ভাঙা আয়নার আলো - পর্ব ২১ - শারমিন আক্তার সাথী - ধারাবাহিক গল্প

ভাঙা আয়নার আলো - শারমিন আক্তার সাথী
          বারবিকিউ পার্টি শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। রাত যেন ধীরে ধীরে পুরো পৃথিবীটাকে নিজের কালো আঁচলের নিচে ঢেকে ফেলেছে। বাচ্চারা রাত এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের হাসি-আনন্দে মুখরিত উঠান এখন নিস্তব্ধ। বড়োরাও যে যার ঘরে চলে গেছে। চারদিকে এক ধরনের গভীর নীরবতা নেমে এসেছে।

জবা শাড়ি বদলে একটি হালকা থ্রি-পিস পরে নিঃশব্দে বাইরে বের হলো। আষাঢ়ের রাত।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে চারদিক ডুবে আছে। আকাশজুড়ে জমাট কালো মেঘ। মনে হচ্ছে, আকাশ আজ নিজের বুকভরা কান্না আর ধরে রাখতে পারছে না। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ, দূরের গাছপালার ফিসফিস শব্দ, আর অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা ভেসে বেড়াচ্ছে।

বারান্দা থেকে নেমে বাইরের পাকা বেঞ্চে বসে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল জবা।
এমন বৃষ্টিভেজা রাতগুলোতেই ইরফানকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।

বৃষ্টির দিনে ইরফানের বায়নার শেষ থাকত না। বৃষ্টি দেখলেই বলত,
'জবা খিচুড়ি রান্না করো।'
সাথে ইলিশ মাছ আর গরুর মাংস ভূনা তো থাকতোই। ইরফান তৃপ্তি করে খেতো। জবা চোখের তৃপ্তি নিয়ে তাকিয়ে দেখত। মানুষের প্রিয় মানুষকে খেতে দেখার মাঝেও যে এক ধরনের সুখ লুকিয়ে থাকে, তা জবা জানত।

আজ ইরফানের সাথে জবার কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও স্মৃতিগুলো সম্পর্কের নিয়ম মানে না। তারা দরজায় কড়া নাড়ার প্রয়োজনও বোধ করে না। যখন-তখন এসে বুকের ভেতর ঝড় তুলে দেয়।

জবার মনে হলো, সময় যেন উল্টো দিকে হাঁটছে। সে ধীরে ধীরে ফিরে যাচ্ছে অতীতে। সেই দিনগুলোতে, যখন পৃথিবীটা এতটা ফাঁকা ছিল না।

অন্ধকারের আড়ালে জবার চোখ বেয়ে নেমে এলো কয়েক ফোঁটা জল। নিকশ কালো আধারে জবার চোখের জল কেউ দেখল না, কিন্তু একজন অনুভব করল। নিঃশব্দে। শব্দ না করে। দাবি না জানিয়ে।

ফারিস। পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। জবার কান্না থামানোর চেষ্টা করল না। কোনো সান্ত্বনাবাক্যও বলল না। শুধু উপস্থিত থাকল।
কখনো কখনো মানুষকে শান্তনা দেওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা।
জবা কতক্ষণ কেঁদেছে, তার হিসাব নেই।

হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। প্রথমে টুপটাপ। তারপর ঝুপঝুপ। তারপর যেন সমগ্র আকাশ পৃথিবীর উপর নেমে এলো। বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়তে লাগল টিনের চালে, গাছের পাতায়, উঠানের মাটিতে।

জবা তবুও নড়ল না। স্থির হয়ে বসে রইল।
এইবার ফারিস ধীরে ধীরে এসে ওর পাশে বসল। জবা জানত সে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল।
অনেকক্ষণ ধরেই জানত। তবুও কিছু বলেনি।
কিছু নীরবতা ভাঙতে নেই। ফারিস জবার মাথায় হাত রেখে বলল,
'ভিতরে চল।'
'আরেকটু সময় থাকি।'

বৃষ্টি ক্রমশ তীব্র হতে লাগল। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো শরীরে এসে বিঁধছে। মনে হচ্ছে অসংখ্য বরফকুচি ছুঁড়ে মারছে কেউ। তবুও ওরা বসে রইল।
অনেকক্ষণ পর জবা ধীর কণ্ঠে বলল,
'আর কতকাল এভাবে একতরফা আমাকে ভালোবেসে যাবেন?'
ফারিস হাসল। একটা ক্লান্ত, বিষণ্ণ হাসি।
কিন্তু বৃষ্টির অন্ধকারে সে হাসি চোখে পড়ল না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
'যতদিন এ দেহে প্রাণটা আছে।'
'তারপরও।'
জবা তাকাল। ফারিসের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এলো। বলল,
'পরকালেও তোর জন্যই অপেক্ষা করব। এ জন্মে না হোস আমার, পরকালে আমার হবি জবা?'

জবা মাথা নিচু করে ফেলল। চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা জল বৃষ্টির স্রোতে মিলিয়ে গেল। পৃথিবীতে কত মানুষ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য জীবন কাটিয়ে দেয়। আর একজন মানুষ আছে, যে বছরের পর বছর কিছু না চেয়েই তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে। অপেক্ষা করে যাচ্ছে। দাবি ছাড়াই। শর্ত ছাড়াই। জবার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

এই মানুষটাকে সে ভালোবাসতে পারছে না।আবার ঘৃণাও করতে পারছে না। শুধু এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করে ফেলছে।
জবা আকাশের দিকে তাকাল।

বৃষ্টিভেজা কালো আকাশটা ঝাপসা লাগছে।
হয়তো চোখের জলের কারণেই। তার মনে হলো, এটাও কি কোনো শাস্তি?
তবে কোন পাপের?
কোন অপরাধের জন্য একজন মানুষকে এমন একজনের ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে হয়, যে তাকে নিঃস্বার্থভাবে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে?'

—————

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ ইরফানের চোখ পড়ল সামনের সিটের নিচে। একটা নারীদের ব্যাগ। ব্যাগটা ও-ই রেখেছিল গাড়িতে। তবুও মুহূর্তেই ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ধরা হাত কেঁপে গেল।
বৃষ্টিভেজা অন্ধকার রাস্তায় গাড়িটা কয়েক সেকেন্ড এদিক-সেদিক দুলে উঠল। ইরফান তাড়াতাড়ি গাড়ি রাস্তার পাশে থামাল। 

বাইরে তখনও মুষলধারে বৃষ্টি। আকাশ যেন পৃথিবীর সব কান্না একসাথে ঝরিয়ে দিচ্ছে।কাঁপা হাতে ব্যাগটা তুলে নিল সে।
চেইন খুলে ভিতরে তাকাল। কিছু কাগজপত্র।
একটা লিপস্টিক। ছোট্ট আয়না। কয়েকটা প্রসাধনী। একজন মানুষের প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট জিনিস। সাধারণ, তুচ্ছ।

তবু আজ সেগুলোকে দেখে ইরফানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার জমে উঠল।কিছুক্ষণ ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইল সে।
তারপর চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজ রাতের ঘটনা মুছে ফেলা যাবে না। 

যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু এবার রাস্তার চেয়ে বেশি ছুটছিল ইরফানের চিন্তাগুলো। একটার পর একটা ভাবনা এসে মাথার ভেতর ধাক্কা মারছে। কোনোটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা এসে জায়গা নিচ্ছে। হৃদপিণ্ডটা যেন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক জোরে ধুকপুক করছে।

অবশেষে শেষ রাতে বাড়ি ফিরল সে। বাড়ির বিশাল গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল। আগে এই বাড়িতে হাসির শব্দ ছিল। জারার ছোটাছুটি ছিল। জবার ডাক ছিল। এখন কেবল নীরবতা। ভয়ংকর নীরবতা।

ভেজা কাপড় বদলে নিজের ঘরে গিয়ে বসে রইল ইরফান। অন্ধকার ঘরে একটার পর একটা সিগারেট জ্বলছে নিভছে। আবার জ্বলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে। কিন্তু ওর বুকের ভার কমছে না। বরং বাড়ছে। প্রতিটি মুহূর্তে বাড়ছে।

আজ প্রথমবার ইরফান অনুভব করল মানুষের সবচেয়ে বড় বিচারক কখনো আদালত নয়। নিজের বিবেক। সেটা যখন প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখন পৃথিবীর কোনো শব্দ তাকে থামাতে পারে না।

ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে ভোরের দিকে এগোচ্ছে। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে। চারপাশে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। হঠাৎ দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে এল ফজরের আযান।
'আল্লাহু আকবার...'

শব্দটা কানে যেতেই ইরফানের বুক কেঁপে উঠল। কেন যেন মনে হলো বহুদিন পর সে এই ডাক শুনছে।

অনেক বছর পর। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে।
পা দুটো ভারী লাগছে। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বাথরুমে গিয়ে অজু করল। ঠান্ডা পানি মুখে পড়তেই যেন বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।

আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিজেই চমকে গেল। এ কাকে দেখছে সে? এই কি সেই ইরফান? যে একসময় জবার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ ছিল? যার জন্য জবা গর্ব করত? আয়নার মানুষটাকে আজ অপরিচিত লাগছে। অচেনা। ক্লান্ত। ভাঙা।
নামাজে দাঁড়াল ইরফান।

কিন্তু সূরা পড়তে গিয়ে বারবার গলা আটকে যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সিজদায় গিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
কাঁপতে কাঁপতে দুহাত তুলে ফিসফিস করে বলল,
'হে আল্লাহ... আমি কী করে ফেলেছি?'

ওর কণ্ঠ ভেঙে গেল। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল জায়নামাজে। আজ প্রথমবার ভয় পেল ইরফান। পুলিশকে নয়।মানুষকে নয়। ভয় পেল নিজের কাজকে।
ভয় পেল সেই বিচারের দিনকে। যেদিন কোনো মিথ্যা থাকবে না। কোনো অজুহাত থাকবে না। কোনো পালানোর পথও থাকবে না।

নামাজ শেষ হওয়ার পর অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো ইরফানের। মনে হচ্ছে বুকের ওপর চাপা পড়ে থাকা বিশাল এক পাথর সামান্য হলেও হালকা হয়েছে। ফজরের কোমল আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা শেষ আযানের ধ্বনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে সকালের পাখিদের ডাকের মধ্যে।

জায়নামাজে বসে কিছুক্ষণ স্থির রইল ইরফান। চোখ দুটো লাল। সারা রাতের ক্লান্তি, অনিদ্রা আর অস্থিরতা মুখে স্পষ্ট। তবু ভেতরে কোথাও এক ধরনের শূন্যতা। যেন কান্নার পর মানুষ কিছু সময়ের জন্য অনুভূতিহীন হয়ে যায়।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের দিকে তাকাল সে। সেখানে পড়ে আছে কোয়েলের ব্যাগ। ব্যাগটা দেখামাত্র বুকের ভেতরের সেই সাময়িক শান্তি আবার অদৃশ্য হয়ে গেল।অতীতের ঘটনাগুলো যেন একে একে ফিরে এল চোখের সামনে। ইরফান চোখ বন্ধ করল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু স্মৃতি মানুষ যতই ভুলতে চায়, ততই তারা ফিরে আসে।

ঘরের ভারী বাতাস থেকে বেরিয়ে বাগানের দিকে চলে গেল সে।
রাতের প্রবল বৃষ্টিতে পুরো বাগান ভিজে গেছে। মাটির গায়ে জমে আছে পানি। ঘাসের ডগায় ডগায় ঝুলছে শিশির আর বৃষ্টির শেষ ফোঁটা। পূর্ব আকাশে সূর্য উঠতে শুরু করেছে। সোনালি আলো ভেজা পাতার ওপর পড়ে ঝিকমিক করছে। অথচ প্রকৃতির এই সৌন্দর্য তার চোখে ধরা পড়ছে না।

একসময় এই সকালগুলো ভালো লাগত। জবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খেত। জারা খালি পায়ে বাগানে দৌড়াত। আজ সবকিছু আছে।শুধু তারা নেই। বাড়িটা যেন আগের চেয়ে আরও বড় হয়ে গেছে। আর সে আরও একা।
কিছুক্ষণ নীরবে হাঁটার পর আবার ঘরে ফিরে এল ইরফান।

তারপর ধারাল কাঁচি দিয়ে কোয়েলের ব্যাগের প্রতিটি অংশ কোটে টুকরো টুকরো করল। এত ছোট টুকরো করল যে বোঝাই গেল না এটা কোনো ব্যাগ। প্রাসাধনী গুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করে ডাস্টবিনে ফেলল।

তারপর একটা রহস্যময় হাসি হেসে নিচে নামল। নিচতলায় নামতেই রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নাস্তার গন্ধ। কাজের মানুষ সালেহা খালা রান্না করছেন। সবকিছু আগের মতোই চলছে। শুধু তার জীবনটাই আর আগের জায়গায় নেই।

বাইরে দাঁড়িয়ে কেয়ারটেকার রইস উদ্দিনকে ডাকল সে।
'রইস উদ্দিন, শোনো।'
'জি স্যার?'
'বাড়ির চারপাশটা পরিষ্কার করে ফেলো। অনেকদিন ধরে এলোমেলো হয়ে আছে।'
রইস উদ্দিন মাথা নাড়ল।
'আচ্ছা স্যার।'
'পরিষ্কার করে ময়লাগুলো জ্বালিয়ে দিও।'
'স্যার রাতে এত বৃষ্টি হলো। ময়লা সব ভিজা। এখন পোড়ালে তো পুড়বে না।'

রাতের প্রবল বৃষ্টি শেষে রোদ উঠছে। সেদিকে একনজর বুলিয়ে ইরফান বলল,
'এখন না বিকালে পুড়িয়ে ফেল। এখন তো রোদ উঠছে। আর বাড়ির সকল রুমের ডাস্টবিন থেকে ময়লা এনে পুড়িয়ে ফেলো।'
'আচ্ছা স্যার।'

কথা শেষ করে ভেতরে ঢুকে এল ইরফান।
ঠিক তখনই পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওর বুক ধক করে উঠল। জবা। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল ও। তারপর কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে জবার শান্ত, নির্লিপ্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
'কাল রাতে তুমি বেশ কয়েকটি মেসেজ করেছিলে। প্রতিটায় বলেছো জরুরি কথা আছে কল করো।'

ইরফানের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। জবা আবার বলল,
'গতকাল জারার হাত থেকে পড়ে গিয়ে আমার ফোনের ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আজ নতুন ফোনে সব সেট করে দেখলাম তোমার মেসেজ। তোমাকে কল করে তোমার পুরাতন নাম্বারে না পেয়ে এটায় কল করলাম।'
'আমার অন্য ফোনটা পানিতে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।'
'ওহ।'

সংক্ষিপ্ত উত্তর। যেন আর কোনো আগ্রহ নেই।
যেন কথাগুলো কেবল সৌজন্য। একসময় যে নারী তার প্রতিটি বাক্য মন দিয়ে শুনত, আজ তার কণ্ঠে কোনো অনুভূতি নেই। অনুভূতিহীন কণ্ঠে জবা বলল,
'এখন বলো এত মেসেজ কেন?'

ইরফান লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। গলা পরিষ্কার করল। তারপর ধীরে বলল,
'জারার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল খুব।'

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। ভয়ংকর নীরবতা। তারপর কল কেটে গেল। কোনো উত্তর নয়। কোনো রাগ নয়। কোনো অভিযোগ নয়। শুধু নীরব প্রত্যাখ্যান। মোবাইলটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনল ইরফান।

মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কারণ সে এমনটাই আশা করেছিল। তবু বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।

মানুষ যখন কাউকে হারায়, তখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ঝগড়ায় নয়; কষ্ট হয় তখন, যখন তার উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।

জানালার বাইরে সূর্য আরও উঁচুতে উঠেছে।
নতুন একটা সকাল শুরু হয়েছে। কিন্তু ইরফানের জীবনে রাতটা এখনও শেষ হয়নি

—————

শিশুদের কোলাহলে মুখর পার্কের সামনে একা বসে আছে সিনথিয়া। চারপাশে রঙিন বেলুন, দোলনা, স্লাইড, সবকিছু যেন জীবনের এক টুকরো আনন্দ ছড়িয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে শিশুরা, তাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে ভেসে এসে লাগছে সিনথিয়ার কানে।
কিন্তু সে হাসছে না।

তার চোখ স্থির হয়ে আছে সেই শিশুদের দিকে অথচ মনে হচ্ছে, সে দেখছে না কেবল, হারিয়ে যাচ্ছে।

আজ থেকে কয়েকদিন আগেও মা হওয়া শব্দটা ওর জীবনের খুব বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না। এতদিন মা হওয়া নিয়ে তেমন বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না ওর। কিন্তু মানুষ যখন কিছু হারায়, তখনই বুঝতে শেখে। সেটা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

যখন থেকে শুনল ও আর কোনোদিন মা হতে পারবে না, তখন থেকেই মা হওয়ার ইচ্ছেটা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মানুষের ইচ্ছেই হয়তো এমন। যা পাওয়া সম্ভব নয় তাকে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা মনে জন্মায়। সেদিন যেন সিনথিয়ার ভেতরের একটা অংশ চিরতরে নিভে গেছে।

তারপর থেকেই প্রতিটা শিশুর হাসি যেন ওকে আরও বেশি ব্যথা দেয়। ও ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে।
'কত অদ্ভুত জীবন…!'

মনে মনে ভাবল ও। যে জিনিস একসময় গুরুত্বই পায়নি, সেটাই এখন তার সবচেয়ে বড় শূন্যতা।

পাশের বেঞ্চে বসে থাকা মানুষদের দিকে তাকাল একবার। সবাই কারও না কারও সঙ্গে আছে। কেউ বাচ্চার হাত ধরে আছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ আইসক্রিম খাওয়াচ্ছে।
আর ও? শুধু একা।

একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পড়ে আছে এক কোটি টাকা। কাগজে সেটা বিশাল সম্পদ।
কিন্তু এই মুহূর্তে সিনথিয়ার কাছে ওটা যেন এক টুকরো কাগজ ছাড়া আর কিছু না।
টাকার ভেতরে কোনো স্পর্শ নেই, কোনো ডাক নেই, কোনো সম্পর্ক নেই। যে টাকার জন্য এতকিছু করল, সে টাকায় ও বিন্দুমাত্র আগ্রহ পাচ্ছে না।

হঠাৎ ওর মনে হলো, সব ঠিক করে ফেলবে।বাড়ি যাবে। পরিবারের পা ধরে ক্ষমা চাইবে।
যা ভেঙে গেছে, জোড়া লাগাবে। এই ভাবনাটা নিয়েই ও উঠে দাঁড়াল।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় মানুষের পরিকল্পনার চেয়েও নিষ্ঠুর হয়। বাড়ি পৌঁছে ও যখন দরজার সামনে দাঁড়াল, তখন ভেতর থেকে যে সত্য বের হয়ে এলো, তা ওর পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে দিল।

ওর বাবা গত হয়েছেন ছয়মাস আগে। ওর চিন্তায় চিন্তায় স্ট্রোক করে মারা গিয়েছেন নাকি। সিনথিয়ার মুখে কোনো শব্দ এল না।
শুধু ঠোঁট কাঁপল একবার। তারপর চারপাশ যেন আরও ধূসর হয়ে গেল। আরও একটি ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। ওর ভাই বদলি হয়ে গেছে।

তারা সবাই এখন দিনাজপুর থাকে। কোথায় থাকে তা প্রতিবেশীরা জানে না। কারও নাম্বারে কল করেও সিনথিয়া পায়নি। যেন সবাই ওর থেকে পালাতে চাইছে। ও যেন তাদের জীবনে নাই এমন ভেবে নিয়েছে। যেন অস্তিত্বহীন ও।

তাদের ফোন নম্বরগুলোও আর কাজ করে না। একটা নম্বরও না। যেন পৃথিবীর কোনো এক অদৃশ্য নিয়মে সবাই একসাথে তার অস্তিত্ব মুছে ফেলেছে। সিনথিয়া ধীরে ধীরে বসে পড়ল মেঝেতে। চোখের সামনে ভেসে উঠল শুধু একটা প্রশ্ন,
'আমি কি সত্যিই কারও ছিলাম? কিছুই ছিলাম না কারও জীবনে? এ জীবনে কী চেয়েছিলাম? আর জীবন আমায় কী দিলো?'

সিনথিয়া ভুলে গেছে কাউকে ঠকালে জীবন তাকেও চরম ভাবে ঠকায়। জীবনের হিসাবকে যত সহজ ভাবা হয় ততও সহজ নয়। জীবন কারও কাছে কিছু বাকি রাখে না। সমুদ্র যেমন নিজের কাছে কিছুই রাখে না। সব ফিরিয়ে দেয়। জীবনও তেমন নিজের কাছে কিছুই রাখে না। যা দিবে তাই ফিরিয়ে দিবে।

সিনথিয়া হাঁটতে লাগল উদ্দেশ্যহীনভাবে। যেন ওর কোনো গন্তব্য নেই। কেনো মানুষ নেই যার কাছে চাইবে একটু আশ্রয়। একটু দরদ, একটু মায়া।

—————

জবা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আজই জারাকে সত্যিটা জানাবে। আর অপেক্ষা নয়।
মিথ্যা আশায় একটা শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা নিষ্ঠুরতা। কিন্তু সত্যিটা কীভাবে বলবে? কীভাবে বোঝাবে এমন একটা সম্পর্কের ভাঙনের কথা, যার অর্থই জারা পুরোপুরি বোঝে না?

দূর থেকে তাকিয়ে দেখল, জারা তার নানির সঙ্গে বাগানের দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে। বিকেলের নরম আলোয় মেয়েটার হাসিমুখটা আরও উজ্জ্বল লাগছে। শিশুরা কত সহজে হাসতে পারে!

জবার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। এই হাসিটুকু মুছে গেলে? যদি মেয়েটা কষ্ট পায়?
জবা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বলল,
'মা, জারার সাথে আমার একাকি কিছু কথা আছে।'

জুঁই সুলতানা মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকালেন। মায়ের চোখ কখনও ভুল করে না।
তিনি বুঝলেন, কথাটা সহজ নয়। তবুও হাসিমুখে বললেন,
'আচ্ছা বল। আমি ততক্ষণে পনিরের একটা নতুন রেসিপি শিখেছি। সেটা আজ নাস্তায় ট্রাই করি।'

জবা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। জুঁই সুলতানা চলে যেতেই জবা দোলনায় বসে জারাকে নিজের কোলে টেনে নিল। কয়েক মুহূর্ত শুধু মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
তারপর বলল,
'মা, তুমি এখন অনেক বড়ো হয়েছো তাই না?'

জারা গর্বিত মুখে বলল,
'হ্যাঁ। কিছুদিন পরই তো আমি ক্লাস টু তে উঠব।'
'গুড। সো ইউ আর বিগ গার্ল নাউ।'
'ইয়েস।'
'এখন আমি কি তোমার সাথে আমার কিছু কথা শেয়ার করতে পারি?'
'অবশ্যই পারো।'

জবা গভীর শ্বাস নিল। কথাগুলো বুকের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধছে। তবু বলতেই হবে। বলল 
'তোমার বাবাকে তোমার কেমন লাগে?'

জারার চোখ সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠল। বলল,
'সে পৃথিবীর বেস্ট বাবা।'
জবার ঠোঁট কেঁপে উঠল। একসময় সেও ঠিক এই কথাটাই বিশ্বাস করত। খুব বিশ্বাস করত। আর এখন সেসব কেবলই দীর্ঘশ্বাস...! বলল,
'আচ্ছা তোমার বাবা যদি আমার সাথে কোনো অন্যায় করে তাহলে তাকে কি আমার ক্ষমা করা উচিত?'

জারা কপাল কুঁচকে ফেলল।
'কেমন অন্যায় মা?'

জবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা শিশুকে বিশ্বাসঘাতকতার ভাষা শেখানো যায় না। তাই সে শিশুর ভাষাতেই বলল,
'উমমম। ধরো একটা চকলেটের জন্য তোমার বাবা আমার সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট করল, অন্য একজনের সাথে বন্ধুত্ব করল। আমাকে অনেক কষ্ট দিল। চিট করল। আমাকে কাঁদালো অনেক। তাহলে কী আমার তাকে ক্ষমা করা উচিত?'

জারা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ছোট্ট গলায় বলল,
'বাবা তো তাহলে খুব অন্যায় করেছে।'

জবার গলা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো। চোখের ভেতর পানি জমতে শুরু করল।
'হ্যাঁ। খুব অন্যায় করেছে।'
একটু থেমে ফিসফিস করে বলল,
'আমাকে এক জীবনে না ভুলতে পারার কষ্ট দিয়েছে।'
জারা মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
'আমি কি বাবাকে বকে দিব?'

জবা হেসে ফেলল। একটা কষ্টমাখা হাসি। বলল,
'এ কষ্ট এমন কষ্ট যা বকলে কমবে না মা।'
'তাহলে...?'
'তুমি যখন আরও বড়ো হবে তখন তোমাকে সত্যিটা বলবো।'

জারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
'তাহলে এখন কী করবে তুমি?'
জবা অনুভব করল, সবচেয়ে কঠিন কথাটা এবার বলতে হবে। ও মেয়েটার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
'আমি আর তোমার বাবা এখন আলাদা আলাদা বাড়িতে থাকব। তুমি আমার সাথে থাকবে।'

মুহূর্তেই জারার মুখের হাসি মুছে গেল।চোখদুটো বড় হয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে নিষ্পাপ চোখদুটো ভরে উঠল জলে। জবার বুকটা যেন ছিঁড়ে যেতে লাগল। কিন্তু মেয়ের চোখ থেকে প্রথম অশ্রুবিন্দুটা পড়ার আগেই সে দ্রুত বলল,
'কিন্তু তুমি চাইলে যখন তখন তোমার বাবার সাথে কথা বলতে পারবে। দেখা করতে পারবে। চাইলে তার কাছে গিয়ে দু একদিন থাকতেও পারবে।'

জারা স্থির হয়ে শুনছে। জবা ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
'কারণ আমি তো জানি তুমি তোমার বাবাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো। তোমার বাবাও তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। সে কারণে তোমাকে আমি বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করব না। আমি তোমার বাবাকে শাস্তি দিতে পারি কিন্তু তোমাকে নয়।'

অবশেষে জারার চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। বলল,
'আমি বাবাকে বলবো চকলেটের জন্য যার সাথে সে বন্ধুত্ব করেছে সে চকলেট ফিরিয়ে দিতে। তাহলেই তো সব ঠিক হবে।'

শিশুরা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সমস্যারও সহজ সমাধান খুঁজে পায়। জবার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মেয়ের মাথায় মুখ লুকিয়ে বলল,
'মা খেয়ে ফেলা চকলেট তো ফেরত দেওয়া যায় না।'
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। বলল,
'মনে জমা কষ্টও কমে না। তুমি এখন বুঝবে না। যখন তোমার বোঝার বয়স হবে তখন আমি নিজে তোমাকে বুঝিয়ে বলবো। তখন তুমি বুঝবে তোমার বাবা আমাকে কি পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু মা এর মানে এই নয় তোমার বাবা তোমায় ভালোবাসে না। সে তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে।'

জারা কিছু বুঝল না। তবু অনুভব করল তার মা কাঁদছে। সে ধীরে ধীরে জবার বুকে মুখ গুঁজে দিল। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। জবা দ্রুত নিজের চোখের জল মুছে ফেলল। তারপর মেয়েকে আরও শক্ত করে বুকের মধ্যে আগলে নিল। মনে হলো, পৃথিবীর সব ভাঙন, সব বিশ্বাসঘাতকতা, সব কষ্টের মাঝেও এই ছোট্ট মানুষটাই তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।

—————

সকাল কখন পেরিয়ে দুপুরের দিকে গড়িয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই ইরফানের।
ফজরের নামাজ আদায় করে বিছানায় শুয়েছিল। তারপর গভীর, ক্লান্ত এক ঘুম তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। এখনও ঘুমিয়ে আছে। যেন ঘুম নয়, বাস্তবতা থেকে পালিয়ে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা।

জবা আর জারা চলে যাওয়ার পর থেকে তার জীবনের সমস্ত নিয়মকানুন এলোমেলো হয়ে গেছে।

যে মানুষটা একসময় সময় মেপে চলত, যার প্রতিটা দিনের আলাদা পরিকল্পনা থাকত, সে আজ উদ্দেশ্যহীন।

স্বপ্নের সেই বিশাল প্রজেক্ট; যার জন্য এত লড়াই, এত দৌড়ঝাঁপ, সেটাও এখন কর্মচারীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। যেন প্রজেক্ট নয়, নিজের স্বপ্নটাই ছেড়ে দিয়েছে।

আসলে স্বপ্নগুলো আর বেঁচে নেই। জবার সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার দিনই সেগুলোও মারা গেছে। এখন কাজ করে কী হবে?
কার জন্য করবে?

বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার তার চেয়ে কোটিগুণ বেশি আছে ওর। অথচ সুখের নামে কিছুই নেই ওর।

এখন ওর জীবনে বাকি আছে কেবল দুটি কাজ; এক- মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা।
দুই- জবা আর জারার অগোচরে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ইরফান ভালো করেই জানে, ওর জীবনে যত শত্রু তৈরি হয়েছে, তাদের অনেকেই সুযোগ পেলে জবা কিংবা জারাকে আঘাত করবে।তাই ও নীরবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে; জবা আর জারার দিকে বাড়ানো প্রতিটি বিষাক্ত হাত সে ভেঙে দেবে। যে কোনো মূল্যে।

'স্যার...! স্যার...!'
কাজের লোক সালেহার ডাকে ঘুম ভাঙল ইরফানের। ঘুম ঘুম বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলল,
'বলুন খালা?'
'স্যার নিচে একজন পুলিশ অফিসার আসছে।'

'পুলিশ' শব্দটা শুনেই বুকের ভেতর কোথাও যেন হালকা একটা ধাক্কা লাগল। আতঙ্কের জোয়ার বইল মনে। তবে মুখে তার কোনো ছাপ ফুটল না। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে হাই তুলল সে।
'তাকে বসতে বলো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।'

বাথরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াল ইরফান। কল খুলে মুখে ঠান্ডা পানি ছিটাল কয়েকবার। পানির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগল গাল বেয়ে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। গালে বেশ দাঁড়ি গজিয়েছে। জবা থাকলে এতক্ষণে বকাঝকা শুরু করে দিত।
'এভাবে জংলি মানুষের মতো দাঁড়ি রাখো কেন?'

তারপর নিজেই ট্রিমার এনে হাতে ধরিয়ে দিত। জবার পছন্দ ছিল হালকা ট্রিম করা দাঁড়ি। একেবারে ক্লিন শেভ পছন্দ করত না।
আর একটু বেশি বড় হলেও রাগ করত।
স্মৃতিটা মনে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। দ্রুত দাঁত ব্রাশ করে মুখে আবার পানি ছিটাল ইরফান।

আজকাল স্মৃতিগুলোও শত্রুর মতো।
যখন-তখন এসে আক্রমণ করে।

কালো শার্ট আর সাদা জিন্স পরে নিচে নামল ইরফান। দুঃখ মানুষকে ভেঙে দেয়। কিন্তু কখনও কখনও তাকে আরও রহস্যময়ও করে তোলে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
মুখে অবসাদের ছায়া। তবুও অদ্ভুতভাবে সুদর্শন লাগছে ইরফানকে।
একটু বেশিই সুদর্শন ও৷ এই অগোছালো ভাব, কষ্ট, মলিনতাও ওর সৌন্দর্য কমাতে পারেনি। 

ড্রইংরুমে বসে ছিলেন ইন্সপেক্টর সুবেদার আলী। ইরফান এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়াল।
'হ্যালো স্যার।'
'হ্যালো ইরফান সাহেব। হাউ আর ইউ।'
'আই অ্যাম গুড।'
'পায়ের ব্যথা কমেছে?'
'জি।'

সুবেদার আলী কয়েক মুহূর্ত ইরফানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন,
'আপনার স্ত্রী সন্তান কোথায়?'
'ওরা ওদের নানাবাড়িতে আছে।'
'বেড়াতে?'

ইরফান খানিক বিরক্ত বোধ করল। কপাল সামান্য কুঁচকে বলল,
'আপনি নিশ্চয়ই এসব জানতে এখানে আসেননি?'

অফিসার মৃদু হাসলেন।
'রাইট। পয়েন্টে আসি।'
তারপর কণ্ঠটা গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল,
কোয়েল কোথায়?'

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল।
কিন্তু ইরফানের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। বলল,
'আমার এক্স সেক্রেটারি কোয়েল?'
'জি।'
'সে কোথায় আছে, তা আমি কী করে জানব?'

সুবেদার আলী এবার সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বললেন,
'সে গত আঠারো দিন যাবত নিখোঁজ।'
'কেন?'
'সেটাই তো খুঁজছি আমরা। সেটা জানতেই আপনার কাছে আসা।'

ইরফান ভ্রু তুলল। বলল,
'ওহ। কিন্তু আমি কী হেল্প করতে পারি?'
'তার ফোনও বন্ধ। লোকেশনও ট্রাক করা যাচ্ছে না।'
'খারাপ খবর।'
'আপনার তার সাথে কবে কথা হয়েছে?'

ইরফান কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,
'দিন তারিখ তো ঠিক মনে নেই। তবে মে বি ১০ কি ১৫ দিন আগে এক রাতে কল করেছিল।'
'কেন?'
'চাকরি ফেরত চাইছিল।'
'তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল কেন?'
'আমার ওয়াইফ করেছিল। কারণ আমায় বলেনি। যেহেতু কোম্পানির মালিল সে, সেহেতু আমার কিছু বলার ছিল না।'

'আপনার ওয়াইফ আপনাকে কারণ বলেনি।'
'না।'
'কেন?'

ইরফান এবার ঠান্ডা চোখে তাকাল। বলল,
'কারণ আমরা এখন আর একসাথে নেই। আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন প্রাক্তনের কাছে কেউ নিশ্চয়ই নিজের কথা বলে না?'

ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
'ডিভোর্স?'
'জি।'
'কারণ?'
'এটা আমাদের পারসোনাল বিষয়। আলোচনা করতে আগ্রহী নই।'

সুবেদার আলী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ইরফানের মুখে। যেন কোনো ফাঁক খুঁজছেন। কোনো অসাবধানী প্রতিক্রিয়া। কোনো আতঙ্ক। কোনো মিথ্যার ছাপ। কিন্তু ইরফান আশ্চর্যরকম স্থির।

'আপনার সাথে তারপর কোয়েলের সাথে কোনো কথা হয়নি?'
'জি না।'
'অফিসার কোয়েলের কী হয়েছে বিস্তারিত বলবেন?'
'কদিন আগে তার মা থানায় এসে তার মিসিং ডায়রী করে। আমরা তার লাস্ট লোকেশন পাই লেবুখালি। তারপর তার ফোন বন্ধ। সেখানে খোঁজ করেও তার কোনো খোঁজ পাইনি।'
'ওহ।'
'আপনার টেনশন হচ্ছে?'
'এজ এ হিউম্যান একটু চিন্তা হচ্ছে। এছাড়া তার সাথে আমার এমন কোনো সম্পর্ক ছিল না যে অত্যাধিক টেনশন হবে। জাস্ট প্রোফেশনাল সম্পর্ক ছিল।'

অবশেষে অফিসার উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
'ঠিক আছে। আপাতত এটাই।'
'কোয়েলের কোনো খোঁজ পেলেন?'
'না।'
সামান্য দুঃখী মুখ করে ইরফান বলল,
'আশা করি মেয়েটা বেঁচে আছে।'
'আমরাও তাই আশা করছি।'
'ওকে আমি তবে আসছি। পরে কিছু লাগলে যোগাযোগ করব।'
'শিওর।'

দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের সাথে আটকে গেল। অদ্ভুত এক নীরবতা। একজন খুঁজছে সত্য। অন্যজন লুকিয়ে রাখছে সত্য। কে জিতবে, তা সময়ই বলে দেবে।

ইন্সপেক্টর চলে গেলেন। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো বাড়িজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
ইরফান স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে কালো মেঘ জমছে। আবার বৃষ্টি হবে হয়তো।

ওর ঠোঁটের কোণে একফোঁটা বিবর্ণ হাসি ফুটল। কিন্তু বুকের গভীরে অদৃশ্য এক ভয় নিঃশব্দে শেকড় গাড়া শুরু করেছে। কারণ ও জানে কিছু সত্য যত গভীরেই চাপা দেওয়া হোক, একদিন না একদিন মাটির ওপর ভেসে উঠবেই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp