পবনপত্র - পর্ব ১১ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ২য় দিন। আমজাদ হয়তো কোথাও ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাশেদ ঘরে আছে। ছেলে মানুষ কেন চার দেয়ালের মাঝে ওভাবে পড়ে থাকবে? বাদল তার কক্ষসঙ্গীদের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
বাতাস বইছে, গাছপালার পাতা খসখস শব্দ করছে। আজকে দীর্ঘ লাফ আর উচ্চ লাফের বাছাইপর্ব চলছে সকাল থেকে। দায়িত্বরত আলমগীর চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমাচ্ছে। তার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো বাদল। নামের তালিকায় আঙুল ঠেকিয়ে নিজের নামটা খুঁজতে শুরু করলো। আজকেও হয়তো তাকে অনেক দেরিতে ডাকা হবে। এতো অপেক্ষা করার ইচ্ছে নেই তার।

“তোমার নাম তাহলে বাদল!”

বাদল চমকে উঠে পাশে তাকালো। তামান্না নামের মেয়েটা হাতদুটো পেছনে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, “দেখে ফেলেছি।”

বাদল নিজের নামের উপর থেকে আঙুল সরিয়ে নেয়। নির্বিকার মুখে মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর চলে যেতে উদ্যত হতেই তামান্না আবার কথা বলে, “তোমার কি মানসিক সমস্যা আছে?”

কথাটা বাদলের গায়ে লাগলো। সে মাথা ঘোরায়, “কী বললেন?”

“সেদিন তোমাকে একটা মেয়ের গায়ে কাগজ ছুঁড়তে দেখলাম।”

“সেটাতে আপনার সমস্যা কী? আপনার গায়ে তো ছুঁড়িনি।”

তামান্নার মুখে একটু কাঠিন্য দেখা যায়, “তুমিই ঐ ছেলেটা না? ঐ যে, তোমাদের নামে যে অনেক কমপ্লেইন আসে?”

বাদল আর কথা বাড়ালো না, বারান্দা থেকে নেমে এলো। মাঠে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের চেঁচামেচির মাঝেও তামান্নার ঐ সতর্কবাণী তার কানে আসে, “ভুল মানুষের সাথে ঝামেলা করেছো তুমি। একজন চুপ থাকলেই কিন্তু সবাই চুপ থাকবে না।”

মেয়েটার কথায় সে ভ্রুক্ষেপ করলো না। পুরোনো ভবনের দিকে এগিয়ে গেলো। নিজের কাজের জন্য সে মোটেও অনুতপ্ত নয়। সে কি ঐ মেয়েটাকে প্রতিবাদ করতে বারণ করেছে? সে কি চেয়েছে মেয়েটা চুপ থাকুক? বরং উল্টোটাই চেয়েছে! কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় চুপ থাকে, কথা না বলে–তবে অন্যকে দোষারোপ করে লাভ কী?
লাইব্রেরির ভেতর কয়েক কদম হেঁটেই বাদল থেমে দাঁড়ায়। মেয়েটা আজকেও তার জায়গায় বসেছে। হাতে মুষ্টি পাকিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। মৌমিতা মাথা তুলে তাকাতেই হম্বিতম্বি করে বলতে লাগলো, “আপনাকে যে বললাম, এটা আমার জায়গা।”

মৌমিতা বই বন্ধ করে শান্তভাবে উঠে দাঁড়ায়। পেছনের আলমারিতে বইটা তুলে রাখে। ছেলেটার মুখের মাংসপেশিগুলো শক্ত হয়ে আসে, সে জানে, এবারও তাকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। মেয়েটা বইয়ের শেষ পাতায় ছিলো, এটা বাদল লক্ষ করেছে। পড়া শেষ হওয়ার কারণেই সে উঠে দাঁড়িয়েছে, বাদলের কথায় নয়। মেয়েটা বারবার তাকে এমনভাবে উপেক্ষা করছে, যেন সে অদৃশ্য, শ্রবণাতীত কিছু! এতো অহমিকা মেয়েটার!

“দাঁড়ান!”

মৌমিতা দাঁড়ালো না। বরং এমন ভাব করলো যেন সে কিছুই শোনেনি। বাদল দাঁড়িয়ে থাকে। সে ক্ষুব্ধ, হয়তো কিছুটা ব্যথিতও। মৌমিতা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেলে বাদল দৃষ্টি ফেরায়, শূন্য আসনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখানে সে পড়ার জন্য আসে না। নিজের কল্পিত রাজত্বে সময় কাটাতে আসে। কিন্তু তার সিংহাসনটা কেউ বিনা যুদ্ধে জয় করে নিয়েছে। লাইব্রেরিতে আর কাজ নেই তার। প্রতিযোগিতার কথাও সে বেমালুম ভুলে গেছে। কেবল এতোটুকুই মনে পড়লো, এই মফস্বলে তার আরেকটা সাম্রাজ্য আছে, রেলস্টেশন। বাদল এখন সেখানেই যাবে। আজ এমনিতেও ক্লাস হবে না। কলেজ ছুটির সময় হলে সে আবার ফিরে আসবে।
যাওয়ার আগে বাদল টেবিলটার সীমানা বরাবর হাত রাখে, টেবিলের ধার ঘেঁষে হাত বুলিয়ে সে চলে যায়। ঐ ধারের অপরপ্রান্তে লিখে রাখা এক অক্ষরের নামটা টেবিলে আঁকা অন্যান্য আঁচড়ের মাঝেও জ্বলজ্বল করতে থাকে, মৌ।

সূর্যটা এখন মাথার উপর প্রায়। বাদলকে খুঁজতে খুঁজতে আমজাদ হয়রান হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভবনের ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই এখন ক্লাসে ফিরছে। আবার অনেকেই বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমজাদের একটু আফসোস হলো, তাদের কলেজে কড়াকড়ি কোনো নিয়ম নেই। কড়া নিয়ম থাকলে তো সেটা ভাঙা যায়। যেখানে নিয়ম নেই, সেখানে নিয়ম ভাঙার কোনো আনন্দও থাকে না।
সুরাইয়াকে দেখেই সে বলে উঠলো, “চুরাইয়া? ভালো আছো?”

সুরাইয়া আশেপাশে তাকিয়ে শব্দের উৎস খোঁজে, আমজাদকে নজরে পড়তেই এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “এমন চড় দেবো না, মুখ দিয়ে খালি 'চু চু'ই বের হবে!”

“তোমার নামটা আরও সুন্দর শোনা যাবে তখন।”

সুরাইয়া মুখ ফিরিয়ে খটখট করে হাঁটতে শুরু করে। আমজাদ তার পায়ের দিকে তাকায়, “আবার উঁচু স্যান্ডেল পরেছে রে! দুইদিন পর দেখবো বিটিভির নাটকেও অভিনয় করছে। ভালো!”

সুরাইয়া থামে না, সামান্য ঘুরে বলে, “তোমার নাটক বের করবো আমি! দেখতে থাকো।”

জানালা খোলা। মৌমিতা মুখ বাড়িয়ে কামরাঙা গাছটার উপরের দিকে তাকালো। ডালে পাখি এসে বসেছে। বিনা অনুমতিতে গান শোনাচ্ছে। গাছ থেকে অল্প দূরত্বেই খন্দকারদের সীমানা শেষ। এদিকে জহির মিঞাসহ বেশ কিছু মানুষের জমি আছে। বাড়ির পেছনে ধানের ফসল। মৌমিতা ভেবে রেখেছে, তাদের বাড়ির সীমানায় একটা প্রাচীর তুলবে। কামরাঙা গাছটার আশেপাশে একটা বাগান করবে। একপাশে থাকবে ফল আর সবজির বাগান, অন্যপাশে ফুলের বাগান।

রোদের তেজ কমে গেছে। মার্জিয়া ভেজা গামছা নিয়ে দরজার কাছে এলো, তারপর সেটাকে দড়িতে ঝুলিয়ে দিলো। উঁকি দিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকালো, রাবেয়া আশেপাশে আছেন কিনা, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আজকে একেবারেই বকা খাওয়ার মন মানসিকতা নেই তার।

“মার্জিয়া?”

লাফিয়ে দুই পা সরে গেলো মেয়েটা। জুনায়েদ কখন এসে দাঁড়িয়েছে, সে টের পায়নি।

“রিপন বাড়িতে আছে?”

মার্জিয়া ভ্রু কুঁচকায়, “মামা কখন বাড়িতে থাকে, আপনি জানেন না?”

“জানলে তো জিজ্ঞেস করতাম না।”

“একটু আগেই বাইরে গেলো।”

“ওহ।” জুনায়েদ আর কিছু বলে না, চলেও যায় না। মার্জিয়া গামছার আরেকপাশে গিয়ে দাঁড়ায়, সেটার ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলে ওঠে, “আপনি সেদিন মিথ্যা বললেন কেন?”

“মিথ্যা? কবে?”

“ঐদিন। আপনি যে বললেন, আব্বা সিঙ্গারা পাঠিয়েছেন। কিন্তু আব্বা তো ওটা পাঠাননি।”

জুনায়েদ থতমত খেয়ে তাকিয়ে থাকে। এভাবে অপ্রস্তুত হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আসেনি সে। আমতা আমতা করে বলে, “ওহ। আচ্ছা... আরকি, হ্যাঁ... কেন? ভালো ছিলো না?”

মার্জিয়া তার এমন উত্তরে হাসি আটকাতে ব্যর্থ হয়, সে পুরোপুরি গামছার পেছনে লুকিয়ে পড়ে, “আপনাকে আমি কী প্রশ্ন করলাম। আর আপনি এসব কী বলছেন!”

“না, আরকি...” জুনায়েদ অযথা ঘাড় চুলকে আরেকটা অজুহাত সাজায়, “চাচা সেদিন সিঙ্গারা কিনতে চাইলেন। তারপর... কিনলেন না। তাই ভাবলাম, আমিই নিয়ে আসি। যাই হোক, গেলাম। রিপনকে জানিয়ে দিও, আমার একটু... দরকার ছিলো।”

ছেলেটা দ্রুত নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। সে দৃষ্টির অন্তরালে যেতেই আবার হাসতে শুরু করে মার্জিয়া, ঘাড়ে ঝুলে থাকা ভেজা কাপড়টাও দড়িতে ঝুলিয়ে দেয় সে।
জুনায়েদ বছরে কয়েকবার খুব আবোল তাবোল কাজ করে! যদিও সে খুব সাবধানী মানুষ। তবে এবার সে যা করেছে, তা মার্জিয়ার কল্পনাতীত। অন্তত ছেলেটার গম্ভীরতার মুখোশটা আজ ধপাস করে খুলে পড়েছে। মার্জিয়া প্রাচীরের ঐপাড়ের বাড়িটার দিকে তাকালো আবার। ছাদ ছাড়া কিছু দেখা যায় না সেভাবে। সে উপলব্ধি করলো, তার কানের উপরিভাগ গরম হয়ে গেছে। রঙটাও হয়তো রক্তিম হয়ে উঠেছে। জুনায়েদ ভাই আবার কিছু খেয়াল করেনি তো!

—————

বাদলকে তৈরি হতে দেখে রাশেদ বিস্ময় প্রকাশ করলো, “কোথায় যাবি?”

“রবিউল স্যারের বাসার ঐদিক—”

“ক্লাস তো পাঁচটার দিকে। এখনও চারটাই বাজেনি।”

বাদল শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রাশেদের দিকে তাকালো। অতো স্পষ্ট উত্তর দেয়াটা ঠিক হয়নি। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নেয় সে, “আরকি, ঐদিকে যাচ্ছি। একটা কাজ আছে। এখনই চলে আসবো।”

রাশেদ আবার বইয়ে মনোযোগ দেয়, “তাড়াতাড়ি আসিস। আমজাদ ভাই কিন্তু খুব রেগে আছে তোর উপর।”

“কেন?”

“আবার নাকি হারিয়ে গিয়েছিলি?”

“হারিয়ে যাবো কেন? আমি কি ছোট বাচ্চা?”

“প্রায় প্রায়ই তো কোথাও না কোথাও চলে যাস। খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথায় গিয়েছিলি?”

“সবকিছু তোকে বলতে হবে?”

রাশেদ আর প্রশ্ন করে না। বাদল ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।

মৌমিতা রিকশায় উঠে বসে। বাড়ির কাছে আজ একটাও খালি রিকশা পাওয়া যায়নি। মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসতে হয়েছে। প্রায়ই এমন হয়, এদিকে কোনো যানবাহন পাওয়া যায় না। তার উপর রোদ। ওড়নায় মুখ মুছলো মেয়েটা। দেরি হয়েছে অনেক, ক্লাস হয়তো শুরু হয়ে গেছে।
তাদের ব্যাচের আগের সময়টা ফাঁকা। দুপুরের খাবার আর বিশ্রামের জন্য রবিউল স্যার ২ ঘণ্টা বিরতি নেন। এই সময়ে ক্লাস না হলেও ঘরটা খোলাই থাকে। তবে, এই বিষয়ে মৌমিতা এতোদিন মাথা ঘামায়নি।

টিউশন ক্লাসের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে দেখলো, একটা ছেলে ক্ষিপ্র বেগে সাইকেল নিয়ে যাচ্ছে, মুখে বিরক্তির ছাপ, চুলগুলো উড়ছে তার। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, সে ঐ জুনিয়র ছেলেটা, লাইব্রেরিতে যার সাথে দেখা হলো আজকেও। ছেলেটা রিকশা অতিক্রম করতেই মৌমিতা বিস্মিত হয়ে বসে রইলো। এই ছেলের তো এখন এখানে থাকার কথা না।

স্যারের বাড়ির সামনে গিয়ে রিকশা দাঁড়ায়। মৌমিতা ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে আসে। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। নিজের বেঞ্চে ব্যাগ রাখতে গিয়ে সে দেখে, টেবিল এবং বেঞ্চ—উভয় স্থানেই কেউ পানি ঢেলে রেখেছে। ঐ জায়গায় মেঝেটাও অনেক দূর পর্যন্ত ভেজা। ক্লাসে খালি পায়ে ঢুকতে হয়। মেয়েটা পায়ের আঙুল গুটিয়ে ভ্রু কুঁচকায়, কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। রবিউল স্যার বলে উঠলেন, “কী হয়েছে?”

“স্যার... বেঞ্চে পানি—”

ব্যাপারটাকে কারও কাছেই তেমন গুরুতর মনে হলো না। স্যারের দেয়া সুতি কাপড় দিয়ে বেঞ্চ মুছে মৌমিতা কোনোমতে বসলো। পায়ের নিচে জবজবে পানি। সে এই পর্যন্ত সব মেনে নিলো। কিন্তু এরপরে যা উপলব্ধি করলো, তারপরে আর নির্বিকার থাকা সম্ভব হলো না। উঁচু বেঞ্চের নিচে পা রাখার একটা তক্তা ছিলো, ওটা ভেঙে গেছে। কিংবা কেউ ভেঙে ফেলেছে। গতদিন পর্যন্ত একদম ঠিকঠাক ছিলো বেঞ্চটা। মৌমিতা ভেজা মেঝেতে পা রাখলো। তার জানামতে, এমন কাজ করার মতো কোনো শত্রু তার নেই। ক্লাসে সে আর মনোযোগ দিতে পারলো না।
তামান্না অনুপস্থিত। বেঞ্চের ডানপাশটা ফাঁকাই পড়ে আছে। বামপাশে বসে থাকা মেয়েটা ক্লাস জুড়ে মূর্তির মতো হয়ে রইলো। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।

ক্লাস শেষ হওয়ার আর কিছুক্ষণ বাকি।
বাদল রাস্তার ওপাশের ঐ জানালাটার দিকে তাকায়। কপাট আধখোলা। জানালার পাশে বসে থাকা মেয়েটা খাতায় কিছু একটা লিখছে, বাম হাতে।

লেখা শেষ করে মৌমিতা খাতাটা জমা দিলো স্যারের টেবিলে। বুঝতে পারলো, রাস্তার ঐপাশ থেকে একজন তার দিকে তাকিয়ে আছে।

বাদল দেখে, মেয়েটা পিছিয়ে বসেছে। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না, দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে!

ছুটির পর মৌমিতা সাধারণত দেরিতে বের হয়, সবাই চলে যাওয়ার পর। আজ সে তাড়াহুড়ো করে আগেই বেরিয়ে পড়লো। ভিড়ের মাঝে নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করলো। বাদলও আজ রাস্তা পার হতে দেরি করলো না। তাদের চোখাচোখি হয়। ছেলেটার মুখে এখন হাসি নেই, চোখদুটোতে কোনো ভাষাও নেই। তবু মেয়েটা হুট করে আতঙ্ক বোধ করে। আজও বাদল দ্রুতগতিতে পাশ কাটিয়ে যায়। পাশ কাটানো হয়তো তার উদ্দেশ্য ছিলো না। মৌমিতা সঠিক সময়ে সরে না গেলে ধাক্কা লাগতো ছেলেটার সাথে।

কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায় মৌমিতা। রোদ উঠেছে। আগের দিনের মতো পাতা থেকে পানি ঝরছে না। তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। বয়সে ছোট একটা ছেলের উদ্ভট আচরণে সে ভীত হবে—এমনটা কল্পনাতেও আসেনি। ছেলেটার লক্ষ্য এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু সামান্য একটা আসনের জন্য সে এমন করছে না–এ ব্যাপারে মৌমিতা নিশ্চিত। আর কেবল মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কেউ এতো দূরে যায়, এতো জেদ দেখায়? কী চায় ছেলেটা?

শেষ বেঞ্চের এক কোণে ব্যাগটা রাখলো রাশেদ। বাদল তার পাশে এসে বসে, জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেয়। রাশেদ নীরবে তার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।
নীল ডায়েরিটা পাওয়ার পর থেকে বাদল কেমন যেন হয়ে গেছে। ইদানিং তাকে আরও অদ্ভুত লাগছে। বাদলকে রাশেদ যতোটুকু চেনে, একটা মানুষের গতিবিধি বোঝার জন্য ততোটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু এই ছেলেটার কাজকর্ম কখনোই তার বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয় না। অবশ্য তার বৈশিষ্ট্যও এমনই। একগুঁয়ে, জেদি, আর কখনো কখনো হয়তো আরও ভয়ঙ্কর কিছু। তাকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে, ভদ্রতা বজায় রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাদল ক'দিন ভালো হয়ে থাকতে পারে? তাছাড়া প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য তো আমজাদ ভাই রয়েছেই।
আপাতত বাদলের কাজকর্ম শিকারীর মতো মনে হচ্ছে। আর সে কোনো শিকারের সন্ধান পেয়েছে বলেই রাশেদের বিশ্বাস! ডায়েরির মেয়েটা তার নাগালের বাইরে। তার প্রতি বাদলের অনুভূতি কেমন—এটা রাশেদ জানে না। ডায়েরির মালিককে খুঁজে পেলে সে ঝামেলা করতো নিশ্চিত, হয়তো মেয়েটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও করতো, সুযোগ নিতো। এর থেকে ভালো কিছু বাদলের থেকে আশা করা উচিত নয়!

ইদানিং বাদল ডায়েরি নিয়ে তেমন ব্যস্ত থাকছে না। নতুন কিছু পেয়ে গেছে সম্ভবত, কিংবা নতুন কাউকে। রাশেদের এখানে কিছুই করার নেই। সে শুধু এতোটুকুই চাইতে পারে, যার জীবনে ঝড় আসতে চলেছে, সে যেন একটু মজবুত হয়। তীব্র ঝড়ো হাওয়াতেও টিকে থাকার ক্ষমতা যেন থাকে তার।

—————

মৌমিতা টিউশন ক্লাস থেকে ফিরেই শুয়ে পড়েছে। মাথাটা নাকি খুব ব্যথা করছে। রাবেয়া শরবত বানিয়ে এনেছেন। যে গরম পড়েছে! মেয়েদুটো সারাদিন ছোটাছুটি করে। শরীরে পানিশূন্যতা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় ডাকলেন রাবেয়া, “মৌ?”

মৌমিতা ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়, “হুম।”

“শরবত খাও তো দেখি। কতো করে বলি, একটু বেশি করে খাওয়া-দাওয়া করো। এতোটুকু খেয়ে কি চলা যায়? পানিটাও খাও না ঠিকমতো। শরীর তো খারাপ হবেই।”

মৌমিতা উঠে বসলো, শরবত এক চুমুক খেয়ে চুপ করে বসে রইলো। মেয়ের মলিন মুখটার দিকে রাবেয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আজকে ক্লাসে কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”

মৌমিতা একটু অপ্রস্তুত হয়, ডানে বামে মাথা দোলায়।

“খেয়ে একটু শুয়ে থাকো। শরীরটা কি বেশি খারাপ লাগছে মা?”

আবার মাথা নেড়ে মৌমিতা শরবতের গ্লাস ফেরত দেয়। তারপর শুয়ে পড়ে। একটু পরেই মাগরিবের আজান দিবে। তবুও চোখ বন্ধ করে সে। মাথাটা ঢিপঢিপ করছে। অসহ্য একটা ব্যথা। মৌমিতার যখন জ্বর আসে, তখন মাথায় এমন যন্ত্রণা হয়, উঠে বসলে মাথা ঘোরে। মেঝেতে পা ফেললে সরাসরি মাথায় গিয়ে লাগে। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরখ করার চেষ্টা করলো। জ্বর এসেছে কিনা, বোঝা গেলো না। তবে মৌমিতা সিদ্ধান্ত নিলো, আগামীকাল সে কলেজে যাবে না। ভীষণ ক্লান্তি কাজ করছে। শারীরিক নয়, মানসিক ক্লান্তি। তার শান্তশিষ্ট নির্ভেজাল জীবনে হঠাৎ করে একটা ঝামেলা এসেছে। সেটাকে সামাল দেয়ার মতো অবস্থা তার নেই।
মাথাটা হঠাৎ ফাঁকা মনে হলো তার। পর মুহূর্তেই নিজেকে ধিক্কার জানায় মৌমিতা। জীবনে সে এর থেকেও বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এসব সামান্য অসুবিধাকে এতো গুরুতর ভাবলে চলবে না। অন্তত একটা জুনিয়র ছেলেকে নিয়ে আতঙ্কে থাকাটা বেশ লজ্জাজনক।

মৌমিতা ধীরে ধীরে উঠে বসলো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।

আপার প্রতি মার্জিয়া খুবই বিরক্ত। প্রতিদিন তার আপাই মশারি টাঙায়। আজ সে একটা কাজও করেনি। তাতে সমস্যা নেই। একদিন নাহয় মার্জিয়া লাগিয়ে নিলো মশারি। কিন্তু তার বোন আগেই শুয়ে পড়েছে। বিছানা ঝাড়াও সম্ভব হচ্ছে না।
সন্ধ্যার দিকে আপার মাথাব্যথা ছিলো, রাবেয়া তাকে শুয়ে থাকতে বলেছিলেন। তবু রাতে মৌমিতা অনেক কাজ করেছে। কেবল মশারি দেয়ার বেলায় তার যতো অলসতা।
মার্জিয়া টের পেলো, তার যুক্তি ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। আপা আজকে একটা কাজও করেনি—এটা মিথ্যে। আসল কথা হলো, আপা সবচেয়ে কঠিন কাজটা তার জন্য ফেলে রেখেছে। বিছানা ঝাড়ু দেয়া আর মশারি টাঙানোর মতো জঘন্য কাজ তৃতীয়টি নেই। মার্জিয়া কিছুই করলো না। অপরিষ্কার বিছানায় আপার পাশে শুয়ে পড়লো সে।

“আপা?”

“কী?”

“আজকে... ভাবছি, মশারি দেবো না। কেমন জানি দমবন্ধ লাগে।”

“আচ্ছা।”

"কিন্তু অনেক মশা। সব রক্ত আজকেই শেষ করে ফেলবে। মশারি না দিলে সকালে উঠে দেখবা, চেহারার নকশাই পাল্টে গেছে।”

“তাহলে দে।”

“না থাক। একদিন না দিলে কী এমন হবে?”

মৌমিতা নিশ্চুপ, চোখদুটো বন্ধ। মার্জিয়া তার দিকে কাত হয়, মাথাটা একটু উঁচু করে গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, “আপা, এখনও কি মাথা ব্যথা করছে?”

“হুম।”

“মাথা টিপে দেবো?”

“উঁহু।”

মার্জিয়া বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর বালিশে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। নখ কামড়াতে শুরু করে।
মশারি না দিলে যদি আপাকে মশা কামড়ায়? তারপর যদি ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া হয়? তার একমাত্র আপার শরীরটা এমনিতেও ভালো না, আরও বিপদ ডেকে আনার কী দরকার?
মার্জিয়া উঠে বসলো। একদিন মশারি টাঙালে নিশ্চয়ই তার হাত খসে পড়বে না!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp