ভাব তরঙ্গ - পর্ব ১৩ - বেলা শেখ - ধারাবাহিক গল্প

ভাব তরঙ্গ - বেলা শেখ
“কাল মাঠে নামাবে?”

“না।”

“রিজন কি?”

অরুণাভ বন্ধু মোহনের দিকে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “রিজন দেখালো না। বলল, আপাদত রেস্ট নাও।”

“আশ্চর্য!”

অরুণাভ কাঁধ উঁচিয়ে বন্ধুর পাশে বসলো। মোহন তাঁর কাঁধে হাত রাখলো। সান্ত্বনার সুরে বলল, “মন খারাপ করিস না ভাই।”

“মন খারাপ না।” অরুণাভ অস্বীকার করলো।

মোহন পিঠ চাপড়ে বলল, “আয়নায় নিজেকে দেখ গিয়ে। পেঁচার কোনো অংশ কম লাগছে না।”

অরুণাভ হাসলো ক্ষণ। পিঠ এলিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তখনই ইন্টারকম থেকে কল আসে। মোহন রিসিভ করে কথা বলল। 

“হেয় বাডি, আমার ক্রাশ আসবে বলিস নি তো!”

মোহন হঠাৎ আনন্দের সাথে বলল। অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “তোর ক্রাশ বলতে?”

“পাতাবাহার ছাড়া আর কে!”

“হোয়াট?” অরুণাভ তড়িৎ গতিতে উঠে বসলো। বিস্ফোরক দৃষ্টি বন্ধুর মুখ পানে।

মোহনের কি হলো? সে শর্টসের উপরেই জিন্স পরে নেয়। হুডি জড়াতে জড়াতে বলল, “মায় ওয়ান এন্ড ওয়ানলি ক্রাশ পাতাবাহার এসেছে বাডি। আজ তো পটিয়েই ছাড়বো। কাবাবে হাড্ডি খ্যাত তোর বুড়ো বাপটাও আসে নি। আমার তো ঈদ ঈদ লাগছে। লা লালা লা লা!”

পারফিউম মাখে আর গুনগুনিয়ে চলে মোহন। অরুণাভ প্রথমবার রাগলো না। আম্মু এসেছে, দিকবিদিক ভুলে হোটেল রুম থেকে ছুটে যায়। মোহন দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বন্ধুকে পিছু ডাকে। অরুণাভ পিছু চাইলে সে হেসে বলল,

“বাডি, নিচে তো দেখ? শর্টস পড়েই দৌড় দিচ্ছিস! লজ্জা থাকা উচিৎ!”

অরুণাভ ফিরে এসে কোনরকম ট্রাওজার কোমড়ে অবদি তুলে ছুটে যায় আবারও। মোহন মুখে কিছু একটা লাগাতে লাগাতে বলল, “আবে ইয়ার, এতো তাড়ার কি আছে?”

“তুই বুঝবি না।”

অরুণাভ বন্ধুকে ফেলে ত্রস্ত পায়ে ছুটে চলে। মোহনও পিছু পিছু আসে। লিফট থেকে নেমে ওয়েটিং জোনের দিকে আগায় দুই বন্ধু। মোহন দূর হতেই উঁকি ঝুঁকি দেয়।

“কোথায় পাতাবাহার? তাঁর চাঁদ বরণ মুখ দেখার জন্য আমি ছটফট ছটফট করছি।”

অরুণাভ বন্ধুর পেটে কনুই মেরে শাসিয়ে বলল, “জিন্দা থাকতে চাইলে কিপ ইয়্যুর মুখ শাট।”

মোহন দাঁত কেলালো। যার দরুন বোঝাই গেলো তাঁর মুখ শাট হওয়ার প্রশ্নই আসে না। অরুণাভ মাথায় চাটা মেরে সামনে হাঁটে। হঠাৎ-ই থেমে গেলো সে। মোহন পিছু ফিরে এসে বলল,

“কি হলো বাডি?”

“আম্মু আসে নি!” 

অরুণাভের গলা অন্যরকম শোনালো। মোহন বাহু ঝাঁকিয়ে বলল, “ইন্টারকম থেকে ফোন করে যে বললো, একটা মহিলা এসেছে। তোর মা বলে পরিচয় দিলো। তোর সাথে দেখা করতে চায়!”

“সি’জ নট আম্মু। ওনাদের ভুল হয়েছে হয়তোবা।”

মোহন ভ্র কুঁচকালো। বুক চিরে হাহাকার বেরিয়ে আসলো, আহ্ পাতাবাহার! সে বন্ধুর বাহু টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “চল, গিয়ে দেখে তো আসি। কে সে।”

“নো নীড!”

“বাডি পাতাবাহারও তো হতে পারে। এখান থেকে তো ক্লিয়ারলি দেখাও যাচ্ছে না।”

“আমি ক্লিয়ারলি দেখতে পাচ্ছি। আর আমার আম্মুকে ওই সম্বোধন করা বন্ধ কর। নয়তো তোর মুখের নকশা বদলে দিবো। এটা মজা না সিরিয়াস হুমকি!”

অরুণাভ হুট করেই রেগে উঠলো। তারপর হনহনিয়ে উল্টোপথে হাঁটা দিলো। পিছু ডাকলেও সাঁড়া দিলো না। মোহন কি মনে করে রিসেপশনে আসে। রিসেপশনে বসা সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। বলল, 

“রুম নাম্বার ৩০৪ এ ফোন করে বলা হয়েছে অরুণাভ সরকারের মা এসেছেন। কোথায় উনি?”

মেয়েটি ওয়েটিং জোনের দিকে ইশারা করে বলল, “ওখানে বসেছেন। ওই যে বাচ্চা মেয়েটার সাথে যে বসেছেন, উনিই।”

মোহন তাদের দিকে ফিরলো। বলল, “আর ইয়্যু সিওর উনি অরুণাভ সরকারের কথা বলেছেন? অরুণাভের মাকে চিনি আমি। ইনি সে নন।”

মেয়েটির কপালে ভাঁজ পড়লো, “উনি তো অরুণাভ সরকারের কথাই বলেছেন। আমি ভুল শুনি নি। বর্ষা চৌধুরী নাম ওনার। আর ওই বাচ্চাটা অরুণাভের বোন।”

মোহন কথা না বাড়িয়ে ওয়েটিং জোনের দিকে এগিয়ে গেলো। বর্ষা চৌধুরীর সাথে বসা পিচ্চি মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয়। সে হাসলেও পিচ্চি মেয়েটা মুখ বাঁকালো।

—————

দুই হাতে মুখ ঢেকে নিচু হয়ে বসে অরুণাভ। হালকা পাতলা দেহ খানি কাঁপছে। কাঁদছে কি? হাতের তালুতে চোখ গাল ডলে হা করে শ্বাস ফেলল। চোখ দুটো ভেজা। ওই মহিলা চায় টা কি? যখন অরুণাভ চাইতো সে আসুক, তাঁর জন্য সহানুভূতি দেখাক, বুকে টেনে আদর করুক। তখন তো সে আসতো না! এখন অরুণাভ জীবনে তাঁর আগমণ চাইছে না, খুবই অসহ্য লাগছে তাকে। কিন্তু সে আসছে! সে চাইছে টা কি? এতো বছর পর হঠাৎ ফেলে যাওয়া সন্তানের প্রতি তাঁর দরদ উথলে উঠছে? উঠুক, সে যাবে না। প্রশ্নই আসে না। তবে তাঁর কোমল মন কোথাও এক টুকরো স্পৃহা জাগায়, তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াতে। কেন সে সাভার থেকে মিরপুর ছুটে এসেছে? তাঁকে দেখার জন্য কি?

“ওহ্ গড, আই যাস্ট হেইট মায় সেল্ফ।”

বিড়বিড় করে অরুণাভ ফোন খুঁজে বেড়ায়। খুঁজতে কষ্ট হয় না। বেডেই ছিলো। সে ফুল হাতার জার্সির হাতা টেনে গাল মুছে। হা হা করে শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে। ‘Ammu’ দিয়ে সেভকৃত নাম্বারে কল লাগায়। রিং হয় তবে রিসিভ হয় না। এক সময় কেটে গেল। অরুণাভ মুহুর্তের মধ্যে আবার কল লাগায়, এবার ফোন বন্ধ বলছে। অরুণাভের গলা ধরে আসে। মুহুর্তেই আনিকার নাম্বারে কল লাগালো। রিসিভ হতেই মেয়েলী রিনরিনে সুর ভেসে আসে।

“আরে আরে আরে, সূর্য আজ কোনদিকে উঠলো। স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাকে কল করলো! আমার তো কপাল খুলে গেলো। কি সৌভাগ্য আমার!”

মিষ্টি সুরে স্পষ্ট ভর্ৎসনা। অরুণাভ তর্কে না জড়িয়ে বলল, “কোথায় তুই?”

“তৈমুরের সাথে কফি খেতে এসেছি।”

অরুণাভ নাকের পাটা ফুলিয়ে দাঁত কটমট করে বলল, “ওই কৈতরের বাচ্চার যদি বিন্দুমাত্র লজ্জা শরম থাকে ও তোর নাম অবদি মুখে নেবে না।”

আনিকা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। অরুণাভ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, “তুই কি বাড়িতে?”

“নাহ্ রমনায় এসেছি ফ্রেন্ডসদের সাথে!”

“ফ্রেন্ডস বলতে?”

ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধা হয় নি আনিকার। দুষ্টু হেসে বলতে, “ঈশান, রকি, আরফিন…”

“ফর গড সেক তোকে হাতের কাছে পেলে কিমা বানাবো শয়তান।” অরুণাভের রগে রগে হিংসারা কুটকুট করে। 

তাঁকে রাগাতে পেরে আনিকা মুচকি হাসলো, “একদম টিপিক্যাল বয়ফ্রেন্ডের মতো বিহেভ করবি না। দে আর মায় ফ্রেন্ডস!”

“নি*কুচি করেছে তোর ফ্রেন্ডদের!”

“ল্যাঙ্গুয়েজ!” আনিকা কান চুলকে সাবধান করে।

অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “কাল ম্যাচ দেখতে নীলাশা আসবে বলল।”

আনিকার সমস্ত হাসি গায়েব। সে রাগত স্বরে বলল, 
“সস্তা ট্রিকস আমার উপর এপ্লাই করবি না।”

“আরে সত্যিই আসছে! একটু আগেই ফোন করে জানালো।”

“তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকিস। যত্তসব ফা*লতু! তুই ছা*পড়ি, ওই নীলাশা আরেক ছা*পড়ি। মেড ফর ইচ আদার। দুজনে পদ্মায় ডুবে মর! তোর সাথে ব্রেকআপ।”

“আরে রাগছিস কেন ভাই? মজা… হ্যালো হ্যালো?”

অরুণাভ ফোন নামিয়ে দেখে, কেটে দিয়েছে। সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে আবারও কল লাগায়, এবারও কেটে দেয়। পরের বার আর কল ঢুকলো না। সে এখন তাঁর ব্লক লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে।হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইন্সট্রা সব চেক করে হতাশ হলো অরুণাভ। নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিলো,

“বাদ দে ভাই অরুণাভ, মেয়ে মানুষ!”

সে ডায়াল লিস্টে ঘুরে ‘Abbu Koliza’ দিয়ে সেভ করা নাম্বারে কল লাগালো।  

“আব্বু, আসসালামুয়ালাইকুম।”

অরুণ সরকার তব্দা খেয়ে যায়। মিটিং রুমে বায়ারদের সামনে ক্ষণিকের জন্য বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। একটু পর স্তম্ভিত সুরে বলল, “জি, কে বলছেন?”

“আব্বু সিরিয়াসলি?” অরুণাভ হতাশ হয়ে বলল।

অরুণ সরকার ‘এক্স কিউজ মি’ বলে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে আসে। একহাতে ব্লেজারের বোতাম খুলতে খুলতে কেবিনের দিকে অগ্রসর হয়। কৌতুক পূর্ণ স্বরে বলল,

“কৃপা পূর্বক ফোনটা তার মালিকের কাছে হস্তান্তর করুন। বয়স হয়েছে আমার, চিন্তায় হার্ট অ্যাটাক না করে ফেলি।”

অরুণাভ বিষাদের মাঝেও হাসলো বাবার কথায়। অরুণ কেবিনে এসে ব্লেজার গা হতে আলগা করলো। সোফায় হাত পা ছড়িয়ে বসে বলল, “চুপ করে আছেন যে? আমার ফোর টোয়েন্টি ছেলের কাছে দিন।”

“আমি কি ফোন কাটবো?”

অরুণ হাসলো, “ফোন করে সালাম কালাম দিচ্ছো! হঠাৎ করে এমন ভালোমানুষী হজম করা মুশকিল হয়ে যায় তো।”

কল কেটে যায়। অরুণ সরকার কপালে দৃঢ় ভাঁজ ফেলে আবারও কল লাগায়। রিসিভ হতেই প্রশ্ন করলো, “কি সমস্যা?”

“কিছু না, তুমি কি বাড়িতে? থাকলে ফোনটা আম্মুর কাছে দাও। আম্মুর ফোন বন্ধ বলছে।”

অরুণ সরকার ঘার ডলে বলল, “আমি তো অফিসে আছি। আর তোমার আম্মুর ফোন বন্ধ কেন থাকবে?”

বন্ধ না, ইচ্ছাকৃত বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আম্মু যে তাঁর সাথে কথা বলছে না। সে বলল, “বাড়ি ফিরলে একটু আমার সাথে কথা বলিয়ে দিও।”

অরুণের খটকা লাগলো তবে সে পাল্টা প্রশ্ন করলো না। অরুণাভ আবারও বলল, “তুমি কি ব্যস্ত, আব্বু?”

“না, তুমি বলো আমি শুনছি। কালকের ম্যাচে থাকছো তুমি?”

“এখনও সিদ্ধান্ত হয় নি।” অরুণাভ অকপটে মিথ্যে বলে।

“মন খারাপ কেন তোমার?” অরুণের কেন যেন মনে হলো ছেলের মন খারাপ। 

“মন খারাপ না, ব্যস বাড়ির সবার কথা মনে পড়ছে।”

“খুব দূরে তো না, আমি ড্রাইভার পাঠিয়ে দিচ্ছি ঘুরে যাও।”

“আচ্ছা দেখি, গেলে ফোন করবো।”

“ওলাফ অফিসেই আছে! কথা বলবে?”

“না থাক, কথা বললে আরো মন খারাপ করবে। ফোন রাখছি, হুঁ?” অরুণাভের মনে হলো আরেকটু কথা বললে সে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।

“আচ্ছা, আমি কি দেখা করে আসবো?”

“তাঁর প্রয়োজন নেই। আমি ফোন রাখছি।”

অরুণ কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু অরুণাভ শুনলো না। সে মুখের উপর ফোন কেটে দিল। চোখে জমা নোনাজল উপচেপড়ার সময়টুকুও পায় না, সেই প্রশ্ন এসে দগ্ধ করে যায় যা সে ভুলক্রমেও শুনতে চায় না।

“পাতাবাহার তোর আসল মা নয়, সৎ মা?”

বন্ধুর বিষবাক্যে কড়া দৃষ্টি ফেলে অরুণাভ বলল, “না, উনিই আমার মা।”

“কিন্তু ওই মহিলা, বর্ষা চৌধুরী নাম। সে বলল উনি তোর জন্মাদাত্রী। সেপারেশনের পর আঙ্কেল পাতাবাহারকে বিয়ে করেছে। যদিও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আবার হচ্ছেও। বাডি, ক্লিয়ার কর তো!”

মোহন বন্ধুর পাশে এসে বসলো। অরুণাভ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখে কাঠ কাঠ স্বরে টেনে টেনে বলল, “সে মিথ্যা বলেছে। যার তাঁর কথা বিশ্বাস করতে নেই।”

“বাট…”

“আমি তোর বন্ধু, তোর আমাকে বিশ্বাস করা উচিত নাকি ওই অচেনা ঠক মহিলাকে?”

“তোকে, কিন্তু…”

“তাহলে ‘কিন্তু’ সাইডে রাখ। আমি গোসলে যাচ্ছি!”

অরুণাভ উঠে দাঁড়ালো। মোহন অবাক হয়ে বলল, “এই ঠান্ডায় গোসল?”

“হট শাওয়ার নেবো।”

“ওহ্ আচ্ছা। ক্যান আই জয়েন ইয়্যু বাডি?”

অরুণাভ তেড়েফুঁড়ে আসে। মোহন বিছানায় উঠে পাশ বালিশকে ঢাল বানিয়ে হাসে। অরুণাভ ‘থু’ বলে ওয়াশ রুমে চলে যায়। মোহন হাসিতে বিছানায় কয়েকদফা গড়াগড়ি খায়। তারপর পাতাবাহারের কথা স্মরণে আসতে মুখটা দুঃখী দুঃখী বানায়। 

—————

অরুণ সরকার ফোন রাখতেই সুজন কেবিনে ঢুকলো। সে জানতে চাইলো, “প্রহর কোথায়?”

সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বস, অফিসের এমন কোনো ব্যক্তি নেই যাকে ছোট সরকার নাস্তানাবুদ করে নি। কি অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন তাঁর। তা-ও লাগাতার। উত্তর করার সাথেই পরবর্তী প্রশ্ন হাজির। ফারুখ আহমেদের মোটা পেটে আঙুল ডাবিয়ে বলে, ‘আঙ্কেল তুমি কি প্রেগন্যান্ট? তোমার পেটে কয়টা বাবু আছে?’’ বেচারা ফারুক ভাই লজ্জায় কেঁদেই দিচ্ছিলো। একদন্ড তাঁর মুখ স্থির থাকে না। ভোর কিন্তু সুইট বয় ছিলো। কোলে কোলে থাকতো সবার।”

অরুণ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “হি’জ ওলসো সুইট। যাও ডেকে আনো তাকে।”

সুজন তাকে ডাকতে যায়। প্রহর সরকারকে কেবিন অবদি আনতে সুজনের দশ মিনিট সময় লাগে। সে আজ বাবার মতো সেজেছে। একই স্যুট ব্যুট। পার্থক্য শুধু চুলে, অরুণ সরকারের চুল জেল দিয়ে সেট করা হলেও প্রহরের সিল্কি চুল কপালে আঁছড়ে পড়েছে। 

“আঙ্কেল, তোমার কি হাগু চেপেছে?”

সুজনের মাথায় যেন বাজ পড়লো। সে বলল, “না তো।”

“তাহলে এমন মুখ বানিয়েছো কেন?”

সুজন মুখে হাত দিয়ে বলল, “কেমন মুখ বানিয়েছি?”

“কমোডে বসে থাকি কিন্তু আমার হাগু বের হয় না। তখন আমি যেমন মুখ বানাই ঠিক তেমন মুখ বানিয়েছো। তুমি না বেশি বেশি সবজি খাবে বুঝলে? তাহলে হাগু জলদি জলদি বের হবে। কোনো কষ্টই হবে না।”

প্রহর বড়দের মতো আঙুল নাড়িয়ে উপদেশ দিচ্ছে। তাঁর মাম্মাম বলেছে সবজি খেলে হাগু করতে কষ্ট হয় না। ওদিকে সুজনের মুখটা ভোঁতা হয়ে গেছে। তাঁর ইচ্ছে করে কানে হাত চেপে ‘আআআ’ করে চেঁচিয়ে দুঃখপ্রকাশ করতে। সে কেবিনের দরজা খুলে প্রহরকে কেবিনে যেতে ইশারা করে। প্রহর প্রবেশ করলে সে দরজা টেনে বন্ধ করে দিলো। নিজে ঢুকলো না। তাঁর আর একফোঁটাও এনার্জি নাই এর বকর বকর শোনার।

অরুণ সরকার ছেলেকে দেখেই বাহু মেলে দিলো। প্রহর দৌড়ে এসে বাবার বাহুতে নিজেকে সঁপে দেয়। বাবার আদরের প্রকোপ কমে আসতেই ভাবুক স্বরে বাবাকে প্রশ্ন করলো,

“পাপা, মাম্মাম কি বিউটিফুল না?”

অরুণ সরকার নিম্ন ওষ্ঠাধর কামড়ে ছেলের দিকে তাকায়। আবার কি বলবে? সে ছেলেকে বুকের উপর তুলে। কপালে ঠোঁট চেপে ধরে বলল, “তোমার মাম্মাম ঠ্যু মাচ বিউটিফুল।”

“তাহলে অফিসে মাম্মামের বিউটিফুল ছবি না লাগিয়ে ওই আন্টিদের ছবি কেন লাগিয়েছো? এটা তো ঠিক না, তাই না?”

প্রহর গাল ফুলালো। তাঁর চোখে মাম্মামের চেয়ে সুন্দর আর কেউ নেই। সে বাবার চোখে চোখ রেখে বলল, “পাপা, তুমি আন্টিদের ছবি সরিয়ে মাম্মামের ছবি লাগিয়ে দাও।”

অরুণ সরকার শব্দ করে হেসে উঠলো। বলল, “আমার এখানে দূরদুরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে বুঝলে? ওই আন্টিদের ছবির কাছে তোমার মাম্মামের ছবি লাগালে সবাই তোমার মাম্মাকে দেখবে। বদ নজর দিবে। তখন তোমার মাম্মামের মুখে অনেক পিম্পল হবে। ইয়্যুর মাম্মাম হেটস পিম্পল।

অরুণ ভেবে চিন্তে জবাব দিলো। আশা করলো ছেলের জবান বন্ধ হবে। কিন্তু প্রহর তো প্রহরই। সে মুহুর্তের মধ্যেই তাঁর পরবর্তী প্রশ্ন নিয়ে হাজির হলো, “তাহলে তো ওই আন্টিদের ছবিও লাগানো ঠিক হয় নি। ওনাদের মুখেও নিশ্চয়ই অনেক পিম্পল হয়েছে!”

আহ্ কি সুন্দর যুক্তি! অরুণ কতক্ষণ ভাষাহীন হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রহর চোখ পিটপিট করলে সে দুই গাল চেপে সারা মুখে ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে লাগল।

“ছোট সরকার, এতো পাকা পাকা কথা কার থেকে শিখলেন আপনি?”

“কথা কি ফল?”

“না।”

“তাহলে কথা কিভাবে পাকে?”

অরুণ ছেলের ফোলা ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করে বলল, “আমার জান, আমার তোতা পাখি, আমার আবেলার প্রহর, আপনার প্রশ্ন শুনে আমি জবাব খুঁজে পাই না। কোথায় পান এমন অদ্ভুত প্রশ্নের ভান্ডার, হুঁ?”

“আমার কি ডানা আছে?” প্রহর দুই হাত মেলা ডানার মতো দেখায়।

“না তো!” অরুণ আগ্রহের সাথে বলল।

“আমার কি তোতার মতো লাল লাল ঠোঁট আছে?” বলেই বাবার গালে ঠোকর দেয়। 

অরুণ এবারও না বোধক জবাব দিলো। প্রহর চোখ ছোট ছোট করে বলল, “আমি কি লাল মরিচ খাই?’

“না, আপনার ডানা, লাল লাল ঠোঁট না থাকলেও আপনি আমার তোতা পাখি। বুঝলেন ছোট সরকার?”

প্রহর চোখ পিটপিট করে দাঁত দেখিয়ে হাসলো। তাঁর খরগোশের মতো দাঁত দুটো বড্ড আদুরে লাগে। অরুণ নাকে নাক ছুঁয়ে বলল, “আমার জান, আপনি না আসলে আমার কি হতো?”

“কি হতো?”

“আপনার পাপা হয়তো আরো ক’ছর আগেই দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে চলে যেতো। আপনার উছিলায় হয়তো আল্লাহ আমার আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে, সাথে অনেক বেশি সুখ।”

প্রহর চোখ পিটপিট করে তাকালো। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “পাপা, পঁচা কথা বললে আমি আপুনিকে বলে দিবো।”

“একদম না। আমি পঁচা কথা বলবো না।”

অরুণ ভীতু মুখ বানিয়ে বলল। প্রহর তাতেই হেসে একাকার। তাঁর হাসিতে পাতাবাহারের ঝলকানি পাওয়া যায়। পাতাবাহারও এমন শরীর দুলিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে কোটরে পানি টলমল করে তার। 

“পাপা, আই মিসড মাম্মাম।”

“মি ঠ্যু!”

প্রহর মিটিমিটি হেসে বলল, “আমরা কি এখন বাড়ি ফিরতে পারি?”

“হ্যাঁ পারি কিন্তু আগে আমাদের আরেকটা মিটিং এটেন্ড করতে হবে। এন্ড ইটস্ ইম্পোর্টেন্ট, মায় লিটল সুইট হার্ট।”

অরুণ ছেলেকে পাশে বসিয়ে ল্যাপটপ কোলে তুলে ইমেইল চেক করে। প্রহর ল্যাপটপে উঁকি দেয়। ব্যুলেটের থেকেও বেশি স্পীডে চলা তার মুখ চালু হওয়ার আগেই অরুণ সরকার আত্মসমর্পণ করে বলল, 

“পাপার সুইট বয় ওলাফ, দুটো মিনিট চুপ করে বসো। ওখানে আমার ফোন আছে। তুমি তোমার ফেবারিট ‘ফ্রুট নিনজা’ কেন খেলছো না?”

প্রহরের মুখটা চুপসে গেল। সে আলস্য ভঙ্গিতে উঠে গিয়ে বাবার ফোনটা হাতে নেয়। পাওয়ার বাটনে চাপ দেয়। ফোনের স্ক্রিনে মায়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখেই প্রহরের মুখে রং ফিরে আসে। সে ঠোঁট চোখা করে ফোনের স্ক্রিনে চুমু খায় অনবরত। 

অরুণ কোণা চোখে তা খেয়াল করে হাসলো। বড় জন, অরুণিতা পাপা ভক্ত হলেও এই ছোটজন আবার মাম্মাম বলতে হুঁশ হারিয়ে ফেলে। সে হাতের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছেলের উপর সুচারু দৃষ্টি রাখে। প্রহর চুপ থাকতে মোটেই পছন্দ করে না। সে বাবার পাশ ঘেঁষে বসে কথা বলার সুযোগ খুঁজে। খুঁজতে তাঁকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয় না।

“পাপা, গার্লস গয়না কেন পড়ে? তাদের তো এমনিতেই দেখতে প্রিটি লাগে! গয়না পড়ার কি দরকার?

অরুণ সরকার হাসলো শুধু। প্রহর বাহু ঝাঁকিয়ে বলল, “বলো না পাপা?”

“পরে বলি? আমি একটু বিজি আছি।”

প্রহরের শুকনো মুখ দেখে অরুণ জানতে চাইলো, “আব্বু, মন খারাপ করলে?”

প্রহর মাথা দোলালো, মন খারাপ করে নি। হামি তুলে বলল, “পাপা, মানুষ চোখ বন্ধ করে ঘুমায় কেন?”

“মানুষ চোখ বন্ধ করে না, ঘুম পেলে চোখ আপনে আপ বন্ধ হয়ে যায়। যেমন তোমার চোখ বন্ধ হতে চাচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে আমার তোতা পাখির?”

প্রহর বাবার কোল থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে দেয়। নিজে সে স্থান দখল করে বাবার বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নেয়। বাবার মুক্ত হাতদ্বয়কেও কাজে লাগিয়ে দেয়। একহাত মাথায় আরেক হাত পিঠে রাখে। অরুণ সরকার ছেলেকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে পিঠে আলতো চাপড় মেরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। 

সুজন তাঁর বসের অনুমতি নিয়ে অত্যন্ত সাবধানের সাথে কেবিনে প্রবেশ করে। প্রহরকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে স্বস্তি পায়। রূমাল কপালে ঘষতে ঘষতে বলে, 

“বস, মিটিং আমি সামলে নিয়েছি। আব্বাস খাঁ আর আলী খাঁ ‘অরুণিতা’স কিচেনে’ আপনার অপেক্ষায় আছে। আপনি কি এখনি বেরুবেন?”

“হ্যাঁ, ডিলটা একবার হয়ে যাক শুধু। তারপর অরুণিতা’স কিচেন আগে ঢাকা, এরপর পুরো দেশে মশহুর হবে, সুজন।”

অরুণ সরকারের কথায় আত্নবিশ্বাস আকাশচুম্বী। সে যেকোনো উপায়ে অরুণিতা’স কিচেনকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যাবে তা বলার অবকাশ নেই। সুজন হেসে বলল, “বস, ভোরের জন্য সরকার জুয়েলারি ফ্যাশন, অরুণিতার জন্য অরুণিতা’স কিচেন, ছোট বসের জন্য কি পরিকল্পনা আছে আপনার?”

অরুণ সরকার হাসলো। বুকে ঘুমন্ত ছেলের পিঠ চাপড়ে বলল, “পরিকল্পনা হলো ওকে বড় হতে দেওয়া যাবে না।”

“বুঝলাম না বস?”

“বুঝতে হবে না। যাও তুমি গয়নার ডিজাইন গুলো কারিগরকে ভালো করে বুঝিয়ে দাও। ভুল যেন না হয়।”

সুজন সম্মতি জ্ঞাপন করে চলে যেতে নেয় অরুণ কি মনে করে পিছু ডাকলো। সুজন দরজা অবদি গিয়ে ফিরে আসে। বিনয়ের সাথে বলে,

“কিছু বলবেন বস?”

অরুণ একটু ভেবে বলল, “বাঙলো খালি চাই। আমরা দ্রুত সেখানে শিফট হচ্ছি।”

সুজনকে চিন্তিত দেখালো। অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলল, “কোনো সমস্যা?”

“তা একটু বস! নতুন যে ফরেনার ফ্যামিলি উঠেছে তাঁরা আরও কিছুদিন থাকবে বলছে। এরজন্য বড় এমাউন্টের পেমেন্ট করতেও রাজি। বস আপনাকে তো বলতেই ভুলে গেছি!”

সুজন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো। অরুণ সরকার গম্ভীর গলায় বলল, “কি?”

“ম্যামের ‘পাতাবাহার হাউজ’ নিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। অনেক প্রশংসা করেছে বাঙলোর। আমি আপনাকে বলেছিলাম ম্যামের পেইন্ট লাগান, আপনি শোনেন নি। পেইন্ট লাগালো পুরো হিস্টোরিক্যাল ভাইব পাওয়া যেতো। এখনও করা যাবে আপনি বলেন তো…”

“সেসবের কোন প্রয়োজন নেই। ওটা কোনো হিস্টোরিক্যাল প্যালেস না। তোমার ম্যামের বাড়ি। খুবই সাধারণ। খালি পড়েছিল তাই রেন্টে দিয়েছিলাম। কিছু প্রফিট আসলে ক্ষতি কি? তোমার ম্যামের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়লো। যাইহোক শিঘ্রই আমরা সেখানে শিফট হচ্ছি। যত দ্রুত সম্ভব গেস্ট বিদায় করো।”

“ওকে বস!”

সুজন চলে গেলে অরুণ ঘুমন্ত ছেলেকে বুকে রেখেই হাতের কাজগুলো শেষ করে বেরিয়ে পড়ে মিটিংয়ের জন্য। প্রহরকে বুকে আগলে গাড়িতে বসে বসে অরুণ সরকার ভাবনায় বুঁদ হয়। একটা সময় ছিলো সে তাঁর কলিজাকে ঠিক এভাবেই বুকে আগলে দুনিয়ার সকল ব্যস্ততা কাটিয়ে দিতো। পিচ্চিকালে অরুণিতাও স্বীয় পুতুল ব্যাগ কাঁধে ফেলে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়তো অফিসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতো। কখনো কাঁধে, কখনো ঘারে, কখনো বুকে, তো কখনো বাবার কনিষ্ঠা আঙুল ধরে পায়ে পায়ে হাঁটতো। কোনো কান্নাকাটি না, কোনো প্রকার বিরক্তি ছাড়াই সে মাকে ভুলে বাবার সাথে লেগে থাকতো। সারাটা দিন কাটিয়ে মাঝরাতে ঘুমন্ত কন্যাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতো অরুণ সরকার। মেয়ে তাঁর বাবা অন্তঃপ্রাণ। অন্যদিকে প্রহর মায়ের সাথে একটু বেশিই জুড়ে রয়েছে। এর পেছনেও কারণ দাঁড় করিয়েছে অরুণ সরকার। অরুণিতা, অরুণাভ নামগুলোয় অরুণ থাকলেও প্রহরে সে নেই। কেন নেই? সব দোষ পাতাবাহারের। সে ‘অরুণদ্বীপ সরকার’ রাখতে চাইলেও মহিলা ‘হিন্দুয়ানা’ বলে দুটো ঝাড়ি সহ মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। নাম রাখা হয় প্রহর সরকার। তবে তাঁকে ‘স্নো কিড–ওলাফ’ বলেই বেশি ডাকা হয়। সে তুষার পাতের মতোই হেব্বি কুল! 

“পাপা, মাম্মামের কাছে কখন যাবো?”

আধো আধো চোখ মেলে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইলো প্রহর। অরুণ সরকার ছেলের মাথাটা বুকে চেপে ধরে বলল, “তোমার মাম্মামের কাছেই যাচ্ছি, আব্বু। তুমি ঘুম দাও!”

“পাপা, ঘুম কি চকলেট যে তোমাকে দেবো?”

অরুণ হেসে বলল, “ঘুমাতে বলেছি মানিক। চোখ বন্ধ করো তো।”

“পাপা, চোখ খুলে রেখে কেন ঘুমানো যায় না?”

“আমি জানি না।” অরুণ আত্মসমর্পণ করে দিলো।

প্রহর প্রশ্ন করলো, “কেন জানো না?”

অরুণ সরকার তপ্ত শ্বাস ফেলে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়। প্রহর বাবার জবাব না পেয়ে আবারও ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়। অরুণিতা’স কিচেনে গিয়ে অরুণ সরকার, আব্বাস খাঁ আর আলী খাঁ’র সাথে সাক্ষাৎ করে। প্রহর তখনও বাবার কোলে ঘুম। মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে অরুণের সফেদ শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছে। অরুণিতা’স কিচেন থেকে বেরিয়ে অরুণ ফার্মেসিতে চলে যায়। 

—————

পৌষের গোধূলি বেলা‌। কুহেলীর দল হ্যারিকেন হাতে দলবেঁধে এদিকেই ধেয়ে আসছে। অতিথি পাখিদের বিরামহীন কিচিমিচি ডাক সরকার বাড়ির প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত করে রেখেছে। পাতা ও রুবি পুকুর পাড়ে বসে আলাপ জুড়ে দিয়েছে। দুজনার মুখাবয়ব গম্ভীর। আলাপনের এক পর্যায়ে পাতা বলল,

“আপু, ভোর তোমাদের চোখের সামনেই বড় হয়েছে। ছন্নছাড়া ভাব আছে ওঁর। রাগ-গোস্বা, কথাকাটাকাটি যা হয় ওঁর বাবার সাথেই। তোমাদের সাথে কখনো বিদ্রূপ আচরণ অন্তত আমার চোখে পড়ে নি। ওঁর স্বভাব চরিত্র তোমাদের নখদর্পণে। আমি বিশ্বাস রাখি ও এমন কোনো দৃষ্টিকটু কিছু করে নি যার জন্য তুমি তাঁর গায়ে হাত তুলবে।”

রুবি হাসলো। মাটির ঢিমি তুলে পুকুরে ঢিল ছুড়ে বলল, “ তোমার কাছে দৃষ্টি কটু না লাগলেও আমার কাছে লেগেছে। ভাবী, আমার মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক। তোমার ছেলেও কচি খোকা না। আজ বিয়ে দিলে কালকেই বাপ হয়ে যাবে। আমার চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে আনিকাকে নিজের করে ছাড়বে। আমি যেন আঁটকে দেখাই। আস্ত বেয়াদব হয়েছে। তাছাড়াও তাঁরা বদ্ধ ঘরে একে অপরকে জড়িয়ে ছিলো। স্বচোক্ষে দেখেছি আমি। রাগ হবে না আমার? আবার শাক দিয়ে মাছ ঢাকার জন্য বলে ‘ইটস যাস্ট নর্মাল হাগ’। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি।”

পাতা রুবির দিকে ফিরে। রাগে মুখটা লাল হয়ে গেছে। রুবি আরও বলল, “তোমার মেয়েকে এরকম পরিস্থিতিতে দেখলে তুমি কি করতে?”

“আপু অরুকে…”

“আমি যাস্ট উদাহরণ দিচ্ছি তাই তুমি রেগে গেলে। আর আমি স্বচোক্ষে দেখেছি।” রুবি পাতাকে থামিয়ে দিল।

পাতা গায়ের শাল ভালোভাবে জড়িয়ে হালকা হেসে বলল, “ভাবী তুমিই ঠিক। ব্যাপারটা খুবই চোক্ষুলজ্জার। ভোর- আনিবুড়ি কাজটা ঠিক করে নি। শাসন প্রাপ্য। তবে তা দুপক্ষেই। একজনকে শাসন করলে আরেকজন….”

রুবি আবারও থামিয়ে দেয় পাতাকে। মুখে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল, “তুমি ভাবছো আমি ভোরকে সহ্য করতে পারি না। তাই ওর উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছি। ভাবী, আমি নিজের মেয়েকেও শাসন করেছি। ভোরকে তো একটা চড় মেরেই শোধ, আমি আনিকাকে দুটো থাপ্পর মেরেছি, কথা শুনিয়েছি। ও স্টিল আমার সাথে কথা বলছে না।”

পাতার আর কিছুই বলার থাকে না। রুবি নিজে থেকেই বলে, “আমি ভেবেছিলাম এরপর হয়তো ভোর সুধরে যাবে। কিন্তু নাহ্! সে আমার উপরে ক্ষোভ দেখাতে না পেরে তৈমুরকে ডেকে এনে বাজে ভাবে অপমান করেছে, হুমকি দিয়েছে। তা-ও জানে মেরে ফেলার হুমকি। তুমি এ ব্যাপার কিভাবে দেখছো ভাবী?”

পাতা উশখুশ করে। সে কি ভাববে? তাঁর তো হাসি পাচ্ছে। বিশ বছরের বাচ্চা ছেলেটা নাকি পঁচিশ বছরের তাগড়া যুবককে হুমকি দিয়ে এসেছে। তা-ও জানে মেরে ফেলার হুমকি! আচ্ছা রুবি আপু এই বিষয়টাকে পজিটিভলি নিতে পারে না? ভোর আনিকার জন্য কতটা বেপরোয়া! কতটা পাগল আনিকার জন্য!

“আপু, ভোর- আনিবুড়ির বিষয়টা নিয়ে আরেকবার ভাবা যায় না? ছোটবেলার সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুমি এখনও ভোরকে জাজ করছো! আর এই যুগে এসেও তুমি বলছো ভোর বাপ দাদার বংশ ধরে রাখবে। বাপ দাদার মতো দুই বিয়ে করবে! হাস্যকর নয় কি? এমনটা হলে তো আরিয়ান ভাইয়ারও আরেকটা বিয়ে করার কথা!”

রুবির কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়। বলে, “আমার দাদা শ্বশুরের প্রথম বউ অসুখে মরলে সে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিল। অরুণ ভাইয়ার মা মারা গেলে শ্বশুর মশাই আরেক বিয়ে করেছিল। অরুণ ভাইয়ার অবশ্য বউ মরে নি। ডিভোর্স হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে করেছে না?”

পাতার হাসি মুখটা বিমর্ষ হয়ে আসে। চোখ ভরে উঠতে সময় নেয় না। সে ঘন ঘন পলক ফেলে নজর ও অশ্রু দুটোই লুকিয়ে নেয়। রুবি হয়তো বুঝতে পারে। পাতার হাতে হাত রেখে অনুতাপের সুরে বলে, “আ’ম স্যরি ভাবী। কিন্তু এটাই তো সত্যি। দেখো? আদুরিরও ডিভোর্স হলো। অন্যত্র বিয়ে দিলাম ওকে। আর বাদ আছে আরিয়ান। আমি তো তাঁকেও সন্দেহ করি। কে জানে, লুকিয়ে অন্য কোথাও সংসার পেতেছে কি-না!”

রুবি বলতেই থাকে। তবে পাতার হঠাৎ মনে হলো তাদের পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। পাতার গা ছমছম করে ওঠে। সে বিদ্যুতের গতিতে পেছনে ফিরে। কালো ছায়া দেখে ভয়ে ভয়ে বলে, “কে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে?”

রুবিও কৌতুহলী দৃষ্টিতে পেছন ফিরে। তখনই আরিয়ান সরকার এগিয়ে আসে। রুবির দিকে তাকিয়ে কটমট করে বলল, “নিজের ভালো পাগলেও বুঝে। আমাকে পাগলা কুকুরে কামড়ায় নি যে নতুন করে সংসার পাতবো। আমি যদি পারতাম ঢাক ঢোল পিটিয়ে রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা ওলিতে গলিতে এহলান করে বেড়াতাম ‘বিবাহ করিয়া কেহু আপনার ঘরে সর্বনাশ ডাকিয়া আনিবেন না।’ কিন্তু আমার তো রগে রগে বাঙালিয়ানা! আমি একা কেন আতংক নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরবো? তোরাও আয়! একসাথে মরি। দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ।”

রুবি ফিক করে হেসে দিলো। বলল, “সব পুরুষ মুখে মুখে এমনটা বললেও তাঁরা মনে প্রাণে চার বিয়ের স্বপ্ন বুকে পুষে রাখে।”

“ভেরি ফানি!”

“তুমি যাও তো এখান থেকে। আমার ঝগড়া করার মুড নেই।” 

“কিন্তু আমার আছে! আসো ঝগড়া করি” রুবির কথার পৃষ্ঠে আরিয়ান ঝগড়ুটে গলায় প্রত্যুত্তর করলো। রুবি হতাশ বদনে বলল, “আরিয়ান প্লিজ?”

“কিসের প্লিজ রুবি? তোমার সাহস কি করে হয় আমার বংশ নিয়ে কথা বলার? আমার দাদা, আমার বাবা, আমার ভাই কিংবা আমার বোন। কেউই শখের বশে দ্বিতীয় বিয়ে করে নি। একেক জনের একেক রকম পরিস্থিতি ছিলো। এখন আমাদের বংশের সবার সাথেই এই দ্বিতীয় বিয়ের পরম্পরা চলতে থাকবে, যেমনটা তুমি ভাবছো। তাহলে তো পরের সিরিয়ালে আমি, আনিকা, রূপ, অরু, ওলাফ সবাই দাঁড়িয়ে আছি। ভোর একা না বুঝলে? আনিকার লাইফ পার্টনার হিসেবে ভোরকে আমার পছন্দ না। তাঁর মানে এই না ভোরকে আমি অপছন্দ করি। আমাদেরই তো ছেলে ভোর।”

পাতা হঠাৎ ম্লান হেসে বলল, “আপনাদেরই তো ছেলে। তবুও ভরসা করতে পারছেন না। একতরফা হলে না হয় বুঝতে পারতাম। কিন্তু আনিকারও সেম ফিলিং কাজ করে। তারপরও…”

পাতা কথা অধরা রাখে। আরিয়ান বলল, “ওঁরা এখনও বাচ্চা। আনিকা তবুও খানিকটা ম্যাচিউরিটি দেখায় তবে ভোর পুরাই ইমোশনাল ফুল। আবেগে ভাসছে এখন। দু তিন বছর পর যখন ম্যাচিউরিটি আসবে তখন এসব আবেগের দাম থাকবে না।”

“তাহলে দুই তিন বছর সময় নিন না ভাইয়া? আনিকারই বা কি বয়স? এখনই বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন! মনে হচ্ছে ভোর আনিকাকে পছন্দ করে বলেই আপনারা আনিকার বিয়ে দিতে চাইছেন। ভোর কি এতোটাই অযোগ্য আনিকার জন্য?”

“যোগ্য অযোগ্যের প্রশ্ন আসছে না আম পাতা জোড়া জোড়া। দুজন ভাই বোনের মতো বড় হয়েছে! হুট করেই নতুন সম্পর্কে জড়ানো কেমন দেখায় না? তাছাড়াও দুটোর একদন্ড পড়ে না। তাদের সংসার আমি অন্তত ভাবতে পারি না। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে শুধু ওঁরা না, অরুণ ভাই আর তোমার জা রুবির ভেতর মনোমালিন্য হবে। রুবির মুখ তো থামানো সম্ভব না। আবার অরুণ ভাইয়াও ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। আমি ভয় পাই নতুন সম্পর্ক পুরনো সম্পর্ক গুলোকে নিঃশেষ না করে দেয়। তুমি আমার কথা গুলো ভেবে দেখতে পারো।”

“কথাগুলো ফেলে দেবার মতো না। তাই বলে কি আমরা বাচ্চাদের কথা ভাববো না?”

রুবি এ যাত্রায় কঠিন গলায় বলল, “না ভাববো না। ভাবী, তোমার সো কল্ড ছেলের জন্য তোমার মতোই বেচারি টাইপ কাউকে খুঁজে নাও। যে ‘জি হুজুর’ করে বেড়াবে সবসময়ই। আমার মেয়েকে ‘জি হুজুরগিরি’ করা শেখাই নি আমি। সে উচিত কথা বলবে। তখন তোমার ছেলে, ছেলের বাপ কেউই হজম করতে পারবে না। তাদের বাপ ছেলের ন্যাকামি…”

আরিয়ানের ক্রোধ ভরা দৃষ্টিতে থামতে বাধ্য হয় রুবি। অপমানে পাতার মুখটা লাল হয়ে এসেছে। রুবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আমি মুখের উপর সত্যটা বলে দিই বলে আমার কথাগুলো খারাপ মনে হয়। বাট আমি সত্যটাই বলছি।” 

“তোমাকে তো সত্য কথা বলার জন্য নোবেল দেওয়া উচিত রুবি।”

আরিয়ান রুবি তর্ক লেগে যায়। পাতা আলগোছে সেখান থেকে উঠে আসে। সে বুঝে উঠতে পারে না রুবি আপুর সমস্যাটা কি! ভোরের বাবার কথাই কি তবে ঠিক? রুবি আপু চাইছে না, তাঁরা এ বাড়িতে থাকুক। সে বিষন্ন মনে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

—————

প্রহর বাড়িতে এসেই জোরে জোরে ‘মাম্মাম’ বলে ডাকতে শুরু করে। নিচে না পেয়ে দৌড়ে উপরে চলে যায়। অরুণ সরকার অলস ভঙ্গিতে ছেলের পিছু পিছু হাঁটে। দোতলায় উঠতেই রবীন্দ্র সংগীত কানে বাজে। অরুণ পথ পাল্টে স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে যায়। আধখোলা দরজায় কড়া নেড়ে বলল,

“সোনা, মে আই কাম ইন?”

“অফকোর্স ইয়্যু আর!”

অরুণ সরকার ভেতরে প্রবেশ করে। অরুণিতা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “পাপা, লেটস ডান্স!”

“নো!”

“ইয়েস! গিভ মি ইয়্যুর হ্যান্ডস?”

অরুণ পিঠ পেছনে হাত বেঁধে প্রস্তাব নাকচ করে, “আই কান্ট ডান্স!”

অরুণিতা ভোঁতা নাক সিকায় তুলে বলে, “পাপা, ABCD”

অরুণ ভ্রু কুঁচকে চায়। অরুণিতা বিরক্ত সুরে বলে, “এনিবডি ক্যান ডান্স, পাপা!”

“ASCND, সোনা!” 

বাবার কথায় অরুণিতার কপালে ভাঁজ পড়ে। অরুণ সরকার মেয়ের অনুকরণ করে বলে, “অরুণ সরকার ক্যান নট ডান্স, সোনা।”

অরুণিতার মুখাভঙ্গি দেখে মনে হলো অরুণ সরকারের প্রতিবিম্ব তারই সম্মুখ আয়নায় প্রতিফলিত হয়েছে। অরুণ ব্যর্থ চিত্তে হাত বাড়িয়ে দেয়। অরুণিতা হাতে হাত রাখতেই অরুণ তাকে গোল গোল ঘোরায়। পায়ে পা মিলিয়ে প্রতিটি স্টেপ নিপুণ ভাবে করে। অরুণিতা ঝলমল হাসি উপহার দিয়ে বলে,

“পাপা, ইয়্যু রিমেমবার সায়ান, ডুই ইয়্যু?”

অরুণ সরকারের চাহনি সুক্ষ্ম হয়। বলে, “নো। আই ডোন্ট রিমেমবার এনিওয়ান”

“পাপা, ইয়্যু নো হিম। তুমি বলেছিলে ওঁরা আমাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয় হয়।”

অরুণ সরকার আবারও মেয়েকে গোল গোল ঘোরায়। বলে, “সায়রার ছেলে তাই না?”

“ইয়েস!”

“তারপর বলো?”

“পাপা, সায়ানের নানুবাড়ি গ্রামে। ওঁর কাজিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। সব ফ্রেন্ডসদের ইনভাইট করেছে। গ্রামের বিয়ে নাকি অনেক ইউনিক হয়। আমার সব ফ্রেন্ডস যাবে। সায়রা মিস বললো দিদুনের বোন আছে ওই বাড়িতে। ”

অরুণ সরকার আকস্মিক থেমে যায়। স্বাভাবিক মুখে গাম্ভীর্যতা ফিরে আসে। পরবর্তী কথা না শুনেই বুঝতে পারে মেয়ের মনভাব। সে সরাসরি নাকচ করে বলে,

“সোনা, আমি আমার নিকটাত্মীয়কে ভরসা করতে পারি না, সেখানে ওঁরা তো দুঃসম্পর্কের। যাইহোক নেক্সড উইকেন্ডে আমরা সবাই কোথাও ঘুরে আসবো। তুমি বলো কোথায় ঘুরতে চাও?”

অরুণিতার উজ্জ্বল মুখে আঁধার নামে। কিছু সময় চুপ থেকে বলে, “তোমার আদরের ছেলেদের বেলায় কখনো ‘না’ বলতে দেখলাম না। অথচ আমার সব কিছুতে তোমাদের ‘না’ শব্দটাই আগে আসে।”

অরুণিতা মেঝেতে বসে পড়ে। বাবার স্তম্ভিত মুখপানে চেয়ে পায়ের সোনার ঘুঙুর জোড়া খুলতে খুলতে বলল, “স্যরি পাপা, আমি ওভাবে বলতে চাই নি।”

অরুণ হাঁটু গেড়ে বসে মেয়ের সামনে। পা হতে ঘুঙুরের বাঁধন খুলে দেয়। কোমল স্বরে বলে, “তোমার কথায় ভুল নেই। ওঁরা দুজন আমার খুব আদরের ছেলে। কিন্তু তুমি তো আমার মা। সোনা মা, তোমাকে অচেনা জায়গায়, অচেনা মানুষের মধ্যে…”

“পাপা, আ’ম নট আ বেবি গার্ল। আমার সব ফ্রেন্ডগুলো যাচ্ছে‌। ওদের বাবা-মা অনুমতি দিয়েছে। কারণ তাদের নিজ ছেলে মেয়েদের চিন্তা নেই। যত চিন্তা সব আমার পাপার।”

অরুণ হাসলো। মেয়ের এলোমেলো চুল গুছিয়ে রেবনে বাঁধতে বাঁধতে বলল, “ছোটবেলায় ব্যাঙের পেছনে ছুটতে ছুটতে পানিতে পড়ে গিয়েছিলে। তোমাকে খুঁজে না পেয়ে আমি তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। সবার উপর চিল্লাচ্ছিলাম। তোমার ভাইকে অনেক বকেছিলাম। দুই ঘা বসিয়েও দিয়েছিলাম। পরে রূপ এসে বলল পুকুর ঘাটে তোমার চিপস পড়ে আছে। আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। পুকুর থেকে যখন তুললাম ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট দেহখানি। সেদিন থেকে আমি হার্টের রুগি। অল্পতেই আমার প্রেসার সবসময় হাই হ্যালো করে।”

“পাপা, মাম্মাম তোমার ইমোশনাল টাইপ মন ভোলানো কথাবার্তায় গলে যায়। কিন্তু আ’ম নট লাইক মাম্মাম। যাও তো এখান থেকে। আচ্ছা থাকো, আমিই চলে যাচ্ছি।”

অরুণিতা রসকষহীন গলায় প্রত্যুত্তর করে নিজেই চলে যায়। অরুণ চোয়াল চুলকে মেয়ের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়ে কোন ধাতুর তৈরি? একে বশ মানানো অসম্ভব ব্যাপার!

অরুণ টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে রুমে প্রবেশ করে। শু জোড়া খুলে তাকে সাজিয়ে রাখে। মুজো জোড়া ময়লা কাপড়ের ঝুরিতে রেখে ডাকলো, “পাতাবাহার?”

সাড়াশব্দ নেই। অরুণ ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে চোখ বুজে নেয়। কেমন ফাপড় আঁটকে আসে। আবার প্রেসার বাড়লো কি! হয়তোবা! সকালে ওষুধ খাওয়া হয় নি। পাতাবাহার জানলে গলা চেপে ধরবে। অরুণ চোখ মেলে তড়িঘড়ি উঠে বসে। ওষুধের বাক্স খুলে সকালের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ সরিয়ে নেয়। পায়ের শব্দ পেতেই সজাগ হয়। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে এগিয়ে আসে। হালকা পাতলা দেহ খানি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “পাতাবাহার, কোথায় ছিলে? কখন থেকে ডাকছি। আই মিসড ইয়্যু সো মাচ।”

সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার কার্যকরী প্রয়াস। অরুণ বাঁধন দৃঢ় করে আপন নারীর ঘ্রাণ শুষে নেয়। ছোট ছোট আঁখি যুগ্ম আবেশে বন্ধ হয়। এই তো সুখ! 

প্রহর মায়ের পিছু পিছুই ঘরে ঢুকেছে। বাবার কথায় বিরোধীতা করে বলে, “মাম্মাম, পাপা মিথ্যে কথা বলছে। পাপা তোমাকে একটুও মিস করে নি। আই মিসড ইয়্যু মাম্মাম। অনেক বেশি বেশি মিসড ইয়্যু।”

অরুণ সরকার চোখ মেললো। পাতার ঘারে থুতনি ঠেকিয়ে ছেলের দিকে সুক্ষ্ম নজরে তাকালো। প্রহর চোখ পিটপিট করে বলে, “তুমি আপুর মতো করে তাকাচ্ছো কেন?”

অরুণ হেসে পাতার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, “পাতাবাহার, আই লাভ ইয়্যু।”

প্রহর শুনতে পায়। সে মায়ের হাত ঝাঁকিয়ে বলে, “মাম্মাম, পাপার থেকে বেশি বেশি আই লাভ ইয়্যু!”

পাতা বুকে দু্ই হাত ঠেকিয়ে ঠেলে সরায় অরুণকে। কোনো কথা না বলে প্রহরকে বিছানায় বসিয়ে শু, মুজো, শার্ট, প্যান্ট খুলে বাড়ির পোষাক পরিয়ে দেয়। প্রহর মায়ের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “মাম্মাম তোমার মন খারাপ?”

“উঁহু, গিজার ওন করা আছে। গরম পানিতে হাত মুখ ধুয়ে আসো।”

প্রহর মাথা নেড়ে চলে যায় ওয়াশরুমে। অরুণ সরকার ব্লেজারের ভেতর পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করে বিছানায় রাখে। আড়চোখে পাতার দিকে তাকিয়ে বলে, “পেঁচার মতো মুখ বানিয়ে রেখেছো কেন? কি হয়েছে?”

পাতা প্যাকেটটা আলমারিতে লুকিয়ে রেখে বলে, “কিছু না।”

অরুণ সরকার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে কৌতুকপূর্ণ গলায় বলে, “এক্সাক্টলি পাতাবাহার। কিছুই হয় নি। বরং এটাকে গুড নিউজও বলা চলে।”

পাতা বরফ শীতল স্বরে বলল, “তাহলে মিষ্টি বিতরণ শুরু করে দিন।”

“রিপোর্ট পজিটিভ আসলে অবশ্যই বিতরণ করবো।”

পাতা মেঝে থেকে ছেলের শু তুলে ছুঁড়ে মারে। অরুণ বাহু ডলতে ডলতে মুখ কুঁচকে নিয়ে বলে, “এতো জলদি মুড সুইং শুরু হলো তোমার?”

পাতা এবার নিজের পায়ের স্যান্ডেল ছুঁড়ে মারে অরুণের উদ্দেশ্যে। অরুণ স্যান্ডেল ক্যাচ করে হাসে। ফর্সা গোলগাল মুখটা রাগে-অভিমানে লাল টুকটুকে হয়ে আছে। অরুণ তাতে ঘি ঢেলে বলল, “বাচ্চারা জানলে খুশি হবে। বিশেষ করে ভোর।”

পাতা রাগে বোম হয়ে বসে। যেকোনো সময় ফেটে পড়তে পারে। অরুণ সরকার মজা পায়। ইদানিং বাজে এক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে সে। নেশাটা হলো পাতাবাহারকে রাগিয়ে দেওয়া। মহিলা এখন অল্পতেই রেগে যায়। হাতের কাছে যা পায় ছুঁড়ে মারে। কতক্ষণ চেঁচামেচি করে। তারপর নিজে নিজেই কেঁদে ভাসায়। সে কাছে গেলেই ছ্যাত করে ওঠে। আবার কাছে না গেলেও ছ্যাত করে ওঠে।  

"তোমার জন্য কিছু এনেছিলাম! তোমার পছন্দের তেঁতুলের চাটনি। ডজন খানেক এনেছি। ফুরিয়ে গেলে আবারও আনবো। এখন কি একটা খাবে? দাঁড়াও ছিঁড়ে দিচ্ছি!"

অরুণ সরকার দাঁত দিয়ে চাটনির প্যাকেট ছিঁড়ে। অধর কিনারায় দুষ্টু হাসি। পাতার গা জ্বলে পুড়ে ওঠে সেই হাসিতে। অরুণ চাটনি জিভে লাগিয়ে নাক মুখ কুঁচকে নেয়। চ্চা-ধ্বনি নির্গত করে বলে, "এটাতো একটু বেশিই টক লাগছে। নাকি আমার মুখেই বেশি টক লাগছে! একটু মুখে নিয়ে দেখ তো বউটি?"

আর বুঝি সহ্য করা গেলো না? চাটনির প্যাকেট ছিনিয়ে নেয় পাতা। ছুঁড়ে ফেলে অরুণের দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলল, "খুব হাসি পাচ্ছে তাই না?"

অরুণের হাসি আস্তেধীরে গায়েব হলো বিচলিত সুরে বলল, "একদমই না। আমার তো খুব কান্না পাচ্ছে! এই দেখো আমি কাঁদছি। শুধু চোখের পানিটাই নেই। আসলে পুরুষ মানুষ চোখের পানি সহজে দেখায় না। তুমি বললে আমি দেখাতে রাজি আছি।"

"তো দেখান!"

অরুণ পাতার কাঁধে বাহু ভর দিয়ে দাঁড়ায়। ঝুঁকে এসে পাতার নাকের ডগায় কামড় বসায়। পাতা নাকের পাটা ফুলিয়ে আহত বাঘিনীর ন্যায় শত্রুপক্ষের উপর হামলে পড়ে। উন্মুক্ত পেশিবহুল বাহুতে দাঁত কপাটি গেঁথে গেছে। অরুণ সরকার পাতার ধারালো দাঁতের দংশনে নাস্তানাবুদ। বাহু ঝাঁকিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,

"আরে পাগলী, মজা করছিলাম। ছাড়ো... পাতাবাহার লাগছে তো! ছাড়ো... এই রাক্ষসী! ওরে আল্লাহ রক্ত খাচ্ছো নাকি? মানুষের রক্ত খাওয়া হারাম! স্বামীর রক্ত খাওয়া বেশি বেশি হারাম। আমি কিন্তু আল্লাহ পাকের কাছে বিচার দিবো বলেছিলাম! ইয়া আল্লাহ রিপোর্ট যেন পজিটিভ আসে।"

পাতা বাহু কামড়ে ধরেই ফ্যাল ফ্যাল করে চাইলো তারদিকে। এই লোকের কি লাজ লজ্জা নেই? কতটা নির্লজ্জতার সাথেই না বলছে রিপোর্ট পজিটিভ আসুক। পজিটিভ আসলে কি হবে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp