পবনপত্র - পর্ব ১৮ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          মার্জিয়া স্কুলের পোশাক পরে বেরিয়েছে উঠোনে। সকালের রোদটা তার ভালো লাগে। সে দেখে, মারুফ পেছনে হাত গুটিয়ে মনোযোগ দিয়ে বাড়ির শেষ সীমানায় তাকিয়ে রয়েছেন।

“আব্বা, গেলাম।”

তিনি ধাতস্থ হয়ে পেছনে ঘুরলেন। ইশারায় কাছে ডাকলেন মেয়েকে, “ছোট মা?” আঙুল তুলে রান্নাঘরের দিকটা দেখালেন, “এই যে এদিকে আরেকটা ঘর বানাবো। ভালোই জায়গা পড়ে আছে। বড়সড় একটা ঘর হবে।”

মার্জিয়া হা করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে, তারপর বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বললো, “কেন?”

“তোমার একটা আলাদা ঘর লাগবে। মৌয়ের জন্য ঐ ঘরটাই থাক। তোমরা বড় হচ্ছো, বিয়েশাদি হবে। তারপর জামাইয়েরা এলে তো—”

“এতো তাড়াতাড়ি বিয়ের চিন্তা?”

“তাড়াতাড়ি চিন্তা করাই ভালো। একদিন তো সব ঠিকঠাক করতেই হবে।”

“লাগবে না। রিপন মামা চলে গেলে আমি নাহয় ঐ ঘরেই থাকবো।”

“ঐ ঘরটা ছোট। বড় একটা ঘর লাগবে।”

মার্জিয়া একটু তাড়া দেখায়, “আব্বা? আপনাকে কি প্রতিবছরই ভাঙচুর করতে হবে? এখন একটু থামেন তো। আমি বড় হওয়ার পর এইদিকে আরও বড় বড় দুইটা ঘর তুলবো। আর ঐপাশে বাগানও করবো একটা। কামরাঙার গাছ তো আছেই, একটা পেয়ারার গাছ লাগাবো...”

মারুফ অভিভূত হয়ে কথাগুলো শুনলেন। বাইরে অবশ্য কোনো মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন না। বারান্দার দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে উচ্চস্বরে বললেন, “মৌ মা? শুনে যাও তোমার ছোট বোন কী বলে!”

মার্জিয়া সরু চোখে আব্বার দিকে তাকায়, “আপনার কি মনে হয় আমি ইয়ার্কি করছি?”

“না না। বিশ্বাস করলাম বলেই তো মৌকে ডাকলাম। একটু দেখুক, তার ছোট বোনের চিন্তাভাবনা কতো সুদূরপ্রসারী। ওর নিজের তো কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই নেই।”

আব্বার ডাক শুনে মৌমিতা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলো। শেষ বাক্যটা তাকে আবার চলে যেতে বাধ্য করলো। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই মানে? আব্বা মাঝে মাঝে এমন লাগামহীন কথা যে কেন বলেন! ছোট মেয়ের প্রশংসা করবেন ভালো কথা, সেটার জন্য বড় মেয়েকে টেনে পাতালে নামিয়ে দেওয়া কি খুব জরুরী?

মার্জিয়া আব্বার আলোচনা সভা থেকে মুক্ত হয়ে কোনোমতে দরজার বাইরে এসেছে। সকালে এখানে রিকশা পাওয়া দায়। শুধু রিকশা কেন, কোনো প্রাণীই নেই রাস্তায়। সে অস্থির হয়ে আশেপাশে তাকায়। কিছুদূর হেঁটে গেলেই আর রিকশা নিতে ইচ্ছে করবে না। কষ্ট করে হাঁটার পরেও পুরো ভাড়াটাই দিতে হয়। সময় নষ্ট, টাকাও নষ্ট।
সে দেখলো, জুনায়েদ এদিকেই আসছে। কাছাকাছি এসে ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে বললো, “কোথায় যাও?”

“আপনার মাথায়।”

“সোজা কথা বললে কী হয়?”

“সোজা কথা কেন বলবো? আপনার কমন সেন্স দেখলে আমার কথাই বলার ইচ্ছা করে না। তবুও যে বলি, সেটাই তো বেশি।”

জুনায়েদ হাসে, পাঁচিলের উপর দিয়ে অযথাই উঠোনের দিকে দেখে, “তোমার মাথা তো দেখি খুব গরম। ছাতা নিয়ে যাও। দেবো? ছাতা?”

“আপনি ছাতায় চড়ে বসে থাকেন।”

আর তর্কে গেলো না সে। মেয়েটার মাথা আসলেই গরম। নাহলে তার সাথে এভাবে কথা বলতো না। বিষয়টাকে এবার একটু গুরুত্ব সহকারে দেখলো জুনায়েদ। রাস্তার ডানে-বামে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তোমার ক্যালকুলেটরের কী খবর? ঠিক করে দিতে হবে?”

মার্জিয়া বিড়বিড় করে বললো, “নিজেকে ঠিক করেন আপনি।”

“কী?”

“আপনার মাথা! দেখতে পাচ্ছেন না দেরি হয়ে গেছে?”

“এখানে দাঁড়িয়ে রিকশা পাওয়া যাবে না। মোড়ের দিকে যেতে হবে।”

জুনায়েদ ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। একেবারে রিকশা নিয়েই হাজির হবে হয়তো। মেয়েটা ছোট একটা শ্বাস ফেলে। রাস্তার দিকে চোখ থাকলেও তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরে গেছে। সে নখ কামড়াতে শুরু করলো। জুনায়েদ ভাই ক্যালকুলেটরের কথা মনে রেখেছে। সেটা যদি ঠিক করে নেয়া যেতো, তাহলেই হয়তো বেশি ভালো হতো। আব্বাকে এভাবে টাকা নষ্ট করতে হতো না। এমনিতে বাজারের অবস্থা ভালো না। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, আব্বার আয় বাড়ছে না। তবুও তিনি বাড়িটা সংস্কার করার কথা ভাবছেন। নতুন ঘর দিয়ে মার্জিয়া কী করবে? শ্বশুরবাড়ি যদি পাশের বাসাই হয়, তাহলে তো কোনো ঝামেলা নেই!

“মার্জিয়া?”

মেয়েটা চমকে উঠে ঘুরে তাকালো। জুনায়েদ রিকশা এনেছে। খুব মিষ্টি করে তাকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে মার্জিয়া রিকশায় উঠলো। কী যেন ভেবে হড়বড় করে বলে ফেললো, “জুনায়েদ ভাই? আপনি কি মন খারাপ করলেন?”

“মন খারাপ কেন করবো?”

“কিছু না।”

কথাটা বলেও মেয়েটা কোনো ভরসা পায় না, দাঁত দিয়ে কুটকুট করে নখ কাটতে থাকে সে। রিকশা চলতে শুরু করলো। তখনই জুনায়েদ স্বাভাবিকের চেয়ে একটু উঁচু গলায় বলে ওঠে, “আরও বেশি করে নখ কামড়াও!”

হঠাৎ এমন প্রকাশ্য আক্রমণে মার্জিয়া রাগে ফুঁসে উঠলো, পেছন ঘুরে দেখলো, ছেলেটা ইতোমধ্যেই নির্লিপ্ত হয়ে বিপরীত দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

—————

ক্লাসে মন নেই বাদলের। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে শহরের এক গ্রন্থাগারে ‘বহুব্রীহি’ বইটা পেয়েছে। তবে তা কেনার মতো টাকা তার কাছে নেই। জমানো টাকাটা বইয়ের দামের এক তৃতীয়াংশ। আমজাদ ভাই কিংবা রাশেদের কাছে সাহায্যও চাইবে না, কাজটা সে একাই করবে। কিন্তু এতোগুলো টাকা জোগাড় করাও চাট্টিখানি কথা নয়। তার মনটা তবু আজ ভালোই। বইটা খুঁজে পাওয়া গেছে, এটা খুশির খবর বটে। তবে তার মন ভালো থাকার আরেকটা কারণ আছে। গতদিনের ছোট্ট ঘটনাটা এখনও মাথার ভেতর ঘুরছে। কুকুরগুলোর ভয়ে তটস্থ মেয়েটা যেভাবে তার দিকে সরে এসেছিলো, তা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
বাদল দুই হাত বেঞ্চের উপর গুটিয়ে রাখলো, তারপর তার মাঝে মুখখানি লুকিয়ে ফেললো। রাশেদ খুব চালাক। মুখ দেখলেই বুঝে যাবে, কিছু একটা হয়েছে। আর বাদল কাউকেই কিছু বুঝতে দিতে চায় না, যতোদিন ব্যাপারটা এমন একপাক্ষিক থাকছে। এখনও একটা বিষয় সে মেনে নিতে পারেনি যদিও। সে কেন মৌমিতার জুনিয়র! মেয়েটা হয়তো তাকে ছোট হিসেবেই দেখবে। এই ছোট হয়ে থাকার ব্যাপারটাই তাকে পীড়া দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

টিফিনের সময়েও মৌমিতা লাইব্রেরিতে যাচ্ছে না অনেকদিন হলো। আজ সে ভেবে রেখেছে, তামান্নাকে নিয়েই যাবে সেখানে। নতুন কোনো বই এসেছে কিনা দেখতে হবে। কিছুদিন হলো পড়ার মতো কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।
বিরক্ত হয়ে ক্লাসে বসে থাকার পর সে বাইরে বের হলো। তামান্না অনেকক্ষণ আগেই বেরিয়েছে। এখনও ফিরছে না। নিশ্চয়ই কোথাও আড্ডা দিচ্ছে।
দোতলার বারান্দায় হাঁটতে লাগলো মৌমিতা। শ্রেণিকক্ষগুলোর ভেতরে উঁকি দিলো। তারপর সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে এলো। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজে ফেলেছে সে। তবু তামান্নাকে পেলো না কোথাও। বাড়িতে যাওয়ারও কথা না। ব্যাগটা এখনও বেঞ্চেই পড়ে আছে। তাহলে কোথায় গেলো?

মৌমিতা পুরোনো ভবনের দিকে যাবে বলে মনস্থির করলো। কিন্তু বেশিক্ষণ সময় নেই। এখনই টিফিনের বিরতি শেষ হবে।
বারান্দার এক কোণে গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। মুখ ঘামে ভিজে গেছে। এদিক-ওদিক না গিয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়াটাই ঠিক হবে। তামান্নাও হয়তো চলে আসবে। মৌমিতা ওড়নার কিনারা দিয়ে মুখটা মুছে ফেললো। হাত দুটোও কেমন চিটচিটে হয়ে আছে। সে কমনরুমের দিকে পা বাড়ায়। হাত-মুখ ধুতে হবে।
ঘণ্টা বেজে গেছে, বিরতি শেষ। ভিড়ের বিপরীতে হেঁটে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছালো সে। এককোণে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে থেমে দাঁড়ালো। কমনরুম ফাঁকা, সবাই ক্লাসে চলে গেছে। তবু একটা মেয়ে একপাশে চেয়ারে বসে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। মৌমিতা দ্রুত পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। কিছুটা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার পর সে মেয়েটার কাঁধে হাত রাখে, “তামান্না?”

মেয়েটা একটু চমকায়। মাথা না তুলেই দুই হাতে মুখ ঘষতে থাকে।

“কী হয়েছে?”

মৌমিতার স্বরে উৎকণ্ঠার আভাস পেয়ে তামান্না দ্রুত অভয় দেয়, “আরে, কিছু না।”

চোখজোড়া লাল হয়ে উঠেছে। অনেক চেষ্টা করেও সে গাল থেকে অশ্রুর দাগটা তুলে ফেলতে পারেনি। বড় শ্বাস টেনে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো সে, “টিফিন শেষ না? ক্লাসে চল। মুখটা একটু ধুতে হবে।”

“তুই... কাঁদছিলি কেন?”

তামান্না কপালে হাত রেখে বলে, “মাথা ব্যথা রে। কালকে রাত থেকে শরীরটা এত্তো খারাপ হয়ে গেলো। ওষুধ খেয়েছিলাম। ভাবলাম, ঠিক হয়ে যাবে। তবু দেখলাম, আবার মাথাটা ধরেছে।”

“তুই বাসায় যা তো। চল, আমি রেখে আসি।”

তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মৌমিতা। অশ্রুর সাথে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সযত্নে সরায় মুখ থেকে। এই মমতামাখা সামান্য স্পর্শেই তামান্নার অশ্রু আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে হাত দিয়ে কোনোমতে চোখ ঢেকে ধরে, ভাঙা স্বরে বলে, “মাথাটা খুব ব্যথা করছে।”

“চল। আমি তোকে বাড়িতে রেখে আসি।”

মৌমিতা দু'হাত ধরে মেয়েটাকে টেনে তুললো। কলপাড়ে নিয়ে গেলো। ব্যথাটা যে মাথায় নয়, অন্য কোথাও, তা সে বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তবু তাকে জেরা করতে গেলো না। তার এমন ভঙ্গুর দশা মৌমিতা আগে কখনও দেখেনি। হয়তো বিহ্বলতার কারণেই সে আর কোনো প্রশ্ন করতে পারলো না।

তামান্নার মা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন মেয়েকে নিয়ে। তবু মৌমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একটু বসো মা। কিছু খেয়ে যাও।”

“না চাচি, কিছু খাবো না। তামান্না বললো, ওর মাথা ব্যথা। ওষুধ খেয়েও নাকি কাজ হয়নি।”

আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “হ্যাঁ। ও একটুতেই অসুস্থ হয়ে যায়। নিয়মিত কলেজেও যেতে পারে না এজন্য। ভালোমতো খাওয়া-দাওয়াও করে না...”

মৌমিতা মাথা নাড়লো। তার মনোযোগ ভদ্রমহিলার কপালের ঐ কাটা দাগে। সে ভাবছে, একবার প্রশ্ন করবে, আঘাতটা কী করে লেগেছে? প্রশ্ন করা সম্ভব হলো না। সে অন্যমনস্ক হয়েই বসে রইলো। আয়েশা তাড়াহুড়ো করে কিছু কাজ সেরে এলেন। তারপর পাশের সোফায় বসলেন, “এতো কষ্ট করলে মা, কিছু একটা খেয়ে যাও। এক কাপ চা দিই?”

পুনরায় খাওয়ার প্রসঙ্গ আসায় মেয়েটা মনে মনে বিরক্ত হয়। সে সজোরে মাথা নাড়ে, “না, চা খাবো না। আমি বাসায় যাই।”

মৌমিতার সাথে আয়েশাও উঠে দাঁড়ালেন। আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কয় ভাইবোন তোমরা?”

“দুই বোন।”

“তুমি বড়?”

ভদ্রমহিলার জিজ্ঞাসায় মৌমিতা একটু খুশি হলো। সাধারণত যখন সে কাউকে জানায়, তারা দুই বোন, মানুষের দ্বিতীয় প্রশ্নটা এমন হয়—‘ভাই নেই?’
আয়েশা অহেতুক ভাই নিয়ে কিছু জানতে চাননি। মৌমিতা মাথা দোলায়, হাসিমুখে বলে, “জ্বী।”

“তুমি পুরোই তোমার বাবার মতো দেখতে।”

মেয়েটা অবাক হয়, তবু সহজভাবেই বলে, “আপনি আব্বাকে চেনেন?”

“হুম।” তিনি মাথা নাড়লেন, সচেতন হয়ে বললেন, “এক গ্লাস পানি খেয়ে যাও?”

“না।”

মৌমিতা হনহন করে দরজার দিকে গেলো, ছিটকিনি খুললো নিজ দায়িত্বে।

“কিছু একটা খেয়ে যেতে। আমি খুব খুশি হতাম তাহলে।”

“আজকে থাক।”

মেয়েটার কণ্ঠে অপ্রয়োজনীয় দৃঢ়তা। অনেকটা প্রত্যাখ্যানের মতো শোনালো সেটা! আয়েশা তবু হাসলেন।
মারুফ খন্দকারের মেয়েটা প্রকৃতপক্ষেই তার ছোট সংস্করণ। একই চোখ, একই মুখ। শুধু তাই নয়, স্বভাবটাও একই। অল্প শব্দে উত্তর দেয়ার বৈশিষ্ট্য নির্ঘাত সে তার আব্বার কাছ থেকেই পেয়েছে। এই তেজ, এই জেদটুকুও তার রক্তে বইছে যেন।

টিউশন থেকে ফিরে রাশেদ হাই তুলতে তুলতে ঘরে ঢুকলো। বাদল নিজের টেবিলের দিকে যায় ব্যাগটা নিয়ে। আমজাদ সোজা হয়ে বসে, তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “বাদল? তোর একটা চিঠি এসেছে।”

“আমার চিঠি?”

“হ্যাঁ, একজন এসেছিলো। তোর খোঁজ করলো। এটা দিয়ে বললো, কালকে আবার আসবে।”

বাদল খামটা হাতে নেয়। চিঠি পাঠিয়েছে হারুন ভাই। টাকাও পাঠিয়েছে, কলেজ আর টিউশনসহ সব খরচের টাকা। হারুন কাল আবার আসবে দেখা করতে, চিঠিতেও এমনটাই লিখেছে।
খামের ভেতরে চিঠিটা ঢুকিয়ে রাখলো বাদল। জানালার সামনে গিয়ে টাকাগুলো গুনতে লাগলো। এমনিতেও তার হাত খরচ আর টিফিনের টাকা একটা বইয়ের জন্য তুলে রাখা। এখান থেকেও অতিরিক্ত কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে কিনা, সেটাই পরখ করে দেখলো সে।

স্টেশনে জনসাধারণের ভিড়। এ সময়ে একটা ট্রেন আসে, তাই যাত্রীদের আনাগোনা কমছে না।
ছেলেটা হাঁটছে ছাউনির বাইরে। বাকিদেরকে সে কিছু জানিয়ে আসেনি। এখানে আসার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে সে। রেলস্টেশনে পরিচিত মুখ তাকে অস্বস্তি দেয়। এই জায়গাটা তার একার। দুনিয়া আর বাস্তবতা যখন খুব ভারী মনে হয়, তখন সে সব টান ছিন্ন করে বেরিয়ে পড়ে।

আর কিছুদূর হাঁটলেই তুলনামূলক অনুন্নত একটা এলাকা চোখে পড়ে। শহুরে জীবনের বিলাসিতার ছিটেফোঁটা নেই সেখানে। অস্তগামী সূর্যের ম্লান আলোয় মফস্বলের এই বিচ্ছিন্ন লোকালয়টিকে আরও অন্যরকম দেখায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করে খেলছে এখনও। শীঘ্রই তাদের মায়েরা এসে কান টেনে ধরে ঘরে নিয়ে যাবে। আবার যখন আকাশে সূর্যের দেখা মিলবে, ওরা বেরিয়ে পড়বে নিজ নিজ আস্তানা থেকে। জীবনের এই চিন্তামুক্ত দিনগুলো সীমিত।
বাদল প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে পড়লো। গ্রন্থাগার এখনও খোলা আছে কিনা, সে জানে না।

—————

মৌমিতা ক্লান্ত দৃষ্টিতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। কলমটা খাতার উপরে ধরে রাখা। খোলা জানালার বাহির থেকে বাতাস আসছে। তাতে শিউলি ফুলের গন্ধ। মেয়েটার মুখের উপর ছোট ছোট চুলগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, বিক্ষিপ্তভাবে। চোখে, মুখে অবাধ্য হয়ে বিঁধে যাচ্ছে তারা। মেয়েটা তাদের সরায় না, চোখ বন্ধ করে। সামনে থাকা বোর্ড, শ্রেণিকক্ষ, সবটাই অন্ধকারে ডুবে যায় খানিকক্ষণের জন্য। শিউলি ফুলের পাশাপাশি আরও একটা গন্ধ বাতাসে। সেটা ভালোভাবে অনুধাবন করার সময় পেলো না সে। ঘণ্টা বেজে উঠলো।
তামান্না আসেনি আজ। তার শরীরটা হয়তো সারেনি। একটু ভালোভাবে চিকিৎসা করানো যায় না? এভাবে চলতে থাকলে তো পড়াশোনার ক্ষতি হবে।
মেয়েটা এসব চিন্তা থামিয়ে দিয়ে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায়।

লাইব্রেরির ভেতরে পা ফেলতেই মৌমিতা দেখে, বাদল দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঐ জানালার সামনে। হাতে একটা বই, তা সাবধানে টেবিলে রাখলো সে। মেয়েটা সেদিকে অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার মনে কোনো ভাবনা আসে না। কোনো রাগ, ঘৃণা, কিছুই না। সে কেবল পা ফেলে এগিয়ে যায় নিজের আসনের দিকে। বাদল তাকে দেখলো না। কিংবা না দেখার ভান করলো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশ ভাবুক ভঙ্গিতে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মৃদু একটা হাওয়া ধাক্কা দেয় মেয়েটাকে। আজ চুলের সাথে এলোমেলো হয়ে যায় তার চিন্তার জগৎ।

চেয়ারে বসার পর বাস্তবে ফিরে আসে মৌমিতা। সামনে রাখা বইটা হুমায়ূন আহমেদের বহুব্রীহি। অনেকদিন ধরেই সে এটা খুঁজেছে শহরের লাইব্রেরিগুলোতে। আশেপাশে তাকালে দেখা যায়, ছেলেটা কোথাও নেই, চলে গেছে।
মেয়েটা কৌতূহল দমন করলো না আর। হাত বাড়িয়ে বইটা নিজের দিকে টেনে নিলো। কয়েক পাতা তো পড়ে দেখাই যায়। বইটা খুললো সে, অযথাই ফাঁকা পৃষ্ঠাটার দিকে দৃষ্টি তাক করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। ছোট একটা শ্বাস ফেললো। চোখের উপর থেকে সন্তর্পণে চুলগুলো সরালো। প্রথম পৃষ্ঠায় যেতেই একটা ভাঁজ করা কাগজ দেখলো। আরেক দফা চারপাশে তাকালো।
জানালাটা বন্ধ থাকে না কখনোই, আজকেও খোলা। তবে হাওয়ার দাপট হয়তো আজ একটু বেশিই। মৌমিতা উড়তে থাকা পাতাটাকে চেপে ধরলো আলতো হাতে। ভাঁজ করা কাগজটা দু'হাতে খুলে মেলে ধরলো।

   “ঠিকানা তোমার হারিয়ে ফেলেছি,
   উড়োচিঠি বাকি আর নেই।
   জানা অজানার ভিড়ে কেন তবু
   বারবার খুঁজি তোমাকেই?”

কানের কাছে বইতে থাকা বাতাসের শনশন শব্দ, লাইব্রেরির মৃদু কোলাহল... সব ভেদ করে মেয়েটা শুধু নিজের হৃৎপিণ্ডের ক্রমবর্ধমান ধুকপুকানি শুনতে পেলো। চোখের সামনের সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেলো মুহূর্তেই। সামনে রয়ে গেলো কেবল একটা চিরকুট।
হাতের লেখাটা আলাদা শুধু। বাকি সব তার চেনা। শব্দ, ছন্দ, সব তো তারই।

চোখের সামনে ভেসে উঠলো, তার নিজের হাতে ভাঁজ করা একটা কাগজের টুকরো। দোতলা বাড়ির জানালা থেকে ছুঁড়ে ফেলা ঐ বিমান, আর একটা ছেলে।
মৌমিতার হাত কেঁপে ওঠে। চিরকুটটা সে হাতের মাঝে চেপে ধরে। ছেলেটার মুখটা মনে পড়লো না, মনে পড়লো তার হেঁটে যাওয়ার ধরন, পেছন থেকে আবছা দেখা একটা অবয়ব মাত্র। ঐ এক ঝলকের পরিচিত মানুষটা, সে বাদল? সেদিন মেয়েটা টের পেলো না কেন, এই ছেলেটাকে মনে জায়গা দেয়াটা চরম ভুল? বয়সে ছোট, বেপরোয়া, বেয়াড়া একটা মানুষকে বাহির থেকে দেখতে এতো আপন মনে হবে কেন? আর বাদল জানলোই বা কীভাবে—জানালা থেকে ঐ কাগজের টুকরোটা মৌমিতা ছুঁড়েছিলো? কীভাবে বুঝলো, এই বইটা সে খুঁজছিলো? নাকি এসবই কাকতালীয়?

প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে, আর মেয়েটা ঘুরপাক খায় লাইব্রেরির প্রতিটা কোণে। পুরোনো ভবনের চারপাশে খুঁজে বেড়ায় তাকে, যতোদূর খোঁজার সামর্থ্য তার আছে। তবু পরিচিত সেই মুখখানি আর দেখা দেয় না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp