সকাল আটটা বাজে। সুস্মিতা আর সৌম্য এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। মৌমিতা ওদেরকে ঘুম থেকে তোলেননি। কারণ, আজ থেকে ছুটি শুরু, একটু বিশ্রামের দরকার ছিলো ওদের। দ্বিতীয় কারণটা হলো, মৌমিতার মনটা ভালো নেই। আজকের তারিখ দেখার পর থেকেই তিনি মনমরা হয়ে আছেন।
খাওয়ার ঘরের বড় জানালার সামনে মৌমিতা দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় নানান চিন্তা। বাচ্চাদুটোর ঈদের কেনাকাটা এখনও হয়নি। বাইরে যেতেও ইচ্ছা করছে না তার। সুজয়ের সাথে ওদেরকে মার্কেটে পাঠাবেন কিনা, সেটাই ভাবছেন। কাল থেকে লোকটার সাথে সেভাবে কথা হয়নি। স্ত্রীর মন মেজাজ বুঝেই কথা বলেন তিনি। কিন্তু তার এই অতিরিক্ত সতর্কতা স্ত্রীর পছন্দ কিনা–সেটার ব্যাপারে হয়তো ভেবে দেখেন না।
পায়ের শব্দ শুনে মৌমিতা ঘুরে তাকান। সুজয়কে বের হতে দেখেই বলে ওঠেন, “কোথায় যাও?”
সুজয় দরজার সামনে দাঁড়ালেন, ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে জুতো রাখার র্যাক খুলতে খুলতে বললেন, “হসপিটালে। একজন ইমার্জেন্সি পেশেন্টকে নাকি ওটিতে নিবে—”
“কেন? শওকত ভাই নেই?”
“ছুটি নিয়ে চলে গেছে।”
মৌমিতা এগিয়ে আসেন, একটু রাগ দেখিয়ে বলেন, “হ্যাঁ, সবাই তো ছুটি নিবেই। দেখা যাবে, তুমি ছাড়া সবাই ছুটি নিয়ে চলে গেছে।”
সুজয় কিছু বললেন না। তিনি দরজার ছিটকিনি খুলতেই মৌমিতা ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন, “ইফতার কি আজকেও বাইরে করবা?”
“ঠিক নাই।”
“কখন আসবা?”
সুজয় কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়ালেন, আঙুল দিয়ে একগোছা চুল মৌমিতার কানের পেছনে গুঁজে দিলেন, “যখনই ডাকবা, চলে আসবো।”
তিনি আর দেরি করলেন না, হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। মৌমিতা তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, যতোক্ষণ না তিনি দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। এরপর ছোট একটা শ্বাস ফেলে মৌমিতা দরজা বন্ধ করলেন।
জানালার ওপাশ থেকে পাখির কিচির মিচির শব্দ আসছে। এই ব্যস্ত শহরে রোজ রোজ এই শব্দ শোনা যায় না। সুস্মিতার জানালার অপর পাশে অবশ্য একটা প্রকাণ্ড আমগাছ রয়েছে। পাখিগুলো বোধহয় ওখানেই বসে আছে। সুস্মিতা চোখ বন্ধ করেই দৃশ্যটা কল্পনা করলো—গাছের ডালে বসে একজোড়া পাখি ডাকাডাকি করছে, আর খোলা জানালা থেকে দেখা যাচ্ছে শহরের এই দুর্লভ মুহূর্তটা। সুস্মিতা লাফিয়ে উঠে বসলো। জানালা কি খোলা? হাত দিয়ে সাদা পর্দাটা একটু সরাতেই সে নিশ্চিত হলো, জানালা খোলা। রাতে সে খেয়াল করেনি নিশ্চয়ই।
বাইরে ভালোভাবে তাকাতেই দেখা যায়, গাছের ডালে তিনটা পাখি বসে আছে, একজোড়া নয়। এখন আর তাদের গান শোনা যাচ্ছে না, রাস্তা থেকে হর্নের আওয়াজ আসছে। সুস্মিতা জানালার কাচটা পুরোপুরি সরিয়ে ফেললো। অনেক বেলা হয়েছে, সূর্যটা প্রায় মাথার উপরে চলে এসেছে। কিছুক্ষণ আনমনে বসে থাকার পর সে খাট থেকে নামলো। মেয়েটা ইদানিং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি উদাসীন হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে এখন। যা হওয়ার, হয়ে গেছে।
মৌমিতা বন্ধ দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, “সুস্মিতা? নয়টা বেজে গেছে। ওঠো এখন। ছুটি আরও পড়ে আছে, একমাসের ঘুম কি একদিনেই শেষ করে ফেলবে নাকি তুমি?”
সুস্মিতা খুবই বিরক্ত হলো। সে তো উঠতেই যাচ্ছিলো, আম্মু কেন একেবারে এই সময়েই এসে উঠতে বলছেন? ঘুম থেকে সে নিজেই উঠেছে, কিন্তু কৃতিত্বটা চলে যাচ্ছে আম্মুর কাছে!
—————
অপারেশন থিয়েটার থেকে সুজয় যখন বের হলেন, তখন দুপুর দুইটা বাজে। ব্যক্তিগত চেম্বারে ঢুকে এসি চালু করলেন। আজকের গরমটা অস্বস্তিকর। আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে, বৃষ্টি নামলে মন্দ হয় না। সুজয় ভাবছেন, ছুটিটা আজই নিবেন। ঈদের আর দেরি নেই। চেয়ারে বসেই ক্যালেন্ডারে চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারিখটা দেখে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ালেন। দেয়ালের কাছাকাছি এসে আরেকটু মনোযোগ দিয়ে তাকালেন ক্যালেন্ডারের দিকে। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেললেন তিনি, তবু নিঃশ্বাসটা যেন গলাতেই দলা পাকিয়ে আটকে রইলো।
আজকের দিনটা বিশেষ। এবং একইসাথে শুভ আর অশুভ একটা দিন।
১৯৯৯ সালের এই দিনেও আজকের মতোন ভ্যাপসা গরম ছিলো। এই সময়ে সুজয় হয়তো সার্জন উম্মে কুলসুমের চেম্বারে বসে ছিলো। উম্মে কুলসুম বলেছিলেন, “আপনি তো এখন আজিম ভাইয়ের আন্ডারে আছেন, না?”
সুজয় মাথা নেড়ে বলে, “জ্বী।”
উম্মে কুলসুম সামনে রাখা ফাইলটার দিকে এক ঝলক তাকালেন, “দেখুন, আপনার ওয়াইফ কিন্তু আগে থেকেই ট্রমাটাইজড ছিলেন কোনো কারণে। উনি শারীরিক আর মানসিকভাবে খুবই দুর্বল। আমরা... অনেক চেষ্টা করেছি। যা কিছু করতে পারতাম, সবই ট্রাই করেছি। কিন্তু বাচ্চাটাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
সুজয় মাথা নিচু করে বসে থাকে। ভদ্রমহিলা তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, “আপনার ওয়াইফ কি বাচ্চাটাকে দেখেছেন?”
“জ্বী না।”
“না দেখানোই ভালো। উনি যদি দেখতেও চান, তবু চেষ্টা করবেন যেন না দেখানো হয়। এমনিতেও উনার মেন্টাল কন্ডিশন খুবই খারাপ। এতো সুন্দর বাচ্চাটা মারা গেছে, এটা জেনে উনার অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। আর শুনুন, চিন্তার কিছু নেই। আশা করছি উনি তাড়াতাড়ি রিকভার করবেন। আমি নার্সকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে এসেছি। জিজ্ঞেস করলেই পেয়ে যাবেন।”
“আচ্ছা, আসি তাহলে।”
সুজয় হাসপাতালের করিডোর ধরে হাঁটতে থাকে। সবকিছু দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু মনে হয় না তার কাছে। বেঞ্চে বসে থাকা অপরিচিত মানুষগুলোর আহাজারি, রোগী নিয়ে সেবিকাদের ছোটাছুটি, ডাক্তারদের কথাবার্তা, আশেপাশের কোলাহল, সবকিছুই কেমন যেন অস্পষ্ট শোনায়। কেবিনের সামনে পৌঁছেও সুজয় অকারণে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ভেতরে ঢুকতেই নার্স এসে প্রেসক্রিপশনের ফাইল এগিয়ে দেয়, “স্যার, এই যে এই মেডিসিন গুলো লাগবে।”
সুজয় ফাইলটা হাতে নেয়। নার্স বলে, “পেশেন্ট কিছু খেতে চাচ্ছে না স্যার। অনেক চেষ্টা করলাম, কোনো রেসপন্স করছে না।”
“ওহ।”
বেডে আধশোয়া হয়ে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকায় সুজয়। তার চোখ দুটো বন্ধ, ঘুমাচ্ছে কিনা, বোধগম্য হলো না। সুজয় কাছে গিয়ে বসলো। স্ত্রীর ডান হাত নিজের দুই হাতের মাঝে রেখে সে চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু স্বরে ডেকে ওঠে, “মৌ?”
মৌমিতা ধীরে ধীরে চোখ খুললো। সে একটু ভালো করে উঠে বসার চেষ্টা করতেই সুজয় বাধা দেয়, “থাক, থাক। শুয়ে থাকো।”
মৌমিতা বিড়বিড় করে বলে, “আব্বা এসেছিলেন... স্বপ্নে।”
সুজয়ের ভেতরটা যেন ছ্যাঁৎ করে ওঠে। সে দু'হাতের মাঝে থাকা মৌমিতার হাতখানি আরেকটু শক্ত করে ধরে। কথায় অপ্রয়োজনীয় জোর দিয়ে বলে, “শরীর দুর্বল থাকলে মানুষ এমন স্বপ্ন দেখে মাঝে মধ্যে। এসবের কোনো অর্থ থাকে না।”
মৌমিতার মুখ দেখে মনে হয় না, সে কথাটাকে তেমন গুরুত্ব দিয়েছে। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সুজয় তার হাতটা ছেড়ে দিয়ে উঠতে গেলেই সে আবার ঘুরে তাকায়, খুব ক্ষীণ স্বরে কিছু বলে। আশেপাশে আরেকটু কোলাহল থাকলে কথাটা সুজয়ের কান অবধি পৌঁছাতোই না।
“আ... আমাদের বাবুটা? মারা গেছে?”
সুজয় এমন কোনো প্রশ্ন আশা করেনি হয়তো। মৌমিতা খুব ভালো করেই জানতো, সে মৃত পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে। তবু ব্যাপারটা পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। আরেকবার পরখ করে দেখতে চাইলো, সবটা কি আসলেই বাস্তব? নাকি স্বপ্ন?
সুজয় কোনো উত্তর দেয় না। অনেক চেষ্টা করেও, সামান্য 'হ্যাঁ' শব্দটা উচ্চারণ করতেই যেন তার গলা ফেটে যাচ্ছিলো সেদিন। মৌমিতা সত্যটা জানে, নতুন করে বলার কিছুই নেই।
কিন্তু আরেকটা সত্য সে কখনোই জানতে পারেনি। মৃত ছেলেটা দেখতে হুবহু মৌমিতার আব্বার মতো হয়েছিলো।
এখন পর্যন্ত এই কথাটা তাকে কেউ বলেনি। সুজয়ও কখনও তার স্ত্রীকে জানাননি, তাদের প্রথম সন্তান একেবারে মারুফ খন্দকারের চেহারাটাই পেয়েছিলো। মৌমিতার ভাগ্য ঐ মুখখানি দেখার বেলায় সহায় হয়নি আর কখনোই।
—————
বিদ্যুৎ চলে গেছে কয়েক মিনিট হলো। সৌম্য এখনও গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সুস্মিতা ভাইয়ের এই অকারণ আক্ষেপে ভীষণ অসন্তুষ্ট। গতদিনের ক্রিকেট ম্যাচ পুনঃপ্রচার হচ্ছে আজকে। সৌম্য গতকাল ম্যাচটা দেখেছে, সেটা আজ আবার দেখছিলো। তখনই কারেন্ট গেছে। সুস্মিতা এতে খুশিই হয়েছে। এই বিরক্তিকর খেলা তার পক্ষে দুই মিনিট দেখাও সম্ভব না। ভাগ্যের জোরে এমন একটা ছোট ভাই জুটেছে কপালে; সে যতোক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকে, ব্যাট-বল ছাড়া থাকতে পারে না। আর যখন বাড়িতে থাকে, টিভিতেও ক্রিকেট দেখে, গল্প করতে গেলেও বারবার ক্রিকেটের প্রসঙ্গ আনে।
কয়েক মাস আগে বেশ কিছু পোস্টার এনে দেয়ালে লাগিয়েছিলো সৌম্য। সেদিন আম্মুর কাছে ভালোই বকা খেয়েছিলো। সুস্মিতার অবশ্য খারাপই লেগেছিলো ঐদিন। একটা সামান্য বিষয় নিয়ে আম্মু এতো বকাবকি না করলেই পারতেন।
সবসময় রেগে থাকার যদি কোনো প্রতিযোগিতা হতো, তাহলে মৌমিতা নিজের ঘরে আর থাকার জায়গা পেতেন না। ঘরটা পুরস্কার দিয়েই ভরে উঠতো।
সোফার পাশের জানালাটা খোলা। ঠাণ্ডা বাতাস আসছে বাহির থেকে। সুস্মিতা সেদিকে সরে বসলো। অন্ধকার হয়ে এসেছে। মাগরিবের আজান দিবে এক ঘণ্টা পর। মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। কলিংবেলের সাথে মেঘের ঐ গুড়গুড় আওয়াজটা ভারী অদ্ভুত শোনালো। বেলটা একটু দেরিতে বেজে উঠলে ভালো একটা সুর তৈরি হতো।
রান্নাঘর থেকে মৌমিতা চেঁচিয়ে উঠলেন, “সুস্মিতা? বয়স কি দিনে দিনে কমছে নাকি তোমার? কলিংবেলটা বেজেই যাচ্ছে, উনি হা করে বসে আছেন। এই মেয়েটা যে কী ভাবে সারাদিন, স্কুলে গিয়ে আদৌ পড়াশোনা করে কিনা, দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে...”
সুস্মিতা উঠে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে পা ফেলে দরজার কাছে গেলো। সুজয় এসেছেন।
সৌম্য দৌড়ে রান্নাঘরে গেলো, “আম্মু? আজকে আব্বু তাড়াতাড়ি এসেছে, একেবারে ইফতারের আগেই।”
ক্রিকেট ম্যাচটা দেখতে না পারার শোক কেটে গেছে সৌম্যর। সে খুব উৎসাহের সাথে পানিতে চিনি মেশাচ্ছে, শরবত বানাবে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঘর মোটামুটি অন্ধকার। ডাইনিং টেবিলে একটা চার্জার লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। সুজয় পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়েছেন।
“সুস্মিতা?” তিনি মেয়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন, “অন্ধকারে কী করো মা? বাইরে আসো।”
“জ্বী আব্বু।”
সুস্মিতা উঠে দাঁড়ানোর ভান করে এক পা মেঝেতে রাখে। সুজয় চলে গেলে, সে আবার বিছানায় পা তুলে হেলান দিয়ে বসে। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে অকারণে পাতা ওল্টাতে থাকে। তার জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়েছে গতকাল। বিষয়টা এখনও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
ইফতারের পর সুজয় মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সৌম্য কিছুতেই যেতে চাইলো না। সে পত্রিকা থেকে কয়েকটা ছবি কেটে রেখেছে, তার পছন্দের কয়েকজন ক্রিকেটারের ছবি। সেগুলোই হয়তো এখন লাগিয়ে রাখবে কোথাও। তার একটা বড় আকারের ডায়েরি আছে, সেখানেই ছবিগুলো সাজিয়ে রাখার পরিকল্পনা করেছে সে। ডায়েরিতে ছবি লাগানোর বুদ্ধিটা তাকে মৌমিতাই দিয়েছেন, দেয়াল রক্ষা করতে। সৌভাগ্যক্রমে, বুদ্ধিটা সৌম্যর বেশ পছন্দ হয়েছে।
আবহাওয়া সুন্দর। ইফতারের সময় বৃষ্টি হওয়ায়, পরিবেশটা এখন বেশ আরামদায়ক। মৌমিতা মেয়ের ঘরে ঢুকলেন। জানালার কাচ একপাশে সরানো। সামনের বহুতল ভবনটা দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে। রাস্তা থেকে হলুদাভ একটা আলো আসছে। ঘরের দেয়ালে আমগাছের ছায়া দেখা যাচ্ছে। বাতাসে পাতাগুলো দোল খেলে ছায়াটাও নড়াচড়া করতে থাকে।
মৌমিতা সুইচে চাপ দিলেন, বৈদ্যুতিক বাতির কর্কশ আলোয় অপরূপ দৃশ্যখানি চাপা পড়ে গেলো। জানালা বন্ধ করে তিনি বিছানায় বসলেন। বিছানা হাতড়ে বালিশের নিচ থেকে ধূসর মলাটের ডায়েরিটা বের করলেন। পৃষ্ঠাগুলোতে চোখ বুলাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর পেয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠাটা। ভ্রু কুঁচকে তা-ই পড়তে শুরু করলেন।
“এপ্রিল, ২০১৩:
আমার বারান্দায় এই মুহূর্তে একটা কালো ছাতা মেলে দিয়ে রাখা। আমার ছাতা নয়। আম্মুকে বলেছি, ছাতাটা দিয়েছে আমার বান্ধবী আদিবা। আজকে আমি স্কুলে ছাতা নিয়ে যাইনি। ছুটির সময় মুষলধারে বৃষ্টি। তখনই একজন মানুষ আমাকে ঐ ছাতাটা দিয়েছে। তার নাম অবশ্য আদিবা নয়। তার নাম হলো আদিব। আমি কিছুতেই নিতে চাইলাম না ছাতাটা। ছেলেটা জোর করে দিয়েছে। কাজটা ঠিক হলো কিনা, বুঝলাম না।”
মৌমিতা পাতা ওল্টাতে থাকেন। আদিবা নামের মেয়েটার কথা সুস্মিতা প্রায়ই বলতো। তিনি কখনও তেমন মনোযোগ বা গুরুত্ব দেননি। ডায়েরির লেখাগুলো পড়ে মৌমিতার মনে সেই পুরোনো কথা উঁকি দিতে থাকে। একটু গুরুত্ব দিলে হয়তো তিনি আগেই ব্যাপারটা বুঝে ফেলতেন। মেয়েটাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। মৌমিতা একটা লম্বা শ্বাস নিলেন, নিজেকে বোঝালেন, এখনও সময় আছে।
“জানুয়ারি, ২০১৪:
স্কুলে আজকে নতুন কক্ষে দ্বিতীয় ক্লাস ছিলো। আমাদের ক্লাসরুমটা থেকে আদিবদের ক্লাসরুম দেখা যায়। ছেলেটা অবশ্য তাকায়ই না আমার দিকে। ছাতাটা সেদিন ফেরত না দিলেই ভালো হতো। ঐ বাহানায় কথা তো হতো! অবশ্য কথা বলার বেলায় আমি আনাড়ি। ভাবছি, আদিবকে একটা চিঠি লিখবো, ওকে বলবো, যে ছাতাটা আমি ফেরত দিয়েছি, সেটা ওর ছাতা নয়। এতোটুকুই লিখবো।
ছি! আমি কেন আদিবকে চিঠি লিখতে যাবো? দাঁত উঁচু, ইঁদুর একটা! আমার চিঠি পাওয়ার যোগ্যতা আছে নাকি ওর?”
“ফেব্রুয়ারি, ২০১৪:
আদিবসহ কয়েকটা ছেলে প্রতিদিন আমাদের ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাপারটা ভীষণ বিরক্তিকর। তবে এর চেয়েও বেশি বিরক্তির ব্যাপার হলো– সুরভি মনে করে, আদিব ওকে পছন্দ করে। নাহ। এটা বিরক্তির ব্যাপার না, হাস্যকর ব্যাপার। বেচারির ধারণা যেদিন ভুল প্রমাণিত হবে, কী কষ্টটাই না পাবে!”
“সেপ্টেম্বর, ২০১৪:
ভীষণ লজ্জাজনক একটা ব্যাপার আমি উপলব্ধি করলাম। ঐ দাঁত উঁচু ছেলেটাকে আমার ভালো লাগে! ইদানিং আমি ঐ ক্লাসটার দিকেই তাকিয়ে থাকি। চোখ যে কখন ওদিকে চলে যায়, টেরই পাই না। ঐ ইঁদুরটার মুখ একদিন না দেখলে, আমার সেই দিনটা পুরোই মাটি হয়ে যায়। নিজের এই অধঃপতন আমি মানতে পারছি না।”
“নভেম্বর, ২০১৪:
আজকে অষ্টম শ্রেণির শেষ ক্লাস ছিলো। আদিব নাকি আর এই স্কুলে পড়বে না। জেএসসি পরীক্ষার পরেই যশোরে চলে যাবে, ওর বাবার বদলি হয়েছে। ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, আর দেখা হবে না। আজ সারাদিন এটা নিয়েই মন খারাপ করে বসে ছিলাম। আম্মু খুব রাগ করেছে। আমারও রাগ হচ্ছে। আদিবের জন্য কেন আমি মন খারাপ করবো? তার যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই যাক। আমার কিছুতেই কিছু যায় আসে না।”
“জানুয়ারি, ২০১৫:
আদিব কোথাও যায়নি, এখানেই আছে। তবু ভরসা পাচ্ছি না। হঠাৎ যদি দেখি, চলে গেছে? ছেলেটা শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না আমাকে। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না।”
“জুলাই, ২০১৫:
আমি খুব বড়সড় একটা অকাজ করতে যাচ্ছি। একটা চিঠি লিখেছি, আদিবের জন্য! কাল ঈদের ছুটি দিবে। কালকেই কোনোমতে চিঠিটা ওর হাতে পৌঁছে দেবো। হায় খোদা! আমি সত্যিই বিরাট একটা ঝামেলার কাজ করতে যাচ্ছি। প্রস্তাব কি কখনো মেয়েরা দেয়? না তো। কিন্তু আদিব যদি আগ বাড়িয়ে কিছু না বলে, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ আমাকেই নিতে হবে। আমি জানি না, কী করতে যাচ্ছি। শুধু এতোটুকুই জানি যে কাজটা বাড়াবাড়ি হলেও জরুরি। ছেলেটার জানা উচিত, একটা মেয়ের মাথায় উঠে সারাটা দিন লাফালাফি করা ঠিক না। হাজার হলেও, একটাই তো মাথা আমার। সেই মাথা যদি খারাপ হয়ে যায়, আদিব কি ক্ষতিপূরণ দিবে? আর আমার মনও তো একটাই। তার জানা উচিত, আমার একটা মাত্র মন আমি তাকেই সমর্পণ করেছি। ইচ্ছা করে করিনি যদিও!”
“জুলাই, ২০১৫:
বুঝতে পারছি না কী লিখবো। নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। কিন্তু আমি লিখবো। এই ডায়েরিই আমার অনুভূতির সাক্ষী, অধঃপতনের সাক্ষী, আর আজ থেকে এটা আমার অনুশোচনার সাক্ষী। জানি না এই ব্যাপারটা আমি আগে কেন খেয়াল করলাম না।
আদিবের ক্লাসের দেয়ালে, এককোণে স্পষ্ট করে আমাদের দুইজনের নাম লেখা ছিলো। জানালার পাশেই। ওদিক দিয়ে কতো যাওয়া আসা করলাম, খেয়াল করলাম না কখনও। আজ খেয়াল করলাম, তবে নামদুটো অক্ষত পেলাম না। আমার নামের উপরে আদিবের নামটা লেখা ছিলো। আজ দেখলাম, ওর নামটা কেটে দেয়া, পাশে লেখা—ইঁদুর!
সুরভির সামনে আমি ওকে ইঁদুর বলে তাচ্ছিল্য করেছিলাম। ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি, কথাটা ওর কান অবধি চলে গেছে।
ভাবতে অদ্ভুত লাগছে, আমিও একসময় আদিবের মাথায় ঘুরঘুর করতাম, ওর মনটাও দখল করেছিলাম হয়তো। কিন্তু নিজের অজান্তেই একটা সীমানা টেনে দিলাম। তার চেয়েও বড় কথা, আদিব মিথ্যে জানলো। আমিও সত্যিটা মুছে ফেললাম। চিঠিটা ছিঁড়ে...”
মৌমিতা আর পড়তে পারলেন না। মাথাটা বেশ ঝিমঝিম করছে। তিনি চোখদুটো বন্ধ করলেন। এভাবে কতোক্ষণ বসে রইলেন, ঠাওর করতে পারলেন না। কলিংবেলের শব্দে তিনি সচেতন হলেন, মেরুদণ্ড সোজা করে বসলেন। ডায়েরিটা হাতেই রয়েছে এখনও। তিনি বুঝতে পারলেন না, এই মুহূর্তে তার ঠিক কী করা উচিত।
·
·
·
চলবে……………………………………………………