মেঘবন - পর্ব ২৬ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          চলমান শর্টের চমৎকার মেলবন্ধনে নিমিষেই বাগড়া দিয়ে হাঁচি দিয়ে উঠলো রিদিমা। থেমে থেমে পরপর তিন-চারটে হাঁচি! তালহা বিরক্ত হলো। রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে কুৎসিত এক গালি দিতে নিলেই সহ-পরিচালক অর্ক গোপনে হাত চেপে ধরলো। চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলো। অথচ আশ্বস্ত হওয়ার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই তালহার। টানা চার মাস ধরে কোন নাটকের শুটিং চলে? তাও আবার মাঝারি আকারের ছোট গল্পকে ঘিরে? যতরকমের বাঁধা-বিপত্তি যেন সব এই এক কাজকে ঘিরেই শুরু হয়েছে। উফ, জ্বালা! ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলতেই পাশ হতে ভরাট কণ্ঠের টিটকারি সূচক হাসির শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। হাসিটা তামজিদের। সে মূলত ভাইয়ের শুটিং দেখতে এসেছে। এমনিই। তার দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। বোরিং, আলস্য ভরা সময়। মুখের ভেতর জুসের স্ট্র ঢুকিয়ে তামজিদ তাচ্ছিল্য করে শুধালো, ‘কি নায়িকা নিয়েছিস! এক ঘণ্টা ধরে একটা শর্টই দিতে পারে না।’

তালহা আড়নয়নে তাকায়। তামজিদ থেকে জ্যুসের গ্লাস ছিনিয়ে ঢোগ ঢোগ করে সবটুকু খেয়ে নেয়। বিরক্ত গলায় চাপা রাগ নিয়ে বলে, ‘তোকে দেখে এমন করতাছে।’

তামজিদ ভারি অবাক হলো যেন। প্রশ্ন করলো, ‘আমাকে দেখে কেন? আমাকে কি আজকে বেশি সুন্দর লাগতেছে?’

‘না, কালা কাউয়ার মতো লাগে।’
বলতে বলতে পাশে দাঁড়ানো কর্মী তানিয়ার দিকে একপলক তাকালো সে। গম্ভীর গলায় বললো, ‘রিদিমার মেকআপ নষ্ট হয়ে গেছে। ঠিক করো। আর বলে দাও, এবার শর্ট ভালো না হলে আর করার দরকার নেই। পেকআপ সবার।’

অর্ক মানলো না সেকথা। টাকার ওপর টাকা যাচ্ছে এই এক নাটকের পিছনে। এই ঈদে নাটক-টা যদি হিট না হয় ভয়াবহ লসের মুখে পড়তে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখে চন্দন হাসি ফুটিয়ে বললো, ‘আহাহ্! রাগ করবেন না তালহা। একটা শর্টই তো! আমাদের হাতে এখনো সময় আছে। এই তানিয়া! রিদিমাকে বলো একটু রেস্ট নিয়ে তারপর যেন শর্ট-টা ভালো ভাবে দেয়।’ 

তালহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘এবারই শেষ, আমি আর রিদিমাকে কোনো নাটকে নিচ্ছি না।’

অর্ক কিটকিটিয়ে হেসে বললো, ‘আপনাকে পছন্দ করে। তারওপর আপনার ভাই এসেছে আজকে। জমজ। তারমানে দুটো পছন্দের মানুষ একসাথে। দেখছেন না চোখই সরাতে পারছে না আপনাদের দু'জন থেকে? তাইতো শর্টে গোলমাল করছে!’

তামজিদ পাশ হতে তালহার পেটে কনুই দিয়ে গুঁতো মার লো। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘তোকে নায়িকাও পছন্দ করে! বললি না যে?’

‘বলে কি হবে?’

‘প্রেম কর। সুন্দর দেখতে।’

তালহা বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকালো, ‘এত সুন্দর লাগলে তুই কর।’

এ কথার পিঠে উত্তর দিতে খানিকটা সময় নিলো তামজিদ। বাঁকা হাসি ঠোঁটে ফুঁটিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। আকাশে ক্যাটক্যাটে রোদ উঠেছে। সূর্যের দিকে তাকানো দায়। চোখ জ্বলে যায়। তামজিদ তবুও আধো আধো নয়নে চেয়ে রইলো। দৃষ্টি ঝাপসা হলো। রাজ্যের আক্ষেপ নিয়ে বললো, ‘একটাকে পছন্দ করি। আমার হবে না। আরেকটার সঙ্গে প্রেম করি। ওকে আমার চাই না। এখন আবার নতুন করে প্রেম করা সম্ভব না। আমি অনেক দূর্বল হয়ে গেছিরে তালহা! সুন্দরীদের হৃদয় ভাঙ্গতে মনে জোর পাই না।’

ফোনে কল এসেছে। শুটিং স্পটের হৈ-হুল্লোড়, ব্যস্ত হাঁকডাকে খুব সামান্য করে কলের আওয়াজ কানে আসছে। প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করলো তামজিদ। স্ক্রীনে তুবার নাম। কল ধরবে না ভেবেও কি মনে করে রিসিভ করলো সে। ওপাশ থেকে ন্যাকা কান্নার সুর ভাসলো, ‘তুমি অনেক খারাপ হয়ে যাচ্ছো তালহা! পাষাণ হয়ে গেছ! এতকিছু হয়ে গেল… আমায় একটা বার কল দিতে পারলে না?’

তামজিদ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তার থেকে দশ হাত দূরে, একদম সামনাসামনি চেয়ারে নায়িকা রিদিমা বসে আছে। পাশে নায়ক দীপ্ত। ওরা দু'জন কথা বলার মাঝে রিদিমা বারবার তামজিদের দিকে তাকাচ্ছে। লজ্জা পাচ্ছে। নজর লুকোচ্ছে। কিন্তু আড়নয়ন দেখা মোটেও থামাচ্ছে না। এবার একদম ইচ্ছে করেই রিদিমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ভ্রু নাঁচালো তামজিদ। ফোনে বললো, ‘স্যরি সোনা, ব্যস্ত ছিলাম।’

তালহা কান খাড়া করে ফেললো। অলস বিকেলের ক্লান্ত রোদ তামজিদকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। ওপাশ থেকে তুবা কান্নার সুর বাড়িয়ে বললো, ‘মিথ্যে কথা! তুমি আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসো না। কেন বাসো না? শুনো না! যা করার আমার চাচা করেছে। আব্বু কিছু করেনি বিশ্বাস করো! মেইন কালপ্রিট হচ্ছে বড় চাচ্চু। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে।’

তালহা-তামজিদ একে অপরের চোখাচোখি হলো। ফোনের সাউন্ড কমিয়ে তামজিদ সর্তক গলায় জানতে চাইলো, ‘আমি তোমার কথা কেন বিশ্বাস করবো? কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে? ভুয়া কথা বলো নাতো!’

তুবা জোর গলায় বললো, ‘সত্যি আছে! আব্বুর গোপন লকারে সব আছে। ওই লকারের ব্যাপারে আমি আর আব্বু ছাড়া কেও জানে না। বড় চাচ্চু সব ডকুমেন্টস আব্বুর কাছে রাখে। তুমি চাইলে আমি তোমাকে সব দেখাতেও পারবো। দেখবে তুমি?’

তামজিদ খেয়াল করলো, উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে। ঠোঁটে ঠাঁই পাওয়া মৃদু হাসি প্রভাতের স্নিগ্ধ কিরণের মতোন। কল কেটে নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগলো তার। তালহা শক্ত হয়ে বসে আছে। শর্ট শুরু হচ্ছে। কিন্তু তার মন সেখানে নেই। তামজিদের খুশিমতোন চেহারার দিকে চেয়ে খুব আস্তে জানতে চাইলো, ‘সব তবে শেষ হচ্ছে?’

উত্তরে মাথা ওপর-নিচ নাড়ালো তামজিদ। তালহা জিজ্ঞেস করলো, ‘তুবার কি করবি? মেয়েটা তোর জন্য পাগল।’

‘ছেড়ে দেব। কাজ শেষ আমার। ওই মেয়ের সঙ্গে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে। জোর করে কাউকে ভালোবাসা যায়? ভুলে থাকা যায়?’

তামজিদের কণ্ঠ বড্ড নির্লিপ্ত শোনালো। যেন তুবার জন্য অল্প একটু খারাপ লাগা, ভালো লাগা— কিচ্ছু নেই তার। শূন্য, ফোঁতা অনুভূতি। আর মেরিন… শেষের লাইনটা বুঝি মেরিনের জন্য?

—————

কালবৈশাখীর ঝড় হয়েছিল। হলুদের অনুষ্ঠান মাঝপথেই নির্ঝঞ্ঝাট শেষ হয়েছিল বলে রক্ষে! নয়তো এই বৃষ্টির মাঝে নব বধূ প্রায় মেরিনকে হলুদ বুঝি গালে ছোঁয়ানো যেত? বড় চাচার গান-বাজনা পছন্দ নয়। এমনিতেও তিনি গানের আয়োজন করতে দিতেন না। সে হিসেবে ঝড়টা এসে ভালোই হয়েছে। সকাল থেকে রোদ্দুর মাখো মাখো তেজে গা গরম হয়েছিল সবার। উত্তপ্ত মাথায় রক্ত টগবগ। এবার এই ঝড়ো হাওয়ায় পরিবেশ, মন, মস্তিষ্ক শান্ত হলেই হলো!
মেরিন সবে হলুদের পর্ব শেষ করে ঘরে ঢুকেছে। বাতি জ্বালিয়েছে। ওমনি! ঝোপ ঝোপ করে আকাশ থেকে বারিধারা নামতে শুরু করলো। মেরিন থম মেরে কিছুক্ষণ জানালার ওপাশের নিশীরাতের দিকে তাকিয়ে রইলো। একাধারে, একদৃষ্টে। তার মন খারাপ। এইযে বিয়ের কথা শুরু হলো, সে বড় চাচার বাড়ি এলো, বিয়ের কেনাকাটা হয়ে গেল, কাল দুপুরেই বিয়ে হয়ে যাবে— তারফান ওয়াহাজ কোথায়? এতটুকুও কি মেরিনের কথা মনে পড়ছে না ওই পাষাণের? একবার কি কল করা যায়নি? বিয়ের কেনাকাটার কথা বলা হলেও ওই লোক আসেনি। টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে কেবল। ফোনে ফোনে রজনী হায়দারের সঙ্গে কথা হয়েছে। হলুদের অনুষ্ঠানে একপলক তালহাকে দেখা গিয়েছিল। আর কেউ নেই, কিছুই না। কেন? হঠাৎ করে এত লুকোচুরি শুরু হয়েছে কেন? এ নিয়ে বড় চাচাও নাখোশ। মেরিন তাই উচ্চবাচ্য করেনি। তারফান ডাক্তার মানুষ। ব্যস্ত হতেই পারে। তাই বলে এত বেশি? মেরিনের মন খারাপ করে দেওয়ার মতোন বেশি?

আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে গিয়ে অন্যমনস্ক হলো মেরিন। ফোনের স্ক্রীন জ্বলছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপরই রাখা। গোটাগোটা অক্ষরে তারফানের নাম ভাসমান। মেরিন হুট করে অভিমানি হয়ে গেল। কল ধরলো না। মুখও ফিরিয়ে নিলো না। যতক্ষণ পর্যন্ত কল বাজলো, স্থির ফোনের স্ক্রীনে চেয়ে রইলো সে। একসময় কল কেটে গেল। পরপরই মেসেজ এলো, ‘হলুদ সাজে তোমায় কেমন দেখতে লাগছে, মেরিন? আমায় দেখাবে না? বেশি অভিমান করে ফেলেছো? বেশি রাগিয়ে দিয়েছি?’

তিনটে প্রশ্ন। এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর মনে মনে দিলেও ফোন ছুঁয়েও দেখলো না মেরিন। তারফান ফের মেসেজে লিখলো, ‘বারান্দায় এসো মেরিন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। একটু দেখেই চলে যাবো! সত্যি! আমার হলুদ রাঙ্গাবতী…’

মেরিন আঁতকে উঠলো! রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি মানে? লোকটা কি এখানে চলে এসেছে? সর্বনাশ! মেরিনের পাথর অভিমান নিমিষেই গলে পানি পানি হয়ে গেল। জোরে নিশ্বাস টেনে সতেজ বাতাসটুকু নিজের মাঝে নিয়ে জানালার বাহিরে উঁকি দিলো সে। ওইতো! ওইতো বেয়াদব লোকটা! ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে, মুষলধারে বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ঠায়, স্থির, নির্বিকার! মেরিন সেথায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। কিন্তু যাবে কিভাবে? বাড়ি ভর্তি যে মানুষ!
হলুদ শেষে যে যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। গুটিগুটি পায়ে, চুপিচুপি সদর দরজা পেরোতে নিলেই বড় চাচা দেখে ফেললেন। গম্ভীর গলায় তক্ষুণি ডাক দিলেন, ‘কোথায় যাচ্ছো মামণি?’

মেরিন থমকায়, ভড়কায়। পায়ের শক্তি অচল হয়ে গেছে। ভয়ে গলা শুষ্ক। মাথা নুইয়ে ঢোক গিলে বলে, ‘আমি, না-মানে… বাহিরে বৃষ্টি! বৃষ্টি দেখতে যাচ্ছি।’

বড় চাচা শান্ত নয়নে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। নির্মল দুটি চোখ। মৃদু হেসে শুধালেন, ‘তোমার বর এসেছে দেখা করতে?’

মেরিন জবাব দিতে পারলো না। লজ্জায় মাথা আরও নত হয়েছে। থুতনি ঠেকছে গলায়। বড় চাচা এবার হো হো করে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘ছাতা নিয়ে যেও মা, নয়তো ভিঁজে যাবে।’

—————

ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বৃষ্টির ফোঁটা দেখা যায়। গোনা যায়। এক, দুই, তিন… গুনতে গুনতে কখন যে পাঁচ'শত পেরোলো! গোনায় ভুল আছে। এতগুলো বৃষ্টির ফোঁটা একসাথে গোনা যায় না। গোনার সাদ্ধি নেই। তারওপর গুনতে গুনতেই মেরিনের লাইট জ্বলজ্বল আলোকিত বারান্দায় কত শত বার যে তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় তাকিয়েছে তারফান! মেয়েটা আসেনি৷ বড্ড অভিমানি কি-না! তারফানের বুক ভারি হয়ে আসে। আজকাল হস্পিটালের কাজ বেড়েছে। হায়দারের ব্যাপার দেখতে হচ্ছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মেরিনের কথা যে মনে পড়েনি, তা নয়। মনে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ছুঁটে আসার সাহস হয়নি। ইদানিং নতুন করে স্বপ্ন দেখছে তারফান। মেরিনকে নিয়ে। মেরিনকে ঘিরে। তাদের একটা সুন্দর, সুখী পরিবার। আদৌ এমন সুখী, সুন্দর পরিবার তাদের হবে? স্বপ্নের মতো প্রাণবন্ত, বুকে সুখ সুখ ব্যথা পাওয়া সংসার?

‘তারফান…’

গেইট পেরিয়ে ছুটে আসা রমণির দিকে তাকায় তারফান। বৃষ্টির জলে চোখ দুটো ইতোমধ্যে রক্তলাল হয়ে গেছে। ঘোলা দৃষ্টি। সূক্ষ্ণ জ্বলুনি ভাব। রমণির চেহারা অস্পষ্ট। ভালো ভাবে তাকানোর মাঝেই অনুভব করলো, শরীরে তার বৃষ্টি ছুঁতে পারছে না। সঙ্গে সঙ্গেই গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো একটা ঠান্ডা বাতাসে কেঁপে উঠলো তারফান। চোখের পাতা কাঁপলো। স্পষ্ট দেখলো, একটা বিশ বছর বয়সী মেয়ে শাড়ি পরে আছে। বাসন্তী রঙের। স্নিগ্ধ মুখে অল্পসল্প সাজ। দু'গালে, কপালে হলুদ লেগে আছে। এত আদুরে একটা অভিমানি চেহারা! মনহরিণী! কাঁপা হাত এগিয়ে মেরিনের কপাল থেকে হলুদ মুছে দিতে চাইলো তারফান। হচ্ছে না। ভাঙা, ভরাট গলায় আশ্চর্য হলো, ‘উঠছে না কেন?’

বলতে বলতে আরেকটু জোরে হাতের ঘর্ষণ করলো কপালে। জানতে চাইলো, ‘ব্যথা পাচ্ছো?’

‘পাচ্ছি না।’

তারফান আশেপাশে থাকলে মুহূর্তটা জাদুকরী মনে হয় মেরিনের কাছে। সব কাল্পনিক লাগে, ভালো লাগে, স্বপ্ন মনে হয়। সেখানে অভিমান ঠায় পায় না। তবুও জোর করে অভিমান ধরে রাখলো মেরিন। আস্তে করে শুধালো, ‘এখন সময় হয়েছে আপনার আমার কাছে আসার? আপনার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল আপনি আমায় চেনেনই না।’

কপালের হলুদটুকু মুছে গেছে। বিজয়ী হাসলো তারফান। বললো, ‘চিনি তো! তোমার নাম মেরিন খন্দকার।’

‘আপনি একটা যা-তা!’

তারফানের হাসি ঠোঁটে গাঢ় করে লেপ্টে গেছে। প্রগাঢ় নয়নে সে শুধু মেরিনকেই দেখে যাচ্ছে। ঘোর লেগে যাচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধ হচ্ছে। আচ্ছা, তারফানের কি জ্বর আসছে? 
মেরিনের গাল ছুঁতে গিয়ে আরেকদফা হাত কাঁপলো তারফানের। বুড়ো আঙুল হলুদ রাঙা গালের সঙ্গে একদম মিশিয়ে জানিয়ে দিলো, ‘মেরিন… তুমি আমার।’

তারফানের পা দুলছে। ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থাকা দায়। চোখ পিটপিট। মুখ এমন লাল হয়ে আছে কেন? দ্রুত তার কপালে হাত ছোঁয়ালো মেরিন। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আঁতকে উঠে বললো, ‘আল্লাহ! আপনার তো অনেক জ্বর! বৃষ্টি মাঝে দাঁড়াতে কে বলেছে আপনাকে? পাগল আপনি?’

জবাবে তারফান হাসলো মাত্র। দাঁত বের করে হাসিটা প্রগাঢ় করে মিহি মিহি চোখে তাকালো। বললো, ‘তোমাকে এখনই টুকটুকে বউ লাগছে মেরিন। ফুল বউ। কালকে কেমন লাগবে? তুমি আগে আগে আমাকে ছবি পাঠাবে।’

‘পাঠাবো। কিন্তু এখন আপনি বাসায় যাবেন। ঔষধ খেয়ে ঘুমাবেন। সকালে ফোন করবেন আমাকে। বুঝেছেন?’

তারফান বুঝেছে। মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু এই অবস্থায় এই লোক বাড়ি যাবে কেমন করে? মেরিনের দুশ্চিন্তা বাড়লো, ‘বাসায় যাবেন কিভাবে? তালহা ভাইয়া বা তামজিদ ভাইয়াকে ফোন দিয়ে এখানে আসতে বলুন।’

‘ইখতিয়ার আছে গলির মুখে। যেতে পারবো। তুমি এখনই যাওয়ার তাড়া দিও না তো! আমি তোমাকে দেখতে এসেছি।’

বুকের বা'পাশে ভীষণ ব্যথা তারফানের। এইযে, এই মাত্র মেরিনকে দেখে হলো। মেয়েটার বাহু টেনে নিজের বুকের মধ্যিখানে টেনে নিলো তারফান। আদুরে ভাবে মিশিয়ে নিলো। ছাতা হাত থেকে গড়িয়ে গেছে। খরখরে, অমসৃণ রাস্তায় হুটোপুটি খাচ্ছে। 
তারফানের সঙ্গে সঙ্গে ভিঁজলো মেরিনও। বুকের ধুকপুক আওয়াজ জোড়ালো হলো। তারফান লম্বা একটা নিশ্বাস টেনে আওড়ালো, ‘আমায় ভুল বুঝবে না মেরিন। আমি… ইচ্ছে করে করছি না।’

মেরিন হাঁসফাঁস করলো। এত জোরে ধরেছে কেন? প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘কি ইচ্ছে করে করছেন না? বিয়ে হওয়ার পর থেকে আপনারা সবাই এসব বলছেন কেন আমাকে? কি লুকোচ্ছেন?’

তারফান উত্তর দেয় না। মনে পরে, ঠিক এমন বৃষ্টিমুখোর ক্ষণে একবার মেরিনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তারফান। মেয়েটা তখন তাকে দু'চোক্ষে দেখতে পারতো না। অথচ এখন! মেরিনকে বুকে নিয়ে আছে সে। নির্দ্বিধায়।
মেরিন অস্পষ্ট গলায় বললো, ‘আমার থেকে কিছু লুকোবেন না তারফান। আমি মিথ্যা পছন্দ করি না। যা করবেন আমায় জানাবেন। আমি বুঝবো, বোঝার চেষ্টা করবো।’

তারফানের জ্বর বাড়ছে। বুকে ঠাই পাওয়া রমণিকে দৃঢ় ভাবে বুকের সঙ্গে বেঁধে রাখার সাধ জাগছে। কিন্তু… ফিরতে হবে। কাজ এখনো বাকি। মেরিনকে নিজের থেকে সরিয়ে নিলো তারফান। আরও কিছুক্ষণ, কিছু পলক মেরিনকে একাধারে দেখে কপালে গাঢ় একটা চুমু খেল। ঠোঁট কপালে ছুঁইয়ে রেখে আধো আধো গলায় আওড়ালো, ‘মেরিন, তুমি আমার না চাওয়া প্রাপ্তি। আমার কালো পৃথিবীর শেষ আলো।’
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp