খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - পর্ব ০৮ - মুশফিকা রহমান মৈথি - ধারাবাহিক গল্প

খোঁপার ওই গোলাপকাঁটা - মুশফিকা রহমান মৈথি
          আমার পা আটকে গেলো। রবিভাইয়ের মুখ দেখতেই আমার অন্তঃস্থলের সেই দলা পাকানো গুমোট ভয়টা উতলে উঠলো। মধ্যদুপুরের নীরব রাস্তা। আশেপাশে কুকুরের আনাগোনাটাও নেই। কুকুরেরাও যেন তখন বিশ্রামে আছেন। এই মধ্যদুপুরে আমার সাথে কিছু হলে কেউ কি টের পারে। দশমাস আগের দেওয়া সেই ঠুনকো হুমকি কি কেমন কিছু শব্দ। আমার বুক ভয়ে টিপটিপ করছে। গলা শুকিয়ে এসেছে। অসাড় পা গুলো মনের জোর দিয়ে টানার চেষ্টা করলাম। আমাকে এখন ই বাড়ি যেতে হবে। পা বাড়াতেই হিনহিনে স্বরে আমার শরীর জমে গেলো,
 "কাননরানী যে! কতদিন পর দেখা। এতোদিন পর দেখা হলো আর এখনই ফুরুত করে পালাচ্ছো!"

আমি পেছনে তাকালাম না। আর ভয় গাঢ় হলো। আমি তাদের পাত্তা না দিয়ে আবারও যেতে ধরলে রবিভাই ঠিক এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। সেই কুৎসিত চাহনী, সেই উগ্র হাসি। দশমাস আগে এই মানুষটির হুমকির কারণেই বাবা যারপরনাই অসহায়ের মতো আমাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। পুলিশের ধারে যখন রবিভাইয়ের অভিযোগ করতে যান। পুলিশ পান চিবাতে চিবাতে বলেন,
"আমি বুঝেছি, যা হচ্ছে অন্যায়। আমি চাইলে রবির কলার ধরতে পারি। কিন্তু রবি কার আন্ডারে কাজ করেন জানেন তো, মেয়র। মেয়রের এক ফোন আর আমার ট্রান্সফার খাগড়াছড়ি। তাই আমি ওর কলার কেন লোমেও হাত দিতে পারবো না।"

বাবা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। রবি ভাই নাকি আমাকে ভালোবাসতেন। আচ্ছা ভালোবাসা মানে ভয় দেখানো? বিশ্রী বিশ্রী কথা বলা? যে কুৎসিত ইঙ্গিত তিনি করতেন আমার গা গুলিয়ে আসতো। রবি ভাইয়ের চোখের সেই বিশ্রী চাহনীকে আমি ঘৃণা করতাম। হয়তো উনার কারণেই আমার সাহেবকেও এতোটাই ভয় করতাম। তিনি যখন আমাকে ছুঁতেন আমি গুঁটিয়ে থাকতাম। ধীরে ধীরে আমি অনুভব করেছি, এই স্পর্শ ভিন্ন। বড্ড আদুরে, বড্ড যত্নশীল, বড্ড স্বস্তিদায়ক। 

রবিভাই আমার পথ আটকে রেখেছেন। আমি আমার ব্যাগের স্ট্র‍্যাপটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। তার বিশ্রী ওই হাসি দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার ছিলো না। রবিভাই কিছুটা ঝুঁকে এসে বললেন,
 "শুনেছি বিয়ে করেছো এক ফকিন্নির পোলাকে! বলি বিয়েই যখন করলে আমি কি দোষ করেছিলাম? আমার চাকরি নেই বলে নাকি ওই ফকিন্নির পোলা আমার থেকে শিক্ষিত! শিক্ষা দিয়ে কি হয় কানন? আমার মধ্যে কি নেই যার জন্য তোমার বাপে একেবারে পুলিশ স্টেশন চলে গিয়েছিলো? ফকিন্নির পোলা কি আমার থেকে সুখে রেখেছে?

আমি তার কোনো কথার উত্তর দিলাম না। আমার কণ্ঠ কাঁপছে। মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। তবুও সেই ভয়কে প্রকাশ না করে আমি বললাম,
 "রবিভাই আমার পথ ছাড়ুন।"
"বিয়ের পর তুমি আরোও অনেক সুন্দর হয়ে গেছো কানন। এতো সৌন্দর্য্যের রহস্য কি? ওই ফকিন্নির পোলা দেখি সেই পানি ঢালছে। কছলাকছলি করে নাকি রাতে খুব? ওর থেকে দ্বিগুন সুখ আমি দিতাম"

আমি গা শিউরে উঠলো। রাগে আমার গা রি রি করতে লাগলো। কান জ্বলে যাচ্ছে। তার দিকে না তাকিয়েই বললাম,
 "মুখ সামলে কথা বলুন রবি ভাই। আমার সাহেব আপনার মতো জঘন্য নন।"

রবি ভাই অট্টোহাসিতে ফেটে পড়লেন। তার কুৎসিত হাতে আমাকে ছুঁতে চাইলেন। আমি দু কদম পিছিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। তিনি আমার এমন প্রত্যাখ্যানে তাচ্ছিল্য ভরে হাসলেন। অতঃপর ঝুঁকে এলেন আমার সামনে। ফিসফিস করে এমন একটা জঘন্য কুৎসিত করা বললেন যে আমার গা গুলিয়ে উঠলো। লোম দাঁড়িয়ে গেলো। আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। পেটের নাড়ি পেঁচিয়ে এলো। মুখ ভরে রবি ভাইয়ের গায়ে বমি করে দিলাম। রবি ভাই একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। সরে দাঁড়ালেন আমার থেকে সাথে সাথে। বিশ্রীভাবে বললেন,
 "শা*** বমি করার জায়গা পাশ না।"

আমি আরোও গলগলিয়ে বমি করলাম। দেখলাম তিনি বিরক্ত হয়ে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে কেঁটে পড়লেন। অথচ এখানে আমার সাহেব হলে তিনি এক বিন্দু নড়তেন না। সে মুখে হয়তো বিরসতা থাকতো। কিন্তু আমার মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে বলতেন,
"একেই চিমচা শরীর, উপর থেকে খাওয়া দাওয়ায় নকটামি। পাখির মতো শরীর বানিয়ে উড়ে যাবার ধান্দা! বারবার বলি খাওয়া দাওয়ায় যেন অনীহা না হয়! যতসব নোংরা জিনিস খাবে আর পেট খারাপ করবে। আমার কথা কি শোনা হবে! সব ঘুরেফিরে অপুষ্টই জুটে আমার কপালে, যন্ত্রণা যতসব।"

সাহেবের যুক্তিহীন বকা চলমান থাকতো সেই সাথে তার আদুরে হাত। আমাকে সামলে নিতেন খুব যত্নে। এখন তিনি নেই তাই নিজেকে নিজেই সামলাম খুব কষ্টে। ব্যাগের থেকে পানির বোতল বের করে মাথায় মুখে পানি দিলাম। মুখ পরিষ্কার করে দীর্ঘসময় বসে রইলাম এক দোকানের কোনায়। শরীরটা যখন চলার মতো হল তখন আমি পা বাড়ালাম বাড়ির দিকে। 

বমি করার জন্য শরীরটা প্রচন্ড দূর্বল হয়ে গিয়েছিলো। বাড়ি ফিরে দেখলাম মা বসে আছেন দরজার কাছে। আমাকে আসতে দেখেই তিনি চিন্তিত মুখে বললেন,
 "এতো দেরি বৌমা? কয়টা বাজে দেখেছো? তুমি জানো না আজকে মিষ্টিকে দেখতে আসবে?"

সেদিন মিষ্টি আপুকে দেখতে আসার কথা ছিলো। রাতে চুপিচুপি মা আর খালার পরিকল্পনাতে আমাকেও জুটালেন। মিষ্টি আপুর ফাইনাল পরীক্ষা তখনো শেষ হয় নি। তবুও মা পাত্রপক্ষকে বাড়ি ডেকেছেন। পছন্দ হলে পাকাপাকি করে রাখবেন। সাহেব জানেন না কিছুই।আমি সেদিন প্রায় দেড় ঘন্টা দেরিতে এসেছিলাম। আমার মূর্ছিত মুখ আর দূর্বল চোখ মায়ের চোখে পড়লো না। তিনি আমাকে বললেন,
"তুমি সেদিন যে মিষ্টি বানিয়েছিলে, ঐটা বানাও। উনারা বিকেলে আসবে। মিষ্টি পরোটার খাম আর মাংস করে রেখেছে। তুমি শুধু বেলে ভাজবে। মুহাইমিন আসার আগে ওরা চলে যাওয়াই ভালো। নয়তো ঘরে কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে তোমার বর!"

আমার বর! মনে মনে হাসলাম। মায়ের ধারণা তার ছেলে এখন পুরোপুরি আমার বশে। কিছু বলতে গেলে আমাকে দিয়েই বলান। অথচ তারা ছেলে যে আমাকে কতটা মিলিটারি শাসনে রাখেন তা যদি জানতেন।

বমি করার জন্য শরীরটা বড্ড দূর্বল লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো এখন একটু ঘুমাই। কিন্তু এই আবদার গুলো বাপের বাড়িতেই মানায়। আমি জামাকাপড় ছেড়ে গোসল করে রান্নাঘরে গেলাম। মাথা টুলছিলো বলে একটু দই চিড়া খেলাম। মা মেহমান আসবে বলে দই আনিয়ে রাখায় একটু সুবিধা হল। 

মেহমান এলেন আসর বাদ। ছোট খালা শ্বাশুড়ি এই সম্বন্ধ এনেছিলেন। উনি এতো পাত্র পান কোথায় আল্লাহ জানেন। আমি মিষ্টি বানালাম, সেই সাথে পরোটা আর গরুর মাংস দেওয়া হলো। তারা বেশ আয়েশ করে খেলেন। ছেলে সম্পর্কে বলি। ছেলে বিসিএস ক্যাডার। খুব বড়লোক। জমি জমা, বাড়ি, অর্থের অভাব নেই। সরকারি কলেজের ইসলামি বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর। খুব উচ্চপদ। সেই সাথে বয়সটাও উচ্চ। কিন্তু সমস্যা ছেলের বয়স। ছেলের বয়স পঞ্চাশ। যে এসেছিলেন তিনি ছিলেন ছেলের ছোট বোন এবং বোনের ননদ। বাবা-মা নেই। ছেলের চার বোন। বোনেদের বিয়ে শাদীর দিকে খেয়াল করতে করতেই আর বিয়ে করা হয় নি। কিন্তু বিয়ের বয়সটা কি একটু বেশি-ই না! জীবনের অর্ধেকটাই তো কেটে গেছে। এখন যদি লোকটা অক্কা পায় মিষ্টি আপুর কি হবে? চৌদ্দ বছরের ব্যবধান আমাকে যেভাবে আতংকিত করে, ছাব্বিশ বছরের ব্যবধান কি মিষ্টি আপুকে আতংকিত করবে না? 

মিষ্টি আপুর মলিন মুখটায় আমি নিজেকে দেখছিলাম। সাহেব অনেক ভালো মানুষ, আমার ভাগ্য ভালো ছিলো। কিন্তু মিষ্টি আপুর বুড়ো বর যে এমন ভালো হবে তার কি নিশ্চয়তা। মা কি একটু বাড়াবাড়ি করছেন না। আমি মিষ্টি আপুর হাত ধরে বললাম,
 "সাহেবকে বলে দেই! বিয়ে হবে না"
"মা তোমার উপর খুব চটবেন। একেই তোমার উপর মা ক্ষুদ্ধ।"
 "যে ক্ষুদ্ধ তার মন তো গলাতে পারবো না আপু। অহেতুক তাই বলে একটা অন্যায় কাজে সাপোর্ট করবো?"

মিষ্টি আপু বিষন্ন হাসলেন। আমার মুখ ধরে বললেন,
 "বিয়েটা ভাইয়াই দিবেন না। মা যা করছেন করুক। ভাইয়া তোমার থেকে জানলে মা তোমাকে ভুল বুঝবে। এর থেকে ভাইয়া নিজ থেকেই জানুক। তুমি কেন খারাপ হবে?"

মিষ্টি আপুর কথা ঠিক। শ্বাশুড়ি মা আমার উপর অসন্তুষ্ট। তার ধারণা মাহমুদের ঘটনার পেছনে আমি দায়ী, তার বড় ছেলে আগে ভালো ছিলো এখন আমি তাকে বশ করেছি। অথচ কৃপাধারী হুতুম যে আজীবন এমন-ই তা তিনি জেনেও অজান্তা সাজেন। মিষ্টি আপুকে নিয়ে গেলাম নিচে। মিষ্টি আপুকে দেখে তাদের মুখোভাব কেমন যেন হলো। মিষ্টি আপু দেখতে মিষ্টি কিন্তু রঙ তার একটু চাপা। রঙ চাপা বলেই মায়ের এতো ফাউ চিন্তা। মিষ্টি আপু তাদের চা এগিয়ে দিলেন। তারা মিষ্টি আপুকে কোনো প্রশ্ন না করে আমাকে করতে লাগলেন। একেই শরীরটা খারাপ উপর থেকে তাদের প্রশ্ন বড্ড জ্বালা দিলো। 
"তোমার নাম কি?"
"কানন!"
 "পড়াশোনা কিসে কর?"
 "এবার চারুকলায় প্রথম বর্ষে।"
"বয়স কত?"
 "উনিশ হবে"
"রান্নাবান্না পারো?"
"টুকটাক!"

মনে হচ্ছিলো যেন মিষ্টি আপু না আমাকে দেখতে এসেছে তারা। মা বিরক্ত হলেন। বললেন,
 "আমার মিষ্টি যে যে রান্না পারে তা আমিও পারি না৷ ওর রান্না যে সুস্বাদু, খেয়ে আঙ্গুল চাটবেন!"

তবুও তারা মিষ্টি আপুর সম্পর্কে কোনো কথা জানার আগ্রহ দেখালেন না। এমন সময় কলিংবেল বাজলো। আমি দরজা খুলতেই চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। সাহেব দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি গদগদ হয়ে শুধালাম,
"আপনি এতো তাড়াতাড়ি?"
"কেন? তাড়াতাড়ি আসার উপর কি এখন জরিমানা দিতে হবে? আমার আড়ালে কোনো অকাজ করা হচ্ছিলো বুঝি?"

আমি তার খোঁটা পাত্তা না দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম,
 "ঘরে আসুন বুঝবেন!"

সাহেব চোখ মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। গাল টিপে বললেন,
 "কুচুটে পেয়ারা!"

 অতঃপর ঘরে ঢুকতেই তিনি বুঝলেন কি অকাজ হচ্ছিলো। সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। মা খুব ভয় পেলেন। পাত্রপক্ষের সামনে তার ছেলে ফেঁটে পড়লে অসুবিধা। তার ছেলে প্রথমেই ফাঁটলেন না। গলার টাইটা ঢিলে করতে করতে বসলেন তাদের সামনে। আমাকে বললেন,
 "পানি খাব!"

তারপর মেহমানদের উদ্দেশ্যে শুধালেন,
 "জি আপনাদের পরিচয়!"

ছেলের বোন তাদের পরিচয় দিয়ে বললেন,
 "আপনি মেয়ের ভাই তাই তো?"
"হুম!"
"আচ্ছা এবার সরাসরি বলি। আমাদের আপনার ছোট বোনকে পছন্দ হয়েছে। মেয়েটির বয়স আমাদের ভাইয়ের থেকে অনেক কম মানছি। কিন্তু আপনার ছোট বোন দেখতে শুনতে আমাদের ভাইয়ের সাথে মানাবে।"
"মিষ্টির বিয়ে তো আমি এখন দিব না। তাই এসব বলেও লাভ নেই। আর একবছর পরে আপনার ভাই তো আমার শ্বশুরের বয়সের হবেন। তাই চান্স ই নেই।"
"আমরা তো মিষ্টিকে নয় কাননকে পছন্দ করেছি।"

কথাটা শোনামাত্র আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। আমি আড়চোখে আমার সাহেবের দিকে তাকালাম। তার মুখ কঠিন হয়ে গেছে। চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি শানিত। তিনি কড়া স্বরে বললেন,
 "আমি ঘরে আসা মেহমানদের আমি লাথি মারি না। নয়তো আপনাদের মারতাম। সাহস কি করে হলো আমার বউকে আপনার বুইড়া ভাইয়ের জন্য পছন্দ করতে!"
"ও আপনার ছোট বোন না!"
 
আমার সাহেব আরোও ক্ষেপে গেলেন। তিনি খালার উদ্দেশ্যে বললেন,
"এমন আহাম্মক মানুষদের আমার ঘরে আনেন কেন? যন্ত্রণা যতসব! এখন কি বউয়ের মাথায় নিজের নাম খোঁদায় করে রাখবো!"

বলেই তিনি উঠে চলে গেলেন। পাত্রপক্ষরা বেশ লজ্জা পেলেন। মুখ লাল হয়ে গেলো তাদের অপমানে। তারা সেই অপমান গিলে মাকে বললেন,
 "আপনার মেয়ের বিয়ে ভালো ঘরে হবে না। ভাইয়ের এমন আচারণে কে বিয়ে করবে!"

মায়ের অসন্তোষ বাড়লো। কিন্তু সাহেব তার রাগ দেখার অপেক্ষা করলেন না। আমিও সাহেবের পেছনে ঘরে ছুটলাম। সাহেব তখনও রাগে গজগজ করছেন। টাইটা খুলে বিছানায় ছুড়ে পায়চারি করছেন। আমি তার পাশ থেকে উঁকি দিয়ে বললাম,
 "এতো রাগার কি আছে? উনি বুঝেন নি হয়তো! এখন সবাইকে তো আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখানো যায় না আমি বিবাহিত!"
"ছোট একটা মেয়ে শাড়ি পরে ঘুরছে তাও বুঝবে না কেন শুনি! গাধা নাকি! এই গাধার ঘরে দিব আমি আমার বোনকে!"

আমি মিটিমিটি হাসছিলাম। অমনি সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন,
"এই হাসি বন্ধ! নয়তো পেয়ারা থেকে পেয়ারা ভর্তা বানাবো!"
 
এবার আমি হিহি করে হেসে উঠলাম। সাহেব কিছুক্ষণ কড়া নয়নে তাকালেন অবশ্য কিন্তু পেয়ারা ভর্তা বানালেন না। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,
"হিসেব সব জমা রইলো! রাতে সুদে আসলে ফেরত দিব আমি!"

আমার হাসি তবুও থামলো না। আমি খিলখিল করে হাসছি। হাসির দমকে আমি খাটে বসে পড়লাম।আমার হাসিতে বিরক্ত সাহেব আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর তিনি আমার কাছে এলেন। নিজের পুরু ঠোঁটটা আমার ঠোঁটে বসিয়ে দিলেন। আমার হাসি, আমার কথা সব শুষে নিলেন। আমি তার ঘামে ভেজা শার্টটা খামছে ধরলাম। এক অদ্ভূত ঘোরে আমি পড়েছিলাম। যখন নিষ্পত্তি মিললো তখন সাহেব আমার গালে একটা কামড় দিয়ে বললেন,
 "একদম দেশি পেয়ারা! টক!"

—————

রাতে মা খাবার খেলেন না। সাহেব তার মেয়ের ভালো চান না সেটাই তার দাবি। সাহেব অবশ্য তাতে খুব একটা গা করলেন না। সোজা ঘোষণা দিলেন, 
"মিষ্টির রেজাল্ট বের হবার পর বুড়ো কেন এরশাদ শিকদারের সাথে বিয়ে দিলেও আমি কোনো কথা বলবো না।"

সাহেবের এই ঘোষণাটা মিষ্টি আপুকে খুব ভোগালো। কিন্তু মায়ের জিদে কি আর করার!

—————

দু দিন যখন কলেজ ছুটি হলো, দেখলাম কলেজের গেটের উল্টো পাশে রবিভাই তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার গা শিউরে উঠলো। আমার ঠিক করা রিক্সায় আমি দ্রুত উঠে পড়লাম। তারা তাতেও ক্ষান্ত থাকলো না। আমার পিছু পিছু মোটর সাইকেল চালিয়ে আমার বাসার গলি পর্যন্ত এলেন। ভয়ে আমার বুক ছোট হয়ে গিয়েছিলো। সেই সাথে নিজের কাপুরুষতার উপরও ধিক্কার জানালাম। এমনটা পর পর তিনদিন হবার পর আমি সাহেবকে জানালাম,
 "আমি আর পড়াশোনা করবো না।"

সাহেব আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইলেন। তার চোখের ধারে আমি থিতু হয়ে গেলাম। তিনি কোলের থেকে তার ফাইলগুলো রেখে বললেন,
"কি সমস্যা!"
"আঁকাউঁকি শিখে কি হবে? চাকরিও তো করার ইচ্ছে নেই। অহেতুক ঝামেলা! আমি ঘর আর পড়াশোনা একসাথে করতে পারবো না। কষ্ট হয়। সেদিনও মাথা ঘুরাচ্ছিলো। এই রোদে ক্লাস করে এসে খুব ক্লান্ত লাগে।"
"আসল সমস্যা কি?"

আমি শাড়ির আঁচলে আঙ্গুল পেঁচিয়ে অনেকসময় দাঁড়িয়ে রইলাম। সাহেবের কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
 "এই কালকে আমি আনতে যাবো। গেটে থাকবো ঠিক দেড়টায়। মনে থাকে যেন!"

উনি সত্যি সত্যি পরদিন আমাকে নিতে গেলেন। রবিভাইরা যথারীতি দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি বের হয়েই সাহেবের শার্টের হাতা টেনে ধরলাম। খুব আস্তে বললাম,
 "উনারা প্রতিদিন আমাকে ফলো করে!"

সাহেবের চোখজোড়া মুহূর্তেই যেন জ্বলে উঠলো। তিনি বাঘের ক্ষিপ্র গতিতে রাস্তা পার হলেন। রবি ভাই তখন খুব আয়েশে সিগারেট খাচ্ছিলেন। সাহেব তার সামনে দাঁড়ালেন। রবিভাই একদলা থুথু ফেলে বললেন,
"কি রে ফকিন্নির পোলা?"

অমনি বাঘের থাবার মতো ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলেন রবি ভাইয়ের মুখে। রবিভাই চড় খেয়ে বসা থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলেন। আকস্মিক আক্রমনে তার মাথা যেন কাজ করা থামিয়ে দিলো। ঠোঁট কেটে গলগলিয়ে রক্ত পড়ছে। মুখের একপাশ ফুলে উঠেছে। চোখ মেলতে পারছে না সে। সাহেব তার কলার টেনে তাকে নিজের দিকে আনলেন। খুব শীতল স্বরে তাকে হুমকি দিলেন,
 "এরপর থেকে কখনো আমার বউয়ের ত্রিসীমানায় দেখলে তোর আব্বারে শুদ্ধ পুতে রাখবো!"

যে মানুষকে পুলিশ অবধি ছুঁতে পারে না, আমার সাহেব তাকে কি না চড় মেরে মুখের মানচিত্র বদলে দিলো! আমি হতভম্বের মতো চেয়ে আছি। আমার মাথা ঘুরাচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা দুলছে। কখন যে সেই দুলুনিতে আমি নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম আমার মনে ছিলো না। যখন চোখ খুললাম এক ক্লিনিকের সাদা বিছানাতে শুয়ে ছিলাম। পাশে নার্স আমার স্যালাইন দেখছিলেন। মধ্যবয়স্কা মহিলা। গোলগাল মুখ। আমার হাতে তখন চিনচিনে ব্যাথা। আমি চোখ মেলে নার্সের দিকে তাকাতেই সে আমার দিকে হাসি মুখে চাইলেন। আমি সাহেবকে খুঁজলাম। কিন্তু তাকে দেখতে পেলাম না। আমি উঠতে গেলে নার্স মৃদু স্বরে বললেন,
 "উঠো না। এখন খুব সাবধানে থাকতে হবে। অন্তত তিনমাস।"

আমি ভ্যাবলার মতো চেয়ে ছিলাম। নার্স হাসি মুখে বললেন,
"তুমি একা নও। তোমার পেটে একজন বাড়ছে!"

কথাটা বুঝতে আমার সময় লাগলো। আমি অনেকক্ষণ শুণ্য নয়নে তাকিয়ে ছিলাম। হুট করে আমার বাচ্চা সত্তাটা বড় হয়ে গেলো। মাতৃত্ব হয়তো মেয়েদের ভেতরে সবসময় লুকায়িত থাকে। তাই তো নার্সের কথাটা শুনতেই আমার ভেতরের লুকানো মা সজাগ হয়ে গেলো। আপনাআপনি ভার হয়ে গেলো শরীর। যত্নশীল হয়ে গেলো কাউকে সুরক্ষা দিতে। সে হয়তো এখনো একটা ছোট মাংস পিন্ড, তবুও আমার হাত পেটে চলে গেলো। মনের ভেতর এক অদ্ভূত অনুভূতির সংমিশ্রণ উদিত হলো। আমি কি ভালো মা হবো? এর মধ্যে আমার সাহেব ফিরে এলেন। তার চোখমুখ অত্যন্ত কঠিন। তার মুখোভাব দেখে আমার হৃদয় ধক করে উঠলো। সাহেব কি খুশি নন!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp