জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস যখন শ্রীমঙ্গল স্টেশনে এসে থামল তখন ছায়া ছায়া বিকেল। পশ্চিমাকাশ জুড়ে ভ্রমরের মতোন কালো মেঘ। শীতল হাওয়া বইছে। যেকোনো সময় নুপুর পায়ে ঝমঝম করে নেমে আসবে বৃষ্টিকন্যারা। মৌনি কাঁধে বিশাল ব্যাগপ্যাক আর হাতে একটি লাগেজ নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এলো। চোখের রোদচশমাটা মাথার উপর তুলে দিয়ে নির্লিপ্ত মুখে একবার স্টেশনটা দেখল। ছোটোখাটো স্টেশন। প্ল্যাটফর্ম থেকে ঢাল বেয়ে নিচে নামলেই সারি সারি স্টেশনারি দোকান। তার সামনে বেশ কিছু সিএনজি আর জিপ গাড়ি নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। মৌনির গন্তব্য রাধানগর। সেখানকার একটি বনবাংলোতে তার বুকিং আছে। চারিদিকে চা বাগান আর দিগন্তপ্রসারী পাহাড়ের মাঝে একটি নিরিবিলি বাড়িতে সে কাটিয়ে দিবে আগামী একটি মাস। মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়াবে শ্রীমঙ্গলের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়। বাকি সময়টা লিখবে, পড়বে, ছবি আঁকবে। চমকপ্রদ ব্যাপার! কিন্তু বাস্তব ঘটনা এতো চমৎকারভাবে ঘটল না। ঝমঝম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মৌনি যখন কোনোরকমে একটা সিএনজি ভাড়া করলো; তার ঘন্টাখানেক পরই জানতে পারলো, রাধানগর এতোই প্রত্যন্ত অঞ্চল যে খোদ সিএনজি ড্রাইভারও জায়গাটা খুঁজে বের করতে পারছেন না। হালের জাদু ‘গুগল ম্যাপ’ ঘেঁটে এলাকাটা খুঁজে বের করে আরও চমকে গেল মৌনি। মূল সড়ক থেকে নেমে সরু, পাহাড়ি একটা রাস্তা ধরে কয়েকটি আদিবাসী পল্লি পেরিয়ে একদম জনমানবহীন এক উপত্যকায় এসে থেমে গেল তাদের গাড়ি। সামনে একটি ভাঙা সাঁকো। গুগল ম্যাপ বলছে এই সাঁকো পেরিয়ে কিছুটা হাঁটলেই পাওয়া যাবে সেই রহস্যময়ী বনবাংলো। সিএনজি এই সাঁকো পেরুতে পারবে না। মৌনির হাঁটতে হবে একা। রাস্তার দু'পাশে বনফুলের ঝাড়। দূরে গোধূলি আর কুয়াশার সঙ্গে মিলেমিশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি পাহাড়। তার ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে চা বাগান। আশেপাশে গহীন জঙ্গল। কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব নেই। নির্বাসনের জন্য চমৎকার একটি জায়গা। কিন্তু একলা এক মেয়ের জন্য কতটা নিরাপদ সে ব্যাপারে ভরসা করা যায় না।
মৌনি দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে দু'পেয়ে পথ ধরে এগুলো। কিছুটা হাঁটতেই রাস্তার ধারে বন্য ফুলগাছে শোভামণ্ডিত লোহার গরাদের ফটক চোখে পড়ল। তার পাশে আরাম করে ঘুমাচ্ছে দুটো দেশি কুকুর। মৌনির উপস্থিতি টের পেয়েই গলা বাড়িয়ে হৈ-হুল্লোড় জুড়ে দিলো তারা। কুকুরদের কোলাহল শুনেই সম্ভবত ফটকের পাশের এক ঘর থেকে বেরিয়ে এলো একটি লোক। মৌনি বুঝল এটা রিসেপশন। তখন সন্ধ্যা নামতে আরম্ভ করেছে। বন্য ঝিঁঝিদের ডাক, ফটকের কাছের দুই কুকুর আর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ছাড়া এই পৃথিবীতে আর একটি মানুষও বেঁচে নেই বলে মনে হলো মৌনির। এখানে কি আর কেউই থাকে না? লোকটি মৌনিকে রিসেপশনে ডেকে নিয়ে বসালেন। চেইক-ইনের ফর্মালিটিস শেষ হওয়ার পর নির্বাসিত এই বাংলোতে আরও একটি প্রাণীর সন্ধান পেলো মৌনি। পনেরো-ষোল বছরের একটি ছেলে। এই বাংলো বাড়ির পোর্টার। ছেলেটা লাগেজপত্র নিয়ে মৌনিকে তার জন্য বরাদ্দ বাংলোতে পৌঁছে দিলো। যন্ত্রের মতো জিজ্ঞেস করলো,
‘ ইফতারের জন্য কিছু নিবেন, ম্যাম?’
মৌনি জবাব না দিয়ে একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে বাড়িটি দেখল। কাঠের দু'তলা বাড়ি। নিচের তলাটা ফাঁকা। উপরে একটিমাত্র শোবার ঘর। তার সঙ্গে লম্বা ঝুল বারান্দা। কাঠের সিঁড়ির গোড়া থেকে সবুজ লনের বুক চিড়ে দুই দিকে চলে গিয়েছে চুন সুরকির সরু পথটা। একটি মিশেছে দূরের জঙ্গলের অন্ধকারে। অপরটি নেমে গিয়েছে বাড়ির সামনের শানবাঁধানো ছোট্ট পদ্মপুকুরটির কাছে৷ পুকুরের পাশে একটি দোলনা – ঝড় পরবর্তী হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে। মৌনি আশপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
‘ আপনাদের রান্নার ব্যবস্থা কোথায়?’
ছেলেটি পশ্চিমের গহীন জঙ্গলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল,
‘ ওদিকে।’
মৌনি একবার সেই অভয়ারণ্যের দিকে তাকাল। জানতে চাইল,
‘ এই বাংলোবাড়িতে কি এই একটাই বাড়ি?’
‘ জি না, ম্যাম। আরও ছয়টা বাংলো আছে।’
‘ ওগুলোতে কেউ থাকছে না?’
ছেলেটি ফের জঙ্গলের দিকে ইশারা করে অনুভূতিশূন্য গলায় বলল,
‘ ওদিকের একটা বাড়িতে একজন স্যার থাকছেন। এছাড়া কেউ নেই। অফ সিজনে বাংলোগুলো ফাঁকাই থাকে।’
মৌনি বুঝল, এজন্যই এতো স্বল্পমূল্যে সহজেই পাওয়া গিয়েছে এই বাংলো। মৌনি ক্ষণকাল ওই জঙ্গলের দিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে থেকে দু-তলায় উঠে গেল। ছেলেটিকে এক গ্লাস পানি আর এক কাপ চা পাঠিয়ে দিতে বলে গম্ভীর মুখে দরজায় খিল দিল। একেবারে একলা এখানে এসে দীর্ঘ একমাস থাকার সিদ্ধান্ত যে ভয়ংকর খারাপ সিদ্ধান্ত হয়েছে ভেবে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করলেও নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রাখার চেষ্টা করলো মৌনি। দীর্ঘ সময় শাওয়ার নিয়ে ঘুমানোর পোশাক পরল। ততক্ষণে ইফতারের সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ওয়াশরুম থেকে বেরুতেই কানে এলো দরজার করাঘাত। অনিশ্চিত ভয়ে বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটাতে লাগল মৌনির । একমাসের পরিকল্পনা করে এলেও লাগেজ থেকে এখনও কিছুই বের করা হয়নি। অনেকক্ষণ হলো সে আবিষ্কার করেছে, এই নির্জন নির্বাসনে অসংখ্য হিংস্র প্রাণী আর কতগুলো পুরুষ মানুষের সঙ্গে সে একলা অসহায় এক নারী। এই রাতে যেকোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আজকে রাতটা অক্ষত থাকতে পারলে আগামীকাল ভোরেই মৌনি শ্রীমঙ্গল শহরের দিকে চলে যাবে। মৌনি দরজা খোলার আগে সতর্ক হাতে দরজার পর্দা সরিয়ে কাচের দরজার ওপাশের মানুষটিকে দেখল। কিছুক্ষণ আগের সেই পোর্টারকে দেখে কিছুটা নির্ভার হয়ে দরজা খুলল। ছেলেটির হাতে একটি ট্রে। তাতে এক বোতল পানি, এক কাপ চা আর হালকা কিছু স্নেকস্।
‘ এতোকিছু তো চাইনি।’
‘ এগুলো বাংলোর পক্ষ থেকে ওয়েলকাম ট্রিট ম্যাম। কিন্তু রাতের খাবারটা আপনাকে অর্ডার করতে হবে। রাতে কিছু নিবেন? অথবা সাহরিতে?’
মৌনি ট্রে-টা হাতে নিয়ে জানতে চাইল,
‘ রাতে কিছু খাবো না। সাহরির খাবার কখন দিয়ে যাবেন আপনারা?’
ছেলেটি মৌনিকে চমকে দিয়ে বলল,
‘ রুমে খাবার দেওয়ার নিয়ম নেই ম্যাম। কেবল চা এবং কফির জন্য রুম সার্ভিস চালু আছে। বাকি খাবারের জন্য আপনাকে ডাইনিং এ যেতে হবে।’
ওই ভোর রাতে ওমন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একলা ডাইনিংয়ের কাছে যেতে হবে ভেবেই প্রায় মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হলো মৌনির। আশেপাশে কোথাও গার্ড নেই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, বসতি নেই– এ কোন অলীক জায়গায় এসে পৌঁছাল মৌনি! প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে পোর্টারকে বিদেয় করলো সে। তারপর কিছুক্ষণ থম ধরে বসে রইল বিছানায়। জায়গাটা অনিরাপদ হলেও ঘরটা বেশ মনোরম। একটি বড় বিছানা। পার্শ্ব টেবিলে তাজা বুনোফুল। ছোট্ট কাঠের আলমারি। বিস্তৃত জানালার পাশে একটি আরামকেদারা। জানালা খুললে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া চা বাগান চোখে পড়ে। বারান্দার পাশের দেয়ালটা স্বচ্ছ কাচের তৈরি। পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালে চোখে পড়ে ঝুল বারান্দার টিমটিমে হলদে আলো। রুচিশীল বেতের সোফা আর ছোট্ট কফি টেবিলে গুছিয়ে রাখা দেশি-বিদেশি ম্যাগাজিন।
অনেকটাক্ষণ নীরবে বসে থেকে উঠে গিয়ে জানালাটা খুলে দিলো মৌনি। সঙ্গে সঙ্গে হিমেল হাওয়ার ঝাপটায় লাফিয়ে উঠল তার কুন্তলরাশি। আকাশে গোল একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয়
ঝলমল করছে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে যাওয়া সারি সারি চা গাছের নরম কচি পাতা। মৌনি ব্যাগ থেকে একটি বই আর ব্যাটারির আলো বের করে ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল। সাহারিতে খেতে যাবে কি-না সে চিন্তা এখনও মাথায় কুটকুট করে কাটছে। রাতে কিছু হয়ে যায় কিনা, দরজা ভেঙে কেউ ভেতরে ঢুকে যায় কিনা এই ভয় সেই কুটকুটে আরও রশদ জোগাচ্ছে। আজ রাতে আর ঘুমানো সম্ভব না৷ মৌনি বই আর আলো হাতে বসল জানালার পাশের আরামকেদারায়। ব্যাটারির আলোটা জানালার পাটাতনে রেখে ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করলো বইয়ের পাতায়। কে জানে জীবনের কোন কালো ঝড়ের ভয়ে যাযাবরের মতোন ছুটে বেড়াচ্ছে মৌনি। ঝড়? না ঝড় তো নয়। মৌনি আসলে বাঁচতে চাইছে ঝড়ের পর আরম্ভ হতে চাওয়া ভারি বর্ষণ থেকে। ঝড়ের হাওয়ার দাপট তো কতকাল ধরেই সে রেখে দিয়েছে বুকের ভেতর। ওসব তাকে খুব একটা বিচলিত করে না। কিন্তু তারপরের বৃষ্টিতে ভিজতে চায় না সে। একবার বৃষ্টি নামলেই কর্দমাক্ত হবে পথ। সারাজীবন ওই কাদামাটি মাড়িয়ে হাঁটতে হবে ভাবতেই ক্লান্ত লাগে। মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বই বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলো ধীরে ধীরে বাড়ছে। সেই দুধ সাদা জ্যোৎস্নায় কতক্ষণ ডুবে ছিল জানা নেই মৌনির। ঘোর কাটল মিহি এক সুরে। মনে হচ্ছে, রাতের সমস্ত সৌন্দর্য শুষে নিয়ে কাছে কোথাও বেহালা বাজাচ্ছে কেউ। আশেপাশে কেবল পাহাড় আর জঙ্গল হওয়ায় শব্দটা ঠিক কোনদিক থেকে আসছে বোধগম্য হচ্ছে না। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে সম্ভবত দিক হদিস করা যেতো। কিন্তু মৌনি বারান্দায় গেলো না। সেই চেয়ারে বসেই কাটিয়ে দিলো অর্ধেক রাত।
ভোর রাতে ফের টোকা পড়ল দরজায়। মৌনি তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে মগ্ন হয়ে আকাশ দেখছে। হঠাৎ করাঘাতে চমকে উঠে ভীত গলায় জানতে চাইল,
‘ কে?’
সঙ্গে সঙ্গেই পরিচিত কণ্ঠে জবাব এলো,
‘ খাবার তৈরি, ম্যাম।’
মৌনি উঠে দাঁড়াল। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। ছেলেটি ইতোমধ্যেই ফিরে গিয়েছে। মৌনি ভেবেছিল তার পিছু পিছুই পৌঁছে যাবে ডাইনিংয়ে। পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় কিছুক্ষণ সন্দিগ্ধ চোখে সে তাকিয়ে রইল সেই অন্ধকার জঙ্গলের দিকে। তারপর কী ভেবে একটা টর্চ হাতে রওনা দিলো সেদিকে। নিজের বাংলোর সীমানা পেরিয়েই মৌনি নিজেকে আবিষ্কার করলো একটি আঁধার ঢাকা জঙ্গলে। আশেপাশে কোথাও আলোর ব্যবস্থা রাখেনি কতৃপক্ষ। কেন রাখেনি কে জানে! মৌনি টর্চ জ্বেলে আরও কিছুটা এগুতেই দেখতে পেলো একটি আলো ঝলমলে রান্নাঘর। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে আরো দুটো বাংলো। মৌনি বাংলো দুটো পেরিয়ে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চারদিকে জানালা দেওয়া হলদে আলোর রান্নাঘরটিতে বেশ কয়েকজন ছেলে দ্রুত হাতে কাজ করছে। সামনের লনে গুছিয়ে রাখা হয়েছে কয়েকটি ছোট ছোট চেয়ার টেবিল। সম্ভবত বিকেলের নাস্তার জন্য এই ব্যবস্থা। একটু দূরে একটি কাঠের টঙ ঘর চোখে পড়ল মৌনির। চমৎকার পলিশ করা ঘরের উপরে রঙিন টিনের ছাউনি। একটা হলদে বাতি নির্বিকার ভাবে আলো ছড়াচ্ছে সেখানে থাকা একমাত্র ডাইনিং টেবিলটির ওপর। মৌনি খাবার খাওয়ার জন্য সেই টঙ ঘরটাই বেছে নিলো। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে মৌনির দেখা হলো একটি কুকুরের সঙ্গে। মৌনিকে দেখে সে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে আবার আগের মতোই মাথা নুইয়ে শুয়ে পড়ল। প্রথমদিকে একটু ভয় পেলেও ধীরে ধীরে রাতটাকে উপভোগ করতে লাগল মৌনি। জ্যোৎস্না ভেজা রাত, চারদিকে বন্য ঝিঁঝির ডাক, বিশুদ্ধ হাওয়া আর জঙ্গলের অভ্যন্তরে টঙের উপর বসে খাবার খাওয়া ধীরে ধীরে দারুণ উপভোগ্য মনে হতে লাগল তার। খাবারের স্বাদও স্বর্গীয়। খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে মৌনি লক্ষ্য করলো সামনের এক বাংলোতেও একইভাবে খাবারের সন্দেশ পাঠিয়ে এলো একটি ছেলে। তার কিছুক্ষণ পর বাংলো থেকে বেরিয়ে এলো লম্বা মতো একটি লোক। লোকটি মৌনির ডাইনিংয়ের দিকে এলো না। বাংলোর সামনে দিয়ে আলো-আঁধারি পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ছনের ছাউনি দেওয়া একটি উন্মুক্ত ঘরের দিকে। টঙের ডাইনিংয়ের মতো ওখানেও একটি খাবার টেবিল আছে। লোকটি বসলো মৌনির দিকে পিঠ ফিরিয়ে। এই মুহূর্তে এই লোক আর মৌনিই তবে এই জংলী বাংলোগুলোর একচ্ছত্র অধিপতি? এতোগুলো মানুষ এই এক মাস কেবল তাদের দু'জনকেই আপ্যায়ন করবে? মনে মনে নিজেকে বনের রাণী ভেবে খুবই উত্তেজনা বোধ করলো মৌনি। কিন্তু খাওয়া শেষে ফিরে যাওয়ার সময় বাঁধলো এক বিপত্তি। মৌনির মনের উত্তেজনাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল টঙের মেঝেতে শুয়ে থাকা তন্দ্রাচ্ছন্ন কুকুরটি। মৌনি কুকুর-বিড়াল অসম্ভব ভয় করে। এই জঙ্গলে এই কুকুর তাকে কামড়ে ধরলে কেউ ছাড়াতেও আসবে না ভেবে মৌনি দ্রুত পা চালালো নিজের বাংলোর দিকে। কুকুরটিও সমানতালে এগিয়ে এলো। মৌনি আরও জোরে হাঁটলো। এক সময় না পেরে দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে বাংলোর দিকে ছুটতে লাগল সে। কুকুরটি তাকে আচমকা দৌঁড়াতে দেখে ভয় পেয়ে চারদিকে ‘ঘেউ ঘেউ’ রব তুলে নিজেও ছুটতে লাগল দ্রুত গতিতে। মৌনি এবার কেঁদেই ফেলল প্রায়। ‘ও মা গো’ বলে গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে উঠে গেল নিজের বাংলোর ঝুল বারান্দায়। কুকুরটি সেখানেও তেড়ে আসতে পারে এই ভয়ে দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা প্রায় বন্ধ করে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে। কুকুরটি দু'তলায় উঠেনি। নিচের লনে দাঁড়িয়েই হাউকাউ করছে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল মৌনি। ধড়ফড় করতে থাকা বুকটাকে শান্ত করে দরজাটা লাগাতে গিয়ে চোখ পড়ল জঙ্গলের কাছের পথটিতে। সেখানে দীর্ঘদেহী এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মৌনি তাকাতেই ছায়াটা চলে গেল জঙ্গলের ভেতর। মৌনি কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে থেকে দরজা বন্ধ করলো। সারাজীবনের সকল লোমহর্ষক অনুভূতি এই এক রাতেই পাওয়া হয়ে গিয়েছে তার।
নিজের বিছানায় চুপ করে শুয়ে আছে সাব্বির। ঘরের আলো নেভানো। খোলা জানালার সফেদ পর্দাগুলো অল্প অল্প উড়ছে। রাতের বাতাস কোথা থেকে চুরি করে এনেছে এক মুঠো গন্ধরাজের সুবাস। বাইরে গাঢ় জ্যোৎস্না। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে দিনের আলোর মতোই কিছুটা আলো এসে পড়েছে সাব্বিরের গায়ের ওপর। ভেতরের ঘর থেকে সংসারি বাড়িগুলোর মতোন টুংটাং শব্দ আসছে। এই রাতে মিথি এতো কী কাজ করছে কে জানে! চোখ বন্ধ করে দূর থেকে ভেসে আসা সেই শব্দগুলোই মন দিয়ে শুনছিল সাব্বির।
‘ ঘুমিয়ে পড়েছেন?’
প্রশ্নটা শুনে চোখ মেলে তাকাল সাব্বির। মিথি কখন ঘরে এসেছে টের পায়নি সে। তাকে তাকাতে দেখে মিথি জানতে চাইল,
‘ আমি আপনার পাশে বসলে কি আপনার অসুবিধা হবে সাব্বির?’
সাব্বির মৃদু হাসল। এতো কান্ড ঘটিয়ে তারপর জানতে চাইছে, পাশে বসলে কি তার অসুবিধা হবে? সাব্বির কপালে একটা হাত রেখে শুয়েছিল। হাতটা নামিয়ে আরেকটু সোজা হয়ে মিথিকে বসার জায়গা করে দিয়ে বলল,
‘ বসুন।’
মিথি কেবল বসলোই না। খুব স্বাভাবিকভাবে হাত রাখল সাব্বিরের মাথায়। তার নরম চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
‘ আসুন আপনার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেই। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঘুম আসছে না। হাত বুলিয়ে দিলে ঘুম আসবে।’
সাব্বিরের বলতে ইচ্ছে হলো, আপনি এরকম গা ঘেঁষে বসে থাকলে আমার আরও ঘুম আসবে না মিথি। কিন্তু বলল না। জীবনের প্রথম কেউ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এই স্নেহটুকু সে বাধ্য শিশুর মতোন আঁজলা পেতে নিল। জ্ঞান হওয়ার পরই সাব্বির নিজেকে আবিষ্কার করেছিল এক অনাথাশ্রমে। মা-বাবা বলে যে কিছু হয় সেটাই সে বুঝেনি অনেকদিন। যতদিন বুঝেনি ততদিনই জীবনের সবচাইতে ভালো সময় কাটিয়েছে সাব্বির। জেনে ফেলেই জীবনটা হয়ে গেল জীবন্ত এক বিভীষিকা। সাব্বির নিজের অজান্তেই আরেকটু চেপে মিথির কোল ঘেঁষে শুলো। মিথির শাড়ির আঁচল থেকে অদ্ভুত মিষ্টি এক গন্ধ আসছে। আচ্ছা, এটা কি কেবল মিথিরই আঁচলের গন্ধ? নাকি পৃথিবীর সকল নারীদের আঁচলে একই রকম গন্ধ হয়? আর মায়েদের? মায়েদের আঁচলের গন্ধ কেমন হয়? মিথি তার ঘন চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
‘ আচ্ছা সাব্বির, আপনার শৈশব তো অনাথাশ্রমে কেটেছে। সেখানে আপনি আপনার ম..’
বলতে গিয়েও থামল মিথি। একটু অস্বস্তি নিয়ে ‘মা’ শব্দটা বদলে ফেলে বলল,
‘ সেখানে আপনি আপনার জন্মদাত্রীর পরিচয় কী করে জানলেন? অনাথাশ্রম থেকেই জানানো হয়েছিল?’
‘ না।’
মিথি ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
‘ তাহলে?’
সাব্বির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ যখন আমার ছয় অথবা সাত বছর বয়স তখন জীবনের প্রথম এবং শেষবারের মতো আমার সঙ্গে একজন দেখা করতে এলো। মলিন পোশাকের মধ্যবয়স্ক এক লোক। যতক্ষণ তিনি ছিলেন আমার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাননি৷ ছোট ছিলাম তো? ভেবেছিলাম তিনি হয়তো আমাকে নিতে এসেছেন। কিন্তু তার বদলে তিনি আমার হাতে দিলেন এক টুকরো কাগজ। এছাড়া আর একটি কথাও বললেন না। তাকালেন না। আদর করলেন না। নিজের পরিচয়ও দিলেন না। আমি তখন কেবল নিজের নাম লিখতে শিখছি। কাগজের লেখা পড়ার মতো ম্যাচিউরিটি আমার ছিলো না। তারপরও প্রতিদিন আমি কাগজটা পড়তে চেষ্টা করতাম। কাগজের মাঝমাঝি একটা কঙ্কালসার কিশোরীর ঝাপসা ছবি ছাপা ছিলো। মেয়েটি তার বড় বড় ক্লান্ত চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। আমি জানতে চাইতাম, মেয়েটার কী হয়েছে? ওই একটি কাগজ পড়ার অদম্য ইচ্ছায় আমার বর্ণমালা শেখার আগ্রহ বেড়ে গেল। রোজ নতুন একটা বর্ণমালা শিখতাম আর সেই কাগজে সেই বর্ণ খুঁজে বের করে ঘটনাটা আরেকটু বুঝার চেষ্টা করতাম। কাগজটা আমি সহজভাবে পড়ে ফেলতে পারলাম আরও দুই বছর পর। কিন্তু এর অর্থ বুঝতে আরও অনেক সময় লেগে গেল। খবরের কাগজের অতো কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ তখনও জানতাম না আমি। তারপর একদিন অর্থটাও বুঝলাম। তারপর বুঝে ফেললাম, কে আমি! কোথা থেকে এসেছি। এই কাগজটা আমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কারণ।’
মিথি হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ নীরবে সাব্বিরের চুলে বিলি কেটে অন্যমনস্ক গলায় বলল,
‘ আপনি একজন যোদ্ধা সাব্বির। আপনি যেখানে ছিলেন। যে মানসিক ঝড় বয়ে বেড়িয়েছেন। সেখান থেকে নিজেকে এখানে তুলে আনা অনেক শক্ত একটা কাজ। আপনি যদি ঝরে যেতেন। অন্যান্য বাচ্চাদের মতোন জীবনের দিশা হারাতেন তাহলে সেটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হতো। কিন্তু আপনি এই প্রচন্ড ঝড়েও নিজেকে হারাতে দেননি। নিজের পরিচয় বানিয়েছেন। জীবনের এতোগুলো বছর কারো বিন্দুমাত্র খারাপ না চেয়ে, খারাপ না করে কাটিয়ে দিয়েছেন। তারপরও আপনি নিজেকে কী করে এতো তাচ্ছিল্য করেন, সাব্বির? মানুষের সজ্ঞায় আপনি কত উৎকৃষ্ট মানুষ আপনি জানেন? আমি যতবার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবি ততবার নতুন করে আপনার প্রেমে পড়ি৷ আপনার মনে মানুষের পরিচয় নিয়ে খুব ভুল একটা ধারণা আছে, সাব্বির। মানুষের পরিচয় সেটা না যা সে জন্মসূত্রে পায়। মানুষের পরিচয় সেটা যা সে নিজে তৈরি করে।’
মিথি একটু থেমে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ফের বলল,
‘ আপনি তো শুধু নিজেকে তাচ্ছিল্য করেন না সাব্বির। আপনি আপনার সঙ্গে আমার ভালোবাসাকেও তাচ্ছিল্য করেন। আপনার মনে হয়, আমি আপনাকে দয়া করছি, মায়া করে ভালোবাসছি। কিন্তু আমি আসলে ভালোবেসেছি আপনার ব্যক্তিত্ব। আপনি যদি কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারে খুব স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করতেন, খুব বিত্তশালী হতেন তাতেও আমার আপনার প্রতি আগ্রহ আসতো না যদি আপনি আপনি না হতেন। আমি আপনাকে শুধু আপনার জন্য ভালোবাসি। আপনি আপনি এ-কারণে ভালোবাসি৷ আপনার সকল সত্য জানার আগেই আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনার সত্য সেই ভালোবাসায় এক সেকেন্ডের জন্যও দ্বিধা তৈরি করতে পারেনি। তাহলে আপনার এতো দ্বিধা কীসের সাব্বির?’
তারপর সাব্বিরের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ নাকি আপনার এখনো উপরতলার বৃষ্টির দিকে নজর? আমাকে এসব ভুংভাং বুঝিয়ে ডিভোর্স দিয়ে ওকে বিয়ে করার মতলব?’
সাব্বির চুপ করে মিথির কথা শুনছিল। শেষ কথায় হেসে ফেলে নির্দোষ চোখদুটো তুলে তাকাল। বলল,
‘ অবিশ্বাস্য! আপনি এখনও বাচ্চা মেয়েটার পেছনে পড়ে আছেন মিথি?’
মিথি চটে গিয়ে বলল,
‘ বাচ্চা! আপনার শিশু বৃষ্টিকে বিয়ে দিলে এতোদিনে আরেকটি শিশুর জননী হয়ে যেতো। তাকে আপনার বাচ্চা মনে হচ্ছে? শিশু শিশু করে বৃষ্টিবিলাসের ধান্ধা! সুযোগ পেলেই তো বৃষ্টিতে ভিজেন দেখি। ঘটনা তাহলে এই?’
সাব্বির হো হো করে হেসে উঠল। মিথি বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ অযথা হাসবেন না। হেসে গড়িয়ে পড়ার মতো কোনো কথা আমি বলিনি। আজ থেকে আপনার বৃষ্টিতে ভেজা বন্ধ।’
সাব্বির হাসতে হাসতে বলল,
‘ আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন মিথি।’
মিথি তার চুলগুলো মুঠো করে ধরে আরেকটু হেলে এসে ধমকি দেওয়ার মতো করে বলল,
‘ আজকের পর থেকে চোখ বন্ধ করে বাসা থেকে বেরুবেন আপনি। ভুলেও শিশু বৃষ্টির দিকে তাকাবেন না। ওকে দেখলেই নিশ্চয় আদর করে চকলেট কিনে দিতে ইচ্ছে করে? সেদিন দেখলাম মধুর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করছেন, কেমন আছো বৃষ্টি? কেন? ও কেমন আছে সেটা জেনে আপনার কী দরকার?’
সাব্বির কী বলবে ভেবে পেলো না। অবাক গলায় বলল,
‘ কী আশ্চর্য! একটা পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হলে কথা বলব না?’
মিথি নির্বিকার গলায় বলল,
‘ না, বলবেন না। বৃষ্টির সঙ্গে আপনার কোনো পরিচয়ই থাকবে না। যে শিশু মেয়ে স্বপ্নে দশবার আপনার সন্তানের মা হয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে আপনার কীসের কথা? কীসের পরিচয়? তার সঙ্গে দেখে হলেই কেন হা করে তাকিয়ে থাকতে হবে?’
সাব্বির অবাক হয়ে বলল,
‘ আমি কখনোই বৃষ্টি দিকে তাকিয়ে থাকি না মিথি।’
মিথি সরু চোখে তাকাল। মাথা কাত করে রাগান্বিত মুখটিতে মুহূর্তেই এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে জানতে চাইলো,
‘ তাই! তাহলে আপনি কার দিকে তাকিয়ে থাকেন সাব্বির?’
সাব্বির মিথির দিকেই তাকিয়ে ছিল। মিথির প্রশ্নের ধরনে মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে গেল তার মুখ। মিথির থেকে সরে গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বলল,
‘ অনেক রাত হয়েছে। ঘুমান মিথি।’
প্রত্যুত্তরে শব্দ করে হেসে উঠল মিথি। সাব্বিরের কানে সেই হাসি বাজল কাচের চুড়ির মতো, রিনিঝিনি রিনিঝিনি।
বসন্তের শেষ। প্রকৃতিতে ইতোমধ্যেই গ্রীষ্মের আমেজ। এই ঝড়, এই চারদিকে ঝলমল করে উঠছে রোদ। আজ এই ভোর থেকেই আরম্ভ হয়েছে ভ্যাপসা গরম। শাওন অলসভাবে বসে আছে বিছানার ওপর। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ফিরে আসার পর গত কিছুদিন সে ছিলো কাস্টেডিতে। ভয়ংকর শারিরীক, মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে এই সময়গুলোতে। কাল থেকে তার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ইনকুয়েরি। শাওনের মনে হচ্ছে, ইনকুয়েরির ফলাফল খুবই খারাপ হবে। খুব সম্ভবত তার ক্যাডেটশিপ বাতিল হয়ে যাবে। শাওনের অবশ্য তা নিয়ে খুব একটা ব্যথাবোধ হচ্ছে না। ইমাদকে শাওনের ব্যাপারে স্টেটমেন্ট দিতে হয়েছে। ইমাদ কী স্টেটমেন্ট দিয়েছে কে জানে? শাওন ফিরে এসে খুব ফাঁপা একটা যুক্তি দিয়েছিল। বলেছে, ট্রেনিংয়ের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পালিয়েছে। কথাটা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বুঝতে পারছে না। অফিসাররা খুব একটা বিশ্বাস করেছে বলেও মনে হয় না। তার পাস্ট রেকর্ডে সে খুবই এক্টিভ ক্যাডেট। কোনো ট্রেনিংয়েই সে পিছিয়ে নেই। ইমাদ নিশ্চয় মৌনির কথাটা বলে দিবে। ইমাদ না বললেও অবশ্য কথাটা গোপন থাকবে না। এই একাডেমিতে সকল ক্যাডেটই তো জানে মৌনির সম্পর্কে শাওনের মানসিক অবস্থার কথা। ট্রেনিংয়ের কষ্ট সইতে না পেরে পালালে ক্ষমা পাওয়া যায় কিনা শাওন জানে না। তবে প্রেমে অন্ধ হয়ে পালিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। একজন ক্যাডেটের মানসিক স্থিরতা হবে দৃঢ়। প্রেমিকা ডাকলেই ছুটে পালিয়ে গেলে চলবে কেন? মৌনি অবশ্য তার প্রেমিকাও না। তবে মৌনি তার কী? বন্ধু? এখনও বন্ধুত্ব আছে তাদের মধ্যে? শাওনের ধীরে ধীরে মনে পড়ল তার আর মৌনির শেষ কথা বলার দিনটির কথা। সেই দিনের কথা এই সেনা একাডেমির কাস্টেডিতে বসেও অনেকবার ভেবেছে শাওন। প্রতিবার অদ্ভুত এক ব্যথায় ভরে উঠেছে বুক। আজ সেরকম কিছু হলো না। অনুভূতি ভোঁতা হয়ে আছে। ভালো খারাপ কোনোটাই লাগছে না। ক্যাডারশিপ বাতিল হলে শাওন কী করবে? তার মায়ের একমাত্র সম্বল সে। মাকেই বা কী বুঝাবে? কোনো ভাবনাই শাওনকে বিচলিত করতে পারল না। সে কেবল অলস বসে রইল। কোনো ভাবনা ছাড়া শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভোর হতে চাওয়া আকাশের দিকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………