তাদের গুমোট ফ্ল্যাটে সকাল সকাল নতুন সদস্য এসেছে। একটা বড়োসড়ো পার্সিয়ান বিড়াল। তার নাম রিকু। এটা একটা ছেলে বিড়াল। হালকা বাদামী রঙের মাঝে তার গায়ের পশম। ওর চেহারা খুব গম্ভীর। যেন সামনে কেউ আসলেই তাকে একদম ভষ্ম করে দিবে। কিন্তু স্বভাবে আবার চরম দুষ্টু, আহ্লাদী। ওকে প্রায়ই ভ্যাক্সিন দেওয়া লাগে। আজও দিয়ে এসেছে। যেহেতু মেইডের আজ কাজ পড়েছে এই বাড়িতে তাই বাধ্য হয়েই খাঁচায় বন্দী করে নিয়ে এসেছে। এখন আবার বাড়ি গিয়ে দিয়ে আসতে নিলে সময় ফুরিয়ে যাবে। সপ্তাহিক কাজ দুইদিন এসে করে দিয়ে যায়। আবার কখনো তিনদিন। আজ তো কিছুতেই মিস দেওয়া যেত না।
রিকু তখনো খাঁচায় বন্দী, মেইড গিয়েছে লন্ড্রির কাপড় দেখতে। ইসমাত ব্রেকফাস্ট করতে করতে কি যেন ভাবল, এরপর দ্রুত খাওয়া শেষ করে বিড়ালটাকে বড়ো খাচা থেকে খুলে নিজের কোলে নিল। ইসমাতকে পেয়ে রিকু খুব আহ্লাদী হলো। তার গায়ের সাথে যেন একদম মিশে যেতে চাইল৷ সাহিদদের বাড়িতে দুটো কুকুরও আছে। তবে এই বিড়ালটাই যেন তাদের বাড়ির প্রাণ। তার এটা ওটা নষ্ট করে বাড়ি মাথায় তোলাটাই যেন আনন্দের। তাকে খাঁচায় ঢোকানোও বেশ কষ্টসাধ্য। বাইরে গেলে তার মুড আরও বেশি খারাপ হয়ে যায়। ধুলোবালি সহ্য করতে পারে না সে। বিড়ালরা এমনিতেই পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করে, ইনি একটু বেশিই। ধুলোবালির জন্যেই কয়েকবার অসুস্থ হয়েছে সে। এজন্য এই ঢাকা শহরের রাস্তায় তাকে বের করাও কঠিন।
ইসমাতের কোলে রিকু যখন ঘুমাচ্ছিল তখন ইসমাত ফোন বের করে ছবি তুলল। রিকুর বেশ কিছু ছবি তার আগে থেকেই আছে। মাহফুজ সাহেব জানেন ইসমাত রিকুকে কতটা পছন্দ করেন। এজন্য তিনি প্রায়ই বলেন,
--"একটা কাজ করো না, রিকুকে নিয়ে একটা ফেসবুক পেজ খুলে ফেলো। সেখানে রিকুর ছবি আপলোড করবে, ক্যাপশন দিবে। অবসর সময়ে সেসব দেখতে ভালো লাগবে।"
ইসমাতের সেসব করার সাহস কিংবা সময় নেই। তবে তার ছবি তোলার হাত দারুণ। এক বছরে রিকুর বহু ছবি তার গ্যালারিতে জমেছে। এসব ভাবনার মাঝেই ইসমাতের অফিস থেকে কল এলো। ইসমাত রিকুকে রেখেই ব্যাগটা নিয়ে অফিসে ছুটল। তাড়াহুড়ায় তার খেয়ালই নেই এই মহাশয় একবার ছাড়া পেলে কিসব করে বেড়ায়।
ইসমাত যেতেই সে বোকার মতো এদিক সেদিক তাকাল। ইসমাতের গন্ধ শুকে রান্নাঘরে গেল, সেখানে নেই। বারান্দায় গেল, সেখানেও ইসমাত নেই। পুরো ঘর জুড়ে ইসমাতের ঘ্রাণ, সে কোন দিকে যাবে ভেবে পাচ্ছে না। রিকু ভাবনায় পড়ে বারান্দায় বসে রইলো। দুটো চড়ুই তার কাছাকাছি এসে খেলতে চাইল যেন। কিন্তু গম্ভীরমুখো রিকুর মুখটা দেখেই যেন পালাল। রিকু তার হাতদুটো উঠিয়ে গাছ ছোঁয়ার চেষ্টা করল। যার ফলস্বরূপ ঠাস করে পড়ে একটা টব ভেঙে ফেলল। মাটি ওড়ায় সে একটা হাঁচি দিয়ে আবারও ভেতরে চলে এলো, যেন কিছুই করেনি। বাথরুমটা বারান্দা থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় মেইড রিকুর কূকীর্তি শুনতে পায়নি।
রিকু এবার পা টিপে টিপে গেল সাহিদের ঘরের দিকে। সৌভাগ্য বলব নাকি দূর্ভাগ্য, সাহিদের রুমের দরজা খোলা ছিল। দিনেও রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, মিষ্টি এক ঘ্রাণ পুরো ঘরময়। ঘ্রাণটা রিকুর পছন্দ হলো। সে ভেতরে চুপিচুপি গেলেও পুরো ঘর তছনছ করল বড্ড খুশিমনে। সাহিদ তখনো বিছানায় ঘুমানো, আজ জিম বাদ দিয়ে সে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘরে কী হচ্ছে তার বিন্দুমাত্র শব্দও সে পায়নি।
রিকুর কি আর মালিকের এত শান্তি ভালো লাগে? সে এবার বিছানায় উঠে গেল, সাহিদের বুকের ওপর গিয়ে বসে রইলো। সাহিদের সাথে তার সম্পর্কটা অন্য রকম। ঘনিষ্ঠও বলা যায়। কালে-ভদ্রে সাহিদ তাকে আদর করে, কিন্তু বাকিটা সময় চেঁচামেচি করে। রিকু তার চেঁচামেচির কি বোঝে কে জানে? কিন্তু শাহেলা বলেন তার ছেলেকে জ্বালাতে নাকি রিকু বড্ড মজা পায়।
রিকু এবারও তাই করল। পশমে মোড়ানো গা-টা মুড়িয়ে দিল সাহিদের মুখের ওপর। কেমন ঘঁষে ঘঁষে দিচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে না পেরে সাহিদ আঁতকে উঠে ছুঁড়ে মারল রিকুকে অদূরে। রিকু ছিটকে গেলেও নিজেকে সামলে নিল, আবারও লেজ নাড়িয়ে তার হাঁচি দিতে থাকা মালিককে দেখতে লাগল। সাহিদের নাকে-মুখে পশম ঢুকেছে। সে পরপর কয়েকবার হাঁচি দিয়ে গরম চোখে তাকাল সাহিদের দিকে। রিকু তখন পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে সাহিদকে দেখছে। সাহিদ কিড়মিড় করতে গিয়ে আবার হাঁচি দিল। বহু কষ্টে বলল,
--"কোন জনমের রিভেঞ্জ নিচ্ছিস রিক? তোর গার্লফ্রেন্ডগুলাকে ছাটাই করেছি বলে? এটারে এই বাড়িতে আনছে কে? ইসমাত, ইসমাত!"
সাহিদের এবার তার অতি সাধের ঘরের দিকে চোখ পড়ল, পুরো ঘর এলোমেলো। মেজাজের যতটুকু নিয়ন্ত্রণ ছিল তাও হারিয়ে ফেলল মুহূর্তে। উদ্ভ্রান্তের মতো চেঁচাচ্ছে সাহিদ। মেইড ভড়কে গিয়ে দৌড়ে এলো। রিকুকে খাঁচার বাইরে এবং ঘরের এই হাল দেখে তার কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে।
সাহিদ মেইডকে ধমক দিতে গিয়ে আবারও হাঁচি দিল।
--"এটারে আমার ঘর থেকে বের করো আর নয়তো চব্বিশ তলার উপর থেকে এটাকে ফেলে দিব আমি!" বলেই আবারও হাঁচি দিল।
--"স্যার বিশ্বাস করুন, আমি ওকে খাঁচাতেই রেখে কাজ করছিলাম, জানি না কীভাবে.."
সাহিদ মেইডের কথা না শুনে কয়েক আঙুলে রিকুর ঘাড়ের কাছাকাছি তুলে নিয়ে গেল বাইরে। পারছে না আছাড় মা()রতে। রিকু ছোটাছুটি করার চেষ্টা করছে। সাহিদ তাকে জোর-জবরদস্তি করে খাঁচায় ঢুকিয়ে ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে রেখে এসে নিজের ঘরের বাথরুমে চলে গেল। যাওয়ার আগে মেইডকে হুমকি দিয়ে গেল,
--"খবরদার এই হতচ্ছাড়া, ইডিয়েটকে কোনো মেয়ে বিড়ালের কাছ ঘেঁষতে দিবে না। খাবার না দিলে তো আমার মা আরেকবার হার্ট এট্যাক করবে। এজন্য ওর আসল জায়গাতেই হাত দিছি। আই ওয়ার্ন ইউ মেইড! নো ফিমেইল ক্যাট! আমি যদি কোনো ভাবে খবর পাই, দ্যান ইউ'ল আউট।"
মেইড ভড়কে গেল। সাথে এই বাড়িতে আরও দুজন মেইড ডাকল। রিকু যা তোলপাড় করেছে। তা সব পরিষ্কার করতে হবে দুই ঘণ্টার মধ্যেই। নয়তো দেখা যাবে রিকুর সাথে সাথে মেইডকেও বস লাথ মারবে। কোন কুলক্ষণে যে এটাকে এই বাড়িতে এনেছিল। সে তো এখনো ভেবেই পাচ্ছে না রিকু খাঁচা খুলে বের হলোই বা কীভাবে?
যাকে নিয়ে এত ঝড়, তোলপাড়.. সে বাইরে দরজার কাছেই খাঁচার ভেতরে চুপটি করে ঘুমোচ্ছে। যেন যুদ্ধ জয় শেষে সে ভীষণ ক্লান্ত।
—————
অফিসে আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। মিটিং-এ ইসমাতও বসা। আজ এখানে প্রতি অফিস থেকেই উচ্চপদস্থ কর্মীরা এসেছে। মাহফুজ সাহেবের দেশে প্রায় চারটি অফিস। তার থেকে মূল হচ্ছে ঢাকাতেই। এছাড়া তাদের আউটলেট, শো-রুম বিস্তৃত, ছড়িয়ে ছিটিয়ে। দেশের বাইরেও তাদের বেশ কয়েকটা আউটলেট আছে। আজকের মিটিং অতি জরুরি। মাহফুজ সাহেব আজ ঘোষণা করলেন যে অস্ট্রেলিয়াতেও তারা আউটলেট খোলার বিশেষ সুযোগ পাচ্ছে। এ নিয়ে ওনার পরিকল্পনাও বেশ দীর্ঘ। এই পরিকল্পনার সূচনা করবেন সাহিদের জন্মদিনের ঝামেলার পর। এ নিয়ে কর্মীদের মতামত চাইলেন, শুনলেন তার কথা-বার্তা। কেউই এই সিদ্ধান্তে অমত করেনি, ইসমাতও নয়। তবে এই কাজ করতে বেশ রিস্ক আছে। দেশীয় নিজস্ব ব্র্যান্ড বিদেশের মাটিতে স্থাপন করা বেশ দুঃসাহসিক ব্যাপার। এই সাহস মাহফুজ সাহেব প্রতিবারই দেখিয়েছেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়। একজন কর্মচারী জিজ্ঞেস করলেন,
--"অন্যান্য দেশের মতো তো এবারও লোক পাঠাচ্ছেন বস। এবার কাকে পাঠাচ্ছেন? ভেবেছেন কিছু?"
সে বিষয়ে মাহফুজ সাহেব তেমন কিছু বললেন না। অন্যান্য প্রসঙ্গে সেই প্রশ্নও এড়িয়ে গেল। ইসমাত চোখের চশমাটা ঠিক করে আবারও ল্যাপটপে মনোযোগ দেয়। সে প্রতিবারের মতোই বেশ মনোযোগী। একবার কাজের মধ্যে ঢুকে গেলে মেয়েটা কেমন গম্ভীর হয়ে যায়, পুরো ফোকাস সেখানেই স্থির হয়ে যায়।
মিটিং-এর প্রায় শেষ পর্যায়ে গিয়ে মাহফুজ সাহেব এই প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন সাহিদের জন্মদিনের ব্যাপারে। জানালেন বড়োসড়ো পার্টি হবে। সেখানে সবার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এমন কি এই জন্মদিন নিয়ে ওনার কী পরিকল্পনা সেটাও ক্ষুদ্রভাবে বর্ণনা করলেন। উনি কর্মচারীদের সামনে বেশ গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকেন। ওনার ধারণা বসদের সবসময় ভ্রু কুঁচকে রাখাটা বাধ্যতামূলক। নয়তো কর্মীরা কাজে ধ্যান পাবে না। আহ্লাদ করলে কাজকে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়ার ততটা তারা দিবে না। একপ্রকার ভয়ই পায় ওনাকে অফিসের কর্মচারীরা, বেশ সমীহ করে চলে। আবার বোনাসের সময় বা কোনো প্রজেক্ট ভালো করলে রমজান সাহেবের মাধ্যমেই খবর পৌঁছানো হয়। তিনিই ম্যানেজারের মাধ্যমে সবাইকে সুসংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি সবার একাউন্টে টাকা ট্রান্সফারও করেন।
ইসমাতের এই অফিসের বস হিসেবে মাহফুজ সাহেবকে দেখলে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। সাহিদ যেন মাহফুজ সাহেবেরই রূপ পেয়েছে। মাহফুজ সাহেব যে ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষ, এমনও নয়। ওনারও রগে রগে রাগ আছে, শুধু তিনি কখনো প্রকাশ করেন না। এই বাপের বদমেজাজের স্বভাবটাই পেয়ে গেছে সাহিদ। শুধু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, ছেলেটা প্রকাশ করে শান্তি পায়। কিন্তু মাহফুজ সাহেব আবার গুটি চালেন একদম পাক্কা শিল্পপতির মতো করেই। মানুষের মুখে মুখে আছে, মাহফুজ সাহেবের চার চোখ। আগে-পিছে সবকিছুতেই উনি বেশ চালু।
রমজান সাহেব হচ্ছেন ওনার পি.এ, ডান হাতও বলা যায়। ব্যবসায়ের একদম শুরু থেকেই উনি মাহফুজ সাহেবের সাথে। ওনাদের দুজনের মধ্যে বন্ডিং এতটাই মজবুত যে এনারা চোখে-চোখেই অনেক ইশারা-ইঙ্গিতের কাজ করে থাকেন। রমজান সাহেব মধ্যবয়সী, মাহফুজ সাহেবের থেকে কয়েক বছরের ছোটো। ওনারও ব্যবসায়ের দিক থেকে নজর তীক্ষ্ণ, সাথে আনুগত্য তো রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। বিশ্বাস ভঙ্গ তো দূর, উনি যেন এখন শাহ পরিবারেরই একজন অংশ। উনি কর্মচারীদের খোঁজ-খবর রাখার পাশাপাশি ইসমাতের ওপরও তীক্ষ্ণ নজর রাখেন।
বসের আদেশ, ওনার পুত্রবধূর ওপর কেউ নজর উঠিয়ে তাকালেই গেট আউট! এই কাজ অবশ্য রমজান সাহেব বেশ আমেজেই করছেন। এজন্য কাউকে পেলেই খেদিয়ে দেন, যেমনটা সোহানের সাথে করেছেন। তিনি সবসময়ই বিশ্বাস করেন, "দুষ্টু গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো"। কেউ চাকরিচ্যুত হলে সে কৈফিয়ত চায়, কিন্তু রমজান সাহেব আবার লজিক দিতে বড্ড পাকা। একদম গাছ পাকা ঝুনা কাঁঠালের মতোই। তার লজিকের সাথে কেউই পেরে উঠে না, এরপর আর কি.. বুকে পাথর বসিয়ে কাজ ছাড়তে হয়। নয়তো যদি মামলা দিয়ে দেয়? বড়ো মানুষদের বিশ্বাস আছে।
সাহিদের জন্মদিনের পাশাপাশি এই হেড অফিসে আরেকটা পার্টির আয়োজন হচ্ছে এই মাসেই। মাহফুজ সাহেব সবাইকে জানিয়ে দিলেন যেন সবাই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে। খুব শীঘ্রই তারা এক এক বিদেশি ইনভেস্টরের সাথে কাজ করতে যাচ্ছেন, সেই উপলক্ষেই এই পার্টি। মাহফুজ সাহেব ওদের জানিয়ে রাখেন সময় মতো ইনভাইটেশন পেয়ে যাবে।
মিটিং শেষ হতেই ইসমাত বেরিয়ে দেখল সকলের মাঝে সাহিদের জন্মদিন নিয়ে দারুণ উৎকণ্ঠা। কিছুদিন পরের বিজনেস পার্টির থেকে বেশি উত্তেজিত সাহিদকে ঘিরেই। বসের ছেলের জন্মদিন, নিশ্চয়ই বেশ বড়োসড়ো আয়োজন। কিছু কিছু পুরুষরা তো ভেবে নিল নিজেদের সেভিংস দিয়ে ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাজার দামের স্যুট বানাবে। আপাতত তারা এর বেশি বাজেটে যাওয়ার সাহস করল না। কেউ কেউ তো আগেরটাই চালিয়ে দেওয়ার পায়তারা করল। আর মেয়েরাও ভেবে নিল দামী ড্রেস বা গাউন নিবে। যাকে নিয়ে এতসব পরিকল্পনা তার বউ-ই নিজ কেবিনে এসির নিচে বসা।
লিয়াকত এলো তখন চা নিয়ে। ইসমাত সেই গরম চায়েই চুমুক দিল। যাক, এবার শান্তি লাগছে। ইসমাত হাতঘড়িতে দেখল প্রায় বিকাল হয়ে এসেছে। লিয়াকত তখন হাতে ট্রে নিয়ে ম্যাডামকে উপর-নিচ দেখে বলল,
--"ম্যাডাম, রাগ না করলে একটা কথা কইতাম।"
--"বলো।"
--"আমি কিন্তু জানি আপনে আমাগো ছোডো সাবরে বিয়া করছেন। আমি রমজান সাব এর কথা একদিন হুইন্না লাইছিলাম।"
ইসমাত বিষম খেল। লিয়াকত দ্রুত করে পানি এগিয়ে দিল। জুবুথুবু মুখ করে বলল,
--"রাগ করলেন, ম্যাডাম?"
ইসমাত তাকাল লিয়াকতের দিকে। কাট কাট গলায় বলল,
--"আর কেউ জানে?"
--"লিয়াকতের পেডে বোম মারলেও কাউরে কইব না।"
ইসমাত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এবার লিয়াকত অবাক হলো,
--"আপনে সত্যি ছোডো সাবের বউ? তইলে আপনে এত খাডেন ক্যান? আয়েশ করবেন।"
ইসমাত সে কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বলল, "আরেক কাপ চা আনো।"
লিয়াকত বাধ্য ছেলের মতো চলে গেল চা আনতে। এবারের চা আরও ভালো করে বানাবে ভেবে নিল। অফিস জুড়ে তখনো সবাই সাহিদের জন্মদিনের আলাপে ব্যস্ত। লিয়াকত মিনমিন করে আওড়ায়,
--"যা জামাইর জন্মদিন তার হুঁশ নাই, পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই। তোমরা যদি জানতা তোমরা বাঘিনীর সামনে দিয়া চলন-ধরণ করতেছ।"
লিয়াকত এবার সেই সমালোচনার গ্রুপটার দিকে তাকাল। লিয়াকত কান খাড়া করে ওদের পাশ কেটে যেতে চাইল, কিন্তু লিয়াকতকে দেখতেই ওরা চুপ হয়ে গেল। লিয়াকত আশাহত হলো। বাকিরা ভালো করেই জানে এই লিয়াকতের সামনে কিছু বলা ঠিক না, এটায় তো আরেক চামচা। কাকে কি লাগিয়ে দিবে কে জানে? লিয়াকত মুখ ভার করেই চলে গেল চা করতে। আবারও বিড়বিড় করল,
--"তোমাগো সুবুদ্ধি দিতে মঞ্চায় যে ম্যাডামের নামে বদনাম কইরো না। হেয় আমাগো ছোডো সাবের বউ। বসে জানলে জিভ টাইন্না দিব। তহন মুখ দা আর কথা বাইর হইব না। কপাল চাপড়াইবেন জিভ হারাইয়া।"
লিয়াকত ছেলেটা অল্পবয়সী। সবে একুশ বছর বয়স। স্টাফ হিসেবে এখানে চার বছর যাবৎ কাজ করছে। তাকে নিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে বেশ সমালোচনা। কারণ সে বেশ ভালো মাইনে পায়। কর্মচারীরা ভেবে পায় না তারা এত পড়ালেখা করে চাকরি করছে প্রায় ৩০-৪০ হাজারের বেতনে। আর লিয়াকত সামান্য চা বিতরণ, এই সেই কাজ করেই নাকি পেয়ে যাচ্ছে সাতচল্লিশ হাজার টাকা। তাহলে তাদের এত পড়াশোনা করে চাকরি করে কি লাভ? লিয়াকতের মাঝেমধ্যে বলতে ইচ্ছা করে,
--"চা, কফি বানাইন্না আর বাকিসব কাম আমি পুরা অফিস জুইড়া করি, এক জায়গায় বইয়া করি না। কোনো কামই ছোডো না। তাও মাইনষের কত জ্বলন।"
—————
বিড়ালের পশমটা সাহিদের বেশ ক্ষতিই করেছে। যার কারণে তার জ্বর-সর্দি হয়েছে। এই মুহূর্তে সে বিশ্রাম করার বদলে বন্ধু সাব্বিরের ডাকে এসেছে যমুনা ফিউচার পার্কে। মুখে তার মাস্ক, একপাশে দাঁড়ানো। কিন্তু সাব্বিরের খবর নেই। কল দিলে জানতে পারে এই ছেলে বাড়ির মহিলাদের নিয়ে এসেছে শপিং করতে। আর মহিলা মানেই তো এক ঘণ্টার শপিং চার ঘণ্টা লাগিয়ে করবে। সাহিদ আপনমনে বেশ কয়েকবার বিশ্রী গা লি দিয়েছে সাব্বিরকে। ওর সাহস কত বড়ো তাকে এনে দাঁড় করায়!
সাহিদ বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে লিফটে উঠে গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে যায়। নিচে আসতেই কারো সাথে সে ধাক্কা খেল। পরিচিত গলায় সরি শুনতেই সাহিদ মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ইসমাত শুরুতে চিনতে না পারলেও মাস্ক পরিহিত সাহিদকে চিনতে বেশি সময় লাগেনি। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
--"মাস্ক পরেছ কেন?"
সাব্বির আর রিকুর রাগটা সাহিদ ইসমাতের ওপরই ঝেড়ে বলল,
--"আমি বেশি হ্যান্ডসাম তো! না জানি যদি কোনো মেয়ে এসে চুমু টুমু খেতে চায়? তাই মাস্ক!"
ইসমাত বিরক্ত হলো ছেলেটার ত্যাড়া জবাবে। সে এসেছিল তার কলিগ সারাহ'র সাথে। সারাহ গিয়েছে আড়ং-এ। তার লিভিংরুমের জন্য কিছু শো-পিজ কিনতে। ইসমাতেরও এসব কেনার শখ হয়, সংসার সাজানোর ইচ্ছে হয়.. কিন্তু সেই শখ তীব্র হওয়ার আগেই সে কেটে পড়েছিল। এখন মনে হচ্ছে আউটলেট থেকে বের হওয়াই তার দোষ হয়েছে। সারাহ তার পিছু পিছু এসে সাহিদ আর ইসমাতকে একসাথে দাঁড়ানো দেখে অবাকই হলো। ইসমাতের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
--"উনি কে?"
সাহিদ বুঝতে পারেনি সারাহ তাদেরই অফিসের কর্মচারী। সে ভেবেছে হয়তো ইসমাতের কোনো বান্ধবী, যারা একসাথে ঘুরতে এসেছে। সে দ্রুত মাস্ক খুলে ইসমাতকে শিক্ষা দিতেই বলল,
--"আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ। নাইস টু মিট ইউ। ইসমাত আপনাকে বিয়ের কথা জানায়নি রাইট? ওহ, সো স্যাড।"
সারাহ'র চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তার একটুও চিনতে ভুল হচ্ছে না। হ্যাঁ, এটাই তো বসের ছেলে। কিন্তু সে কী বলল? ইসমাত বিবাহিত? তাও এই ছেলের সাথে? অত্যন্ত বিস্ময়ে ওর হাত মুখের ওপর চলে আসল। এদিকে ইসমাত টগবগ করে ফুটছে। এই ছেলে এতটা বেয়াক্কেল, বেয়াদব! সে অবাক হচ্ছে এর কর্মকাণ্ডে। এখন সে সারাহ'র সাথে চোখে-চোখ মেলাবে কেমন করে? কি জবাব দিবে তাকে?
ইসমাতের এই মুখ দেখে সাহিদ বেশ পৈশাচিক আনন্দ পেল। সত্যি বলতে এই খবর ফাঁস হলে তার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু ইসমাতের জন্যে বিরাট সমস্যা। ইসমাত দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
--"সারাহ আমার কলিগ।"
এতেও বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা হলো না সাহিদের। আজ নয়তো কাল জানতই। সে জানিয়ে দিয়েছে নাহয়। উদাসীম গলায় বলল,
--"সো হোয়াট?"
তখনই কোত্থেকে সাব্বির এসে উচ্ছ্বাসের সাথে দাঁড়াল। ঠিক সাহিদের পাশেই। সে বেশ খুশি হয়েছে আবারও বন্ধুর বউয়ের সাক্ষাৎ পেয়ে। সাহিদের ফুরফুরে মেজাজ আবারও নষ্ট করতে হাজির এই ছেলেটা। এবার তারই রাগ বাড়ল। সাব্বির হাসিমুখে বলল,
--"হাই ভাবী, হোয়াটস আপ? আ'ম গ্লেড আপনার সাথে আবারো মিট হয়েছে। আমার মম এসেছে৷ সাহিদের বউকে দেখতে চেয়েছিল। আসেন মিট করিয়ে দেই?"
সাহিদ এবার সাব্বিরের মুখ চেপে ধরে বলল,
--"লেটস গো, সাব্বির। আই থিংক ইউ নিড সাম সুইটস!"
বলেই সাব্বিরকে মারতে মারতে সাহিদ ওদের দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেল। ইসমাত তখনো পারল না সারাহ'র নজর মেলাতে। এই পাকনা সাহিদটা না!
·
·
·
চলবে……………………………………………………