ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময়সূচী দেওয়া হয়েছে। মূল ফটকে টাঙিয়ে রাখা আছে তা। বিরতির সময় সেটাই অনেকক্ষণ ধরে দেখলো মৌমিতা। এসবে তার আগ্রহ নেই, তবে তামান্না থাকলে এতোক্ষণ অনেক মাতামাতি করতো এটা নিয়ে। দরজা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সে অন্যদিকে পা বাড়ালো। সুরাইয়া তাকে দেখতেই হাসিমুখে বলে উঠলো, “কী খবর মৌ? অনেকদিন পর দেখা হলো।”
মৌমিতা জোর করে একটু হাসে, “এই তো, ভালোই। তোর কী অবস্থা?”
“বেঁচে আছি। তুই কি নাম দিবি নাকি কোথাও?”
“না।”
“কোথায় যাস?”
“লাইব্রেরিতে।”
সুরাইয়া ফটকের কাছে এসে দাঁড়ালো। চোখ-মুখ কুঁচকে নোটিশের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তার চোখ গেলো কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে, সে-ও হয়তো নোটিশ দেখতেই এসেছিলো। তার নাম জানে না সুরাইয়া, তবে ছেলেটা জুনিয়র এবং আমজাদের সাথে ভালোই খাতির আছে তার।
“অ্যাই ছেলে?”
কথাটা বাদলের কানে পৌঁছায়নি। সে শুকনো মুখে ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সুরাইয়া ভিড় ঠেলে তার দিকে এগিয়ে যায়, “এই যে জনাব? আমজাদ কোথায়?”
আমজাদের নাম শুনে বাদল ঘুরে তাকায়, সুরাইয়াকে দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, “আমি জানি না।”
“তোমার নামটা সেদিন শোনা হয়নি।”
“আমি তো বলিইনি। শুনবেন কেমনে?”
“আচ্ছা যাই হোক। শোনো, আমজাদের নামে আমি আবার কমপ্লেইন করবো। ওকে জানিয়ে দিও।”
“পারবো না।”
কারণ জানতে না চেয়ে, পরবর্তী কথা না শুনেই বাদল হাঁটতে শুরু করলো। তার মন মেজাজ ভালো নেই। আজকের আবহাওয়াটাও বিভ্রান্তিকর। ঝড়ো হাওয়া বইছে, শুকনো পাতাগুলো এদিক সেদিক উড়ে যাচ্ছে। ধূলোবালি এসে একেবারে চোখে মুখে বিঁধছে। হালকা রোদও উঠেছে।
বাদল গাছতলার ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালো। মাঠে ছোটাছুটি করতে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালো। অসহায়ের ন্যায় বিড়বিড় করে বললো, “শুধু একবার দেখা করিয়ে দাও খোদা—”
টুপটাপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রগুলো হৈ দিয়ে ওঠে। বাদল পুরোনো ভবনের পাশ ঘেঁষে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। বৃষ্টির তেজ ক্রমেই বাড়ছে, শার্ট ভিজে যাচ্ছে। সে মাথার উপর হাত দিয়ে কোনোমতে বারান্দায় উঠে দাঁড়ালো। এখানেও শিক্ষার্থীদের ভিড়, বিশেষ করে মেয়েদের।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে আসে ছেলেটা। বাইরে এখন মুষলধারে বৃষ্টি, আর দাপুটে বাতাস। দূরের কয়েকটা লম্বা সুপারি গাছ হেলেদুলে তাল মেলাচ্ছে দমকা হাওয়ার সাথে। একটা ছোট শ্বাস ফেলে লাইব্রেরির ভেতর ঢুকলো বাদল। আজকে এখানে মানুষ কম, অধিকাংশ আসনই ফাঁকা পড়ে আছে। জানালার দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই সে দেখলো, তার জায়গায় একটা মেয়ে বসে আছে। মাথায় ওড়না দেয়া, দূর থেকে মুখটা বোঝা যাচ্ছে না স্পষ্ট। বাদল জোরে জোরে হেঁটে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, “এই যে আপু? এটা আমার জায়গা।”
মেয়েটা তার দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না। তার নাকের বামপাশে একটা ছোট্ট নাকফুল। জানালা দিয়ে আসা তীর্যক নরম আলোয় সেটা হীরের মতো চকচক করছে। চাপা বর্ণের মুখশ্রীতে কী সুন্দরভাবে মানিয়ে গেছে!
তার দিকে বোকার মতো কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর বাদল হঠাৎ সচেতন হয়। ভদ্রতা রক্ষার্থে না হলেও, অপ্রস্তুত ভাবটা লুকাতে মৃদু হেসে বলে, “আপু, আপনি অন্য কোথাও গিয়ে পড়েন। এই জায়গা ছাড়া আমার পড়া হয় না।”
মেয়েটা তার কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আবার বইয়ের দিকে তাকালো। বাদল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
কয়েক মাসে লাইব্রেরির এই আসনটার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে গেছে সে। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীই এটা জানে, সেজন্য এখানে বসার দুঃসাহস দেখায় না কেউ। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সামনে বসে থাকা মেয়েটা হয়তো এ ব্যাপারে উদাসীন।
বাদলের মেজাজটা ধীরে ধীরে আরও খারাপ হয়ে গেলো। সে রাগ নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা করলো, পারলো না। পাশের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো। সেখান থেকে একটা কাঠের চেয়ার টেনে আনতে লাগলো। চেয়ারটাকে উঁচু করে তুলে আনার সামর্থ্য তার আছে। কিন্তু সে বিদঘুটে শব্দ করে সেটাকে টেনে ঐ টেবিলের সামনে রাখলো। লাইব্রেরিতে উপস্থিত কয়েক জোড়া বিরক্ত এবং কৌতূহলী চোখ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সে তোয়াক্কাই করলো না। মেয়েটার সামনে চেয়ার রেখে মুখোমুখি সেখানেই বসে পড়লো। মেয়েটাও তোয়াক্কা করলো না। বাদল শীতল দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। এতোকিছুর পরেও মেয়েটার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে তার মুখখানা অন্ধকার হয়ে যায়।
বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সেটার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এমন নীরবতা চিরে হঠাৎ ঘণ্টা বেজে উঠলো, টিফিনের বিরতি শেষ। বাদলের সামনে বসে থাকা মেয়েটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বইগুলো গুছিয়ে ফেললো, উঠে দাঁড়িয়ে আলমারিতে সাজিয়ে রাখলো সেগুলো। তারপর লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেলো। প্রায় সবাই বেরিয়ে গেলো। বসে রইলো কেবল বাদল। তার সর্বাঙ্গে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে! এভাবে উপেক্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতা নেই তার। তবে দুঃখের বিষয়, সে কিছুই করতে পারছে না। এবং তার চেয়েও বড় দুঃখের বিষয়, বাদল জানে না, তার মেজাজ বিগড়ে দেয়া ঐ মেয়েটা মৌমিতা খন্দকার।
—————
মারুফ উঠোনে পা রাখলেন, হাতে বাজারের ব্যাগ। মার্জিয়া আজকেও একেবারে দরজার সামনে গামছা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাবেয়া হয়তো খেয়াল করেননি এখনও। মারুফ কাছে গিয়ে সেটা ধরে দেখলেন শুকিয়ে গেছে কিনা, তারপর আধভেজা গামছাটাকে অন্য দড়িতে ঝুলিয়ে দিলেন।
রিপন আজ বাড়িতেই আছে, পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছে। রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন মারুফ, বাজারের ব্যাগটা নামিয়ে রাখলেন। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হচ্ছিলো, এখন তা থেমেছে। ঝরঝরে প্রকৃতিতে হালকা রোদ উঠেছে। তিনি মেয়েদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, “মৌ মা?”
রিপন বলে উঠলো, “মৌ আসেনি এখনও।”
তবু ঘরের ভেতরে উঁকি দিলেন মারুফ। ঘটঘট শব্দে ফ্যান ঘুরছে। মার্জিয়া আপাদমস্তক চাদরে ঢেকে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মারুফ চলে যাচ্ছিলেন, তখন তার দৃষ্টি যায় টেবিলের ওপর রাখা ধূসর ডায়েরিতে। তিনি টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডায়েরির কয়েকটা পাতা উল্টে দেখলেন। মৌমিতা কিছুই লেখেনি এখানে, একটা দাগ পর্যন্ত দেয়নি। মারুফের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো।
মৌমিতার ডাকাডাকিতে যখন মার্জিয়ার ঘুম ভাঙে, তখন ভরদুপুর। তুলনামূলক গরম লাগছে। মার্জিয়া পা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে শরীর থেকে চাদরটা সরালো, তারপর উঠে বসে দুইহাতে চোখ ঘষতে লাগলো। মৌমিতা জানালার পর্দা সরিয়ে বলে, “খেতে যা।”
“খুবই বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
“কী?”
“ঐ তো, দেখলাম জু—”
মার্জিয়া সতর্ক হয়ে মাঝপথে কথা থামায়। সে যা দেখেছে, তা আপাকে বলা উচিত হবে না। এদিকে আগামাথা না ভেবে সে বলতেও শুরু করেছে। মৌমিতা সামনে এসে দাঁড়ায়, “কী দেখলি? জুনায়েদ ভাই বিয়ে করে ফেলেছে?”
ভেতরের অস্থিরতা চাপা দিয়ে মার্জিয়া স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো, তবে একটু নাটকীয়ভাবেই বলে উঠলো, “ছ্যাহ! ওনাকে কেন দেখতে যাবো আমি?”
“বাজে স্বপ্নের কথা বললি, তাই বললাম আরকি।”
তার আপা মুখ টিপে হাসছে। মার্জিয়া অন্যদিকে তাকায়, খাটে পা ঝুলিয়ে বসে।
“খেতে আয় মার্জু।”
মৌমিতা খাওয়ার ঘরে যায়।
কিছুক্ষণ ঠায় বসে থাকার পর মার্জিয়া হাই তুললো। আপা ইদানিং বাড়াবাড়ি করছে। কিছু বুঝতে পেরেছে সম্ভবত। মার্জিয়ার ইচ্ছে করছে, তার আপার জীবনেও কেউ আসুক। তারপর যখনই জুনায়েদ ভাইয়ের প্রসঙ্গ আনা হবে, আরেকটা মানুষের প্রসঙ্গ টেনে আপাকে চুপ করিয়ে দেয়া যাবে। এভাবে একা একা আর ভুগতে চায় না সে।
মৌমিতাদের টিউশন ক্লাস শেষ হয় বিকেল ৫টার দিকে। রবিউল স্যার গণিত পড়ান। নিজের বাড়ির একপাশে মাঝারি আকারের ঘরটা তিনি পড়ানোর জন্য বরাদ্দ রেখেছেন। বামদিকের সারির ৩য় বেঞ্চে মৌমিতা বসে, পাশে একটা জানালা আছে। এখানে সবার আসনই মোটামুটি নির্ধারিত। তামান্না নিয়মিত আসে না, যেদিন আসে, মৌমিতার পাশেই বসে। আজকে সে আসেনি।
মৌমিতা ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। একদিনের বৃষ্টিতেই রাস্তার দু'পাশে পানি জমেছে। বিকেলের নরম রোদে তবু স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে সব। শ্যাওলা আবৃত দেয়ালের পাশ দিয়ে মেয়েটা সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে থাকে। রাস্তার ঐ পাড়ে তাকাতেই ছেলেটাকে দেখতে পারে সে। আজকেই কলেজে দেখা হয়েছিলো তার সঙ্গে, সম্ভবত জুনিয়র। একটা সামান্য আসন নিয়ে বেশ ভালোই ঝামেলা বাঁধানোর চেষ্টা চালিয়েছিলো। এখন আশেপাশের কয়েকটা ছেলের সাথে হাসাহাসি করছে সে, যতোবারই হাসে, তার দুই গালে টোল দৃশ্যমান হয়।
মৌমিতা মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো। প্রায় সবাই চলে যাচ্ছে।
রিকশা ডাকা নিয়ে তার তাড়াহুড়ো নেই। অন্যরা চলে যাওয়ার পরে সে ধীরেসুস্থে রিকশা ডাকে, ভাড়া ঠিক করে—সবসময় এমনই হয়। রিকশা নিয়ে প্রতিযোগিতা করার কোনো কারণ খুঁজে পায় না মৌমিতা। আজকে ভ্যান, রিকশা কোনোটাই তেমন নেই। সে তবু রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের আরেকপাশে একটা প্রকাণ্ড কৃষ্ণচূড়া গাছ। পাতা থেকে বৃষ্টির পানি ঝরছে এখনও। মাথার ওড়নাটা একটু ভালো করে টেনে দিলো মৌমিতা, মুখের সামনে থেকে চুল সরালো।
ছেলেগুলো কখন রাস্তা পার হয়েছে, সে দেখেনি। তারা এখন এদিকেই আসছে। মৌমিতা চোখ নামিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়ালো। লাইব্রেরির ঐ ছেলেটা কি তাকে দেখেছে? চিনতে পেরেছে?
ছেলে গুলো তাকে অতিক্রম করে চলে যায়। বাকিদেরকে সে খেয়াল করলো না। গালে টোল পড়া ছেলেটা যখন পাশ কাটিয়ে গেলো, তার গতির কারণে সৃষ্ট বাতাসের ঐ সামান্য ধাক্কায় মেয়েটার চুলগুলো আবার এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে চলে আসে।
তারা রবিউল স্যারের বাড়িতে ঢুকলো। মৌমিতা বুঝলো, ওরা একাদশ শ্রেণির ব্যাচটাতে পড়ে। ওদিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে আবার রিকশা খোঁজায় মনোযোগ দিলো সে। কৃষ্ণচূড়ার পাতা থেকে এখনও টুপটুপ করে পানি ঝরছে, মাথার ওড়নাটা প্রায় ভিজেই গেছে। সেদিকে তার মনোযোগ নেই। রাস্তার দিকে তাকিয়ে অকারণে মিটমিট করে হেসে ওঠে মেয়েটা, তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “জুনিয়র!”
আপাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মার্জিয়া বই বন্ধ করলো, উৎফুল্ল হয়ে বললো, “আপা? চলো না আজকে কোথাও ঘুরতে যাই?”
“আজকে?”
“হ্যাঁ। আজকে অতো গরম নেই। পরিবেশটাও সুন্দর—”
“এখন তো সন্ধ্যাই হয়ে যাবে।”
মার্জিয়া খোলা জানালার দিকে তাকালো। সূর্যের তেজ কমে এসেছে। সিমেন্টের কালো মেঝেতে এখনও এক চিলতে কমলা রঙের রোদ দেখা যাচ্ছে। সেদিকে চোখ রেখেই মার্জিয়া দেয়ালে হেলান দিলো, “তাও ঠিক। সন্ধ্যায় তো বের হওয়া যাবে না। আব্বা দোকানে, রিপন মামাও বাড়িতে নেই। কে নিয়ে যাবে?”
মৌমিতা মাথা নাড়ে, ওড়নাটা মাথা থেকে খুলতে খুলতে বলে, “কাল যাস তাহলে। আমার ক্লাস নেই কালকে।”
“যদি বৃষ্টি থাকে সারাদিন?”
“তাহলে বৃষ্টিতে ভিজবো। অনেকদিন হলোই তো ভিজি না।” ভেজা ওড়নাটার দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকালো মৌমিতা। দরজার পেছনে ঝুলিয়ে রাখলো সেটা। মার্জিয়া একটু ভেবে বললো, “আম্মা রাজি হবেন না। জ্বর ধরার ভয় দেখাবেন। নাহলে বকবেন। আর তাছাড়াও—”
“চাচিইই?”
জুনায়েদের ডাক শুনতেই মার্জিয়া সটান হয়ে বসলো। তারপর খাট থেকে নেমে বাইরে ছুটলো। মৌমিতা বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, “তোকে ডাকেনি, পাগল! আম্মাকে ডেকেছে।”
মার্জিয়া শুনলো না। ওড়না ঠিক করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। জুনায়েদ তাকে দেখেই একটা কাগজের ঠোঙা এগিয়ে দিয়ে বললো, “এটা চাচা পাঠিয়েছেন।”
খুব সাবধানে ঠোঙাটা হাতে নেয় মার্জিয়া, “কী আছে?”
“সিঙ্গারা। এখন গরম আছে, পরে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”
“আপনি ভেতরে আসবেন না?”
“না। যেদিন দাওয়াত দিবা, সেদিন যাবো।”
মার্জিয়া চোখ নামায়, আঙুল ঘুরিয়ে ঠোঙায় অদৃশ্য নকশা আঁকতে আঁকতে বলে, “ধরেন, আজকেই দাওয়াত দিলাম।”
“তুমি দিলে তো হবে না। যদি চাচি দেন, তাহলে আসবো। রান্না তো আর তুমি করবা না, তাই না!” জুনায়েদ হেসে বলে, “আসি।”
—————
বাদল চায়ের দোকানের বেঞ্চটার উপর গিয়ে বসলো। পাউরুটি ছিঁড়ে ছুঁড়লো রাস্তার কুকুরগুলোর দিকে। বাদলের সাথে তাদের বেশ ভাব হয়েছে। অথচ পরিচয়ের বেশিদিন হয়নি। কলেজের পেছনের এই গলিটা কুকুরদের অভয়ারণ্য। মাঝে মাঝে কিছু নেশাগ্রস্ত ছেলেদেরও দেখা যায়। তবে তাদের উৎপাত এখন কমেছে।
এই কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বাদলের অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। তবু তার বিশ্বস্ত বন্ধুদের তালিকার সবচেয়ে বড় স্থান দখল করেছে কুকুরগুলো। অবলা মানুষদের ভালো না লাগলেও, এই অবলা প্রাণীগুলোকে তার খুব ভালো লাগে। রেলস্টেশনের পরেই তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা–কলেজের পেছনের এই গলিটা।
হাতে থাকা পাউরুটির শেষ টুকরোটা ছুঁড়ে সে উঠে দাঁড়ায়। দোকানদার বললেন, “চা খাবা না বাবু?”
বাদল পেছনে ঘোরে, জোর করে একটু হেসে বলে, “বাবু? আমাকে বাচ্চা মনে হয়?”
দোকানদারও হাসলেন, “বাচ্চাই তো। আমার নাতির বয়স তোমার সমান। ওরে আমি বাবু বলি। এখন চা খাবা নাকি? দিবো?”
“না।”
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। হোস্টেলে ফিরতে হবে। কুকুরগুলোকে পেছনে ফেলে বাদল হাঁটতে শুরু করে।
আমজাদ আর রাশেদ কোনো একটা পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছে। বাদল ভেতরে ঢুকে চেয়ারে গিয়ে বসলো। আমজাদ তাকে দেখে খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো, “কুত্তাদেরকে আপ্যায়ন করে আসলি?”
বাদল মাথা নাড়ে, “হুম।”
“শোন। আমরা ছাদে একটা চড়ুইভাতির আয়োজন করবো। আমাদের ক্লাসের কয়েকজন মিলে কথা বলেছি। আর তোরাসহ ফার্স্ট ইয়ারের কয়েকজন থাকবি।”
“রান্না কে করবে?”
আমজাদ তার কাছে এসে দাঁড়ায়, “কে আর করবে? আমাদেরকেই করতে হবে।”
“খালাকে বললেই হয়।”
“না না। খালা ঐদিন ছুটিতে থাকবে। রান্না তুই করিস। রাশেদ বললো, তুই নাকি ডিম সিদ্ধ করতে পারিস, ভাজতেও পারিস।”
“এহ! তাই বলে আমি রান্না করবো? প্রশ্নই আসে না। ঐসব মেয়ে মানুষের কাজ—”
আমজাদ এবার তার কান টেনে ধরলো, “কথা ঘুরাবি না বেয়াদব। বল, রান্না করবি? বল!”
বিনা কারণে হঠাৎ এমন কানমলা খেয়ে বাদল খেই হারিয়ে ফেললো। নিজেকে কোনোমতে মুক্ত করে বললো, “আচ্ছা, আচ্ছা।”
রাশেদ বলে ওঠে, “এখন মেয়েরা চাকরিও করে ছেলেদের মতো। কিন্তু ছেলেরা যদি রান্না করতে চায়—”
“তোকে কেউ কিছু বলতে বলেছে?”
“বলবে কেন? আমার মুখ আছে, আমি বলবো।”
“সেজন্য অসময়ে কথা বলবি?”
আমজাদ মহাবিরক্ত হয়ে ধমক দিলো, “চুপ কর তো শালা! ভাগ্য করে তোদের মতো দুইটা রুমমেট পেয়েছি। একটা বেশি কথা বলে, আরেকটা কথাই বলে না। আর যখন দুইজনই কথা বলে, তখন বিস্ফোরণ ঘটে।”
তিনজন নীরবতা পালন করে কিছুক্ষণ। তারপর রাশেদ হতাশ ভঙ্গিতে বলে, “আমি আপনার শালা নই।”
“বাকি কথা শুনিস নাই?”
“শুনেছি।” রাশেদ বাদলের দিকে তাকায়, “খুঁজে পেয়েছিস সিনিয়র মেয়েটাকে?”
বাদল ডানে-বামে মাথা নাড়ে। তারপর টেবিলের দিকে ঘুরে বসে। তার বইগুলোর উপরে রাখা আছে নীল ডায়েরিটা। অপঠিত একটামাত্র পৃষ্ঠা বাকি আছে সেখানে। ডায়েরিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো সে। তারপর সেটাকে বইয়ের উপর থেকে নামিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। সযত্নে পাতা ওল্টাতে লাগলো।
“মার্চ, ১৯৯১:
দেশের সরকার বদলে গেছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টি থেকে আমি তেমন পরিবর্তন দেখছি না। তবে একটু স্বস্তি পেয়েছি, স্বৈরশাসকের পতন হওয়ায়। উত্তাল দেশটা এখন অনেকটাই শান্ত হয়েছে। এ কয়দিন আমি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পত্রিকা পড়েছি। আগে যে পড়তাম না, এমন নয়। আগে শুধু কাগজে ছাপা গল্প আর ধারাবাহিক উপন্যাসগুলো পড়তাম। কিন্তু এবার দেশ বিদেশের সব খবরই পড়েছি। বড় হয়ে যাচ্ছি তো!
কিছুদিন হলো আবার অরুচি এসে গেছে খবরে। এই শান্ত দেশে কোনো নতুন খবর নেই। সরকার কী করছে, কী করতে চাচ্ছে, এগুলোই এখন মূল সংবাদ। আগের মত আর উত্তেজনা নেই এসব খবরে।
মাঝে মাঝে একটা ব্যাপার ভাবলে খুব অদ্ভুত লাগে। আশেপাশের মানুষেরা আমাকে শান্তশিষ্ট ভাবে। তারা মনে করে, একা থাকতে আমার ভালো লাগে। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু অনেকেই ভাবে, আমার হয়ত এমনই শান্ত, নির্জন আর নির্ভেজাল জীবন ভালো লাগে। এটা নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত না। এই নিয়ম কানুনে ঠাসা জীবনটা ভীষণ একঘেয়ে। আমি চাই, আমার জীবনটা ঝড় বাদলে পূর্ণ থাকুক।
যাই হোক, এসব কথা এখন বাদ। হুমায়ূন আহমেদের একটা নতুন বই প্রকাশ পেয়েছে, নাম বহুব্রীহি। এই বইটা আমি কত খুঁজলাম, কোথাও পেলাম না। তামান্নার কাছে অনেক বই আছে। কিন্তু এটা ওর কাছেও নেই। আমাদের এদিকের কোনো গ্রন্থাগার বা বইয়ের দোকানে এখনও আসেনি বোধহয়। আর এলেও আমার কিছু করার নেই। আম্মা বলেছেন, এই বছর আর কোনো বই কিনে দেয়া হবে না। তামান্না অবশ্য কিনবে। ওরা বড়লোক মানুষ। ওর কাছ থেকে ধার নিয়েই পড়তে হবে।”
বাদল ছোট একটা শ্বাস ফেলে পরবর্তী ফাঁকা পৃষ্ঠাটার দিকে তাকায়। মৌমিতা খন্দকারের ডায়েরির সাথে তার যাত্রাটা এখানেই শেষ। ডায়েরি ফেলে দেওয়ার কারণটা এখান থেকে জানা গেলো না। সাদা পাতাগুলোর মাঝখানে কয়েকটা শুকনো পাপড়ি চাপা দিয়ে রাখা। গোলাপের পাপড়ি, কালচে লাল বর্ণের। বাদল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, পাপড়ি গুলোতে আঙুল বুলিয়ে আবার আগের পৃষ্ঠায় আসে। তামান্না নামের মেয়েটা কি বই কিনে ফেলেছে?
গালে হাত দিয়ে ঐ বাক্যটাতে বাদল আরেকবার চোখ বোলায়, “আমি চাই, আমার জীবনটা ঝড় বাদলে পূর্ণ থাকুক।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু হেসে ফেলে ছেলেটা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………