দরদর করে ঘামছে ফাহিমা। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম হাতের তালু দিয়ে মুছে শীর্ণ পায়ে হেঁটে একটা চেয়ার টেনে বসতেই তার হাত থেকে লাঠি পড়ে মেঝেতে মৃদু শব্দ তুলল। লাঠি তোলার আগ্রহ কিংবা শক্তি কোনোটাই পেল না সে, চেয়ারে ভার ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজল।
ফাহিমার অত্যন্ত দক্ষ হাত, শক্তিশালী বাহু। পুরুষের মতো উচ্চতা তার। জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব পালনে সে শতভাগ সফল। আসামির মুখ থেকে কথা বের করতে যেকোনো কিছু করতে বদ্ধপরিকর সে। বড় বড় রাঘব বোয়ালরাও তার সামনে টিকতে পারে না। অপরাধীরা তার হাত থেকে বাঁচার জন্য ভেতরের সব কথা উগড়ে দেয়নি এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। অথচ আজ পাঁচদিন দিন যাবৎ এক অল্প বয়সী মেয়ে তার হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে টু শব্দটিও করেনি। শারীরিক, মানসিক-কোনো নির্যাতন বাকি রাখা হয়নি তবুও তার আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি! যেন একটা পাথরকে লাগাতার পেটানো হচ্ছে, যার জীবন নেই, ব্যথা নেই; একটি জড়বস্তু মাত্র! এই পাথরের রক্ত ঝরে, কিন্তু জবান খোলে না।
ফাহিমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চাপা আক্রোশ নিয়ে মেয়েটিকে শাসাল, ‘শেষবারের মতো বলছি, মুখ খোল।’
মেয়েটি তার থেকে দুই হাত দূরে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় ঝিমুচ্ছে। এক মিনিট… দুই মিনিট করে দশ মিনিট পার হয়ে গেল কিন্তু মেয়েটির থেকে কোনো জবাব এলো না। ফাহিমা হতাশাবোধ করছে। চারপাশে থমথমে নীরবতা, মেয়েটি কি নিঃশ্বাসও নেয় না?
নীরবতা ভেঙে যায় বুটের ঠকঠক শব্দে। উপস্থিত হয় ইন্সপেক্টর তুষার। তাকে দেখেই ফাহিমা উঠে দাঁড়ায়, স্যালুট করে।
তুষার পেশাদারী কণ্ঠে প্রশ্ন করে, ‘কী অবস্থা?’
ফাহিমা নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ করার সঙ্গে চারদিনের বর্ণনা দেয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। তুষার বহুদর্শী চোখে মেয়েটিকে দেখল তার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ফাহিমাকে বলল, ‘আপনি আসুন।’
রিমান্ডে আসামিকে বিভিন্ন নির্যাতনের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করার ব্যাপারটা ফাহিমার কাছে ভীষণ উপভোগ্য। কিন্তু এই প্রথম সে কোনো দায়িত্ব থেকে পালাতে চাচ্ছে। ফাহিমা হাঁফ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
তুষার একটি চেয়ার টেনে মেয়েটির সম্মুখ বরাবর বসে। ঠান্ডা গলায় বলে, ‘আজই আমাদের প্রথম দেখা।’
সামনের মানুষটা যেভাবে ছিল সেভাবেই রইল। কিছু বলল না, তাকালও না।
তুষার বলল, ‘মা-বাবাকে মনে পড়ে?’
মা-বাবা শব্দ দুটি যেন নিস্তব্ধ তীড়ে সমুদ্রের ঢেউ নিয়ে আসে। মেয়েটি নড়ে উঠে, চোখ তুলে তাকায়। তার অপূর্ব গায়ের রং, ঘোলাটে চোখ। কাটা ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে। চোখের চারপাশে গাঢ় কালো দাগ। এ নতুন নয়, মুখের এমন দশা রিমান্ডে আসা সব আসামিরই হয়।
তুষার মুখের প্রকাশভঙ্গী আগের অবস্থানে রেখে পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘মা-বাবাকে মনে পড়ে?’
মেয়েটি বাধ্যের মতো মাথা নাড়ায়। মনে পড়ে। তুষার কিছুটা ঝুঁকে এলো।
মেয়েটির দৃষ্টিজুড়ে নীলচে যন্ত্রণা। তুষার তার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘নাম কী?’
মেয়েটির নাম সহ খুঁটিনাটি সবই জানে তুষার, তবুও জিজ্ঞাসা করল। তার মনে হচ্ছে, অপর পক্ষ থেকে উত্তর আসবে।
তার ধারণাকে সত্য প্রমাণ করতে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে মেয়েটি নিজের নাম উচ্চারণ করল, ‘পদ্ম…আমি…আমি পদ্মজা।’
পদ্মজা চৈতন্য হারিয়ে হেলে পড়ে তুষারের ওপর। তুষার দ্রুত তাকে বাহুডোরে আটকে ফেলল। উঁচু কণ্ঠে ফাহিমাকে ডাকল, ‘ফাহিমা, দ্রুত আসুন।’
—————
১৯৮৯ সাল।
সকাল সকাল রশিদ ঘটকের আগমনে হেমলতা বিরক্ত হোন। তিনি বহুবার পইপই করে বলেছেন, ‘পদ্মর বিয়ে আমি এখনি দেব না। পদ্মকে অনেক পড়াব।’
তবুও রশিদউদ্দিন প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসে। হেমলতার কথা হচ্ছে, মেয়ের বয়স আর কতই হলো? মাত্র ষোল। শামসুল আলমের মেয়ের বিয়ে হয়েছে চব্বিশ বছর বয়সে। পদ্মর বিয়েও তখনি হবে, ওর পছন্দমতো।
হেমলতা রশিদকে দেখেও না দেখার ভান ধরে মুরগির খোয়াড়ের দরজা খুলে দিলেন। রশিদ এক দলা থুথু উঠানে ফেলে হেমলতার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বুঝছ পদ্মর মা, এইবার যে পাত্র আনছি এক্কেরে খাঁটি হীরা।’
হেমলতা বিরক্ত ভরা কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমি কি আমার মেয়ের জন্য আপনার কাছে পাত্র চেয়েছি? তবুও বার বার কেন এসে বিরক্ত করেন?
রশিদউদ্দিন হার মানার লোক নয়, সে হেমলতাকে বুঝানোর চেষ্টা করল, যুবতী মাইয়া ঘরে রাহন ভালা না। কখন কী হইয়া যাইব টের পাইবা না।’
‘মেয়েটা তো আমার। আমাকেই বুঝতে দেন?’ রশিদউদ্দিনের উপস্থিতি যে তিনি নিতে পারছেন না তা স্পষ্ট। তবুও রশিদ নির্লজ্জের মতো নানা কথায় তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করল কিন্তু সুবিধা করতে পারল না। ব্যর্থ থমথমে মুখ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
প্রতিদিন কোনো না কোনো পাত্রপক্ষ এসে হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলবে, ‘মোর্শেদের বড় ছেড়িডারে চাই।’
সব পাত্র যদি এই এক মেয়েকেই চায় তাহলে তার কী করার? তাকেও তো টাকাপয়সা কামাতে হবে!
রশিদ গজগজ করতে করতে আওড়ায়, ‘গেরামে কি আর ছেড়ি নাই? একটা ছেড়িরেই ক্যান সবার চোক্ষে পড়তে হইব?’ কথা শেষ করেই সে এ দলা থুতু ফেলল সড়কে।
রোদ উঠতে না উঠতেই মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি হবে। বছরের এই সময়ে এভাবেই রোদ-বৃষ্টির খেলা চলে। বর্ষায় একদম স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না পূর্ণার। শুধু মারের ভয়ে যেতে হয়। সে মুখ কালো করে স্কুলের জামা পরে পদ্মজাকে ডাকল, ‘আপা? এই আপা? স্কুলে যাবা না? আপারে।’
পদ্মজা পিটপিট করে চোখ খুলে কোনোমতে বলল, ‘না। যাব না।’ পর পরই চোখ বুজে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। পূর্ণা নিরাশ হয়ে হেমলতার ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা, আপা কি স্কুলে যাইব না?’
হেমলতা বিছানা ঝাড়ছিলেন। হাত থামিয়ে পূর্ণার দিকে কড়াচোখে তাকিয়ে বললেন, ‘যাইব কি? যাবে বলবি। বল, যাবে।’
পূর্ণা মাথা নত করে বলল, ‘যাবে।’
হেমলতা বললেন, ‘তোদের পড়াশোনা করাচ্ছি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার জন্য নয়। বইয়ের ভাষায় কথা বলবি।’ পূর্ণা মাথা নত করে রেখেছে। তা দেখে হেমলতা সন্তুষ্ট হোন। তার মেয়েগুলো মায়ের খুবই অনুগত।
তিনি পুনরায় বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, পদ্মর শরীর ভালো না। সারারাত পেটে ব্যাথায় কেঁদেছে। থাকুক, আজ ঘুমাক।’
পূর্ণার সদ্য পা দেয়া কিশোরী মন চট করে বুঝে যায় পদ্মজা কীসের ব্যাথায় কেঁদেছে। সে গতকাল রাতে নানাবাড়ি ছিল বলে জানত না। ভোরেই চলে এসেছে। নানাবাড়ি কাছে, হেঁটে যেতে পাঁচ মিনিটও লাগে না।
পূর্ণাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেমলতা বললেন, ‘তুই যা। মাথা নিচু করে যাবি মাথা নিচু করে আসবি। কোনো অভিযোগ যেন না শুনি।’
‘আচ্ছা আম্মা।’
পূর্ণা ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। সবাই বলে তার চুল নাকি খুব সুন্দর। কিন্তু সে নিজেকে পুরোটাই সুন্দর মনে করে। গায়ের রং কালো হতে পারে তবে সে কখনোই সেজন্য নিজেকে অসুন্দরভাবে না। পূর্ণার ইদানীং খুব সাজতে ইচ্ছে করে। কিন্তু হেমলতা সাজগোজ পছন্দ করেন না। তাই সে সতর্ক দৃষ্টিতে মায়ের উপস্থিতি একবার দেখে নিলো। আশপাশে নেই! পূর্ণা দ্রুত গত মাসে মেলা থেকে আনা লাল লিপস্টিক গাঢ় করে ঠোঁটে মাখল। এখন হেমলতা দেখার আগে এক ছুটে বেরিয়ে যাবে।
ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা বাজল। এখনো পদ্মজা ওঠেনি। হেমলতা শব্দহীন পায়ে মেয়েদের ঘরে প্রবেশ করেন। বিশাল বড় বিছানায় পদ্মজা দুই হাত ভাঁজ করে ঘুমাচ্ছে। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা আলতো পেলব রোদ্দুরের স্পর্শে পদ্মজার মসৃণ পাতলা ঠোঁট, ফরসা ত্বক চিকচিক করছে। হেমলতা বিসমিল্লাহ বলে দ্রুত পদ্মজার গায়ে তিনবার ফুঁ দিলেন। গুরুজনরা বলে, মায়ের নজর ভালো না। এতে সন্তানের ক্ষতি হয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে নজর কাটাতে বিসমিল্লাহ বলে ফুঁ দিয়ে দিলেন
হেমলতার মায়া লাগছে পদ্মজার ঘুম ভাঙাতে।
তবুও আদুরে গলায় ডাকলেন, ‘পদ্ম। এই পদ্ম।’
পদ্মজা চোখ খুলে মাকে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে। যেদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় সেদিনই তাকে হেমলতা ডেকে তুলেন। পদ্মজা অপরাধী কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘বেশি দেরি হয়ে গেছে আম্মা?’
হেমলতা হেসে বললেন, ‘না, মুখ ধুয়ে খেতে আয়।’
পদ্মজা দ্রুত কলপাড়ে গিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে নিল। হেমলতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তার বাবা ছিল হাই স্কুলের শিক্ষক। তাই তার মধ্যে নিয়ম-নীতির প্রভাব বেশি। মেয়েদের শক্তপোক্ত নিয়মে বড় করছেন। নিয়মের মধ্যে সবকিছু হওয়া চাই।
পদ্মজা রান্নাঘরে ঢুকে দেখে স্টিলের প্লেটে খাবার সাজানো। হেমলতা রান্নাঘরে ঢুকতেই পদ্মজা দ্রুত ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে নিল।
এটি হেমলতার দেওয়া আরেকটি আদেশ, খাওয়ার সময় মাথা ঢেকে খেতে হবে। পদ্মজা খেতে বসতেই হেমলতা মেয়েকে সরল কণ্ঠে বললেন, মুখ ধুতে গিয়ে চুল ভিজিয়ে এসেছিস। খেয়ে রোদে বসে চুলটা শুকিয়ে নিস।’
‘আচ্ছা আম্মা।’ পরক্ষণেই বলল, ‘আম্মা, পূর্ণা, প্রেমা আসেনি?’
‘পূর্ণা স্কুলে। প্রেমা দুপুরে আসবে।’
‘আর আব্বা…আব্বা কবে আসবেন?’ মিনমিন করে বলল পদ্মজা।
এই প্রশ্নে হেমলতা থমকে দাঁড়ালেন। শুকনো গলায় জবাব দিলেন, ‘খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।
পদ্মজার চোখ দুটি জ্বলতে শুরু করে। তার জীবনে জন্মদাতা আছে কিন্তু জন্মদাতার আদর নেই। সে জানে না তার দোষটা কোথায়? কেন নিজের বাবা বাকি বোনদের আদর করলেও তাকে করে না? কথা অবধিও বলেন না। পদ্মজা বহুবার হেমলতাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমি কি তোমাদের সত্যিকারের মেয়ে আম্মা? নাকি সন্তান হয় না বলে কি দত্তক এনেছিলে? আব্বা কেন আমাকে এত অবহেলা করে? ও আম্মা…আম্মা বলো না?’
হেমলতা নিশ্চুপ থেকে অনেকক্ষণ পর জবাব দেন, ‘তুই আমার গর্ভের সন্তান। আর তোর বাবারই মেয়ে। এখন যা, পড়তে বস। অনেক পড়তে হবে তোর।’
ব্যাস এইটুকুই! যতবার প্রশ্ন করেছে একই উত্তর পেয়েছে। কখনো কোনো শব্দের নড়চড় হয়নি।
‘এত কী ভাবছিস? তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ।’
হেমলতার কথায় পদ্মজার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে দ্রুত খাওয়া শেষ করে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, আজ বড়ই আচার বানানোর কথা ছিল।
সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। কয়েক মাস হলো গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। আট গ্রাম মিলিয়ে অলন্দপুর। তাদের গ্রামের নাম আটপাড়া। প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যারাত থেকে তিন ঘণ্টা অন্ধকারে তলিয়ে থাকে গ্রাম। সারাদিন তো বিদ্যুৎ এর নামগন্ধও থাকে না। তাহলে বিদ্যুৎ দিয়ে লাভটা কী হলো? পদ্মজা, পূর্ণা, প্রেমা তিন বোন একসঙ্গে পড়তে বসে। হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই মোড়ল বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে যায়। নয় বছরের প্রেমা খামচে ধরে পদ্মজার ওড়না। পদ্মজা মৃদু স্বরে ডাকল, ‘আম্মা…আম্মা।’
হেমলতা ভেতরের ঘর থেকে বললেন, ‘টর্চ নিয়ে যা।’
হেমলতার ডাকে পদ্মজা উঠে দাঁড়ায়। প্রেমা অন্ধকার খুব ভয় পায়। বড় বোনের ওড়না ছেড়ে পূর্ণার হাত চেপে ধরে। টর্চ নিয়ে ঘরে ঢোকার মুহূর্তে পদ্মজা গেইট খোলার আওয়াজ পায়। উঁকি দিয়ে দেখে হানিফ এসেছে। লোকটা সম্পর্কে তার সৎ মামা। হানিফকে দেখেই সে দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে।
হানিফ চেঁচিয়ে বলে, ‘বুবু, বাড়ি আন্ধার ক্যান! বাত্তি-টাত্তি জ্বালাও।’
‘হানিফ নাকি?’ হেমলতা হারিকেন হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ান। হানিফ দাঁত বের করে হাসল। বলল, ‘হ, আমি।’
‘আয়, ভেতরে আয়।’
হানিফ বারান্দা পেরিয়ে বড় ঘরে ঢুকে বলল, ‘তোমার ছেড়িগুলা কই?’
‘ঘরেই আছে, পড়াশোনা করে।’
‘এই আন্ধারেও পড়ে!’ অবাক হয়ে বলল হানিফ।
হেমলতা কিছু বললেন না। হানিফ এই বাড়িতে আসলে কোনো কারণ ছাড়াই অস্বস্তি হয় তার
তিনি প্রসঙ্গ এড়াতে বললেন, ‘ওদের খাওয়ার সময় হয়েছে। তুইও খেয়ে নে।
‘এইহানেই খামু? না তোমার সরাইখানাত যাইতে হইব?’
তার উচ্চারিত শেষ বাক্যে রসিকতা ছিল। গ্রামে থেকেও হেমলতা খাবারের জন্য আলাদা ঘর রেখেছে সেটা হানিফের কাছে রসিকতাই বটে!
হেমলতার স্বাভাবিক সুরে বললেন, ‘খেতে চাইলে খেতে আয়।’
পদ্মজা কিছুতেই রাতের খাবার খেতে আসল না। কেমন জড়োসড়ো হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, হানিফকে ভয় পাচ্ছে বা কোনো কারণে অবহেলা করছে। হানিফ ছয় বছর সৌদিতে ছিল। তিন মাস হলো দেশে ফিরেছে। তিন মাসে যতবার হানিফ এই বাড়িতে পা রেখেছে ততবারই পদ্মজা অজুহাত দিয়ে দূরে দূরে থেকেছে। হেমলতার বিচক্ষণ, সন্দেহবাতিক মস্তিষ্ক মুহূর্তে ভেবে নিল অনেক কিছু। আজই এই লুকোচুরির ফয়সালা করবেন তিনি। হানিফ পদ্মজাকে দেখার জন্য অনেক ছলচাতুরী করেও সুযোগ পেল না। বিদ্যুৎ আসার ঘণ্টাখানেক পর হানিফ চলে যায়। পূর্ণা, প্রেমা ঘরে ঢুকতেই পদ্মজা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে বলে, ‘কতবার না করেছি? লোকটার পাশে বেশিক্ষণ না থাকতে? তোরা কেনো শুনিস না আমার কথা?’
পূর্ণা, প্রেমা বিস্ময়ে হতবিহ্বল। পদ্মজা কখনো কিছু নিয়ে এভাবে নিষেধ করে না। তাহলে এখন কেন এমন করছে? হেমলতা রুমে ঢুকতেই পদ্মজা চুপসে গেল।
‘পদ্ম আমার ঘরে আয়।’
মায়ের এমন কাঠকাঠ আদেশ শুনে পদ্মজার কলিজা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়। পূর্ণা-প্রেমা নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করে। পদ্মজা ধুকধুকানি হৃদস্পন্দর নিয়ে হেমলতার ঘরের দিকে গেল।
হেমলতা মেয়ের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজা পায়ের আঙুল খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে! সুন্দরীরা ভীতু আর বোকা হয় তার দৃষ্টান্ত প্ৰমাণ পদ্মজা। তাকে ছাড়া পদ্মজা কীভাবে চলবে?
পদ্মজার সঙ্গে উঁচুকণ্ঠে কথা বলতে হেমলতার খুব মায়া হয়। কিন্তু আজ বলতেই হবে। আবেগ লুকিয়ে তিনি বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কী লুকোচ্ছিস আমার থেকে? হানিফ কী করেছে?’
পদ্মজা ফোঁপাতে থাকে। হেমলতা সেকেন্ড কয়েক সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। কণ্ঠ নরম করে বললেন, ‘হানিফ ধড়িবাজ লোক! সৎ ভাই বলে বলছি না। আমি জানি সে কতটা খারাপ। তার ব্যাপারে যেকোনো কথা আমি বিশ্বাস করব। তুই আমাকে বল কী লুকোচ্ছিস? কী করেছে হানিফ?’
মায়ের আদুরে কণ্ঠ শুনে পদ্মজা বাঁধ ভাঙা নদীর মতো হু হু করে কেঁদে উঠল। লুটিয়ে পড়ল মায়ের পায়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………