মেঘবন - পর্ব ৩০ - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা - ধারাবাহিক গল্প

মেঘবন - ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
          মস্ত আকাশে একটা ভীষণ স্বার্থপর চাঁদ উঠেছে। শুভ্র, শীতল, অহংকারী চাঁদ। যার শরীরে দাগ আছে, অবহেলার গল্প আছে। কি যেন বলে লোকে? পোঁড়া রুটি। চাঁদ, তুমি পোড়া রুটি। অথচ তা সত্ত্বেও কত কত মানুষ তোমাকে ভালোবাসে! উজ্জ্বল তারাদের দল অবিশ্রান্ত পাহারা দেয়। আহা চাঁদ! তুমি পোড়া রুটি উপমা পাওয়া সত্ত্বেও কি ভীষণ প্রিয়! 
সংগোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তামজিদ। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখের মণিতে একটা সূক্ষ্ণ সফেদ আলো। জলের অস্তিত্ব কি টের পাওয়া যায়? ধুর! তামজিদের মন খারাপ। কিন্তু তাই বলে চোখে জল? ছি, ছিহ্! তা কেন হবে? গ্রিল ধরে রাখা হাত শক্ত করলো সে। বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো। গর্জন তুলে প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘সমস্যা কি? নতুন দেখছিস আমাকে? চোখ অন্যদিকে ফেরা।’

তালহা ফেরালো না। বরং অতিশয় আরাম করে বিছানায় পা মুড়িয়ে বসলো, আমোদ নিয়ে তামজিদের ব্যথিত মুখপানে চেয়ে রইলো।
‘মেরিন এখন তোর ভাবি হয়। বড় ভাইয়ের বউ। যা মনে আছে ভুলে যা। ওইদিকে আর তাকানো যাবে না। কি বলেছি বুঝতে পারছিস?’

‘হু।’ কথাটা যেন খুব আনমনে আওড়ালো তামজিদ। ভীষণ আস্তে করে। তালহা বোধহয় শুনতেও পায়নি। প্রশ্ন করে, ‘কি বললি? হু? না-কি না? স্পষ্ট করে বল।’

চাঁদের একরোখা সৌন্দর্যে তামজিদের চোখ জ্বলতে শুরু করলো। কুৎসিত আত্মগ্লানিতে বুক ফোঁপাচ্ছে। নিশ্বাস এত বিস্বাদ! কেমন অচেনা সুরে জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা, আমি যদি তারফানের আগে মেরিনকে নিজের করে চাইতাম? কিংবা স্বার্থপরের মতো ভাই পছন্দ করে জেনেও মেয়েটাকে ছিনিয়ে নিতাম, ও কি আমার হতো? আমার প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে তালহা। ব্যাপারটা জানতে ইচ্ছে করছে। বিয়ের আগেও আমার কাছে সুযোগ ছিল। আমি চাইলেই মেরিনকে নিজের করে পেতাম। কেন যে চেষ্টা করলাম না!’

তালহা আতঙ্কে নীল হয়ে তাকায়। তামজিদকে উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পাগল, উন্মাদ কিছু। সে ভয়ে ভয়ে আওড়ায়, ‘একটা মেয়ের জন্য ভাইকে কষ্ট দিবি?’

‘দিতে পারলাম কই? ভাই সবার আগে। কিন্তু... তালহাহ্! মেরিন কবুল বলার সময়টাতে আমার মনে হচ্ছিল তারফানকে মেরে আমি মেরিনকে নিয়ে পালিয়ে যাই। আমার উপর জীনে আছড় করেছে না-কি দেখতো! মাথা এমন ভার ভার লাগছে কেন?’

ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে তামজিদের কাছে এসে দাঁড়ালো তালহা। নমনীয় চোখে চেয়ে বললো, ‘উল্টা-পাল্টা জিনিস খাবি, লাল পানি গিলবি— মাথা ঘুরাবে না? আয়, একটু ঘুমিয়ে নেয়।’

তামজিদ বিছানায় শুতে শুতে জিজ্ঞেস করলো, ‘মা কোথায়?’

‘ঘুমাচ্ছে।’

‘আমাকে সকালে ডেকে দিবি। তুবা দেখা করতে চেয়েছে। মেয়েটার সাথে সব হিসাব ক্লোজ করে আমাকে আবার হস্পিটালে যেতে হবে। হাহ্... কত কাজ আমার!’

দীর্ঘশ্বাসটা দীর্ঘ হলো। কোলবালিশ জড়িয়ে ওপাশ ফিরে শুলো তামজিদ। তন্দ্রাঘোরের আদুরে আলিঙ্গনে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ঘোলা দৃষ্টিতে সবকিছু উঁচু মিনারের মতোন। ভারি পলক ঝাপটে ঘুম জড়ানো গলায় বললো, ‘নিজের রুমে যা তালহা। তোর গায়ে গন্ধ।’

নাক কুঁচকে ভয়াবহ নজরে একবার ভাইয়ের ঘুমন্ত মুখপানে তাকালো তালহা। ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে একটা চড় মারতে। কিন্তু নাহ্! নিজেকে বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে তামজিদের মাথার কাছে এসে বসলো সে। ঘন চুলের গভীরে বার কয়েক হাত বুলালো। ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে বললো, ‘মেরিনকে ভুলে যা ভাই। কষ্ট হলেও ওদিকে আর তাকানো যাবে না। তুই না সবসময় বলিস তুই তারফানের চেয়ে বেশি বুঝদার? কম বোকা? বুঝদার হয়ে সড়ে আয় ভাই।’

ছোটবেলা থেকে এ-ই হয়ে আসছে, হচ্ছে। তারফান আর তামজিদ দেখতে যেমন এক রকম? তাদের স্বভাব, পছন্দ-অপছন্দ, আচার-আচরণ সব একদম একই। পাজি দুটো সেকথা মানতে চায় না। সদা নিজেদের বুদ্ধিমান কিংবা একে অপরকে বোকা প্রমাণ করতে তৎপর থাকে। তালহা দূর থেকে দেখে সেসব। মাঝে মাঝে খুব বাজেভাবে দু'ভাই প্রতিযোগিতায় পরাজিত হলে এগিয়ে আসে, স্বান্তনা দেয়। এইতো সেদিন! হস্পিটালে একটা সার্জারি করতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছিল তামজিদ। সিনিয়র থেকে টানা আধঘণ্টা ঝাড়ি খেয়েছে। তামজিদ আবার অন্যের বকা নিতে পারে না। ওর মর্মে আঘাত আনে। বিক্ষিপ্ত মনে বাসায় ফিরেই তালহাকে এবিষয়ে বিচার দিলো। তালহা কি সেসব বুঝে? তবুও ভাইয়ের মন রক্ষার্থে কত শত আজগুবি স্বান্তনা যে সে দিয়েছিল!
মৃদু শব্দে হেসে ফেললো তালহা। খেয়াল হলো, তামজিদ ঘুমের ঘোরে কি যেন বলছে। একটু ঝুঁকতেই শুনতে পেল, ‘ভাই... বুকে... বুকে ব্যথা!’

ঠোঁটের হাসি ম্লান হলো। চুলে আবারও হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো সে। মিহি স্বরে আওড়ালো, ‘ঠিক হয়ে যাবে, ভাই আছি।’

আঁধারে নিমজ্জিত আশপাশ ঘুঘুর ডাকে জেগে উঠলো হঠাৎ। এইতো, কিছুক্ষণ পর নিশীথের দাপট কমে আকাশে ভোর ভোর আলো ফুঁটতে শুরু করবে। শেষ সময়ে চাঁদের দ্যুতি যেন একটু তীব্রই। জানালার বাঁধা পেরিয়ে তামজিদের ঘুমন্ত মুখ আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। কি নিষ্পাপ! কি স্নিগ্ধ!

—————

পূব দিক থেকে সূর্যের কমলাটে রঙ ধীরলয়ে উঁকি দিচ্ছে। বাতাসে শীতলতার ঠান্ডা স্পর্শ। পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ কানে যেতেই ঘুমটা ছেড়ে গেল। পিটপিট নজরে চোখ মেলতেই প্রথমে একটা কাক সাঁই করে উড়ে যেতে দেখলো তারফান। কালো কুঁচকুঁচে কাক। বিচ্ছিরি দেখতে। পিঠের দিকে শক্ত কিছু বিঁধছে। সহ্য করা যাচ্ছে না। উঠে বসতেই খেয়াল হলো, ছাদের ময়লা মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। পিঠে এতক্ষণ ছোট্ট পাথর গুতো মে রে মে রে জানান দিচ্ছিল, ‘ওঠো! ওঠো! ওঠো!’

চিলেকোঠার দরজা হাট করে খোলা। বিস্তৃতহীন বিছানায় এলোমেলো শুয়ে থাকা মেরিনকে ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। তারফান কপাল চেপে ধরলো। চোখ ডললো। মাথার পেছনটায় চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। ঘুমে চোখ কাতর। দুর্বল হাত বাড়িয়ে জবা গাছ থেকে একটা জবাফুল ছিঁড়ে নিলো সে। ঢুলুঢুলু পায়ে চিলেকোঠায় গিয়ে বিছানার কাছে মেঝেতে বসলো। পিটপিট চোখে দেখলো, মেরিন খুব বেকায়দায় ঘুমিয়ে আছে। বিয়ের শাড়ি তখনো শরীরে জড়ানো। গহনা খুলেনি, সাজ মুছেনি, ক্লান্ত মুখের গাল বরাবর দুটো অশ্রুরেখা। কেঁদেছিল? তার ওপর উপর রাগ করে?

হুট করে প্রতিশোধের মিষ্টি স্বাদটা ভীষণ তেঁতো লাগতে শুরু করলো। পানির পিপাসা পেয়েছে। কিন্তু পানি খেতে ইচ্ছে করছে না। ঘুমাতে মন চাইছে। কিন্তু মেরিনের ঘুমন্ত মুখ দেখার লোভ ছাড়া যাচ্ছে না। তারফান অতিশয় দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেললো। থেমে থেমে, রয়েসয়ে। কাল থেকে এমন সেজেগুজে থাকতে মেয়েটার নিশ্চয়ই খুব অস্বস্তি হচ্ছে? হাত বাড়িয়ে মেরিনের এলো চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে দিলো তারফান। হাতের জবাফুল কানের পেছনে গুঁজে দিলো। ওয়াশরুম থেকে ছোট্ট বোলে পানি এনে একটা তোয়ালে ভেজালো সেখানে। ধীরে ধীরে মেরিনের সাজ তুলে দিতে লাগলো। মেয়েটা অতো সাজেনি। তবুও কি প্রাণনাশী লাগছে! কান আর গলা থেকে গহনা খুলতে নিলেই মেরিন নড়েচড়ে উঠলো। বিরবিরিয়ে বললো, ‘ধরবেন না আমাকে।’

হু? মেরিন কি জেগে? মনে হলো না। মেয়েটা ঘুমের ঘোরে কথা বলছে। তারফান তবুও প্রতিউত্তর করলো, ‘তুমি আমাকে যত ইচ্ছে ঘৃণা করতে পারো মেরিন। তবে তোমাকে ধরা বারণ— একথা বলবে না।’

মা বলেছিল, বাসররাতে স্ত্রীদের উপহার দিতে হয়। তারফান বিশেষ ভাবে সেকথা ভেবে দেখেনি। রাস্তায়, খুব হুট করে একটা কাঠের বেলীফুলের মালা পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। তারফান প্যান্টের পকেট থেকে সেই মালাটাই বের করলো। মেরিনকে পরিয়ে দিলো। ফটাফট দুটো ছবিও তুললো সে। সাজ মুছে ফেলায় মেরিনকে এখন স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। ফুলো গালে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, চোখের পাপড়িগুচ্ছ বাতাসের তালে নড়ছে। তারফানের হঠাৎ যে কি হলো! ফটাফট মেরিনের দু'গালে, চোখে, কপালে, নাকে, থুতনিতে অগণিত চুমু খেল সে। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে— ওমনি! ফোনে কল বাজলো। হাসপাতাল থেকে ইনটার্ন ডক্টর শিহাব কল করেছে, ‘স্যার, খুব আর্জেন্ট আপনাকে লাগতো। পেশেন্ট হঠাৎ করেই খুব বমি করছে। আপনি এখন আসতে পারবেন?’

স্থির মেরিনের দিকে চেয়ে থেকে তারফান গম্ভীর স্বরে জবাব দিলো, ‘আসছি। ডক্টর মোশারফ কোথায়?’

‘উনি অন্য একটা ওয়ার্ডে আছেন।’

‘উনাকে খবর দিন। আমার আসতে সর্বোচ্চ বিশ মিনিট লাগবে।’

বিশ মিনিট! গোসল সেড়ে, কাপড় পালটে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য খুব কম সময়। তবুও তারফানের মাঝে অতোশতো তাড়া দেখা গেল না। সে আরও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ মেরিনকে দেখল। মেরিনের ধীরে ধীরে শ্বাস ফেলে গভীর ঘুমের অতলে হাবুডুবু খাওয়া পরখ করলো। এরপর এগিয়ে এসে নরম বাম হাত শক্ত করে নিজের দু'হাতের মুঠোয় নিলো তারফান। তখনের মতোন কপাল ঠেকালো। দ্রুত নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে থেমে থেমে, ভীষণ আস্তে আওড়াতে লাগলো, ‘আমাকে যদি সারাজীবন তোমার কাছে নত হয়ে থাকতে বলো, আমি থাকবো মেরিন। এখন থেকে কোনো কিচ্ছু লুকাবো না। শুধু, তুমি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আমার স্বপ্নগুলোর মতো আমাকে ছেড়ে হারিয়ে যেও না। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, জানি। আর দিবো না মেরিন। ইউ ক্যান স্ল্যাপ মাই ফেস, আইল জাস্ট বেয়ার ইট। সো প্লিজ, ডোন্ট লিভ মি... মাই লাভ।’

একবিন্দু উষ্ণ তরল অচিরেই মেরিনের অবচেতন হাত ভিঁজিয়ে দিলো। নিঃশব্দ টুপটাপ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp