পদ্মজা - পর্ব ০৪ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

পদ্মজা - ইলমা বেহরোজ
          দিনটিকে বড়ো অলক্ষুণে মনে হচ্ছে পদ্মজার। সকালে উঠে দেখে লাল মুরগিটার একটা বাচ্চা নেই। নিশ্চয় শিয়ালের কারবার! রাতে মুরগির খোপের দরজা লাগানো হয়নি। আর এখন চোখে পড়ল, দেয়াল ঘড়িটার কাঁটা ঘুরছে না। ঘড়িটা রাজধানী থেকে হানি খালামণি দিয়েছিলেন। গ্রামে খুব কম লোকই হাতঘড়ি পরে। দেয়াল ঘড়ি হাতেগোনা দুই-তিনজনের বাড়িতে আছে। পদ্মজা সূর্যের দিকে চেয়ে সময়ের আন্দাজ করার চেষ্টা করল। পূর্ণা-প্রেমা দুপুরের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আম্মা…পদ্মজা পাশের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে হেমলতা মনোযোগ সহকারে সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন। আটপাড়ায় একমাত্র তিনিই সেলাই কাজ করেন। প্রতিটি ঘরের কারো না কারো পরনে তার সেলাই করা জামা আছে।

‘লুকিয়ে দেখছিস কেন? ঘরে আয়, হঠাৎ বললেন হেমলতা। পদ্মজা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘না, আম্মা। কাজ আছে।’

হেমলতা জগ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘পানি ভরে নিয়ে আয়।’

জগ হাতে নিয়ে পদ্মজা বলল, ‘ছদকা কোন মুরগিটা দেব?’

হেমলতা গতকাল স্বপ্নে দেখেছেন, বাড়িতে আগুন লেগেছে। তাই ছদকা দিবেন বলে মনস্থির করেছেন। দুঃস্বপ্ন দেখলেই তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন, গরিব-দুঃখীদের ছদকা দেয়ার পরই স্বস্তি পান। তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস, গরিব-মিসকিনদের দান করলে তাদের দোয়ায় বিপদ কেটে যায়।

‘সাদা মোরগটা। মুন্না এসেছে?’

‘না। প্রতিদিন বিকেলবেলা পানি নিতে আসে। একটু পরই আসবে।’ হেমলতা আর কথা বাড়ালেন না। পদ্মজা কলপাড় থেকে পানি নিয়ে আসে। আছরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে মোড়ল বাড়ির কল থেকে পানি নিতে আসে মুন্না। গ্রামে সচ্ছল পরিবার নেই বললেই চলে। হাতেগোনা যে কয়টা পরিবারে সচ্ছলতা বিদ্যমান শুধু তাদের বাড়িতেই টিউবওয়েল আছে। পুরো আটপাড়াতে টিউবওয়েল মাত্র পাঁচটা। পদ্মজাদের টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে প্রতিদিন অনেকেই আসে। তার মধ্যে একজন মুন্না; বয়স বেশি নয়, মাত্র দশ। মা হারা ছেলেটির পঙ্গু বাবা সদরে বসে ভিক্ষা করে। মুন্নাকে দেখে রাখার বা যত্ন করার কেউ নেই। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়, কারো মায়া হলে একবেলা নিয়ে দুমুঠো খেতে দেয়।

পদ্মজা মোরগ নিয়ে কলপাড়ে এসে দেখে—মুন্না নেই। একটু সামনে হেঁটে যেতেই ঘাটে দেখতে পেল ছেলেটিকে। ডাকল, ‘এই, মুন্না।’

মুন্না ফিরে তাকাল, পদ্মজার হাতে সাদা মোরগ দেখে খুশিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে তার চোখ-মুখ। পদ্মজা না বললেও সে বুঝে গেল—আজ ছদকা পাবে। দাঁত কেলিয়ে হেসে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এরো মুন্না।

‘হাসছিস কেন? এই নে মোরগ। তোর আব্বাকে নিয়ে খাবি।

মুন্না খুশিতে গদগদ হয়ে মোরগটিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। কী সুন্দর মুন্নার হাসি! তার খুশিতে পদ্মজাও খুশি হলো। বলল, ‘খুব খুশি?’

‘হ’

‘আমাদের জন্য দোয়া করবি।’

‘করবাম, আপা।’

‘আচার খাবি?’

‘হ, খাইবাম।’ কোনো খাবারে ছেলেটার ‘না’ নেই। সে সব খায়।

পদ্মজা আবার হাসল। খাওয়ার কথা শুনলেই পেটুক মুন্নার চোখ চকচক করে ওঠে। আচার নিয়ে আসে পদ্মজা, মুন্নার সঙ্গে ঘাটের সিঁড়িতে বসে আরাম করে দুজন আচার খায়। মুন্না একটু একটু করে খেতে খেতে বলল, ‘আপা, তুমি খুব ভালা।’

‘তাই?’

‘হ। বড়ো হইয়া আমি তোমারে বিয়া করবাম।’

পদ্মজা বিষম খেল। দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ শুনল নাকি। বিয়ে তার কাছে খুব লজ্জাজনক শব্দ। শব্দটি শুনলেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সে, অন্তর কাঁপে। ফিসফিসিয়ে মুন্নাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বিয়ের কথা কোথায় শিখলি?’

‘আব্বা কইছে।’

‘আর বলবি না এসব। যা, বাড়িতে যা।’

পদ্মজা তড়িঘড়ি করে বাড়ির ভেতর চলে যায়।

রান্নাঘরে ঢুকে দেখে, হেমলতা রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ থাকে না। হারিকেন জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। প্রতিদিন ঘরে একটা, আবার রান্নাঘরে আরেককটা হারিকেন জ্বালানো অনেক খরচের ব্যাপার। তাই বিকেলে রাতের রান্না সেড়ে ফেলেন তিনি।

পদ্মজা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা, আমি রাঁধি?’

লাগবে না। সাহায্য কর শুধু।

পদ্মজা চোখ ঘুরিয়ে খুঁজতে লাগল, কী কাজ করা যায়! কিন্তু এমন কিছু পেল না যেটা করা যায়, কোনো সাহায্যের প্রয়োজনই তো নেই-ই! হেমলতা বললেন, ‘লাউ নিয়ে আয়।’

‘লাহাড়ি ঘর থেকে?’

‘লাহাড়ি ঘরে নেই। ছিঁড়ে নিয়ে আয়।’

পদ্মজা এমনভাবে ছুটে যায় যেন মায়ের আদেশ নয়, চাঁদ পেয়েছে!

লাউ, বরবটি, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, করলা, চিচিঙ্গা, পটল, ঝিঙাসহ নানা ধরনের সবজির মেলা বাড়ির চারপাশে। পদ্মজা সাবধানে ঘাসের ওপর দিয়ে লাউ গাছের দিকে এগোয়। বর্ষাকাল হওয়াতে জোঁকের উপদ্রব বেড়েছে। অবশ্য জোঁকের ভয় তার নেই।

পদ্মজার গমনপথের দিকে ঝিম মেরে কতক্ষণ চেয়ে রইলেন হেমলতা। মেয়েটাকে দেখলে মাঝেমধ্যে মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে, বুকের ভেতর কীসের যেন অস্থিরতা অনুভব হয়; যুক্তিহীন কিছু চিন্তা ঘুরে বেড়ায় মস্তিষ্ক জুড়ে। পদ্মজার চুল দেখলে মনে হয়, এই সুন্দর ঘন কালো রেশমি চুল পদ্মজার একেকটা কাল রাত। পদ্মজার ছিমছাম গড়নের দুধে-আলতা দেহের অবয়ব দেখলে মন বলে—এই দেহ পদ্মজার যন্ত্রণা। পদ্মজার ওষ্ঠদ্বয়ের নিম্নে স্থির হয়ে থাকা কালো সূক্ষ্ম তিল দেখলে যেন পদ্মজার এক জীবনের কান্নার কারণ। হেমলতা পদ্মজার রূপের বাহার নিতে পারেন না। কেন কৃষ্ণকলির ঘরে ভুবন মোহিনী রূপসীর জন্ম হলো? জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে…এই তিনের ওপর কারো হাত থাকে না। যদি থাকত, হেমলতা মোর্শেদকে বিয়ে করতেন না…কিংবা পদ্মজার মতো রূপসীর জন্মও দিতেন না। ভুলেও আল্লাহর কাছে রূপসী মেয়ে চাইতেন না। হেমলতার বুক চিরে ভারি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

আজ শুক্রবার। স্কুল নেই। ফজরের নামাজ আদায় করে তিন বোন পড়তে বসেছে। প্রেমা নামাজ পড়তে চায় না, ঘুমাতে চায়। হেমলতার মারের ভয়ে পড়ে। সে ঝিমুচ্ছে আর পড়ছে। তা দেখে পদ্মজা আর পূর্ণা ঠোঁট টিপে হাসছে। হেমলতা বিরক্ত হোন। প্রেমার তো পড়া হচ্ছেই না…সেই সঙ্গে পদ্মজা আর পূর্ণার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। তিনি কর্কশ কণ্ঠে ধমকে উঠলেন, ‘প্রেমা, ঘুমাচ্ছিস কেন? ঠিক হয়ে পড়।’

আচম্বিত ধমকে চমকে উঠল প্রেমা, তাড়াতাড়ি পড়া শুরু করল চোখ খুলে। হেমলতা কিছুক্ষণ প্রেমাকে পর্যবেক্ষণ করে স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘পড়তে হবে না। ঘরে গিয়ে ঘুমা।’

প্রেমা একটু অবাক হয়। পরমুহূর্তেই খুশি হয়ে ছুটে যায় ঘরে। পূর্ণা মুখ ভার করে ফেলল। তারও তো পড়তে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু মা কখনো তাকে ছাড় দেন না। হয়তো ছোটোবেলা ছাড় দিতেন, মনে নেই। সে আবার সব কিছু খুব দ্রুতই ভুলে যায়। ব্রেন ভালো প্রেমার, যা পড়ে মনে থাকে। পদ্মজার অবশ্য সবকিছুই স্বাভাবিক…

…শুধু রূপ বাদে।

—————

সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাতে ঝাকি জাল আর বড়শি নিয়ে মোর্শেদ বাড়িতে ঢুকলেন, কাঁধে পাটের ব্যাগ ঝুলানো। ভোরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তিনি বাড়ি ফিরলে পূর্ণা ও প্রেমা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। মাছ খেতে পারে অনেক! অর্থসংকটের জন্য হেমলতা খুব কম মাছ কেনেন। মোর্শেদ যতদিন বাড়িতে থাকেন, ততদিন মাছের অভাব হয় না। মোর্শেদ কিছু বলার আগেই পূর্ণা

ও প্রেমা গামলা নিয়ে ছুটে আসে উঠানে। তিনি কাঁধের ব্যাগ উলটে ধরলেন গামলার ওপর। পুঁটি, ট্যাংড়া, পাবদা, চিংড়ি মাছের ছড়াছড়ি লেগে যায়।

হেমলতা মনে মনে ভারি খুশি হোন। পদ্মজা লতা দিয়ে চিংড়ি খেতে খুব পছন্দ করে। আর প্রেমা-পূর্ণা পছন্দ করে পাবদা মাছের ভুনা। আড়াল থেকে পদ্মজা দেখছে, তার ঠোঁটেও হাসি। মেয়েগুলো খুব খুশি হয়েছে মাছ দেখে। মোর্শেদ বাড়ি থেকে বের হতেই লতা আনতে বাড়ির পেছনে ছুটে যাবে পদ্মজা।

প্রেমার মাথায় হাত বুলিয়ে হেমলতাকে উদ্দেশ্য করে মোর্শেদ বললেন, হুনো লতা। আমার আম্মারারে পাবদা ভুনা কইরা দিবা। সবজি-টবজি দিয়া রানবা না।’

‘আব্বা, আপনি বাড়িতে থাকবেন? তাইলে তো প্রতিদিনই মাছ খেতে পারি,’ বলল পূর্ণা।

মোর্শেদ আড়চোখে আড়ালে লুকিয়ে থাকা পদ্মজাকে একবার দেখে তীক্ষ্ণ চোখে হেমলতার দিকে তাকিয়ে পূর্ণাকে জবাব দিলেন, ‘কোনো রহম অশান্তি না হইলে তো থাকবামই।’

গামছা নিয়ে কলপাড়ে চলে যান তিনি। জন্মদাতার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে পদ্মজার মুখটা ছোটো হয়ে যায়। প্রতিবার বাড়ি ছাড়ার আগে মোর্শেদ পদ্মজাকে কটুকথা শোনান। তখন হেমলতা রেগে গিয়ে জবাব দিলে তর্কা- তর্কি করে তিনি বাড়ি ছাড়েন।

‘মোর্শেদ নাকি? বাড়ি ফিরলা কোনদিন?’

মোর্শেদ গোসল সেরে সকালের মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছিলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে রশিদ ঘটককে দেখে হেসে বললেন, ‘আরে, মিয়া চাচা। আহেন, আহেন। পূর্ণারে চেয়ার আইননা দে। খবর কী?’

পূর্ণা চেয়ার নিয়ে আসে। রশিদ এক দলা থুতু উঠানে ফেলে চেয়ারে বসল আরাম করে। প্রেমাকে উঠানে খেলতে দেখে খসখসে গলায় ফরমায়েশ দিল, ‘এই মাইয়া, যা পানি লইয়া আয়। অনেকক্ষণ ধইরা দমডা আটকাইয়া আছে।’

প্রেমা রান্নাঘর থেকে পানি এনে দেয়। রশিদ পানি খেয়ে মোর্শেদকে বলল, ‘খবর তো ভালাই। তো বাবা ছেড়িডারে কী বিয়া দিবা না?’

‘দুই বছর যাক। পড়তাছে যহন মেট্রিকটা পাশ করুক। কী কন?’

‘মেজোডা না। বড়োড়া। তোমার বউ তো মরিচের লাহান। কোনোবায় ও রাজি অয় না। তুমি বোঝাও। পাত্র খাঁড়ি হীরা। বাপ-দাদার জমিদারি আছে।’

মোর্শেদ আড়চোখে হেমলতা এবং পদ্মজার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন— নেই ওরা। তিনি জানেন পদ্মজার উপর কোনোরকম জোরজবরদস্তি তিনি করতে পারবেন না। হেমলতা তা হতে দেবে না। এসব তো আর বাইরের মানুষের সামনে বলা যায় না। মোর্শেদ রশিদ ঘটককে নরম গলায় বললেন, ‘থাকুক না, পড়ুক। মায়ে যহন চায় ছেড়ি পড়ুক তাইলে পড়ুক।’

রশিদ নিরাশ হয়ে তাকিয়ে রইল। ভেবেছিল, মোর্শেদ হয়তো রাজি হবে। রশিদ এতদিন মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ছিল। এরপর বড়ো অসুখে পড়ে। তাই মোর্শেদ বাড়ি ফিরেছে শুনেও আসতে পারেনি। আজ একটু আরামবোধ হতেই ছুটে এসেছে অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু মোর্শেদের জবানবন্দিতে সে আশাহত হলো। কটমটে গলায় বলল, ‘যুবতী ঘরে রাহন ভালা না। যহন বংশে কালি পড়ব তহন বুঝবা। হুনো মোর্শেদ, এই বয়সি মাইয়াদের স্বভাব চরিত্র বেশিদিন ভালা থাহে না। পাপ কাম এদের চারপাশে ঘুরঘুর কর। বেলা থাকতে জামাই ধরাইয়া দেওন লাগে। বুঝছ? তোমার বউরে বোঝাও।’

পাত্রের অনেক প্রশংসা করল রশিদ; জমিজমা, বাড়িঘর—সবকিছুর বাড়াবাড়ি রকমের বর্ণনা দিল। রশিদ ঘটক যেতেই মোর্শেদ হেমলতার পাশে গিয়ে বসেন, পদ্মজার বিয়ের কথা তুলেন ইনিয়েবিনিয়ে। হেমলতা সাফ নাকচ করে জানিয়ে দিলেন—কিছুতেই এখন মেয়ের বিয়ে দিবেন না। আর মোর্শেদকে পদ্মজার ব্যাপারে নাক গলাতেও মানা করে দেন। শেষ কথাটা বেশ কঠিন করেই বললেন, ‘আগে বাপ হও। পরে বাপের কাজ করতে এসো।’

মোর্শেদের তিরিক্ষি মেজাজ। রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। রগে রগে তার রাগ টগবগ করছে। পদ্মজাকে বারান্দায় দেখে তিনি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন, ‘ছেড়ি যহন রূপ দিয়া নটি হইব, তহন আমার ঠ্যাংও পাইবা না। এই ছেড়ি মজা বুঝাইব।’

কথাটি শুনে পদ্মজার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হেমলতা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসেন মোর্শেদকে কিছু কঠিন কথা শোনাতে। পদ্মজা তখন দৌড়ে আসে। হেমলতার হাতে ধরে রান্নাঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। মোর্শেদ যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, তারও ততক্ষণ খুব ভালো লাগে। পূর্ণা-প্রেমা কত খুশি হয়। বাড়িটা পরিপূর্ণ লাগে। সে চায় না বাবা ঝগড়া করে রাগ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাক। হেমলতা রাগে এক ঝটকায় মেয়ের হাত সরিয়ে দেন। তার সহ্য হয় না মোর্শেদকে। মানুষের কথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া বদমেজাজি একজন মানুষ মোর্শেদ। ভালোটা কখনো বোঝে না, মানুষের কথায় নাচে। সারাক্ষণ একটা বাক্যই যেন জপ করে, ‘লোকে কী বলবে?’

—————

মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার ওপর বৃষ্টি নিয়ে মোর্শেদ বাড়ি ফেরেন। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি খুব খুশি। হেমলতাকে ডেকে বললেন, ‘এক মাসের লাইগগা ঘরটা ছাইড়া লাহাড়ি ঘরে উইঠঠা পড়ো।’

হেমলতা কিছু বললেন না। তার প্রশ্নবোধক চাহনি দেখে মোর্শেদ বললেন, ‘শুটিং করার লাইগগা মাতব্বর বাড়িত যারা আইছে হেরার নাকি শুটিংয়ের জন্যি আমার বাড়ি পছন্দ হইছে। বিরাট অংকের টেকা দিব কইছে। আমিও কথা দিয়া আইছি।’

হেমলতা রেগে যেতে গিয়েও পারলেন না। সত্যি, টাকা খুব দরকার। পদ্মজার সামনে মেট্রিক পরীক্ষা। কত খরচ! কলেজে পড়াতে ঢাকা পাঠাতে হবে। পদ্মজা যখন ছোটো ছিল তখনো একবার এই বাড়িতে শুটিং হয়েছিল। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘টাকার কথা আমার সঙ্গে আলোচনা করতে বলো। নয়তো জায়গা হবে না।’

‘আরে..বলামনে। এখন সব গুছাও। ওরা কালই আইব।’

পূর্ণা আড়াল থেকে সবটা শুনেছে। সাত দিন হয়েছে লিখন শাহ আর চিত্রা দেবী অলন্দপুরে এসেছে। অথচ, সে দেখতে পারল না! হেমলতা যেতে অনুমতি দেননি। পূর্ণা নামাজের পর দোয়ায় খুব অনুনয় করে আল্লাহকে বলেছে, যেন লিখন শাহ আর চিত্রা দেবীকে স্বচক্ষে দেখতে পারে। আর এখন শুনছে তাদের বাড়িতেই নাকি আসছে ওরা! পূর্ণার মনে হচ্ছে খুশিতে সে মারা যাবে! বুকের ভেতর দম আটকে আসছে…

…পানি লাগবে…পানি।

—————

‘এই, মগা আমাকে এক কাপ চা দাও তো।’

মগা ঝড়ের গতিতে চা নিয়ে আসে। চিত্রার পাশের চেয়ারটা টেনে তাতে বসল লিখন। এরপর মগাকে বলল, ‘দারুণ চা করো তো তুমি! ‘

কাঁচুমাচু হয়ে হাসল মগা। ভাবে বোঝা গেল, প্রশংসা শুনে ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। এদিকে মগার ভাবভঙ্গি দেখে হেসে উঠল চিত্রা। চিত্রার হাসির সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখছে মগা। মাতব্বর বাড়ির কামলা সে, চিত্রনায়ক লিখন শাহ এবং চিত্র নায়িকা চিত্রা দেবীর সেবা করার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছে। চিত্রার সুন্দর মুখশ্রীর সামনে সবসময় থাকতে পারবে ভেবে মগা ভীষণ খুশি। চিত্রা বলল, ‘তোমার ভাইয়ের নামটা যেন কী?’

চার ফুট উচ্চতার মগা উৎসাহ নিয়ে জবাব দিল, ‘মদন।’

চিত্রার হাসি পায়। অনেক কষ্টে চেপে রাখল।

মগা-মদন…এসবও কারো নাম হয়?

শুটিংয়ের মাঝে হুট করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। তাই আপাতত শুটিং স্থগিত আছে। বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছে সবাই, প্রত্যেকের হাতে রং চা। ডিরেক্টর আবুল জাহেদের খিচুড়ির স্বাদ অতুলনীয়। তিনি আজ খিচুড়ি রান্না করছেন, বৃষ্টি দেখেই ঢুকে পড়েছেন রান্নাঘরে।

চিত্রা লাহাড়ি ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, এই বাড়ির দুইটা মেয়ে কোথায়? আসার পর একবার এসেছিল। এরপর তো আর এলো না।

মগা বলল, ‘ওই যে লাহাড়ি ঘর। ওইডাত আছে।’

‘লাহাড়ি ঘর…সেটা কী?’

মগার বদলে লিখন জবাব দিল, ‘যে ঘরের অর্ধেক জুড়ে ধান রাখা হয়, আর অর্ধেক জায়গায় চৌকি থাকে কামলাদের জন্য—ওই ঘরকে এখানে লাহাড়ি ঘর বলে। বোঝা গেছে?

চিত্রা চমৎকার করে হাসল, ‘বোঝা গেছে। এই মগা, বৃষ্টি কমলে লাহাড়ি ঘরে যাব। ঠিক আছে?’

চিত্রার ‘এই মগা’ ডাক যেন মুহূর্তে মগার জগৎ-সংসারকে স্বর্গ করে তোলে। সে বাধ্যের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, আপা।’

চিত্রা লিখনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যাবা? ওই তো সামনেই আলসেমি করো না।’

মগা হইহই করে উঠল, ‘না না, বেঠা লইয়া যাওন যাইত না। বাড়ির মালিকের মানা আছে।

মগার না করার তীব্রতা দেখে ভীষণ অবাক হলো সবাই। চিত্রা প্রশ্ন করল, ‘মানা কেন?’

‘বাড়ির বড়ো ছেড়িডারে তো আপনেরা দেহেন নাই। আগুন সুন্দরী। এই লিখন ভাইয়ের লাহান বিলাই চোখা। ছেড়িডারে স্কুল ছাড়া আর কোনোহানো যাইতে দেয় না। বাড়ি দিবার আগে কইয়া রাখছে—লাহাড়ি ঘরে বেঠামানুষ না যাইতে। এই ছেড়ি লইয়া বহুত্তা কিচ্ছা আছে।’

চিত্রা বেশ কৌতূহল বোধ করল। লিখন তীক্ষ্ণ ঘোলা চোখে লাহাড়ি ঘরের দিকে তাকাল। দেড় দিন হলো এখানে এসেছে। উঠানের শেষ মাথায় থাকা লাহাড়ি ঘরটা একবারো মনোযোগ দিয়ে দেখা হয়নি।

সামনের দরজাটা বন্ধ। দুটো ছোটো মেয়ে এসেছিল ঘরটার ডান পাশ দিয়ে। ঘরটার ডানে-বাঁয়ে-পেছনে গাছপালা। বাড়িটা পুরনো হলেও দারুণ।

তবে এই মুহূর্তে তার অন্যকিছুর প্রতি তীব্র কৌতূহল কাজ করছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp