আকাশ পরিষ্কার। বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাড়ির পেছনের জানালাটা খোলা, শিক নেই। মারুফ অনেকবারই এই জানালায় শিক লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু তার দুই মেয়ে কোনোভাবেই রাজি হয়নি। যদিও তারা ভালোভাবেই জানে, একদিন না একদিন ঐ জানালায় শিক বা গ্রিল ঠিকই লাগানো হবে। মারুফ খন্দকার মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আপস করবেন না।
শিকবিহীন জানালা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে মেঝেতে। মার্জিয়া ঘরে নেই, উঠোনে গাছে পানি দিচ্ছে। মৌমিতা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুল এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। কপালের উপর একগোছা চুল থুতনি সমান ছোট করে কেটে রেখেছে সে। হালকা বাতাসেই সেগুলো এসে নাকে মুখে ঢুকতে চায়! শুরুর দিকে বিরক্ত লাগলেও এখন এটার সাথে সে মানিয়ে নিয়েছে। নিজেকে তার এভাবেই ভালো লাগে। বৈদ্যুতিক পাখার নিচে দাঁড়িয়ে মেয়েটা চুলগুলো আঁচড়ে নিলো, তারপর একটা হাতখোঁপা বেঁধে ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকলো। এখন তাকে বের হতে হবে।
মারুফ খন্দকার সোফায় বসে আছেন, খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছেন। রাবেয়া তার সামনে চায়ের পেয়ালা রেখে বললেন, “দোকানে যাচ্ছেন না যে? বিকাল হয়ে গেলো।”
মারুফ পত্রিকা নামিয়ে রাখলেন, “আজকে একটু গণ্ডগোল হয়েছে ঐদিকে—”
কথা শেষ না হতেই বারান্দায় শব্দ হলো, রিপন এসেছে। ভেতরে ঢুকে সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘরের দিকে যেতে শুরু করলো। মারুফ তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “রিপন, কী খবর? আজকাল তোমাকে দেখা যায় না। কোথায় থাকো?”
রিপন হাঁটা বন্ধ করে মারুফের কাছে এসে দাঁড়ালো, “কী আর বলি! বিরোধী দলের ছেলেগুলোর ডানা গজিয়েছে। সেটাই ছেঁটে দিয়ে আসলাম আরকি!”
“ওহ। তার মানে আজকের ঝামেলার মধ্যে তুমিও ছিলে।”
রাবেয়া ভয়ানক রেগে গেলেন, “এটা কেমন কথা রিপন? তোমাকে আমি এখানে এনে রেখেছি মারামারি করার জন্য? পড়াশোনার নাম নেই, সারাক্ষণ শুধু রাজনীতি, রাজনীতি—”
মৌমিতাকে বেরোতে দেখে রাবেয়ার মনোযোগ সেদিকে ঘুরে গেলো, “মৌ? তুমি কই যাও?”
ব্যস্তভাবে জবাব দেয় মৌমিতা, “টিউশন আছে—”
“না না। কোথাও যাওয়া হবে না আজকে। বাইরে ঝামেলা হয়েছে, মারামারি হচ্ছে, এসবের মধ্যে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। বাসায় পড়ো।”
প্রস্তাবটা মৌমিতার ভালো লেগেছে। বাইরে যাওয়ার পরিবর্তে ঘরে থাকার পরামর্শ তার বরাবরই প্রিয়। তবু আরেকবার নিশ্চিত হওয়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো, “যাবো না?”
রাবেয়ার আগে মারুফ বলে উঠলেন, “যাবে না কেন? তোমার স্যার তো অন্যদিকে পড়ায়, ঐদিকে কোনো ঝামেলা হয়নি। যাও।”
রাবেয়া আর কিছু বললেন না, মৌমিতা তার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বেরিয়ে পড়লো। মার্জিয়া ততোক্ষণে ভেতরে এসেছে, মগ-বালতি রেখে এসে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলো সে। রিপন তার বড় বোনের দিকে তাকিয়ে আগের প্রসঙ্গ টেনে আনলো, “এতো ভয় করেন কেন আপা? এই পুরা নাটোরে কারও এতো বড় বুকের পাটা নাই যে আমার ভাগ্নির সাথে ঝামেলা করবে। না মারুফ ভাই?”
মারুফ কোনো মতামত জানালেন না, সোফায় হেলান দিয়ে পা দোলাতে লাগলেন। রিপনও আর দাঁড়িয়ে থাকলো না, নিজের ঘরে ঢুকে পড়লো। রাবেয়া মার্জিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছে পানি দিয়েছো?”
মার্জিয়া মাথা নাড়ে, “হুম।”
“তাহলে এখন সবজিটা একটু কেটে দাও তো মার্জু। আমার আরও কাজ আছে।”
সে দ্বিরুক্তি করলো না। রান্নাঘরে ঢুকে বটি নিয়ে বসে পড়লো।
রিপন গোসল সেরে বেরিয়েছে। মারুফকে সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখে সে সামনে রাখা পত্রিকাটা নেয়। শিরোনামে চোখ বুলিয়ে বলে, “দোকানে যাবেন না দুলাভাই?”
মারুফ চোখ খুললেন, তবে কোনো জবাব দিলেন না। রিপনের একটা ভালো গুণ আছে, প্রশ্নের জবাব না পেলেও সে কখনও অভিযোগ করে না।
মার্জিয়া হাত ধুয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছিলো, জহির মিঞার কণ্ঠ শুনে সে ভ্রু কুঁচকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। জহিরের হাতে মিষ্টির হাঁড়ি, মুখে চওড়া হাসি। মারুফের দিকে দৃষ্টি রেখে তিনি মাথা নাড়লেন, “কী অবস্থা মারুফ?”
মারুফ সোজা হয়ে বসলেন, “এই তো ভালোই। আপনি আবার এই অবেলায় মিষ্টি দিয়ে এলেন যে?"
জহির মিঞা হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, টেবিলের উপর হাঁড়িটা রাখলেন, “ঐ যে একটা ঘটকালি করলাম না গত সপ্তাহে? বিয়ে ঠিক হয়েছে, বুঝলা? দুইজনই টাকাওয়ালা পরিবারের মানুষ।”
রাবেয়া বললেন, “ভালোই হলো। আমাদের মেয়ের ঘটকালিও নাহয় আপনিই করেন—”
জহির ঘুরে মার্জিয়ার দিকে তাকালেন। রিপন খ্যাঁক করে হেসে বললো, “বড়টার কথা বলছে। এর তো এখনও বয়স হয়নি।”
মারুফ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, “বড় জনেরও বয়স হয়নি।”
জহির মিঞা একটু শব্দ করে হাসলেন, “তোমার বড় মেয়েকে নিয়ে চিন্তা কী? সময় হলে দেখো ভালো ভালো প্রস্তাব আসবে। খুব লক্ষ্মী মেয়ে...”
মার্জিয়া মনে মনে বলে, “হ্যাঁ, আর আমি অলক্ষ্মী।”
মারুফ ছোট মেয়ের দিকে তাকালেন, “মা, তুমি যাও, পড়তে বসো।”
—————
“আগস্ট, ১৯৯০:
আমাদের সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী হলেন জহির চাচা। উনার স্ত্রীকে আমি দেখিনি। আমি খুব ছোট থাকতেই চাচি মারা গেছেন। এক মেয়ে আর দুই ছেলেকে চাচা একা একা মানুষ করেছেন। ছোট ছেলে বাদে বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। চাচা এককালে প্রাইমারিতে মাস্টারি করতেন, এখন পুরোদস্তুর ঘটক হয়ে গেছেন। রাস্তায় যাতায়াতের সময় মাঝে মাঝে উনার সাথে দেখা হয়, তখন তিনি নানান ধরনের পরামর্শ দেন। কিন্তু কথার উপসংহার ঐ বিয়ের প্রসঙ্গে গিয়েই থামে। এই মানুষটা স্ত্রী ছাড়া এত দীর্ঘ একটা সময় কাটিয়ে দিয়েছেন, দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি, এটা ভাবলে একটা আলাদাই শ্রদ্ধা কাজ করে চাচার প্রতি।
জহির চাচার ছোট ছেলের নাম জুনায়েদ। ছোটবেলা থেকে নানান কারণে তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। আব্বা তাকে খুব স্নেহ করেন। আমাদের জন্য যখন কিছু আনতেন, তার জন্যেও আনতেন। জুনায়েদ ভাই কথা বলেন কম, যদিও আমার মত অসামাজিক নন। একসময় তিনি আমাদের বাড়িতে আসা কমিয়ে দিয়েছিলেন। রিপন মামা অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর যখন আমাদের বাড়িতে উঠলেন, তখন থেকে জুনায়েদ ভাই আবার আগের মত আসা-যাওয়া শুরু করেছেন। আর তারপরেই একটা বিষয় আমি খেয়াল করলাম।
অনেক আগে আমাদের বাড়িতে একজন কম বয়সী বুয়া কাজ করতেন। নাম ছিল ময়না। আমরা ডাকতাম ময়না আপা। উনার সাথে মার্জিয়ার বেশ সখ্য হয়েছিল। ময়না আপা জুনায়েদ ভাইকে বলতেন– ছোট ভাইজান, তার দেখাদেখি মার্জিয়াও তাই বলে ডাকত। এরপর যে কত কী হয়ে গেল! আপার বিয়ে হয়ে গেল, আমরাও বড় হয়ে গেলাম। মার্জিয়া এখন আর ছোট ভাইজান কথাটা ব্যবহার করে না, জুনায়েদ ভাই বলে ডাকে। জান শব্দটা বাদ দিয়েছে। অথচ তার মনের ভেতর উঁকি দিলে দেখা যেত—ভাইজানের ‘ভাই’ উধাও, শুধু ‘জান’ রয়ে গেছে! মেয়েটা মনে করে, আমি কিছু বুঝি না, বুঝি ঠিকই, কিন্তু কিছু বলি না।
বয়সটাই এমন। সবকিছু স্বপ্নের মত দেখায়, কিন্তু শেষমেশ তা দুঃস্বপ্নে রূপ নিলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে মন চায় না।”
বাদল ডায়েরিটা বন্ধ করলো। আর মাত্র দুইটা পৃষ্ঠা বাকি আছে, তারপরের পাতাগুলো ফাঁকা। ডায়েরি বইয়ের মাঝে রেখে সে ব্যাগটা কাঁধে নেয়। ক্লাস শুরু হবে মিনিট খানেকের মধ্যেই। গতকাল অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমজাদের পরিচিত ঐ মৌমিতাকে পাওয়া যায়নি। কলেজেই আসেনি মেয়েটা। আজকে আবার তাদের ক্লাসে যেতে হবে, মৌমিতাকে খুঁজতে হবে।
বেশ রোদ উঠেছে। মাঠে অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই মাথা গলে পড়ার মতো অবস্থা!
টিফিনের ঘণ্টা বাজামাত্র বাদল বেঞ্চে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো প্রায়। সে এবং রাশেদ বিজ্ঞানের ছাত্র। আমজাদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো হলেও পড়ার ব্যাপারে কোনো পরামর্শ পাওয়া যায় না, কেননা সে মানবিকে।
একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুধু শুরু হওয়ার খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এখনই রাশেদরা অতিরিক্ত পড়ার চাপ অনুভব করতে পারছে।
ঘণ্টা শোনার পর স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেছেন। রাশেদ উদ্দেশ্যহীন হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ, তারপর বইয়ের পাতা ওল্টাতে শুরু করলো। অনেকেই ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। পাশে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকা বাদলের দিকে তাকায় রাশেদ, নিচুস্বরে বলে, “বাদল? আমজাদ ভাই এসেছে।”
বাদল টেবিল থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো। আমজাদ প্রায় ছুটে এলো সেদিকে, প্রফুল্ল মুখে বললো, “আজকে এসেছে মৌমিতা।”
মানবিক বিভাগের ক্লাসের সামনে এসে আমজাদ বাদলের দিকে তাকায়, “ডায়েরি আবার হোস্টেলে রেখে এসেছিস নাকি?”
“না, ব্যাগেই আছে।”
বেঞ্চের এককোণে বসে থাকা সুরাইয়া আড়চোখে তাদের দিকে তাকালো, তার উপস্থিতি হয়তো টের পায়নি আমজাদরা। কিংবা পেলেও উপেক্ষা করছে। ছেলে তিনজন ভেতরে ঢুকলো। সুরাইয়া হাত গুটিয়ে বসে, তাদের দিকেই তাকিয়ে থাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।
আমজাদ একটা মেয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো, “মৌমিতা?”
মেয়েটা পেছনে ঘুরলো। প্রায় ধবধবে গায়ের রং, লম্বা চুল বিনুনি বাঁধা। মৌমিতা নামের মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে, “কী?”
আমজাদ আর রাশেদ, বাদলের মুখের দিকে তাকায়। বাদল হঠাৎ অপ্রস্তুত বোধ করে, মেয়েটার দিকে সরাসরি না তাকিয়ে মাথা নিচু করে, অস্থির ভঙ্গিতে বলে, “আ... আপনার ডায়েরিটা আমার কাছে আছে।”
“কোন ডায়েরি?”
“যেটা আপনি... ঐ যে, ডাস্টবিনে ফেলেছিলেন—”
“দুঃখিত। আমি ডায়েরি ব্যবহার করি না।”
কথাটা বাদলের মাথায় ঢুকতে যেন একটু সময় নেয়। সে এবার ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার চোখের দিকে তাকায়, “আপনার পুরো নাম কী?”
ছেলেটার কণ্ঠ থেকে কোমলতা এবার পুরোপুরি খসে পড়েছে। হঠাৎ তার এমন স্বর পরিবর্তনে মেয়েটা থতমত খেয়ে বলে, “মৌমিতা সাহা।”
বাদল ভ্রু সোজা করে আমজাদের দিকে তাকালো, তারপর হনহন করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো। বাকি দু'জনও তাকে অনুসরণ করে বাইরে আসে। আমজাদ বাদলের কাছাকাছি এসে বলে, “ডায়েরিটা রেখে এসেছিস, তাই না? আমি জানতাম তো, একটা কাজও—”
বাদলের বিরক্তি সপ্তম আকাশে! সে ঘুরে রুক্ষ স্বরে বললো, “ঐ মৌমিতা না। ডায়েরিটা মৌমিতা খন্দকারের।”
“ওহ। তুই তো আমাকে পুরা নাম বলিস নাই।”
“আপনি এতোটুকু বলতে পারতেন যে এই মেয়েটা হিন্দু।”
“বললাম যে তখন? রাশেদকে বলেছিলাম, রাশেদ বলেনি তোকে?”
বাদল হাঁটা থামিয়ে রাশেদের দিকে তাকায়। রাশেদ টু শব্দটিও করে না। ঢোক গিলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। বিষয়টা তার একেবারেই মনে ছিলো না। এতো বড় একটা ঝামেলার কেন্দ্রে যেহেতু সে এসেই পড়েছে, এবার বাদল অনেক কথা শোনালেও প্রতিবাদ করার উপায় নেই। প্রয়োজনও নেই। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে বাদল ছোট একটা শ্বাস ফেলে বললো, “আচ্ছা, সমস্যা নাই।”
তারপর সে নিজের ক্লাসে ঢুকে গেলো। রাশেদ আর আমজাদ হা করে চেয়ে রইলো দরজার দিকে।
বাদলকে হুট করে বেশ অপরিচিত মনে হচ্ছে। এই ছেলেটা চুপ করে থাকা একেবারে সহ্য করতে পারে না। কম কথা বলা তার কাছে বড়সড় অপরাধ। আর আজ একজন অপরাধীকে হাতেনাতে ধরেও সে একটা কথাও শোনালো না। এই পরিবর্তনে রাশেদ তেমন স্বস্তিবোধ করছে না, সে ঐ বিস্ময়ের সুরেই বলে উঠলো, “বাদলের কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি, আমজাদ ভাই?”
টিফিন পিরিয়ড শেষ। মেঘের গুড়গুড় শব্দ শোনা যাচ্ছে, সূর্যটা ঢেকে গেছে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে। জানালা দিয়ে সজোরে বাতাস ঢুকতে লাগলো। মৌমিতার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখের সামনে উড়ছে। সে জানালার কপাট টেনে বন্ধ করে দিলো। তামান্না তার খাতায় একবার উঁকি দিয়ে নিজের খাতায় লিখতে শুরু করে, বলে, “আজকে তাড়াতাড়ি ছুটি দিলে ভালো হতো।”
মৌমিতা কিছু বললো না, মুখের উপর থেকে ছোট চুলগুলো সরিয়ে আবার লেখায় মনোযোগ দিলো। তামান্না পেছনের বেঞ্চে হেলান দিয়ে বললো, “তুই এতো চুপচাপ থাকিস কেমনে? আমি যদি তোর মতো হতাম, আমার মা খুব খুশি হতো। আমি সারাদিন বকবক করি, মা একদম অতিষ্ঠ হয়ে যায়।”
মৌমিতা লিখতে লিখতেই বললো, “আর আমার আম্মা চুপ করে থাকলেই রাগ করে।”
তামান্না খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ওঠে, “মা অদল বদল করে ফেলি!”
“তোর মুখে কোনো লাগাম নাই?”
“নাহ।”
মৌমিতার লেখা শেষ। সে খাতা জমা দেয়ার জন্য দাঁড়াতে গেলেই তামান্না তার হাত টেনে ধরে, “আমি তোরটাসহ একসাথে দিয়ে আসবো। আমার লেখা শেষ হোক।”
অন্ধকার হয়ে এসেছে। ভ্যাপসা গরম। বৃষ্টির দেখা নেই। কিছুদিন হলো এমনই হচ্ছে। আবহাওয়া হঠাৎ করে বদলে যায়, দমকা বাতাস বইতে শুরু করে। কালো মেঘের গর্জন শোনা যায়। কিন্তু বৃষ্টি নামে না। জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে আছে এক পশলা বৃষ্টির অপেক্ষায়। এবারের বর্ষাকালটাও খুব গরমে কেটেছে। এমনিতেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি গরম পড়ে নাটোরে। এই বছরে যেন সেই গরমের দাপট আরও বেড়ে গেছে। গ্রীষ্ম, বর্ষা পেরিয়ে শরতে এলেও তা কমছে না, বরং বেড়েই চলেছে। তার উপর লোডশেডিং!
মার্জিয়া ভেজা চুলে বারান্দায় পায়চারি করছে। মনে মনে পরিকল্পনা করে রেখেছে রাতে ঘুমানোর আগে আরেকবার গোসল করবে। আপার হয়তো আজকেও ব্যবহারিক ক্লাস আছে, তাই কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে। আব্বাও আসেননি এখনও। খুব একঘেয়ে লাগছে। রাবেয়া তাকে কাপড় গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এই গরমে ঘরে বসে ঐ বিরক্তিকর কাজ সে করতে চায় না।
খাওয়ার ঘরে গিয়ে ফ্যানের সুইচ চালু করে দেখলো মার্জিয়া, বিদ্যুৎ আসেনি এখনও। সে ঘরে ঢুকে জানালা খুলে পর্দা সরিয়ে দিলো। বাতাস ভালোই আসছে, তবে গরম বাতাস। মেঘ সরে গেছে।
মৌমিতা দুলতে দুলতে ঘরে ঢুকলো, কলেজের পোশাকটা ঘামে ভিজে গেছে। শরীরে একফোঁটা পানি অবশিষ্ট নেই যেন। মার্জিয়া তাকে দেখে বলে উঠলো, “তোমার তো খুবই খারাপ অবস্থা! কারেন্ট আসেনি এখনও। বিকালেও যদি না আসে, পানি তোলাই হবে না আজকে।”
মৌমিতা এমন ভান করলো, যেন সে কিছুই শুনতে পারেনি। ব্যাগটা টেবিলের উপর তুলে রাখলো। মার্জিয়ার মনে পড়লো, ফ্যান চালু করা নিয়ে ঝগড়া হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাদের আর কথা হয়নি। মৌমিতা সবসময় এমন করে। সামান্য একটা মনোমালিন্যকে পুঁজি করে কয়েকদিন অভিমান করে থাকে। প্রতিবার মার্জিয়াই তার রাগ ভাঙায়। আজ তা করার প্রয়োজন হলো না, মৌমিতা বললো, “পানি শেষ নাকি?”
মার্জিয়া মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ, পানি শেষ। কারেন্ট আসলেই মোটর চালু করবো। আচ্ছা, তোমাকে কি এক গ্লাস শরবত বানিয়ে এনে দেবো?”
মৌমিতা চেয়ারে বসলো, “আচ্ছা।”
মার্জিয়া দৌড়ে চলে গেলো। খোলা জানালা দিয়ে মৌমিতা বাইরে তাকায়। পাখির কিচির মিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেদিন রিপন বললো, কামরাঙা গাছে নাকি বুলবুলি পাখি বাসা বেঁধেছে। কথাটার সত্যতা কতোটুকু, তা জানা যায়নি। খাবারের ঘর থেকে খুটখাট আওয়াজ আসছে। মার্জিয়া সম্ভবত শরবত বানাচ্ছে। মৌমিতা ধূসর ডায়েরিটা বের করলো, আনমনে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ।
শরবতের গ্লাস এনে মার্জিয়া বড় বোনের দিকে এগিয়ে দিলো, মুখ বিকৃত করে বললো, “লেবুটা ভালো না, তিতা।”
সে ধপাস করে বিছানার উপর বলে পড়লো। টেবিলের উপর রাখা ডায়েরিটা দেখিয়ে বললো, “এটা আব্বা দিয়েছেন?”
“হুম।”
“কী লিখবা এখানে?” মার্জিয়া ভ্রু নাচায়। মৌমিতা ঢকঢক করে শরবতটা গিলে ফেলে, মাথা নেড়ে বলে, “কিছু লিখবো না।”
“কেন? ফাঁকাই থাকবে?”
“হুম।”
“ওহ। তাহলে আমাকে দিয়ে দাও। যদি তোমার না লাগে।”
মৌমিতা সরু চোখে তাকালো, “তুই কী করবি?”
“করবো কিছু একটা—”
“ঠিকভাবে না বললে দেবো না।”
মার্জিয়া সরে বসলো, তারপর বিছানায় শুয়ে পড়লো, “নিজেও লিখবা না, আমাকেও দিবা না। তোমার বাচ্চাকাচ্চাকে দিও!”
“গ্লাসটা রেখে আয়।”
“তুমি রাখো। দিনে দিনে অলস হয়ে যাচ্ছো তুমি।”
“জুনায়েদ ভাইয়ের মতো কথা বলবি না।”
“আমি কারও মতোই কথা বলি না। যেটা সত্যি, সেটাই বললাম।”
—————
বিদ্যুৎ এসেছে সন্ধ্যার দিকে। খাটের নিচে জ্বলন্ত কয়েলটা কোনোমতো ঢুকিয়ে আমজাদ পায়চারি করতে লাগলো, “ইশ! কী মশা রে!”
রাশেদ বলে উঠলো, “আমি এখন পর্যন্ত চৌদ্দটা মশা মারলাম।”
“এতোক্ষণে তো মশার চৌদ্দ গুষ্টি শেষ হওয়ার কথা তাহলে, এখনও এতোগুলো বেঁচে আছে কেমনে?”
“আপনার খালি উল্টাপাল্টা কথা।”
বাদল টেবিলে গিয়ে বসেছে। রাশেদও পড়ার টেবিলেই বসে আছে, কিন্তু পড়া ছেড়ে মশা নিধন করছে। আমজাদ আরেকজনের দিকে তাকিয়ে খোঁচা দিয়ে বললো, “রাশেদ? দেখিস এবার বাদল সব সাবজেক্টে ফার্স্ট হবে, বলে রাখলাম।”
ওরা দু'জনই খুব ভালোভাবে জানে, বাদল পড়াশোনা করতে বসেনি। রাশেদ চাইলেই আমজাদের কথায় সম্মতি জানিয়ে আগুনে ঘি ঢালতে পারতো। কিন্তু সে তা করে না, টেবিলের দিকে ঘুরে বসে আপনমনে বলতে থাকে, “আমাদের রুমে একটা কড়া সিনিয়র থাকলে ভালো হতো। কান ধরে পড়তে বসাতো। আমজাদ ভাই তো নিজেই পড়াশোনা করে না। আমরা যদি ভুলেও পড়তে যাই, কান ধরে টেবিল থেকে তুলে দেয়!”
আমজাদ ফোঁস ফোঁস করে ওঠে, “তাই নাকি রে? পড় তো দেখি তাহলে। তোদের দুইটার রোল যদি এবার এক থেকে পাঁচের মধ্যে না থাকে, তাহলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো! আমার জন্য নাকি পড়তে পারে না জমিদারের বাচ্চা। যা, যতো খুশি পড়, আমি আর কিছুই বলবো না। আমার জন্য নাকি পড়া হয় না!”
বাদলের কানে এসব তর্ক পৌঁছালো না। সে মাথা কাত করে ডায়েরির পাতা ওল্টাচ্ছে।
মৌমিতা খন্দকারের একটা ছোট বোন আছে, মার্জিয়া খন্দকার। সে জুনায়েদ নামের একটা ছেলেকে পছন্দ করে। জুনায়েদ তাদের প্রতিবেশী। এই তথ্যগুলো সকাল থেকেই বাদলের মাথায় ঘুরঘুর করছে। আর বারবার একটা প্রশ্ন আসছে মনে। এই পৃষ্ঠায় নিজের ছোট বোনের পছন্দ নিয়ে লিখেছে মৌমিতা। আর দুইটা পৃষ্ঠা বাকি। এখানে যদি সে নিজের ভালো লাগা নিয়ে কিছু লিখে থাকে? যদি তার মনে আগে থেকেই অন্য কোনো ব্যক্তি জায়গা দখল করে বসে থাকে?
বিষয়টা বাদল মাথা থেকে ঝাড়তে পারছে না। তবু নিজেকে সে বুঝ দেয়, মেয়েটার জীবনে এখনও কেউ আসেনি। সে দেরি করে ফেলেনি, এখনও সময় আছে।
“অক্টোবর, ১৯৯০:
আব্বা ব্যবসার কাজে আমাকে নিয়ে রাজশাহী গিয়েছিলেন গত পরশু। দেশের অবস্থা এমনিতে ভালো না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলছে। বাড়ির ভেতরে বসে আন্দোলনের তীব্রতা বোঝা যায়নি। কেবল রিপন মামার কাছেই টুকটাক খবর শুনতাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম, বেশ ভালোই ঝামেলা শুরু হয়েছে।
সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরের দিকে আব্বা মমতাজ ফুপুর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। রতন ভাই তখন বাড়িতে নেই। তাই নিশ্চিন্তে দুপুরের খাবার সেখানেই খেয়েছি।
মানুষগুলো যেমনই হোক, বাসাটা ভীষণ সুন্দর, বিশেষ করে রিতা আপার ঘরটা। আপা আমার সাথে টুকটাক কথা বলে ডাইনিং রুমে গেল, তারপর বড়দের সাথে কী আড্ডাটাই না দিয়েছে! আমি গেলাম না। আমার জন্য ফাঁকা ঘরের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
রিতা আপার কাছে অনেক বই। তবে কবিতার বই বেশি। অনেক তরুণ কবিরাও দেখলাম চমৎকার সব কবিতা লিখেছেন। হঠাৎ আমার মাথায় ভূত চাপে, আমি নিজে একটা কবিতা লেখার চেষ্টা শুরু করলাম। ব্যাগ থেকে খাতা বের করলাম। ওখানে সময় কাটানোর জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর পেলাম না।
কিন্তু সময় কাটাতে কাটাতে দুই ঘণ্টা কোন দিকে যে চলে গেল, টের পেলাম না। আব্বার বাড়ি যাওয়ার কোনো লক্ষণও দেখলাম না। দুই ঘণ্টায় আমি লিখেছি কেবল এই চার লাইন।
ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি,
উড়োচিঠি বাকি আর নেই।
জানা অজানার ভিড়ে কেন তবু
বারবার খুঁজি তোমাকেই?
এমন বিষাদময় প্রেমের কবিতা তো আমি লিখতে চাইনি! বিরক্ত লাগল। ঐ পাতাটা ছিঁড়ে একটা প্লেন বানালাম। তারপর সেটাকে জানালার বাইরে উড়িয়ে দিলাম।
বিকেলবেলা, তেমন রোদ নেই। রাস্তা একেবারে ফাঁকা। শুধু একটা ছেলে হেঁটে যাচ্ছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকতেই দেখলাম, আমার প্লেন সেই ছেলেটার দিকে যাচ্ছে। আরে, এত বড় খালি রাস্তা ফেলে ওখানে কেন যেতে হবে?
প্লেনটা ঐ ছেলেটার মাথায় গিয়েই লাগল, তারপর রাস্তায় পড়ল।
সর্বনাশ যা হওয়ার হয়েই গেছে। কিন্তু আরো ঝামেলা ছিল আমার ভাগ্যে। ছেলেটা রাস্তা থেকে কাগজের প্লেনটা তুলেই পেছনে তাকাল, সোজা জানালার দিকে। আমি লাফ দিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। একটুর জন্য ছেলেটার চেহারা দেখতে পারলাম না ভালোভাবে। কিন্তু যতটুকু দেখেছি, তাতেই মনে হলো ছেলেটা আমার পরিচিত। খুব পরিচিত!
আমি আবার দেখতেই যাচ্ছিলাম, তখনই আব্বা ডাকলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই বুঝলাম, দেরি হয়ে গেছে। রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলতে শুরু করেছে, ছেলেটা নেই।
বিকেলেই রওনা দিলাম নাটোরের উদ্দেশ্যে। ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। বারবার আফসোস হচ্ছিল, কেন লুকিয়ে গেলাম? কেন ভালোভাবে দেখলাম না মুখটা?
ছেলেটা আমার অচেনা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু নিজেকে কিছুতেই বুঝাতে পারলাম না। তাকে পরিচিত ভাবতে, কাছের কেউ ভাবতে অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিল। জানি না কেন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………