টিনের চালে ঝুম ঝুম শব্দ। বৃষ্টির এই ছন্দ অন্যবেলা বেশ লাগলেও এই মুহূর্তে ভয়ংকর ঠেকছে পদ্মজার কাছে। একেকটা বজ্রপাত আরো বেশি ভয়ানক করে তুলেছে পরিবেশ। সে কাঁচুমাচু হয়ে ফোঁপাচ্ছে।
বৃষ্টির শব্দ একটু কমলে কিছু কথা ভেসে আসে বাতাসে, ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? আমাকে ভয় পাবেন না। বিপদে পড়ে এই বাড়িতে উঠেছি। বিশ্বাস করুন।’
পদ্মজা কান্না থামিয়ে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল। দরজার ওপাশ থেকে আমির নামের মানুষটি বলছে, ‘দরজা খুলুন। বিশ্বাস করুন আমাকে। আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসেনি। ভয় পাবেন না।’
পদ্মজা একটু নড়েচড়ে বসল। আমির আবার বলল, ‘শুনছেন?’
ঢোক গিলে কথা বলার চেষ্টা করল পদ্মজা। কী অদ্ভুত, কথা আসছে না! খ্যাঁক করে গলা পরিষ্কার করতে চাইল সে। বলল, ‘আ…আমি দরজা খুলব না।’
ক্ষণকাল কোনো উত্তর এলো না, শুধু বৃষ্টির ধ্বনি শোনা গেল। একসময় পুরুষালি কণ্ঠটি বলল, ‘আচ্ছা, খুলতে হবে না। দয়া করে আপনি শুধু ভয় পাবেন না।’
‘আপনি চলে যান।’
বৃষ্টিটুকু থামতে দিন। হঠাৎ বৃষ্টির জন্যই তো আপনার বাড়িতে ওঠা। আমার বৃষ্টিতে সমস্যা হয়।’
আমিরের মুখে স্পষ্ট শুদ্ধ ভাষা শুনে পদ্মজা অনুমান করে নিলো, লোকটি শিক্ষিত। কথাবার্তা শুনে ভালো মানুষ মনে হচ্ছে, তবুও সাবধানের মার নেই। সে দরজা খুলল না, বিছানায় গিয়ে বসল; আগের থেকে ভয় কিছুটা কমেছে।
আমিরের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘শুনছেন?’
পদ্মজা জবাব দিল, ‘বলুন।’
‘আপনার নাম কী? ডাকনাম বলুন।’
‘পদ্মজা।’
‘সুন্দর নাম। আমার নাম জিজ্ঞাসা করবেন না?’
‘জানি।’
আমির অবাক হওয়ার ভান ধরে প্রশ্ন করল, ‘কীভাবে? আমাকে চিনেন?’
‘না, কিছুক্ষণ আগেই নাম বললেন।’
‘তখন তো ভয়ে কাঁপছিলেন, নামও শুনেছেন!
আমিরের কণ্ঠে রসিকতা। পদ্মজা মৃদু হাসল, কেন হাসল জানে না। আমির পুনরায় বলল, ‘শুনছেন?’
‘শুনছি।’
‘আপনি কি এরকমই ভীতু?’
‘সাহসিকতা প্রমাণ করানোর জন্য এখন বের হতে বলবেন, তাই তো?’
ওপাশ থেকে গগন কাঁপানো হাসির শব্দ ভেসে আসে। আমির হাসতে হাসতে বলল, ‘বেশ কথা জানেন তো।’
চলমান প্রসঙ্গ এড়িয়ে পদ্মজা বলল, বৃষ্টি কমলেই কিন্তু চলে যাবেন!’
‘তাড়াতে হবে না। বৃষ্টি কমলে নিজে থেকেই চলে যাব।’
কষ্ট নিবেন না। খালি বাড়ি তো, তাই বলছি।’
‘বাকিরা কোথায়? এটা মোর্শেদ কাকার বাড়ি না?’
‘জি।’
‘উনার ধানের মিল তো এখন আমার আব্বার দখলে। ছুটিয়ে নিবেন কবে?’
পদ্মজা অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল। বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘আপনি মাতব্বর কাকার ছেলে?’
‘অবাক হলেন মনে হচ্ছে?’
‘মাতব্বর কাকার ছেলের নাম তো বাবু!’
আমির হেসে বলল, ‘আমার ডাকনাম বাবু। এই নামে আম্মা আর আব্বা ডাকে। ভালো নাম আমির।’
পদ্মজা আর কথা দীর্ঘ করল না। বজ্রপাত থেমেছে, বৃষ্টি রয়ে গেছে। আমির জিজ্ঞাসা করল, ‘বাকিরা কোথায়?’
‘আম্মা-আব্বা ঢাকা। আজ ফেরার কথা ছিল। আর আমার দুই বোন আর ভাই নানাবাড়ি। বোধহয় বৃষ্টির জন্য আসতে পারছে না।’
‘এখনো আমাকে ভয় পাচ্ছেন?’
‘একটু, একটু।’
‘এটা ভালো। অচেনা মানুষকে একেবারেই বিশ্বাস করতে নেই।
—————
বাসন্তী ভ্যান থেকে নেমে সামনে এগোলেন। মোর্শেদের বাড়িটা তিনি চেনেন না। তাই কোনদিকে যেতে হবে বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিকে আকাশের অবস্থা ভালো না। রাস্তাঘাটেও মানুষ নেই। ঝড়ো হাওয়া বইছে। আরো কিছুটা পথ হাঁটার পর আচমকা ঝড় শুরু হলো। তিনি দৌড়ে একটা বাড়িতে উঠে পড়েন। রমিজ আলি বারান্দায় বসে হুঁকা টানছিল। সিল্কের শাড়ি পরনে, পেট উন্মুক্ত, লম্বা চুলের বেণুনীতে ধবধবে সাদা বাসন্তীকে দেখে সে অবাক হয়ে এগিয়ে এলো। বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘কেডা আপনে? কারে চান?’
বাসন্তী কেঁপে উঠলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে রমিজকে দেখে লম্বা করে হেসে বললেন, ‘হুট কইরা মেঘখান আইয়া পড়ল তো।’
‘তো আপনে কার বাড়িত যাইতেন?’
‘মোর্ছেদের বাড়ি।’
রমিজ আলি বিরক্তি নিয়ে সরে গেল। ঘরের ভেতর থেকে চেয়ার এনে দিয়ে বলল, ‘মোর্শেইদদার কী লাগেন আপনে?’
বাসন্তী চিন্তায় পড়ে যান। গ্রামের মানুষ তো জানে না তার আর মোর্শেদের সম্পর্ক কী! এখন জানানোটা কতটা যুক্তিসংগত হবে? সেকেন্ড কয়েক ভাবার পর যুক্তি মিলল। গ্রামবাসীকে বলা উচিত। নয়তো নিজের অধিকার তিনি কখনো পাবেন না। একমাত্র গ্রামবাসীরাই পারবে তার জায়গাটা শক্ত করে দিতে। বাসন্তী রমিজ আলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তার বউ লাগি। পরথম বউ। তার লগে আমার বিছ বছরের ছম্পর্ক।’
রমিজ আলির চক্ষুদ্বয় যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। মোর্শেদের বউ! বারকয়েক চোখ পিটপিট করল সে, ‘কী বললেন? কার বউ?’
‘মোর্ছেদ, মোর্ছেদের বউ।’
মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাওয়ার মতো আনন্দ হতে থাকে রমিজের। সে প্রবল উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘হের পরের বউয়ে জানে?’
‘না।’
‘থাহেন কই আপনে?’
‘রাধাপুর।’
‘লুকাইয়া রাখছিল বিয়া কইরা?’
‘হ। এখন মোৰ্ছেদ আমারে তালাক দিতে চায়। আমার সঙ্গে ছংছার করতে চায় না। তাই আমি আমার অধিকার নেয়ার জন্য আইছি। আমি তার বাড়িতে থাকবার চাই। আপনেরা আমারে ছাহায্য করেন। গ্রামবাছী ছাড়া মোর্ছেদ আমারে জায়গা দিব না।’
রমিজ আলি প্রবল বৃষ্টি, আর বজ্রপাতকে হটিয়ে বাহাদুরের মতো বলে উঠল, ‘আপনের জায়গা করে দেওন আমরার কাম। আপনি চিন্তা কইরেন না। মেঘডা কমতে দেন। এরপর খালি দেহেন কী হয়!’
বাসন্তীর চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। অবশেষে একটা ভরসা পাওয়া গেল। রমিজ আলির প্রতিশোধের নেশা পেয়েছে। মোর্শেদ তাকে কত কটু কথা বলেছে, অবজ্ঞা করেছে, অপমান করেছে। এইবার তার পালা। প্রতিটি অপমান ফিরিয়ে দেয়ার শপথ করেছে সে অনেক আগেই। বাসন্তীকে ভরসা দিয়ে সে বলল, ‘আপনি বইয়া থাহেন। আমি আরো কয়জনরে লইয়া আইতাছি।’
রমিজ আলি খুশিতে গদগদ হয়ে বেরিয়ে গেল লোকবল আনতে। ছইদ, রজব, মালেক, কামরুলকে নিয়ে ফিরে এলো। সবার হাতে হাতে ছাতা। কামরুল আটপাড়া এলাকার মেম্বার। গ্রামে কোনো অনাচার হলে তা দেখার দায়িত্ব তার। তাই তিনি মাথার উপর বজ্রপাত, ঝড় নিয়েই ছুটে এসেছেন।
—————
পদ্মজা উসখুস করছে। টয়লেটে যাওয়া প্রয়োজন। প্রস্রাবের বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়। সাহসও পাচ্ছে না বের হওয়ার। ঘরে পায়চারি করল কিছুক্ষণ। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলো। এরপর কাঁচি কোমরে গুঁজে আয়তুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিয়েই দরজা খুলল। আচমকা দরজা খোলার আওয়াজ শুনে আমির চমকে তাকাল। আকাশ থেকে কালো মেঘের ভাব কেটে গেছে অনেকটা। সন্ধ্যার আজান পড়ছে। সালোয়ার, কামিজ পরা পদ্মজাকে দেখে মুহূর্তে হৃদস্পন্দন থমকে গেল তার। পদ্মজা ওড়না টেনে নিলো নাক অবধি। কাঁপা পায়ে আমিরের পাশ কেটে গেল। আমিরের চোখ স্থির। নিশ্বাস এলোমেলো। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। পদ্মজা যখন ফিরছিল ঘরে, আমির ডাকল, ‘পদ্মজা?’
পদ্মজা দাঁড়াল। মানুষটা খারাপ হলে এতক্ষণে আক্রমণ করত। যেহেতু করেনি, মানুষটার উদ্দেশ্য খারাপ না। তাই দাঁড়াল, তবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না।
আমিরের গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। শার্ট ভিজে যাওয়াতে বারান্দার দড়িতে রেখেছে, যাতে বাতাসে শুকিয়ে যায়। যেন রূপকথার জগতে হারিয়ে গেছে এমনভাবে আমির বলল, ‘অলন্দপুরে এমন রূপবতী আছে—জানা ছিল না।’
পদ্মজা লজ্জা পাওয়ার পাশাপাশি বিব্রতবোধ করল। বৃষ্টি প্রায় কমে এসেছে। তাই সে বলল, ‘আপনি এবার আসুন। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।’
‘যেতে তো ইচ্ছে করছে না।’
লোকটা বলে কী! এতক্ষণ বলল বৃষ্টি কমলেই চলে যাবে। এখন বলছে, যাবে না। পদ্মজা ঘুরে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে আকুতি ফুটিয়ে বলল, ‘দয়া করে চলে যান।’
আমির কিঞ্চিৎ হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। না চাইতেও আমির পদ্মজার নজরে পড়ে। শ্যামবর্ণের একজন পুরুষ, থুতনির মাঝে কাটা দাগ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো পদ্মজা। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘বৃষ্টি কমে গেছে। আম্মা-আব্বা চলে আসবে। চলে যান।’
আমির অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। তার নিস্তব্ধতা পদ্মজাকে বিরক্ত করে তুলল। এত ঘাড়ত্যাড়া, দুই কথার মানুষ কীভাবে হয়? উঠানে পায়ের শব্দ! কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ। বারান্দা থেকে দুজন তাকাল। গ্রামের এতজনকে দেখে পদ্মজার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল সে। রমিজ আলি চেঁচিয়ে ডাকল, ‘কইরে মোর্শেইদদা? আকাম কইরা এখন লুকায়া আছস ক্যান? বাইর হ। তোর আকাম ধইরা লইয়া আইছি।’
আমির বারান্দা পেরিয়ে বেরিয়ে আসে।
গম্ভীরমুখে বলল, ‘উনারা বাড়িতে নেই।’
উৎসুক জনতা আমিরকে দেখে অবাক হয়। কামরুল বললেন, ‘আরে আমির। শহর থেকে আইলা কবে?’
‘এই তো চার দিন হলো। আছেন কেমন?’
‘এই তো আছি। তা এইহানে কী করো?’
আমির উত্তর দেয়ার আগে রমিজ আলি প্রশ্ন করলেন, ‘বাড়িত কেউ নাই?’
আমির বেশ সহজ-সরল গলায় বলল, ‘আছে। পদ্মজা আছে।’
উপস্থিতি পাঁচ-ছয়জন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। সবার দৃষ্টি দেখে আমির বুঝল, সে কত বড়ো ভুল করে ফেলেছে। তাহলে পদ্মজা এটারই ভয় পাচ্ছিল? আমির দড়ি থেকে শার্ট নিয়ে দ্রুত পরল। এরপর কৈফিয়ত দেয়ার স্বরে বলল, ‘আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। বাড়ি ফিরছিলাম। বৃষ্টি নামে তাই এই বাড়িতে উঠে পড়ি। বাড়িতে কেউ নাই জানলে…’
আমির কথা শেষ করতে পারল না। রমিজ আলি চেঁচিয়ে আশপাশে বাড়ির সব মানুষদের ডাকা শুরু করল। মাতব্বর তাকে কম অপদস্ত করেনি সমাজ থেকে কোণঠাসা করেছে। মোর্শেদ পথেঘাটে কটু কথা শুনিয়েছে। আজ সেই যন্ত্রণা কমানোর দিন। আমির ভড়কে গেল।
কামরুল আঙুল শাসিয়ে কঠিন স্বরে বললেন, ‘তোমার কাছে এইডা আশা করি নাই। তোমার আব্বারে ডাকাইতাছি। উনি যা করার করবেন।’
আমির বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আরে আজব! কী শুরু করেছেন আপনারা?’
ছইদ আমিরের কাছাকাছি বয়সের। ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে তাদের মধ্যে। ছইদ হুংকার ছেড়ে বলল, ‘চুপ থাক তুই! তোর বাপে মাতব্বর বইলা তোরে ডরাই আমরা? আকাম করবি আর ছাইড়া দিমু?’
রাগে-অপমানে আমিরের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করে। রেগে গেলে চোখের রং পালটে যায় তার। কালো মুখশ্রীর সঙ্গে লাল চোখ ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ছইদ ভেতরে ভেতরে ভয় পেল। আমিরের হাতে কম মার সে খায়নি। তবে আজ সুযোগ পেয়েছে। পুরো গ্রামবাসী এক দলে। সে কিছুতেই ছাড়বে না। ঢোক গিলে বলল, ‘চোখ উলডাইয়া লাভ নাই। কুকামের উসুল না তুলে যাইতাছি না।’
আমির রাগে শক্ত হাতে থাপ্পড় বসাল ছইদের কানে। মুহূর্তে ছইদের মাথা ভনভন করে উঠে। ততক্ষণে রমিজের উসকানিতে মানুষ জমে গেছে। সবার হাতে হাতে টর্চ, হারিকেন। রাতের আঁধার নেমে এসেছে। আমির আবারও ছইদকে মারতে গেলে কয়জন এসে তাকে জাপটে ধরল। কামরুল একজন মহিলাকে আদেশের স্বরে বললেন, ‘শিউলির আম্মা, কয়জনরে লইয়া মাইয়াডারে বার কইরা আনো। লুকাইছে নটি। গ্রামডা নটিদের ভিড়ে ধ্বংস হইয়া যাইতাছে।’
পদ্মজা মাটিতে নতজানু হয়ে বসে কাঁপছে, তীব্র কাঁপুনি পা থেকে মাথার চুল অবধি। বাইরের প্রতিটি কথা তার কানে এসেছে। চারপাশ যেন ভনভন করছে।
শিউলির আম্মা পদ্মজার ঘরে আসে। দরজা খোলা ছিল। টর্চ ধরে দেখল পদ্মজা মাটিতে বসে কাঁপছে। পদ্মজাকে খুব পছন্দ করে সে। তাই পদ্মজার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘কেন এমন কাম করছস?’
পদ্মজা ঝাপসা চোখ মেলে তাকাল। শিউলির আম্মা পাশের বাড়ির। পদ্মজার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। পদ্মজা শিউলির মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বলল, ‘ভাবি আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি। সবাই ভুল বুঝছে।’
রীনা নামে একজন মহিলা পদ্মজাকে জোর করে টেনে দাঁড় করাল। হেমলতার অনেক বাহাদুরি এই মেয়ে নিয়ে, অনেক অহংকার। সেই অহংকার আজ ভালো করে ভাঙবে। সে মনে মনে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছে।
ঘৃণা ভরা কণ্ঠে পদ্মজাকে বলল, ‘ধরা পড়লে সবাই এমনডাই কয়। আয় তুই।’
পদ্মজা আকুতি করে বলল, ‘বিশ্বাস করুন আমি খারাপ কিছু করিনি আম্মা এসব শুনলে মরে যাবে। আপনারা এমন করবেন না।’
কারো কানে পৌঁছাল না পদ্মজার আর্তনাদ, আকুতি। সবাই গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মনের, সুন্দর পরিবারের সদস্যগুলোকে ধ্বংস করায় মেতে উঠল। পদ্মজাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে বাহিরে। কখনো ঘোমটা ছাড়া কোনো পুরুষের সামনে না যাওয়া মেয়েটার বুকের ওড়না পড়ে রইল ঘরে। তিন-চার জন মহিলা শক্ত করে পদ্মজার বাহু চেপে ধরে রাখে। সবাইকে উপেক্ষা করে পদ্মজা ঘৃণাভরা চোখে তাকাল আমিরের দিকে। আমির চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর, কিছুতেই পারছে না।
পূর্ণা বাড়িতে ঢুকে দেখে কোলাহল। সে ভয় পেয়ে গেল। জ্বরের তোড়ে কাঁপছে পূর্ণা। একটু এগিয়ে দেখল, পদ্মজার বিধ্বস্ত অবস্থা। মুহূর্তে তার জ্বর উবে গেল। দৌড়ে এসে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার আপাকে এভাবে ধরেছেন কেন? আপা…এই আপা? কাঁদছ কেন?’
পদ্মজা কেঁদে বলল, ‘পূর্ণা, আম্মা মরে যাবে এসব দেখলে। আমি কিছু করিনি পূর্ণা।’
পূর্ণা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু অনুভব করছে তার বুক পুড়ছে। পুরো শরীর ব্যথায় বিষিয়ে যাচ্ছে। সে রীনাকে বলল, ‘খালা আপনি আমার বোনকে এভাবে ধরেছেন কেন? ছাড়েন।’ ধমকে উঠল পূৰ্ণা।
রীনা কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘তোর বইনের গতরে রস বাইড়া গেছিল। এজন্য খালি বাড়িত ব্যাঠা ছেড়া ডাইকা আইনা রস কমাইছে।’
নোংরা কথাটি শুনে পূর্ণার গা রি রি করে উঠল! তেজ নিয়ে বলল,
‘খারাপ কথা বলবেন না। আমার আপা এমন না।
পাশ থেকে একজন মহিলা পূর্ণার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোর মা যেমন হের মাইডাও এমন অইছে। নিজেও এমন কিচ্ছা করল। মাইয়াও করল।’
পদ্মজা চমকে তাকাল।
মহিলা বলে যাচ্ছে, ‘বুঝলা তোমরা সবাই…মায় এক বেশ্যা, মাইয়ারে বানাইছে আরেক বেশ্যা।’
পদ্মজা আচমকা রেগে গেল খুব। আক্রোশে তার শরীর কাঁপতে থাকল। রীনা সহ দুজন মহিলাকে ঠেলে সরিয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার মা নিয়ে কিছু বললে আমি খুন করব। মেরে ফেলব একদম। জিভ ছিঁড়ে ফেলব।’
পদ্মজার এহেন রূপে সবাই থতমত খেয়ে যায়। তার লম্বা চুলগুলো খোঁপা থেকে মুক্ত হয়ে পিঠময় ছড়িয়ে পড়েছে। চোখের মণি অন্যরকম হওয়াতে মনে হচ্ছে, কোনো প্রেতাত্মা রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। গ্রামের কিছু মহিলা আবার বিশ্বাস করে, পদ্মজা কোনো পরির মেয়ে। তাই এত সুন্দর। এই মুহূর্তে তারা ভাবছে, পদ্মজার ভেতর কেউ ঢুকেছে। তাই সামনে এগোল না। রীনা একাই এগিয়ে এলো। পদ্মজার চুলের মুঠি ধরে বিশি গালিগালাজ করতে শুরু করল। কামরুলকে বলল, ‘কামরুল ভাই, এই বান্দিরে বাঁন্ধা লাগব।’
পূর্ণা-প্রেমা পদ্মজাকে ছাড়াতে গেলে ছইদসহ আরো তিন চারজন এগিয়ে আসে। অন্ধকারে ভিড়ের মাঝে বাজেভাবে নিগৃহীত হলো পদ্মজা-পূর্ণা- প্রেমা। কয়টা কালো হাত নিজেদের তৃপ্তি মিটিয়ে নিলো খুব সহজে। তিন বোনের কান্না, তাদের আর্তনাদ কারো হৃদয় ছুঁতে পারল না।
হেমলতার অনুপস্থিতিতে তার আদরের তিন কন্যার জীবন্ত কবর হচ্ছিল, বাধা দেয়ার কেউ ছিল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………