মেঘবন - পর্ব ২৭ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে। চাঁদের ঝিমানো আলসেমি এইতো, বৃষ্টি শেষেই আকাশে উঁকি দিচ্ছে একটু পর পর। ঘরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সব কিছু আবছা দেখলো তারফান। জ্বরে শরীর দূর্বল, নড়বড়ে পায়ের কদম। পরনের জামাকাপড় বাতাসে শুকিয়ে গেছে। চিটচিটে একটা অস্বস্তিতে মুহূর্তেই পরনের টি-শার্ট খুলে ফেললো সে। ধপ করে বিছানায় শরীর এলাতেই খাট দুলে উঠলো। ওমনি, ধড়ফড়িয়ে উঠলো তামজিদ। মাত্র পিছি-তে কাজ শেষ করে ঘুমাতে এসেছিল সে। চোখ লাগতে না লাগতেই এহেন ভূমিকম্প হলো কোথায়? তাড়াহুড়োয় বিছানা থেকে নামতে নিলেই ভূতের মতো তার হাত চেপে ধরলো তারফান। ক্লান্ত কণ্ঠস্বর বিরক্ত শোনালো, ‘আমি, তোর বড় ভাই।’

‘তোকে বড় ভাই মানে কে শয় তান?’
বুকের ধক করে ওঠা বিচ্ছিরি শব্দ আচমকা থেমে গেছে। তারফানের চেয়েও অত্যাধিক বিরক্তি নিয়ে শরীর থেকে কাঁথা সরালো তামজিদ। তেঁত গলায় বললো, ‘তোকে ফ্ল্যাটের চাবি দিয়ে বড় ভুল করেছি আমি। যখন তখন বিরক্ত করতে আসিস কেন? তোর নিজের চিলেকোঠা নেই? এমনিতেই কত কাজ দিয়ে রেখেছিস। শরীরটাও ভালো না। হুট করে মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। গা গরম।’

একটা প্রজ্জ্বলিত চাঁদের পরশ তক্ষুনি তারফানের মুখের ওপর আবছা ভাবে পড়লো। খুবই সামান্য, মৃদু। শুষ্ক ঠোঁটের আশপাশে চামড়া উঠে গেছে। তামজিদ ক্ষণেই ভ্রুদ্বয় বাজে রকম কুঁচকে শুধালো, ‘ঠোঁট এমন কেন তোর? মেরিনকে চুমু-টুমু খেয়ে এসেছিস?’

ফাঁটা ঠোঁটে অল্প একটু হাসির রেখা দেখা দিলো। পরপরই ঠোঁট ফুলিয়ে তারফান বললো, ‘পরে… বিয়ের পরে খাবো। এখন জ্বর। জ্বর নিয়ে ওকে চুমু খেলে ওর জ্বর হয়ে যাবে না?’

কুঁচকানো ভ্রুদ্বয়ে আরও কয়েকদফা ভাঁজ ফেলে তারফানের তপ্ত কপালে হাত রাখলো তামজিদ। ভীষণ উষ্ণ। জ্বলে যাচ্ছে। আঁতকে উঠে বললো, ‘একি! তোর তো জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে তারফান! একটু সাবধানে থাকবি না? কালকে বিয়ে। কত কাজ! তোর এই জ্বরের জন্য এখন আমাদেরও শরীর খারাপ হয়ে যাবে। দুরু! অ্যাঁই তারফান!’

তারফান শুনলো ঠিক কিন্তু উত্তর দিতে পারলো না। জ্বর জ্বর ঘুমে ভীষণ দিশেহারা লাগলো নিজেকে। শ্রবণ শক্তি হ্রাস পেল। ভীষণ একপেশে হয়ে মনে পরলো সেই আগের কথা, ঝাপসা চোখে দেখলো সেই আগের ছোট্ট তারফানকে।
তখন সে স্কুলে পড়তো। অষ্টম শ্রেণী। ছোট থেকেই শারীরিক ভাবে প্রচন্ড দুর্বল তারফান। ফুলের ঘ্রাণ সহ্য করতে পারে না। শ্বাসকষ্ট হয়। বেশিক্ষণ পানি ছুঁলে শরীরে জ্বর কাবু করে। কথায় কথায় হাঁপিয়ে ওঠার স্বভাব। সেবার স্কুলে সাঁতারের প্রতিযোগিতা হলো। ফার্স্ট প্রাইজ ভিডিও গেমস। সাথে একটা বিশাল ফুলের বুকেট। ভিডিও গেমসের প্রতি তারফানের আগ্রহ ছিল না। ছিল ওই সামান্য ফুলের বুকেটের জন্য৷ ঘরে তখন অস্পষ্ট একটা নীলচে দেওয়াল বাসা বেঁধেছে। দুঃখ, কষ্টের নীল নীল ব্যথার দেওয়াল। স্বপন হায়দার আর ভালোবেসে রজনী হায়দারের জন্য ফুল আনেন না। ডাইনিং টেবিলে স্বযত্নে সাজিয়ে রাখা শুষ্ক ফুল রাত্রিক্ষণে মায়ের প্রত্যেকটা আর্ত নাদে একটু একটু করে পঁচে যাচ্ছে। ক্ষ ত - বিক্ষ ত ফুলগুলো নজরে এলে তারফানের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সে বড় হয়েছে। সব বুঝে। মায়ের কষ্ট বুঝি বুঝবে না? আশা-আকাঙ্ক্ষা টের পাবে না? 

দশ মিনিটের সাঁতারে নাকে পানি ঢুকে গেল তারফানের। ময়লা পানি কত'শত বার যে গিলে ফেলেছে! তবুও তার দু:ক্ষ নেই। একহাতে ভিডিও গেমস আর অন্যহাতে বুকে জড়িয়ে রাখা ফুলের বুকেটটা দেখিয়ে তারফান বড়ো উৎফুল্ল হয়ে রজনী হায়দারকে বললো, ‘তোমার সব আবদার এখন থেকে আমি পূরণ করবো, মা। সব কথা শুনবো। তুমি আর ওই লোকের কাছে যাবে না। আবদার করবে না।’

সেদিন রাতে কালবৈশাখী ঝড় হলো। শরীরের ভয়া বহ উষ্ণতায় তারফান ঠিকঠাক শ্বাস নিতে পারে না। ফর্সা চামড়ায় গুটি গুটি লাল দাগ। তার দেখাদেখি তালহা, তামজিদেরও ভীষণ জ্বর। স্কুলের সহপাঠীগণ তাদের এই টেলিপ্যাথি সংযোগের কথা জানতে পেরে প্রথমে অদ্ভুত নজরে তাকালো। পরপরই তাদের দম আটকানো হাসিতে মিইয়ে গেল তারফান। জোর গলায় বলতে পারলো না, হাসির কি আছে? ছোট থেকে তারা তিন ভাই তো এমনই। 

—————

ভোরের সকাল। স্নিগ্ধ, পবিত্র। কপালে ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে অচিরেই চোখ পিটপিট করলো তারফান। চোখ মেলে ধীরে ধীরে তাকালো। সে রজনী হায়দারের কোলে মাথা রেখে আছে। তিনি পরম মমতায় তার কপাল টিপে দিচ্ছেন, চুলে হাত বুলাচ্ছেন। চোখে চোখ পড়তেই সস্নেহে হাসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এমন জ্বর বাঁধালি কিভাবে? কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, জানিস?’

তারফান উত্তর দিতে পারলো না। পেটের কাছে কি যেন খোঁচা দিচ্ছে। তাকিয়ে দেখলো, তার দু'পাশে লম্বালম্বি হয়ে তালহা আর তামজিদ শুয়ে আছে। তালহার বাম হাত তার পেটের একদম কাছে। তারফান আশ্চর্য হয়ে শুধালো, ‘কি সমস্যা? গুঁতা দিচ্ছিস কেন?’

তালহা অস্পষ্ট গোঙালো, ‘সড়! এখন আমি আম্মুর কোলে শুবো।’

‘কোন দুঃখে?’

তালহা তপ্ত চোখে তাকালো। যেন এক্ষুনি, এই মুহূর্তে তারফান নামক যাযাবরকে ধ্বংস করে দিবে সে। উঁচু গলায় বললো, ‘আমাদের জ্বর কি তোর চোখে পরে না? খুব তো বলতিস, মা আমাকে সবচে’ বেশি ভালোবাসে। কঁচু! সেই রাত থেকে তোর সেবা করছে।’

রজনী হায়দার সরু চোখে তাকাতে গিয়েও হেসে ফেললেন। তালহার চুলেও বার'দুয়েক হাত বুলিয়ে বললেন, ‘তোদের সেবা করছি না? তারফানের আজকে বিয়ে। ওকে তো সুস্থ হতে হবে। নইলে এই অসুস্থ শরীর নিয়ে বিয়ে করবে কিভাবে?’

তামজিদ নড়চড়ে উবু হয়ে শুলো এবার। বিরাট হামি দিয়ে বললো, ‘ওর জায়গায় আমি বিয়ে করে আসবো নাহয়। কেউ বুঝবে না।’

চট করে একটা জোড়ালো থাবা এসে তামজিদের পিঠ জ্বালিয়ে দিলো। তারফান আশ্চর্য গম্ভীর স্বরে বললো, ‘তোর ভাবি হয়।’

তামজিদ লম্বা নিশ্বাস নিলো। আরেকটু এগিয়ে মায়ের উষ্ণতার সঙ্গে মিলেমিশে বললো, ‘জানি।’

ঘরের ফ্যান বন্ধ। ভ্যাপসা গরমে শরীর-মন হ-য-ব-র-ল হয়ে উঠবার কথা থাকলেও গরম ঠিক লাগছে না। শেষ রাতের বৃষ্টি আর ভোর ভোর সকালের মিষ্টি বাতাসে মন শান্ত, প্রাণ ক্লান্ত। তারফানের ঘন চুলে হাত বুলানোর মাঝেই রজনী হায়দার হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে উঠলেন। বলতে লাগলেন, ‘তোদেরকে আমি খুব ভালো একটা জীবন দিতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম যেন আমার করা পাপ তোদের না ছোঁয়। কিন্তু, প্রত্যেকটা পদক্ষেপে আমি হেরে গেছি। এই জীবনে একটুখানি সুখ আমি তোদের দিতে পারিনি।’

তামজিদ প্রায় ঘুমিয়ে গিয়েছিল। মায়ের করুণ সুর কানে আসতেই এবার চোখ-মুখ বিকৃত করে ফেললো। গমগমে গলায় বিতৃষ্ণা নিয়ে বললো, ‘এসব কথা আবার কেন শুরু করেছো মা? ভালো লাগে না।’

অথচ রজনী হায়দার থামলেন না। বুকে বিশাল একটা পাথর অনেকদিন ধরে শক্ত খুঁটি গেঁড়েছে। যে জন্ম পরিচয় তিনি তার ছেলেদের কাছে অতি গোপনে লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা খুব আমোদেই স্বপন হায়দার তার তিন তিনটে সোনার টুকরোকে চিৎকার করে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তারা জার জ! অ বৈধ! মন কি তার ভাঙেনি? ভেঙেছে! ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। আজও অতীতের কথা ভাবলে চাপা কষ্টে দম বন্ধ হয় রজনী হায়দারের। চোখে জল আসে। এবারও এলো। বড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘আমি তোদেরকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার আশায় স্বপনের হাত ধরেছিলাম। লোকটা অনেক ভালো ব্যবহার করতো আমার সাথে। ইমন থেকে আমি যা আশা করতাম তার সব যেন পায়ের কাছে এনে দিতো। ফুল পছন্দ করি জেনে রোজ ফুল আনতো। বিয়ের পরও। আমি ভেবেছিলাম, এবার বুঝি একটা সুখের সংসার হবে আমার! এবার বুঝি আমি ভালো থাকবো!
বিয়ের তখন বছরও গড়ায়নি। একদিন একজন মহিলা আমায় কল করলো। প্রচন্ড গালাগাল করতে লাগলো। অকথ্য ভাষায় অনেক অভিশাপ দিলো। আমি শুরুতে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। পরে জানলাম, স্বপনের প্রথম স্ত্রী সে। গ্রামে থাকে। আমার দুনিয়া দুলে উঠলো। স্বপনের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সে অস্বীকার করেনি। উলটো আমাকে বলেছে আমার মতো পতি তাকে বিয়ে করা আমার সাত-কপালের ভাগ্য। কিন্তু, বিয়ে কি আদৌ করেছিল? করেনি। বিয়ের কাগজ, রেজিষ্ট্রি সব ভুয়া ছিল। আচ্ছা, মানুষ কবুলও মিথ্যামিথ্যি বলতে পারে? তারফান, তুই তো বড় হয়েছিস। অনেক কিছু জানিস। তুই বল, কবুল বলা সত্ত্বেও বিয়ে হয়না কিভাবে?’

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো না। গলায় কাঁটা বিঁধে আছে। শক্ত, ত্যাড়া কাঁটা। ওই কাঁটা উগড়ে ফেলতে পারলো না তারফান। ওভাবেই, খুব আস্তে জবাব দিলো, ‘ভুল মানু্‌ষের সঙ্গে ভুল বিয়ে হয় না, মা।’

রজনী হায়দার কিছুপলক ছেলের নিষ্পাপ মুখপানে একাধারে চেয়ে রইলেন। পরপরই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি। তালহা-তামজিদ-তারফান কেউ তাকে স্বান্তনা দিলো না। জায়গা থেকে নড়লো না। নিথ র হয়ে পরে রইলো।
এর পরের গল্প তাদের জানা। সেই বিল্ডিংয়ের নিচ তলাতেই আল-ফয়সাল হাকিম নামের এক লোক থাকতেন। পেশায় সাংবাদিক। ব্যাচেলর। রজনী হায়দারকে ছোট বোনের মতো স্নেহ করে এসেছেন। একদিন তিনিই রজনী হায়দারকে ওই নরক থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। একটা শক্তপোক্ত থাকার জায়গা আর গার্মেন্টসে কাজ দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখা হয়নি। বিয়ে করার পর আল-ফয়সাল হাকিমের স্ত্রী এহেন অপ্রয়োজনীয় আদিখ্যেতা পছন্দ করছিলেন না।

অনেক্ষণ, অনেক্ষণ গড়িয়ে যাওয়ার পর তারফান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। মাথা ঝিমিয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই। শরীর ঘেমে আছে। জ্বর ছেড়েছে বোধহয়! গোসল দরকার। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করলো সে। রাতে ঘরে ফিরে মেরিনকে জানানো হয়নি। অভিমানিনী নিশ্চয়ই রেগে আছে? মুখ ফুলিয়েছে? পাওয়ার বাটনে ক্লিক করতেই মেরিনের নোটিফিকেশন পেল তারফান। পাঁচটা মেসেজের ভিড়ে শেষের দুটো একটু আগের। আট'টা পনেরো মিনিটে।

মেরিন লিখেছে, ‘কোথায় আপনি? বাসায় ভালো মতো পৌঁছেছেন? জ্বর কমেছে?’
নিচেই বউ সাজা একটা জলজ্যান্ত পুতুলের ছবি। 

তারফানের বুকের ভেতরটা নিমিষেই ভারি ভারি হয়ে উঠলো। একটা গাঢ় আহ্লাদে চোখের দৃষ্টি শীতল হলো। ছবির মেরিনের গালে বার কয়েক আঙুল বুলালো সে। মেসেজ টাইপ করার শক্তি কুলালো না। ভয়েজ রেকর্ডার অন করে তারফান কণ্ঠে মাদকতা মিশিয়ে বললো, ‘ছবি পাঠাতে বললেই তোমাকে কেন পাঠাতে হবে, মেরিন? তুমি কি জানো, এখন, এই মুহূর্তে তোমার কাছে ছুটে গিয়ে তোমার সমস্ত সাজ আমার নষ্ট করে দিতে ইচ্ছে করছে? জানো না। জানো না বলেই এমন ছবি পাঠাতে পেরেছো। বুকে ভয়-ডর নেই তোমার?’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp