রানি আজ প্রাসাদের বাহিরে বসে আছেন। হিমশীতল বাতাস বইছে। আরাম বোধ হচ্ছে বড়ো। তিনি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। কারো পায়ের শব্দ তার মস্তিষ্কে গিয়ে ঠিক পৌঁছালো। চোখ বন্ধ থাকলেও তিনি ঠিক অনুভব করলেন তার সামনে এসে কেউ দাঁড়িয়েছে।
রানির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব দ্রুতই সচল হয়ে উঠে। তিনি ঘ্রাণ চেনেন মানুষের। চোখ বন্ধ রেখেই বললেন,
“ইনান ণেকিতান যে! কোন কারণে আমার রাজ্যে?”
ইনান ণেকিতান চমকে গেলো। সে দূর থেকেই দেখতে পেয়েছিল রানির চোখগুলো বন্ধ। তবুও রানি কীভাবে বুঝে ফেললেন তার উপস্থিতি! সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখান থেকে তাকে রানির দেখতে পাওয়ারতো কথা ছিলো না।
ইনানকে চুপ থাকতে দেখে রানি চোখ মেললেন। আড়মোড়া ভেঙে বসে বললেন,
“কী ব্যাপার? আমার রাজ্যে কী আপনার?”
“কেন? আসতে পারি না?”
“কোনো রাজার অন্য রাজ্যে আমন্ত্রণ ব্যতীত আসা কি শোভনীয়? রাজার এতে মানের ক্ষুণ্ণ হয় বোধহয়।”
“আপনার কাছে আমার আর মান কীসের? সর্বস্বই তো আপনার পদতলে অর্পণ করেই রেখেছি।”
“সেটাতো আরও লজ্জাজনক। একজন বিবাহিতার পদতলে সবকিছু দিয়ে দেওয়া যে অন্যায়।”
“আপনি বিবাহিতা এখন হয়েছেন। যখন আমি সব অর্পণ করেছিলাম তখনতো আপনি কারো ছিলেন না, রানি।”
রানি এবার হাসলেন। ইনান ণেকিতান আজকাল কথার খেলা জানেন বেশ। মৃন্ময়ীর সাথে থেকেই বোধহয় কথার উন্নতি হয়েছে অধিক। একমাত্র মৃন্ময়ীই কথার বিপরীতে কথা ঠেলে দিতে পারে এমন।
উঠে দাঁড়ালেন তিনি। ইনান ণেকিতানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“চলুন, প্রাসাদে চলুন। শুনি আপনার আগমনের কারণটুকু। বাগানে বসে এসব আলোচনা মানাচ্ছে না ঠিক।”
“কেন? খারাপ লাগছে না তো। খোলা অংশুমালীর নিচে আমার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলার গঞ্জনা মানাচ্ছে বোধহয়। প্রাসাদে সমস্তই প্রাতিষ্ঠানিক আলাপ। ব্যক্তিগত কথার জন্য এই স্থানই ঠিক আছে বেশ।”
“ব্যক্তিগত আলাপ আমি ব্যক্তিগত মানুষের সঙ্গেই করি, রাজা ইনান ণেকিতান। আর আপনি আমার ব্যক্তিগত কেউ নন তা নিশ্চয় অবগত?” রানির কাঠখোট্টা জবাবে ইনানের মুখটি চুপসে এলো বেশ। তবে দমে যাওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ তার ভেতরে নেই। সে একরোখা হলো,
“কিন্তু আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কখনো আপনার ব্যক্তিগত কেউ হলে সেটা আমিই হবো! হেমলকতো আপনার ব্যক্তিগত নয়, রানি। তিনিতো কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিলো, তাই না?”
“আমি কখনো কি আপনাকে তেমন কিছু বলেছিলাম? আর প্রতিশ্রুতি আপনাকে দিয়েছিলাম তার প্রমাণপত্র আছে?”
“আপনি আমার সাথে এখন চতুরতা দেখাচ্ছেন। কিন্তু আপনার অতীত কথাতে তো আশ্বাস ছিলোই।”
“এমন আশ্বাস আরও আঠাশটি রাজ্যের রাজাও নিয়ে বসে আছেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমি কেবল প্রত্যাখ্যান করিনি। সেটাকে প্রতিশ্রুতি ভেবে ভুল করলে তার দায় কেবল আপনার। আমার নয়।”
কথা বলতে বলতে তার চোখের মণি দুটো নড়ল এদিক-ওদিক। ঠোঁটে সেই খেলায় জয় হওয়ার হাসি বিদ্যমান। তাকে না কথায় হারানো যায় না অস্ত্রে!
ণেকিতান বড্ড হতাশ হলো এবার। বুক ভরে শ্বাস নিলো। বুকে রাখল নিজের ডান হাতটি।
রানি প্রস্তুতি নিলেন এবার ণেকিতানের ক্রোধের। ণেকিতান এবার যেই উগ্র আচরণটুকু করবে তার পূর্বপ্রস্তুতি রানি নিয়ে নিলেন মনে মনে।
কিন্তু তাকে বিস্মিত করে দিয়ে ণেকিতান হেসে ফেলল। পুরুষের উচ্চ হাসি ভীষণ গমগমে হয় বলেই ণেকিতানের সেই হাসি প্রাসাদের প্রাচীরে গিয়ে অব্দি প্রতিধ্বনিত করতে লাগল। রানি একটুতো বিস্মিত হলেন বটেই। ণেকিতানের এই রূপ নিতান্তই আজ তার কাছে বড়োই নব্য ও অপরিচিত।
“আপনি রাজনীতি অনেক জানেন মানেই যে আমরা জানি না তা কিন্তু নয়। তবে সে যা-ই হোক, হৃদয়ের উপর কারো জোরজুলুম চলে না। কিন্তু তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট করবেন কি?”
রানি কামিনী যদিও ণেকিতানের আচরণ ও কথার আগপাছ বুঝলেন না তবুও জিজ্ঞেস করলেন, “কী বিষয়?”
“আপনি তাহলে কাকে নিজের ব্যক্তিগত স্থানটুকু দিবেন? আমায় যে দিবেন না তা আমি বেশ বুঝেছি, কাকে দিবেন সেটুকুই শুনে যাই তবে। মনেরও তো একটু সান্ত্বনা প্রয়োজন।”
ণেকিতান আজ বড়োই শান্ত। কার কণ্ঠে যুদ্ধ নেই, অস্ত্র নেই। আছে যতটুকু তা কেবলই শান্তি। কেবলই মেনে নেওয়া।
রানি ণেকিতানের উত্তরটুকু দিতে ইচ্ছুক নয় বলেই বললেন,
“সেসবও গোপনীয় আলাপ। সেসব আলোচনা আমি করতে চাচ্ছি না বোধহয়।”
“গোপনীয় আলাপ? এখানেতো হেমলক পিয়ার্স নেই। সে শুনবে না মোটেও যে আপনি, স্বয়ং রানি কামিনীকাঞ্চন তাকে হৃদয় দিয়ে বসে আছেন। তবে বলতে সমস্যা কী?”
কথার ফাঁকে ফাঁকে, প্রশ্নের ভাঁজে যেই উত্তর গুছিয়ে পরিবেশন করেছে ণেকিতান তার রানিকে বিস্মিত না করে পারল না।
রানি সেই প্রসঙ্গ তাই পুরোপুরিই উল্টে দিতে চাইলেন। প্রসঙ্গ পাল্টাতে বললেন,
“চলুন, প্রাসাদে চলুন। বাকি কথা সেখানেই হোক।”
“প্রাসাদে আমি যাবো। আপনার সেনাপতি হ্যাব্রোকে দেখতে এসেছি। দেখেই ফিরবো। বাহিরে আমার দেহরক্ষীরা অবস্থান করছে।”
“চলে যাবেন! রাত্রি হচ্ছে যে। ফিরতে অসুবিধা হবে এই রাত্রে।”
“ফিরিয়ে তো দিচ্ছেন আপনিই, রানি। ফিরে যেহেতু হবেই তবে আর বিলম্ব করে লাভ কি? বরং দ্রুত ফিরলে মায়া কম হবে। যতই থেকে যাওয়ার লোভ ততই বাড়ে মায়া। বিবাহিতার প্রতিতো আর আমি সেই অযাচিত মায়া দেখাতে পারি না।”
“কীসব বলছেন আজ, রাজা ইনান! প্রেম,প্রণয় ব্যতীতও তো আমাদের সম্পর্ক আছে। আপনি আমার সহযোগী রাজ্যের রাজা। সেটা কি কম?”
“সেই সম্পর্কের জেরে যুদ্ধের ময়দানে আমি আপনার পাশে দাঁড়াতে পারব বড়োজোর জীবনটাতেতো নয়। তাহলে প্রাসাদে গিয়ে আর টান বাড়িয়ে লাভ কী বলুন?”
রানি বেশ অস্বস্তি অনুভব করলেন। আগাগোড়া তিনি ইনান ণেকিতানকে কেবল তার রূপের পূজারি হিসেবেই দেখেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ণেকিতান সবার মতোই। সবার মতোই কামত্তোজিত তার অনুরাগ রানি প্রতি। সেজন্য রানির পদতলে সঁপে দিয়েছে নিজেকে স্বেচ্ছায়। আজ কেন তবে রানির সেই ভাবনা চূর্ণ হচ্ছে? কেন পুরুষদের প্রতি হওয়া তার সেই তীব্র ঘৃণায় কেউ কেউ উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে তার অনুভূতিকে সংশয়ে ফেলছে? স্রষ্টা কেন ঘৃণা ও প্রেম একই সাথে তার ভেতরে দিয়েছেন? দ্বন্দ্ব লেগে যায় না এতে অনুভূতির? রানি যে দিশে হারিয়ে ফেলেন!
রানির মনে হলো ণেকিতান যতই হাসি হাসি মুখে সেই প্রত্যাখ্যান মেনে নিক, ভেতরে ভেতরে কষ্ট পাচ্ছে সে। রানি হ্যাভেনকে দেখার পর থেকে পুরুষদের চোখ বুঝতে পারেন। আর হেমলকের সাথে থাকার পর থেকেই পুরুষের মন বুঝতে পারেন আরও গভীর ভাবে। এবং এই অভিজ্ঞতা থেকেই তার মনে হচ্ছে ণেকিতানের চোখে ফুটে উঠেছে এক ধরনের দুঃখ। রাজ্য হারিয়ে ফেললেও বোধহয় এমন দুঃখ দেখা দিতো না সেই চোখে। একই দুঃখ রানি দেখেছেন হেমলকের চোখে। আবার হ্যাভেনের চোখেও হয়ত…
নিজের ভাবনার সুতো টেনে ধরেন তিনি। লাগাম আনেন ভাবনায়। কথা খুঁজে না পেয়ে অহেতুক প্রশ্ন করেন,
“আপনি হ্যাব্রোকে দেখতে এসেছেন বললেন না? কেন হঠাৎ হ্যাব্রোর সাথে সাক্ষাৎকারের ইচ্ছে জাগল?”
ণেকিতান স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল,
“শুনেছিলাম সে জখম পেয়েছে। শয্যাশায়ী প্রায়। তাই…”
“তাই আপনি সামান্য একজন সেনাপতিকে দেখতে এলেন? রাজ রাজারা অসুস্থ হচ্ছেন, পরকাল গমন করছেন কখনোইতো তাদের দেখতে যেতে শুনিনি তেমন! অথচ আমার রাজ্যের সেনাপতিকে দেখতে চলে এলেন? সত্যি বললেন না অজুহাত?”
কথা বলতে বলতে রানি ভ্রু কুঁচকান। শেষ কথাটি চাপা হাসেন। ণেকিতান মাথা নাড়ায় বিপরীতে,
“অজুহাত নয় ঠিক। তবে প্রথম কারণ তাকে দেখতেই আসা। সে আপনার রাজ্যের সামান্য সেনাপতি ঠিকই কিন্তু আপনাে জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষ। এমন অনুগত্য সেনাপতির এ ধরায় বোধহয় খুবই অভাব। আমি অবাক হয়ে যাই তার সেই ভাবভঙ্গি দেখে। প্রতি মুহূর্তে তাকে দেখে মনে হয়, তার যেই প্রবল ক্ষমতা তা বোধহয় আমাদেরও নেই। অথচ আমরা রাজা! রাজ্য আমাদের আছে। কত কত দেহরক্ষী, যোদ্ধা আছে। তার কেবল আপনি আছেন। সেই কেবল আপনির প্রতিই তার যেই বিশ্বাস তা সবকিছুকে হার মানায়। রাজ রাজাদের আসরে মাঝে মাঝে সেই প্রসঙ্গে কত কথা উঠে! এমনিতেই আপনার মতো ভুবনমোহিনী রূপ কারো নেই। তার উপর আপনার সেনাপতি। আপনাকে হিংসে করার জন্য যে কত উপায় স্রষ্টা দিয়ে দিয়েছেন তা বলে বুঝানো দায়।”
হ্যাব্রোর প্রশংসায় রানি অতি আনন্দিত বোধ করলেন। হ্যাব্রোর প্রতি তিনিও যে তাই বড়োই কৃতজ্ঞ। সে কথাটি অবশ্য তিনি গোপনেই রাখলেন।
রানির নিশ্চুপ হাসির মাঝেই একজন দেহরক্ষী এলো। দূরে দাঁড়িয়েই চাইল অনুমতি। রানি তাকে আসার অনুমতি দিতেই সে ঝটপট করে চলে এলো। এসেই কুর্ণিশ করে বলল,
“রানি, রাজা হেমলক পিয়ার্স এসেছেন। আপনাকে তিনি জানাতে বললেন।”
হেমলক রাজ্যে ফিরে ছিলো আজ থেকে প্রায় বেশ কিছুদিন আগেই। এর ভেতর আর আসেনি। পত্র পাঠিয়েছিলো কয়েকবার। আজ হঠাৎ আগমন ঘটায় রানি একটু আশ্চর্য হলেন। এসেছে তো এসেছেই আবার এত রাখঢাক কবে থেকে হলো তার সেই ভেবে ভেবেই হয়রান হলেন তিনি।
হেমলক কখনো এত আনুষ্ঠানিকতা দেখায়নি। যখন, যেখানে, যেভাবে ইচ্ছে চলে এসেছে। হুটহাট তার চলে আসা। কিন্তু আজ নিজেই রানির খোঁজে বাগানে না এসে দেহরক্ষী পাঠালো! অদ্ভুত!
রানি প্রহরীকে ‘আসছি’ বলে পাঠিয়ে দিতেই ণেকিতান বলে উঠল,
“এমনি এমনি এই হেমলক পিয়ার্সকে অপছন্দ করি না আমি। প্রথমে আমার রাজ্যে গিয়েছিলো আপনার চিত্র অঙ্কন করতে। পরে শুনি সে আপনাকেই চিত্র উপহার পাঠাতো নিজে অঙ্কন করে। সে জানত আমি কতটা বেপরোয়া, অস্থির ছিলাম আপনার জন্য। অথচ মোক্ষম সময় পেতেই সে বিবাহটা সেড়ে ফেলল। এত এত অকাজ করেছে না! আপনি যদি তার অর্ধাঙ্গিনী না হতেন তবে একটা যুদ্ধ ঠিক লাগিয়ে ফেলতাম। কেবল আপনার জন্যই পারছি না। সেইতো যুদ্ধ লাগলে পতীর সহযোদ্ধা হয়ে আপনিও ময়দানে নামবেন। আর যাই হোক, আপনার বিপরীতে আমার তলোয়ার উঠবে কি আর? হেরে বসব না যুদ্ধ? রানিকে হারিয়েছি মানলাম শেষমেশ রানির হাতেই প্রাণটা হারাবো নাকি? তাই আর ময়দান অব্দি গেলাম না। ছেড়ে দিলাম দাবী।”
কথা শেষ করে এমন ভাবে হাসল ণেকিতান যেন কত মজাদার কিছু বলে ফেলেছে। রানিও তাকে সহজ হতে সাহায্য করলেন। স্বাভাবিক ভাবেই হাসলেন সাথে সাথে।
“বোধহয় ভালোই করেছে যুদ্ধ না করে। আমি আবার অস্ত্রের সামনে এলে কাউকেই ছাড়তে পারি না। নির্দয় কি-না!”
“সে আর বলতে? এত বছর ঘুরে সামান্য করুণা পেলাম না, প্রাণ যে পাবো তার আর কী নিশ্চয়তা!”
“চলুন, চলুন, অনেক দুর্নাম করলেন আমায়। এবার প্রাসাদে চলুন।”
ণেকিতান মেনে নিলো। আলগোছেই বলল, “যাচ্ছি। সেনাপতিকে দেখেই চলে যাব। আপনি যান হেমলক পিয়ার্সের কাছে। আপনার সাথে এই সাক্ষাৎ আমার স্মরণে থাকবে।”
রানি ঘাড় নাড়ালেন। একটি প্রহরীকে ডেকে ণেকিতানকে হ্যাব্রোর স্থান দেখিয়ে দিতে বললেন এবং কিছু খাবার দাবারের কথাও বলে দিলেন। এরপর চলে গেলে ব্যস্ত পায়ে।
ণেকিতান সেদিকে তাকিয়েই ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলল। তার বুকটা হালকা লাগছে আজ। রানিকে পাওয়ার জন্য সে কম কিছু করেনি। রানির আগেপিছে সবসময় খোঁজ রাখার জন্য গুপ্তচর রেখেছে, একটা বয়স অব্দি একা থেকেছে, কত রাজ্যের শত্রু হয়েছে কেবল তারা রানির শত্রু বলে। তবে রানিকে আর পাওয়া হলো না।
সে মনে মনে নিজেকে শান্ত করল। ভালোবাসা যে পাওয়া না-পাওয়ার উর্ধ্বে। সেসব নিয়ে আর হিসেবনিকেশ করে দুঃখ বাড়িয়ে লাভ কী?
—————
রানির কক্ষটিতে তত ঝলমলে আলো নেই। তিনি আজকাল একটু শান্তিতে, আবছাতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলেই আলোগুলো খুবই কম। কক্ষটিতে মৃদু বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে একটি সুন্দর ঘ্রাণ আসছে। কীসের সুবাস হেমলক ঠিক ধরতে পারছে না। তবে ঘ্রাণটা ভীষণ পবিত্র পবিত্র লাগছে। যেন মিষ্টি কোনো কিছু চারপাশে আছে।
হেমলক যখন ধ্যান মগ্ন হয়ে রানির বিছানার পাশে নতুন কিছু সাজসজ্জা দেখছিলো তখনই রানি উপস্থিত হলেন। তার উপস্থিতি বোঝা যায় দূর থেকেই। গায়ে অলঙ্কারের যেই সুমধুর ঝঙ্কার তুলে হাঁটেন তিনি, যে কেউ-ই সেই শব্দ শুনতে পারবে। তার অলংকারের শব্দটাও তার মতোই অন্যরকম।
“হঠাৎ আমার রাজ্যে?”
খুবই ধীর গলার স্বর রানির। হেমলক এবার সাজসজ্জা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সরাসরি দৃষ্টি রাখল রানির চোখেমুখে।
“আমার রানি যেখানে আমাকে সেখানে হঠাৎ হঠাৎই চলে আসতে হয়। কিছু করার নেই।”
“অকারণেই আগমন নাকি?”
“কেন? অসুবিধা করলাম কি এসে?”
“অসুবিধার প্রশ্ন এলো কোথা থেকে? তা-ই বললাম কখন?”
“না, বাগানে তোমার প্রতিবেশী রাজার সঙ্গে বেশ হাস্যালাপ দেখলাম তো, তাই ভাবলাম আমি এসে বিশেষ অসুবিধে করলাম কিনা?”
হেমলকের কণ্ঠে প্রবল মান। রানি এতক্ষণে বুঝলেন, কেন হেমলক বাগানে না গিয়ে খোঁজ পাঠিয়েছিল। নিশ্চয় তাদের আলাপ আলোচনা দেখেছে।
“আমার সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক নেই। বিশেষ সম্পর্কতো আপনার সঙ্গে। সে যেই নারীটির চিত্র অঙ্কন করতে দিল আপনাকে ভরসা করে, আপনি সেই নারীটিকে হরন করে নিলেন। সেসব অন্যায় বিষয় নিয়েই আমাদের হাস্যালাপ হচ্ছিল।”
“তাই বলে আমার রানির সঙ্গে সে বাগানে দাঁড়িয়ে অত আলাপ করতে পারে না।”
“অবশ্যই পারে। আমি একজন রানি। একটি রাজ্যের রানি। আমার সাথে যে-কোনো রাজ্যের রাজা-ই আলাপ করতে পারে। সামান্য আলাপেই আজ আপনি এত হম্বিতম্বি করছেন? আপনি বোধহয় আমার অতীত ভুলে যাচ্ছেন। আমি এক আসরে বিভিন্ন রাজাদের সঙ্গে বসে বাইজি নৃত্য দেখেছি, মদ্যপান করেছি। আমার দুর্নামেরতো কমতি নেই! তাহলে আজ হঠাৎ এত কথা কেন?”
হেমলক এবার দমে এলো। রানির কথাটি তার মাথায় চট করে প্রবেশ করল। পুরোনো কোনো বিষয় নিয়েই সে আজকাল বলতে চাচ্ছে না। বহু বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজেকে এখানে, রানির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। নিজের অনুশোচনা তার অন্তর ক্ষত করছে। সেই অনুশোচনা থেকে রেহাই পেতেই তার এখানে আসা। অথচ এসেই ভুলে বসেছে আসল উদ্দেশ্য। রানি যে পুরোনো কথার ইঙ্গিতই পুনরায় করলেন আবার!
হেমলক এলোমেলো হয়ে গেলো। তার বলার উদ্দেশ্য, কথা সমস্তটাই গোলমেলে হলো। উপায়ন্তর না পেয়ে সে ক্লান্ত ভঙ্গিতেই জড়িয়ে ধরল রানিকে। স্ব-ইচ্ছায় পরাস্ত হওয়া যাবে বলে।
রানি গা থেকে কী সুন্দর ঘ্রাণ এসে লাগছে তার নাকে! হেমলক নাক স্পর্শ করল রানির ঘাড়। জোরে জোরে সে শ্বাস টেনে নিলো ভেতরে। বুকটা যেন ভরে গেল শান্তিতে!
রানি আজ বারণ, নিষেধ করলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন আপোষেই। হেমলককে ঠিক ততটাই ঘনিষ্ঠ হতে দিলেন যতটা ঘনিষ্ঠ হেমলক হতে চেয়েছে।
প্রাচীরে থাকা মানব-মানবীদের ছায়াগুলো অদ্ভুত খেল জমালো। মনের দ্বন্দ্ব দূরে থেকে শরীর মিশে হয়ে গেলো একাকার। এই বোধহয় দ্বিতীয়বার, যখন ছায়ারা একে অন্যের ভেতর ডুবে যেতে পারল। মিলেমিশে গেলো সব। তা-ও সজ্ঞানে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………