প্রতিদিনের মতো পাখিদের কলতানে পদ্মজার ঘুম ভাঙল। জানালার ফাঁক গলে আসা দিনের আলো বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। অন্যদিন ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে। আজ দেরি হয়ে গেল!
‘পূর্ণাকে তুলে নিয়ে যা। একসঙ্গে অজু করে নামাজ পড়তে বস।’
হেমলতার কণ্ঠ শুনে পদ্মজা ঘুরে তাকাল। তিনি কোরআন শরীফ পূর্বের জায়গায় রেখে বললেন, ‘পূর্ণাকে একটু বুঝাস, নামাজ পড়তে চায় না।’
‘আচ্ছা, আম্মা।’
পদ্মজা পূর্ণাকে ডেকে নিয়ে কলপাড়ে যায়। এরপর দুই বোন একসঙ্গে জায়নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষ করে হেমলতার সামনে এসে দাঁড়াল পদ্মজা। হেমলতা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজা হেমলতার চোখ দেখে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, ‘আম্মা, তোমার চোখ এমন লাল হলো কেন?’
হেমলতা দুই চোখে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘রাতে ঘুমাইনি তাই।’
পুনরায় পদ্মজার উৎকণ্ঠা, ‘কেন? কেন ঘুম হয়নি? কেমন দেখাচ্ছে তোমাকে! বিছানায় পড়াটাই শুধু বাকি।’
কিছু চুল পদ্মজার মুখের ওপর চলে এসেছে। হেমলতা তা কানে গুঁজে দিয়ে আদরমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘আজ আমার মেয়ে চলে যাবে। তাই আমি সারারাত জেগে আমার আদরের মেয়েকে দেখেছি।
হেমলতার কথা শুনে পদ্মজা আবেগী হয়ে উঠে। হেমলতাকে জড়িয়ে ধরে কান্নামাখা কণ্ঠে বলল, ‘আমার খুব মনে পড়ে তোমাকে। চলো আমার সঙ্গে। একসঙ্গে থাকব। তোমার না ইচ্ছে ছিল, আমাকে নিয়ে শহরে থাকার।
‘পাগল হয়ে গেছিস! মেয়ের জামাইর বাড়িতে কেউ গিয়ে থাকে? দুই- তিন দিন হলে যেমন তেমন।’
হেমলতার শরীরের উষ্ণতা পদ্মজাকে ওম দিচ্ছে। মায়ের উষ্ণতায় কী অদ্ভুত শান্তি! পদ্মজা কান্না করে দিল। হেমলতা পদ্মজার মুখ তুলে বললেন, ‘সকাল সকাল কেউ কাঁদে? বাড়ির বউ তুই, শাশুড়ি কী করছে আগে দেখে আয়, যা।’
পদ্মজা আরো কাঁদতে থাকল। কাঁদতে কাঁদতে যতবার চোখের জল মোছে ততবারই আবার ভিজে যাচ্ছে। বুকটা হাহাকার করছে। মা-বাবা- বোনদের রেখে কত দূরে চলে যাবে সে!
কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল পদ্মজা। পেছন থেকে শোনা গেল হেমলতা কথা, ‘বাচ্চাদের মতো করছিস কিন্তু।’
পদ্মজা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিলো। ঢোক গিলে নিজেকে শক্ত করে চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। পদ্মজা ঘর ছাড়তেই হেমলতার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। তিনি দ্রুত জল মুছে নিলেন। পালঙ্কের দিকে চেয়ে দেখেন, পূর্ণা চিত হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ বাবা! এ মেয়ে কখন ঘুমাল? হাসি পেল হেমলতার। তিনি কাঁথা দিয়ে পূর্ণাকে ঢেকে দিলেন।
পদ্মজা রান্নাঘরে ঢুকতেই ফরিনা মুখ ঝামটালেন, ‘আইছো ক্যান? যাও ঘুমাও গিয়া।
‘কখন এত দেরি হয়ে গেল বুঝিনি।’ মিনমিন করে বলল পদ্মজা।
‘বুঝবা কেন? মা আইছে তো। হউরির লগে তো আর মায়ের মতো মিশতে মন চায় না।’
পদ্মজা অবাক হয়ে তাকাল। আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘আমি তো মিশতেই চাই। আপনি সবসময় রেগে থাকেন।’
মুখের উপরে কথা কইবা না। যাও এহন।’
পদ্মজা ঘুরে দাঁড়াল চলে যাওয়ার জন্য। ফরিনা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘কইতেই যাইবাগা নাকি? জোর কইরা তো কাম করা উচিত। এই বুদ্ধিডা নাই?’
পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিদিন সে কাজ করার জন্য জোরাজুরি করে, কিন্তু ফরিনা করতে দেন না। এজন্যই সে এক কথায় চলে যাচ্ছিল। আর এখন কী বলছেন! সে ব্যাপারটা হজম করে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। ফরিনা গলার স্বর পূর্বের অবস্থানে রেখেই বললেন, ‘হইছে, কাম করতে হইব না। এরপর তোমার মায়ে কইবো দিনরাত কাম করাই তার ছেড়িরে। যাও। বারায়া যাও।’
পদ্মজা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লতিফা ঠোঁট চেপে হাসছে। ফরিনার এমন ব্যবহারের সঙ্গে সে অভ্যস্ত।
বেশ অনেকক্ষণ পর পদ্মজা বলল, ‘আম্মা, আমি করবটা কী?’
পদ্মজা মাথা থেকে ঘোমটা সরে গেছে। মুখটা দেখার মতো হয়েছে। ফরিনা পদ্মজার মুখ দেখে হেসে ফেললেন, দ্রুত হাসি লুকিয়েও ফেললেন। এই মেয়েটাকে তিনি অনেক আগেই ভালোবেসে ফেলেছেন। এত শান্ত, এত নম্র-ভদ্র মেয়ে দুটো দেখেননি। হেমলতাকে হিংসে হয়…হেমলতার গর্ভকে হিংসে হয়! পদ্মজার ঢাকা যাওয়া নিয়ে প্রথম প্রথম ঘোর আপত্তি ছিল ফরিনার। কিন্তু এখন নেই। ওপর থেকে যাই বলুন না কেন, তিনি মনে মনে চান পদ্মজা পড়তে যাক। অনেক পড়ুক, অনেক বেশি পড়ুক। এই মেয়ের জন্ম রান্নাঘরে রাঁধার জন্য নয়, রানির আসনে থাকার জন্য। পদ্মজা ফরিনার দুই সেকেন্ডের মৃদু হাসি খেয়াল করেছে। সে সাহস পেল। ফরিনার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
ফরিনা চোখ-মুখ কুঁচকে প্রশ্ন করলেন, ‘ঘেঁষতাছো কেন?’
পদ্মজা শিমুল তুলোর ন্যায় নরম স্বরে বলল, ‘আমার খুব মনে পড়বে আপনাকে, আপনার বকাগুলোকে। আপনি খুব ভালো।’
ফরিনা তরকারিতে মশলা দিচ্ছিলেন। পদ্মজার কথা শুনে হাত থেমে যায়। পদ্মজার দিকে তাকান। পদ্মজা বলল, ‘আমি আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরব, আম্মা?’
ফরিনা কিছু বলতে পারলেন না। এই মেয়েটা এত ভালো কেন? তিনি পদ্মজার চোখের দিকে তাকাতেই অনুভব করলেন, কয়েক বছরের লুকোনো ক্ষত জ্বলে উঠছে। ক্ষতরা পদ্মজার সামনে উন্মোচন হতে চাইছে। কোনোভাবে কী যন্ত্রণাদায়ক এই ক্ষত সারাতে পারবে পদ্মজা? ভরসা করা যায়? পদ্মজার মায়ামাখা দুটি চোখ দেখে বুকে এমন তোলপাড় শুরু হলো কেন? বত্রিশ বছর আগের সেই কালো রাত্রির কথা কেন মনে পড়ে গেল? যে কালো রাত্রির জন্য আজও এই সংসার, এই বাড়িকে তিনি আপন ভাবতে পারেন না। প্রতিটি মানুষের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন। সেই যন্ত্রণা কেন বুক খুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে?
উত্তরের আশায় না থেকে পদ্মজা জড়িয়ে ধরল ফরিনাকে। ফরিনা মৃদু কেঁপে উঠলেন। নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে পদ্মজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। পদ্মজা ফরিনার বুকে মাথা রাখতেই টের পেল, ফরিনার বুক ধুকধুক করছে।
—————
হাওলাদার বাড়ি থেকে ডানে, দুই মিনিট হাঁটার পর ঝাওড়া নামের একটি খালের দেখা পাওয়া যায়। খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওলাদার বাড়ির সবাই। ট্রলার নিয়ে মাঝি অপেক্ষা করছে। ট্রলারটি হাওলাদার বাড়ির। পদ্মজার পরনে কালো বোরকা। লাবণ্য যাবে না। সকাল থেকে তার ডায়রিয়া শুরু হয়েছে। তিন-চার দিন পর আলমগীর ঢাকা নিয়ে যাবে। আজ আমির আর পদ্মজা যাচ্ছে। প্রেমা, প্রান্ত, মোর্শেদ, বাসন্তী সবাই সকালেই এসেছে। সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। পূর্ণা হেঁচকি তুলে কাঁদছে। হেমলতা পদ্মজার দুই হাত মুঠোয় নিয়ে চুমু দিয়ে বললেন, ‘ঠিক মতো পড়বি, খাবি। স্বামীর খেয়াল রাখবি। কাঁদবি না কিন্তু। একদম কাঁদবি না।’
তুমি কাঁদছো কেন, আম্মা?’
‘না, না, কাঁদছি না,’ বলেও হেমলতা কেঁদে ফেললেন। পদ্মজার কান্নার বেগ বেড়ে যায়। বোরকা ভিজে একাকার। একদিকে মা অন্যদিকে তিন ভাই-বোন কেঁদেই চলেছে। হেমলতা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, পারছেন না। পদ্মজা বলল, ‘আর কেঁদো না, আম্মা। তুমি অসুস্থ।’
হেমলতা কান্না আটকাতে ঢোক গিলেন। বললেন, ‘কাঁদব না। সাবধানে যাবি। দেরি হচ্ছে তো। আমির, নিয়ে যাও আমার মেয়েকে। যা, মা, সাবধানে যাবি। নিয়মিত নামাজ পড়বি।’
পদ্মজা হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করল। পদ্মজার দেখাদেখি আমিরও করল। বাড়ির সব গুরুজনদের সালাম করে ট্রলারে পা রাখতেই হেমলতার কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দমালা ভেসে আসে, ‘আমার প্রতিটা কথা মনে রাখবি। কখনো ভুলবি না। আমার মেয়ে যেন অন্য সবার চেয়ে গুণেও আলাদা হয়। শিক্ষায় কালি যেন না লাগে।’
পদ্মজা ফিরে চেয়ে বলল, ‘ভুলব না, আম্মা। কখনো না। তুমি চোখের জল মোছ। আমাদের আবার দেখা হবে।’
হেমলতা তৃতীয় বারের মতো চোখের জল মুছে হাত নেড়ে বিদায় জানান। ট্রলারের ইঞ্জিন চালু হয়।
মা-মেয়ে একে অপরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
দুজনের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় বর্ষণ হচ্ছে।
—————
কাঁদছেন মোর্শেদ। তবে পদ্মজার জন্য কম, হেমলতার জন্য বেশি। হেমলতার দিনগুলো এখন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। কাঁদছেন ফরিনাও। প্রতিদিন বাড়িজুড়ে একটা সুন্দর মুখ, সুন্দর মনের জীবন্ত পুতুল মাথায় ঘোমটা দিয়ে আর হেঁটে বেড়াবে না। আবারও মরে যাবে তার দিনগুলো। হারিয়ে যাবে সাদা-কালোর ভিড়ে।
মাদিনী নদীর ঠান্ডা আর্দ্রতা বাতাসে মিশে ছুঁয়ে দিচ্ছে পদ্মজার মুখ। চোখের জল শুকাতে শুকাতে আবার ভিজে যাচ্ছে। আমির পদ্মজার কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এবার তো থামো।’
আমিরের আলতো ছোঁয়ায় পদ্মজা আরো আবেগী হয়ে উঠল। আমির বলল, ‘এ তো আরো বেড়ে গেছে! থামো না। আমি আছি তো। আমরা ছয় মাস পর পর আসব। অনেকদিন থেকে যাব।’
‘সত্যি তো? কাজের বাহানা দেখাবেন না?’
‘মোটেও না।’ আমির পদ্মজার চোখের জল মুছে দিল। চোখের পাতায় চুমু খেল। পদ্মজা নুয়ে যায়। বলল, ‘নদীর পাড় থেকে কেউ দেখবে।
‘কেউ দেখবে, কেউ দেখবে, কেউ দেখবে! এই কথাটা ছাড়া আর কোনো কথা পারে আমার বউ?’
পদ্মজা আমিরের দিকে একবার তাকাল। চোখের দৃষ্টি সরিয়ে বলল, ‘আমরা ট্রলার দিয়ে ঢাকা যাব?’
‘সেটা সম্ভব না। কিছুক্ষণ পরই ট্রেনে উঠে যাব। ‘
আমির পদ্মজার গাল ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াতেই, আমিরকে হতবাক করে দিয়ে পদ্মজা ট্রলারের ভেতর ঢুকে গেল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………