়। ও তখন ব্লাস করছিল। কালো বলে বোঝা যাচ্ছিলো না।”

অরুণাভ কথা বাড়ানোর জন্য বন্ধুর আলাপন চালিয়ে যায়। তাঁর মধ্যে বন্ধুর কুকীর্তিই বেশি। চঞ্চলা কণ্ঠে বিরামহীন বলে চলেছে সে। পাতার চোখে অগাধ ঘুম ছেয়ে আছে। অরুণাভের অস্পষ্ট শব্দমালা বিরক্ত লাগছে।

“আম্মু জানো কি হয়েছে…”

“ফোন রাখি? আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”

অরুণাভের কথাগুলো অসম্পূর্ণ থেকে গেল। উজ্জ্বল মুখটা আবারও ফ্যাকাশে হয়ে আসে। মন খারাপের রেশ অব্যহত রেখে বলল, “আমার উপর অনেক রাগ জমে আছে তাই না?”

পাতা হাসলো ক্ষণ, “আমি কারো উপর রাগ করি না ভোর। রাগ যা আছে আমার নিজের উপরেই আছে। বারবার আশাহত হবার পরেও এতোটা আশা রাখা উচিত হয় নি।”

“হুঁ, ফোন রাখলাম। ঘুমাও, বিরক্ত করার জন্য স্যরি।”

অরুণাভ কল কেটে দেয়। পাতা ফোন ছুঁড়ে উদ্দেশ্যহীন। ঘুমের ঘোরে ফোন রিসিভ করেছিল সে। ভোর কল করেছে জানলে রিসিভই করতো না। পাতা হাই তুলে চোখ বুজে নেয়। আশ্চর্যের বিষয় একটু আগেই ঘুমে চোখ মেলে রাখা দায় হয়েছিল কিন্তু এখন ঘুম নেই চোখে! পাতা কতক্ষণ জোর করেই ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। আকস্মিক এক অদ্ভুত বিষন্নতা তাঁকে জাপ্টে ধরেছে। কম্বল সরিয়ে উঠে বসে সে।

অরুণ সরকার পাশের রুমেই। কার্পেটের উপর বিছানো বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসেছে। কোমড় অবদি সফেদ লেপ দিয়ে ঢাকা। কানে হেড ফোন লাগিয়ে ল্যাপটপে কারো সাথে ধীমে আওয়াজে কথা বলছে। পাতার আগমনে নজর উঠালো। খেয়াল করলো বউটির ভ্রূকুটির ভাঁজে জগতের সমস্ত বিরক্তি এসে ভিড় জমিয়েছে।

“ঘুম ভেঙ্গে গেছে?”

পাতা জবাব দিলো না। পাশে এসে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। অরুণের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে লেপ উঠিয়ে দেয় পাতার গায়ে। কিছু না বলে মিনিট বিশেক সময় নিয়ে কনফারেন্স শেষ করলো। পাতা তখনও চাতক পাখির মতো জেগে। অরুণ কোলে বালিশ চাপিয়ে পাতার মাথা তুলে নেয়। খোঁপা খুলে চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে ঝুঁকে আসে। বধূয়ার ললাটে স্নেহভরা চুমু দেয়। খেয়াল করে মানবীর চোখের কার্ণিশ বেয়ে জল গড়াছে। অরুণের বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যথার উদ্রেক হয়। 

“সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এতোটা আপসেট হলে হয়?”

“সামান্য বিষয়?” 

পাতার প্রশ্নের ঢং ব্যতিক্রম। অরুণের মনে হলো এখন বড়সড় একটা ঝামেলা হবে। তাই সে স্বভাব সুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “সামান্য বিষয় নয় কিন্তু এতোটা আপসেট হবার মতোও তো নয় পাতাবাহার। তোমাকে মনমরা দেখলে আমার ভালো লাগে না।”

“তো কি সুখে হি হি হি করে হাসবো?”

“হাসো… তুমি হাসলে আমার সুখ সুখ লাগে।”

“ওত হাসি আসে না ভোরের বাবা। পেট আমার ফুলবে, আপনার না।”

হঠাৎ হাসি পেলেও অরুণ সরকার হাসার ভুল ভুলক্রমেও করলো না।

“এই বয়সে এসে ফুটবলের মতো পেট নিয়ে সকলের সামনে আমাকে ঘুরতে হবে। মানুষের টিটকারী, কটুক্তি শুনতে হবে। ভোর অরু দু'জনেই যথেষ্ট বড় হয়েছে। এখন প্রেগন্যান্ট হলে ওদের কতটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে? আমিই বা ওদের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো? চোক্ষুলজ্জাও বলে কিছু হয় ভোরের বাবা। আপনার না থাকুক আমার আছে। প্রহরকে নিয়েই মাঝে মাঝে অস্বস্তিতে পরতে হয়। আবার আরেকজন হাই হ্যালো করছে। হাসার কিছু বলি নি আমি যে দাঁত দেখাবেন!”

অরুণের গাম্ভীর্যে আঁকা চিকন ওষ্ঠাধরে হাসি ফুটতে চাইলেও পাতার ঝাড়িতে অনেক কষ্টে আটকে রাখে। তবে চোখের তারায় উঁকি দেওয়া হাসিটুকু লুকাতে ভুলে যায়। ওই গভীর হাস্যোজ্জ্বল ছোট ছোট চোখজোড়ার দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে পাতা নিমিষেই নীরাবতাকে বেছে নেয়। কিন্তু তাঁর মেঘধরা চোখ দুটো নিজস্ব ভাষায় অনেক কিছুই জানিয়ে দিচ্ছে। অরুণ পাতার মাথা উঁচু করে বুকে জড়িয়ে নেয়। উন্মুক্ত ঘারে নাক ডাবিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 

“এখনো কনফার্ম হয় নি, তাই না? সকালে চেক করো একবার। তারপর আমরা বিকেলে ডাক্তারের কাছে যাবো। এপোয়েন্ট নিয়েছি আমি।”

পাতার হেলদোল নেই। অরুণ বুঝানোর চেষ্টা করে তাঁকে, “জন্ম মৃত্যু আল্লাহ পাকের হাতে। তিনি যদি অসময়ে কাউকে আমাদের মাঝে পাঠান, আমরা অস্বীকার করার কে?”

পাতা এখনও নিরুত্তর। অরুণ সরকার একাই বলে যায়। যখন বুঝলো তাঁর বলা বৃথা যাচ্ছে তখন ফোঁস করে শ্বাস ফেলে চুপ থাকলো। পাতা হঠাৎ মাথা তুলে অরুণ সরকারের চোখে চোখ রেখে বলল, 

“আপনার ছেলে ফোন করেছিল!”

অরুণের চওড়া কপালে তীক্ষ্ম ভাঁজ। অবুঝ ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো, “আমার ছেলে?”

“হুঁ”

“ভোরের কথা বলছো?” অরুণের কণ্ঠে বিস্ময়।

“হুঁ।”

অরুণ ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল, “তোমার অতি আদরের ভোর সোনা হঠাৎ ‘আমার ছেলে’ কি করে হয়ে গেল?”

পাতাও হাসলো, “সে আমার ছেলে না।”

অরুণ ভেবেই নিলো সে ভুল শুনেছে। অপ্রস্তুত হেসে বলল, “কি বলছো?”

“ছোট বেলায় লুকিয়ে চুরিয়ে ওঁর মায়ের সাথে কথা বলতো। আমি কষ্ট পেতাম। তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম। বাচ্চা ছেলে, একটু বুঝ আসলে আর ও মুখো হবে না। আমার ধারনা ভুল ছিলো। ভোর এখনও ওঁর মায়ের জন্য কাঁদে, কথা বলে, দেখা করে। অথচ আমি বোকার স্বর্গে বাস করছিলাম। আমি তো জানতাম ওঁর আগে, পিছে, পাশে শুধু আমিই আছি, ওঁর মা শুধু আমিই। কিন্তু ভোর আবারও প্রমাণ করে দিলো আমি ওঁর মা হতে পারি নি।”

পাতা প্রতিটি শব্দ অতি সহিষ্ণুতার সাথে ব্যক্ত করে। গলা কাঁপে না, চোখ ছেপে জলটুকুও আসে না। শুধু অধরে এঁকে আছে ম্লান হাসি। সেই হাসি অরুণ সরকারের মুখের রং উড়িয়ে নিয়ে গেলো। কিছু সময় তো সে কথা বলতে পারলো না। গলায় কষ্টরা দলা পাকিয়ে স্বররজ্জুকে বরফ করে রেখেছে। লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে অরুণ সরকার নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

“ভুলটা আমার পাতাবাহার। ওই মহিলা চলে যাওয়ার পর ভোর খুব কাঁদতো। কাঁদতে কাঁদতে দম আটকে যেতো। কিচ্ছু খেতো না। অনেকটা বাধ্য হয়েই ফোন করতাম…”

পাতা হাত তুলে থামিয়ে দেয় অরুণকে। পূর্বের মতো হিম করা কণ্ঠে বলে, “এই বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না। যার যা খুশি করুক, আমার কিছু যায় আসে না। ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমাবো!”

কথা শেষ করেই পাতা উঠে দাঁড়ালো। অরুণের দিকে না তাকিয়েই ঘর ছাড়তে উদ্যত হয়। দরজা অবদি গিয়ে কি মনে করে থেমে গেলো। পিছু ফিরে উদাস মনে বলল,

“আচ্ছা, আপনিও কি ওনার কথা ভাবেন? ছেলের মতো আড়ালে আবডালে দেখা সাক্ষাত করেন নাকি আবার? শত হোক প্রথম ভালোবাসা! ওত সহজে ভোলা যায় নাকি?”

অরুণ সরকার অনুভূতিহীন চোখে চায়। কয়েক গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাতা ঘন পাপড়িতে আবিষ্ট ওই ছোট ছোট চোখের ভেতর জমা জলকনার হদিশ খুঁজে পেল কি? হয়তো না। পাতা জবাবের অপেক্ষায় না থেকে দরজা টেনে দিয়ে ঘরে চলে যায়।

অরুণ ঠাঁয় বসে। শরীরে তাঁর এক চিমটি বল নেই। সম্পূর্ণ শরীর কি তবে প্যারালাইজড হয়ে গেলো? এমন লাগছে কেন তাঁর? আধ ঘণ্টার মতো সে মূর্তির মতো বসেই রইলো। বুকের ধড়ফড়ানি শান্ত হলেই সে ভারী শরীর টেনে ঘর অবদি গেলো। বিছানা ফাঁকা দেখে অরুণের বুকের ব্যাথা বেড়ে গেল। তাঁর জন্য বরাদ্দ অক্সিজেন বুঝি শেষের পথে! অথচ সে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে আরো কয়েক যুগ বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনে এসেছে। 

—————

“হ্যালো, সায়ান?”

ভরাট গলার কাশির শব্দে অরুণিতার মেরুদন্ড বরাবর শীতল ঢেউ খেলে গেলো। অদ্ভুত অনুভূতি মাথা চাড়া দিয়ে গেলো। এ তো সায়ানের আওয়াজ না! কে এই মানব? অরুণিতা ভাবনা ঠেলে কণ্ঠে গম্ভীর ভাব এনে বলল, “সায়ান, ইজ দ্যাট ইয়্যু… ওর সামবাডি এলস?”

“ওই, ইংরেজদের বংশধর! বাংলা বলতে মুখে ব্যথা লাগে তোর?”

অরুণিতার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো বুঝতে এই গেঁয়ো, অভদ্র, চরম মাত্রার বিরক্তিকর মানব কে হতে পারে! অরুণিতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ইয়্যু নো হোয়াট….”

“ইয়েস আই নো হোয়াট। W-H-A-T ; এর মানে হলো ‘কি’! মানে বলছিলাম হোয়াট শব্দের অর্থ ‘কি’। আবার ভাববি না ‘হোয়াট শব্দের অর্থ কি’ সেটা জিজ্ঞাসা করছি। তুই কি বুঝেছিস আমার কথা? নাকি আরেকবার বলবো!”

ওপাশের নীরাবতা টের পেয়ে সোহরাব শেখ গর্ব বোধ করলো। পিচ্চি একটা মেয়ে কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়ে। এটা সহ্য করা যায়? মেয়েটার ইংলিশ তাকে যেন তাচ্ছিল্য করে। চিল্লিয়ে বলে, তুই মাধ্যমিকে ইংরেজিতে ডাবল জিরো পেয়েছিলি। 

“কি রে চুপ মেরে গেলি ক্যান?”

অরুণিতা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে। লোকটার মাঝে বিন্দুমাত্র ভদ্রতাবোধ নেই। সে দাঁত কটমট করে বলল, “আপনার মতো অভদ্র, অসভ্য, ঠোঁট কাটা, ইতর মানুষ আমি দু'টো দেখি নি।”

“কিন্তু আমি আরেকটা দেখেছি!” সোহরাব চট করেই উত্তর দিলো। মনটা তাঁর বেশ ফুরফুর করছে।

“আচ্ছা কে সে?” অরুণিতা অনাগ্রহ ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো। । 

কিন্তু সোহরাব তো সোহরাবই। সে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল, “তুই!”

অরুণিতা খুব সহজে রাগে না। সে বাবার মতোই ঠান্ডা মাথার মানুষ। কিন্তু এই মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলো না। সে অত্যন্ত ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “ইয়্যু আর আ পেইন ইন দা নেক!”

পরবর্তী জবাব সোহরাবের ঠোঁটের আগায় এসেছিল। হা-ও করেছিল। কিন্তু এই মেয়ের ইংরেজি তাকে আঁটকে দিলো। এঁকে তো ইংরেজি তাঁর কম বোধগম্য হয়। তার উপর ফিরিঙ্গীদের মতো ফরফর করে বললো! সোহরাব শেখ হালকা করে কেশে নিয়ে বলল,

“তোর ঘারে ব্যাথা তো আমি কি করবো? ওষুধ খা। এক কাজ করতে পারিস, ‘পাগলা মলম’ লাগিয়ে মালিশ কর। ব্যথা মিনিটের মধ্যেই ছু মন্তর। আমার গর্দান, পিঠ, কোমড়ে ব্যথা উঠলে খলিল্ল্যারে দিয়া মালিশ করাই। তুই বলিস তো খলিল্ল্যারে পাঠাই?”

অরুণিতা যেন রণমুর্তি! ধারালো বর্শা হাতে ফোঁস ফোঁস করছে। যেকোনো সময় সোহরাব শেখের বুক এফোঁড়ওফোঁড় করে দিবে। এই লোক নিজেকে ওভার স্মার্ট ভাবে? তাঁকে নিয়ে মজা করছে? তাঁকে পঁচাচ্ছে! কত্তবড় সাহস! 

“ইয়্যু আর ফুল ওফ বুলশিট! হু দা হেল ডু ইয়্যু থিংক ইয়্যু আর?”

রাগে অরুণিতার কথা জড়িয়ে আসছে। সোহরাব মাথা চুলকালো। তারপর চব্বিশ পাটি দেখিয়ে হাসলো। দুষ্টু স্বরে বলল, “আংরেজিতে কইছস মানে ঠিকই কইছোস!”

এই লোক নিজেকে কি ভাবে? তাকে পচাচ্ছে, হাসির খোরাক বানাচ্ছে! রাগে ক্ষোভে অরুণিতা হাতের ফোন ফিক্কে মারতে উদ্যত হয়। যখন মনে উদয় হয় হাতের আই ফোনটা তাঁর মাম্মামের, তখন নিজেকে গুটিয়ে নিলো। তবে ওপাশের ব্যক্তির উপর রাগ বিন্দুমাত্র কমলো না। সোহরাব দাঁত দিয়ে আঙুলের নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, “কি হলো? কথা বলছিস না যে!”

“আপনার সমস্যা কি?” 

এবার আর ইংরেজি বললো না। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে তাঁর। সোহরাব মেঝে থেকে পা তুলে বেতের চেয়ারে বাবু হয়ে বসলো। চোয়াল চুলকে বলল, “কোষ্ঠকাঠিন্য!”

“হোয়াট?” অরুণিতা চাঁপা স্বরে চেঁচায়।

সোহরাব কণ্ঠে দুঃখি দুঃখি ভাব মিশিয়ে বলল, “দুলাভাই বিচিকলা এনেছিল। সেটা খেয়েই পেট টাইট হয়ে আছে। আমি সোহরাব শেখ মানুষটা যুতের না। আমার পেট টাইট করেছে, আমি তার ভুরি ঢিলে করে দিয়েছি। সে ঘণ্টা দুয়েক ধরে ওয়াশ রুম দখল করে বসে আছে।”

“এসব আমাকে কেন বলছেন?”

“তুইই তো জানতে চাইলি!”

অরুণিতার মাথা চক্কর দিলো। এ লোকের মাথায় নিশ্চয়ই সমস্যা আছে! পাবনা থেকে পালিয়ে আসা মানসিক রুগীও হতে পারে। সে চোখ উল্টিয়ে বলল, “ইয়্যু আর দা মোস্ট ডিজগাস্টিং পিপল আই এভার মেট!”

“সেম সেম” সোহরাব শেখ কান চুলকে বলল।

“গো টু হেল!”

“আবারও সেম সেম!”

অরুণিতার অতিরিক্ত রাগে কান্না আসে। কান্নার স্বরে বলে, “আ’ল কি*ল ইয়্যু!”

“আ’ল কিল ইয়্যু ঠ্যু, সোনা।”

সোহরাব টেনে টেনে বলে। অরুণিতা মাথা হ্যাং হয়ে আসে। এই লোক এতো রাত ফোন দিয়ে বিটলামি শুরু করেছে! 

“লজ্জা করে না আপনার?”

“ওই ডিভাইসটা আমার মাঝে কম কম আছে। যাইহোক তোরে একটা কথা বলার জন্য ফোন দিছিলাম।”

অরুণার ভ্রু একত্রিত হয়। সোহরাব নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে বলে, “আসলে আমি একটা স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন না আসলে… স্বপ্নের এই ঘটনা টুক আমার সাথে এর আগেও ঘটছে। গভীর রাতে হসপিটালে একটা নবজাতকের কান্নার শব্দ! পরদিন নবজাতককে কোলেও নিছিলাম। নাদুসনুদুস মিষ্টি একটা বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু নাকটা বোচা।”

অজান্তেই অরুণিতার হাত নাক ছুঁয়ে দেখে। ফোনের ওপাশে সোহরাব শেখের গা জ্বালানো হাসি ভেসে আএ! অরুণিতার তাঁর ধ্যানে সোহরাব শেখের বুক বর্শা দিয়ে ঝালাফালা করে দিয়েছে। সোহরাব শেখ মেঝেতে শুয়ে তরপাচ্ছে। 

“যেটা বলতে ফোন দিছিলাম! খরগোশ কই রে? আই মিসড মায় শালা বাবু!”

অরুণিতা মুখ থেকে কঠিন কিছু নির্গত হতে চাইছে। অনেক কষ্টে নিজ লাফজ সংযত করে বলল, “ডোয়াট ডু ইয়্যু মিন বায় শালাবাবু? সেদিনের থাপ্পড়ের কথা ভুলে গেছেন নাকি?”

সোহরাব ফুরফুরে মেজাজ বিগড়ে গেলো। ভুলে যাবে? অসম্ভব! ঊনত্রিশ বছরের জীবনে প্রথম থাপ্পড় ছিলো। এর আগে কেউ তাঁর গায়ে হাত তোলা দূর, ফুলের টোকা দেওয়ার সাহস করে ওঠে নি। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের চোখের মণি সে। 

“তুই আস্ত বেয়াদব। তোর মাঝে সামাজিকতা নেই।”

“সেম সেম!” অরুণিতা ঝলমলে হাসি উপহার দিলো। এখন একটু শান্তি শান্তি লাগছে।

“তোকে তো দেখে নিবো!” সোহরাব রাগী রাগী গলায় বলল।

“আমি মনে হয় ভয়ে কাঁপছি!” 

অরুণিতার শ্লেষযুক্ত কথা সোহরাব চোয়াল চুলকায়। একটু সময় নিয়ে ভেবে বলে, “সোনা, বেশি বাড় বেড়ো না, ডানা দুটো কেটে দিবো। সোহরাব শেখের সাথে নো পাঙ্গা! জীবন ঝালাপালা করে দিবো এক্কেরে! এখন ফোনটা শা*লাবাবুর কাছে দাও। আবার ভেবো না খরগোশকে শা*লাবাবু ডেকে তোমার সাথে লাইন সেট করতে চাইছি। সোহরাব শেখের রুচি এতোটাও পচে যায় নি, সারাজীবন আটার বস্তা টানতে পারবো না আমি। আমার বউটউ এলে খরগোশকে তাঁর ধর্মের ভাই বানিয়ে দিবো বুঝলে?”

“ওয়ে মিস্টার কালো ভাল্লুক! সায়রা মিস পাপাকে ভাইয়া ডাকে। সো আমার ভাই আপনার ভাগ্নে টাইপ কিছু হয়। আপনি তাঁকে শা*লাবাবু ডাকছেন? সো সেমফুল!”

সোহরাব কেশে উঠলো। আমতা আমতা সুরে বলল, “আপার সাথে আমার সাম নাই। তাছাড়াও তোর ভাই দুলাভাই ডাকে আমাকে।”

“সে আপনি ওঁর মাথা খেয়েছেন। কি বলেছিলেন ওকে? আপনার নাম দুলাভাই! আপনি একটা নাম্বস্কাল!”

সোহরাব তেতে উঠলো, “একদম ইংরেজিতে গালি দিবি না। আমি বাংলা ভার্সন শুরু করলে তোকে মিনিটে একশ তেত্রিশ বার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে হবে।”

অরুণিতা নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে হাসে। বুঝতে পারে অভদ্র লোকটা ইংরেজি বুঝতে পারে না। আকস্মিক তাঁর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি নাড়াচাড়া দিলো। কিছু বলার প্রস্তুতি নিতেই ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলী ঝাঁঝালো গলা শোনা গেলো!

“বাবু, তোর দুলাভাই তিন ঘণ্টা ধরে ওয়াশ রুমে। কত ডাকছি, কোনো সাড়াশব্দ নেই। এখন তো আমার টেনশন হচ্ছে। তুই এতো বজ্জাত কেন হলি বল তো? কাউকে একদন্ড স্বস্তি দিস না। এক্ষুনি দরজা ভেঙে তোর দুলাভাইকে বের কর!” 

সায়রা মিসের গলা এটা। তারমানে অভদ্র লোকটা মিথ্যে বলে নি তখন। দুষ্টু বাচ্চাদের সে দুচোক্ষে সহ্য করতে পারে না। আর এটা তো বড়ো ষাঁড়!

“কাইল্যা, বুইড়্যা, ধ্যামনা বেডারে কয় বা…বু! ওলে লে কচি করে বাবুতা!” 

সুর তুলে ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে ভর্ৎসনা করে অরুণিতা। ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই চট করে কল কেটে শয়তানি হাসে। 

ওদিকে সোহরাব রেগে মেগে খুন। কি বললো ওই দুদিনের মেয়ে? আবার মুখের উপর কলও কেটে দিয়েছে। ‘আস্ত বেয়াদব’ বিড়বিড় করে সোহরাব পাশে তাকায়। ভাগিনা তাঁর মুখ গোমড়া করে বসে আছে। চোখে মুখে দুঃখের ছাপ। সে ভ্যাবলাকান্তের মতো একটা হাসি দিলো। তারপর দরোজায় দন্ডায়মান বোনের দিকে তাকালো।‌ 

সায়রা শেখ ঝাঁঝালো গলায় ডাকলো, “বাবু?”

“আপা বয়রা না আমি!”

“তোর দুলাভাইকে ওয়াশরুম থেকে বের কর।”

“আপা, একটু পর আপনে আপ বের হয়ে আসবে। টেনশন বাদ দাও তো! ডাইনিং টেবিলের উপর মেট্রো ট্যাবলেট রেখেছি। দুলাভাই বেরোলে খাইয়ে দিয়ো।”

সায়রা শেখ অতিষ্ঠ হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। পাঁচ বোনের এক ভাই। অতি আদরে আদরে বাঁদর বনে গেছে। বড্ডো জ্বালিয়ে মারে, বাদ যায় না একটা কেউ। কারো কথাই শুনে না। যা মন চাইবে তাই করবে। ভাববেও না, এই কাজের পরিণতি কি হবে! বড্ড বাউন্ডুলে স্বভাবের। তিনি ফোঁস করে শ্বাস ফেলে প্রস্থান নেন।

বোনের থেকে দৃষ্টি হটিয়ে সোহরাব শেখ ভাগ্নের দিকে তাকায়। জোড়া ভ্রু যুগল কুঁচকে নিয়ে বলে, “তোর আবার কি হলো?”

অভিমানে চোখ দুটো টলমল করে ওঠে সায়ানের। খানিকটা কর্কশ কণ্ঠে বলল, “মামু তোমার হাবভাব আমার সুবিধার ঠেকছে না। তোমাকে বলেছি, আবারও বলছি। আই লাইক অরুণিতা!”

“এ্যাই ল্যাইক অ্যালুনিতা” মুখ ভেঙ্গিয়ে বলেই সোহরাব হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসতে হাসতেই বলল, “দুনিয়ায় মেয়ের অভাব পড়েছে? তোর চয়েস খুবই জঘন্য। ওই বুচিকে দেখেছিস? আস্ত গিলে খাবে তোকে, ঢেঁকুর টুকুন তুলবে না। তোদের একসাথে দাঁড় করালে মনে হবে মোটু আর পাতলু কি জোড়ি!”

“মা…মু!” সায়ান রাগে চেঁচিয়ে উঠলো। সাথে সাথেই ঠাস করে চড় পড়লো গালে। সে কাঁদো কাঁদো মুখে তাকায় মামার দিকে।

সোহরাব দাঁত কপাটি দেখিয়ে ক্লোজ আপ হাসি দিলো। বলল, “আস্তে ভাগ্নে… আস্তে। আপা আসলে তোর পা*ছায় চামড়া থাকবে না। আপা কিন্তু খুব চালাক। তুই যে ওই বুচিটার প্রতি আকর্ষিত, তা আপা ওলরেডি বুঝে গেছে।”

“কি বলো!” সায়ান গালে হাত রেখেই বিস্ময় প্রকাশ করে। 

সোহরাব ভাগ্নের কোলে পা তুলে দিলো। সায়ান ভোঁতা মুখে পা টিপতে শুরু করলো। সোহরাব গালে হাত চেপে ভাবুক স্বরে বলল, “ভাগ্নে, ওই বুচি মেয়েটা সুবিধার না। পা থেকে মাথা অবদি অহংকার ঠুসে ঠুসে ভরা। তখেয়ে খেয়ে নিজেকে ফুটবল বানাচ্ছে। তাছাড়াও দেখতে আহামরি কিছু না। আমার পছন্দ হয় নি।”

“মামু, তোমার পছন্দ অপছন্দ জানতে চাইনি। আমার পছন্দ হয়েছে ব্যস। ওটাই তোমার বউমা হবে।”

সায়ান প টেপা বন্ধ করে নিজ মনোভাব দরবারে পেশ করলো। সোহরাব কটমট করে তাকিয়ে আবারও গালে ঠাস করে চড় মেরে দিলো। সায়ান গালে হাত রেখে ফোঁস ফোঁস করে বলল,

“মামু কথায় কথায় মারো কেনো?”

“তোর চাঁদ বরণ চেহারা দেখলেই আমার হাত নিশপিশ করে। হুমুন্দির বাচ্চা, মেয়ে হওয়ার ঘোষণা দিয়ে ছেলে হয়ে কেন জন্মেছিস? তোর জন্য আম্মার এক ভরি স্বর্ণ মানষের মেয়েকে দিয়ে দিতে হয়েছে। বাজারে এখন এক ভরি স্বর্ণের দাম জানিস?”

সোহরাব বলতে বলতে আবারও ভাগ্নের মাথায় চড় মারে। সায়ান মাথা ডলে বিরক্ত সুরে বলল, “মামু সেজন্যই তো বলছি অরুণিতার সাথে আমার লাইন সেট করে দাও। অরুণিতা আমাদের বাড়ির বউ হয়ে আসলে ওই এক ভরি তো আসবেই, সাথে পুরা সরকার জুয়েলারি ফ্যাশন হাউজ! মাম্মা চলে না বলো?”

সোহরাব চোখ বড় বড় করে ভাগ্নের দিকে তাকায়। মনে মনে কতক্ষণ ভাগ্নের বুদ্ধির প্রশংসা করে। তারপর কুটিল হেসে বলে, “ভাগ্নেরে… তোর বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। এক ভরি স্বর্ণ ফিরিয়ে আনার জন্য হলেও ওই অহংকারী মেয়েকে শেখ বাড়ির বউ বানাতে হবে।”

“শেখ না, মন্ডল বাড়ির বউ।” সায়ান সুধরে দিলো।

সোহরাব হেয়ালীর সুরে বলল, “বউ হবে এটা কনফার্ম তো! শেখ নাকি মন্ডল ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না ভাগ্নে।”

সায়ান খুশিতে গদগদ হয়ে মামার পা টিপে। মামু যখন বলেছে তাহলে অরুণিতা সরকার তাদের বাড়ির বউ হবেই হবে। সে উৎফুল্ল হয়ে বলল, “মামু, তাহলে আম্মুকে বলে অরুণিতার ফ্যামিলিকে রাজি করাও না?”

সোহরাব রেগে মেগে আগুন। ভাগ্নের পিঠে এলোপাথাড়ি হাত চালিয়ে বলল, “ব*গলে বা*ল গজায় নি আর উনি এসেছে বিয়ে করতে!”

“মা…মু! বিয়ের কথা থোরাই বলতে বলেছি! অরুণিতা যেন ময়না বুবুর বিয়েতে যেতে পারে সেই জন্য আম্মুকে বলে সরকার ফ্যামিলিকে রাজি করার কথা বলছি।”

সোহরাব শান্ত হলো। একগাল হেসে বলল, “ওহ্ তাই বল!”

“রাজি করাবে?”

“উম… আম্মাকে তো জানিস ভাগ্নে!”

“নানুকে আমি মানিয়ে নিবো। শুধু মাত্র অরুকে নানুবাড়ি নেওয়ার জন্য আমি আমার সমস্ত ফ্রেন্ড সার্কেলকে ময়না বুবুর বিয়েতে ইনভাইট করেছি। এখন অরুই যদি না যায় তাহলে আমি কচু গাছের সাথে ফাঁস দিবো।”

সোহরাব শেখ ভাগ্নের কাঁধ চাপড়ে দিল। ঠোঁটের উপর সদ্য উঁকি দেওয়া গোঁফের দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। বয়স কত ওঁর? তেরো পেরিয়ে চৌদ্দতে পা দিবে। এই বয়সে সে আব্বার পেছনে পাঁচ টাকার জন্য ক্যানুক্যানু করতো! আর এঁরা গার্লফ্রেন্ড বানাতে উদগ্রীব!

—————

অরুণিতার অধর কোনে এক চিলতে হাসি এখনও বিরাজমান। ফুলো গালের দুই পাশেই টোল পড়েছে। কাঁধ সমান চুল গুলো এলোমেলো করে অরুণিতা আনন্দ প্রকাশ করে। তবে পিছু ফিরতেই ঘন পল্লবে আবিষ্ট ছোট ছোট চোখ দুটো বৃত্তাকার হয়ে আসে। খুব দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে এনে বলল, 

“হোয়াই আর ইয়্যু লুকিং লাইক দ্যাট? ডিড ইয়্যু গাইজ সি আ ঘোস্ট অর সামথিং? ইজ ইট স্ট্যান্ডিং বিহাইন্ড মি?”

“ইয়েস, ইটস স্ট্যান্ডিং বিহাইন্ড ইয়্যু!” 

রূপক সরকার ফিসফিসিয়ে জবাব দিলো। অরুণিতা তাঁকে অনুকরণ করে ফিসফাস করে বলল, “শুড আই টার্ন অ্যারাউন্ড? ইজ দ্য ঘোস্ট রিয়েলি দ্যাট স্কেয়ারি?”

“ইয়েস, বাট নট মোর দ্যান ইয়্যু!” রূপক পূর্বের মতোই বলল।

অরুণিতা ঠোঁট চোখা করে বিরক্তিকর শ্বাস ফেলল। রূপক হেসে বলল, “কে ছিলো? বয়ফ্রেন্ড নাকি!”

অরুণিতার মুখটা গম্ভীর বানালো। বড় বোন আনিকা, আর নয়নের দিকে একপল তাকিয়ে জবাবে বলল, “ব্রো, ডোন্ট টক রাবিস। হি’জ মায় ক্লাসমেট!”

“ক্লাসমেট… আই সি! ফ্রেন্ড হলে না হয়, এতো রাতে কল করার মানে বুঝতাম। ক্লাসমেট এতো রাতে ফোন দিলে ব্যাপারটা কিন্তু ফিশিং ফিশিং!”

আনিকা ভ্রু নাচিয়ে দুষ্টু হাসে। এগিয়ে এসে বাহু ধরে বলে, “আরে ভয় পাচ্ছিস কেন? বল না, অরু? আমরা কাউকেই বলবো না।”

“আর না বললে আ’মাকে বলে দিবো। তোমার মেয়ে রাতে চুপিচুপি চুপিচুপি বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলে। তখন আ’মা তোকে ঝাটা পেটা করবে।”

রুপকের কথায় অরুণিতা কপালে একরাশ বিরক্তিভাব ফুটিয়ে বলল, “বয়ফ্রেন্ড নামক ফালতু জিনিস অরুণিতা সরকারের জীবনে না ছিলো, না থাকবে। কথাটা মাথায় গেঁথে রাখো সবাই। সায়রা মিসের ছেলে সায়ান ছিলো। ব্রো, তুমি চেনো না ওকে?”

রূপক মাথা নাড়লো। আনিকা হতাশ বদনে বোনের কাঁধ জড়িয়ে সান্ত্বনা দিলো, “অরু তোকে আগা গোরাই চিনি আমরা। পুরাই রসকষহীন! তোর দ্বারা প্রেম পিরিতি হবে না আমরা সিওর। একটু মজা করছিলাম আরকি। আচ্ছা চল? মুভিটা শেষ করি।”

“চল চল, আমার বাপে চলে আসলে একগাদা লেকচার শোনাবে।”

রুপক হৈ হৈ করে ঘরে গিয়ে ল্যাপটপের সামনে বসে মুভি চালু করে। আনিকা, অরুণিতা এসে পাশে বসে। পপকর্ণে বাটি কোলে বসিয়ে হা করে সিনেমা উপভোগ করে। নয়ন এখনও বেলকনির দরজায় দাঁড়িয়ে। ক্লান্তি ভরা চোখ দুটো অরুণিতার মুখপানে আঁটকে। সিনেমার নীলচে আলোয় ফর্সা মুখটা জ্বল জ্বল করছে। কপালে ঈষৎ ভাঁজ; ভোঁতা নাকের পাটা ফুলছে ,আবার চুপসে যাচ্ছে; ঘন পাপড়ির আবডালে গভীর ওই চোখ দুটো বড্ডো তেজস্বী! নয়ন স্মীত হাসলো। সায়ান এতো রাতে ফোন কেন করেছিল? সায়ান যে অরুর প্রতি দূর্বল তা পুরো ক্লাস জানে। কানাঘুষো শোনা যায় একটু আকটু। কিন্তু অরুর দিক থেকে পজিটিভ সাইন পাওয়া যায় নি। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে সন্দেহ জাগলো, অরুও সায়ানের প্রতি টান রাখে হয়তো। বুক চিরে হাহাকার বেরিয়ে আসে নয়নের। 

“নয়ন ভাইয়া? ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? মুভি শেষ হলো যে!”

অরুণিতার ডাকে নয়ন এগিয়ে এসে তাঁর পাশে বসলো। অরুণিতার কোচে থাকা পপকর্ণের বোল থেকে পপকর্ণ নেওয়ার সময় ইচ্ছাকৃত হাত দিয়ে পেলব হাতখানা ছুঁয়ে দেয়। অরুণিতা নয়নের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল, “কিছু বলবে?”

“না.. ভভভভুল করে লেগেছে!” নয়ন তোতলালো।

অরুণিতা কতক্ষণ তাকিয়ে দেখলো তাকে। তারপর চোখ সরিয়ে ল্যাপটপে চলমান হরর মুভিতে ডুবে গেলো। নয়ন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। অরুণিতার ছোঁয়া লাগা হাতটা সবার অলক্ষ্যে ঠোঁটের আগায় চেপে চুমু খেলো। নিমিষেই তাঁর সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো। মনে হলো অরুণিতাকেই চুমু খেলো। কৎ শব্দে ঢোঁক গিলে উপর ওয়ালার কাছে মনে মনে একই দোয়া করলো যা সে প্রতি প্রার্থনায় করে।

‘ইয়া খোদা, তুমি অরুণিতাকে আমার করে দাও।”

—————

মাথার লম্বা বেনুনীতে নয়নতারা ফুল একটা একটা করে গেঁথে দেয় আনিকা। টকটকে অধরের নৃত্যে ধ্বনিত গুনগুন সুর পুরো ঘরময় ঘুরে বেড়ায়। তখনই ধরাম করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে রুবি। মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে বলে,

“কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?”

“কোথায় আবার? মিরপুর যাচ্ছি। আজ মিরপুর স্টেডিয়ামে তোমার আদরের ভাতিজা খেলবে তো।”

আনিকা বলেই মিষ্টি করে হাসলো। ঘুরেফিরে নিজেকে প্রদর্শন করিয়ে বলল, “আম্মু, দেখে বলো তো আমাকে কেমন দেখাচ্ছে? সুন্দর না লাগলেও সুন্দর বলবে কিন্তু?”

“আনিকা, নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে। তুমি কেন বুঝতে চাইছো না? তোমার জীবনটা আমি ফুলে ফুলে সাজাতে চাইছি কিন্তু তোমার ঝোঁক কাঁটার দিকে। ওই ছেলের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি? খেলেধুলে কত কামাবে ও?”

“চাচ্চুর কি কম আছে?”

মেয়ের জবাবে নাখোশ হলো রুবি। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “সেটা ওঁর বাপের, ওর না আনিকা। নিজ যোগ্যতায় কতটুকু করেছে?”

“সবে বিশ বছর। যোগ্যতা আছে কি-না তা প্রমাণের সময় টুকু অন্তত দিতেই পারো।”

“খেলাধুলায়ও সেরকম নামডাক নেই। ন্যাশনাল টিমে আদৌ টিকবে? আমার অন্তত মনে হয় না। ওঁর চেয়ে অভিজ্ঞ ট্যালেন্টেড ক্রিকেটার হা করে চেয়ে আছে। পড়াশোনাতেও ভালো না। কি করে খাবে? বাপের টাকার ফুটানি দেখানো ছাড়া পথ আছে কি?”

আনিকার কপালে বিরক্তের রেখা। সে পার্সে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে রাখতে বলল, “আম্মু, প্লিজ মুড নষ্ট কোরো না। তোমার রোজকার ঘ্যান ঘ্যান আমার বিরক্ত লাগে। আমরা তো এখনি বিয়ে করছি না, তাই না? ভোর আগে সেটেল হোক, আমিও পড়াশোনা শেষ করি।”

রুবি শক্ত চোখে মেয়েকে শাসায়। আনিকা তা উপেক্ষা করে পার্স আর ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। নিচতলায় আসতেই অরুতিতা, রূপক, নয়নকে চোখে পড়ে। সবাই রেডি হয়ে তারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। সে মুচকি হেসে বলল, “টুটুল আসার কথা। আসে নি?”

“এসেছে তো! সাথে ওর আরেক ফ্রেন্ডকেও এনেছে। বাইরে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

রূপক ফোনে গেম খেলতে খেলতে জবাব দিলো। তাঁর কথায় আনিকা ভাবুক স্বরে বলল, “আরেক ফ্রেন্ড! নাম কি?”

“পত্রলেখা পাঠান।”

“অদ্ভুত নাম। যাইহোক ফ্রেন্ড নাকি গার্লফ্রেন্ড?”

“ফ্রেন্ডই তো বললো। গার্লফ্রেন্ডও হতে পারে। সিনিয়র আপুটা বেশ সুন্দরী। আমি আবারও ক্রাশ খেয়েছি আপু।”

আনিকার চাহনি সুক্ষ্ম হলো। টুটুলের ফ্রেন্ড মানে ভোরেরও ফ্রেন্ড হবে! ভোরের সব ফ্রেন্ডসদের সে চেনে। তাদের মধ্যে পত্রলেখা পাঠানের নাম তো কখনো শুনে নি। কে এই সুন্দরী পত্রলেখা পাঠান?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp