পবনপত্র - পর্ব ০৬ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          রেলস্টেশনের পাশে একটা চায়ের দোকান আছে। দোকানটা এখন বন্ধ। তবু বাদল সেখানেই সাইকেল থামায়। ভোরবেলা এদিকে ভিড় থাকে না। আজকে পুরো এলাকাই যেন ফাঁকা। সূর্য উঠেছে কেবলই। নরম একটা আলো চারিদিকে। স্টেশনের ভেতরে ঢুকলো ছেলেটা। প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকে সূর্যের আলো পড়েছে। সে ঐ আলোর উপর পা রাখলো। আলোটা পড়লো তার জুতোর ওপর। বাদল একটা ছোট শ্বাস ফেলে হাঁটতে শুরু করলো। স্টেশনের শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়ালো সে, বড় একটা শ্বাস টেনে নিলো। তারপর কয়েক পা পিছিয়ে পেছনের বেঞ্চটাতে বসে পড়লো।

প্রায় দুই মাস হলো সে নিজ এলাকা ছেড়ে এখানে এসেছে। বাড়িতে ফেরার ইচ্ছে নেই তেমন। তবে নাটোরের মূল শহরটা তার পছন্দ না। কিন্তু এই স্টেশনটা তার ভালো লাগে, যখন এখানে কেউ থাকে না। অন্যকারও উপস্থিতি টের পেলে তার এই জায়গাটাও আর ভালো লাগে না। এর পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা—তা বাদল নিজেও জানে না। জানতে চায়ও না। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে দিব্যি।

আমজাদ অস্থির হয়ে পায়চারি করছে ঘরের ভেতর। তাদেরকে অফিসে ডাকা হয়েছিলো সকাল ৮টায়। এখন বাজে সাড়ে ৮টা। বাদল কোথায় গেছে, ওরা দু'জন জানে না। রাশেদ হাঁটতে থাকা আমজাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা তার কাছে তেমন গুরুতর মনে হচ্ছে না। আমজাদ তার দিকে তাকায়, “চল, ব্যাটাকে খুঁজতে হবে। হারিয়ে-টারিয়ে গেলোই নাকি! দরখাস্ত পরে দেবো।”

রাশেদ উঠে দাঁড়ালো। বাদলকে খুঁজতে যাওয়ার প্রস্তাবটা তার ভালো লাগেনি। সময় হলে ছেলেটা নিজেই ফিরে আসবে। তবু ঘরে বসে থাকার চেয়ে বাইরে বের হওয়াটা লাভজনক। হোস্টেল পেরিয়ে কলেজের মূল ফটকের কাছে এসে দাঁড়ালো ওরা। রাশেদ বলে উঠলো, “ভাই বাদ দেন। এমনি এমনি এতো কষ্ট করার দরকার নাই। বাদল ছোট বাচ্চা না। চলে আসবে।”

“কিন্তু আমার চেয়ে তো ছোট। একটা দায়িত্ব আছে না আমার?”

“শোনেন। আপনি বাদলকে চেনেন মাত্র দেড় মাস হলো। আমি সেই ক্লাস সেভেন থেকে চিনি। বাদল মাঝে মাঝেই এমন করে। কোথায় যে যায়, কাউকে বলে যায় না। কাউকে সাথেও নিয়ে যায় না।”

“ওর বাপ-মা কিছু বলে না?”

রাশেদ উত্তর দিলো না। আঙুল উঁচিয়ে বললো, “পেছনের গলিতে যাই, চলেন।”

কলেজের পেছনের গলিটা সবসময় কুকুরদের দখলে থাকে। রাশেদ যদি ঠিক ভেবে থাকে, বাদল তাহলে ওখানেই আছে। এবং রাশেদের ধারণাই ঠিক! দোকান থেকে কেনা রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে কুকুরগুলোকে খাওয়াচ্ছে বাদল। আমজাদ দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে গেলো।

“শালা! আমরা চিন্তায় মরে যাচ্ছি আর তুই এখানে কুত্তাকে—”

উচ্চশব্দ শুনেই কুকুরগুলো ঘুরে ঘেউ ঘেউ শুরু করলো। আমজাদ কয়েক পা পিছিয়ে যায়, “এদের এতো গায়ে লাগলো ক্যান?”

বাদল উঠে দাঁড়ায়, “আপনার না প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে যাওয়ার কথা?”

“তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতেই তো যাওয়া হলো না আর।”

“কেন? অভিযোগ তো আপনার নামে ছিলো। আমি কেন যাবো?”

“আমি কি জানি তুই যাবি না? কিছু তো বলিস নাই ঠিকমতো। যাই হোক, চল এখন।”

মেয়েদের হলের সামনে একটা ফুলের বাগান আছে। সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় সুরাইয়া নামের মেয়েটা টিটকারি করে বলে উঠলো, “কলেজ থেকে বের করে দিলো নাকি?”

আমজাদ দুই পা পিছিয়ে আসে, “কাকে? তোমাকে?”

“হাহ! তোমার মগজ এতোই ছোট? সোজা কথা বোঝো না?” সুরাইয়া বাদলদের দিকে তাকালো, “এরা কি জুনিয়র নাকি? তোমার সাথে ঘুরছে যে? চেহারা দেখে তো নিষ্পাপ মনে হচ্ছে।”

“আমাকে কি পাপী মনে হয়?”

বাদল ঘুরে এসে আমজাদের পাশে দাঁড়ালো, “আপনার আর কাজ নাই আমজাদ ভাই? মেয়েদের সাথে তর্ক করতে যান—”

সুরাইয়া হেসে বললো, “যুক্তিতে না পারলে মানুষ ছেলে-মেয়ের কথা তোলে। যাই হোক, নাম কী তোমার?”

“নাম শুনে কী করবেন?” বাদল আমজাদকে ঠেলা দিয়ে বললো, “চলেন।”

রাশেদ আগে থেকেই এগিয়ে ছিলো। বাকি দুইজন তার কাছাকাছি আসতেই সে অভিযোগ জানালো, “যেচে মানুষের সাথে লাগতে যান। এই জন্যেই তো কমপ্লেইন আসে। দেখেন, ঐ মেয়ে আবার কমপ্লেইন দিবে। আর বাদল, তুই মাঝখানে যাস কেন?”

বাদল বিস্মিত হয়ে রাশেদের দিকে তাকায়, “মাঝখানে যাওয়া বলতে? আমি একটা শব্দ উচ্চারণ করলেও তোর সমস্যা?”

“বাদ দে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই—”

“তোর আদেশ নিষেধ আমাকে মেনে চলতে হবে কেন?”

“তুই সবসময় উল্টাপাল্টা বুঝিস। নিজে থেকে একটা কথা বানাস, তারপর সেটা দিয়েই বিচার করিস সবাইকে।”

রাশেদ হাঁটছিলো বাদলের সামনাসামনি। বাদল ধাক্কা দিয়ে তাকে দেয়ালের দিকে সরিয়ে দেয়, হনহন করে এগিয়ে যায়, “কথা না বলে এমন ভাব দেখায় যেন উনি সবজান্তা। আমাকে সহ্য না হলে যেখানে খুশি যাক। আমি কি নিষেধ করেছি?”

বাদল ঘরে ঢুকে গেলো। রাশেদ আমজাদের দিকে ঘুরে অসহায়ের মতো কৈফিয়ত দেয়, “দেখলেন? আমি কী বললাম, আর ও কী বুঝলো?”

আমজাদ তার কাঁধে হাত রাখলো, “তুই তো ওকে অনেক বছর ধরে চিনিস। জানিসই তো বাদল চুপচাপ থাকা মানুষদের পছন্দ করে না। দোয়া কর যেন এখন একটু সুমতি হয় বাদলের।”

আমজাদ চলে গেলেও রাশেদ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। সত্যিই কি এমন কোনো চমৎকার হতে পারে না, যেন বাদল বদলে যায়? রাশেদ দরজার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসে। বাদল কোনো পুরোনো আসবাব না যে চাইলেই পাল্টে ফেলা যাবে! মানুষ ততোক্ষণ বদলায় না, যতোক্ষণ না সে নিজের পরিবর্তন চায়। আর বাদল তা চাইবে কেন?

হোস্টেলের ভেতরে থাকতে ওদের হাঁসফাস লাগে। আমজাদ আর রাশেদের তবু তেমন অসুবিধা হয় না চার দেয়ালের এই পরিচিত গণ্ডিতে। তবে তৃতীয়জন এখানে স্থির হয়ে থাকতে পারে না, সারাক্ষণ ছটফট করে। সুযোগ পেলেই বাইরে চলে যায়। কথাটা বরং একটু উল্টো, সুযোগ না পেলেই ছেলেটা আরও ছটফটায়! কাউকে না জানিয়ে হুটহাট বেরিয়ে পড়ে। তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায় না তাকে, যতোক্ষণ না সে নিজে ধরা দেয়। অবশ্য কয়েকদিন হলো সে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে তেমন যাচ্ছে না। ব্যস্ত থাকার মতো একটা জিনিস পেয়ে গেছে সে।

ছুটির দিনে পুরোনো ভবনের নিচতলার সব কক্ষে তালা ঝোলে। ৩য় তলায় ল্যাব আছে, সেটাও বন্ধ থাকে। কেবল দোতলার লাইব্রেরিটা খোলা। বাদল ভেতরে ঢুকে আশেপাশে তাকালো। তেমন ভিড় নেই। কলেজ খোলা থাকলে মাঝে মাঝে খুব ভিড় হয়। তবে শেষ মাথায় জানালার পাশের ঐ আসনে কেউ বসে না। বাদল কোনো পয়সা খরচ না করেই আসনটা কিনে নিয়েছে যেন। সে যে খুব পড়ুয়া–এমনও নয়। ইদানিং সে একটা বিশেষ কারণে ঘন ঘন আসে লাইব্রেরিতে।

চেয়ারে বসে ব্যাগ থেকে নীল ডায়েরিটা বের করলো বাদল। অনেকদূর অবধি পড়ে ফেলেছে সে, অল্প কিছু পৃষ্ঠা বাকি আছে। ঘরে বসে পড়তেও সমস্যা নেই। তবে লাইব্রেরিতে আসার একটা উদ্দেশ্য আছে তার। ডায়েরির মালিক যদি এখানে আসে, হঠাৎ একদিন কি তাদের দেখা হতে পারে না?

—————

খন্দকার বস্ত্রবিতান।

ওসমান বসে বসে হাতপাখা ঘোরাচ্ছে, গরম কাটছে না তবু। মারুফ চোখে চশমা এঁটে মনোযোগ দিয়ে হিসাবের খাতা দেখছেন। ব্যবসার অবস্থা বেশ খারাপ। তাই বন্ধের দিনেও দোকান খুলে বসে আছেন। নতুন কাপড় কিনে দোকানে তুলতে হবে। সেটার জন্যেও টাকা লাগবে। পাশের দোকানের কর্মচারীটা খুবই বেয়াদব। ঝাড়ু দিলে সব আবর্জনা এনে মারুফের দোকানের সামনে জমা করে রাখে। মারুফ মনে মনে অনেকবার করে ভেবেছেন, একদিন সামনে পেলে ছেলেটাকে ভালোমতো ধমক দিবেন, আর মনিবকেও সতর্ক করে আসবেন। তবে এখনও তেমন কিছুই করতে পারেননি তিনি। কাউকে কিছু বলার ব্যাপারে খুবই জড়তা কাজ করে তার মধ্যে।

“চাচা?”

তিনি দোকানের প্রবেশপথের দিকে তাকালেন, দেখলেন, জুনায়েদ দাঁড়িয়ে আছে। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। সে ভ্রু কুঁচকে দোকানের সামনে জমে থাকা শুকনো পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মারুফ কেশে গলা পরিষ্কার করলেন, চোখ থেকে চশমা খুললেন, “হ্যাঁ, জুনায়েদ? কিছু বলবে নাকি?”

সে বিরক্ত হয়েই ভেতরে ঢুকলো, চড়া স্বরে বলে উঠলো, “দোকানের সামনে এতো ময়লা কেন চাচা? সব ঝাড়ু দিয়ে এদিকে কেন জমিয়ে রেখেছে? আপনি কিছু বলতে পারেন না?”

“আরে, সমস্যা নেই। ওসমান কিছুক্ষণ পরেই আবার দোকানটা পরিষ্কার করবে। তখন সব ময়লা একসাথে ফেলে আসবে।”

জুনায়েদকে দেখে মনে হলো না কথাটা শুনে সে আশ্বস্ত হয়েছে। সে টিফিন ক্যারিয়ারটা মারুফের সামনে টেবিলে রাখে, “চাচি খাবার পাঠিয়েছেন। দুপুরে নাকি বাড়ি যাবেন না আপনি।” দোকানের চারপাশে তাকিয়ে বলে, “ঝাঁটা কোথায় আছে?”

মারুফ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “আহা! তোমাকে ঐসব কাজ করতে হবে না তো—”

“কাজটা একটু এগিয়ে দিয়ে যাই।”

“না না, লাগবে না। শোনো, তোমার জন্য আরেকটা কাজ আছে।”

মারুফ পেছনে ঘুরলেন, তাক থেকে একটা কাপড়ের ব্যাগ বের করে জুনায়েদের হাতে দিলেন, “এটা মৌকে দিতে হবে।”

জুনায়েদ মাথা নাড়লো, “আচ্ছা।”

“দেখো তো, ডায়েরিটা কেমন লাগছে তোমার কাছে? ভালো হয়েছে না?”

ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে জুনায়েদ ডায়েরিটা বের করলো, একটা ভাঁজ করা কাগজ টুপ করে মেঝেতে পড়ে গেলো। মারুফ সেটা দেখিয়ে বললেন, “ওটাও দিও। ভেতরে রাখো।”

জুনায়েদ মেঝে থেকে ভাঁজ করা চিঠিটা ভুললো। ধূসর মলাটের ঐ ডায়েরিটার ভেতরে সে খুব সাবধানে রাখলো সেটা, “ডায়েরি তো ভালোই হয়েছে। কিন্তু আপনি এতো টাকা খরচ করতে যান কেন? দেশের অবস্থা তো দেখছেনই। ব্যবসায় লাভ না হলে পরে কিন্তু অসুবিধায় পড়বেন।”

মারুফ বিগলিত হাসলেন। তিনি চোখে চশমা পরে আবার হিসাবের খাতাটা খুললেন, “টাকা জমিয়েই বা লাভ কী? নিজের জন্যে কি আর ব্যবসা করি? আজ যে মানুষগুলো দুটো শখের আবদার করে আমার দিকে চেয়ে থাকে, তারা কাল বড় হয়ে যাবে। নিজের শখ নিজেই পূরণ করবে। এই দুইদিনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কৃপণতা দেখাই কী করে?”

রাবেয়ার মেজাজটা আজকের আবহাওয়ার চেয়েও গরম। অবশ্য সেটার কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে। মারুফ যেদিন দুপুরের খাবার বাইরেই খেয়ে নেন, সেদিন রাবেয়ার মন খারাপ থাকে। আজকে তাই এমনিতেও তার ভালো লাগছে না। তাছাড়া কাল থেকে দুই মেয়ের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তিনি। সুযোগ পেলেই কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেবেন বলে ভেবে রেখেছেন।
মার্জিয়া উপুড় হয়ে শুয়ে একটা গল্পের বই পড়ছে, পা দুটো আকাশের দিকে তুলে রাখা। ডান হাতের নখ কামড়াচ্ছে। সে যখন খুব দুশ্চিন্তায় থাকে, তখন এভাবেই নখ কামড়ায়। গল্পে খলনায়িকা খুব ভয়াবহ একটা কাজ করতে যাচ্ছে। উত্তেজনা তুঙ্গে। এমন সময় মৌমিতা তার হাতটা টান দিয়ে সরিয়ে বলে, “নখ কামড়াচ্ছিস কেন?”

হতভম্ব হয়ে বড় বোনের দিকে তাকালো মার্জিয়া, “তাতে তোমার এতো সমস্যা কেন? আমি কি তোমার নখ কামড়াচ্ছি? তোমার না কালকে পরীক্ষা, পড়ো—”

মৌমিতা হাতটা ছাড়লো না, চোখ বড় করে বললো, “এতো বড় নখ!”

মার্জিয়া কোনোমতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসলো, নখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বললো, “সমস্যা কী? খারাপ তো লাগে না দেখতে!”

“খারাপ লাগে না মানে! মুরগির ঠ্যাং দেখেছিস? সেটার চেয়েও খারাপ লাগছে দেখতে—”

প্রতিবাদ স্বরূপ কিছু বলার সুযোগ পেলো না মার্জিয়া। কেননা তার বোনের কথা শেষ হওয়ার আগেই জুনায়েদের ডাকটা শোনা গেলো, “মৌমিতা?”

ওরা দু'জনই পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। মৌমিতা ভ্রু কুঁচকে বলে, “এই লোকের আবার কী হলো?”

মার্জিয়া সরে বসলো, “তোমাকে ডাকে। যাও শুনে আসো।”

“তুই যাহ। আমার উঠতে ইচ্ছা করছে না।”

মৌমিতা আবার বই নিয়ে হেলান দিয়ে বসলো। তার উঠে যাওয়ার কোনো লক্ষণ না দেখে মার্জিয়া নখ কামড়াতে শুরু করলো। জুনায়েদ আরও জোরে ডেকে উঠলো, “মৌমিতা!”

মার্জিয়া খাট থেকে নেমে পড়ে। আয়নার সামনে গিয়ে দ্রুতগতিতে চুল ঠিক করে। তারপর বাইরে ছুটে আসে।
জুনায়েদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উঠোনের দিকে তাকিয়ে আছে, মুখটা দেখা যাচ্ছে না, খুব বিরক্ত হয়ে আছে নিশ্চয়ই? রাবেয়া গোসলে ঢুকেছেন। নইলে এতোক্ষণে তিনিই চলে আসতেন। দরজার কাছে গিয়ে মার্জিয়া বলে উঠলো, “কী হয়েছে?”

জুনায়েদ ঘুরে তাকালো, “তোমার বোনকে ডাকো।”

মার্জিয়ার মুখখানি শুকিয়ে গেলো, “কেন? আমাকে বলা যাবে না?”

জুনায়েদ বিরক্তি প্রকাশ করে, “আরে ডাকলে ডাকো, নাহলে চলে যাচ্ছি আমি। চাচা একটা জিনিস পাঠিয়েছেন ওর জন্য। সেটা দিতে এসেছি।”

“ওহ আচ্ছা। ডাকছি।”

মার্জিয়া দরজা থেকে একটু সরে এলো, “আপা? আব্বা তোমার জন্য কী জানি পাঠিয়েছেন—”

কিছুক্ষণের মধ্যেই মৌমিতা ক্লান্ত ভঙ্গিতে এসে জুনায়েদের সামনে দাঁড়ালো। জুনায়েদ কাপড়ের থলেটা তার দিকে এগিয়ে দেয়, “দিনে দিনে অলস হয়ে যাচ্ছো তুমি!”

মৌমিতা মনে মনে বললো, “আজাইরা পরামর্শ দিতে কে বলেছে আপনাকে?”

ব্যাগটা নিয়েই সে ঘরের দিকে যেতে উদ্যত হলো, জুনায়েদ আবার সতর্ক করলো, “ভেতরে চিঠি আছে একটা। নিচে পড়ে যেতে পারে। তুমি তো আবার কোনোকিছু ভালোভাবে দেখো না!”

ঘরে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতরে উঁকি দেয় মেয়েটা। ভেতরে একটা ধূসর মলাটের ডায়েরি, রূপালি বললেও চলে। চিকচিক করছে উপরটা। মৌমিতা ভেতরের পাতা উল্টে দেখলো ভালো করে। ভাঁজ করা চিঠিটা পেয়ে গেলো সেখানে।

“স্নেহের মৌ,

তোমার ভগিনীর নিকট হইতে শুনিলাম, তুমি তোমার ডায়েরিখানা হারাইয়া ফেলিয়াছ। যদ্যপি আমার সংশয় হইতেছে, তুমি সম্ভবত আমার প্রতি রুষ্ট হইয়া তোমার ডায়েরি ফেলিয়া দিয়াছ। যদি বস্তুতই এইরূপ ঘটিয়া থাকে, তাহা হইলে তোমার ক্ষোভের কারণ অতিশয় তুচ্ছ।
পিতা কি সন্তানের ক্ষতি কামনা করিতে পারেন? আমি যাহা চাহিয়াছি, তোমার মঙ্গলের জন্যেই চাহিয়াছি।

উপরন্তু আমি তোমার ব্যক্তিগত ডায়েরি খুলিয়া দেখিয়াছিলাম বটে, কিন্তু তোমার রচনা সকল পাঠ করি নাই। কেবল তোমার অঙ্কিত চিত্রসমূহ দেখিয়াছিলাম। তুমি অনর্থক ভুল বুঝিয়াছ মা।
আমার প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়া আপন শখের বস্তু হারাইয়া ফেলিলে, ইহাতে কিছু প্রাপ্তি ঘটিল কি?

যাহা হউক, কন্যা পিতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করিতেই পারে, কিন্তু তাহাতে পিতার কর্তব্য কিছু হ্রাস পাইবে না। আমি তোমার নিকট একখানা নূতন ডায়েরি প্রেরণ করিয়াছি। দেখিয়া জানাইবে, তোমার মনঃপূত হইয়াছে কিনা।

ইতি
মারুফ”

মৌমিতা বেশ কয়েকবার পড়ে ফেললো চিঠিটা।
মারুফ প্রায়ই ব্যবসার কাজে শহরের বাইরে যান। তখন চিঠি লেখেন রাবেয়াকে, এভাবেই, তৎসম ভাষায়। আব্বার কাছ থেকে এমন গুরুগম্ভীর একখানি চিঠি পাওয়ার শখ মৌমিতার বহুদিন হলো। সেই ইচ্ছা এতো দ্রুত পূর্ণ হবে—তা অবশ্য সে ভাবেনি। মৌমিতা ভাবতো, তার যখন বিয়ে হবে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকবে, তখন আব্বাকে সে চিঠি লিখবে। আর তার আব্বা সাধু ভাষায় চিঠির জবাব দেবেন। সেই কাঙ্ক্ষিত চিঠি সে সময়ের আগেই পেয়ে গেছে।
আব্বা এখানে একটা মিথ্যে কথা লিখেছেন। মৌমিতা মলাটের নিচে নানান ধরনের ছবি এঁকে রেখেছে ঠিকই, তবে মারুফ শুধু সেই ছবি দেখেননি, তিনি ডায়েরিটা পড়েছেন। পুরোটা না পড়লেও বেশ কিছুদূর পড়েছেন, এ ব্যাপারে মৌমিতা নিশ্চিত। নাহলে গতকাল তিনি রতনকে এতো স্পষ্টভাবে ধমক দিতেন না। রতন আর রিতাকে মারুফ খুবই ভালোবাসেন। মাঝে মাঝে তাদের প্রতি তার স্নেহ মৌমিতার কাছে বাড়াবাড়িই মনে হতো। অথচ কাল রতনকে এতো কড়া একটা কথা বললেন তিনি, মেয়েকে কিছুই বললেন না। সম্প্রতি ডায়েরিটা মারুফ পড়েছেন, ভাগ্নের কাজকর্ম নিয়ে ধারণা হয়তো সেখান থেকেই পেয়েছেন।

রাবেয়ার চেঁচামেচি শোনা গেলো। তিনি গোসল সেরে বেরিয়েছেন। মৌমিতা কাগজটা ভাঁজ করে নতুন ডায়েরিটার মাঝখানে ঢুকিয়ে রাখলো। রাবেয়া ঘরে ঢুকলেন, “জুনায়েদ এসেছিলো নাকি?”

মৌমিতা মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ, আব্বা একটা ডায়েরি—”

“ছেলেটা এসে যে এতো চিৎকার করে ডাকাডাকি করলো, তোমাদের কোনো উত্তর দেয়ার ইচ্ছা নাই। একটাবার অন্তত 'জ্বী' বলতে পারতা। নিজে না গিয়ে আবার ছোট বোনটাকে পাঠিয়েছো। কেন? তুমি কি মহারানী? মানুষ তোমার হয়ে কাজ করে দেবে?”

“আম্মা আমি—”

“দেখলাম তো, আমার মেয়ের গুণ দেখে আমি নিজেই অবাক। কালকে যে ফুপুটা বাড়িতে আসলো এতোদিন পর, আমার দুই মেয়ে সালাম দিয়েই ঘরে ঢুকে গেলো। একটা কথাবার্তা নেই। অন্তত এক কাপ চা বানিয়ে তো দিতে পারতা? আমরা যে আপাদের বাড়িতে যাই, তখন দেখো না? রিতা কী সুন্দর কথা বলে সবার সাথে, চা-নাস্তা নিজেই তৈরি করে দেয়।”

মৌমিতা ক্ষীণ স্বরে বলে, “আম্মা, কালকে আমার একটু মাথাব্যথা ছিলো।”

“এখন তো ওটাই বলবা। নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা। রিতা কতোটুকু বড় তোমার থেকে? ও যদি পারে, তুমি পারো না কেন?”

মৌমিতা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে কোনো অনুতাপের লেশমাত্র নেই, সামান্য বিরক্তির ছাপ রয়েছে। মেয়েকে এভাবে দেখে রাবেয়া আরও বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, “কী মেয়ে মানুষ করছি আমি? এতোগুলো কথা বললাম, এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিচ্ছো? দাও। আমি সবসময় থাকবো না তোমার ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য। কাল যখন পরের ঘরে গিয়েও ঝামেলা করবা, তখন মানুষ সেই আমাকেই গালমন্দ করবে। বলবে, এই মেয়ের মা কিছুই শেখায়নি মেয়েকে। ননীর পুতুল বানিয়ে রেখেছে। পরের ছেলে যখন—”

“আম্মা চুপ করেন তো। আমার মাথাব্যথা করছে।”

রাবেয়া ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মৌমিতার দিকে। তারপর ধুপধাপ শব্দ করে নিজের ঘরের দিকে গেলেন, “ছোটটাও সঙ্গদোষে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! দুইটা মেয়েই চরম অসামাজিক। এরা এরকম যে কীভাবে হলো...”

মৌমিতা ধপ করে খাটের উপর বসলো। এতোক্ষণ ধরে তার আম্মাই কথা বললেন। তবু নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হলো তার কাছে। মাথার উপর খটখট শব্দে ফ্যান ঘুরছে। এই সামান্য আওয়াজটাও হঠাৎ প্রচণ্ড অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে।

—————

“এপ্রিল, ১৯৯০:
নিজের ব্যাপারে একটা বিষয় আমি খুব ভালোভাবে জেনে নিয়েছি। আমি অসামাজিক, অহংকারী, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ইত্যাদি ইত্যাদি। রোজ রোজ এই একই কথা শুনতে শুনতে কান ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। এখন আমি বিশ্বাস করি, আমি একটা আত্মকেন্দ্রিক, অসামাজিক মেয়ে। কারণ আমি মানুষের সাথে কথা বলতে পারি না। কী বলব–এই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে পাই না। মানুষের ভিড় আমার ভালো লাগে না। নিজেকে খুব নিচ, খুব হীন মনে হয়। অযোগ্য মনে হয়। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে অদৃশ্য হয়ে যেতে, পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যেতে। কারণ আমি অহংকারী।
একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে আমি দিনের পর দিন ভাবতে থাকি। রাতের ঘুম নষ্ট করে ফেলি। হীনমন্যতায় ভুগি। জানি না কেন। কারও সাথে একটা কথা বলতে গেলেও সেটা অনেকবার মনে মনে অনুশীলন করি। শেষ অবধি আর কিছু বলা হয় না। আর বললেও সেভাবে বলতে পারি না, যেভাবে আমি বলতে চাই। নিজের উপর মাঝে মাঝে ঘৃণা হয়, প্রচুর ঘৃণা হয়। আমি কেন এত আলাদা? কেন এত অসামাজিক, দাম্ভিক? কেন আমি আর দশটা মানুষের মত কথা বলতে পারি না, কেন ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারি না? আমার আশেপাশের মানুষগুলো কত মিশুক! আমি কেন তাদের মত হতে পারি না?

নিজেকে পরিবর্তন করার অনেক চেষ্টা করেছি। পারিনি। তবে আমার মনোভাবে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। আমি কথা বলতে শিখিনি, মানুষের সামনে নির্দ্বিধায় দাঁড়াতে শিখিনি। তবে নিজেকে ঘৃণা করতে শিখেছি। আর এতটুকু অন্তত আমি দাবি করতে পারি, আমি এতটাও স্বার্থপর নই।
মানুষ একে অপরকে খুব সামান্য কারণে ঘৃণা করে। মাঝে মাঝে কোনো নির্দিষ্ট কারণও লাগে না। কিন্তু কেউ অকারণে ভালোবাসে না কখনোই। ভালোবাসতে পারে কেবল স্বার্থপর মানুষেরা। কাউকে ঘৃণা করতে স্বার্থের প্রয়োজন হয় না।”

বাদল পাশে ঘুরে জানালার দিকে তাকালো। বাইরে কড়া রোদ। লাইব্রেরির এই বৈদ্যুতিক পাখার বাতাস যেন তার গায়েই লাগছে না। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকালো। তারপর তা কাঁধে ঝুলিয়ে হলের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
ইদানিং সে খুব অদ্ভুত কিছু একটা অনুভব করছে। মৌমিতা খন্দকারের ভাষায় হয়তো এটাকে স্বার্থপরতা বলা যেতে পারে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp