প্রত্যুষের প্রথম কিরণটুকু ফুটেছে কেবল। আবহাওয়ার মন্দা ভাব দেখা যাচ্ছে বেশ। বাউণ্ডুলে বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর।
হ্যাব্রোর চোখগুলো লাল। রাতে ঠিকঠাক নিদ্রা যায়নি হয়ত। বেশ অনেকটা দিন সে নিদ্রাযাপন করতে পারে না। এক জোড়া টলমলে আঁখি তাকে জাগিয়ে তুলে। তার কোলে শুয়ে যেই চোখগুলো টলমল করছিলো, যে চোখগুলো বিশ্বাস করতে পারেনি হ্যাব্রো চোখগুলোর মালকিনের বুকে ছুরি বসাতে পারবে, সেই চোখগুলো আজকাল জ্বালাতন করে।
রানি দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। উনারা এই মুহূর্তে ক্যামিলাস রাজ্যের জন্য রওনা হবেন তাই হ্যাব্রো সমস্তটা তদারকি করছে। এ্যাজেলিয়ার দায়িত্ব তার কাঁধে ন্যস্ত না থাকলে সে-ই পৌঁছে দিয়ে আসত উনাদের। কিন্তু রানির তীব্র নিষেধাজ্ঞা। রাজ্য ছেড়ে এক নিমিষের জন্যও যেন কোথাও না যায় হ্যাব্রো। রানির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার সাধ্য হ্যাব্রোর নেই। সে করবোও না। তাই সেই নির্দেশ কেবল তথাস্তু বলে মেনে নিয়েছে।
“আবহাওয়ার বেশ অবনতিই দেখা দিচ্ছে, রানি। আরেকটু অপেক্ষা করে দেখবেন না-কি রওনা দিবেন এখন? মনে হচ্ছে তো ভারি বর্ষণ হবে।”
রানি নিজের রাজঘোড়াটির গায়ে হাত বুলাচ্ছিলেন। প্রাণীদের প্রতি তার বিশেষ স্নেহ রয়েছে। সেই স্নেহ এই হাতের ভাঁজে ভাঁজেই প্রকাশ পাচ্ছে বেশ। হ্যাব্রোর কথায় তিনি বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বললেন,
“সেই রাজ্যে আমার কিছু কাজ অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছে। সেগুলো সমাপ্ত করেই আমার এখানে ফিরতে হবে। বিলম্ব করলে অনেককিছু ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।”
“খুব শীগ্রই ফিরবেন না-কি কিছু দিন থাকবেন?”
“ফিরে আসব, হ্যাব্রো। একেবারেই ফিরব। আচ্ছা, তোমায় যে বলেছিলাম রাজ পুরোহিতকে বলতে একটি শ্রাদ্ধশান্তির আয়োজন করে রাখতে তা মনে আছে তো?”
হ্যাব্রো জবাবে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ, তার অবগতই রয়েছে সব। যদিও রানির কাছের কেউ মৃত্যুবরণ করেনি। আশেপাশেও কারো মৃত্যুর সম্পর্কে অবগত নয় সে কিন্তু রানি তবুও কার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার জন্য আয়োজন করতে বললেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু জিজ্ঞেস করারও যে উপায় নেই। রানি নিজের কাজের জন্য জবাবদিহিতা কখনো করেন না। করতে পছন্দও করেন না।
রানিদের অপেক্ষার মাঝেই গ্রহাচার্যকে আসতে দেখা গেলো। বয়স্ক লোকটি ধীরে ধীরে হেঁটে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন। এত ভোরে গ্রহাচার্যের এখানে উপস্থিত হওয়া ঠিক বোধগম্য হলো না হ্যাব্রোর। তবে রানির শান্ত-স্থির দাঁড়িয়ে থাকাতে কিছুটা কারণ সে ধরে ফেলল চট করেই।
রানিই হয়ত আসতে বলেছেন। তাইতো অবাক হলেন না মোটেও। হ্যাব্রোর ভাবনা ঠিক হলো গ্রহাচার্য নিকটে আসার পর। এসেই রানিকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। বৃদ্ধার হাতে একটি নথিপত্র রয়েছে।
“রানিমা, আপনার গ্রহ সম্বন্ধে বেশ কিছু অনুসন্ধানের পর গ্রহের উপর নির্ভর করে আপনার কিছু আসন্ন বিষয় আঁচ করা যাচ্ছে।”
রানি আঁচ করা বিপদটি সম্পর্কে হয়ত অবগত। বা অনুমান করে নিয়েছিলেন তাই উৎকণ্ঠা না দেখিয়ে হ্যাব্রোকে বললেন কিছুটা দূরত্বে যেতে।
হ্যাব্রো অবাক হলো। রানির এমন গোপন থেকে গোপন জিনিস সে জানে যা আর কারো জানার কথা নয়। এমন বহু বিষয় রয়েছে যা রানি কেবল হ্যাব্রোর সাথেই আলোচনা করেছেন। আজ প্রথম বোধহয় রানি কোনো বিষয় তার সামনে প্রকাশ্যে আনতে চাইলেন না। এমন কী গ্রহ সংকেত পেয়েছেন উনারা যা সে শুনতে পারে না? মনে কৌতূহল থাকলেও হ্যাব্রোর সরে দাঁড়াতে হলো। রানির আদেশ পালন করাই যে শিরোধার্য।
চারপাশে নির্মল বাতাস। গ্রহাচার্যের কপালে ভাঁজ। তিনি নথিটির দিকে তাকিয়ে এক মনে পর্যবেক্ষণ করতে করতে মাথা নাড়ালেন।
“আপনার সামনে বেশ কিছু বাঁধা-বিপত্তি রয়েছে এবং তা কাটিয়ে উঠারও প্রবণতা দেখছি। শনি ও বৃহস্পতি এক সঙ্গে একই ঘরে বিরাজ করাতে আপনার মানসিক ভাবে কিছু পরিবর্তন হতে পারে। বিষণ্ণ, হতাশ হওয়ার লক্ষ্মণ আছে। তবে একটি ভালো বিষয়ও খেয়াল করা যাচ্ছে, আপনার আগামীতে রাজ্যের বিস্তৃতি বৃদ্ধি পাওয়ার সংকেত দেখা দিচ্ছে। অর্থাৎ আপনি হয়ত আগামীতে যেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তার বিজয় লাভের সম্ভাবনা বেশ দেখা যাচ্ছে। তবে…”
রানি গ্রহাচার্যের সমস্ত কথাই এক ধ্যানে শুনছিলেন। গ্রহাচার্যের পথিমধ্যে বিরতিতে তিনি ভ্রু কুঁচকে নিলেন, “তবে?”
“তবে সাবধান থাকতে হবে। প্রাণ সংঘাতেরও একটু আভাস রয়েছে। পরিকল্পনায় বিন্দুমাত্র নড়চড় প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।”
গ্রহাচার্য থামলেন। রানির দৃষ্টি দূরে। অল্প অল্প মাথা নাড়াতে নাড়াতে তিনি বিদায় দিলেন গ্রহাচার্যকে।
বৃদ্ধ গ্রহাচার্য রানির এই ভাবলেশহীন চেহারাটি পর্যবেক্ষণ করে ইতস্তত বোধ করলেন। কেউ নিজের প্রাণনাশের কথা শুনেও এত নিশ্চিত থাকতে পারেন কীভাবে?
গ্রহাচার্য বিদায় নেওয়ার পূর্বে একটু দাঁড়ালেন। আমতাআমতা করলেন খানিকটা,
“আমার একটি আর্জি রয়েছে। রানিমা, আপনি অনুমতি দিলে পেশ করব।”
রানি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, “কী আর্জি? পেশ করুন।”
“আমি একটি যজ্ঞ করতে চাই। আপনার প্রাণনাশের সেই বিপদটি কাটানোর জন্য।”
“যজ্ঞ? তার বিশেষ প্রয়োজন নেই বোধহয়। রানির প্রাণ এত শীগ্রই যাওয়ার নয়, গ্রহাচার্য। আমি যেহেতু বলেছি বিজয় আমার, তার মানে বিজয় আমারই হবে।” রানির কাঠ কাঠ বাচনভঙ্গিতে গ্রহাচার্য থেমে গেলেন। তিনি জানতেন রানি এমনটাই বলবেন। তবুও তার মনের আকাঙ্ক্ষা বের না করে পারছিলেন না।
গ্রহাচার্য মাথা নাড়িয়ে কেবল সম্মতিটুকু দিলেন। এরপর আবার যেভাবেই এসেছিলেন সেভাবেই ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগলেন। মেঘ ভার করা আকাশে আলোর সামান্য ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট ছিলো। সেই সামান্য আলোতেই রানি দেখলেন সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধা অদৃশ্য হতে লাগলেন হাঁটার তালে তালে। রানি ভেবে পান না, আজকাল তার রাজ্যের মানুষগুলো চারপাশে এভাবে আগলে রাখার আবদার নিয়ে থাকে কেন? তার পৃথিবীতে কেউ নেই বলেই স্রষ্টা হয়ত নানান বেশে, নানান জনকে উপস্থিত করাচ্ছেন।
—————
লিলির হাতটা সেড়ে উঠেছে বেশ। এখন সে এক হাতেই সমস্ত কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। রাজবৈদ্যর অদম্য চেষ্টায় নিজের হাতের যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠেছে। প্রতিবেলায় রাজবৈদ্য নিজ উদ্যোগে পথ্য দিয়ে যায়। নিয়ম কানুন মানতে যেন কোনো হেলা না করে সেদিকে বেশ খেয়াল রাখে সে।
লিলি পালঙ্কে বসে আছে শান্তশিষ্ট ভঙ্গিতে। এখনো তার সামনে অবস্থান করছে রাজবৈদ্য। লিলির হাতটি দেখছে ভালো করে। ঘা শুকিয়েছে কি-না, কোনো অসুবিধা আছে কিনা তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করছে।
লিলি এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। তেমন সুঠাম দেহী না হলেও দেখতে বেশ অন্যরকম রাজবৈদ্য। বেশ কিছুদিন ধরেই লিলি রাজবৈদ্য যে দেখতে অন্যরকম তা খেয়াল করছে। একদম নিখুঁত ভাবে। ছেলেটি যেকোনো কাজ এত সুন্দর ও গুছিয়ে করে যে লিলি আজকাল মুগ্ধ তার প্রতি।
“এখন হাত নাড়াতে অসুবিধা বা মৃদু ব্যথাটি অনুভব হয়?”
প্রশ্ন করার সঙ্গে হাতে সামান্য চাপ প্রয়োগ করছে রাজবৈদ্য। মাথা নামানো ছিলো তার। লিলি উত্তর দেয় না প্রশ্নের। রাজবৈদ্য পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “কোনো সমস্যা হয় কি?”
লিলির ধ্যান ভাঙে এবার কণ্ঠটা একটু জোরালো ছিলো বলে। থতমত খেয়ে পর পর বলল, “না, না।”
“অনুভব করে বলছেন না এমনিই বলে দিলেন?”
মিছিমিছি কপট রাগ দেখায় লিলি, “এমনিই বলব কেন? আমার কি বোধবুদ্ধি নেই?”
“কী জানি! যখনই আসি তখনই এভাবে তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে যে আমি নিজেও বুঝি না আপনি কি কিছু কিছু সময় স্থবির হওয়ার বিশেষ ক্ষমতা পেয়েছেন কিনা।”
“তাকিয়ে থাকি মানে? তুমি কী বুঝাতে চাইলে?” নিজেকে ধরা পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা তার কথায়। প্রচুর বল প্রয়োগ করল গুরুগম্ভীর হওয়ার।
রাজবৈদ্য হাসি চেপে রাখল, “যা বুঝলেন তা-ই বুঝাতে চেয়েছি, রাজকন্যা।”
“নিজেকে কী ভাবো তুমি? তুমি কে এমন যে তোমার দিকে আমার তাকিয়ে থাকতে হবে? কোন রাজ্যের রাজপুত্র?” কথাটি বলেই চুপ হয়ে গেলো সে। নিজেরই মনে হলো বাড়াবাড়ি বলে ফেলেছে হয়ত।
রাজবৈদ্যর যদিও তাতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া ছিলো না। যথারীতি সে তার কার্য সম্পাদন করল এক মনে। তবে মুখটা দেখালো থমথমে।
নীরব ক্যামিলাসের প্রাসাদে এই দু'জনের নীরবতা যেন শব্দ করল। অভিমানের শব্দ। তবে কোন অধিকারে এই অভিমান জন্মাল হয়ত জানা নেই কারো।
রাজ বৈদ্য উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ আগের প্রসঙ্গে মোটেও বলল না কিচ্ছুটি। হাতের দিকে দৃষ্টি রেখে কেবল বলল,
“হাতটা সেড়েই গিয়েছি। আশা করছি আর পথ্যের প্রয়োজন হবে না।”
লিলির মন খারাপ হয়ে গেলো কথাটি শুনেই। পথ্যের প্রয়োজন হবে না মানেই অজুহাতে তার সামনে এসে কিছুক্ষণ আর থাকবে না মানুষটা। রাগানোর চেষ্টা করবে না লিলিকে। রাজকন্যা ডেকে যেই সম্বোধন করে আদুরে সেটিও করবে না।
“তাহলে তুমি আর আমার কক্ষে আসবে না?”
“প্রয়োজনতো আর নেই। আমার যতটুকু দায়িত্ব ততটুকুতো হলো।”
“এরপর আর দায়িত্ব নেই বলে দেখতেও আসবে না?”
“সেই ক্ষমতা আমার নেই। অনাধিকার চর্চাও আমি করব না। আমি কোনো রাজ্যের রাজপুত্র নই, সামান্য রাজবৈদ্য। আপনাদের প্রজা। আমাদের কি ক্ষমতা আছে কাজে-অকাজে রাজকন্যার কক্ষে প্রবেশের?”
সুক্ষ্ম খোঁচাটি লিলির গায়ে বিঁধল। তার কথাই ফিরিয়ে দিলো তাকে।
লিলি আরও কিছু বলতো কিন্তু তার আগেই একটি হুলস্থূল পড়ল প্রাসাদে। নিচ থেকে শোনা গেলো হেমলকের উচ্চ কণ্ঠ।
লিলি চমকে গেলো। ভ্রাতা প্রাসাদে ছিলো না বেশকিছু দিন। এখন এলো আর এসেই এত জোরে কী বলছে!
লিলির আগে ছুটে গেলো রাজবৈদ্য। লিলি গেলো পিছু পিছু।
রানির পা দিয়ে মৃদু র ক্ত ঝড়ছে। একটি তীর পায়ের একদম কাছ ঘেঁষেই চলে গিয়েছে বলে সামান্য আঘাত লেগেছে। খানিক ক্ষতও হয়েছে। সেখান দিয়েই গলগলিয়ে র ক্ত পড়ছে। হেমলক ধরে রেখেছে পা-টি। চিন্তায় তার মুখ লাল হয়ে গিয়েছে।
অথচ রানি প্রহরীকে হুকুম ছুঁড়লেন দক্ষিণের দিকে যেতে। তাও তীব্র ভাবে। তীর তাঁক করা ব্যক্তিটিকে যে-কোনো মূল্যেই যেন এখানে নিয়ে আসা হয়।
রাজবৈদ্য আসতেই হেমলক বিচলিত কণ্ঠে বলল, “রানিকে দেখো দ্রুত। আসো।”
রানি পরিস্থিতি শান্ত করলেন। দাসদাসীতে ভরে গিয়েছে প্রাসাদের বাহিরটা।
লিলি অবাক হয়ে বলল, “ভ্রাতা, কখন এলে? আর কেই-বা হুট করে আক্রমণ করে বসল?”
“আমিও তো জানি না। আমাদের আসার সংবাদতো কেউ জানতো না। তবে, কে করল এটা?”
হেমলকের দুশ্চিন্তা হলেও রানির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি খুঁজতে লাগল ক্যামিলাসের মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমারকে। কেবল সেই জানতো এই আসার কথাটা। কিন্তু সে এমনটা করার তো কথা নয়!
রানি আরও একজনকে খুঁজলেন। রাজমাতা প্রাচীও নেই উপস্থিত। সন্ধ্যে হয়েছে বলেই ঢাক বাজতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা আরতির সময় প্রাসাদে তীব্র শব্দে ঢাক বাজে। রানি যদিও আন্দাজ করলেন রাজমাতা কোথায় থাকতে পারে তবুও ভাবনা স্বচ্ছ করার জন্য লিলিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“রাজমাতা প্রাচী কোথায়?”
“রাজমাতা তো আরতির ওখানে। সন্ধ্যা আরতির সময়তো তিনি সেখানেই থাকেন।”
রানির পায়ের ক্ষত স্থানটি যে হেমলক চেপে রেখেছিলো সেদিকে রানির বিশেষ মনোযোগ গেলো না। তিনি ক্ষত পা নিয়ে দ্রুত গতিতে হেঁটে গেলেন প্রাসাদের দিকে। হেমলকের কাছ থেকে পা-টা আচমকা ছাড়ানাতো অবাক হয়ে গেলো সে। অবাক হয়ে রানির দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেও পারল না। তার আগেই রানি প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করে ফেলেছেন। উপস্থিত দাসদাসীসহ অবাক হলো হেমলক স্বয়ং। রানির মতিগতি তার বুঝে আসে না।
তীব্র শব্দে ঢাক বাজছে। ধূপের ধোঁয়া প্রাসাদের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে দিচ্ছে দু'টো দাসী। রানি বসেছেন ঠিক বৈঠকখানার মাঝামাঝি। যেখান থেকে সন্ধ্যা আরতির দৃশ্য স্পষ্টই দেখা যায়। সেখানেই দাঁড়ানো রাজমাতা। নিজের খাসদাসীটিকেও রেখেছেন পাশাপাশি। এতদিন যাবত এই একটি বিষয়ের পুনরাবৃত্তিই ঘটেছে। কারো কাছেই সেটি অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কারো কাছে এটিকে স্বার্থান্বেষী কার্য মনে হয়নি। তবে রানির কাছে এখন সেটি মনে হলো। রাজমাতা ভক্তি থেকে যে আরতির স্থানে দাঁড়ান না তা আজ রানির কাছে স্পষ্ট ভাবেই বোধ হলো। এবং তিনি তার সমস্ত হিসেব মিলাতে পারছেন একে একে। ঘুঙুরের মৃদু শব্দটা বড্ড কানে বাজছে। এতদিন সেটি কৌতূহলের বিষয় হলেও আজ আর কৌতূহল নয় যন্ত্রণার হয়ে উঠেছে সেই শব্দটি। একটি মানুষ পৃথিবীতে নেই, তার চিহ্নটুকু নেই পৃথিবীর কোথাও অথচ সেই মানুষটি উদ্যম নৃত্য করে বেড়াচ্ছে। অক্লান্ত এই নৃত্যের মূলকেন্দ্র কোথায় কেউ তা অবগত নয়। কেউ জানে না কত যন্ত্রণায় সেই ঘুঙুর বাজছে। অথচ রানি জানেন। সেই নৃত্যের নিজস্ব ভাষা রানির কাছে স্পষ্ট।
রানির পায়ের এক পাশে বসেছে হেমলক আরেক পাশে রাজবৈদ্য। যত্ন করে কিছু জড়িবুটি লেপে দিচ্ছে। ক্ষতটা সামান্য মনে হলেও ততটা সামান্য নয়। জড়িবুটির কারণে ক্ষতটা জ্বালা করার কথা অথচ সে রানিকে দেখে অবাক হচ্ছে। রানি বিন্দুমাত্র শব্দ করছেন না। জ্বালা করছে কি-না তা অবগত করছেন না। মুখটিও সামনে কুঁচকাচ্ছেন না ব্যথায়। তার মাঝে মাঝে অবাক লাগে। রানির কি অনুভূতি শক্তি সাধারণের মানুষের তুলনায় বেশি কম? সবসময়ই মানুষটা এত নির্লিপ্ত থাকেন কীভাবে?
রাজকন্যা লিলি চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। রানির ব্যথা না লাগলেও তার যেন খুব ব্যথা লাগছে। চোখমুখ থেকে থেকে বিকৃত করছে।
“আপনার কি খুব লেগেছে, রানি?”
প্রশ্ন করে কৌতূহল নিয়ে তাকাল সে রানির দিকে। রানি রাজমাতার থেকে চোখ ফিরিয়ে লিলির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ করলেন।
“না।” সংক্ষিপ্ত ভাবে উত্তর দিলেন তিনি।
“অনেক রক্ত ঝরলো তো!”
রানি রাজকন্যা লিলির দিকে তাকালেন। এই মেয়েটি তাকে অপছন্দ করতো আগে। এখনও হয়ত করে কিন্তু আগের তুলনায় সামান্যই। এই মেয়েটির হাত কেটে ফেলেছিলেন তিনি ক্রোধে। কিন্তু মেয়েটির উদ্বেগ দেখে সেই কথা কেউ বলবে? দিনে দিনে তিনি স্রষ্টার প্রতি যতই অভিযোগ তুলে নিতে আরম্ভ করেছেন ততই যেন পৃথিবী হয়ে উঠছে ভালোবাসার। নয়ত রাজকন্যা লিলির মতো মেয়ে তার জন্য ভাববে সেটা দুঃস্বপ্নেও কেউ হয়ত কল্পনা করেনি।
জড়িবুটি লেপে দিয়ে রানির আদেশেই রাজবৈদ্য স্থান ত্যাগ করেছে। চলে গিয়েছে লিলিও। হেমলক গিয়েছে রাজবৈদ্যর থেকে পথ্য আনতে। তীব্র ব্যথা যদি হয়!
রানিকে আক্রমণের সংবাদটি পেয়ে ছুটে এলো মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার। এসেই কুর্ণিশ করে হড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি ঠিক আছেনতো, রানি? রাজ্যের ভেতরে আপনাকে আক্রমণ করে ফেলল কে? কার এত দুঃসাহস হলো ভেবে বিস্মিত হচ্ছি। আমি চারপাশে প্রহরীদের পাঠিয়েছি আরও। অবশ্যই সন্ধান পাওয়া যাবে কার এত দুঃসাহস।”
রানি শীতল দৃষ্টিতে তাকালেন মন্ত্রীর দিকে। তার চেয়েও শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“আমার আসার সংবাদটি আপনি ব্যতীত আর কে জানত? আর কাকে জানিয়েছিলেন?”
এতটাই শান্ত কণ্ঠ ছিলো যে ত্রিপাদ কুমারের মাথা নত হয়ে গেলো। যদিও তার হিসেব মিলল না কিন্তু মনে মনে নিজের ভুলটি ধরে ফেলল চট করেই।
লজ্জিত ভঙ্গিতে জানালো, “রাজমাতাকে জানিয়েছিলাম।”
“আমি নিষেধ করেছিলাম আপনাকে কাউকে জানাতে। তারপরেও?” রানির কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেলো ভীষণ।
ত্রিপাদ কুমারের নত মস্তক লজ্জায় আরও নুইয়ে গেলো, “আমি বলতে চাইনি। রাজমাতা এত তাগাদা দিচ্ছিলেন যে না বলে পারিনি।”
“একটি রাজ্যের মন্ত্রী হয়ে আপনার এতটুকু জ্ঞান হলো না যে, আমি যে মানুষটার নজরদারি করতে আপনাকে বললাম তাকেই আমার আসার সংবাদটি দিয়ে দিলেন!”
“আমি দুঃখিত, রানি। আমি লজ্জিত।”
“আপনার ভুলের জন্য আমার প্রাণও যেতে পারত। তখন দুঃখিত বলতেন কাকে? হ্যাঁ?” প্রায় চিৎকার করে উঠলেন রানি। চোখে মুখে তার তীব্র রাগ ফুটে উঠেছে।
ত্রিপাদ কুমার আর একটি কথা বলারও সাহস করল না। রানির গর্দান নেওয়ার স্বভাবের কথা তার ঢের জানা আছে। কথা বলে নিজের প্রাণ দিবে না-কি সে? এমনিই একটা বড়োসড়ো অন্যায় করে বসে আছে।
আরতি থেমে গিয়েছে। কানে এসে তীর্যক ভাবে বিঁধতে থাকা ঘুঙুরের শব্দটিও থেমে গিয়েছে যথারীতি।
রানি নিজের তীব্র রাগ দমিয়ে নিলেন। তিনি তার খেলা কোনো ভাবেই নষ্ট করবেন না। তার বুঝে যাওয়ার বিষয়টি শিকারী জেনে গেলে সাবধান হয়ে যাবে। এতে রানির চাল নষ্ট হবে। তাই তিনি দমে গেলেন। থমথমে গলায় নির্দেশ ছুঁড়লেন, “তীর কে মেরেছে তার খোঁজ বন্ধ করুন। যান।”
ত্রিপাদ কুমার আর এক মুহূর্ত ব্যয় না করেই ছুটে গেলো। এই প্রাসাদের ভেতরে এত জটিল জটিল সম্পর্কগুলো সে কি তা বুঝেছিলো? বুঝলে আর এই ভুলটি কি করতো?
—————
গভীর নিশুতি রাত্রি। চারপাশে তেমন কোনো শোরগোল নেই। রাজমাতার নিদ্রা ছুটে গেলো সেই শোরগোল না থাকা পরিবেশে মৃদু ডাকে। অদ্ভুত ভাবে কেউ যেন তাকে ডাকল!
তিনি চট করে উঠে বসলেন। তার কক্ষে সবসময়ই আলো থাকে। খাসদাসীটি শুয়ে থাকে মেঝেতে। একা কক্ষে তিনি ঘুমাতে পারেন না।
তৃষ্ণায় গলায় শুকিয়ে যাওয়ায় তিনি ঘুম জড়ানো কক্ষে দাসীটিকে ডাকলেন জলের জন্য। এবং খেয়াল করলেন দাসীটি সাড়া দিচ্ছে না। তিনি আবার ডাকতে গিয়ে পুরোপুরি চোখ মেলতেই খেয়াল করলেন তার কক্ষটি অন্ধকার। এত অন্ধকারে কখনো তিনি থাকেননি এত বছরেও। আচমকা এই অন্ধকার যেন তার গলা চেপে ধরল। ধড়ফড়িয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন পালঙ্ক ছেড়ে।
দাসীটিকে আবারও ডাকলেন। সাড়া নেই বিপরীতে। তখনই শব্দ হলো বাতায়নে। মৃদু শব্দে চকিত হয়ে গেলেন তিনি। তড়িৎ গতিতে জানালায় তাকাতেই দেখলেন ঝড় আসছে। শা শা বাতাস আসছে খোলা জানালা দিয়ে। অন্ধকার আকাশে মৃদু মৃদু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এই অন্ধকার কক্ষে, এই এলোমেলো পরিবেশে যেন তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। শীগ্রই তিনি ছুটে গেলেন বাহিরে। কক্ষ ছেড়ে।
প্রাসাদে আজ কোনো প্রহরী নেই যেন! চারপাশটা শূন্য, নিস্তব্ধ। রাজমাতা আরও ভড়কে গেলেন। এত বড়ো প্রাসাদে, এত মানুষ থাকে অথচ আজ কেউ নেই! রাতারাতি সবাই হাওয়া? এই শূন্য প্রাসাদে তার কণ্ঠ যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসছে তারই কাছে। তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। চারপাশটায় তত ঝলমলে আলো নেই। সবগুলো কক্ষের দোর আটকানো। কেবল একটি কক্ষই মেলা। মৃদু আলোটুকু আসছে সেই কক্ষ থেকেই।
রাজমাতা আরও চমকে গেলেন। তীব্র ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো। এটি সেই কক্ষ যা বহুবছর যাবত বন্ধ হয়ে ছিলো। এটি সেই কক্ষ যেটির সামনে লোহার শিক লাগানো ছিলো যা ছুঁলেই প্রাণ হারাতে হতো! অথচ আজ সেই কক্ষের দোর খোলা। হা হয়ে খুলে আছে দোরটি। যেন তাকে গিলে খাবে গোগ্রাসে! সেখানে ধিক্ ধিক্ আলোয় মশাল জ্বলছে। আহামরি তত আলো ছড়াচ্ছে তেমনও নয়।
রাজমাতার মনে হলো বহু বছর আগে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন। কক্ষটি থেকে ঘুঙুরের শব্দও ভেসে আসছে মৃদু। এই শূন্য প্রাসাদে কেবল এক টুকরো শব্দ এই কক্ষেই!
তীব্র ভয়, উন্মাদনা নিয়ে রাজমাতা কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালেন ধীরে ধীরে। তার পা দু'টো অস্বাভাবিক কাঁপছে। অসাড় হয়ে আসছে যেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই কক্ষ থেকে একটি খুব সামান্য শব্দ এলো। ডাক এলো তার জন্য,
“কী নামে ডাকবো তবে? রাজমাতা প্রাচী নাকি নর্তকী তাপসী?”
রাজমাতা প্রাচীর মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বের হলো একটি নাম, “সুর.. সুরসুন্দরী!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………