সম্ভবত সাহিদকে এই একই কালো জ্যাকেটে ভার্সিটিতে দেখেছিল বন্ধুরা। এখনো সাহিদের চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে বেচারা যেন বাড়ি যাওয়ার অবধি ফুরসত পায়নি। তবে ক্লান্তির থেকে তার মুখে রাগের ভার বেশি। সাব্বির বলল,
--"কিরে? বাড়িতে যাসনি? নাকি বউ ঢুকতে দেয়নি?"
সাব্বিরের কটাক্ষে সবাই হাসতে শুরু করল। রুশান বলল,
--"তাও কথা, সিনিয়র বউ বলে কথা। তার কথাই এক কথা। কিরে সাহিদ, তাই তো?"
সাহিদ ব্রিশ্রী এক গালি দিয়ে চেঁচাল,
--"শাট আপ!"
সাহিদের গলায় অসম্ভব তেজ। রাগে রীতিমতো ঘামছে সে। এই কাণ্ডে এবার বন্ধুরা থেমে গেল। সাহিদের হাতের কাছেই মোটা হকিস্টিক। এই ছেলের সাথে এত বছরেও তারা লাগতে পারেনি। এত তার অহমিকা, ইগো আর রাগ! মুখের কথার ছিঁড়ি তো আরও জঘন্য। আজ আকিবের বাসা খালি, তাই বন্ধুরা এসেছিল পার্টি করতে। কিন্তু এই ছেলের রাগে পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে। তাই ভাবল সব নষ্ট করে দেওয়ার চেয়ে চুপ থাকা ভালো। আকিব কত কষ্টে ভালো দামের ওয়াইন কালেক্ট করেছে। খরচাও গেছে প্রচুর। এটা ট্রাই না করলে একদমই হচ্ছে না।
ওদের চুপসে যেতে দেখে সাহিদ সাপের মতো হিসহিস করে বলল,
--"হোয়াট? সাইলেন্ট হলি কেন? কি যেন বলছিলি না.. উম.. সিনিয়র ওয়াইফ, বাড়িতে ঢুকতে দেয় না? স্পিক আপ!!"
সাব্বির সাহিদের বেস্ট ফ্রেন্ড৷ সে টের পেল সাহিদকে আরেকটু রাগালেই তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আজকের ডোজটা বেশি হয়ে গেছে। সাব্বির তাক শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,
--"কুল, সাহিদ! আমরা ফ্রেন্ডস রাইট? টিজ আমরা করব না তো কে করবে? ওকে ফাইন, উই আর স্টপ নাও। ওকে? গাইজ, রিসাম আওয়ার পার্টি।"
সাহিদ ধীরে ধীরে শান্ত হলো। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে এখনো স্পষ্ট শক্ত চোয়াল বোঝা যাচ্ছে। সাহিদ রোজই বলে শেভ করবে, কিন্তু তিন দিন ধরে তার সেটাও হচ্ছে না। তার হরমোনাল প্রব্লেম কিনা কে জানে, তবে অন্যদের তুলনায় দ্রুতই দাড়ি গজায়। এখনো চাপদাড়ি তার ফরসা লাল হয়ে যাওয়া মুখ জুড়ে।
সাহিদের রাগ শান্ত হয়েছে, এটা ভুল। তার এখনো ভীষণ রাগ জমে আছে ভেতরে। এই রাগের শুরুটা এক বছর আগে থেকে। রাগটা তার পরিবারের উপর, বাবার উপর। আগে যা-ও সাহিদ একটু শান্ত থাকত। কিন্তু বন্ধুরা কীভাবে যেন জেনে যায় বিয়ের কাহিনী.. এরপর থেকে এদের সাথে থাকলে তার বেশিরভাগ সময়ই খুব রাগ হয়। ওরা তাকে বিভিন্ন ভাবে টিজ করে তার আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। নিছকই সে বিয়েটা করেছে বাধ্য হয়ে, নয়তো পুরো একটা বছর সে কোন খুশিতে বিবাহিত জীবন কাটাবে? কার বুকে এত দম আছে তাকে জব্দ করার? কিন্তু সে হয়েছে, তার মা-বাবা এসবের পিছের মূল কালপ্রিট।
সাহিদ মুস্তাহাব হলো 'আয়াজী এলিট'-এর মালিক মাহফুজ শাহর একমাত্র ছেলে। মাহফুজ শাহ'র ব্যবসা বেশ বিস্তর, বছর দশেক যাবৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়তেও অবস্থান করছে। আয়াজী এলিট একটি ব্র্যান্ড, যেই ব্র্যান্ডের দৌড় আজ আন্তর্জাতিক মাঠেও পৌঁছেছে একটু একটু করে। এত সম্পদশালী ভদ্রলোকের ছেলে হয়েছে অসম্ভব বখে যাওয়া। জন্মের পর থেকেই কোনো কিছুর একফোঁটা কমতিও সে অনুভব করেনি। হাতের নাগালেই সব পেয়ে যেত বিধায় ছেলেটা আজ চলে গিয়েছে তাদের নিজেদের নাগালের বাইরে, সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে।
জেনেটিক্সের জন্য কিনা কে জানে, তবে সাহিদের চেহারা থেকে শুরু করে সবকিছুই ভিন্নতা বাঙালিদের থেকে। তার লম্বা হাইট, চেহারা, গায়ের শক্তি সবই এসেছে বাবা মাহফুজ শাহ'র থেকে। মাহফুজ শাহ'র বাবা ছিলেন বিদেশি। অর্থাৎ কানাডিয়ান৷ স্বাধীনতার পর এভাবেই ঘুরতে এসেছিলেন এখানে। কিন্তু এখানেই পছন্দ করে বসেন বাঙালি মেয়ে অর্থাৎ সাহিদের দাদী। মাহফুজ শাহ'র নানারা ছিলেন আবার তৎকালীন দেশের ভালো মানের ব্যবসায়ী। যেহেতু দাদী একমাত্র মেয়ে ছিলেন, সেহেতু সমস্ত সম্পদ চলে গেল শাহীন শাহর কাছে। মুসলিম হয়ে দাদার নাম দেওয়া হয়েছিল শাহীন শাহ। সেই থেকেই শাহ'র এই বংশ এখনো চলছে। দাদাই মূলত সবচেয়ে বেশি ব্যবসা বিস্তর করেছিলেন। তার ব্যবসার প্রতি জ্ঞান ছিল প্রখর। তার রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায় লুকানো ছিল ব্যবসার চেতনা। সে নিজেও এই আন্তর্জাতিক কোম্পানির মূল কারণ। তিনি যেমন ফ্যামিলি ম্যান ছিলেন তেমনই চতুর ব্যবসায়ী ছিলেন
দাদা-দাদীর লাভ স্টোরি খুবই কমপ্লিকেটেড, সাহিদের কাছে এসব গল্প অবিশ্বাসের চাইতে বিরক্তির বেশি। ছোটোবেলায় এক গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে তার দাদী তার কান খেয়ে ফেলেছিলেন। এখন আর দাদী নেই। মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। এখন আর তাকে বিরক্ত করার মতো কেউ নেই, এই একটা মানুষই তাকে শাসন করেছিলেন, মার দিয়েছিলেন, আবার সময় অসময়ে গল্পও শোনাতেন। কিন্তু সাহিদের সবসময়ই ছিল ভিডিও গেমের নেশা৷ এখনো সেই নেশা তাকে ছাড়েনি।বাড়িতে ভালো মানের গেমিং পিসিও আছে তার। জীবনে ভালোবাসা বলতে সে এই ভিডিও গেমকেই বোঝে। এমন করে সে কত বিদেশি শত্রু যে করেছে অনলাইন গেমগুলোতে। হ্যাঁ, বন্ধু নয়.. শত্রু৷ জীবনে সে বন্ধুত্ব করতে অত্যন্ত বাজে। তবুও কি করে যেন এই কয়জন তার জীবনে টিকে গেল।
সাহিদ বর্তমানে বাংলাদের টপ এক প্রাইভেট ভার্সিটিতে বিবিএস করছে। সে প্রায়ই বিভিন্ন দেশে ট্যুর দিত, তাই পড়ালেখার দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছে। এজন্য বয়স চব্বিশে এসেও এখনো ছেলেটার ভার্সিটি শেষ হচ্ছে না, মাস্টার্স তো এখনো বাকি।
সাহিদ শুধু তার ভার্সিটিতে নয়, মোটামুটি সব ভার্সিটিতেই তার মুখ পরিচিত। আজকাল তো তার সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ চর্চা হয়, তাই তার এই মুখের পরিচিতি আরও বাড়ছে। এত বড়ো ব্যবসায়ীর ছেলে, তার উপর স্বভাব রয়েছে উগ্র। বাঙালি তো নেগেটিভ বিষয়ে চর্চা করতেই বেশি পছন্দ করে। সাহিদ ভুল করে এক সময় একটা ইন্সটাগ্রাম খুলেছিল, সেটাতেও মেয়ে মানুষের ছড়াছড়ি। বন্ধুরা তো প্রায়ই বলে, কন্টেন্ট বানানো ধরলে সাহিদের আর পিছে ফিরে তাকাতে হবে না। এখন ভ্লগিং, কন্টেন্টের যুগ। সেখানে সাহিদ মাসে একবার কোনো ছবি আপলোড করে। সে আর কার কথার ধার ধারে? সাহিদ তখন ওদের এসব আজগুবি পরামর্শে ক্ষেপে যায়। বলে বসে,
--"বুল শিট।"
সাহিদের রাগ নেমেছে ভেবে ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সবাই। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টিকল না। যতক্ষণে না তাদের বাড়িতে আরও দুটো মেয়ে ওয়েস্টার্ন পড়ে হানা দেয়। একজন আকিবের গার্লফ্রেন্ড আর আরেকজন জান্নাত। ওদের বান্ধবী। জান্নাত সাহিদকে দেখতেই মুচকি হাসল। অনেক সুন্দরী জান্নাত নামের মেয়েটা। মন্ত্রীর মেয়ে, আলাদা এটিটিউড নিয়ে চলাফেরা করে। চেহারা দেখলেই অন্যরকম অনুভূতি হওয়ার মতো। কিন্তু সাহিদের তা হলো না। সাহিদকে দেখে জান্নাত যতটা খুশি হয়েছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষেপে যায় সাহিদ। কোনো দিকে তা তাকিয়ে এই রেয়ার ওয়াইনটা যে পায়ের কাছে এক আছাড় মে(১)রে ভেঙে ফেলল। বন্ধুরা এতে ঘাবড়ে যায়। আকিবের গার্লফ্রেন্ড তো তখন কানে হাত চেপে চেঁচিয়ে উঠল। আকিব দ্রুত মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
--"রাগছিস কেন? জান্নাতকে তো এমনিই ডাকলাম। ও আমাদের বন্ধু.."
--"ফ্রেন্ড মাই ফুট! এঞ্জয় ইওর ননসেন্স মেস!"
সাহিদ তখনই আকিবের বাড়ি থেকে চলে আসল। সে কারো বাড়িতে যাওয়া পছন্দ করে না, তবুও সবাই এত জোরাজুরি করল বিধায় গিয়েছে। ভেবেছে রাগটা একটু ঠান্ডা হবে। হলো বিপরীত। প্রয়োজনের চাইতে আরও বেশি স্পিডে বাইক চালাচ্ছে সে মধ্যরাতের হাইওয়েতে। সৌভাগ্যবশত এই রাস্তায় গাড়ির চাপ নেই তেমন, পুলিশকেও দেখা যাচ্ছে না। সাহিদ যেই পরিমাণে রেগে আছে, এতে আজকে আবারও তার বাইক জব্দ হবার সম্ভাবনা ছিল। এরপর আবারও আরেক ঝামেলা।
কুড়িল বিশ্বরোডের একপাশে সে বাইক থামাল। এই রাতে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, কিন্তু সাহিদের রাগ তাতে কমছে না। পরপর একটা সিগারেট ঠোঁটের ভাঁজে চেপে আগুন জ্বালাল। এই আগুন তার সিগারেটের থেকে ভেতরে জ্বলছে বেশি। তার ইচ্ছে করছে ইসমাতের খুব বড়ো একটা ক্ষতি করে বসতে, যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তার এখন সবাইকে বিরক্ত লাগে। আগে বাবা-মা আর ইসমাতকে লাগত, এখন লাগে বন্ধুদের। সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে সে পরপর কয়েকটা সিগারেট শেষ করল। প্যাকেটে আর একটা সিগারেটও নেই। এটাই শেষ পিস।
এদিকটা নিরিবিলি হওয়ায় সাহিদ এক অদ্ভুত মানুষের দেখা পেল। সে সাহিদকে দেখেই গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। কিছু লোক মানুষকে দেখেই বুঝে যায় পকেটে কড়ি আছে কি নেই। এই লোকও সেই দলেরই। স্ক্যামার বলে কথা। লোকটা খুবই ভদ্র ভাষায় সাহিদকে ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করল। শোনাল, তাদের গাড়িতে অনেক সুন্দরী এক মেয়ে আছে। এই স্ক্যামারদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কক্সবাজারে। আজকাল ঢাকাতেও রাত হলেই এই সমস্ত লোকেদের দেখা পাওয়া যায়। কিছু কিছু অঞ্চলে বেশি। সাহিদ এই চক্র সম্পর্কে জানে, নতুন অভিজ্ঞতা নয় তার জন্য। সে প্রায়ই রাত-বিরেতে বাইরে থাকে। সেই লোকটা সাহিদের কাছাকাছি আসল। আরও ভালো ভাবে মেয়ের সৌন্দর্য বর্ণনা করল। একটা মেয়ে গাড়ি থেকে উঁকি দিল, ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তার সৌন্দর্য খুব প্রকাশ পাচ্ছে। সে গাড়ি থেকে বের না হয়েই সাহিদকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু এবার হলো হিতে বিপরীত। সাহিদ লোকটার হাত টেনে ধরে বলল,
--"আ ওম্যান?"
লোকটা হাসল। সাহিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলল, যেন সে নিখুঁত এক হাসি দিল। আকস্মিক সে এক অঘটন ঘটিয়ে বসল। সাহিদ লোকটার হাতের পালসের কাছাকাছি জ্বলন্ত সিগারেট বসিয়ে দিল। নিরিবিলি রাস্তায় লোকটার আর্তনাদ শোনা গেল। সাহিদ উম্মাদ হয়ে আছে। সে পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল,
--"হোয়াট এ রিলিফ। বেস্ট সিন এভার। মেয়ের চাইতে তুই আমাকে প্রশান্তি দিলি।"
সাহিদ মানিব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার কয়েকটা নোট পায়ের কাছে ফেলে বলল,
--"থ্যাঙ্কস ফর এন্টারটেইনমেন্ট!"
সাহিদকে ওরা ধরার আগেই সাহিদ বাইকের এক টানে ওদের হাতের নাগাল থেকে বেরিয়ে গেল।
নিজেদের এপার্টমেন্টে গিয়ে দেখল ইসমাত অর্ডার করা খাবারগুলো ঢেকে রেখেছে। তারা একই এপার্টমেন্টে থাকলেও রুম আলাদা। কেউ কাউকে বিরক্ত করে না। আবার তারা খুব শান্ত ভাবে যে থাকে তাও না। এই বাড়িতে সপ্তাহে প্রায়ই ভাঙচুরের শব্দ পাওয়া যায়। সাহিদ খাবারগুলা দেখল, তবে খেল না। প্যাকেটগুলো নিয়ে সোজা ডাস্টবিনে ফেলে দিল। এরপর কিচেনে গিয়ে নিজে নিজে একটা আইটেম করে নিজের ঘরে চলে গেল। লম্বা এক শাওয়ারের প্রয়োজন। এরপর নরম ঘুম। আজকে ঘুমের ওষুধ না নিলে চলবেই না। রুমে এসে সবার আগে ওয়াইনের মোটা অংকের পেমেন্ট ট্রান্সফার করল আকিবের একাউন্টে। টেক্সট দিল,
--"ক্ষতিপূরণ আমার, কিন্তু দোষটা তোদের।"
সাহিদ ঘরে যেতেই ইসমাত বেরিয়ে এলো। সে শব্দ পেয়েছে সাহিদ এসেছে, তবুও ইচ্ছাকৃত ঘর থেকে বের হয়নি। ইসমাত কোনো দিকে না তাকিয়ে আগে ডাস্টবিন চেক করল। যা ভেবেছি ঠিক তাই, প্যাকেটগুলা ছুঁয়েও দেখেনি। ইসমাতের রাগ হলো খুব। ইচ্ছে করল এই খাবারগুলি সাহিদের মুখ বরাবর ফেলে আসতে। কিন্তু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। সাহিদের রক্ত গরম, বোধ-বুদ্ধি লোপ পেলেও সে বড়ো! তার পায়নি। সে সাহিদের মতো গরম আর ফাঁকা মাথা নিয়ে চলে না। সে যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত এবং ম্যাচিওর। হঠাৎ করে ইমম্যাচিওরিটি দেখালে আবার আরেক ঝামেলা। ইসমাত ঠোঁটে দাঁত চেপে মিনমিন করে বলল,
--"বেয়াদব একটা।"
·
·
·
চলবে……………………………………………………