দেখতে দেখতে চলে এসেছে শীতকাল। সকাল বাজে দশটা তবুও কুয়াশার চাদরে চারিদিক ঢাকা। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মজা। মনটা কু গাইছে। অজানা একটা ঝড় বইছে বুকে, স্থির হয়ে কোথাও দাঁড়াতে পারছে না। ঢাকা আসার পর থেকে নিয়মিত পূর্ণার লেখা চিঠি পেত। প্রায় চার মাস হলো বাড়ি থেকে কোনো চিঠি আসছে না। পদ্মজা নয়টা চিঠি পাঠিয়েছে। একটারও উত্তর আসেনি। বাড়ির সবার কথা খুব মনে পড়ছে। ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে চলে যায় পদ্মজা। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায়। একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখে: হাওলাদার বাড়িতে টেলিফোন এনেছে। পূর্ণা হাওলাদার বাড়িতে এসে পদ্মজার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পদ্মজা কথা বলতেই ওপাশ থেকে পূর্ণার উল্লাস ভেসে এলো, ‘আপা? আপা আমি তোমার গলার স্বর শুনতে পাচ্ছো। তুমি শুনছো?’
‘শুনছি। কেমন আছিস? আম্মা কেমন আছে? বাড়ির সবাই ভালো আছে?’
‘সবাই ভালো। তুমি কেমন আছো? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার গলা শুনছি!’
‘আচ্ছা, শোন?’
‘বলো আপা।’
‘আশপাশে কেউ আছে?’
‘খালাম্মা আছে।’
‘এই বাড়িতে আর আসবি না। আমি যতদিন না আসব। মনে রাখবি?’
‘কেন? কেন আপা?’
‘মানা করেছি, শুনবি।’
‘আচ্ছা, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম এবার প্রতিদিন দুলাভাইয়ের বাড়িতে আসব। আর তোমার সঙ্গে কথা বলব। ধুর!’
‘আবার যখন আসব আমাদের বাড়িতে টেলিফোন নিয়ে আসব। এরপর প্রতিদিন আমাদের কথা হবে। এখন আমার মানা শোন।’
‘টাকা কোথায় পাবে?’
‘সেদিন উনি বলেছেন, নিয়ে আসবেন। আমি মানা করেছিলাম। বললেন, তুমি আনন্দে থাকলেই আমার সুখ। তোমার সুখের জন্যই এখন আমার সব। আর কী বলার?’
‘দুলাভাই খুব ভালো তাই না আপা?’
‘হুম। আম্মার শরীর সত্যি ভালো আছে?’
‘আছে। আগের চেয়ে ভালো।’
‘খেয়াল রাখিস আম্মার।’
‘রাখব।’
বাতাসটা বেড়েছে। পদ্মজার গা কাঁটা দিচ্ছে। আচমকাই ঘুমটা ভেঙে চট করে উঠে বসল সে। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল, টেলিফোন নেই। স্বপ্নে মনে হচ্ছিল সবই বাস্তব! পদ্মজা দেয়াল ঘড়িতে দেখে, এগারোটা বাজে। টেলিফোন পুরো দেশে হাতেগোনা কয়জনের বাসায় আছে। সেখানে গ্রামে টেলিফোনে যোগাযোগ করা যাবে ভাবাও হাস্যকর।
পদ্মজা বিছানা ছেড়ে ড্রয়িংরুমে চলে এলো, কপালে হাত দিয়ে দেখে, গায়ে জ্বর এসেছে। পূর্ণার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। রান্নাঘরে যেতে যেতে ডাকল, ‘মনা?’
হঠাৎ মাথায় এলো, মনা তো বাসায় নেই। দুইদিন আগে বাড়িতে গিয়েছে। খুব একা লাগছে তার। সবকিছুই রান্না করা আছে। আর কী রাঁধবে? এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়া যায়। পদ্মজা এক কাপ চা নিয়ে বৈঠকখানার জানালার পাশ ঘেঁষে বসল। গ্রামের সোনালি দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। মোর্শেদ প্রথম যেদিন সোয়েটার কিনে দিয়েছিলেন, সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে। সকাল সকাল উঠে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা খাওয়া, তিন বোনের একসঙ্গে পড়তে বসা, একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া— স্বর্ণময় দিনগুলো কখনো কী আর ফিরবে?
কলিং বেল বেজে উঠল। অসময়ে কলিং বেল শুনে অবাক হলো পদ্মজা। আমির তো এই সময় আসে না। দুই ঘণ্টা আগেই বের হলো। তাহলে কে এসেছে? গায়ে শাল টেনে নিলো সে। এরপর দরজা খুলল। দরজার সামনে আমির দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘এত দ্রুত?’
‘তৈরি হও, গ্রামে যাব।’
পদ্মজা চোখের পলক ফেলে আবার তাকাল। বলল, ‘গ্রামে মানে অলন্দপুর?’
আমির দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলল, ‘হু, দ্রুত যাও। শাড়ি পালটাও।’
পদ্মজার উৎকণ্ঠা, ‘হুট করে যে! কোনো খারাপ খবর?’
আমির হেসে বলল, ‘তেমন কিছুই না। কয়দিন ধরে দেখছি মন খারাপ করে বসে থাকো। তাই হুট করে যাওয়ার কথা ভাবলাম। কলেজে তো শীতের বন্ধ আছেই। আমি এক সপ্তাহর জন্য ম্যানেজারকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। আর আলমগীর ভাইয়া এসেছে। কোনো চিন্তা নেই। এবার দ্রুত যাও। ট্রেন বারোটায়। আজকের শেষ ট্রেন কিন্তু এটাই। আমি তৈরি আছি। শুধু লাগেজে দুই তিনটা শার্ট ঢুকিয়ে নিলেই হবে।’
পদ্মজা আর কিছু বলল না। ছুটে গেল দুই তলায়। তার হৃৎপিণ্ড খুশিতে দামামা বাজাচ্ছে। দশ মিনিটের ব্যবধানে শাড়ি পালটে, লাগেজও গুছিয়ে ফেলল। দুজন বেরিয়ে পড়ে। গন্তব্য অলন্দপুর। দীর্ঘ আট মাস পর জন্মস্থান, জন্মদাত্রী, জন্মদাতা, ভাই-বোন সবাইকে দেখতে পাবে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা এতটাই কাজ করছে যে, শীতের প্রকোপও টের পাচ্ছে না পদ্মজা।
কেবিনে ঢোকার পর থেকে বার বার এক কথাই বলে চলেছে সে, ‘কতদিন পর যাচ্ছি! আম্মা হুট করে আমাকে দেখে জ্ঞান না হারিয়ে ফেলে! পূর্ণা নিশ্চিত অজ্ঞান হয়ে যাবে।’
আমির হাসল। পদ্মজার এক হাত মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘আসো গল্প করি।’
পদ্মজার তাকাল। তার চোখ দুটি হাসছে। চিকমিক করছে। সে প্রশ্ন করল, ‘আলমগীর ভাইয়া আমাদের বাসায় উঠবেন?’
‘না। অফিসেই থাকবে।’
‘রানি আপা ভালো আছে? কিছু বলছে?’
আমির চুল ঠিক করতে করতে ব্যথিত স্বরে বলল, ‘ওর জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে। বাচ্চা নষ্ট করতে দিল না। এরপর মৃত বাচ্চা জন্ম দিল। এখন অবস্থা আরো করুণ। ঘরেই বন্দি।’
‘ইস! খারাপ লাগে ভাবলে। মানুষের কপাল এত খারাপ কী করে হয়! মোড়ল বাড়ির সড়ক দেখা যাচ্ছে। পদ্মজা খুশিতে আত্মহারা। দ্রুত হাঁটছে। সে কখনো বাহারি শাড়ি, বোরকা পরে না। আজ পরেছে। শাড়ি বোরকা দুটোতেই ভারি কাজ, চকচক করা ছোটো-বড়ো পাথর। দেখলে মনে হয় হীরাপান্না চিকচিক করছে। সে তার মাকে দেখাতে চায়, সে কতটা সুখী। কোনো কমতি নেই তার জীবনে। মোড়ল বাড়ির গেট ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সব আনন্দ, উল্লাস নিভে যায়। পূর্ণা-প্রেমা দাঁড়িয়ে আছে। দুজনকে চেনা যাচ্ছে না। শুকিয়ে কয়লা হয়ে গেছে।
চোখ ঢুকে গেছে গর্তে। গাল ভাঙা। গায়ে শুধু হাড়। মনে হচ্ছে কতদিন অনাহারে কাটিয়েছে। পূর্ণা পদ্মজাকে দেখেই ‘আপা’ বলে কেঁদে উঠল। ছুটে না এসে দপ করে বসে পড়ল মাটিতে। প্রেমা দৌড়ে এসে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল। পদ্মজা বাকরুদ্ধ। অজানা আশঙ্কায় গলা শুকিয়ে আসছে। চোখ দুটো মাকে খুঁজছে। পদ্মজা আমিরের দিকে তাকাল। আমিরের চোখ অস্থির। পদ্মজা প্রেমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আড়চোখে দেখে, পূর্ণা হাউমাউ করে কাঁদছে। কেন আসছে না ছুটে? কীসের এত কষ্ট তার?
পদ্মজা এগিয়ে আসে। পূর্ণাকে টেনে তুলে ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘এত শুকিয়েছিস কেন? আম্মা…আম্মা ভালো আছে?’
‘আপা…আপারে।’ বলে পদ্মজাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল পূর্ণা। পদ্মজা ঘরের ভেতর তাকাল। কয়েকজোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। অজ্ঞাত ভয়ে গলা দিয়ে কথা আসছে না তার। পূর্ণাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতর ঢুকল। সদর ঘরে চেনা অনেকগুলো মুখ। প্রতিবেশী সবাই। আপন মানুষগুলো কোথায়? পদ্মজা আরো দুই পা এগিয়ে আসে।
উঠান থেকে মনজুরার কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘পদ্ম আইছে, পদ্ম…’
সদর ঘরের মধ্যখানে পাটিতে শুয়ে আছেন হেমলতা। গায়ের ওপর কাঁথা। মেরুদণ্ড সোজা করে রাখা। গোলাপজলের ঘ্রাণ চারপাশে। পদ্মজার বুকের হাড়গুলো যেন গুড়োগুড়ো হতে শুরু করল। বুকে এত ব্যথা হচ্ছে! সহ্য করা যাচ্ছে না। সে হেমলতার পাশে বসে নিস্তরঙ্গ গলায় ডাকল, ‘আম্মা? ও আম্মা?’
হেমলতা পিটপিট করে তাকালেন। চোখ দুটি ঘোলা, কোটরে ঢুকে গেছে। গালে মাংস নেই, ভাঙা। তিনি পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। চিনতে পারলেন না। পদ্মজা হেমলতার এক হাত মুঠোয় নিয়ে চুমু দিল। তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে হেমলতার হাতে। তাতেও হেমলতার ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি নিজের মতো ঘরের ছাদে তাকিয়ে আছেন। মনজুরা সদর ঘরে ঢুকেই বিলাপ শুরু করেছেন, পদ্মজা জোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘চুপ করো। কেউ কাঁদবে না। চুপ করো।’
সবার কান্না থেমে যায়। পদ্মজা হেমলতাকে বলল, ‘ও, আম্মা? কথা বলো? আমি…আমি তোমার পদ্মজা। তোমার আদরের পদ্মজা।’
‘আম্মা চারমাস ধরে কাউকে চিনে না, আপা।’ পূর্ণা ডুকরে কেঁদে উঠল। পদ্মজার চোখ পড়ে সদর ঘরের ঈশান কোণে। মোর্শেদ কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন। এই মানুষটাকেও চেনা যাচ্ছে না। পিঠের হাড্ডি ভেসে আছে। সবার এ কী হাল! পদ্মজা বাকহীন হয়ে পড়েছে। কিছু বলবে নাকি কাঁদবে? বুকে নাম না জানা নীল যন্ত্রণা হচ্ছে! শরীরের শক্তি কমে আসছে। পদ্মজা দুই হাতে হেমলতার মাথা তুলে ধরল। হেমলতা তাকালেন। নিষ্প্রাণ চাহনী। হেমলতার মাথা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে পদ্মজা। আকুল ভরা কণ্ঠে বলল, ‘একবার কথা বলো, আম্মা? একবার দুই হাতে জড়িয়ে ধরো।’
হেমলতার হাত দুটো নেতিয়ে আছে মাটির ওপর। পূর্ণা খেয়াল করল—হেমলতার হাত দুটি কাঁপছে। চেষ্টা করছেন পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরার, কিন্তু পারছেন না। তাহলে কী পদ্মজাকে চিনতে পেরেছেন? পদ্মজা কাঁদতে থাকল। অনেকে অনেক কিছু বলছে। কারো কথা কানে ঢুকছে না। শুধু বুঝতে পারছে, এই পৃথিবীর বুক থেকে তার মা হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছেন হেমলতা। হারিয়ে যাচ্ছে তার কল্পনার রাজ্যের রাজরানি। স্বপ্ন তো সব পূরণ হয়নি! এ তো কথা ছিল না। তবে কেন এমন হচ্ছে? পদ্মজার বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় বিষিয়ে উঠছে সারা শরীর। কাঁপা ঠোঁটে হেমলতার পুরো মুখে চুমু খেল সে। ভারি করুণ ভাবে বলল, ‘ও আম্মা? কোথায় হারাল তোমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ঝাঁঝালো কণ্ঠ?’
কেটে গেল অনেকটা মুহূর্ত। কাছের মানুষেরা ছাড়া আর কেউ নেই। রা নেই কারো মুখে। হেমলতার মতোই সবাই বাকহীন, স্তব্ধ। কেউ খায়নি বাসন্তী গুপ্ত ব্যথা নিয়ে রেঁধেছেন। প্রেমা-প্রান্ত, আমির ছাড়া কেউ খেল না। পদ্মজাকে অনেক জোরাজুরি করেছে আমির। কিছুতেই খাওয়াতে পারল না। আমিরও আর ঘাঁটল না। পদ্মজা জানতে পারল, দুই মাস ধরে হেমলতা বিছানায় পড়ে আছেন। মাঝে মাঝে এক দুটো কথা বলেন। চারদিন ধরে তাও বলেন না। গতকাল ভোরে মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়েছে। এমন অবস্থা হয়েছিল যে সবাই ভেবেছিল আত্মাটা বেরিয়েই যাবে। হাওলাদার বাড়ি থেকে সবাই দেখতে আসে। তখন জানা যায়, আলমগীর ঢাকা যাচ্ছে। মোর্শেদ অনুরোধ করে বলে, পদ্মজা আর আমিরকে খবর দিতে। ওরা যেন দ্রুত চলে আসে। রাতের ট্রেনে সকালে গোডাউনে পৌঁছে আমিরকে সব বলে আলমগীর। আমির সব শুনে আর দেরি করেনি। পদ্মজাকে নিয়ে চলে আসে। পথে কান্নাকাটি করবে তাই আগে কিছুই বলেনি। পদ্মজা এতসব জেনেও কিছু বলল না। মনে অভিমানের পাহাড় তৈরি হয়েছে। কারো কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। সারাক্ষণ চেষ্টা করছে হেমলতার সঙ্গে কথা বলার। হেমলতা কিছুতেই কথা বলছেন না। একটু-আধটু পানি খাচ্ছে, এর বেশি আর কিছুই খাচ্ছেন না। গায়ে মাংস বলতে কিছু নেই। চামড়া ঝুলে গেছে। পদ্মজা হেমলতার পুরো শরীর মুছে দিয়ে কাপড় পালটে দিল। এরপর শোয়া অবস্থায় অজু করাল। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে আরো একবার আকুতি করল, ‘একবার কথা বলো, আম্মা। একবার ডাকো পদ্মজা বলে।’
হেমলতা তাকালেন, কিছু বললেন না। তাকিয়েই রইলেন। মাঝরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তখনো পদ্মজা জাগ্রত। ক্লান্ত হয়ে সবার চোখ দুটি লেগে গেলেও তার চোখ দুটির পলকও পড়ছে না। তার মন বলছে, কে যেন চারপাশে ঘুরছে তার মাকে নিয়ে যেতে। ঝিঁঝিপোকার ডাক, শেয়ালের হাঁক ছাপিয়ে সে যেন কারো পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। অবচেতন মন যেন অনুভব করছে আজরাইলের উপস্থিতি। পদ্মজার বুকে ভয় জেঁকে বসে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেঁদে অনুরোধ করে, ‘অনুরোধ করছি, আমার মাকে কষ্ট দিয়ো না।’
মুখে হাত চেপে কান্না আটকানোর প্রচেষ্টায় বার বার ব্যর্থ হতে থাকল পদ্মজা। কাঁদতে কাঁদতে কণ্ঠ নিভে এসেছে। ঠান্ডায় শরীর জমে গেছে। চোখটা লেগেছে মাত্র তখন দপ একটা শব্দ ভেসে এলো। চমকে তাকাল পদ্মজা। হেমলতা হাত দিয়ে মাটি থাপড়াচ্ছেন। শরীর কাঁপছে। পদ্মজার নিশ্বাস থেমে যায়। হেমলতার এক হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে উঠে বলল, ‘আম্মা, আম্মা যেয়ো না আমাকে ছেড়ে। ও আম্মা, আম্মা…আমার কষ্ট হচ্ছে আম্মা। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে? আম্মা পায়ে পড়ি আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। আম্মা…আম্মা।’
দ্রুত হেমলতাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে পদ্মজা। বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। অনেকগুলো করুণ কান্নার স্বরে হাহাকার করে ওঠে মোড়ল বাড়ি। পদ্মজা কাউকে অনুরোধ করে বলল, ‘নিয়েন না আমার আম্মাকে। কষ্ট দিচ্ছেন কেন এত? আমার আম্মার কষ্ট হচ্ছে। আম্মা, ও আম্মা। আম্মা আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।’
পদ্মজা কাঁদতে কাঁদতে সুরা ইয়াসিন পড়া শুরু করল। হেমলতা শেষবারের মতো উচ্চারণ করলেন, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’
শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে চোখ বুজে ফেললেন। থেমে গেল শরীরের কাঁপাকাঁপি। দেহটা শুধু পড়ে রইল পরিত্যক্ত বস্ত্রের মতো। পদ্মজা দেহটাকে খামচে জড়িয়ে ধরে আম্মা বলে চিৎকার করে উঠল। মানুষ ছুটে আসে আশপাশের সব বাড়ি থেকে। পূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাল। ফজরের আজান পড়ছে। আমির পদ্মজাকে হেমলতার থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই প্রাণ বিহীন দেহটা পদ্মজা ছাড়তে চাইল না। যেন তার ডাকেই ফিরে আসবেন হেমলতা। কথা বলে উঠবেন, আবার হাঁটবেন। পদ্মজাকে ধমকে বলবেন, ‘চুপ! এত কীসের কান্না? আমার মেয়ে হবে শক্ত আর কঠিন মনের। এত নরম হলে চলবে না।’
তা কী আর হয়?
এটা শুধুই কল্পনা। আত্মা একবার দেহ ছেড়ে দিলে আর ফিরে আসে না। আপন ঠিকানায় ফিরে যায়। হেমলতা নামে মানুষটার আয়ুকাল এতটুকুই ছিল। তিনি উড়াল দিয়েছেন পরকালে, রেখে গেছেন আদরের তিন কন্যাকে। আদরের কন্যাদের ছেড়ে তো কখনো দূরে থাকতে পারতেন না! এবার কীভাবে চলে গেলেন? তিনি নিশ্চয় মৃত্যুর সঙ্গে কঠিন যুদ্ধ করেছেন! থেকে যেতে চেয়েছিলেন আরো কিছুদিন। পেরে ওঠেননি।
ভোরের আলো ফুটতেই পদ্মজা নিজেকে শক্ত করে গোসল করে এসে কোরআন শরীফ নিয়ে বসল। হেমলতা বলতেন, ‘মা-বাবা মারা গেলে কান্নাকাটি না করে লাশের পাশে বসে কোরআন শরীফ পড়া ভালো। এতে করে কবরে আযাব থাকলে কম হয়।’
সে প্রতিটা অক্ষর পড়ছে আর কাঁদছে। জীবনের আকাশের সাতরঙা রংধনু নিভে গেছে। আর কখনো উঠবে না। কোনোদিন না। মোর্শেদ বারবার পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখের জল মুছছেন কিন্তু, আবার ভিজে যাচ্ছে। গোসলের পর হেমলতার মুখটা উজ্জ্বল হয়েছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হাসি। পদ্মজা হেমলতার মৃতদেহের সামনে এসে দাঁড়াল। সাদা কাপড়ে মোড়ানো লম্বা দেহটা দেখে হাহাকার করে ওঠে বুক। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি, তোমার রুহ আমার পাশেই আছে। এভাবে কথা না ভাঙলেও পারতে, আম্মা। বলেছিলে, কখনো কিছু লুকোবে না! বেহেশতে ভালো থেকো, আম্মা। আমি পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্তকে দেখে রাখব। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, আম্মা।’
হাঁটু ভেঙে খাঁটিয়ার সামনে বসে পড়ে সে। হেমলতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আল্লাহকে বলে খুব দ্রুত আমাকে নিতে এসো কিন্তু।’
আমির, হিমেলসহ আরো দুইজন খাঁটিয়া কাঁধে তুলে নিলো। কালিমা শাহাদাত বলতে বলতে সামনে এগোলো তারা। পূর্ণাকে তিনজন মহিলা ধরে রেখেছে। সে হাত-পা দিয়ে ঝাঁপিয়ে চেষ্টা করছে ছোটার জন্য। তার ইচ্ছে হচ্ছে মৃত দেহটা রাখতে আঁকড়ে ধরে রাখে। পদ্মজা মাটিতে বসে পড়ল। কী একটা বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে! আম্মা…আম্মা বলে দুই হাতে খামচে ধরে মাটি। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘আমার আম্মাকে কষ্ট দিয়ো না মাটি। একটুও কষ্ট দিয়ো না। আমার আম্মাকে যত্নে রেখ। হীরের টুকরো তোমার বুকে ঘুমাতে যাচ্ছে। কষ্ট দিয়ো না…কষ্ট দিয়ো না।’
—————
হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে পদ্মজা। সন্ধে থেকে খুব ঠান্ডা পড়েছে। এক কাপড়ে মাটিতে মা একা আছে ভেবে পদ্মজার অশান্তি হচ্ছিল। তাই কম্বল নিয়ে রাতের বেলা ছুটে এসেছে মায়ের কবরে। সদ্য হওয়া কবরে কাঁচা মাটির ঘ্রাণ। পদ্মজা কম্বল দিয়ে মায়ের কবর ঢেকে দিল। এরপর দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আম্মা…মনে আছে তোমার? যখন আমি ছোটো অনেক, আব্বা আমার গায়ের কম্বল নিয়ে গিয়েছিল। তখন তুমি তোমার শাড়ির আঁচল দিয়ে সারারাত আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলে? মনে আছে? আমাকে কেন সেই সুযোগ দিলে না? কেন বললে না, তুমি মরণ রোগে আক্রান্ত। আমার জীবনে অভিশপ্ত আক্ষেপ কেন দিয়ে গেলে, আম্মা? কেন পেলাম না আমার মাকে সন্তানের মতো আদর করার সুযোগ? কোন দোষে আমার সঙ্গ তুমি নিলে না? মৃত্যুর আগে নিজের মেয়ের সঙ্গে এত বড়ো অনাচার করে গেলে, আম্মা! বিশ্বাসঘাতকতা করলে। আমি তো তোমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতাম। কখনো কোনো বিষয়ে জোর করিনি। জোর করে জানতে চাইনি। আমি বিশ্বাস করতাম তুমি সব বলবে আমায়। তুমি নিজে আমাকে বার বার বলেছো, তোমার জীবনের এক বিন্দু অংশ থাকবে না যা আমাকে বলবে না। তবে কেন সেই কথা রাখতে পারলে না? আমার কষ্ট হচ্ছে, আম্মা। তুমি অনুভব করছো? আমি তোমার বুকে শুয়ে অভিযোগ তুলছি, তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো! আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছো দশ মাস। তুমি পারতে আমাকে বলতে। তুমি পারতে আমাকে বিয়ে না দিয়ে নিজের কাছে রাখতে। তুমি পারতে আমাকে আরো দশ মাস আমার মায়ের সঙ্গ দিতে। আমি এত আক্ষেপ নিয়ে কী করে বাঁচব, আম্মা?’
কয়েকটা শেয়াল দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝরাতে কবরে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেউ কাঁদতে পারে এমন হয়তো কখনো দেখেনি তারা। পদ্মজা হেমলতার কবরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর অশ্রু বিসর্জন করছে। আত্মহত্যা পাপ না হলে হয়তো এই পথই বেছে নিত সে। মোর্শেদ, আমির টর্চ নিয়ে পদ্মজাকে খুঁজতে খুঁজতে কবরে আসে। হেমলতার কবর দেখে মোর্শেদ দুর্বল হয়ে পড়েন। পদ্মজার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও কাঁদতে থাকেন। আমিরের শব্দভাণ্ডারে সান্ত্বনা দেয়ার মতো ভাষা মজুদ নেই। সে সাহস করতে পারল না কথা বলার। কান্না থামিয়ে পদ্মজা সুরা ইয়াসিন পড়তে থাকল। সে চায় না তার মায়ের কবরে বিন্দুমাত্র কষ্ট হোক। সন্তানের আমল নাকি পারে, মৃত মা- বাবার শাস্তি কমাতে। যদি কোনো পাপের শাস্তি হেমলতার আমলনামায় থেকে থাকে, তা যেন মুছে যায় পদ্মজার কণ্ঠের মধুর স্বরে। ধীরে ধীরে পদ্মজার কণ্ঠ কমে আসে। ঠান্ডায় জমে যায়। পালটে যায় চোখের মণির রং। আমির দ্রুত পদ্মজাকে কোলে তুলে নিলো। মোর্শেদকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসে। হেমলতা মাটির কবরে পড়ে রইলেন একা। শেয়ালগুলি একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। মৃত্যুর মতো সত্য আর নেই।
জন্মালে মৃত্যুর স্বাদ উপভোগ করতেই হবে।
—————
হেমলতার ঘরে দরজা বন্ধ করে পদ্মজা আর পূর্ণা বসে আছে। পুরো বিছানা জুড়ে হেমলতার পরনের কাপড়চোপড়। এসবই শেষ স্মৃতি। পূর্ণা দুটো শাড়ি বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে থেমে থেমে কাঁদছে। পদ্মজা মাটিতে বসে আছে। উসকোখুসকো চুল। পূর্ণা আর কাঁদতে পারছে না। বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও শব্দ বেরোচ্ছে না। পদ্মজা হেমলতার চুড়ি দুটো হাতে নিয়ে বলল, ‘আম্মা বলে এখন কাকে ডাকব? পূর্ণা রে, আমাদের আম্মা কই গেল?’
পূর্ণা বিছানা থেকে নেমে আসে। পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা স্বরে বলল, ‘আল্লাহ কেন এমন করল, আপা? আমাদের প্রতি একটু দয়া হলো না।’
‘এই ঘরটায় আর আসবে না, আম্মা!’
‘আপা, আম্মা আসে না কেন? আপা…আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমাকে মেরে ফেলো।’
‘কাঁদিস না বোন। আমাদের আবার পরকালে দেখা হবে। এরপর আর মৃত্যু নেই। অনন্তকাল একসঙ্গে থাকব। ঠিক দেখা হবে।’
পালঙ্কের উপর একটা পুরনো খাতা। পদ্মজা হাত বাড়িয়ে নিলো। পূৰ্ণা এই খাতার প্রতিটি অক্ষর আগেই পড়েছে। তাই আর সেদিকে ফিরল না। সে ক্লান্ত দেহ নিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে। পদ্মজা খাতার পৃষ্ঠা ওল্টায়—
আমার আদরের পদ্মজা,
আজ পনেরো দিন হলো তোর বিয়ের। প্রতিটা রাত আমার নির্ঘুমে কাটে। পুরো বাড়িজুড়ে তোর স্মৃতি। স্মৃতিগুলো আমায় বিষে জর্জরিত করে দেয়। মেয়ে হয়ে জন্মালে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি যেতেই হয়। তবুও মানতে কষ্ট হচ্ছে আমার মেয়ে সারাজীবনের জন্য অন্যের ঘরে চলে গেছে। বলেছিলাম, আমার জীবনের বিন্দুমাত্র অংশ তোর অজানায় রাখব না। সেই কথা রাখতে আমি লিখতে বসেছি। স্বপ্ন ছিল, তোকে অনেক পড়াব। অনেক…অনেকদিন নিজের কাছে রাখব। কিন্তু মানুষের সব স্বপ্ন কী পূরণ হয়? দীর্ঘ দুই বছর আমার শরীরে বাসা বেঁধে ছিল এক রোগ। প্রাথমিক অবস্থায় ছিল। কিন্তু পাত্তা দেইনি। যখন তোর মেট্রিক পরীক্ষার জন্য আকবর ভাইজানের বাড়িতে গেলাম তখন একজন ভালো ডাক্তারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আকবর ভাইজানের বন্ধু। দেখা করতে এসেছিলেন। তখন তুই পরীক্ষা কেন্দ্রে ছিলি। উনার নাম আসাদুল জামান। বিলেত ফেরত ডাক্তার। কথায় কথায় আমার সমস্যাগুলোর কথা বলি। তিনি খালি চোখে আমাকে দেখে কিছু প্রশ্ন করলেন। উনার ধারণা, আমি পারকিনসন্স ডিজিস নামক প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত, যার আশি ভাগ লক্ষণ আমার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দ্রুত আমাকে পরীক্ষা করতে বলেন। এই রোগের চিকিৎসা তো দূরে থাক দেশে এই রোগ পরীক্ষার কেন্দ্রও তেমন নেই। সেদিনটা আমার জীবনের বড়ো ধাক্কা ছিল। আমি দিকদিশা হারিয়ে ফেলি। আমি মারা গেলে আমার তিন মেয়ের কী হবে? কী করে বাঁচবে? ভয়ানক এই রোগ নিয়ে তোর সামনে হাসতে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। তবুও হাসতে হতো। মুহিব খুব ভালো ছেলে। তাই তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেইনি। আমি মারা যাওয়ার আগে তোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম। বিয়ে ঠিক করে ফিরে আসি গ্রামে। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত অসহনীয় যন্ত্রণায় কাটতে থাকে। আসাদুল জামান ঢাকার এক হাসপাতালের নাম লিখে দিয়েছিলেন। যেখানে এই রোগের পরীক্ষা করা হয়। শতভাগ ভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা করানোটা জরুরি হয়ে পড়ে। তার জন্য কেউ একজনকে দরকার পাশে। তোর আব্বাকে সব বলি। সব শুনে তোর আব্বা হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কেঁদেছে! মানুষটাকে এত কাঁদতে কখনো দেখিনি! আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চলে যাই ঢাকা। আমি তখন হুঁশে ছিলাম না। মৃত্যু আমার পেছনে ধাওয়া করছিল। তাই মাথায় আসেনি আমি না থাকলে আমার মেয়েদের কোনো ক্ষতি হতে পারে। ঢাকা যাওয়ার পথে আল্লাহর কাছে আকুতি করেছি যাতে পরীক্ষায় কিছু ধরা না পড়ে। বিয়েটা ভেঙে দিতে পারি। আর আমার মেয়েদেরকে নিয়ে আরো কয়টা বছর বাঁচতে পারি। কিন্তু আল্লাহ শুনলেন না। তিনি দয়া করলেন না, মা! জানতে পারলাম, আমার হাতে সময় কম। এ রোগের নিরাময় নেই। যেকোনো বছরে যেকোনো মুহূর্তে মারা যেতে পারি। এই কথা শোনা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তোদের কথা মনে পড়তেই আবার নিজেকে শক্ত করে নিয়েছি। যতদিন বাঁচব শক্ত হয়ে বাঁচব। তোর জীবন গুছিয়ে দিয়ে যাব। আমি পেরেছি। তোর বিয়ে হয়েছে। ভালো ছেলের সঙ্গে হয়েছে। সুখে আছিস। এই তো শান্তি। আমার ভাবতে কষ্ট হয়, একদিন তোকে, তোদের সবাইকে আমি ভুলে যাব। এখন তো কথা ভুলে যাই। তখন নিজের নাড়ি ছেড়া সন্তানদের মুখও অচেনা হয়ে যাবে। কী নির্মম তাই না মা?
রবিবার।
তুই ঢাকা চলে গিয়েছিস অনেকদিন হলো। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের আর দেখা হবে না। আমার শরীরের অবস্থা ভালো না। আজ নাকি প্রান্তকে চিনতে পারিনি। বেশ অনেক্ষণ ওর চেহারাটা আমার অচেনা লেগেছে। কী অদ্ভুত! ভুলে যেয়ে আবার মনে পড়ে। হাত, পা, মাথা, মুখের থুতনি, চোয়াল মাঝে মাঝে খুব কাঁপে। ধীরে ধীরে শরীরের ভারসাম্য একদম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লাহাড়ি ঘরে গিয়েছিলাম হুট করে চৌকির উপর থেকে পড়ে গিয়েছি। পূর্ণার সে কী কান্না! মেয়েটা খুব কাঁদতে পারে। একদমই হাঁটতে ইচ্ছে করে না। শক্তি কুলোয় না। তোর কথা খুব মনে পড়ে। মনে সাধ ছিল, বৃদ্ধ হয়ে তোর শরীরে ভর দিয়ে হাঁটব। পেটের চামড়ার ফোসকার মতো কী যেন হয়েছে। চুলকায়, ব্যথা করে। রাতে ঘুম হয় না যন্ত্রণায়। তোর আব্বা আমার অশান্তি দেখে ঘুমাতে পারে না। বাসন্তী আপা সব জানে। মানুষটা অনেক ভালো। ভুল তো সবাই করে। এমন কেউ আছে যে জীবনে ভুল করেনি? বাসন্তী আপার রান্না নাকি অনেক মজার হয়। খুব ভালো ঘ্রাণ হয়। প্রান্ত-প্রেমা সারাক্ষণই বলে। কিন্তু আমি সেই ঘ্রাণ পাই না। ঘ্রাণশক্তিটাও লুপ্ত হয়ে গেছে। কয়দিন ধরে টয়লেটও হচ্ছে না। খাবার গিলতে পারি না। কোন পাপে এমন করুণ দশা হলো আমার? বোধহয়, আর শক্তি পাব না লেখার। সবকিছু ভুলতে আর কতক্ষণ? সব লক্ষণ জেঁকে বসেছে শরীরে। বাকি শুধু দুনিয়াটাকে ভুলে যাওয়া। আজ সারারাত জেগে আরো কিছু কথা লিখতে চাই। সেদিন আমি জলিল আর মজনুর ছেলেকে খুন করেছি। ছইদ তার আগেই খুন হয়ে গিয়েছিল। আটপাড়ার বড়ো বিলের হাওড়ের টিনের ঘরে ওরা তিনজন সবসময় জুয়া খেলে, গাঁজা খায়। সেদিনও গাঁজা খেয়ে পড়েছিল। গিয়ে দেখি ছইদের লাশ এক কোণে পড়ে আছে। দা হাতে দাঁড়িয়ে আছে তোর দেবর রিদওয়ান। ও আমাকে দেখে পালিয়ে যায়। এরকম দৃশ্য দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি তবুও থেমে থাকিনি। ঘুমন্ত জলিল আর মজনুর ছেলেকে বেঁধে—খুনের বর্ণনা লিখতে ইচ্ছে করছে না! শুধু এইটুকু বলব, আমি যখন জলিল আর মজনুর ছেলেকে কোঁপাচ্ছিলাম তখন রিদওয়ান ঘরের এক পাশে লুকিয়ে ছিল। সে সব দেখেছে। আমি বের হতেই সে উলটোদিকে হাঁটা শুরু করে। আজও জানতে পারিনি সে কেন ছইদকে খুন করেছে। তুই ঢাকা চলে গিয়েছিস ভেবে শান্তি লাগছে। রিদওয়ান ভয়ংকর মানুষ। তার খুন করার হাত পাকা। এটা তার প্রথম খুন নয়। সাবধানে থাকবি। আমিরকে সাবধানে রাখবি। তোর শাশুড়িকে বহুবার লুকিয়ে কাঁদতে দেখেছি। উনাকে আপন করে রাখবি।
আর লেখা যাচ্ছে না। হাত কাঁপছে। কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে চারিদিক। এই খাতাটা প্রান্তের। লুকিয়ে নিয়ে এসেছি। আমার সব শাড়ির সঙ্গে ট্রাঙ্কের ভেতর যত্নে রাখব। আমার অনুপস্থিতিতে যখন পড়বি, কাঁদবি না একদম। জীবনে বড়ো হবি। আমি না থাকলে মৃত্যুর কামনা করবি না। এটাও এক ধরনের পাপ। আল্লাহর যখন ইচ্ছে হবে তখনই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তিনি যে কারণে সৃষ্টি করেছেন তা পূরণ হলেই মৃত্যু ধেয়ে আসবে। শুধু মৃত্যুর কথা স্বরণ রাখবি। কোরআনের পথে চলবি। কোনো পাপে জড়াবি না। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিবি না। আমাদের আবার দেখা হবে। আমার মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হবে। তুই তো আমার মা, আমার পদ্মজা। আমার সাত রাজার ধন। আমার তিন কন্যা আমার অহংকার। আমার বেহেশত। ভালো থাকবি, খুব ভালো থাকবি। আম্মা কিন্তু সব দেখব। কান্নাকাটি করতে দেখলে ওপারে আমার শান্তি হবে না। তাই কাঁদবি না। আল্লাহ হাফেজ মা, ভালো থাকিস।’
পড়া শেষ হতেই খাতাটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে হাতপা ছুঁড়ে আম্মা, আম্মা বলে কাঁদতে থাকে পদ্মজা। তার আর্তনাদে চারিদিক স্তব্ধ হয়ে যায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………