অন্তর্নিহিত কালকূট - পর্ব ১২৩ - অনিমা কোতয়াল - ধারাবাহিক গল্প

অন্তর্নিহিত কালকূট
          আধঘন্টা হল মিটিং রুমটাতে পিনপতন নীরবতা। সন্ধ্যা যত রাতের দিকে এগোচ্ছে, ততই শীতলতা বাড়ছে বাতাসে। স্তব্ধ হচ্ছে প্রকৃতি। মনের শিহরণ, উত্তেজনা, আশংকা, ক্রোধ, ভীতি সব অনুভূতি যেন আজ আবহাওয়াতেও মিলেমিশে গেছে। পাঁচ মিনিট আগেই রাণীর একটা মেসেজ এসে পৌঁছেছে শানের ফোনে। সে তার কথামতো নিজের পরিকল্পনা সাজিয়ে পাঠিয়েছে। সেই মেসেজটা পড়ার পরপরই ঘরের নীরবতা আরও বেশি ভারী হয়েছে। মেসেজটা ছিল এরকম-

"যেরকমটা আমি কলে বলেছি। দুটো টিম করে ফেলো। সফলভাবে মালগুলো রিসিভ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। কিন্তু তারচেয়েও বড় উদ্দেশ্য হবে রুদ্রকে গুলশান ফিরে যেতে বাধ্য করা। তবে, উনি গুলশান থাকা অবস্থায় কিছু করা যাবেনা। সেকেন্ডের মধ্যে প্লান বি রেডি করে ফেলবে সে। তাই ও চট্টগ্রাম পৌঁছনোর পরেই যা করার করতে হবে। ঠিক ডেলিভারির টাইমের আগ দিয়ে। যাতে কোন প্লান বি এর চিন্তা ছাড়াই ওনাকে গুলশান ফিরে যেতে হয়। আর ব্যপারটা সহজ হবেনা। এখানে অবশ্যই কড়া ব্যাকআপ রেখে যাবেন উনি। সেই ব্যাকআপ ব্রেক করতে না পারলে কিছুতেই কোন লাভ হবেনা। কাজেই, সেরকম প্রস্তুতি নিয়েই আসতে হবে তোমাদের। কী করবে সেটা ভাবো। আমিও ভাবছি। কিছু মাথায় এলেই ইনফর্ম করব। আর হ্যাঁ! জাকজমক করে বরযাত্রী আসার মতো গুলশান এসোনা। আমি যতটুকু রুদ্রকে চিনি, তোমাদের এক্টিভিটিসের ওপর উনি সর্বোচ্চ নজর রাখার চেষ্টা করবেন। আর উনি যদি কোনভাবে নিশ্চিত হয় যে তোমরা এদিকেও আসছো। তাহলে এখানকার ব্যাকআপ আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দেবেন। তখন সেটা ব্রেক করা নেক্সট টু ইম্পসিবল হয়ে যাবে।
তাই দলবেঁধে একজোট হয়ে আসতে যেওনা। যারাই আসবে এখানে। আড়ালে, ভাগে ভাগে, নিরিবিলি আসবে। যাতে সহজে কেউ টের না পায়। আর এখানে এসে কী করা যায়, সেটা নিয়ে ভালোভাবে ভাবো। তবে ভুল করেও আগেরবারের মতো এই বাড়ির কাউকে টার্গেট করার পরিকল্পনা করোনা। হিতে বিপরীত হবে। যা করার বাইর‍ে করো!"

থমথমে হয়ে আছে ওদের সবার মুখ। কী বলবে, কী করবে কিছু বুঝতে পারছেনা কেউ। যে যার মতো সিগারেট টানছে, মদ গিলছে। প্রথম কথাটা এবারও করিম তাজওয়ারই বলল, ' "হিতে বিপরীত হবে।" কথাটা কিন্তু রুদ্রের থেকে সাবধান করতে বলেনি আমাদের আপনার মেয়ে। বরং নিজের থেকে সাবধান করতে বলেছে। হুমকি দিচ্ছে, হুমকি!'

বিরক্তিতে 'চ্যাহ' শব্দ করল শান, ' এইরকম একটা মুমেন্টেও আপনার এইসব প্যানপ্যান করতে হবে? কালকের ভোরটা কতটা ক্রিটিকাল হতে চলেছে আইডিয়া নেই আপনার?'

' আইডিয়া আছে বলেই বলছি। ও আমাদের না করার কে, কী করব আর কী করবনা?'

' এই "ও" টা না থাকলে এখানে বসে বসে বুলি ঝাড়ার সুযোগ পেতেন না আপনি। হয় ইঁদুরের মতো গর্তে গিয়ে লুকোতে হতো, নয়তো কবরের তলে।'

' তোমার বোনের দয়ার এমনিতেও কবরেই যেতে হবে বলে মনে হচ্ছে।'

শান কিছু বলবে তার আগেই 'থামো!' ধমকে উঠল শওকত মির্জা। রাগে ফোঁসফোঁস করল করিম। এই দুই ভাইবোনকে মনে মনে খু*ন করে ফেলল একবার। হাঁটুর বয়সী দুজন কি-না সারাক্ষণ একে যাতা বলে বেড়ায়। শুধুমাত্র স্বার্থে কাজে লাগছে বলেই হাদার মতো চুপচাপ সহ্য করতে হচ্ছে এসব। নয়তো করিম তাজওয়ারের সঙ্গে এভাবে কথা বলে পাড় পাওয়া যায়না। কাঁদায় পড়া হাতি সে এখন।
এদেরই বা কী দোষ দেবে? তার নিজের ছেলেইতো দাম দেয়না তাকে। পারলে দুবেলা গালি ছোড়ে। ভাবতে ভাবতেই ছেলের দিকে তাকাল সে। অথচ সম্রাট এখনো একদম চুপ, স্থির। সমগ্র শরীর শক্ত করে বসে আছে। চোখজোড়া এখনো লালচে। যেন শরীরে ঢিল দিলেই অঙ্গার ছিটকে বের হবে। আজ, এ মুহূর্তে বড্ড ভয়ংকর লাগছে ওকে দেখতে।

পলাশ মির্জা বলল, ' তবে একটা কথা কিন্তু ঠিকই বলেছে রাণী। রুদ্র চট্টগ্রাম এসে পৌঁছনোর পরপরই ঐখানে কিছু করলে করতে হবে আমাদের। যাতে ও কোন প্লান বি ভাবার সময়টুকু না পায়। আর গুলশানে কিছু ঘটানোর আইডিয়াটা কিন্তু আমাদের কারো মাথায় আসেনি। ওটা কিন্তু ওরই কৃতিত্ত্ব।'

শওকত ধীরেসুস্থে হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে বলল, ' প্লানটা কেমন তারচেয়েও বড় কথা হলো এতে সবাই সম্মত কিনা। সবার সম্মতি ছাড়াতো কিছু এক্সেকিউট করা যাবেনা।'

গলা ঝাড়ল করিম। স্বীকার করতে কষ্ট হলেও বলল, 'পরিকল্পনাটা ভালো। যদি সেভাবে এক্সিকিউটও করা যায়। কক্সবাজারেরটায়তো আপনার একটা ভুলের কারণে প্লানটা সম্পূর্ণ ফুলফিল হতে হতে হলোনা। সেদিন রুদ্রর মৃ*ত্যুটা হলে আজ আর এসব নিয়ে মাথাই ঘামাতে হতোনা আমাদের।'

শান মুখ কুঁচকে বলল, ' আমরা চট্টগ্রামের ডেলিভারি নিয়ে কথা বলছি। কক্সবাজার থেকে বের হন আপনি।'

করিম লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ' প্লান ভালো। আছি আমরা।'

পলাশ একবার ঘরি দেখে বলল, ' সময়তো বেশি নেই তাহলে। আমাদের এখনই ঠিক করে ফেলা উচিত কে কোন দলে থাকবে। যা করার তাড়াতাড়িই করতে হবে।'

এবার সবার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সম্রাটের ওপর। যে এতক্ষণের আলোচনায় সম্পূর্ণ নীরব ছিল। এখনো নীরব। সকলের দৃষ্টি নিজের দিকে অনুভব করে ওর লাল হতে থাকা চোখজোড়া তুলে তাকাল সবার দিকে। শান্ত স্বরে বলল, ' আমি যাব গুলশান। অর্থাৎ ব্লাক হোল গুলশানে যাবে আর ডার্ক নাইট থাকবে চট্টগ্রাম বন্দরে।'

শান ভ্রুকুটি করে ফেলল, ' সেটা তোমরা ডিসাইড করবে?'

সম্রাট একই স্বরে বলল, ' তুমি যেতে চাও?'

খানিকটা থমকাল শান। বুঝল, ভুল হয়েছে। এখন কথা ধরে ধরে ঝামেলা করাটা মুর্খতা। যেটা সম্রাটের মতো রগচটা মানুষও করছেনা। সেখানে ও কেন করবে? তাই চুপ হয়ে গেল ও। এবার কথা বলল শওকত, 'মিউচুয়ালি ডিসিশনে আসতে হবে আমাদের। ওয়েস্ট করার মতো সময় নেই।'

শান বলল, ' শুধুই ব্লাকহোলকে ওখানে পাঠানোর ব্যপারে আমি সম্মত নই। আমি ওদের পুরোপুরি বিশ্বাস করিনা।'

করিমও বলল, ' আমরাও যে তোমাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করি সেকথা কে বলল? শুধু তোমাদেরও চট্টগ্রাম বন্দরে রেখে যেতে আমরা ভরসা করতে পারছিনা।'

পরিস্থিতি আবার গরম হয়ে উঠতেই নিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই শওকত মির্জা বলে উঠল, 'বেশ! যেহেতু কেউ কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিনা, সেহেতু দু দলের লোকজনই দু জায়গায় থাকবে। এমনভাবে আমরা টিম রেডি করি যাতে দু দলের লোকই দু জায়গায় উপস্থিত থাকে। তাহলে ঠিক আছে?'

শওকতের প্রস্তাবে সকলেই আবার তাকাল একে অপরের দিকে। কয়েক সেকেন্ডের নীরব বিবেচনা পর সকলেই সম্মত হল। সম্রাট আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে গুলশান সে যাচ্ছে। সম্রাটের যাওয়ার কথা শুনে করিম তাজওয়ারও গুলশান যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলেন। যদিও ফিল্ডে সে পুরোপুরি থাকবেনা। কিন্তু দলনেতা হিসেবে কাছে থেকে নির্দেশনা দেওয়া এবং নজরদারি সে-ই করবে। কিন্তু আসল ব্যপার হল নিজের সন্তানকে সে একবিন্দু বিশ্বাস করেনা। রেগে গেলে যেকোন ব্লান্ডার ঘটিয়ে ফেলতে পারে এই ছেলে। সেসব সামলানোর জন্যে হলেও তার সেখানে থাকা দরকার। 

সুতরাং মিনিট খানেকের ডিসকাশনের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, ব্লাক হোল থেকে গুলশান যাচ্ছে সম্রাট তাজওয়ার, করিম তাজওয়ার, আর সজল; যার গুলশানেই ঘাটি আছে, সঙ্গে দলের কিছু আর্মড ম্যান। অপরদিকে ডার্ক নাইট থেকে যাবে পলাশ মির্জা, সুজন (লক্ষ্মীবাজারে মূল ঘাটি) এবং আর কিছু আর্মড ম্যান। এই সিদ্ধান্তে সকলেই সম্মত হল। এবং একধাপ ঝামেলা নামল ওদের ঘাড় থেকে।

কিন্তু করিম প্রশ্ন ছুড়লো, 'ওখানে যাব ঠিক আছে। কিন্তু গিয়ে করবটা কী? একটা প্রপার প্লান না থাকলে কাজ কীভাবে করব?'

এ প্রশ্নে খানিকক্ষণ চুপ থাকল সবাই। প্রশ্নটা যৌক্তিক। কারণ ঘটনা সত্য। সত্যিই কোন প্রপার প্লান নেই ওদের কাছে। শওকত মির্জা বলল, 'প্লানের আশায় এখানে বসে বসে সময় নষ্ট করা যাবেনা। রাত বাড়ছে। এখান থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে পৌঁছতে যথেষ্ট সময় লাগবে। এসব চিন্তা যেতে যেতেও করা যাবে। আমরা দু-দলই কন্টাক্টে থাকব।'

করিম খুশি হলোনা এ সিদ্ধান্তে। অসন্তোষ প্রকাশ করে বলল, 'তারওপর ঐ বাড়ির কাউকে কিছু করাও যাবেনা। তাহলে করবটা কী?'

পলাশ দ্বিমত করল, ' আরেহ! এমনতো নয় প্লান করলেই আমরা ওর বাড়ির কাউকে টার্গেট করতে পারব। আগেরবার ওদের মেয়েকে তুলে নিতে পেরেছিলাম কারণ সে বাড়ির বাইরে গিয়েছিল। কখন কীভাবে যাচ্ছে সে ইনফরমেশন আমাদের কাছে ছিল। প্রফেসরকে হাত করেছি। এরপর আরও বাকিসব ম্যানেজ করতে অনেক ঝামেলা গেছে। এবার এইটুকু সময়ের মধ্যে এতোকিছু করা ভুলেও সম্ভব না। তাছাড়াও রাণীকে এখন ক্ষেপালে হিতে বিপরীত হবে। আগেরবারের কথা ভুলে যেওনা কিন্তু। অনেক কষ্টে ব্যপারটা সামাল দিতে হয়েছে সেবার।'

শওকত গম্ভীর হলেন। কথাটা ঠিকই! তার মেয়েই তার পথের সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মুহূর্তে। তারওপর এটাও সত্যি, রাণীর কাছে সে এমন এক ওয়াদা করেছে যা সে কোনদিন রাখবেনা। আর তা না রাখলে এই মেয়ে কোন ভয়ংকর কান্ড ঘটাবে তা কল্পনারও অতীত। তাই সে তার সিদ্ধান্তে অটল। যে দড়ির সাহায্যে ওপরে উঠেছে, তা যদি শেষমেশ গলার ফাঁসই হয়ে যায়। তবে সেই দড়িকেই কেটে ফেলবে সে। অন্যকোন উপায় নেই। শান তার ভয়ংকর দুর্বলতা সেকথা সত্যি। কিন্তু পৃথিবীতে সে নিঃস্বার্থভাবে কাউকে ভালোবাসেনা, কাউকেই না। বেসেছিলতো একবার। নিজের ঘর-পরিবার সবকিছু ছেড়ে, সব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নিঃস্বার্থভাবেই ভালোবেসেছিল একজনকে। তার পরিণতিও দেখে নিয়েছে। আর না।
কিন্তু সম্রাটের উপস্থিতি মাথায় রেখে সে কথা মুখে বলল না শওকত। কেবল বলল, 'শুধুমাত্র একজনের কথাতেই দলের সিদ্ধান্তের নেওয়া হবেনা। ও ওর মতামত জানিয়েছে, আমরা শুনেছি। এখন প্রয়োজন অনুযায়ী প্লানে চেঞ্জেস্ আমরা আনতেই পারি। সব কিছুতো ওর অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকলেতো চলবেনা।'

শান খানিক চিন্তা করে বলল, ' সে না হয় না শুনলে। কিন্তু ও নিজেও কিন্তু এখন গুলশান আছে। জানতে পারলে বসে থাকবে মনে করো? ঐ বাড়ির মেয়ের হলুদের রাতে কী হল মনে নেই?'

আরও একবার থমথমে নীরবতা। শানের কথাটাও যুক্তিসঙ্গত। এ বিষয়ে ঐ মেয়ের ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা করা যায়না। যেকোন সময় যা কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে ও। ওর জন্যে অসম্ভব কিছুই না। 
হঠাৎ সম্রাট বলে উঠল, 'আর যদি ও গুলশানই না থাকে তবে?'

সম্রাটের প্রশ্নটা যেন বজ্রপাতের মতো থমকে দিল সবাইকে। সকলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ওর দিকে। চেহারায় পরিবর্তন এসেছে সম্রাটের। শরীর শিথীল করেছে কিছুটা।
শান বলল, ' ও অলরেডি গুলশানই আছে, ইফ ইউ রিমেম্বার।'

অদ্ভুত এক হাসি ফুঁটে উঠল সম্রাটের ঠোঁটে, ' রাতের মধ্যে যদি আমরা চট্টগ্রাম থেকে গুলশান যেতে পারি। ওও গুলশান থেকে চট্টগ্রাম আসতে পারবে।'

পলাশ বলল, ' আর ও সেটা কেন আসবে? আমাদের কথায় নাকি তোমার কথায়। ঝট করে ধরে ফেলবে কিছু উল্টোপাল্টা হতে যাচ্ছে।'

' আর যদি আমরা নিজেরা না বলি আসতে?'

এবার খানিকটা কৌতূহল নিয়ে তাকাল শওকত মির্জা। হাত থেকে গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, 'মানে?'

সোজা হয়ে বসল সম্রাট। সকলের সঙ্গে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে বলল, ' আমরা বলা ছাড়াও, হঠাৎ এমন কিছুতো ঘটতেই পারে যাতে করে ও এখানে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। ঠিক যেমন রুদ্র বাধ্য হবে গুলশান ফিরে যেতে। ওকেওতো বাধ্য করাই যায় চট্টগ্রাম ফিরে আসতে। এবার মাছের তেলেই একটু মাছ ভাজা হোক?'

' আর অমন এখানে কী ঘটবে?' শওকতের কন্ঠে কৌতুহল বাড়ছে।

আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠল সম্রাটের হাসি। হালকা করে নিজের গাল চুলকে বলল, ' এখানে ও কাকে যেন রেখেছে? জেল থেকে বের করে? কোন এক কাকা হয় ওর। লোকটার বেশ কেয়ার করে বলেই জানি। সেখানে_'

সঙ্গেসঙ্গে মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেল শানের। সশব্দে টেবিল চাপড়ে বলল, ' ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু গো দেয়ার। ওনার কোন ক্ষতি করার চিন্তা করলে রাণীর আগে আমার মুখোমুখি হতে হবে তোমাকে।'

সম্রাট হেসে ফেলল। মাথা নাড়িয়ে বলল, ' তোমারও কাছের কেউ নাকি?'

' দ্যাটস্ নান অফ ইওর বিজনেস।' দাঁতে দাঁত পিষল শান।

' আচ্ছা রিল্যাক্স!' দু হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভান করল সম্রাট। 'তার ক্ষতি করে আমারও কোন লাভ নেই। তবে তাকে ব্যবহার করেতো রাণীকে এখানে আনাই যায়। কারণ এ মুহূর্তে এখানে সেই রাণীর একমাত্র দুর্বলতা।'

কারো মুখে সঙ্গেসঙ্গে কোন কথা সরল না। শানও স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। সবাইকে এমন স্তব্ধ দেখে সম্রাট বলল, ' কম অন! কালকের ভোরটা আমাদের জন্যে কী তা তোমরা সবাই জানো। জীবন মরণের প্রশ্ন। আর এনিহাউ আমাদের সাকসেসফুল হতেই হবে। তারজন্যে যদি এমন কিছু স্টেপ নিতে হয় তাহলে নিতে হবে। এখানে এতো চিন্তাভাবনা করার বা ইমোশনাল হওয়ার কিছু নেই।'

শান দ্বিমত করে কিছু বলতেই নিচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই শওকত তার চিরপরিচিত গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল, 'তনুজার ফ্লাটটা কোথায়, শান?'

শান চমকে তাকাল শওকতের দিকে। কিন্তু শওকতের চোখে স্পষ্ট দৃঢ়তা আর অনড় ভাব দেখে দমে গেল ও। কারণ এরপর ও যাই বলুক তাকে কোন লাভ হবেনা। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ওর বাবা।

সম্রাট বেশ আয়েশ করে চেয়ারে হেলান দিল। বাঁকা হেসে চুমুক দিল হুইস্কির গ্লাসে। সকলেই স্তম্ভিত হয়ে বসে আছে। গা শিরশির করছে তাদের। পেটের মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে আগামী কয়েকঘন্টার কথা চিন্তা করে।

—————

১০ জানুয়ারি, ২০২১। রাত ঠিক সাড়ে বারোটা বাজে। রুদ্রর কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়তা। একা। খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকার পরেও গায়ে কোন গরম কাপড় নেই। যেন হাড়হীম করে দেওয়া এই ঠান্ডাকে বেশ উপভোগ করছে ও। কিংবা এ এক নেশা। নিজের শরীর ওপর টর্চার করার করার নেশা। যা সুযোগ পেলেই করে মেয়েটা। বর্তমানে ওর মাথায় কেবল একটা বিষয়ই ঘুরপাক খাচ্ছে। রুদ্র, রুদ্র আমের!

—————

ঘন্টাখানেক আগেই আমের ভিলা থেকে বেরিয়ে গেছে রুদ্র। রুদ্র যখন বের হবে, তখন ওরা সবাই একসঙ্গেই বসেছিল নিচে বসার ঘরে। অনেকদিন পর একসঙ্গে হওয়ায় টুকটাক কথা বলছিল সবাই মিলে। প্রিয়তাকে এতদিন পর পেয়ে খুশি ছিল সবাই। রুদ্র আর নাজিফা বাদে সবাই উপস্থিত ছিল সেখানে। নাজিফা তখন ভেতরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। এরমধ্যেই সম্পূর্ণ তৈরী হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে রুদ্র আমের। সকলের দিকে একপলক তাকিয়ে কিছু না বলেই যাচ্ছিল ও। সঙ্গেসঙ্গে উঠে দাঁড়াল জ্যোতি আর কুহু। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল প্রিয়তাও।

জ্যোতি এগিয়ে গিয়ে বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, ' তুমি এতো রাতে কোথায় বের হচ্ছো?'

' কাজ আছে। ফিরব না রাতে আর।' থেমে গিয়ে দুই বাক্যে উত্তর দিল রুদ্র।

আর কেউ কিছু বলার সুযোগটাও পেলোনা। তার আগেই রুদ্র বেরিয়ে গেল সদর দরজা দিয়ে। জ্যোতি দু'পা এগিয়েও থেমে গেল। চেহারায় ছড়িয়ে পড়ল এক চেনা আতঙ্ক। উচ্ছ্বাস ঝট করে উঠে দাঁড়াল। সকলকে চোখের ইশারায় একবার 
আশ্বস্ত করে দৌড় দিল রুদ্রর পেছন পেছন। 
আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সকলের মধ্যেই। মাসতিনেক আগে, এমনি রিস্কি একটা সময়ে রুদ্র কক্সবাজার থেকে কী বিভৎস অবস্থায় ফিরেছিল তা স্পষ্ট মনে আছে ওদের সকলের। আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভেসে ওঠে সেসব ভয়ানক দৃশ্য। সেই আতঙ্ক, সেই যন্ত্রণা, বিষাদের মধ্যে দিয়ে অর যেতে চায়না ওরা কেউ।

প্রিয়তা কিছু বলল না। দুশ্চিন্তায় ভ্রুজোড়া কুঁচকে রেখে বসে পড়ল নিজ স্থানে। কুহু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে একহাতে আগলে ধরল। বেচারী ভাবল মেয়েটা বোধহয় ওর ভাইয়ের জন্যে দুশ্চিন্তা করছে। অথচ ওরা জানেনা, প্রিয়তার দুশ্চিন্তার কারণ ভিন্ন। জাফর নিজের চশমা খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকল সে। জ্যোতি ভীষণ হতাশ অবস্থায় এসে বসল নিজের জায়গায়। প্রচন্ড আফসোস নিয়ে বলল, ' এ বাড়িতে কী একটা রাতও কোন দুশ্চিন্তা ছাড়া ঘুমোতে পারব না আমরা? আমি আর পারছিনা বিশ্বাস করো। আর ধৈর্য্য ধরতে পারছিনা। এভাবে মানুষ বাঁচতে পারে? একটা পরিবার চলতে পারে? আল্লাহ এবার অন্তত এসব থেকে মুক্তি দিক।'

কেউ কিছু বলতে পারল না আর। বলার মতো অবশিষ্ট নেইও কিছু। সত্যিই ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙ্গে আসছে প্রত্যেকটা মানুষের। কত সহ্য করা যায়? 

—————

রুদ্র গ্যারেজে ঢুকে নিজের জিপে উঠতেই নিচ্ছিল, তখনই পেছন থেকে ডেকে উঠল উচ্ছ্বাস। রুদ্র থামল। জিপের দরজা বন্ধ করে ফিরে তাকাতে তাকাতে উচ্ছ্বাস এসে দাঁড়াল ওর সামনে। কপালে ভাজ ফেলে বলল, ' কী ব্যপার? এই সময়! ইমার্জেন্সি কিছু?'

' কিছুটা।'

' একা যাবি?'

' রঞ্জু থাকবে। সঙ্গে আরও কিছু লোক।'

উচ্ছ্বাসকে চমকাতে দেখা গেল। অবাক হয়ে বলল, 'রঞ্জু! কিন্তু_কিন্তু ওতো এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। ওকে নিয়ে_'

রুদ্র উচ্ছ্বাসের কথা শেষ হওয়ার আগেই শেষ বলল, ' ওকে দিয়ে কোন ফিল্ডওয়ার্ক করানো হবেনা। ডোন্ট ওয়ারি।'

' কতজন আছিস মোট?'

' হবে কিছু। ডাজেক্ট মেটার।'

রুদ্র বলতে চাইছেনা বুঝে আর বেশি ঘাটালোনা উচ্ছ্বাস। সামান্য মাথা নেড়ে বলল, 'আচ্ছা। সকালের মধ্যে ফিরে আসবিতো?'

ঠোঁট বাকিয়ে হাসল রুদ্র। কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, ' আসব, যদি বেঁচে থাকি।'

বলে ঘুরে চলে যাচ্ছিল রুদ্র। কিন্তু খপ করে হাতটা ধরে ফেলল উচ্ছ্বাস। রুদ্র সপ্রশ্ন চোখে পেছন ঘুরে তাকাতেই উচ্ছ্বাস জড়িয়ে ধরল রুদ্রকে। রুদ্র সেকেন্ডের জন্যে থমকাল। এরমধ্যে উচ্ছ্বাস চোখ বুঝে শক্ত করল হাতের বন্ধন। যেন নিজের সঙ্গে আকড়ে রেখে দিতে চাইছে রুদ্রকে। রুদ্র সিদ্ধান্ত নিল আগের সববারের মতো এবারেও ও পাল্টা ধরবেনা ওকে। কিন্তু দু সেকেন্ড যেতেই কী হল জানেনা। ওর হাত আপনাআপনি চলে গেল উচ্ছ্বাসের চওড়া পিঠে। চোখজোড়াও বুজে এলো আপনাআপনি। এমনটা এর আগে কোনদিন হয়নি। রুদ্রর মনে হল, ও সেই দশ বছরের রোদে পোড়া, সরল মুখের ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরেছে নিজের সঙ্গে। এমন এক লতা যা কোন অজানা স্থান থেকে ছুটে এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। চারপাশটা কেমন অদ্ভুত নিঃশব্দ হয়ে উঠল। 
বেশ কিছু সময় পর চোখ খুলল উচ্ছ্বাস। আলতো করে রুদ্র পিঠে চাপড় দিয়ে বলল, 'সাবধানে থাকিস।'

রুদ্রও চোখ খুলল। মৃদু আওয়াজে বলল, ' ইউ টু। ন'টার দিকেই মালভর্তি হয়েছে গোডাউনটা। একটা বা*স্টা*র্ড অলরেডি পাঠিয়েছিল বিকেলে। সেদিকে একটু খেয়াল রাখিস। দ্যাটস্ ইম্পর্টেন্ট। ওখানে কিছু হলে সোলার সিস্টেমের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। এমুহূর্তে সে ক্ষতি এফর্ড করতে পারবনা আমি। এদিকে কোন ঝামেলা দেখা দিলে জয় আছে, দলের বাকি মেম্বারস্ আছে। ওদের সঙ্গে কনটাক্ট করবি।'

উচ্ছ্বাস মাথা নাড়ল। ওরা সরে দাঁড়াল একে অপরকে ছেড়ে। রুদ্র আর দেরী না করে ঘুরে উঠে গেল জিপে। গাড়ি স্টার্ট করে শেষবারের মতো একবার তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস চোখে হাসল। এরপর আর কোন কথা হলোনা দুজনের মধ্যে। জীপ বের করে চলে গেল রুদ্র। উচ্ছ্বাস দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই। আমের ভিলার গেট পেরিয়ে জিপটা চোখের আড়াল হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। কেন? জানেনা ও।

—————

রুদ্র কোথায় গেছে তা আর কেউ স্পষ্টভাবে না জানলেও প্রিয়তা খুব ভালোকরেই জানে। এবার লোকেশন চেঞ্জ করার কোন পরিকল্পনা ও করেনি। কারণ ও জানে, রুদ্র কোন না কোনভাবে সেই লোকেশন জেনে ফেলবেই। কিন্তু আজ রুদ্রকে আটকাতেই হবে। যেকোন মূল্যে। নয়তো ওর এই ব্যর্থ জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থেকে যাবে। তা ও হতে দিতে পারবেনা। এতোকিছু ঘটিয়ে ফেলার পরতো একদমই না। তার জন্যে যা-ই করতে হোক, করবে।
অন্যদিকে ওরা আদোও কিছু ভাবতে পেরেছে কি-না সে নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা ওর এখন। আর যদি ভেবেও ফেলে তা কতটা কাজ করবে, আদোও রুদ্র ফিরে আসবে কি-না, যদি ফিরে না আসে ওদিকে ওরা কীকরে সামলাবে সব। এতোসব চিন্তায় মাথা রীতিমতো ফেটে যাচ্ছে ওর। কড়া করে এককাপ ব্লাক কফি খেতে হবে ওর এখন। এই তীব্র মাথা যন্ত্রণা নিয়েই সারারাত জেগে থাকতে হবে আজ। এছাড়া আর উপায় নেই।

প্রিয়তা কফি বানানোর উদ্দেশ্যে নিচে এসে দেখল বসার ঘরের সোফায় বসে আছে উচ্ছ্বাস। ল্যাপটপে কাজ করছে কিছু নিয়ে। বসার ঘরটা খানিক অন্ধকার। করিডরগুলো জ্বলতে থাকা লাইটগুলো থেকে সামান্য আলো আসছে এই যা। খানিকক্ষণ চেয়ে রইল প্রিয়তা। উচ্ছ্বাস সত্যিটা জেনে যাওয়ার পর কেমন এক ইতস্ততা তৈরী হয়েছে দুজনের মধ্যে। অদ্ভুত এক সংকোচ, মানসিক দূরত্ব। সেকারণে কিছু না বলেই কিচেনে চলে যাচ্ছিল ও। কিন্তু এরমধ্যেই উচ্ছ্বাস ডেকে উঠল, 'ঘুমাওনি বউমণি?'

প্রিয়তা থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল উচ্ছ্বাসের চোখ ল্যাপটপেই। ও বলল, ' মাথা ধরেছিল। তাই একটু কফি করতে এসেছিলাম।'

' আমার জন্যে এককাপ করবে? অনেকদিন হল তোমার হাতের কফি খাইনা।'

প্রিয়তা চমকাল কথাটা শুনে। পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস তখনও ল্যাপটপে ব্যস্ত। আবছা আলো-অন্ধকারে ল্যাপটপের নীলচে আলো এসে পড়ছে ওর মুখে। প্রিয়তা বেশ খানিকক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়েই তাকিয়ে রইল উচ্ছ্বাসের দিকে। আর কিচেনের দিকে গেলোনা। ধীরপায়ে হেঁটে এসে বসল উচ্ছ্বাসের পাশে। তা টের পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল উচ্ছ্বাস। মৃদু হেসে বলল, 'কী হল, খাওয়াবেনা?'

উত্তরে প্রিয়তা আলতো হাসলো, ' ভয় করবেনা আমার বানানো কফি খেতে? যদি বি*ষ খাইয়ে দেই?'

মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল উচ্ছ্বাসের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ' একটা সত্যি কথা বলব বউমণি?'

' বলো?' 

' তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। হ্যাঁ, এখানো। তোমার আসল পরিচয়, উদ্দেশ্য যাই হোক। তাতে এই সত্যিটা কোনভাবেই বদলাবেনা যে, তুমি আমার বউমণি। যাকে আমি মায়ের মতো শ্রদ্ধা করেছি, ছোট বোনের মতো স্নেহ করেছি, বন্ধুর মতো আপন ভেবেছি। এটা সত্যি যে, রাশেদ বাবা আর পুচকুর জন্যে আমি তোমাকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না। কিন্তু এটাও সত্যি, তোমার প্রতি আমার মনে থাকা স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আমি কোনভাবেই কমাতে পারবোনা। আর নাতো তোমার চোখে দেখা আমার প্রতি স্নেহ আর ভালোবাসাকে আমি মিথ্যা বা ছলনা ভাবতে পারব। হবে না আমার দ্বারা। আমার মন বলে সেদিন তুমি আমায় গু*লি করতে না। পারতেই না। তাই, তুমি আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারো, তা আমি কোনদিন বিশ্বাস করবোনা। মরে গিয়েও না।'

শেষ দিকে কন্ঠস্বর কেমন ভেঙে আসছিলো উচ্ছ্বাসের। ওর বলা এই কয়েকটা বাক্যে তীব্রভাবে কেঁপে উঠল প্রিয়তার বুক। কেউ যেন শক্ত করে চিপে ধরল ওর কলিজাটা। ও শক্ত এক ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে ফেলল উচ্ছ্বাসের থেকে। হাত মুঠো করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল নিজেকে। কিন্তু কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে চোখ খিচে হঠাৎ বলে উঠল, ' আমি মারিনি। তোমাদের, তোমাদের পুচকুকে, আমার্ আমার বাচ্চাকে আমি মারিনি। ও আমার সন্তান ছিল, আমার। তিনমাস ওকে নিজের গর্ভে, নিজের ভেতরে একটু একটু করে বড় করেছি আমি। ও চলে যাওয়ায় যদি সবচেয়ে বেশি কারো কলিজা পুড়ে থাকে সেটা আমার পুড়েছে। তাই_'

হঠাৎ যেন প্রিয়তার খেয়াল হল ও কী বলছে। থেমে দিয়ে ঝট করে চোখ খুলল ও। ওপরে তাকিয়ে নিজের চোখের জল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল। 
উচ্ছ্বাস স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল প্রিয়তার দিকে। কিছুক্ষণ কোন কথা সরল না ওর মুখে। আচমকা যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অনূভুতি হল ওর। স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, 'আমি জানতাম! আমি জানতাম আর্ আর যাই হোক তুমি_'

' ছাড়ো এসব।' প্রিয়তা হাত তুলে থামিয়ে দিল উচ্ছ্বাসকে। দুহাতে চোখের কার্নিশ ঘষলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভালোভাবে ঘুরে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাসের হাতজোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, 'আমার বিষয় ছাড়ো। যা-ই করে থাকি, যেকারণেই করে থাকিনা কেন, তার আর কোন মানে নেই। তাতে কিছু বদলাবে না। না অতীত, না বর্তমান, আর না ভবিষ্যত। তুমি নিজের কথা ভাবো। আমার একটা কথা রাখবে, ভাই?'

উচ্ছ্বাস মুখে বলল না কিছু। তাকিয়ে রইল প্রিয়তার মুখের দিকে। প্রিয়তা লম্বা এক শ্বাস নিয়ে বলল, ' আজ রাতে তুমি নাজিফাকে একা ছেড়োনা। যাই ঘটে যাক, তুমি ওর সঙ্গেসঙ্গে থেকো। আমি জানি, তোমার জীবনের সবটুকু তুমি এই পরিবারের জন্যে দিয়ে দিয়েছো। কিন্তু আজ, জীবনে প্রথম আর শেষবারের মত একটাবার স্বার্থপর হয়ে যাও। প্লিজ।'

উচ্ছ্বাস কিছু বলল না। কেবল প্রিয়তার দিকে তাকিয়ে থেকেই মৃদু হাসল। আবছা আলো-অন্ধকারে জ্বলজ্বল করছে ওর চোখজোড়া। ও সেই ভাঙা গলাতেই বলল, 'আজ আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে বউমণি?'

প্রিয়তা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। উচ্ছ্বাস বলল, ' নিজ মুখে একবার স্বীকার করবে তুমি মন থেকেই আমাকে "ভাই" বলে ডেকেছো? গত দুই বছরে আমার প্রতি তোমার যত্ন, শাসন, ভালোবাসা সবটাই সত্যি ছিল। তুমি সত্যিই আমায় ভালোবাসো। আমি সত্যি সত্যিই তোমার ভাই। বলবে?'

প্রিয়তা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল উচ্ছ্বাসের দিকে। অনাকাঙ্ক্ষিত এক মমতা খেলে গেল ওর দুচোখে। ঠোঁটজোড়া কিছু বলার জন্যে নড়েই উঠছিল, হঠাৎ বেজে উঠল প্রিয়তার সাইডে রাখা সেলফোনটা। রিংয়ের আওয়াজে দুজনেই নড়েচড়ে উঠল। প্রিয়তা শুরুতে ভাবল দলের কারো ফোন। তাই ফোনটা না উল্টেই হাতে নিয়ে উঠে চলে গেলো খানিকটা দূরে। কিন্তু স্ক্রিনে তাকিয়ে বেশ অবাক হল তনুজার কল দেখে। দ্রুত রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে উঠল ফোঁপানো কান্নার আওয়াজ। ভ্রু কুঁচকে উঠল প্রিয়তার। আরও একবার স্ক্রিনে নাম্বারটা দেখে আবার কানে ধরে বলল, 'হ্যালো তনুজা? হ্যালো? হোয়াটস্ রং! কাঁদছো কেন?'

ফোঁপানোর আওয়াজ বেড়ে উঠল তনুজার। রাগে দাঁতে দাঁত পিষল রাণী মির্জা। ফ্যাসফ্যাসে স্বরে বলল, 'ফ্যাঁচফ্যাঁচ না করে বলো, হোয়াই দ্য ফা* আর ইউ ক্রায়িং? শায়না ঠিক আছে?'

তনুজা কোনমতে কান্না নিয়ন্ত্রণ করে বলল, ' বশীর_ বশীর কাকা!'

প্রিয়তার চোখজোড়া থেকে ক্রোধ সরে গিয়ে অস্থিরতা ভর করল। ও উত্তেজিত হয়ে বলল, ' কী হয়েছে কাকার?' কিন্তু কোন উত্তর এলোনা। কেঁদেই চলেছে মেয়েটা। রাগে-চিন্তায় চারপাশ অন্ধকার দেখল প্রিয়তা। দেয়ালে হাত দিয়ে আঘাত করে বলল, ' বলবে কী হয়েছে? কাকার কিছু হয়ে গেলে তোমাকে আমি_'

কিন্তু তাও তনুজার কোন উত্তর এলোনা। শুধুই কান্নার আওয়াজ। ফোন কেটে অস্থির হয়ে চারপাশে তাকাল প্রিয়তা। ঘেমে উঠল সারা শরীর। এলোমেলো হয়ে গেল মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি। কী হয়েছে বশিরের?.মন চিৎকার করে বলে উঠল, না না না। মিতার পর এবার বশির না। কোনভাবেই না। মিতার সময় ও কিছু করতে পারেনি। একটা কাওয়ার্ডের মতো লুকিয়ে ছিল বিছানার নিচে। এবার না। একেবারেই না। 

এদিকে উচ্ছ্বাস ভাবল প্রিয়তাকে শওকত মির্জা কিংবা ডার্ক নাইট থেকে কল করা হয়েছে। রুদ্র বেরিয়েছে অনেকক্ষণ। মারাত্বক কিছু ঘটিয়েছে বোধহয়। তাই প্রিয়তার চেহারার এই হাল। 

প্রিয়তা দ্রুত কদমে সদর দরজার দিকে এগোতেই উচ্ছ্বাসটা খানিকটা খোঁচা মেরেই বলে উঠল, 'কোথায় যাও বউমণি? তোমার হাতের কফি খাওয়াবেনা?'

মনের এই ভয়ংকর অস্থির অবস্থাতেও উচ্ছ্বাসের খোঁচার জবাব দিতে ভুলল না প্রিয়তা। ক্ষণিকের জন্যে দাঁড়িয়ে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, ' নিশ্চয়ই খাওয়াবো। যদি জীবিত ফিরি।'

বলে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল আমের ভিলা থেকে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চট্টগ্রাম পৌঁছতে হবে ওকে। 

—————

অন্যদিকে তনুজা কলটা নামিয়ে রাখার সঙ্গেসঙ্গেই ঘুমন্ত শায়নার দিক থেকে নিজের ব*ন্দু*কটা নামিয়ে ফেলল শান। একটানে ফোনটা কেড়ে নিল তনুজার হাত থেকে। তনুজা ঘৃণাভরে তাকাল শানের দিকে। চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে বলল, 'নিজের স্বার্থের জন্যে, নিজের মেয়ের দিকে ব*ন্দু*ক তাক করতে হাত কাঁপল না তোমার? জানোয়ার একটা!'

শান মুখে উত্তর দিলোনা এ প্রশ্নের। কিন্তু মনে মনে বলল, আমি ভুলকরেও আমার মেয়ের গায়ে একটা আঁচড় লাগতে দিতাম না তনু। কোনভাবেই না। কিন্তু আমি আমার নিজের সন্তানের ক্ষতি করতে পারি। একথা তুমি বিশ্বাস করেছো। সে ভয়ে আমার কথামতো কাজ করেছো। এরচেয়ে বেশি যন্ত্রণার আমার কাছে অন্যকিছু নেই।
কিন্তু মুখে বলল না সেসব কিছু। উল্টে গম্ভীর স্বরে বলল, 'আজ রাতে আর এই ঘর থেকে বের হবেনা তোমরা। তোমার ফোন আমার কবজায় থাকবে।' ঘরে থাকা স্বসস্ত্র লোকদের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, 'বাইরে থেকে দরজা লক থাকবে। আর ওরা পাহারায় থাকবে। চাইলেও বের হতে পারবেনা তুমি। তাই সে চেষ্টা করোনা।' 

চোখভর্তি ঘৃণা আর অশ্রু নিয়ে তাকিয়ে রইল তনুজা। শান চলে যেতে নিয়েও থেমে গেল। ফিরে এসে আলতো করে তনুজার গাল ছুঁয়ে বলল, ' বশির কাকাকে নিয়ে ভেবোনা। রাণীর মতো সে আমারও ভীষণ কাছের কেউ। তার বিন্দুমাত্র ক্ষতি আমি করব না। রুমে তোমাদের দুজনেরই খাবার রাখা আছে। কোন সমস্যা হবেনা। আর রিকোয়েস্ট করব, কোন ঝামেলা করোনা। লাভতো কিছু হবেইনা, উল্টে ক্ষতিটা তোমারই হবে।'

বলে আর দাঁড়াল না শান। দ্রুত কদমে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে সঙ্গে লোকেগুলোও। যাওয়ার আগে বাইরে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে নিতে ভুলল না। 

শান চলে যেতেই শায়না জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল তনুজা। এই মানুষটা আর কতবার ভাঙবে ওকে? কতবার আঘাত করবে? কতবার খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করবে? এই এক পুরুষকে ভালোবেসে আর কতবার ক্ষতবিক্ষত হতে হবে ওকে?

—————

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সরকে চলছে সম্রাট আর করিম তাজওয়ারের গাড়ি। গাড়িটা ড্রাইভ করছে সজল। পাশে বসে আছে সম্রাট, আর পেছনের সিটে করিম তাজওয়ার। ব্লাক হোলের বাকি চারজন অন্য গাড়িতে আসছে। আর পলাশ মির্জাসহ ডার্ক নাইটের লোকেরা ভিন্ন এক গাড়িতে। সম্রাট বারবার কল করে চলেছে রাণীর নাম্বারে, কিন্তু রিসিভ হচ্ছেনা। বিরতিহীন কল করে যাওয়ার পরেও না। ফলে মেজাজ চরম খারাপ হচ্ছে এবার সম্রাটের। নিজের প্লানটা সাকসেসফুল হয়েছে কিনা জানতে হবে ওকে। সেইসঙ্গে আরও ব্যপার আছে।

এতোক্ষণ আসতে আসতে একটাই কথা চিন্তা করছিল সম্রাট। ওখানে গিয়ে ঠিক কী করা যায়। কী করলে রুদ্র ফিরে আসতে বাধ্য হবে গুলশানে। এদিকে আসার আগ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে একটা ম্যাসেজ করে রেখেছিল করিম তাজওয়ার। সেই মেসেজের রিপ্লে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। যাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া আছে। আজ নটার দিকেই গুলশানের গোডাউনে মাল এসে ভর্তি হয়েছে। যার পরিমাণ খুবই হিউজ। এবং সোলার সিস্টেমের জন্যে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণও। সেগুলো আবার কাল সকালে ডেলিভারির জন্যে বেরিয়েও যাবে। দীর্ঘক্ষণ বিষয়টা দিয়ে চিন্তা করার পর অবশেষে পরিকল্পনা খেলল সম্রাটের মাথায়। যদি কোনভাবেই গোডাউনটাতে হামলা করা যায়। মালগুলো ছিনিয়ে নিতে কিংবা নষ্ট করতে। এবং সেই সংবাদ যদি রুদ্রর কান আবধি পৌঁছে দেওয়া যায়। তাহলে তা রুদ্রর জন্যে এক উভয়সংকট হয়ে দাঁড়াবে। যেদিকেই যাক, একদিক দিয়ে ওর ক্ষতি হবেই। এতোগুলো দিন এসব কিছু করতে পারতোনা কারণ যখন মাল ভর্তি থাকতো তখন বেশিরভাগ সময় রুদ্র উপস্থিত থাকতো গুলশান, সেইসঙ্গে কড়া পাহাড়া। কড়া পাহাড়াটা যদিও আজও আছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সেটা ভাঙতেই হবে।

এদিকে বারবার ফোন রিং হওয়াতে মেজাজ বিগ্রে যাচ্ছে রাণী মির্জার। আমের ভিলা থেকে বের হয়ে সোজা নিজের সেই ফ্ল্যাটে গিয়েছিল ও। নিজের পোষাক বদলে, বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়েছে। এখন যতটা স্পিডে সম্ভব ততটাই স্পিডে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছুটে যাচ্ছে ও। কিন্তু বিরতিহীন ফোনের রিংটোনে অতিষ্ঠ হয়ে জায়গা বুঝে বাইক সাইডে চাপালো ও। ভ্রুকুটি করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল সম্রাটের কল। দাঁতে দাঁত চেপে রেখে কলটা রিসিভ করল। তীব্র বিরক্তি ঝেড়ে বলল, 'কী হয়েছে কী?'

রাণী কল রিসিভ করায় যেন হাঁফ ছাড়ল সম্রাট। বলল, 'এমন সময় এতোবার করে কল করছি, নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।'

' বলো!'

' কোথায় আছো তুমি? গাড়ির আওয়াজ পাচ্ছি? তোমারতো আমের ভিলায় থাকার কথা ছিল এখন।' খানিকটা কৌশলে প্রশ্নটা করল সম্রাট।

প্রিয়তাও কথা না পেঁচিয়ে বলল, ' চট্টগ্রাম যাচ্ছি আমি। ইমার্জেন্সি।'

সম্রাট স্বস্তিতে ভেতর ভেতর উত্তেজিত হয়ে উঠল। কিন্তু সেই আবেগ চেপে রাখল ভেতরেই। রাণী যাতে কোনকিছু সন্দেহ করতে না পারে তাই বলল, ' একটা প্লান এসেছে আমার মাথায়। সেটা সম্পর্কে জানাতেই কল করেছি তোমাকে।'

রাণী অস্থির হচ্ছে। দ্রুত পৌঁছতে হবে ওকে চট্টগ্রাম। তনুজার কল লাগছেনা। ওখানের অন্যকাউকে বলাও যাবেনা এই বিষয়ে। তাই অতিষ্ঠ হয়ে বলল, ' যা বলার দ্রুত বলো। সময় নেই আমার কাছে।'

সম্রাট দ্রুতই বলল, ' গুলশানের গোডাউনটাতে অ‍্যাটাক করব আমরা, আজ ভোররাতে। চট্টগ্রাম মাল ডেলিভারি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে। যখন রুদ্রর ফোন অন থাকবে এবং খবরটা ওর কাছে পৌঁছনো যাবে তখন। আর ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই ওকে ডিসাইড করতে হবে ও কোনদিকে যাবে। যেদিকেই যাক, ক্ষতিটা ওরই হবে।'

প্রিয়তা শুনল ঠিকই। কিন্তু সম্রাটের এই পরিকল্পনা নিয়ে বিবেচনায় বসার মতো মানসিক স্থিরতা বা সময় কোনটাই ওর নেই। তাই শুধু বলল, ' যা ইচ্ছা করো। কিন্তু আমার কথাটা মাথায় রেখে!'

বলেই কল কেটে দিল রাণী মির্জা। কান থেকে ফোন নামিয়ে বাঁকা হাসল সম্রাট তাজওয়ার। এই প্লান এক্সিকিউটের জন্যে ও রাণী কেন, কারোরই অনুমতির তোয়াক্কা করতো না। কিন্তু রাণীকে কল দেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই ছিল। রাণী গুলশান থেকে বেরিয়েছে কিনা নিশ্চিত হওয়া। সে নিশ্চয়তা ও পেয়ে গেছে। এবার আর কোন ভয় নেই।

করিম তাজওয়ার বলে উঠল, ' কিন্তু তোমার সত্যিই মনে হয় আমরা ওখানকার সিকিউরিটি ব্রেক করে হামলাটা করতে পারব? আর যাই হোক, এতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রুদ্র নিশ্চয়ই আনপ্রটেক্টেড রেখে যাবেনা। এই প্রশ্নটা শুধু আমি না, প্লানটা জানার পর শওকত মির্জাও করছে।' করিমের সঙ্গে এ মুহূর্তে কলে আছেন শওকত মির্জা।

' আনডাউটলি প্রটেকশন অনেক কড়া থাকবে। কিন্তু সঠিক কৌশল খাটানো গেলে সেই প্রটেকশন ব্রেকও করা যাবে। অসম্ভব বলে কিছু নেই।'

' কী কৌশল?'

' "ওকে" বলো এবার আমাদের ওর ডিরেক্ট হেল্প লাগবে।' 

চমকে উঠল করিম তাজওয়ার। দুচোখে অবিশ্বাস নিয়ে বলল, 'পাগল হয়ে গেছো তুমি? ডিরেক্ট হেল্প! যদি ওর কাছ থেকে ডিরেক্ট হেল্প নেয়াই সম্ভব হতো তাহলে এতোদিনে আমরা নিতাম না? এতোগুলো দিন রুদ্রর কাছে ধরা না পড়ার কারণটাই ছিল ওর নিষ্ক্রিয়তা। রুদ্র কিছু টের পেতোনা কারণ ও কিছু করতোই না, এই হিডেন নাম্বারে মাসে এক দুবার টেক্সট করা ছাড়া। তাও লেস ইম্পোর্টেন্ট কিছু ইনফরমেশনই দিতে পারতো ও। তাও শর্টকাটে। এই যেমন, দুইবছর আগে রুদ্রর চট্টগ্রাম আসার ডিটেইল। এইটুকুই। সরাসরি কিছু করতে গেলে মুহূর্তেই ধরা পড়ে যাবে।

সম্রাট ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, 'তাও আমরা ওকে হাতে রেখে দিয়েছিলাম। কেন? এমনই এক ক্লাইম্যাক্সের জন্যে। এমন এক সময়ের জন্যে যখন ওর বাস্তবতা প্রকাশ পেলেও কিচ্ছু যায় আসবেনা। না ওর জন্যে, আর না আমাদের জন্যে। আজকেই সেই সময়। কারণ তোমরা সবাই এগ্রি করবে, আজ ভোরে খেলা যেদিকেই ঘুরুকনা কেন। এসপার হোক বা ওসপার। কোনকিছুই আর হিডেন থাকবেনা। দুপক্ষের কাছেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে সবকিছু। আর ধ্বংসও হবে অনিবার্য। হয় যেকোনো একপক্ষের, নয়তো দুপক্ষেরই। তাই আর রাখঢাকের কিছু নেই।'
সম্রাট থামল একটু। অতঃপর গলা খানিকটা চড়িয়ে বলল, 'আর মির্জা সাহেব, এক্ষেত্রে আপনার ঐ মন্ত্রী বন্ধুরও সাহায্য লাগবে আমাদের। কী সাহায্য তা জানিয়ে দিচ্ছি। আশাকরি, কাজটা হয়ে যাবে।'

সম্রাটের কথাগুলো শুনে কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো করিম তাজওয়ারে। বুক টিপটিপ করা, গা শিরেশিরে অনুভূতি। পেটের মধ্যে সেই অদ্ভুত গুরগুরেভাব। সত্যি, আজ ভোরেই ওদের সকলের পরিণতি লেখা হয়ে যাবে। আর আজ যা লেখা হবে, তা আর কোনভাবেই বদলানো সম্ভব হবেনা। কোনভাবেই না।

করিম তাজওয়ারকেতো সম্মত হতেই হল। সেইসঙ্গে ফোনের ওপাশ থেকে শওকত মির্জাও সম্মত হয়ে কেটে দিল কলটা। করিম তাজওয়ার কম্পিত হাতে মেসেজ করল সেই নাম্বারটাতে। ভোরে সরাসরিই কথা হবে কলে। কারণ আজ ভোরে আর লুকোনোর কিছু থাকবেনা। পর্দা সরে যাবে সব অজানা রহস্যের ওপর থেকে!

—————

রাত তিনটার খানিক বেশি বাজে। আমের ভিলার করিডরে সঙ্গে জয়েন্ট বিশাল বারান্দাটায় একটা দোলনা রাখা আছে। সেখানেই পাশাপাশি বসে আছে উচ্ছ্বাস আর নাজিফা। নাজিফা নিজের মাথাটা এলিয়ে রেখেছে উচ্ছ্বাসের কাঁধে। মাঝরাতের পিনপতন নীরবতায় অদ্ভুত ছন্দে বাজতে ওদের দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।

নাজিফা ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ অদ্ভুত অনুভূতিতে ঘুমটা ভেঙে যায় ওর। তলপেটে অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথার অনুভূতি শুরু হয়, মৃদু শিরশির করতে থাকে পা। লেবার পেইন শুরু হওয়ার লক্ষণ এগুলো। কিন্তু এমনটা নাজিফার দু-তিন যাবতই হচ্ছে। সময় খুব কাছে তা বুঝতে পারছে ও। কিন্তু কতটা কাছে তা বুঝে উঠতে পারছিলনা। কিছুক্ষণ এপাশওপাশ করে যখন কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলনা, তখন উঠে বসে কল করল উচ্ছ্বাসকে। বলল, 'ভীষণ অস্থির লাগছে আমার। আমায় নিয়ে একটু করিডরে হাঁটবে?'
যদিও শুনে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল উচ্ছ্বাস। নিচে তখনও ল্যাপটপে কাজ করছিল ও। শোনামাত্র সব ছেড়ে প্রায় দৌড়ে ছুটে এসেছিল নাজিফার রুমে। ভেবেছিল বড় কোন সমস্যা হয়েছে। পাগল ছেলের এমন অস্থিরতা দেখে হেসে ফেলেছিল নাজিফা। কোনমতে বুঝিয়ে বলে তবেই শান্ত করেছে। 

এতক্ষণে নাজিফাকে নিয়ে খুব ধীরে ধীরে করিডর আর বারান্দাজুড়ে হেঁটেছে উচ্ছ্বাস। দুজনে টুকটাক গল্প করেছে। নাজিফা খানিকটা ক্লান্ত হতেই দোলনাটার ওপর বসেছে দুজন। ভারী একটা চাদর জড়ানো নাজিফার শরীরে। সেই একই চাদর নিজের গায়েও জড়িয়েছে উচ্ছ্বাস। খোলা বারান্দা দিয়ে ঠান্ডা শীতল হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওদের দুজনের শরীরে। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে যেন একে অপরের উপস্থিতিও গায়ে মাখছে ওরা। উচ্ছ্বাস নাজিফার চুলের ভাজে আলতো করে আঙ্গুল বুলিয়ে বলল, 'এখন ভালো লাগছে একটু?'

নাজিফা চোখ বুজে আছে উচ্ছ্বাসের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে। যেন ভীষণ তৃপ্তিতে উপভোগ করছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্থানে মাথা রেখে। ও সে অবস্থাতেই বলল, 'পায়ের শিরশিরে ভাবটা কমেছে। কিন্তু পেটের চিনচিনে ব্যথাটা আছে। কমছে না।'

উচ্ছ্বাস মাথা নাজিফার দিকে তাকিয়ে বলল, 'রুমে গিয়ে রেস্ট করবে?'

'উমহুম। আরেকটু থাকি।'

উচ্ছ্বাস হালকা হাসল, 'ভালো লাগছে?'

নাজিফাও হাসল। আরেকটু আয়েশ করে মাথা রাখল প্রিয়তমর কাঁধে, 'ভীষণ!'

কিছুক্ষণ আর কোন কথা হলোনা। উচ্ছ্বাস তাকিয়ে রইল শীতের থমথমে আকাশের দিকে। নাজিফাও চোখ বুজে রইল সেভাবেই। হঠাৎ মনে পড়তেই নাজিফা আস্তেধীরে বলল, 'তোমার আমাদের পার্কে শুয়ে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে পড়ে উচ্ছ্বাস?'

ঠোঁটে ঠোঁটে চেপে এদিকওদিক মাথা দোলালো উচ্ছ্বাস। কন্ঠস্বর উদাস করে বলল, 'বাপড়ে! অতো ভয়ংকর দিনগুলো কেউ মনে রাখে নাকি? জীবনের কী তিক্ত তিক্ত স্মৃতি। মনে পড়লেই মুখ তেঁতো হয়ে যায়।'

ভ্রুকুটি করে উচ্ছ্বাসের বাহুতে কিল বসালো নাজিফা। তবে চোখ খুলল না। উচ্ছ্বাস হেসে ফেলল। নাজিফাও হাসল। হেসে বলল, ' পার্কে যখন আমরা পাশাপাশি বসে থাকতাম, তুমি হুটহাট বেসুরা গলায় গান গেয়ে উঠতে। আমি বারণ করতাম, ভীষণ রেগে যেতাম। তোমাকে কিলঘুষি মারতাম। কিন্তু তোমার এই অভ্যাস বদলাতো না।'

উচ্ছ্বাসের হাসি চওড়া হল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সুখময় সেই মুহুর্তগুলো। ও জানে, ওর জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর বিরাট এক অংশ ছিল সেই কয়েকটা মাস। যা ও কোনদিনও ভুলবেনা। নাজিফা কোমল স্বরে ডাকল, 'উচ্ছ্বাস?'

' হু?'

' আজও তোমার একটা গান শোনাবে? প্লিজ?'

' আবার সেই বেসুরা গান! মারবেনাতো!'

' উচ্ছ্বাস!'

উচ্ছ্বাস হেসে ফেলল। চোখ সরল না আকাশের দিক থেকে। বিস্তৃত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ঠোঁটের হাসিটুকু। চোখের সামনে ভেসে উঠল নাজিফার সঙ্গে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে ওদের বিচ্ছেদ, বিরহের সেই তীব্র যন্ত্রণা, একেকটা নির্ঘুম রাত, চেপে রাখা কান্না। অবশেষে সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা। শীতল এই বাতাসটুকুও হঠাৎ বড্ড বেশি ভার লাগলো ওর কাছে। বড় বিষাদময় ঠেকলো। আনমনেই গেয়ে উঠল_

         তুমি এই রোদের মতো 
         আমি তোমায় মাখছি গো,
          তুমি এই মেঘের মতো 
          বৃষ্টির আশায় থাকছি গো। 
         ভাবি যেতে যেতে থেমে 
      সেই দেখা শেষ দেখা না হোক,
           তোমার আমার প্রেমে 
     আমি কি একাই স্মৃতির বাহক। 

          তুমি সব ভালো আমার 
          তুমি সব আলো আমার,
             অন্ধকার তো না,
       তবে কি বৃথা যাবে প্রেম প্রার্থনা। 

         ঈশ্বর কি তোমার আমার 
         মিলন লিখতে পারতোনা ?
         ঈশ্বর কি তোমার আমার 
         মিলন_

' আউচ।' বাহুতে সজোরে কিল পড়ায় থেমে গেল উচ্ছ্বাস। নাজিফা চোখ খুলে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। উচ্ছ্বাস ঠোঁট উল্টে বলল, 'তুমি বলেছিলে মারবেনা।'

নাজিফা অসন্তোষ নিয়ে বলল, 'এসব কী গান? আর কোন গান কোন গান খুঁজে পাওনি? এটাই গাইতে হলো?'

' আরেহ্ মাথায় যে গানটা আসবে সেটাইতো গাইব।'

' থাক! আর গাইতে হবেনা তোমাকে। উজবুক!'

উচ্ছ্বাস হো হো করে হেসে উঠল। নাজিফা কটমটে চোখে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। ওর চাহনী দেখে হাসতে হাসতেই ধীরে ধীরে থমকে গেল উচ্ছ্বাস। যেন সেই দেড় বছর আগের নাজিফা। ঠিক সেই চাহনী, সেই বিরক্তি, সেই অভিব্যক্তি। সেই উজবুক ডাক! উচ্ছ্বাস স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর শক্ত এক ঢোক গিলে বলল, ' একটা অন্যায় আবদার করি নাজিফা?'

নাজিফা ভ্রু নাচালো। অর্থাৎ কী? উচ্ছ্বাস কোনমতে বলল, 'একটা চুমু খেতে পারি? প্লিজ!'

নাজিফা থমকে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। ওদের রিলেশন চলাকালীন সময়ও উচ্ছ্বাস এমন আবদার কখনও করেনি। আজ কী হল। ও খানিকটা অবাক হয়েই বলল, ' তুমিতো বলেছিলে যা হবে, বিয়ের পরেই হবে।'

' জাস্ট আ কিস।' নাজিফার দিকে চেয়ে থেকে অনেকটা ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায়, তৃষ্ণায় কাতর কোন মানুষের মতো বলল উচ্ছ্বাস।

ইতস্ততা দেখা গেল নাজিফার মধ্যে। অস্থির চোখে এদিকওদিক তাকাল ও। ছোট্ট ঢোক গিলল। অমন অপ্রস্তুত পরিবেশেই কেটে গেল আরও কিছুক্ষণ সময়। উচ্ছ্বাস নাজিফার অপ্রস্তুত ভাবটা মুহূর্তেই বুঝে ফেলল। মৃদু হেসে বলল, ' ইটস্ ওকে। আই ওয়াজ কিডিং। চলো, তোমাকে রুমে দিয়ে আসি। ইউ নিড রেস্ট।'

বলে উচ্ছ্বাস উঠতে নিলেই আচমকা হাত ধরে বসিয়ে দিল নাজিফা। আলতো করে হাত রাখল উচ্ছ্বাসের গালে। উচ্ছ্বাস সপ্রশ্ন চোখে তাকাল নাজিফার চোখে। নাজিফা কিছু বলতেই নিচ্ছিল হঠাৎ নিজের তলপেটে তীব্র মোচড় অনুভব করে গুঙ্গিয়ে উঠল ও। চোখ খিচে খামচে ধরল উচ্ছ্বাসের হাত। উচ্ছ্বাসের চোখেমুখে আতঙ্ক খেলে গেল। ও দ্রুত নাজিফাকে আকড়ে ধরে বলল, 'নাজিফা! কী হয়েছে! ঠিক আছো তুমি?'

নাজিফার পেটের মোচড়ানো ব্যাথাটা আরও বাড়ল। নিজের স্যালোয়ারের ভালো ভেজাভাবটাও ভালোভাবে অনুভব করতে পারল। ও ঢোক গিলে উচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে কোনমতে উচ্চারণ করল, 'লে- লেবার।'

উচ্ছ্বাস স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল নাজিফার দিকে। নাজিফাকে ধরা হাতের বাঁধন শক্ত হলো সয়ংক্রিয়ভাবে। বিস্ময়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।

—————

রাত তখন চারটা বাজে। সোলার সিস্টেমের গোডাউনের মেইন গেইটের সামনের রাস্তাটা বেশ থমথমে। কনকনে শীতের শেষরাতে রাস্তাটা ভীষণই শান্ত আর স্তব্ধ হয়ে আছে। আশেপাশে তেমন শব্দ নেই। সোলার সিস্টেমে মালের এই গোডাউনের নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ কড়া এবং সুকৌশলে সাজানো। সামনের গেইটে সেন্ট্রিরূপে উপস্থিত থাকে চারজন শ্যুটার। দুজন একদম সামনে, দুজন খানিক পেছনে। ভেতরে প্রত্যেকটা করিডর টার্ন থেকে শুরু করে ইম্পর্টেন্ট জায়গাতেও লোক ছড়িয়ে আছে। সামনের গেইটের পাহারাদারদের সঙ্গে সবসময়ই ওয়্যারলেসে যুক্ত থাকে এরা।

মেইন গেইটের সামনের রোডে একদম নিঃশব্দে এসে থামল পুলিশের লোগো লাগানো একটা পকেট স্কোয়াড ভ্যান। হেডলাইট নেভানো। গাড়ি থেকে বেশ দ্রুত পুলিশের পোশাকে দুজন লোক নেমে এগিয়ে এলো। একদম সামনে দাঁড়ানো সেন্ট্রি দুজন নড়েচড়ে উঠল। লোকদুটো সেন্ট্রিদের উদ্দেশ্য করে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, 'ভেতরে তল্লাশি আছে, ওপরের অর্ডার। গেট খোল।'

​গেইটের ছদ্মবেশী শুটাররা যদিও বেশ প্রফেশনাল। কিন্তু এতো একিউরেট লগো আর লোকদের তারা কনফিউজড হয়ে গেল ঠিকই। তবে দমল না। দুজনের মধ্যে একজন আইডি কার্ড দেখতে চাইল, এবং অন্যজন পকেট থেকে ওয়্যারলেস বের করতে গেল। ঠিক সেই ফ্রাকশন অব আ সেকেন্ডের অপেক্ষাটাই করছিল লোকদুটো। ভ্যানের ঠিক ভেতর থেকে সাইলেন্সার লাগানো বিশেষ ট্র্যাঙ্কুলাইজার গান থেকে দুটো নিচু শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ হলো কেবল।

​তীব্র ড্রাগের বাতিক্রিয়ায় গেটের সামনের দুজন শু‍টার কোনো শব্দ করার বা ওয়্যারলেসের বাটনে চাপ দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই জাস্ট ঢলে পড়ে গেল মাটির ওপর। খানিক পেছনে থাকা বাকি দুজন হতভম্ব হয়ে গেল। পরিস্থিতি কভারে নেওয়ার আগেই সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের নিখুঁত দুটো শটে তারাও নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। ওয়্যারলেসে ভেতরের ছেলেরা শুধু শুনতে পেল একটা চাপা গোঙানি আর ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ। হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে না পেরে স্বাভাবিকভাবেই প্যানিক ছড়িয়ে পড়ল সবার মধ্যে। ভেতরে থাকা বাকি শুটাররা মেইন গেটের দিকে ব্যাকআপ দিতে ছুটল দ্রুত।

ঠিক এই বিভ্রান্তির সুবর্ণ সুযোগটারই অপেক্ষা করছিল সম্রাট তাজওয়ার। অজ্ঞাত ব্যক্তির দেওয়া সেই গাইডলাইন, গোডাউন ম্যাপ আর সম্পূর্ণ সিকিউরিটি সিস্টেম পুরো গিলে খেয়ে এসেছে ওরা। সবচেয়ে সেইফ জোন হিসেবে, ভারী সাইলেন্ট ইকুইপমেন্ট আর কেমিক্যাল নিয়ে অলরেডি পজিশন নিয়ে নিয়েছে গোডাউনের উত্তর পাশের জেনারেটর রুমের অন্ধকার কোণায়। ম্যাপ অনুযায়ী ওটাই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। যেখানে আছে সম্রাট, পলাশ সুজন আর সজল। প্রত্যেকের গায়ে চাপিয়ে রেখে শীতের ভারী জ্যাকেট, আর মুখে কালো মোটা মাস্ক। করিম তাজওয়ার ফিল্ডে নেই। বয়স পঞ্চান্ন পেরোনোর পর আর ফিল্ড অপারেশনে থাকেনা সে। তবে খানিক দূরে এক আস্তানায় কানেকশনে আছে দলের সঙ্গে। 

এদিক দিয়েই দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢোকার পরিকল্পনা ওদের। কিন্তু গুলশানের এই নির্জনতায় দেয়ালকে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙলে পুলিশ চলে আসবে হুট করে, এখানকার পাহারাদাররাও সতর্ক হয়ে যাবে। তাই সাইলেন্ট 'কেমিক্যাল ক্র্যাকিং এজেন্ট' ব্যবহারের বুদ্ধিটা বেরিয়েছে সম্রাটের মাথা থেকেই।
​ইটের জয়েন্টগুলোতে এক ধরণের বিশেষ অ্যাসিড স্প্রে করতেই মাত্র দুই মিনিটে সিমেন্ট-বালুর বন্ডিং নরম কাদার মতো আলগা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে সেই এসিড দিয়ে ভেতরে প্রবেশ পথ তৈরী করল সম্রাট। ওখানকার সোর্স-লাইনে অল্পবয়সী ছেলেকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। সেটা ওরা ভালোভাবেই জানতো গোপন সেই তথ্যের কৃপায়। ছেলেটার পুরো মনোযোগ ছিল মেইন গেটের দিকে। কিছু টের পেয়ে ছেলেটা যখন চমকে ওদিকে তাকাতে গেল, ঠিক তখনই সাইলেন্সার লাগানো একটা 9mm বু*লে*ট অন্ধকারের বুক চিরে সরাসরি ওর কপালে বিঁধে গেল। কোনো শব্দ ছাড়া ছেলেটা ছিটকে পড়ল জেনারেটরের ডাইনামোর ওপর।

​পরের কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যে সাইলেন্ট হাইড্রোলিক পুশার দিয়ে চাপ দিতেই উত্তর পাশের দেয়ালটা কোনো আওয়াজ ছাড়াই তাসের ঘরের মতো ভেতরের দিকে ভেঙে পড়ল। ধুলো আর অন্ধকারের বুক চিরে বিপক্ষ দলের বারোজন মাস্ক পরা আর্মড ম্যান সাপের মতো সাইলেন্টলি ঢুকে পড়ল গোডাউনের ভেতরের করিডোরে। তারা ম্যাপ ধরে কোনো ভুল রুট না নিয়ে সোজা এগোতে থাকল আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্টের মেইন ডোরের দিকে।

​করিডোরে ব্যাকআপ দিতে আসা রুদ্রর দু-একজন শুটার কিছু বুঝে ওঠার আগেই সম্রাটের পয়েন্ট-ব্লাঙ্ক রেঞ্জের সাইলেন্ট বুলেটে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। ঘরের শত্রু বিভীষণই যখন ভেতরের ডিফেন্সের শক্তি আর দুর্বলতার নিখুঁত স্থানাঙ্ক ফাঁস করে দেয়, তখন সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গও ভেঙ্গে পড়তে সময় নেয় না।

—————

নাজিফার প্রসব বেদনা ততক্ষণে তীব্র রূপ নিয়েছে। রুমের ভেতরে আছে জ্যোতি আর কুহু। সঙ্গে সেই নার্স। বাইরের করিডরে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছে উচ্ছ্বাস। নীরব দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল এ হেলান দিয়ে। জাফর একটা চেয়ার নিয়ে বসা। চোখমুখ বেশ গম্ভীর তার। 
সকলের চোখেমুখে চিন্তা আর উত্তেজনার ছাপ। শীত অনুভব করতে পারছেনা ওরা কেউ। উচ্ছ্বাস ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে, ধুকপুক করছে বুকের ভেতরটা। ভেতর থেকে ভেসে আসা নাজিফার চিৎকারে কলিজাটা চিপে ধরছে যেন কেউ ওর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো এতক্ষণে নাজিফাকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যেতো ওরা। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ঠিক নেই, তা বুঝতে কারোরই কোন সমস্যা হচ্ছেনা। এই অবস্থায় নাজিফাকে নিয়ে বের হওয়াটা ভয়ংকর রিস্কি হয়ে যাবে। তারওপর নার্সও নিশ্চয়তা দিয়েছে, এখনো বিশেষ কোন কম্প্লিকেশন দেখা দেয়নি। দেখা দিলে তিনি অবশ্যই জানাবেন।

দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনার এমন অস্থির মুহূর্তে উচ্ছ্বাস যখন দিশেহারা, তখন হঠাৎ করেই বেজে উঠল ওর সেলফোনটা। উচ্ছ্বাস দাঁড়িয়ে গেল। জাফর আর নীরব প্রায় একসঙ্গে তাকাল ওর দিকে। উচ্ছ্বাস ভ্রুকুটি করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল জয়ের কল। বিস্মিত হল ও। চারটার বেশি বাজতে চলল। এই সময় জয়ের কল! বিস্ময় নিয়েই বেশ অনেকটা দূরে গিয়ে কলটা রিসিভ করল উচ্ছ্বাস। ও কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো জয়ের হাঁপানো, প্রচণ্ড ব্যস্ত কন্ঠস্বর, 'উচ্ছ্বাস ভাই! মেইন গেটে পুলিশ সেজে হিট করছে। ওরা উত্তর পাশের জেনারেটর রুমের দেয়াল কেটে ভেতরে ঢুকে গেছে। করিডোরে লাশ_ ওরা ভেতরের সব রুট এমনভাবে কভার করছে যেন ম্যাপ পুরো গিলে খেয়েছে। ওরা ডিরেক্ট বেসমেন্টের দিকে যাচ্ছে_ লীড_ লীড সম্রাট তাজওয়ার দিচ্ছে।'

এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল উচ্ছ্বাস। জেনারেটর রুমের ওই গোপন উইক জায়গাটার কথা ওরা জানল কী করে? ওই রুটটার কথা তো ওদের ভেতরের লোক ছাড়া কারো জানার কথা না। কিন্তু এখন এসব ভেবে নষ্ট করার মতো একবিন্দুও সময় দেই। ও শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বলল, ' টিম রেডি করে ওয়্যারলেসে কানেক্টেড হ তোরা সবাই। আমি আসছি।'

' রুদ্র ভাইকেহ্, জানাবেন না ভাই? ভাই অপারেশনে গেছে। জানি আমি। এখনো তা শুরু হয়নি। এখন ফোনে পাব ওনায়।'

' ভুলেও না।' কড়া গলায় নিষেধ করল উচ্ছ্বাস। ' আমার মন বলছে এই কান্ডটা ঘটিয়েছেই রুদ্রকে ডিসট্রাক্ট করার জন্যে। সেই প্লান সফল হতে দেবনা আমি। এখানকার দায়িত্ব আমায় দিয়ে গেছে রুদ্র। সেটা আমিই করব। রুদ্রর ওখানকার কাজে যেন বিন্দুমাত্র বাঁধা সৃষ্টি না হয়। কেউ ওকে কিচ্ছু জানাবেনা। আর ওকে যে কেউ কিছু জানায়নি সেটাও যাতে কেউ না জানে।'

জয় খানিক স্তম্ভিত হলেও বলল, 'ঠিক আছে।'

উচ্ছ্বাস কল কেটে দ্রুতপায়ে ফিরে এলো। জাফর সঙ্গে সঙ্গে দু'কদম এগিয়ে এসে বলল, 'কী ব্যপার? কী হয়েছে?' 

উত্তর দিলোনা উচ্ছ্বাস। জোরে জোরে শ্বাস টানল দুটো। চেঁচিয়ে ডাকল জ্যোতিকে। উচ্ছ্বাসের ডাকে দৌড়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো জ্যোতি। এমনিতেই ঘেমে গেছে ও। সপ্রশ্ন চোখে তাকাতেই উচ্ছ্বাস বলল, 'আমি এখন বের হব। তার আগে নাজিফার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই আমি। ব্যবস্থা কর, আমি আসছি।'

জ্যোতি হতবাক হয়ে তাকাল। ও কিছু বলার আগেই উচ্ছ্বাস হনহনে পায়ে চলে গেল নিজের রুমে দিকে। রুমে গিয়ে লক-ড্রয়ার টান দিয়ে নিজের দুই হাতের জন্য দুটো ভারী নাইন-এমএম পিস্তল বের করল, অতিরিক্ত ম্যাগাজিনগুলো জ্যাকেটের পকেটে পুরে বেরিয়ে আবার ফিরে এলো নাজিফার ঘরের সামনে। এসে দেখল জ্যোতি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। উচ্ছ্বাসকে দেখেই ও দ্রুত বলল, 'ভেতরে যেতে পারো তুমি।'

উচ্ছ্বাস আর কিছু শোনার অপেক্ষা করল না। দ্রুত চলে গেল ভেতরে। নাজিফা তখনও প্রসব বেদনায় ছটফট করছে। উচ্ছ্বাস এসেছে বলে পেট থেকে সম্পূর্ণ নিচ অবধি ঢেকে দেওয়া হয়েছে চাদর দিয়ে। জ্যোতিও এসে দরজা ধরে দাঁড়াল। চোখেমুখে তীব্র দুঃশ্চিন্তা।
উচ্ছ্বাস বসল নাজিফার ঠিক পাশে। নাজিফা যন্ত্রণায় কাতর চোখে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস নাজিফার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'আমায় বের হতে হবে নাজিফা। শক্ত থাকবে। কিচ্ছু হবেনা তোমার আর আমাদের বাচ্চার। তুমি ভীষণ স্ট্রং একজন মানুষ। জীবনে অনেক ভয়ংকর সময় পাড় করে এসেছো তুমি, কিন্তু হেরে যাওনি। এবারও পারবে।'

ব্যথায় কাতর অবস্থাতেও নাজিফা বিভ্রান্ত চোখে তাকালো। পুরোটা না বুঝলেও এইটুকু বুঝে ফেলল ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। নয়তো ওকে এই অবস্থায় ফেলে ছেলেটা ভুল করেও যেতোনা। উচ্ছ্বাস এই ভয়ংকর কিছুর মধ্যেই যাচ্ছে। ও কোনমতে ঠোঁট নেড়ে বলল, 'নাহ্। আমাকেহ্ এভাবে রেখে_ যাবে না।'

' আমায় যেতে হবে। তুমি পারবে সবটা সামলাতে।'

' আমিহ্ পা-পারবোনা। প্লিজ যেওনা।' ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলল নাজিফা। 

উচ্ছ্বাস ঝুঁকল নাজিফার দিকে। ফিসফিসিয়ে বলল, 'তুমিতো আমার ঝাঁসির রাণী। তুমি সব পারো। ভয় পেয়োনা, আমি আসব। আজই আমাদের বিয়ে হবে। তুমি আমার দেয়া ঐ শাড়িটা পড়ে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। নীরবকে বলবে কাজি নিয়ে আসতে। আমি আসব। ঠিক আসব।'

বলে উচ্ছ্বাস উঠে যেতে নিলেই হাতটা খামচে ধরল নাজিফা। হুঁ হুঁ করে কেঁদে দিয়ে বলল, 'যেওনা। প্লি_প্লিজ যেওনা।'

উচ্ছ্বাস মৃদু হাসল। চোখে জমা একফোঁটা জল টুপ করে পড়ল নাজিফার মুখে। উচ্ছ্বাস ঝুঁকে আলতো করে চুমু খেলো নাজিফার কপালে। বলল, ' আমি কথা দিচ্ছি, ফিরে আসব।'

নাজিফা কেঁদেই চলেছে। উচ্ছ্বাস হাত ছাড়িয়ে উঠে যেতে নিলে নাজিফা খামচে ধরে রাখল ওকে। মাথা নেড়ে কাতরভাবে নিষেধ করল যেতে। উচ্ছ্বাস আলতো করে হাতটা ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। নাজিফা জোরে কেঁদে ফেলল। উচ্ছ্বাস চলে যেতে নিলেই কুহু এসে জাপটে ধরল ওকে। পাগলের মতো ইশারা করে বলল না যাওয়ার জন্যে। উচ্ছ্বাস আলতো হাতে ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। সস্নেহে কুহুর মাথায় হাত বুলিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে এলো। চোখ খিচে কেঁদে ফেলল কুহু। বের হওয়ার সময় কান্নারত জ্যোতির মুখোমুখি হতেই উচ্ছ্বাস একপলক নাজিফার দিকে তাকিয়ে বলল, 'ওর খেয়াল রাখিস।'

' না গেলে হয়না?' করুণ স্বরে বলল জ্যোতি।

' না হয়না। আমার প্রাণ থাকতে সোলার সিস্টেম আর রুদ্রর কোন ক্ষতি আমি হতে দেবনা। কোনভাবেই না।'

জ্যোতি চেয়েও কিছু বলতে পারল না আর। বুকের ভেতরে তীব্র সুঁচ ফোঁটাচ্ছে যেন কেউ। উচ্ছ্বাস করিডরে যেতেই জাফর চিন্তিত মুখে এগিয়ে এসে বলল, 'গোডাউনে অ‍্যাটাক হয়েছে শুনলাম। তোর সঙ্গে আমিও _'

' না কাকা।' সঙ্গেসঙ্গে বাঁধা দিল উচ্ছ্বাস। ' ফিল্ডে তোমাকে যেতে দেবনা আমি। ওখানে ভয়ংকর রিস্ক। তোমার বিন্দুমাত্র কিছু হলে রুদ্রকে কী জবাব দেব আমি? তারচেয়েও বড় কথা নিজের সঙ্গে আয়নায় চোখ মেলাতে পারবনা আমি যদি তোমার কিছু হয়।'

' কিন্তু _'

' কোন কিন্তু না। আসছি।'

জাফরের দুকাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে বলল উচ্ছ্বাস। নীরবের দিকে তাকিয়ে চোখে আশ্বাস দিয়ে আর এক মিনিটও অপেক্ষা করল না ও। দ্রুত কদমে বেরিয়ে গেল আমের ভিলা ছেড়ে।
          ​ভোর তখন সাড়ে চারটা বাজে। কুয়াশা ভেদ করে উচ্ছ্বাসের গাড়িটা গোডাউন চত্বরের পেছনের গলিতে ব্রেক কষল। চারপাশ তখন অদ্ভুত, থমথমে শান্ত। হেডলাইট অফ করে রেখেছে ও। উচ্ছ্বাসের সাথে গাড়ি থেকেই নামল জয়। পথ থেকেই ওকে তুলে নিয়েছে উচ্ছ্বাস। 
উচ্ছ্বাস গাড়ি থেকে নামামাত্রই নিজের সিগন্যাল কোডে ওয়্যারলেসে নিচু কিন্তু শক্ত গলায় বলল, 'মেইন গেটের সামনে পজিশন হোল্ড কর। পেছনের গলির বাকিরা, তোরা কাভারিং ফায়ার দিতে দিতে উত্তর করিডোরের দিকে মুভ কর। আমি আর জয় পেছনের সিক্রেট এক্সিট দিয়ে ভেতরে ঢুকব।'

​গেটের লকটা নিজের বুটের লাথিতে ভেঙে ফেলল উচ্ছ্বাস। ভেতরের অন্ধকার প্যাসেজে পা রাখা মাত্রই উচ্ছ্বাস আর জয় প্রথম শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যায়। করিডোরে পাহারায় থাকা একজন ঘুরে তাকানোর আগেই উচ্ছ্বাসের পি*স্ত*ল থেকে পরপর দুটো নিঃশব্দ শট বের হয়। কোনো আওয়াজ না করেই মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ে লোকটা।

​উচ্ছ্বাস আর জয় নিচু হয়ে ওখানকার পিলারের কাভার নিয়ে করিডোরের দেয়ালে পিঠ ঠেকাল। ওখান থেকে বেসমেন্টের দূরত্ব মাত্র বিশ গজ। উচ্ছ্বাস দেখল করিডোরের ওপাশে রক্তাক্ত অবস্থায় মরে পড়ে আছে ওদের কিছু লোক। উচ্ছ্বাস দাঁতে দাঁত চাপল। এক হাতে পিস্তল আর অন্য হাতে অতিরিক্ত ম্যাগাজিনটা লক করে বলল, ' শালা লেজ কাটা শেয়াল একেকটা। রাতদুপুরে আসছে পার্টি মারতে। হতে হতে না হওয়া বউটাকে ফেলে আসতে হলো এই বা*লগুলার জন্যে। মিডিলে মারা উচিত শালাদের। খচ্চর! সম্রাইট্টাতো একটা মাগিবাজ। বাকিগুলারও বউ নাই নাকি?'

উচ্ছ্বাসের কথার ধরণে জয়ের হাসি পেলেও সামলালো নিজেকে। পরিস্থিতি সিরিয়াস।
​উচ্ছ্বাস আর জয় ভাবছিল ওরা দুজনে মিলে পুরো করিডোর ক্লিয়ার করে বেসমেন্টটা লক করে দেবে। উচ্ছ্বাসের নাইন এম এমন আর জয়ের হাতের সাইলেন্সার লাগানো ইউজি সাব-মেশিনগানটা যেকোনো আক্রমণের জবাব দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজ শত্রুদলের পরিকল্পনা ছিল আরও নিখুঁত, আরও ভয়ংকর।

—————

রুদ্রর কাছে সংবাদ পৌঁছনোর পরিবর্তে উচ্ছ্বাসকে উপস্থিত হতে দেখে খানিকটা হলেও ভরকে গিয়েছিল সম্রাট, পলাশ আর কানেকশনে থাকা করিম। উচ্ছ্বাসকে দেখামাত্র মাথায় র*ক্ত উঠে যায় সম্রাটের। বিশ্রী এক গালি ছোড়ে সম্রাট। চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে তীব্র রাগে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে, 'এই বাইনচো*র বাচ্চাটা এইখানে আসছে কেন?'

পলাশ অনেকটা দম আটকে বলল, 'ওর আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না। খবর কানে গেলে আসারই কথা। কিন্তু এখন?'

কানেকশনের ওপাশ থেকে করিম সতর্ক করে বলল, 'রাণী কিন্তু নিষেধ করে দিয়েছিল ঐ বাড়ির কাউকে_'

সম্রাট চোখে আগুনের গোলা দিয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর হঠাৎই ভয়ানক এক বক্রহাসি ফুটে উঠল ওর ঠোঁটে। শীতল স্বরে বলল, 'আমরাতো যাইনি ওখানে, কাউকে কিছু করতে। কেউ যদি নিজে যেচেপড়ে মরতে আসে, তাহলেতো আমাদের কিছু করার নাই। কপাল পোড়া ওর। তাই আজকেই এসেছে এখানে। কী বলেন পলাশ কাকা?'

পলাশ খানিক কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল, ' কী করতে চাইছো?'

এরপর সম্রাট এমন পরিকল্পনা বলল, যা শুনে পলাশ স্তম্ভিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। অতঃপর আপনাআপনিই হেসে উঠল। কিন্তু হাসতে পারল না করিম। কোন এক আশঙ্কায় কাঁপছে তার বুক। কিন্তু নিষেধ করারও কোন উপায় খুঁজে পেলেন না। কারণ উনি বুঝে গেছেন সম্রাট আজ কারো কথা শুনবেনা।

—————

পরিবর্তি ঘটনাগুলো ঘটল খুব দ্রুত। করিডোরের মাঝখানে পলাশ মির্জা সুজন আর তার চারজন লোককে ওপেন পজিশনে রাখল যেন উচ্ছ্বাসরা প্রথমে ভাবে শত্রুরা শুধু ওখানেই আছে। কিন্তু উচ্ছ্বাস আর জয় কভার থেকে বের হয়ে নিখুঁত রিফ্লেক্সে সাইলেন্ট ফায়ার করে দুজনকে মাটিতে নামিয়ে দেয়। সুজনও চতুর খেলোয়াড়ের মতো বাকি দুজনকে নিয়ে ব্যাকস্টেপ করার ভান করে ওদের করিডোরের আরও ভেতরে টেনে নেয়। 

উচ্ছ্বাস আর জয় যখনই করিডোরের মাঝ বরাবর এসেছে, ঠিক তখনই দুই পাশের ওভারহেড ক্যাটওয়াক থেকে সজল বাকি লোকেদের নিয়ে পজিশন নেয়। সজলের ইশারায় ভারী লোহার কোল্ডরোল্ড শাটল গেটগুলো হাইড্রোলিক প্রেসারে নেমে আসে। কোনো বিকট শব্দ হলো না, জাস্ট একটা ভারী ধাতব ঘর্ষণের সুঁই সুঁই শব্দ হলো। আর সেইসঙ্গে সেকেন্ডের ব্যবধান ব্লক হয়ে গেল উচ্ছ্বাসদের পেছনের এবং সামনের পুরো রুটটা। ওরা একটা সংকীর্ণ দশ ফুটের কংক্রিট করিডোরে পুরোপুরি আটকা পড়ে গেল। 
শাটল গেটগুলো পড়ার সাথে সাথেই সম্রাটের ক্যাটওয়াক থেকে ওদের লোকেরা যৌথভাবে ছাদ থেকে স্প্রে করে দিল ক্যাপসিকাম অ্যান্ড টিয়ার ক্লাউড। তীব্র ঝাঁঝালো গ্যাসের ধোঁয়ায় পুরো করিডোর সেকেন্ডের মধ্যে ঝাপসা হয়ে গেল। চোখ ফেটে জল আর নাক-গলা দিয়ে দমবন্ধ করা কাশি আসতে শুরু করল উচ্ছ্বাসের। জয়েরও একই হাল।

অন্যদিকে অপরপাশে থাকা উচ্ছ্বাসের লোকেরা বিপাকে পড়ে পিছু হটতে একপ্রকার বাধ্য হল। ওদের সব সিক্রেট রুট, পজিশন, জিনিসপত্রের খুঁটিনাঁটি সবটা ওদের জানা। কোনভাবেই সার্ভাইব সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়েই জান নিয়ে পালালো তারা। অদ্ভুতভাবে ওদের পালাতে দেওয়াও হলো। কেননা সম্রাটের নির্দেশ সেরকমই ছিল

জয় হতভম্ব হয়ে উচ্ছ্বাসকে বলল, ' ভাই! বের হওয়া উচিত। সম্ভব না। কোথা থেকে যেন সবকিছু একদম গিলে আসছে ওরা। মারা পড়ব এক্কেবারে।'

উচ্ছ্বাস ঐ অবস্থাতেই চোখ ডলতে ডলতে হেসে ফেলল। বলল, 'তবে মরেই বের হব। কিন্তু যতক্ষণ জীবিত থাকব করিজা হাতে থাকবে সবকটার। কথা দিয়েছি রুদ্রকে। আমি জীবিত থাকতে অন্তত এখানে কোন ক্ষতি করতে পারবেনা ওরা।'

জয় দেখল, উচ্ছ্বাসের চোখ পুরোপুরি বন্ধ, গ্যাসে ফুসফুস ছিঁড়ে যাওয়ার কথা প্রায়। তবুও উচ্ছ্বাস যেন আজ অদম্য, অবিচল। নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা করে পজিশন নিল উচ্ছ্বাস। জ্যাকেটের হাতা দিয়ে মুখ চেপে ধরে শব্দের ওপর ভিত্তি করে ওপরের ক্যাটওয়াকের দিকে অবিরত সাইলেন্ট ফা*য়ার করতে শুরু করল। ওপর নিচে আছাড় খেয়ে পড়ল একজনের বডি। কভারে থাকা পালাশ হতবাক হয়ে বলল, 'এইটা কী বাপ! কলিজায় ভয় নাই ছোকরার? কী করছে!'

সম্রাট দাঁতে দাঁত পিষে বলল, ' এই বেজ*ন্মাকে কীকরে ভয় পাওয়াতে হয় তা আমি জানি। ভয় পাইয়ে বাপ, বাপ করাবো একে দিয়ে আমি।'

বলতে বলতেই সজলের দিকে ইশারা করল সম্রাট। ইশারা বুঝে মাথা নাড়ল সজল।
এদিকে জয়ের হাতের অস্ত্রও গর্জে উঠছিল। তখনই সজলের ছোঁড়া সাইলেন্ট বু*লে*টের স্ক্র্যাপ এসে বাউন্স করে জয়ের থাইয়ের খানিকটা মাংস নিয়ে বেরিয়ে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় জয় একটা ছোট গোঙানি দিয়ে উঠল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল নিচে।

উচ্ছ্বাস ঝট করে ঘাড় ফেরা। জয়ের এই অবস্থা দেখে আরও হিংস্র হয়ে উঠল ও। রাগে কড়মড় করে বলল, 'শালাদের থাইয়ের ওপর এতো অফসেশন কেন বুঝিনা। পেছন দিয়ে থাই স্যুপ ভরব যদি হাতে পাই।'

উচ্ছ্বাস ধোঁয়ার মাঝেই ওপরের দিকে লক্ষ্যহীন ফা*য়ার করতে শুরু করল। ঠিক তখনই শাটল গেটের একটা অংশ সামান্য ফাঁকা করে ভেতরে পা রাখল স্বয়ং সম্রাট তাজওয়ার। হাতে কাস্টমাইজড নাইন এমএম ট্যাক্টিক্যাল পি*স্ত*ল।
​ধোঁয়ার কুয়াশার মাঝে উচ্ছ্বাসের ফা*য়ারিং পজিশনটা এক পলকে ট্র্যাক করে ফেলল সম্রাট। উচ্ছ্বাস তখনো অন্ধের মতো ওপরে নিশানা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সম্রাট স্লাইড করে এসে উচ্ছ্বাসের হাতের পিস্তলে লাথি মারল। ​উচ্ছ্বাসের ডানহাতের পিস্তলটা ছিটকে গেল কোথায় যেন। 

কিন্তু উচ্ছ্বাস দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে বামহাতের পিস্তল দিয়ে সম্রাটের বুক লক্ষ্য করে ট্রিগার চাপল। সম্রাটও অবিশ্বাস্য রিফ্লেক্সে মাথা নিচু করে উচ্ছ্বাসের বাম হাতটা ধরে মোচড় দিল। পিস্তল থেকে একটা অন্ধ বুলেট দেয়াল ঘেঁষে বেরিয়ে গেল অলক্ষ্যে। ​গ্যাসের তীব্র ঝাঁঝ আর চোখ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও উচ্ছ্বাস স্রেফ বুনো শক্তির জোরে সম্রাটকে জাপটে ধরে দেয়ালের সাথে সজোরে আছাড় মারল। সম্রাটের মুখ থেকে একটা চাপা গালি বের হলো। গ্যাস মাস্কটা একপাশে সামান্য আলগা হয়ে গেল ওর। নিজের পি*স্ত*লের বাট দিয়ে উচ্ছ্বাসের কপালে সজোরে আঘাত করল। রক্তে ভেসে গেল উচ্ছ্বাসের চোখ। সম্রাট দাঁতে দাঁত চেপে বলে, 'শু*রের বাচ্চা। সবকিছুতে ঠ্যাং বাড়িয়ে আসা লাগে তোর। মাদা*চোদ। আজ তোর ঠ্যাং কতবড় আমি দেখব।'

​কিন্তু উচ্ছ্বাস থামার ছেলে নাকি? ও এক হাত দিয়ে সম্রাটের কলার চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে সম্রাটের কোমরে থাকা ছুরিটা বের করার চেষ্টা করল। আগেই লক্ষ করেছিল সেটা ও। সম্রাটও উচ্ছ্বাসের পেটে পরপর দুটো শক্ত হাঁটুর আঘাত করে দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করল। কিন্তু উচ্ছ্বাস যেন আঠার মতো লেগে থাকল ওর সঙ্গে। দুজন করিডোরের ভাঙা ইটের ওপর গড়াগড়ি খেল একবার। পাঁজরে উচ্ছ্বাসের তীব্র এক ঘুষিতে চারপাশে অন্ধকার দেখল সম্রাট। উচ্ছ্বাস হেসে বলল, 'ঠ্যাংটা আমার বরাবরই লম্বা চান্দু। সবখানে ঢুকে যায়। কিন্তু তোর ঠ্যাংয়ের কী অবস্থা? রুদ্রটা একবার মচকে দিয়েছিল শুনেছিলাম?'

রাগে ভয়ংকর ঘি পড়ল সম্রাটের। কেউই কউকে এক চুল জমিও ছাড়ছিল না। সম্রাট এক হাত দিয়ে উচ্ছ্বাসের গলা চেপে ধরে দেয়ালে পিন করতে গেল। অন্যদিকে উচ্ছ্বাস পা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করল সম্রাটকে।

ঠিক তখনই অন্ধকার আর ধোঁয়ার ভেতর থেকে পেছনের একটা ছোট ইমার্জেন্সি এক্সিট ডোর আলতো করে খুলে গেল। ​উচ্ছ্বাসের পুরো মনোযোগ এবং শক্তি তখন সম্রাটের সাথে মরণপণ লড়াইয়ে। ​ধোঁয়ার আড়াল থেকে খুব নিঃশব্দে এগিয়ে এলো একটি অবয়ব। যার ডানহাতে চকচক করছিল একটা ধারালো, চওড়া শিকারী ছুরি। সম্রাট নিজেও খেয়াল করছেনা লোকটাকে। সেও ব্যস্ত লড়াইয়ে।

হঠাৎই উচ্ছ্বাসের চওড়া পিঠের ঠিক মাঝখানে সজোরে গেঁথে দেওয়া হল ধারাল, লম্বা ছু*রিটা। সেকেন্ডে চামড়া, মাংস কাটা আর হাড় সংঘর্ষের অদ্ভুত আওয়াজ শোনা গেল। 'গোঁত' একটা শব্দ করে থমকে গেল উচ্ছ্বাস। আচমকা যন্ত্রণায় গাল ফুলে উঠল, বিস্ফোরিত হয়ে উঠল চোখজোড়া। হাত আলগা হয়ে এলো। গোডাউনের দেয়ালগুলো যেন চিৎকার করে উঠল পরপর কটা আওয়াজে। 
সম্রাট খেয়াল করা মাত্রই বাঁকা হাসল। গা ছেড়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ওয়ালে। যেন কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে চলে এসেছে সে। ছু*রিটা যতটা নির্মমভাবে ঢোকানো হয়েছিল, ততটাই নির্মমভাবে বের করে নেওয়া হল উচ্ছ্বাসের পিঠ থেকে। আরও একটা বিকৃত আওয়াজ করল উচ্ছ্বাস। জ্যাকেট ভেদ করে ফিনটি দিয়ে বেরিয়ে এলো গরম তাজা র*ক্ত। খানিক দূরে মেঝেতে পড়ে থাকা আহত জয় বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল।

উচ্ছ্বাস বিস্ময় নিয়েই ফোঁপানো শ্বাস নিতে নিতে পেছন ফিরে তাকাল। পেছনে তাকানো মাত্রই দুচোখের বিস্ময় কয়েক গুন বৃদ্ধি পেল ওর। ঠোঁট আপনাআপনি বেশ খানিক ফাঁক হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস গিয়ে ছো*রাঘাতের যন্ত্রণাও ভুলে গেল ও। সেকেন্ড দুই তাকিয়ে থাকার পর ব্যথাতুর অস্ফুট স্বরে মুখ দিয়ে কেবল বেরিয়ে এলো, ' কাকাহ্_'

হ্যাঁ, উচ্ছ্বাসকে ছোরাঘাত করা ব্যক্তি আর কেউ নয়, স্বয়ং জাফর আমের। কেশে উঠল উচ্ছ্বাস। চোখে অবিশ্বাস আর যন্ত্রণা নিয়ে দেখে গেল জাফরকে। জাফর চোখমুখে পাথুরে নির্বিকারত্ব। তা আরও বেশি অবাক করল উচ্ছ্বাসকে। পিঠ দিয়ে গলগল করে র*ক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। হাঁটু ভেঙ্গে আসতে চাইল ওর। দেয়ালে হাত ঠেকিয়ে, কাঁপতে কাঁপতে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল ও। তীব্র যন্ত্রণা গিলে ও ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলল, 'কে_ন কাকা?'

মৃদু কেঁপে উঠল জাফর আমেরের চোখের পাতা। চোখ সরিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে নিয়ন্ত্রণ করল নিজেকে। চোখ ফেঁটে আসা জলটা কোনমতে আটকে বলল, 'সেকারণেই, যেকারণটা তুই কখনও দেখতে পাসনি। যেকারণটা তুই কখনও গুরুত্ব দিসনি। আজ তোর এখানে আসা একদম উচিৎ হয়নি। আমি চাইনি তুই আসিস।'

উচ্ছ্বাস চোখে তখনও অবিশ্বাস। জাফরের এই রূপটা স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে ওর। এ সত্যি হতেই পারে। নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্ন। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হাঁটু ভেঙে বসল উচ্ছ্বাস। জয় 'উচ্ছ্বাস ভাই' বলে চেঁচিয়ে উঠল। করিডোরের দুই পাশের লোহার শাটল গেটগুলো ততক্ষণে পুরো খুলে গেছে। ধোঁয়ার আড়াল পলাশ মির্জাও এসে হাজির হল সেখানে। করিম তাজওয়ার ওর মাধ্যমেই কানেক্টেড আছে লাইনে। পেছন পেছন এসে নিজেদের রাইফেল নামিয়ে উচ্ছ্বাসকে ঘিরে ধরল সজল আর সুজনও। দেখে মনে হল, একটা খাঁচায় বন্দী, রক্তাক্ত, একা হয়ে যাওয়া বাঘকে ঘিরে ধরেছে কয়েকটা শেয়াল।

​উচ্ছ্বাসের কপাল বেয়ে নামা রক্তে ওর চোখের মণি দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। ও ঝাপসা চোখে এক হাত দিয়ে নিজের পিঠের গভীর ক্ষতটা চেপে ধরে, অন্য হাতটা বাড়াল মেঝেতে পড়ে থাকা পিস্তলটার দিকে। পলাশ মির্জা ক্রুর হাসল। বুটের সজোর লাথিতে উচ্ছ্বাসের পিস্তলটা করিডোরের শেষ মাথায় ছুড়ে ফেলে দিল। জাফর গম্ভীর গলায় বলল, 'এসব পাগলামো করিস না উচ্ছ্বাস। কথা শোন আমার। আর কোন আঘাত করা হবেনা তোর গায়ে। তোর চিকিৎসাও করা হবে যদি তুই আমাদরে পথ থেকে সরে যাস। আমাদের সাহায্য করিস। প্রাণে বেঁচে যাবি তুই। এমনিতেও রুদ্র এতক্ষণে ফিরে আসছে চট্টগ্রামের মিশন ছেড়ে। এখানে এসেও কিচ্ছু পাবেনা ও। কোন লাভ হবেনা তোর ওর সঙ্গে থেকে। ওকে সাহায্য করে। আজ অন্তত নিজের কথা ভাব।'

উচ্ছ্বাস যন্ত্রণায় লালচে হয়ে ওঠা চোখে তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকাল জাফরের দিকে। ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ও পুরো কাহিনী না জানলেও এইটুকু বুঝে গেছে এই জাফর ওদের কেউ নেই আর। পর হয়ে গেছে সে। হয়তো অনেক আগেই। ওরাই এতোদিন টের পায়নি কোন অদ্ভুত কারণে। এতোদিন পেছনে অনেক কলকাঠি যে জাফর আমের নেড়েছে তা বুঝতে অসুবিধা হলো উচ্ছ্বাসের।
কিন্তু উচ্ছ্বাস ওদের ভুল ভাঙিয়ে জানালোনা, রুদ্র ফিরে আসছেনা। রুদ্রর কাছে ও এখানকার খবর পৌঁছতেই দেয়নি। জাফর চোখ বুঝে লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, 'জেদ করিস না উচ্ছ্বাস। তোর ভালোর জন্যে বলছি। নয়তো খু*ন করতে হবে তোকে আজ, এখানে।'

' আজ এখানেহ্ মরলেও আমার _ কোন _ আফসোস থাকবে না। জানবো আর যাই করিহ্ নিমক_নিমকহারামি করিনি। যারা আমায় রা_রাস্তা থেকে তুলে এনে বড় করেছে তা_তাদের জন্যেই মরেছি, মীর_মীরজাফর কাকা। যাদের ছায়ার এতোহকাল থেকে এলে তা_তাদেরই পিঠে ছু*রি মারতে গিয়ে নিজেকে ঘেন্না লাগছেনা?'

সজোরে উচ্ছ্বাসের নাক বরাবর ঘুষি মারল জাফর। রোষে ফেটে পড়ে বলল, 'তোর মতো গাধা আমিও ছিলাম একসময়। আমিও এমন চিন্তা করেই নিজের গোটা জীবনটা দিয়ে দিয়েছিলাম এই পরিবারকে। বুঝতে অনেক বেশি দেরী করেছিযে, গাধারা জীবনে কখনও দাম পায়না। সারাজীবন ওদের তলানীতেই পরে থাকতে হয়। যেমন আমি থেকেছি। তুই থেকেছিস।'
 
এ অবস্থাতেও হেসে ফেলল উচ্ছ্বাস। নাক দিয়ে র*ক্ত বের হচ্ছে ওর। ও মাথা দুলিয়ে বলল, 'এখনো গা_গাধাই আছো তুমি।'

আরও একটা ঘুষি পড়লো উচ্ছ্বাসের নাকে। এদিকে করিম তাজওয়ার তাড়া দিচ্ছে যা করার তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে আসার জন্যে। সম্রাট হুংকার দিয়ে জাফরকে বলল, 'এই বা*স্টা*র্ড তোমার কথা শুনবেনা। মানার লোক না না। অযথা সময় নষ্ট করোনা আমাদের।'

জয় কোনমতে দেয়াল উঠে দাঁড়াল। পাগল পাগল লাগছে ওর নিজেকে। কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে মুখ। কী থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছেনা ও, সবটাই ঘোর ঠেকছে। ও কোনমতে নিজের পা টেনে হিঁচড়ে বেরিয়ে দৌড়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল ওখান থেকে। এখানে থেকে কিচ্ছু করতে পারবেনা ও। পারবেনা। পারবেনা উচ্ছ্বাসকে বাঁচাতে। যা করার বাইরে গিয়েই করতে হবে ওকে। সুজন গিয়ে ধরতে চালে বাঁধা দিল পলাশ। বলল, এসব চুনোপুঁটি নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন নেই। তাছাড়া ও গিয়ে খবর দিতে পারলে আরও ভালো। রুদ্র আরও ডেসপারেটলি ফিরে আসবে।

—————

চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে এক নির্জন রাস্তায় রুদ্রর জীপের ড্রাইভিং সিটে বসে আছে রঞ্জু। পনেরো মিনিট আগে রুদ্র নিজের টিম নিয়ে বেরিয়েছে মিশনে। এখন থেকে মিশন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত রুদ্রর সঙ্গে যোগাযোগের আর কোন উপায় নেই।
রঞ্জুকে যেতে দেওয়া হয়নি কারণ ওর শারীরিক অবস্থা। তবে এখানে বসেবসেই বিশেষ কিছু কাজ দিয়ে গেছে ওকে রুদ্র আমের। সময়মতো সে কাজগুলোই করার জন্যেই বসে আছে ও। এরমধ্যেই বেজে উঠল রঞ্জুর ফোনটা। জয়ের কল। হঠাৎ জয়ের কল পেয়ে চমকে উঠল রঞ্জু। এমন সময় জয় কেন! রঞ্জু দ্রুত কলটা রিসিভ করল।

কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকেই জয় কাতর, ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, ' রঞ্জু! রুদ্র ভাই! রুদ্র ভাই কই?'

রঞ্জু ভ্রুকুটি করে বলল, 'রুদ্র ভাইতো অপারেশনে গেছে গা। অহন আর হেরে পাইবা না জানো না?'

আফসোসে চোখ বন্ধ করে ফেলল জয়। আহত পা'টাকে টেনে হিঁচড়ে ও বেরিয়ে এসছিল যাতে কোনভাবে রুদ্র অবধি খবরটা পৌঁছনো যায়। কোনভাবে উচ্ছ্বাসকে বাঁচানো যায়, সেই আশায়। কিন্তু তা আর সম্ভব না। ঘটে গেছে যা অঘটন ঘটার।

রঞ্জু ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বলল, ' আরে কইবাতো কী হইছে?'

জয় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ' উচ্ছ্বাস ভাই!'

' কী হইছে ভাইয়ের?' নড়েচড়ে উঠল রঞ্জু।

প্রায় কেঁদে ফেলল জয়। গোডাউনে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটা বলল রঞ্জুকে। জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথাও বিস্তরে জানাল। সব শুনে থম মেরে রইল রঞ্জু। কপাল বেয়ে নেমে এলো চিকন ঘামের স্রোত। জাফর! জাফর আমের! ওদের এতো প্রিয় সেই কাকা এমনটা করল! করতে পারল! উচ্ছ্বাসের কথা মনে পড়তেই ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল রঞ্জুর। কোনমতে প্রশ্ন করল, 'অহন?'

' উচ্ছ্বাস ভাই গোডাউনে যাওয়ার আগে দুটো প্লান রেডি করেছিলেন। একটা ওদের আটকাতে, আরেকটা মাল চু*রি হওয়া আটকাতে। প্রথম প্লানটা নিজের প্রাণ বাজি রেখে হলেও সল করেছে ভাই। ওনার কথামতো এবার দ্বিতীয় কাজটা করতে হবে আমায়। তা করতে পারলে মালগুলো শিওর বেঁচে যাবে। কিন্তু ততক্ষণে না_'

থেমে গেল জয়। দুশ্চিন্তায় ফুঁপিয়ে উঠল। ওপাশে থাকা রঞ্জুরও সমস্ত শরীর হীম হয়ে এলো একপ্রকার। রুদ্র! রুদ্র আমের একথা জানলে কী হবে?

—————

পিঠ, কপাল, নাক ​দিয়ে সমানতালে র*ক্ত বের হচ্ছে উচ্ছ্বাসের। তবুও ওর ঠোঁটের কোণা হিংস্র জেদ সরছেনা। উচ্ছ্বাস সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক পা এগোতেই সম্রাট আর পলাশ দুজনেই এক ইঞ্চি পিছিয়ে গেল। এই মুমূর্ষু ছেলেটার ভেতরের জান্তব শক্তিটাকে ওরা ভালো করেই চেনে। সোলার সিস্টেমের অন্যতম শক্তি ছিল ও। এতো সহজে দমে যাওয়ার পাত্র ও নয়।

উচ্ছ্বাস হঠাৎ করেই কোনো এক অলৌকিক শক্তিতে নিজের সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে ডিরেক্ট পলাশের কলার লক্ষ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ও এক হাত দিয়েই পলাশকে দেয়ালে চেপে ধরতেই সুজন আর সজল একসাথে ওর ওপর চড়াও হতে গেল। কিন্তু উচ্ছ্বাস কনুইয়ের এক বুনো ঝটকায় সজলকে ছিটকে দিল মেঝেতে।

​'ধর একে! শু*রটার শরীর থেকে এত রক্ত যাওয়ার পরও এত জোর কোত্থেকে আসে?' পলাশ মির্জা দমবন্ধ গলায় ফ্যাঁসফ্যাঁসে আওয়াজে চেঁচিয়ে উঠল।

​সম্রাট তাজওয়ার আর জাফর দুজনে মিলে পেছন থেকে উচ্ছ্বাসের দুই হাত চেপে ধরে দেয়ালে পিন করার চেষ্টা করল। উচ্ছ্বাস মাথা পেছন দিকে ঝুঁকিয়ে জাফরের নাকে সজোরে আঘাত করল। জাফরের চশমা ছিটকে গিয়ে নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করর। সম্রাটকে সজোরে লাথি বসালো তলপেটে। সম্রাট ছিটক খানিক দূরে গিয়ে বিশ্রী গালি ছুড়লো। 
কিন্তু তিন জায়গা দিয়ে গভীরভাবে আহত, পিঠে সম্পূর্ণ একটা ছু*রি ঢোকানোর পর এতোগুলো মানুষের সঙ্গে একা পেড়ে ওঠা কষ্টকর। তবুও একা এই একটা ছেলেকে সামলাতে ওদের তিনজনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

কিন্তু তারা সংখ্যায় বেশি। র*ক্তক্ষরণ হতে থাকা আহত শরীরে বেশিক্ষণ টিকতে পারলনা উচ্ছ্বাস। তিন জোড়া শক্ত হাত আর বুটের ক্রমাগত লাথিতে শেষ পর্যন্ত উচ্ছ্বাসের আহত শরীরটা মেঝের ইটের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। ​জাফর আর পলাশ ওর দুই হাত মাটির সাথে নির্মমভাবে চেপে ধরল। উচ্ছ্বাস তখনো মাথা ঝাঁকিয়ে পাল্টা আঘাত করার চেষ্টা করছে।
সম্রাট তাজওয়ার হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে সজলকে বলল, 'প্যাকেটটা দে।'

​সজল জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে হাই ডোজ ড্রা*গ পাউডারের একটা ছোট সিলড প্যাকেট বের করে সম্রাটের হাতে দিল। সম্রাট হাঁটু ভেঙ্গে বসল উচ্ছ্বাসের সামনে। দাঁত দিয়ে প্যাকেটের মুখটা ছিঁড়ে এক হাত দিয়ে উচ্ছ্বাসের চুল মুঠো করে ধরল। সজলকে বলল, 'রেকর্ডারটা অন কর। এক্ষুনি। এই বাইনচো*** একটা চিৎকারও যাতে মিস না যায়। পুরোটা রেকর্ড করবি।'

সজল দ্রুত তাই করল। জাফর খানিক চমকালো। অবাক হয়ে বলল, 'এসব কী করছো? এমন করোনা। হিতে_'

সম্রাট ধমকে বলল, 'চুপ থাকুন। জেনে বুঝেই জড়িয়েছেন এসবে। ফাও আবেগ **** আসবেন না এখন। আর পিছেও যাবেন না! মাথা গরম আছে এমনিতে। বেশি করলে আপনাকেও টপকে দেব।'

জাফর মুখ থমথমে করে আরও শক্ত করে চেপে ধরল উচ্ছ্বাসকে। পলাশও সবশক্তি দিয়ে জাপ্টে ধরে আছে ওকে। উচ্ছ্বাস শরীরে অবশিষ্ট সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে ঝাড়ি দিয়ে যাচ্ছে ছাড়া পাওয়ার জন্যে। ওর ঝাড়িতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে জাফর আর পলাশ।

সম্রাট পুরো প্যাকেটটা উপুড় করে সেই হে*রোইন ঠুসে দিল উচ্ছ্বাসের নাকে আর মুখে। ​সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও উচ্ছ্বাস পাউডারগুলো ভেতরে যাওয়া থেকে আটকাতে পারলনা। গুঙিয়ে উঠে শরীর মোচড়ালো শুধু। পাউডারটা ফুসফুসে ঢুকতেই তীব্রভাবে কাশতে শুরু করল ও। রাসায়নিকের তীব্র ঝাঁঝ আর ড্রাগের বিষাক্ত থাবায় ওর চোখের মণি দুটো ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এলো। যে স্নায়ুগুলো এতক্ষণ ওকে যন্ত্রণার ওপরেও লড়তে সাহায্য করছিল, সেগুলো অবশ হয়ে যেতে শুরু করল। ওর হাতপায়ের পেশীগুলো ঢিলে হয়ে আসল। ও ক্লান্ত চোখে তাকাল জাফরের দিকে, যে কাকাকে ও নিজের বাবার মতো শ্রদ্ধা করত, ভালোবাসতো। ও কাশতে কাশতে কাতর গলায় অস্ফুট স্বরে বলল, 'এমন করোনা কাকাহ। মেয়েটা অপেক্ষা করছেহ আমার জন্যে। আমার আমার একটা বাচ্চা আসছে পৃথিবীতে। ওদের একটাবার দেখতে দাও। ঐ মেয়েটা জীবনে সবকিছু হারিয়েছে, আমায় হারালে ও সহ্য করতে পারবেনা একদম। আমা_ আমাহর_'

শেষ করতে পারল না উচ্ছ্বাস। মাথা গুলিয়ে গেছে এখন। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই আর। কেমন বিভ্রম, ঘোলাটে ভাব। কথাও কোন তালগোল নেই আর। ও কেমন অদ্ভুত গলায় আটকে আটে বলে উঠল, 'আমার বাচ্চাটাকে দেখতে দেবেনা কাকা? আমার অনেক ইচ্ছা ছিল ওর মুখে বাবা ডাক শোনার। শুনতে দেবেনা? আমার নাজিফা আমার জন্যে অপেক্ষা করবে বউ সেজে। যেতে দেবেনা আমাকে? একবার যেতে দাও। নিজে দেওয়া কথা রেখেই চলে আসব আমি। সত্যি সত্যি আসব। তারপর মেরে ফেলো আমাকে। আমি বাঁধা দেবনা।'

​জাফর শক্ত এক ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে ফেলল। ওনার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই ঠিকই, কিন্তু চোখদুটোয় কেমন অদ্ভুত এক শূণ্যতা আর শীতলতা। সে জামার হাতা দিয়ে নিজের নাকের রক্ত মুছে জাফরের সেই রক্তাক্ত শিকারী ছুরিটা আবার হাতে তুলে নিল। উচ্ছ্বাসকে এবার ধরে রাখল সজল আর সুজন। তবে বেশি জোর খাটাতে হলোনা এবার আর। ড্রা*গের তীব্র ডোজে কিছু করার ক্ষমতা নেই উচ্ছ্বাসের। চারপাশটা গুলিয়ে উঠছে। বিভৎস, বিধঘুটে হয়ে আছে সবকিছু।

জাফর প্রথম উচ্ছ্বাসের নেতিয়ে পড়া শরীরটার ওপর ঝুঁকে বসল। হাত কাঁপছিল না তার, কিন্তু চোখের কোণটা শক্ত হয়ে উঠেছিল। সে খুব ঠাণ্ডা মাথায় ছু*রিটার ফলা গেঁথে দিলো উচ্ছ্বাসের বাম পায়ের উরুর মাংসে। গুঙিয়ে উঠল উচ্ছ্বাস। জাফর আস্তে আস্তে ব্লে*ডটা ভেতরে ঘুরিয়ে দিলো। উচ্ছ্বাসের পুরো শরীরটা ধনুকের মতো একবার ওপরে উঠে আবার আছাড় খেয়ে পড়ল মেঝেতে। হিরোইনের নেশায় ও ভীষণ চিৎকার করতে পারছিল না শুরুতে। শুধু ওর কণ্ঠনালী দিয়ে স্রেফ একটা বুক ফাটানো, ভেজা তীব্র গোঙানি বের হয়ে করিডোরের দেয়ালে ধাক্কা খেল।

​পলাশ মির্জা বিরক্ত হয়ে এগিয়ে এসে জাফরের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিল। এই মিনমিনে আঘাত তার পছন্দ হচ্ছেনা। তার চোখে তখন আদিম হিংস্রতা খেলা করছে। পলাশ কোনো দয়া ছাড়া উচ্ছ্বাসের ডান হাতের তালুর ঠিক মাঝখানে ছুরিটা বসিয়ে সজোরে চাপ দিল। ব্লেডটা হাতের তালু ফুঁড়ে সোজা নিচের কংক্রিটের মেঝেতে গিয়ে ঠেকল। উচ্ছ্বাসের আঙুলগুলো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, মুখ দিয়ে লালা আর র*ক্ত মিশে মেঝের ধুলোয় ছড়িয়ে পড়ল। পলাশ সেখানেই থামল না, ছুরিটা মেঝেতে গেঁথে থাকা অবস্থাতেই হাতলটা ধরে দুবার মোচড় দিল। মাংসে আর হাড়ে ধাতুর ঘর্ষণের সঙ্গে উচ্ছ্বাসের চিৎকারের বিভৎস শব্দে করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

​' অনেক তেজ দেখিয়েছিস না? রুদ্রর পোষা কুত্তা কোথাকার!'

অসহনীয় যন্ত্রণা আর হেরোইনের দমবন্ধকর ডোজকে ছাপিয়েও মৃদু হাসতে চাইল উচ্ছ্বাস। ব্যঙ্গ করে বলল, 'আ্ আর, আর এই কুত্তাকে মারতেই তোদের এতোহ্গুলো খচ্ খচ্চরকে একসাথে হতে হয়েছে।'

উচ্ছ্বাসের এহেন ব্যঙ্গে আরও তেঁতে উঠল পলাশ, 'তাই?এই নে! দেখা তেজ! আজ এখানে আসাটাই তোর সবচেয়ে বড় কাল। রুদ্র ঐখান থেকেতো সব ছেড়ে ছুটে আসবেই। এখানেও এসে দেখবে ওর কিচ্ছু নেই। সব শেষ! সব!'

পলাশ ছু*রিটা টান মেরে বের করে এবার উচ্ছ্বাসের পেটে পরপর তিনবার আমূল গেঁথে দিল। যন্ত্রণায় আবার বিকট চিৎকার করে উঠল উচ্ছ্বাস। প্রতিবার ব্লেড ঢোকার আর বের হওয়ার চপচপ শব্দে চারপাশ একপ্রকার নরক গুলজার হয়ে উঠছিল। মেঝের চারপাশ তখন উচ্ছ্বাসের তাজা রক্তে কাদার মতো মাখামাখি। শরীরের র*ক্ত প্রায় অর্ধেক বেরিয়ে গেছে ওর।

যন্ত্রণায় মাথা ঝুঁকে আসছিল উচ্ছ্বাসের। সম্রাট ওর চুল চেপে ধরে মাথাটা উঁচুতে তুলল। চাপা গলায় বলল, 'মরা মায়ের নামে কসম কেটে বলেছিলাম না, তোকে কুত্তার মতো কু*পিয়ে কু*পিয়ে মারব? কথা রাখব আমি আজ। আর ঐদেখ, তোর এইসবকটা চিৎকার শোনানো হবে রুদ্রকে। পুরোটা। ভাব, কেমন লাগবে ওর তখন। আরও একবার সব হারিয়ে।'

ঝাপসা চোখে চলতে থাকা রেকর্ডারটা দিকে তাকাল উচ্ছ্বাস। ঠিকভাবে দেখতে পেলোনা। ঘোলাটে ঘোলাটে লাগছে সব। তাও কোনমতে বলল, ' ওখানে আমার চিৎকার না। তোদের মৃত্যু ঠিক কতটা ভয়ানক হবে তার পরোয়ানা রেকর্ড হচ্ছে।'

বলতে বলতে কেঁশে উঠল উচ্ছ্বাস। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো আঠালো রক্ত। সম্রাট কুটিল হেসে বলল, 'এখনো এতো তেজ? তুই বুঝতে পারছিস না? সকালের সূর্যদয়টা তুই আর দেখতে পাবিনা? সময় আছে এখনো। পা ধরে মাফ চা আমার কাছে। মৃত্যু দিয়ে দেব সহজে। না হলে আরও বেশি যন্ত্রণা দিয়ে মারব।'

রক্তাক্ত মুখেই দেঁতো হাসল উচ্ছ্বাস। কোনমতে নিজের ধরে রাখা হাতটা দিয়েই মধ্যমা আঙ্গুলটা উঁচিয়ে দেখালো সম্রাটকে। এমনিতেই তেঁতে ছিল সম্রাট। উচ্ছ্বাসের একাজে আরও বেশি তেঁতে উঠল ও। রাগে গজগজ করতে করতে মুচড়ে ধরল ওর ঐ মধ্যমা আঙুলটা। মাটির সঙ্গে ঠেঁসে ধরে বুঁট দিয়ে সজোরে পিষে ধরল। যন্ত্রণায় না চাইতেও কুঁকিয়ে উঠল উচ্ছ্বাস। সম্রাট যেন বেশ তৃপ্তি পেল এতে। ও আরও নিষ্ঠুরভাবে পিষতে লাগল উচ্ছ্বাসের আঙ্গুল। "মট" শব্দে ভেঙ্গে গেল আঙ্গুলটা। যন্ত্রণায় শরীর মুচড়ে ছটফট করে উঠল উচ্ছ্বাস। কিন্তু কিছু করার নেই ওর। ড্রা*গের ওভার ডোজে কাবু ও এখন, তারওপর দুজন ধরে রেখেছে ওর প্রায় অকেজো শরীরটা।

সম্রাট একহাতে উচ্ছ্বাসের গাল খামচে ধরে বলল, 'রুদ্রর মানুষকে যন্ত্রণা দিয়ে মারতে ভালো লাগে তাইনা? আমারও লাগে। দেখি আজ! কার ধরণটা বেশি জমপেশ হয়।'

উচ্ছ্বাস নিভু নিভু চোখে আক্রোশ নিয়ে চোখ তুলে তাকল। সম্রাটের দিকেই তাকাল কি-না বুঝতে পারল না। সবটাই ঘোলাটে, নিভুনিভু। শুধু অস্ফূট স্বরে বলল, 'বাইনচো*'

সম্রাটের চোখে তখন আগুন জ্বলে উঠল। মানুষের চাহনী নেই এখন সেখানে আর। ও ছুরিটা উল্টো করে ধরে প্রথম কো*প বসাল উচ্ছ্বাসের ডান গালে। ধারালো ব্লেডটা গালের মাংস চিরে চোয়ালের হাড় চলে গেল। উচ্ছ্বাস 'মাগো!' বলে চিৎকার করে উঠল। কতবছর পর ডাকল ও নিজের মাকে নিজেই থাকে। চেহারাটাওতো ঠিক করে মনে নেই ওর ওর। বাকিসবতো বাদই। সজল আর সুজন আর ধরে রাখতে পারল না উচ্ছ্বাসকে। ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল ওর লম্বা, চওয়া শরীরটা। কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে র*ক্ত ছিটে ছিটে বের হল। হিরোইনের তীব্র ওভারডোজের মধ্যেও এই পৈশাচিক নরকযন্ত্রণা ওর স্নায়ুগুলোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলল যেন। ঝাঁপসা সবকিছু আরও বেশি ঝাঁপসা হয়ে গেল। চোখের সামনে কেবল আবছাভাবে ভেসে উঠল পাগল এক মহিলার অবয়ব। উস্কোখুস্কো চুল, নোংরা ছেড়া শাড়ি। আবলতাবল বুকছে। খুব সামান্য হাসি ফুটে উঠল উচ্ছ্বাসের ঠোঁটে। 
এরপর আবার দেখতে পেল এক গোলগাল মুখের মিষ্টি দেখতে রমনীকে। কখনও সাদা এপ্রোনে, কখনও পরিপূর্ণ গর্ভবতী রূপে। মেয়েটাকে নিজের বউ রূপে দেখার ভীষণ সাধ ছিলো উচ্ছ্বাসের। সে সাধ মিটল না আর। বাচ্চাটার মুখে বাবা ডাকও আর শোনা হলোনা। বাচ্চাটা কী এতক্ষণে ভূমিষ্ঠ হয়েছে? ছেলে নাকি মেয়ে? কেমন হয়েছে দেখতে? নাজিফার মতোই গোলগাল মুখের? মেয়েটা কী সত্যিই আজ বউ সেজে অপেক্ষা করবে ওর জন্যে? কিন্তু ওতো ফিরে যাবেনা আর। পাগলিটা খুব অভিমান করবে হয়তো। ওকে ঠক, প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক ভাববে। যে কোনদিন কথা রাখেনি। সবসময় মাঝপথে হাত ছেড়ে পালিয়েছে। এবারতো একেবারেই পালাচ্ছে। আর ফিরবেনা, কোনদিন না।

দু'কদম পিছিয়ে দাঁড়াল জাফর আমের। চোখ সরিয়ে নিল উচ্ছ্বাসের থেকে। তারপক্ষে আর সম্ভব হচ্ছেনা দেখা। চোখের ভেতরটা ছলছল করছে তার। বারবার ভেসে উঠছে সেই দশ বছরের বিভ্রান্ত ছোট্ট উচ্ছ্বাস থেকে আজকের এই উনত্রিশ বছরের পরিপূর্ণ উচ্ছ্বাসকে। যে এক পরিবারের জন্যে, এক রুদ্র আমেরের জন্যে নিজের আসন্ন সুখি পরিবার, দীর্ঘ একটা জীবনের মোহ ত্যাগ করে সানন্দে মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে। জাফর কম্পিত স্বরে বলল, 'তোর কোন ক্ষতি চাইনি আমি। কারণ তুই আমারই মতো এক ভুক্তভোগী। কিন্তু আজ এখানে না আসলেই পারতি। জীবনে একটাবার অন্তত স্বার্থপর হতে পারতি। বেঁচে থাকতি তুই।'

উচ্ছ্বাস জাফরের কথা শুনতে পেলো কি-না বোঝা গেলোনা ঠিক। কেবল ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে রইল জাফরের দিকে। ও শুধু দেখতে পাচ্ছে সেই জাফরকে যে ছোটবেলায় ওর সঙ্গে খেলতো, কৈশোরে বন্ধুর মতো সব কথা শুনতো, যৌবনে ছায়ার মতো মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতো। ওর সেই জাফর কাকা, মীরজাফর কাকা নয়।

পলাশ উচ্ছ্বাসের কাঁধ ধরে টেনে চিৎ করে শোয়ালো। নিজের মায়ের নামে করা কসম রাখল সম্রাট। বুনো উন্মাদনায় ছু*রিটা দিয়ে উচ্ছ্বাসের দুই কাঁধে, গলায় আর বুকের ওপর অনবরত কু*পিয়ে যেতে লাগল। প্রতিটা কো*পের সাথে সাথে চামড়া আর মাংস ছিঁড়ে ছিটকে আসছিল র*ক্তের ফোয়ারা। সম্রাটের পুরো মুখ আর জ্যাকেট তখন উচ্ছ্বাসের তাজা রক্তে মাখামাখি। কিন্তু হাতের গতি কমছিল না ওর। দীর্ঘদিন মনে মধ্যে পুষে রাখা সকলের প্রতি রাগ, ক্ষোভ, জ্বালা সব মেটাচ্ছে ও এক উচ্ছ্বাসের ওপর। ক্রোমাগত বিরবির করে বলছে, 'নে! দেখ! সবজায়গায় বাঁ হাত ঢোকাতে গেলে ফল কী হয় দেখ!'

সম্রাটের সেই বিড়বিড়ানো আওয়াজ মিলিয়ে গেল উচ্ছ্বাস যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদের তলে। উচ্ছ্বাসের শরীর থেকে প্রায় সবটুকু র*ক্তই যেন বেরিয়ে গেছে। করিডরজুড়ে বইছে রক্তের স্রোত।
সম্রাট দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করতে করতে উচ্ছ্বাসের বুকের পাঁজরের ওপর পরপর কয়েকটা কো*প মারল। হাড় ভাঙার বীভৎস মটমট শব্দে করিডোরটা যেন নরকের চেয়েও জঘন্য হয়ে উঠল। এ পর্যায়ে আর কিছু অনুভব করতে পারল না উচ্ছ্বাস। কেবল কয়েকবার ঝাঁকি খেল শরীরটা। ব্যথা, যন্ত্রণা, ড্রাগের নেশা সব অনুভূতি মিলেমিশে ভোঁতা হয়ে গেল। ঝিম ধরে ঠান্ডা হয়ে এলো গোটা শরীর। মাথার ভেতর সব গুলিয়ে গিয়ে বাস্ত থেকে বহু দূরে টেনে নিয়ে গেল ওকে। ও আবার দেখতে পেল সেই পাগলী মহিলাটাকে, সেভাবেই। রাশেদ আমের। সেই তেজে পরিপূর্ণ মুখ, বজ্রকন্ঠি গম্ভীর আদেশ, ভালোবাসাময় কড়া শাসন। কুহু, জ্যোতি সবার সঙ্গে কাটানো সেই সুখের মুহূর্তগুলো। বউমণি! ওর বউমণি! ওর ঐ এলোমেলো মস্তিষ্ক আজও বিশ্বাস করে ওর সঙ্গে হওয়া আজকের এই ঘটনায় ওর বউমণির হাত নেই। থাকতেই পারেনা। শেষবারের মতো সেই কফিটাওতো খাওয়া হলোনা।

ওর আবার নজিফার কথা মাথায় এলো। মনে পড়ল, বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো নাজিফার কপালে চুমু খেয়ে আসার মুহূর্তটা। নাজিফার সেই কাতর চাহনী, করুণ অনুরোধ, 'প্লিজ যেওনা।' 

হঠাৎ কেঁদে ফেলতে ইচ্ছা করল উচ্ছ্বাসের। নাজিফাকে যেকোন মূল্যে জানাতে ইচ্ছা হল, 'আমি তোমাকে ঠকাইনি নাজিফা। বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আমি সত্যিই ফিরতে চেয়েছিলাম। নিজের সবটা দিয়ে ফেরার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এই পোড়া কপালটা আরও একবার হেরে গেছে। যে সুখের পেছনে আমি সারাজীবন ছুটেছি। সে সুখকে হাতের নাগালে রেখেই আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আমায় ক্ষমা করো, ঝাঁসির রাণী।'

কিন্তু এসব বলাতো দূর, মেয়েটাকে আর কোনদিন দেখতে পাবেনা উচ্ছ্বাস। কোনদিনও না।

আবার সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো উচ্ছ্বাসের। কিছুক্ষণ আর কিচ্ছু দেখতে পেলোনা। সবটাই কালো, শূণ্য। সেই অন্ধকারে যখন আবার আলোকিত হল, তখন ধীরে ধীরে দেখতে পেলো দশ এগারো বছরের একটি ছেলেকে। এলোমেলো চুলের, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের এক তেজস্বী এক ছেলে। সেই ছাদে প্রথম দেখাতেই কড়া ধমক খাওয়া। সিঁড়িতে পা পিছলে গেলে হাত ধরা। তারওপর যতবার ঐ ছেলের পা পিছলেছে ততোবার হাত ধরে সামলেছে উচ্ছ্বাস। কোনবেলা না খেলে, ঠিক পরেরবেলাই নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে। একসঙ্গে কখনও ছাদে বসে, কখনও জিপের ওপর উঠে, কখনও বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে পাশাপাশি সিগারেটের পর সিগারেট টেনেছে। কখনও নিঃশব্দে, কখনও কথা বলে নিজেদের সুখ, আনন্দ, বিষাদ আর দুঃখ ভাগ করেছে। একসঙ্গে হো হো করে হেসেছে। শৈশব, কৈশর, যৌবন সবকটা ধাপে একে অন্যের সঙ্গে সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু আজ থেকে রুদ্র আবার একা হয়ে যাবে। একদম একা।
ফিরে এসে যখন রুদ্র দেখবে উচ্ছ্বাস আর নেই। তখন কী কষ্ট পাব ও? নাকি তাচ্ছিল্য করে সিগারেটে দুটো টান দিয়ে বলবে, ভালোই হয়েছে। একটা বদঅভ্যেস গেছে। নাকি ভেঙে পড়বে ওর প্রাণের ভাইটা। যার সঙ্গে ওর রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু যা আছে, তা যেকোন রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বেশি কিছু। এমন কিছু, যা কেউ কোনদিন বুঝবেনা। রুদ্র আমের উচ্ছ্বাসের রক্তের কেউ না হওয়া সত্ত্বেও, উচ্ছ্বাস নিজের সবটুকু রক্ত তার জন্যে উৎসর্গ করে দিল আজ। 

রুদ্র আমের জানলে কতট ভেঙ্গে পড়বে? উচ্ছ্বাস কল্পনা করল সেই ভঙ্গুর রুদ্র আমেরকে। নিঃসঙ্গ, ভেঙ্গে পড়া, নিঃস্ব রুদ্র হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে। বেসামাল সে। কিন্তু উচ্ছ্বাসতো চলে যাচ্ছে, কে ধরবে রুদ্রর হাত, কে সামলাবে ছেলেটাকে? 

​উচ্ছ্বাসের ভালো চোখটা দিয়ে শেষ এক ফোঁটা নোনা জল আর রক্ত মিশে গাল বেয়ে মেঝের রক্তগঙ্গার সাথে মিশে গেল। ও আর তাকাতে পারছিল না। নিজের র*ক্তা*ক্ত নিস্তেজ হাতটা কোনমতে শেষবারের মতো একটু শূন্য তুলল। যেন ও দূর থেকেই রুদ্রর হাতটা ধরার শেষ চেষ্টা করছে। টেনে তুলে বলতে চাইছে, 'শালা! নেতিয়ে পড়ছিস কেন? আছিতো আমি। তোর ঘাড় থেকে এতো সহজে নামবো ভেবেছিস? এতো সহজে না।'

সম্রাট সুযোগ দিলোনা উচ্ছ্বাসকে আর। ছুরিটা দুই হাতে শক্ত করে উঁচিয়ে ধরল। কোনো দয়া কিংবা দ্বিধা ছাড়াই শরীরের সব শক্তি দিয়ে ছুরিটা গেঁথে দিল উচ্ছ্বাসের বুকের খানিক বাঁ পাশে। ​পাঁজর পুরো চুরমার করে ব্লেডটা ঢুকে গেল হৃদপিণ্ডে। অন্তিম এক মৃদু গোঙানী দিয়ে ঝাঁকি খেয়ে উঠল উচ্ছ্বাসের গোটা শরীর। আঙুলগুলো আলগা হয়ে মাটির ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল ধীর গতিতে। 
চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলল জাফর। পলাশের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুঁটে উঠল। বিজয়ের স্বস্তি সজল আর সুজনের ঠোঁটেও। কিন্তু কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেনা লাইনে থাকা করিম তাজওয়ার। অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করছে সে। এদিকে হাঁপাতে হাঁপাতেই বাঁকা হাসি ফুটল সম্রাটের ঠোঁটে। হেলতে-দুলতে উঠে দাঁড়াল। ছু*রিটা বের করল না উচ্ছ্বাসের বুক থেকে। চেহারা দেখে মনে হল যেন কোন যুদ্ধ জয় করেছে। 

​উচ্ছ্বাসের ঘোলাতে চোখে তাকিয়ে শেষ একবার দেখে নিতে চাইল এই পৃথিবীটাকে। কিন্তু পৃথিবী ওকে সেই সুযোগ দিলো। মৃত্যুর শেষ যন্ত্রণায়ও অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল, 'ভা-ভাই।'
অতঃপর একটা তীব্র, জান্তব ঝাঁকুনি দিল উচ্ছ্বাসের শরীর।নাকের কাছের রক্তাক্ত ধুলোগুলো খানিক উড়ে গেল এদিক-ওদিক। সকল দায়িত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা থেকে মুক্ত হয়ে নিথর হয়ে গেল উচ্ছ্বাসের উনত্রিশ বছর বয়সী দেহটা। চিরকালের মতো। 

পুরো করিডোর জুড়ে তখন শ্মশানের মতো নীরবতা। করিডরের গোটা ফ্লোরজুড়ে উচ্ছ্বাসকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে তখন তিন পশু। পলাশ অকারণ আক্রোশে মুখভর্তি একদলা থু থু ছুড়ে দিল উচ্ছ্বাসের দেহের ওপর। সম্রাট গা দুলিয়ে হাসল তা দেখে। জীবনে প্রথমবার এক লোকের একটা কাজ মনমতো হয়েছে ওর। তৃপ্তিতে ভরে উঠল মনটা। আজ খুশি ও, ভীষণ খুশি। নিজের প্রতিজ্ঞা ও রেখেছে। রুদ্র আমেরকে ভয়ংকর শিক্ষা দিতে পেরেছে। 
সম্রাট নিজেও কম গেলোনা। সজোরে এক লাথি বসালো উচ্ছ্বাসের মৃতদেহে। উচ্ছ্বাসের মৃত শরীরটা খানিকটা দুলে উঠল তাতে। সজল আর সুজনও তাতে শায় দিয়ে হাসল। জাফর খানিক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখল পিশাচগুলোকে। ওরা কেউই টের পেলোনা, করিডরের মেঝের ঐ র*ক্তনদীতে তখন তিন তিনটে সাম্রাজ্য পতনের গল্প লেখা হয়ে গেছে।

রাত তখন চারটা পঞ্চান্ন। একদিকে নাজিফা প্রসবের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। অন্যদিকে পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো বিদায় নিল এক ঠক, প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক। যে সারাটাজীবন কেবল ঠকিয়েই গেছে। নিজেকে!
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp