ফজরের আজান এখনও দেয়নি। বিশ্রামাগার ফাঁকা। মৌমিতা ত্যক্ত মুখে একটা বাল্বের নিচে গিয়ে দাঁড়ালো। গত চব্বিশ ঘণ্টায় একবারও চিরুনি পড়েনি মাথায়, এখন চুল আঁচড়াতে গিয়ে আরও হতাশ হয়ে গেলো সে। মুঠোয় মুঠোয় চুল উঠে যাচ্ছে! হাত দিয়ে ছোঁয়াই যাচ্ছে না। পাশের ময়লা ফেলার ঝুড়িটা যেন তার চুল দ্বারাই ভরে উঠেছে।
মেয়েটার চোখ জ্বালা করতে লাগলো। আজকাল এতো সামান্য কারণে কান্না আসছে কেন, কে জানে? সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। সিঁথিটা এখনও তেমন চওড়া মনে হচ্ছে না। তবে যদি এভাবেই চুল ঝরতে থাকে, বড় পার্থক্য আসতে সময় লাগবে না।
মৌমিতা বড় একটা শ্বাস নিলো। নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হবে এবার। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না। শুধু দুশ্চিন্তাটাই হচ্ছে ভালোভাবে। শরীর আর চেহারা তো অনেক আগেই ভাঙতে শুরু করেছে। কিন্তু শখের চুলগুলোকে সে এভাবে হারাতে চায় না।
বাদলের উপর খুব রাগ হলো হঠাৎ!
আজ ভালোবাসা নিয়ে তার সেই বড় বড় বুলি কোথায়? সে নিজেই বা কোথায়? মৌমিতার অবস্থা কি জানে? হয়তো ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। সেটা অন্তত জানিয়ে যাবে না? কিন্তু... এতো সহজে ছেড়ে যাবে?
মৌমিতা পায়চারি করতে করতে কোনোমতে একটা হাত খোঁপা বাঁধলো। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে বললো, “আমার মধ্যে যদি এক ফোঁটাও আত্মসম্মান বাকি থাকে বাদল, আমি আর কোনোদিনই তোমার খোঁজ করবো না। কখনোই না। আর তুমিও কখনো জানবা না, আমি কেমন আছি। জেনে লাভ কী? তোমার কিছু যায় আসে? মনে তো হয় না। আমি মরে গেলেও জানতে পারবা না—”
আজান দিতে শুরু করেছে। মৌমিতা চুপ করলো। খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে ওড়নাটা টেনে দিলো মাথায়।
একাধিক মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে, পাখির কিচির মিচির শোনা যাচ্ছে সেগুলোর সাথে। ঘোর লাগা একটা পরিবেশ। অল্প সময়ের ব্যবধানেই সব আওয়াজ প্রায় শান্ত হয়ে এলো। মৌমিতা জামার হাতা গুটাতে লাগলো ওজু করার উদ্দেশ্যে। হতাশ ভঙ্গিতে আরেকবার আয়নায় দৃষ্টিপাত করে সে বললো, “তুমি না প্রতিবারই খুঁজে বের করো আমাকে? এবারও সেটা তোমার দায়িত্বে থাকলো। আমার তো সাধ্য নাই তোমাকে খুঁজে বের করার। আর চেষ্টাও করবো না। এতো কিছুর পরেও যদি আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, আমার নাম মৌমিতা খন্দকার না।”
—————
রাবেয়া বিছানার চাদর ঠিকঠাক করেছেন। জায়নামাজ দুটো গুছিয়ে রেখেছেন চেয়ারের উপরে।
বাইরে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। জানালার পর্দা সরিয়ে তিনি মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন, “কিছু খাও মৌ।”
“ওরা কখন আসবে? এতোক্ষণ লাগার কথা না।”
“বললো তো ফজরের দিকে পৌঁছাবে। আমি এতোবার বললাম, সকাল সকাল রওনা দাও। সেটা হলো না। রাতের ট্রেনে আসলো—” রাবেয়া একটু সরে এলেন, নিচুস্বরে বললেন, “মার্জুর জন্য নাকি সকালের টিকেট বাতিল করেছে। ও আবার চিন্তা করতে করতে স্বাস্থ্য খারাপ করে ফেলেছে। অসুস্থ হয়ে গেছে আমার মেয়েটা।”
মৌমিতা ক্ষোভ দেখালো, “মামাকে তো বোঝালাম, ওকে যেন আগে আগে না জানায় কিছু। তবু জানিয়েছেন! কী দরকার ছিলো?”
“তুমি নিজের দিকে তাকাও তো একবার। একেবারে হাড্ডি ছাড়া কিছুই নেই গায়ে। থামো দেখি, একটু বিস্কুট খেয়ে পানি খাও—”
“মও মা?”
মারুফের ঘুম ভেঙেছে। তার ডাক শুনে মেয়েটা উঠে এগিয়ে গেলো, “জ্বী আব্বা?”
“কাও।”
“হ্যাঁ, খাচ্ছি।”
মৌমিতার মনে হলো, কেউ আসছে; ভোরবেলার নিস্তব্ধতা চিরে পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সে পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকায়। রিপন ভেতরে ঢুকেই উচ্চস্বরে সালাম দেয়, “আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই।”
মারুফ একটু চমকে গেলেন, পরমুহূর্তেই খুব শিশুসুলভ ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন। অস্পষ্ট কিছু উচ্চারণ করলেন, হয়তো সালামের উত্তর দিলেন। রিপনের হাসি ম্লান হয়ে গেলো।
মার্জিয়া তাকে পাশ কাটিয়ে একটু সামনে এসে দাঁড়ায়, আর এগিয়ে যেতে পারে না। মারুফ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছেন। ভদ্রলোককে এক ঝলক দেখেই মার্জিয়ার গলা শুকিয়ে যায়। সামান্য ‘আব্বা’ শব্দটা বলতে গিয়ে তার জিহ্বা যেন লেপ্টে গেলো মুখের ভেতর। তার আব্বার এই হাল! গোলগাল চেহারাটার ছিটেফোঁটা নেই। চোখ ফুলে গেছে। মুখে স্পষ্ট অসুস্থতার ছাপ।
মার্জিয়া অবিশ্বাস নিয়েই হা করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঐ চৌকিতে বসে থাকা লোকটা তার আব্বা হতে পারেন না! কোনো এক অপরিচিত মুমূর্ষু ব্যক্তি যেন মারুফ খন্দকারের ছদ্মবেশ ধারণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কী ভয়ানক অসহায় আর নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে তাকে!
মেয়েটার মুখ দেখেও তার মনের অবস্থা মারুফ বুঝলেন না। তিনি বরং খুশিই হলেন, বিগলিত হেসে বললেন, “ছোতো মা?”
“খোদা!”
মার্জিয়া দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো। মৌমিতা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে না ধরলে সে হয়তো মেঝেতেই পড়ে যেতো। রাবেয়া ছুটে এলেন। মেয়েটা ভাঙা গলায় বললো, “আম্মা! আব্বা কথাও বলতে পারেন না? কেমনে হলো এইরকম?”
রাবেয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “স্ট্রোক হয়েছে।”
“স্ট্রোক?”
তিনি বিড়বিড় করে সতর্ক করলেন, “তোমার আব্বার সামনে কান্নাকাটি করতে ডাক্তার নিষেধ করেছে।”
মার্জিয়া সঙ্গে সঙ্গেই চুপ করলো। এভাবে জোর করে কান্না থামানোয় তালুতে চাপ লাগলো, সে কেশে উঠলো। রাবেয়া তাকে ধরে পাশের চৌকিটার দিকে নিয়ে গেলেন, “আসো তো, এখানে বসো।”
রিপনের হতভম্ব ভাবটা একটু কাটতেই সে মৌমিতার দিকে তাকায়, “মৌ? খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছো নাকি?” উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে মারুফের দিকে এগিয়ে যায় কয়েক পা, “দুলাভাই, কতোদিন পর দেখা হলো। ভালো আছেন আপনি?”
মারুফ মাথা দুলিয়ে জানালেন, তিনি ভালো আছেন।
“কীভাবে হলো এইসব? অযথা চিন্তা করার জন্যেই এরকম অসুখ হয়—”
মারুফ হাত নেড়ে কথা বলতে লাগলেন। অস্পষ্ট সব কথা। রিপন বোঝার চেষ্টা করলো। ব্যর্থ হলো। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে বললো, “কী বলেন, কিছুই বুঝলাম না!”
রাবেয়া ক্ষুব্ধ হয়ে তাকালেন ছোট ভাইয়ের দিকে। তবে মারুফ হেসে ফেললেন। তার দেখাদেখি রিপনও হাসলো, “আপনি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবেন দুলাভাই। চিন্তা নিয়েন না। দেখেন, আপনার পিচ্চি পিচ্চি মেয়ে দুইটা কতো বড় হয়ে গেছে। আপনি যেগুলো নিয়ে চিন্তা করেন, সবই ঠিক হবে আল্লাহর রহমতে—”
এ সময় রতন ঢুকলো কেবিনে। বিস্ময় প্রকাশ করলো, “রিপন মামা কখন আসলেন?”
“এই তো, একটু আগেই পৌঁছালাম।”
“ওহ।” রতন ঘুরে তাকায় মার্জিয়ার দিকে, “তোমার কী অবস্থা, মার্জু?”
মেয়েটার কানে প্রশ্ন পুরোপুরি পৌঁছানোর আগেই রাবেয়া বলে উঠলেন, “এক কাজ করো রতন। তুমি বরং বাসায় যাও। অনেককিছু করেছো, অনেক ধকল গেছে। এখন রিপন আছে তো, সমস্যা নেই। তুমি যেতে পারো।”
ছেলেটা মাথা নাড়লো। মনে মনে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট হলো সে। শ্যালক উড়ে এসে জুড়ে বসেছে বলে ভাগ্নেকে তাড়িয়ে দিতে হবে! সে দ্বিরুক্তি করলো না তবু, কেবিন থেকে বের হওয়ার আগে মারুফের দিকে এক ঝলক তাকালো।
রাবেয়া পাশে বসে থাকা কাতর মেয়েটির বাহুতে আলতো চাপ দিলেন, “মা, হাত-মুখ ধুয়ে আসো। ব্যাগটা রাখো। যাও। মৌ? নিয়ে যাও তো ওকে।”
দুই বোনের চোখাচোখি হলো। আপার শুকিয়ে যাওয়া মুখখানি দেখে মেয়েটার চোখে আবার পানি চলে এলো। যে ঠোঁট উল্টে চোখ ঘষতে ঘষতে উঠে দাঁড়ালো। কাছে এসে খুব আদুরে ভঙ্গিতে তার বাহু জড়িয়ে ধরলো মৌমিতা, “আয়।”
মার্জিয়া বড় বোনের সাথে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে। গামছা রয়ে গেছে ব্যাগের ভেতর। হাত-মুখ ধোয়ার পর সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে।
“কেবিনে চল, একটু রেস্ট নে।”
“হু।” বলে মার্জিয়া সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আর কোনো নড়াচড়ার লক্ষণ দেখায় না। মৌমিতা বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়েও পেছনে ফিরে তার দিকে তাকায়, “কী হলো?”
“আপা, আমি ওখানে যাবো না।”
“কেন?”
“আমি আব্বাকে ঐ অবস্থায় দেখতে পারছি না। আমার ভয় লাগছে।”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো, “ভয় লাগার কী আছে? চেহারা খারাপ হয়েছে জন্য?”
“না!” মেয়েটা চমকে উঠে বললো, “দেখলা না, আব্বা কীভাবে কথা বললেন? ওভাবেই যদি বলতে থাকেন, আমি তো কান্না আটকাতে পারবো না। কিন্তু আব্বার সামনে তো কান্না করা যাবে না।”
মৌমিতা ব্যথিত দৃষ্টিতে বোনটার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। কাছে এসে তার হাতদুটো ধরে বললো, “কিন্তু আব্বার সামনে তো যেতে হবে। নাহলে উনি সারাদিন খুঁজবেন। আমি একটু এদিক-ওদিক গেলেই 'মা' 'মা' বলে খুঁজতে শুরু করে দেন। খুঁজে না পেলে একদম মাথা খারাপ হয়ে যায় চিন্তায়—”
মার্জিয়া ভেজা হাতেই চোখ মুছলো, “আচ্ছা চলো।”
সকাল হয়ে গেছে এতোক্ষণে, জানালা দিয়ে দিনের আলো আসছে। হাসপাতালের করিডোরে মানুষজনের চলাচল বেড়েছে। দেয়াল ঘেঁষে ক্লান্তভাবে হাঁটতে হাঁটতে মার্জিয়া প্রশ্ন করলো, “কবে হয়েছে স্ট্রোক? তোমরা তো কিছুই জানাওনি আমাকে।”
“তুই ওখানে একা একা চিন্তা করবি, তাই জানাইনি।”
“এখন বলো, কী হয়েছিলো?”
“বাদল এসেছিলো বাড়িতে, আব্বার সাথে কথা বলেছে। তার পরের দিন থেকেই আব্বা অসুস্থ।”
মার্জিয়া থেমে দাঁড়ায়, ভ্রু কুঁচকে বলে, “কথা বলেছে? কী কথা?”
“জানি না। আব্বাকে জিজ্ঞেস করার মতো অবস্থা নেই। আর, বাদলের সাথে আমার কথা হয়নি।”
“ফোন করে শোনো।”
“তোর মনে হয়, আমি ফোন করিনি? ও কোথায় যে থাকে, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”
“তাহলে? এখন কীভাবে শুনবা?”
“আমি একটু একটু বুঝতে পারছি, কী নিয়ে কথা হতে পারে।”
“কী নিয়ে?”
“ও তো স্টুডেন্ট। চাকরি-বাকরি করে না। আব্বা বোধহয় এটাই বলেছেন। ওর গায়ে লেগেছে। তারপর ও নিশ্চয়ই এমন কোনো উত্তর দিয়েছে, যেটা শুনে আব্বা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন, অসুস্থ হয়ে গেছেন।”
“হতে পারে। অন্য কারণও থাকতে পারে আপা। আব্বা তো অনেকদিন ধরে অসুস্থ। ভালোভাবে ডাক্তারও দেখানো হয়নি।”
“হুম।”
“বাদল ভাই তাই বলে একেবারে নিখোঁজ হয়ে গেলো?”
“হবে না? এটা ছাড়া আর কী-ই বা পারে!”
“আরে, চিন্তা করো না। বাদল ভাই তো আর জানে না, তুমি এখানে। জানলে ঠিকই খোঁজ নিতো। অযথা ভুল বুঝছো—”
“আমি যে এতোবার করে কল দিলাম, সেটা তো ধরতে পারতো একবার।”
“কী আর করার?”
মৌমিতা দমে গেলো। এতোক্ষণে বাদলের পক্ষ নিয়ে কথা বলার মতো একটা মানুষ পেয়ে, তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত দ্বিধা, প্রশ্ন আর অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলো। ছোট বোনটার কাছে সে আরেকটু সান্ত্বনা আশা করছিলো। কিন্তু মার্জিয়ার এমন হাল ছেড়ে দেওয়া দশা দেখে আশাহত হলো। বিড়বিড় করে বললো, “কোথায় আছে, কেমন আছে–কিচ্ছু জানি না।”
মার্জিয়া অনুমান করলো, আপাকে এই বাদলের প্রসঙ্গ থেকে বের করা আপাতত সম্ভব হবে না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দায়সারা ভঙ্গিতে বললো, “হয়তো কোনো ঝামেলার মধ্যে আছে।”
“ঝামেলা না থাকলেও নিজেই ঝামেলা তৈরি করবে ও! তুই তো ওকে চিনিস না।”
“হুম। দেখলামও না একদিন। অথচ কতো বছরের সম্পর্ক তোমাদের।”
“একটা ছবি চেয়েছিলাম।” মৌমিতা মাথা নিচু করে চাদরের পাড় খুঁটতে থাকে, “তোর কথা বলেছিলাম, যে তুই দেখতে চেয়েছিস।”
“ছবি দিয়েছে?”
“না। পরে দিতে চেয়েছে। আবার বলে, ওর কাছে ছবি থাকেই সবসময়। সবখানে ইন্টারভিউ দিয়ে বেড়ায়! বাদ দে...” মার্জিয়ার হাত ধরে মৌমিতা কেবিনের দিকে রওনা দেয়, “আব্বাকে খাওয়ানোর সময় হয়ে গেছে।”
“তোমার নাকি বিয়ের আলাপ চলছিলো?"
“হুম।”
আপার কণ্ঠে অনীহা টের পেয়ে মার্জিয়া আর প্রশ্ন করলো না। চুপচাপ কেবিনে গিয়ে ঢুকলো।
রাবেয়া ইতোমধ্যে খাবার প্রস্তুত করেছেন। মৌমিতা টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে বসে ওষুধগুলো ঠিকঠাক করে নিলো। মার্জিয়া খুব আগ্রহ নিয়ে দেখলো সবকিছু। তার সেই তথাকথিত ভয়টা কেটে গেছে। সে নিজেই জোর করে আম্মার কাছ থেকে খাবার নিয়ে আব্বাকে খাওয়ালো। মারুফ আদরের ছোট মেয়েটার সাথে অনেক আলাপ করলেন, দিকনির্দেশনা দিলেন। মেয়েটা কিছু বুঝলো কিনা, তিনি জানলেন না। মার্জিয়া কেবল বোঝার ভান করে বারবার মাথা নাড়লো, হাতের পিঠে চোখ মুছলো কয়েকবার।
—————
“প্রিয় বাদল,
আশা করছি, এই চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। দোয়াও করছি, পৌঁছে যাক।
আব্বা খুব অসুস্থ। মাইনর স্ট্রোক হয়েছে। আমরা এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
আমি তোমার দেওয়া নম্বরে অনেকবার টেলিফোন করেছি। তোমাকে একবারও পাইনি। এখানে আসার পরেও বেশ কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমি যতবারই ফোন করেছি, তুমি মেসে ছিলে না একবারও।
আব্বার সাথে কথা হওয়ার পরেই এভাবে চলে গেলে। আমার সাথে অন্তত একবার কথা বলতে পারতে। তুমি তো আবার অল্পতেই রাগ কর। কিন্তু সব জায়গায় অভিমান চলে না। এই যে তুমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছ। তোমার কি মনে হয় এতে সবকিছু ঠিক হয়েছে? তুমি এমন কী অপরাধ করেছ যে আমাকে মুখ দেখাবে না? নাকি আমিই কিছু করে ফেলেছি?
আচ্ছা আমাকে বল তো, আমার প্রতি কি তোমার এতটুকুও ভরসা নেই? আমার সাথে একটাবার কথা বলতে পারলে না?
মেয়ের চেয়ে বয়সে ছোট কোনো ছেলেকে একজন বাবা এত সহজে মেনে নিবেন না, এটা তো জানা কথা। আব্বাও তোমাকে এটাই বলেছেন, তাই না? তোমার পরিবার নিয়েও কিছু বলেছিলেন? এত রাগ দেখাচ্ছ। শুধু আব্বার কথার উপর ভিত্তি করে এমন বোকামি করা কি খুব জরুরি ছিল? আমার সাথে কথা বলার প্রয়োজনও মনে করলে না।
যদি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, দু'জনকেই নিতে হবে। তুমি আমাকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
কতবার করে বলেছি, হুটহাট এভাবে হারিয়ে যেও না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বুঝাতে পারব না, কী ঝড়টা যাচ্ছে আমার উপর দিয়ে। কোনো কূল কিনারা পাচ্ছি না। আর তুমি সুযোগ বুঝে আমাকে অথৈ সমুদ্রে ফেলে হারিয়ে গেলে।
তোমাকে নিয়েও খুব চিন্তা হচ্ছে আমার। রাগের মাথায় কিন্তু ভুলেও কিছু করতে যেও না।
তোমার শুধু আব্বার সাথে কথা হয়েছে। আব্বার মতামত জেনেছ। আর আমি কী চাই—সেটা কি তোমার জানা নেই?
আমি অভাবকে ভয় পাই না বাদল। আমি ভয় পাই অশান্তিকে। এই যে তুমি চুপচাপ থাকা মানুষদের সহ্যই করতে পার না। অথচ আমার সব নীরব অত্যাচার কী অবলীলায় সহ্য করে এসেছ বছরের পর বছর ধরে। এরপরেও তোমার সাথে যদি আমি সুখী হতে না পারি, তাহলে তো পৃথিবীর কোনো মানুষই আমাকে শান্তিতে রাখতে পারবে না।
জানি না তুমি কী ভেবে বসে আছ। অত বেশি ভাবতে হবে না। তুমি সবকিছু বেশি বেশিই বুঝে নিচ্ছ আজকাল। এত বুঝতে হবে না তোমাকে। অত বড় হতে হবে না। খুব বড় হয়ে গেছ, তাই না?
এটাও ঠিক, আমি তোমার অবস্থা জানি না। অনেকেই তো অনেককিছু বলে। তুমিও বোধহয় এতদিনে উপলব্ধি করেছ, বয়সে বড় কোনো মেয়ের সাথে প্রেম করা আর সংসার করা এক কথা নয়। এমন কিছু কি মনে হয়েছে সত্যিই? মনে হতেই পারে।
ছেলেরা নিজের চেয়ে বয়সে বড় মেয়েকে সহধর্মিণী হিসেবে সহজে মানতে পারে না। কর্তৃত্ব ফলাতে পারবে না, এই ভয়ে। আর তুমি তো এমনিতেও ওরকম। সামান্য একটা রান্না নিয়ে কথা বললেও তর্ক শুরু করে দাও। আচ্ছা, আমার সামনে কি তোমার নিজেকে কখনও ছোট মনে হয়েছে? আমি কখনও অসম্মান করেছি তোমাকে?
তবে সত্যি বলতে, তোমার আপত্তি থাকতেই পারে। সেটা আমাকে সরাসরি জানালে ভালো হয়।
ধরে নিলাম, তোমার বোধোদয় হয়েছে! তুমি বুঝে ফেলেছ, আমার সাথে থাকতে অসুবিধা হবে। যদি আমার চেয়ে যোগ্য কাউকে পেয়ে যাও, একটু কষ্ট করে নাহয় আমাকে জানিয়ে দিও। আমার জন্য তোমার মনে একবিন্দুও ভালোবাসা অবশিষ্ট আছে কিনা, বুঝতে পারছি না। তবে বুঝলাম, এত বছর ধরে খুব বিরক্ত করেছি তোমাকে। তোমার নাহয় আবেগ বেশি। কিন্তু আমিও ভুল করলাম!
কত বড় ভুল করলাম। আমার আগেই বুঝে নেওয়া উচিত ছিল। দেরি হয়ে গেছে। তুমিও বড় হতে দেরি করে ফেললে। আরেকটু আগে যদি বুঝতে, আমাদের মাঝে কোনোকিছু সম্ভব নয়। বাদল? তোমার কি সত্যিই এমন মনে হয়? নাকি আমিই বেশি বেশি ভেবে ফেলেছি?
তোমার কাছে আমি হাতজোড় করে বলছি, এবার অন্তত একটু সাড়া দিও। হাসপাতালের টেলিফোন নম্বরটা দিলাম। চিঠি পাঠানোর ঠিকানাও দিলাম। তুমি ফোন করতে পার। চিঠিও পাঠাতে পার। বড়সড় চিঠি লেখার প্রয়োজন নেই। আমার জন্য আর কষ্ট করতে হবে না। এক শব্দের চিঠি হলেও চলবে।
শুধু এতটুকু জানাও, আমি কি ঠিক ভাবছি? তুমি কি রাগ করে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছ? নাকি যোগাযোগ করার আর ইচ্ছেই নেই?
উত্তরটা দিও। কীভাবে দেবে, সেটা তোমার ব্যাপার। উত্তর না পেলে ধরে নেব, আমাকে আর প্রয়োজন নেই তোমার। মেনেও নেব।
আজ আমি ভালোভাবে গুছিয়ে লিখতে পারলাম না। সেজন্য দুঃখিত। তবু আশা করি, আমার অবস্থাটা তুমি বুঝবে।
কেমন যেন লাগছে। এত বছর যাকে আপন ভেবে এসেছি, তাকে পর ভেবে নেওয়া সহজ নয়। তবুও হঠাৎ করে তোমাকে খুব পর মনে হচ্ছে। আমি হয়ত নিজেও কখনো তোমার কাছের মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি।
তুমি আমার ডায়েরি পড়েছ, যা কেউ জানে না, তা তুমি জেনে গেছ। শুরুর দিকে এটা নিয়ে অস্বস্তি কাজ করত খুব। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝেছিলাম, তুমি আসলেই আমাকে বুঝতে চেয়েছ। কখনোই বিচার করনি, তাচ্ছিল্য করনি। তোমাকে খুব আপন ভাবতে শুরু করেছিলাম।
কিন্তু আজ নিজের অনুভূতি লিখতে গিয়েও অস্বস্তি হচ্ছে। ঐ পুরনো অস্বস্তি। মনে হচ্ছে, তুমি আর আমার নেই। তোমাকে আমি চিনি না। আমার কথাগুলো পড়ে তোমার কেমন লাগবে, অনুমান করতে পারছি না। আমার কোনো অধিকার নেই এটা জানার, তুমি কোথায় আছ। জিজ্ঞাসাও করব না।
শুধু একটাই অনুরোধ, একটু কষ্ট করে হলেও আমাকে তোমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিও। তোমার যদি মনে হয়, এই সম্পর্কে থাকার আর ইচ্ছে নেই, জানিয়ে দিও আমাকে। আমি মেনে নেব। এতটুকুই।
ইতি
মৌমিতা”
বিকেল হয়ে গেছে। বাইরে ম্লান আলো। মার্জিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে, রাবেয়া এখনও জায়নামাজ থেকে ওঠেননি।
জানালার দিকে খানিকক্ষণ অপলক চেয়ে রইলো মৌমিতা। তারপর দু'হাতে চোখ মুছে টেবিলে রাখা চিঠিটার দিকে তাকালো। নিজের আত্মমর্যাদা ধূলোয় মিশিয়ে এই চিঠিটা সে বাদলকে পাঠাবে। কয়েক ঘণ্টা আগে নিজেকে দেওয়া সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবে। নিজের নাম পর্যন্ত বদলে ফেলার কথা ছিলো। কিন্তু এখন সব বাদ। কেননা, এভাবে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
বাদল আর মৌমিতা এই একই পৃথিবীতে, অথচ পরস্পরের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই—এটা আর কিছুতেই মেনে নেয়া যাচ্ছে না।
আশেপাশে কতো মানুষ, প্রশ্ন করে বারবার, কথা বলে, খোঁজ-খবর নেয়। তবু কেবল একটা মানুষের কাছে সাড়া না পেয়ে নিজেকে অস্তিত্বহীন মনে হচ্ছে। আজ নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে গিয়ে আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হচ্ছে। তাও এমন একজনের কাছে, যাকে আটকে রাখার কোনো ক্ষমতা নেই মৌমিতার। সে যদি যেতে চায়, যেতে দিতে হবে। অথচ, তার যে চলে যাওয়ার অধিকার আছে, এটাও মেনে নেয়া যাচ্ছে না!
মৌমিতা সন্তর্পণে চিঠিটা ভাঁজ করলো। আব্বার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, দুটো আঙুল দেখিয়ে বললো, “আব্বা? একটা ধরেন তো।”
মারুফ তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
“এই দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা ধরেন।”
“মও মা...” দুর্বোধ্য কিছু কথা উচ্চারণ করার পর মারুফ ডান হাতটা উঁচু করে মেয়ের হাতের তর্জনী স্পর্শ করলেন। মৌমিতা ছোট একটা শ্বাস ফেললো। আব্বা যা ঠিক করলেন, তাই হবে। নিজের সিদ্ধান্তের উপর আর আস্থা নেই মৌমিতার। সে হাত গুটিয়ে নিলো। দুটো আঙুলের মধ্যে একটা বাছাই করেছেন মারুফ। সেই অনুযায়ী চিঠিটা পাঠানো হবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায়।
·
·
·
চলবে……………………………………………………