পবনপত্র - পর্ব ১০ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          ওষুধ খাওয়ার পরেও মারুফ ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন মাথা নিচু করে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পা দোলাচ্ছেন। মৌমিতা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আব্বার দিকে তাকায়। রাত প্রায় সাড়ে ১০টা বাজে। এখন তো মারুফের শুয়ে পড়ার কথা ছিলো। তিনি সবাইকে ১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার তাগিদ দেন। আজ এভাবে মশার মধ্যে বসে থাকার কারণটা মৌমিতা বুঝছে না। মার্জিয়া এসে মারুফের চেয়ারের পেছনে দাঁড়ায়, আদুরে গলায় বলে, “কী হয়েছে আব্বা? মাথা ব্যথা নাকি?”

“হুম।”

মার্জিয়া আর কিছু বললো না, দুই হাতে আব্বার মাথা টিপে দিতে শুরু করলো। মারুফ বললেন, “যাও তো, ঘুমিয়ে পড়ো। সকালে স্কুল আছে না?”

“আপনি কেন সবসময় এসব নিয়ে চিন্তা করেন?”

মারুফ মেয়েটার হাত ধরলেন, মাথা থেকে তা সরিয়ে বললেন, “এখন তো আমার এই একটাই চিন্তা। তোমাদেরকে ঠিকমতো মানুষ করতে হবে।”

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় মেয়ের দিকে তাকালেন তিনি। সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মার্জিয়া নিজের কব্জি ছাড়িয়ে নিয়ে আবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো, কৃত্রিম বিরক্তির সুরে বললো, “এতো চিন্তা করেন কেন? মাথাটা একদম গরম হয়ে আছে। আচ্ছা আব্বা, চলেন তো কালকে কোথাও বেড়াতে যাই।”

“কোথায় যেতে চাও?”

“বাইরে কোথাও গেলেই হয়। যেখানে সবাই মিলে যাওয়া যাবে, নাস্তা করা যাবে, এমন কোথাও। আজকের সিঙ্গারাও ভালোই ছিলো। কোথা থেকে নিয়েছিলেন?”

“কোন সিঙ্গারা?”

“আপনি যে পাঠালেন বিকালে?”

“না তো।”

মার্জিয়ার হাত জমে যায়, সে হতভম্ব হয়ে মৌমিতার দিকে তাকায়। তাকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে মৌমিতার হঠাৎ খুব হাসি পেলো, সে মুখ চেপে ধরে অন্যদিকে তাকালো। মারুফ তার মাথায় স্থির হয়ে থাকা মেয়ের হাত অনুভব করলেন, ভ্রু কুঁচকে বললেন, “কোন সিঙ্গারার কথা বলছো মা?”

মার্জিয়া ধাতস্থ হয়েই আমতা আমতা করে, “ঐ যে...”

মৌমিতা তাকে থামিয়ে দেয়, “রিপন মামা এনেছিলেন বোধহয়। জুনায়েদ ভাই ওনার কথা বলছিলেন... মার্জু ভুল শুনেছে।”

“ওহ।”

মারুফের কুঁচকানো ভ্রু সোজা হলো না। কোনো মেয়ের কথাই তিনি পুরোপুরি বোঝেননি। আবার জেরা করতেও ইচ্ছে করলো না। মৌমিতা আব্বার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্জিয়ার দিকে তাকায়। তার শুভ্র মুখখানি রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঐ মুখের দিকে তাকালে মারুফের ভ্রু জোড়া নির্ঘাত আরও কুঁচকে যেতো।

আজকে মৌমিতা মশারি টানিয়েছে। মার্জিয়া চেয়ারে বসে নখ কামড়াচ্ছে। চোখ সেদিকে পড়তেই মৌমিতা ধমকে উঠলো, “নখ কামড়াস কেন?”

মার্জিয়া চেয়ারের উপর দুই পা তুলে হাঁটু ভাঁজ করে বসে, “ভালো লাগছে না।”

“ঘুমের সময় না ঘুমিয়ে নখ কামড়ালে খুব ভালো লাগবে? শুয়ে পড়। আমি আলো নিভিয়ে দিচ্ছি।”

আর কথা না বাড়িয়ে মার্জিয়া সুরসুর করে মশারির ভেতর ঢুকে পড়লো।
সুইচে চাপ দিয়ে আলো নিভিয়ে দেয় মৌমিতা। ঘরে আবছা আলো। এমনিতে রাতে বিছানায় শুয়ে মার্জিয়া অনেকক্ষণ ধরে বকবক করে। স্কুলে কে কী করলো, কবে কী হলো—সব কাহিনী সে আপাকে শোনায়। কিন্তু আজকে মেয়েটা নিশ্চুপ। মৌমিতাও যেচে কথা বললো না। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে। এমন সময় খুটখুট আওয়াজ শোনা গেলো। মৌমিতা ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত হয়ে বললো, “এখনও নখ কামড়াচ্ছিস?”

মার্জিয়া প্রতিবাদ করে, “নাহ। আমি ঘুমাচ্ছি।”

দুই বোনই কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে। শব্দটা ফ্যানেরও না, অন্যকিছুর। মার্জিয়া তার আপার দিকে একটু সরে আসে, “আপা? জানালা থেকে শব্দ আসছে।”

“জানালা থেকে কেন আসবে?”

“ওখান থেকেই আসছে। ভালো করে শোনো। আব্বাকে কালই বলবো, জানালায় শিক লাগাতে হবে।”

মৌমিতা কিছু বললো না। রাতের বেলা মার্জিয়ার চিন্তাধারা বদলে যায়। সকালে যদি কেউ জানালায় শিক লাগানোর প্রস্তাব দেয়, তাহলে আবার এই মেয়েটাই লাফাতে লাফাতে আপত্তি জানাবে।
দুইজনই কান খাড়া করে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। শব্দের উৎস উপলব্ধি করতেই মৌমিতা বলে, “বাতাস উঠেছে। ঝড় আসবে।”

টিনের চালে খটখট শব্দ হচ্ছে। ভালোই বাতাস বইছে বাইরে। মার্জিয়া গায়ের চাদরটা মাথা পর্যন্ত টেনে নিলো। তারপর চোখ বুজে রইলো। ছোট ছোট ডালপালা আর পাতা এখনও আঘাত করছে তাদের ছাদে। তবে শব্দটা এখন বেশ ছন্দময় শোনাচ্ছে।

—————

বাদলের ঘুম ভাঙলো দেরিতে। তখন ঝড় থেমে গেছে। পরিবেশটা শান্ত, শীতল। জানালা থেকে আলো এসে তার মুখের উপর পড়েছে। সে চাদর টেনে পাশ ফিরে শোয়। তখনই আমজাদের উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়, “বাদল? আজকে যাবি না কলেজে?”

বাদল হাত পা ছড়িয়ে বলে, “ভালো লাগছে না।”

“আজকে থেকেই কিন্তু বাছাইপর্ব শুরু হবে। মিস দিলে তো শুরু হওয়ার আগেই তুই আউট।”

বাদল নিজের শরীরটাকে কোনোমতে টেনে তোলে বিছানা থেকে। জীবনটার উপর বেশ বিরক্তি চলে এসেছে তার। সে মাথায় জোর দিয়ে মনে করার চেষ্টা করতে থাকে, কী যেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে।
রাশেদ তাড়া দেয়, “বাদল ওঠ। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।” সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “তুই কি অসুস্থ নাকি?”

বাদল মাথা নাড়ে, “উঁহু।”

কলেজ ছুটি দিলো দুটো ক্লাসের পর।
মাঠের বৃষ্টিভেজা ঘাসে দুপুরের রোদ চিকচিক করছে। বাছাইপর্বের প্রতিযোগীদের ডাকা হয়েছে।
বাদল হাত গুটিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। আপাতত মেয়েদের বাছাই চলছে। বারান্দায় টেবিল সাজিয়ে বসে আছেন অফিসের কর্মচারী আলমগীর। একটা মেয়ে দ্রুত হেঁটে তার সামনে আসে। অন্যান্য মেয়েগুলোকে ঠেলেঠুলে সরিয়ে ব্যস্তভাবে বলে, “আলম ভাই, এখন কতো সিরিয়াল চলছে?”

“এখন এগারো চলছে।”

“আমার নামটা কতো নাম্বারে আছে, একটু দেখেন তো।”

“কী নাম?”

“সেদিনই তো বললাম! যাই হোক, তামান্না আক্তার। দেখেন ভালো করে—”

বাদলের চোখ ঘুরে যায় বারান্দার দিকে। ভিড়ের মধ্যে সে উঁকি দিতে শুরু করে। তামান্না বেরিয়ে আসে, পেছন ফিরে আঙুল উঁচিয়ে বলে, “আমার নাম আসলেই ডাক দিয়েন কিন্তু।”

বাদল তার দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। লম্বা, পাতলা গড়নের মেয়েটা, মুখ ঘেমে গেছে। এই মেয়েটাই কি মৌমিতা খন্দকারের সেই বড়লোক বান্ধবী, যার কাছে মৌমিতা বই ধার নিতে চেয়েছে?
তামান্না মাঠের অপরদিকে হাঁটতে শুরু করে। বাদল কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলো সে। উপায়ান্তর না দেখে ছেলেটা আবার দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। মাঠের দিকে তাকিয়ে রইলো উদ্দেশ্যহীনভাবে।

মৌমিতাকে যদি তামান্নার আশেপাশেই পাওয়া যায়?
একটা ছোট শ্বাস ফেলে বাদল এগিয়ে যায়, শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মাঝে ঢুকে পড়ে। দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। দর্শকদের সামনের সারিতেই তামান্নাকে পাওয়া গেলো। নাক-মুখ কুঁচকে খুব বিরক্ত হয়ে কাউকে কিছু বলে চলেছে সে। বাদল তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর দিকে তাকায়। কল্পনার সাথে কারও চেহারাই মিলছে না! ছেলেটা নিজের অবিন্যস্ত চুলে একবার হাত চালিয়ে ত্যক্ত মুখে অন্যদিকে মাথা ঘোরায়। এমন সস্তা কৌশল অবলম্বন করে মৌমিতাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।

তামান্না আবার ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো। রোদের কারণে তার মুখটা লাল হয়ে গেছে। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করতে করতে গাছতলায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। মুখ ধুয়ে বোতল রাখে সিমেন্টের ঢালাইয়ের উপর। তারপর আবারও ব্যাগে কিছু খুঁজতে শুরু করে।

“আপু?”

পেছনে ঘুরলো তামান্না। ভ্রু কুঁচকে বাদলকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে বললো, “কী চাই?”

“আপনার নাম কি তামান্না?”

মেয়েটা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়, চোখে বিভ্রান্তি থাকলেও একটু হেসে মাথা দোলায় সে, “হ্যাঁ।”

“আপনি সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন?”

“ওমা! সবই তো জানেন। আমাকে ফলো করছেন নাকি?”

বাদল সজোরে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে, “না না। আমার একটু সাহায্য লাগতো, তাই—”

“আপনাকে আগে দেখিনি। নতুন?”

“জ্বী, ফার্স্ট ইয়ার।”

“ওহ আচ্ছা। নাম কী তোমার?”

“নাম নাহয় পরে শুনলেন। আমি শুধু একটা প্রশ্ন—”

“তুমি তো আমার নাম জানো। তোমার নামটাও আমার জানা উচিত। তাই না?”

বাদল চুপ করে থাকে। মেয়েটার যুক্তি খুব অযৌক্তিক মনে হলো। কলেজে মৌমিতা নামের একাধিক মানুষ আছে। তামান্না নামটাও তো কয়েকজনের থাকতে পারে। এই মেয়েটার কথাই যে ডায়েরিতে লেখা ছিলো, তার নিশ্চয়তা কী? এখানে অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়াও কাঙ্ক্ষিত মানুষটার বান্ধবীর পেছনে সময় খরচ না করে তাকে খোঁজাটাই অধিক লাভজনক।
তামান্না ঢালাইয়ের ওপর থেকে বোতলটা তুললো। সরু চোখে বাদলের দিকে তাকালো, “নাম না বললে কিন্তু সাহায্য করবো না।”

ছেলেটা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করে। তামান্না সরু চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর পানির বোতলটা ব্যাগে ঢোকায়।

৫টা বাজতে আরও কয়েক মিনিট বাকি। রাস্তার এই পাশে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন এক বয়স্ক লোক। তার থেকে অল্প দূরত্বেই দাঁড়িয়ে আছে তারা। রাশেদ খুব মনোযোগ দিয়ে ঝালমুড়ি বানানো দেখছে। তার কাঁধে মৃদু টোকা দিয়ে আনিস বললো, “ঝালমুড়ি খাবি?”

রাশেদ মাথা নাড়ে, “টাকা নাই।”

“আমার কাছে আছে, পরে দিস নাহয়। বাদল? তোর জন্যেও আনি?”

বাদল শুনলো না। তার মনোযোগ অন্যদিকে। রাস্তার ঐপাড়ে রবিউল স্যারের বাড়ি, বাইরের ঘরটাতে তিনি পড়ান। ঐ ঘরেরই একটা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে সে, যদিও ভেতরের দৃশ্য প্রায় অস্পষ্ট। রাশেদ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকায়। আনিস বাদলকে প্রায় ঠেলা দিয়েই বলে, “কী রে?”

বাদলের ধ্যান ভাঙে, সে ঘুরে তাকায়, “হ্যাঁ?”

“ঝালমুড়ি আনতে গেলাম, পরে টাকা দিয়ে দিবি।”

“আচ্ছা।”

মেয়েটা জানালার পাশে বসেছে। মাথায় বরাবরের মতোই কাপড় দেয়া। নাকফুলের পাথরটা হয়তো এখনও ঝিলিক দিচ্ছে, তবে তা বাদল দেখতে পারছে না। ওড়নার বাইরে থাকা মুখটুকু চুলে ঢেকে আছে।
বাদল অনুমান করলো, মেয়েটা দুই ঠোঁটের মাঝখানে কলম রেখে কিছু একটা ভাবছে। তবে সে কি আসলেই লাইব্রেরির ঐ বিরক্তিকর মেয়েটা? আগের দিনও হয়তো তার সাথে দেখা হয়েছিলো এখানে। কিন্তু ভালোভাবে খেয়াল করা হয়নি।

“এই নে, ধর।”

ঝালমুড়ির একটা প্যাকেট বাদলের হাতে দিয়ে আনিস আবার অন্য বন্ধুদের দিকে যায়।

আজকে তামান্না এসেছে রবিউল স্যারের ক্লাসে। পড়া বুঝতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে তাকে। টানা তিন দিন ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে, সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এমনিতেও সে মৌমিতার খাতা দেখে লেখে। মৌমিতা তাকে নিষেধ করে না। এটা তার উদাসীনতা নাকি উদারতা—বলা মুশকিল।
ছুটির পর তামান্নাই সবার আগে বের হয়েছে বাইরে। হাত নেড়ে নেড়ে রিকশা ডাকছে, আর বারবার পেছনে ঘুরছে। মৌমিতা সবার শেষে বের হয়, এই ব্যাপারটা তার একেবারেই অপছন্দ।

“মৌ? সবার শেষে যাবি তুই? ওয়েদার কিন্তু ভালো না।”

“আজকে তুই আগে যা, আমার একটু কাজ আছে।”

“কী কাজ?”

“আব্বার দোকানে যাবো।”

মৌমিতা হাঁটতে শুরু করে। রাস্তায় চলমান খালি রিকশাগুলোর দিকে সে ফিরেও তাকায় না। একজোড়া চোখ খুব মনোযোগ দিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে—এ ব্যাপারে সে অবগত। কিন্তু ঐ চোখে থাকা অনুরাগ কিংবা অনুযোগ, কোনোটাই স্পষ্ট নয়। বস্তুত, ঐ চোখদুটো যার, সে নিজেও তা জানে না।
মৌমিতা স্বভাবসুলভভাবে ধীরে সুস্থে রাস্তা পার হলো, ছেলেটার উপস্থিতি প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলো সে। বাদল কিছু ভেবে দেখার সময় নিলো না, হাতে থাকা ঝালমুড়ির প্যাকেটটা দুমড়ে মুচড়ে মেয়েটার দিকে ছুঁড়লো। মেয়েটা ঘুরে তাকায় তার দিকে, কেবল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে থাকে। এই অল্প সময়ের মাঝে, উড়তে থাকা চুলগুলো ভেদ করে তার অভিব্যক্তি দেখতে ব্যর্থ হলো ছেলেটা। মৌমিতার চলনে তাড়াহুড়ো, বিরক্তি, ভয়, কিছুই দেখা গেলো না। যেন কিছুই হয়নি। বাদল বিড়বিড় করে, “ঢং!”

রাস্তার ওপাশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই সে দেখে, তামান্না দাঁড়িয়ে আছে। এই মেয়েটাও এখানে পড়ে? খুব ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে বাদলের দিকে তাকিয়ে আছে তামান্না। যেন চোখ দিয়েই ছেলেটার শরীর এফোঁড়ওফোঁড় করে ফেলবে! বাদল ঐ অন্তর্ভেদী দৃষ্টির পরোয়া না করে‌ বাকিদের সাথে এগিয়ে যেতে থাকে। রাশেদ তার কানের কাছে নিচুস্বরে বলে, “ঐভাবে ঢিল ছুঁড়লি কেন? মেয়েটার গায়ে লাগলো যে? তোর কি মাথা ঠিক আছে?”

“চুপ থাক!”

—————

সামনে মেলে রাখা কাপড়গুলো ওসমান ভাঁজ করে তুলে রাখছে। মারুফ হিসাবের খাতায় খসখস করে কিছু একটা টুকে রাখলেন। আজ বেচাকেনা তুলনামূলক ভালো হয়েছে। ভাবছেন, বাড়িতে যাওয়ার সময় মুরগি কিনে নিয়ে যাবেন। তারপরেই মনে পড়লো, আজ ফিরতে দেরি হবে। বাসায় এটাই জানানো হয়েছে আপাতত। কারও উপস্থিতি বুঝতে পেরে মারুফ পাশ ফিরে তাকালেন, মৌমিতা এসেছে। মেয়েকে দেখে তিনি চোখ থেকে চশমাটা সরালেন, একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার না টিউশন ছিলো?”

“হ্যাঁ, ক্লাস শেষ। আম্মা আপনার টিফিন ক্যারিয়ারটা নিতে বলেছেন। আপনি তো আজকে দেরিতে ফিরবেন। রাতে যেন বাইরে কোথাও না খেতে হয়, তাই বাড়ি থেকেই খাবার পাঠাতে চেয়েছেন।”

“কাকে দিয়ে পাঠাবে?”

“জুনায়েদ ভাই।”

মারুফ খাতা বন্ধ করলেন, কপালে সামান্য ভাঁজ পড়লো। তাদের বাড়িতেই একটা ছেলে মানুষ আছে, রিপন। তবু ছোটখাটো কাজের জন্য প্রতিবেশীকে প্রয়োজন হয়। তার নিজের একটা পুত্র সন্তান থাকলে জুনায়েদকে সবকিছুতে তলব করার দরকার হতো না। সৃষ্টিকর্তা যা ভালো বুঝেছেন, তাই দান করেছেন। এ নিয়ে অভিযোগের সুযোগ নেই। তবে মারুফ শ্যালকের প্রতি একটু বিরক্তই হলেন।

“মৌ মা?”

“জ্বী আব্বা?”

“বাজারে চলো তো আমার সাথে। আজকে একটু ভালোমন্দ বাজার করা যায় কিনা, দেখি।”

বাজারে যেতে মৌমিতার ভালো লাগে না। চারপাশে কেবল লোকজন, কোলাহল, ধাক্কাধাক্কি! একে তো সে মানুষ এড়িয়ে চলে, তার উপর বাজারে পুরুষ মানুষ বেশি। সবখানেই তাকে জড়োসড়ো হয়ে চলতে হয়।

“আপনার তো রাত পর্যন্ত দোকানে থাকার কথা।”

“রাতের দিকে অনেক কাস্টমার আসে, তাই ঐ কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু আজ সকাল সকাল বেশ ভালোই বিক্রি হয়েছে। আজকে থাক, রাত পর্যন্ত থাকবো না।”

“আমাকে টিফিন ক্যারিয়ারটা দেন।”

মারুফ নিজের আসন ছেড়ে উঠে এলেন, “পরে নিয়ে যাবো ওটা। এখন বাজারে যাই, সন্ধ্যা হবে একটু পর।”

মৌমিতার অস্বস্তিটা মারুফের দৃষ্টি এড়ালো না। তবুও তিনি তা না দেখার ভান করলেন। মেয়েদুটোকে তিনি স্বাবলম্বী বানাবেন। ভবিষ্যতে যেন কারও উপর নির্ভর করতে না হয়। পুত্র সন্তান না থাকায় আশেপাশের প্রায় সবাই তার সাথে অদ্ভুত আচরণ করে। মাঝে মাঝে খুব হতাশা কাজ করে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা অকৃপণ হাতে তাকে দু'টি কন্যা সন্তান দান করেছেন, কতো মানুষই তো নিঃসন্তান। এই মেয়েদুটোর মুখের দিকে তাকিয়েই তিনি অসাধ্য সাধন করতে প্রস্তুত! সমাজে যেসব ছেলের বাবারা তার সাথে প্রতিযোগিতা করতে চায়, তারাও জানে, মারুফ খন্দকার নিজের সন্তানের ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ রাখেন না। আর তিনি ভেঙে পড়লে মানুষ সুযোগ নেবেই।

বাড়িতে অনেকদিন পর মুরগির মাংস রান্না করা হয়েছে। রাবেয়ার মন ভালো। তবে এর প্রকৃত কারণ অন্যকিছু। মারুফ বলেছেন, মৌমিতা আজ তার আব্বার সাথে বাজারে গিয়েছে। এটাতেই রাবেয়া খুশি। আজ হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করলেন, তার মেয়েরা বড় হচ্ছে। শুধু বয়সের হিসেবে নয়, অভিজ্ঞতার দিক দিয়েও।

খাওয়ার টেবিলে বসার পর থেকে রিপন তার দুলাভাইয়ের সাথে কিছু নিয়ে আলাপ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু মারুফ সুকৌশলে তা এড়িয়ে গেলেন। রাবেয়া ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন। কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না।
পরিস্থিতি সম্বন্ধে সদা অজ্ঞাত মার্জিয়া তার বড় বড় নখ দিয়ে মৌমিতার হাতে খোঁচা মেরে বললো, “আপা?”

“কী?”

“ঝোল নেবো।”

“নে।”

“বাটিটা এদিকে দাও।”

মৌমিতা মার্জিয়ার প্লেটের দিকে তাকালো, শান্ত স্বরে বললো, “তরকারির অর্ধেক ঝোল তো তুই-ই সাবাড় করলি। প্লেটেও জায়গা নেই। আর এক ফোঁটা ঝোল দিলেই একেবারে সুনামি—”

“আপা!”

মৌমিতা তরকারির পাত্রটা মার্জিয়ার সামনে এগিয়ে দিলো।
মারুফ খাওয়ার কথা ভুলে ওদের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। তার ক্ষমতা থাকলে তিনি পৃথিবীর প্রতিটা খাবারের পদই এনে দিতেন মেয়েদুটোকে। শুধু খাবার কেন? আরও যেসব তাদের প্রয়োজন হয়, কিংবা প্রয়োজন হয় না, সবই এনে দিতেন। কোনো চাহিদা রাখতেন না। তার রাজকন্যা দু'টি কোনো অভাবের মুখোমুখি হতো না। তবে বাস্তবটা অন্যরকম। বাস্তবে তিনি রাজা নন, সামান্য একজন ব্যবসায়ী। তার মতো মানুষের কাছে তিনবেলা ভালোভাবে খেতে পারাটাও বিলাসিতা। মারুফ শুকনো মুখে ভাত মাখতে শুরু করলেন।

খন্দকার সাহেবের কাছে কয়েকটা পুরোনো বই আছে। সেগুলো তিনি মেয়েদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। বেশিরভাগই শরৎচন্দ্র আর রবি ঠাকুরের বই। প্রায় সবকয়টাই মৌমিতার মুখস্থ। তবু রাতে শোয়ার আগে সে একটা বই নিয়ে খাটের এককোণে বসে পড়েছে। মার্জিয়া ঘরে ঢুকতেই সে বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরালো, “বাসন মেজেছিস?”

মার্জিয়া বিছানায় বসে, “আজকে না তোমার মাজার কথা?”

“সকালে আর দুপুরে আমি মেজেছি, আর এমনিতেও অনেক ক্লান্ত লাগছে। তুই যা।”

মার্জিয়া দুই হাত দুইদিকে ছড়িয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো, বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো, “আমি আর কোনো কাজ করবো না। আজকে অনেক খেয়েছি। পেট নিয়ে নড়তে পারছি না।”

মৌমিতা বিরক্ত হলো। কোল থেকে বই নামিয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠলো, “আচ্ছা যাচ্ছি। বইটা উল্টে রাখ, মার্জু।”

মার্জিয়া আগের মতোই চিৎ হয়ে শুয়ে রইলো চোখ বুজে। বই খোলাই থেকে গেলো। পুরোনো বইটাতে মারুফ একটা লাইনের নিচে কলম দিয়ে হালকা দাগ টেনে রেখেছেন—“বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।”
[শ্রীকান্ত: ১]
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp