বড় ছেলে রুমেল আর ছোট ছেলে রুশদ হওয়ার পর আছিয়া কিংবা আলাউদ্দিন কেউই আর নতুন করে কোনো সন্তান নিতে চাননি। তাছাড়া আছিয়া বেগমের মাইগ্রেন এবং হাই-ব্লাডপ্রেশারের সমস্যা ছিল, যার কারণে চিকিৎসক ওনাকে যেকোনো ধরণের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে নিষেধ করেছিলেন। সেই কারণেই, নিজের চরম অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলাউদ্দিনকে সবসময় প্রটেকশন ব্যবহার করতে হতো।
আলাউদ্দিনের সকল পাপাচার, পরকীয়া আর অনৈতিক পঙ্কিল জীবনের মাঝে ওনার নিজের শরীরের স্বার্থে মেনে চলা এই একটা মাত্র বাধ্যবাধকতাই আজ অলৌকিকভাবে আছিয়াকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে দিল।
আইসিইউ-এর বাইরের থমথমে করিডোরে বসে থাকা পর্দাবৃত আছিয়ার দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন, “আপনি সত্যিই ভীষণ ভাগ্যবতী! আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। আপনার এইচআইভি রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।”
আছিয়া সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনে থাকা ওনার ছোট ছেলে রুশদকে কল করলেন। জানালেন, তিনি পুরোপুরি ভালো আছেন, ওনার কোনো রোগ হয়নি। তিনি ছেলেকে বললেন, সে যেন এখন নিজের সুবিধামতো দেশে চলে আসে৷
মা সুস্থ আছেন এবং ওনার ওপর কোনো বিপদ নেই জেনে রুশদ আর তাড়াহুড়ো করে চড়া দামে ইমার্জেন্সি ফ্লাইটের টিকিট কাটল না৷ সে মাকে আশ্বস্ত করে বলল, লন্ডনে তার মাস্টার্সের যে সমাবর্তন ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আছে, সেটি শেষ করে সে আগামী মাস দুয়েকের মধ্যেই দেশে ফিরবে। নিজের লম্পট বাবার আসলে কী মরণব্যাধি হলো কিংবা সে আইসিইউতে মরল কি বাঁচল তাতে রুশদের বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না৷ সে শুধু তার গর্ভধারিণী মায়ের জন্যই দেশে আসবে, মায়ের ভালোবাসার টানেই ফিরবে।
মধ্যরাতে হঠাৎ করেই মারিয়ামের ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই টের পেল, পেটের ভেতরটা কেমন উথাল-পাথাল করছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ও আকুল হয়ে ডাকল, “আম্মা... ও আম্মা! একটু পানি দেও আম্মা…”
জোহরা সজাগ ছিলেন। অশরীরির মতো জানালার বাইরে অমাবস্যার আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলেন। তিনি উঠে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন। মারিয়াম এক নিশ্বাসে পানি খেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “শরীরটা কেমন করতাছে আম্মা। দিনে-রাইতে কতবার যে প্রস্রাব করতে উডা লাগে! একটু পরে পরে জানডা শুকায় যায় পানির তৃষ্ণায়।”
জোহরা কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করে বললেন, “জ্বর তো নাই।”
“হ, জ্বর নাই। খালি বার বার প্রস্রাব ধরে। হাত-পাগুলাও কেমন ফুইলা ঢোল হইয়া গেছে, সকালে ঘুম থেইকা উঠলে চোখ-মুখও ফোলা লাগে। অবশ লাগে, অশান্তি লাগে।”
“বাচ্চা পেডে আইলে শরীল একটু ভারী অয়-ই।”
জোহরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মারিয়ামের মনে স্বস্তি এলো না। ওর মন বলছে, ভেতরে বড় কোনো গোলমাল চলছে। বাবু সামান্য নড়াচড়া করলেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। একটু উঠে দাঁড়ালেই মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা দেখে। ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। কার্ড থাকায় এতদিন সূর্যের হাসি ক্লিনিকে ফ্রিতেই দেখিয়েছে।
গত মাসেই মারিয়াম সেখানে রুটিন চেকআপ করিয়েছিল। তখন সব সমস্যার কথা বললে ডাক্তার বলেছিলেন, সব ঠিক আছে। গর্ভকালীন সময়ে হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে একটু-আধটু সমস্যা হতেই পারে।
মারিয়াম মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মা, একটা ভালা গাইনি ডাক্তার দেহাই?”
জোহরা তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারলেন না। ভালো ডাক্তারের ভিজিটই তো আটশো থেকে দুই হাজার টাকা! গরিবের জন্য এই টাকা খরচ করা মুখের কথা না।
মারিয়াম মায়ের দ্বিধা বুঝতে পেরে আশ্বস্ত করে বলল, “চিন্তা কইরো না। কাজলীরে চাপ দিতাম না। আমার কাছে তিন হাজার টাকা জমানি আছে, তোষকের নিচে। কাজলীর অসুখে লাগে নাই দেইখা আর হাত দেই নাই। ওই টাকাটা নিয়াই যাই। পারুল বুবুরও কত সমস্যা আছিলো। পপুলারের রুমানা হকরে দেখায়া উনি কত উপকার পাইছে। আমিও উনারে দেহাই?”
জোহরা কিছুক্ষণ ভেবে আলতো করে মাথা নাড়ালেন। তার চাঁদের মতো সুন্দর মেয়েটার মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ঘুমাতে পারে না, খেতে পারে না৷ দেরি না করে একটা ভালো গাইনি ডাক্তার দেখানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
পরদিন দুপুর তিনটায় পপুলার হাসপাতালের গাইনি ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে বসল ওরা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ঠান্ডা বাতাসেও মারিয়ামের ভালো লাগছিল না। ডাক্তার রুমানা হক মারিয়ামের ফোলা হাত-পা আলতো করে টিপে পরীক্ষা করলেন। চোখের নিচের ফ্যাকাশে ভাবটা দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, “হাত-পায়ে পানি জমেছে। লক্ষণগুলোও স্বাভাবিক না।”
জোহরা ডাক্তারের গম্ভীর মুখ দেখে হাত দুটো মোচড়াতে মোচড়াতে জিজ্ঞেস করলেন, “সূর্যের হাসির আপারা কইছিল সব ভালা আছে, পেট হইলে এমন অয়।” থেমে উসখুস করে বললেন, “ওর কি বড় কোনো রোগ হইলো?”
রুমানা হক মৃদু হেসে জোহরার ভয় দূর করার চেষ্টা করে বললেন, “ভয় পাবেন না। মা হতে গেলে কতকিছুর মুখোমুখিই হতে হয়৷ আমরা কি সামলে উঠেনি? আপনার মেয়েও পারবে৷ গর্ভাবস্থার ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের দিকে অনেক মায়ের শরীরেই হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়…” রুমানা হক কথা শেষ না করে থেমে গেলেন৷ ডায়বেটিস শব্দটা উচ্চারণ করলে এই শ্রেণির মানুষরা খুব ভয় পেয়ে যায়৷ টেস্ট করে আগে নিশ্চিত হতে হবে। তিনি ছোট করে বললেন, “আমি কিছু পরীক্ষা দিচ্ছি, রিপোর্ট নিয়ে কাল দেখা করবেন।”
মারিয়াম বিষণ্ণ চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে। রুমানা হক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন, “কাল সকালে একদম খালি পেটে, অন্তত আট থেকে দশ ঘণ্টা না খেয়ে টেস্ট করতে আসবে। ওখানে প্রথমে তোমার খালি পেটের রক্ত নেবে। তারপর তোমাকে এক গ্লাস গ্লুকোজের পানি খাওয়ানো হবে। তার ঠিক দুই ঘণ্টা পর আবার রক্ত নেওয়া হবে। এই টেস্টটা করা জরুরি। সুগার বাড়লে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। পেটের বাচ্চার বর্তমান অবস্থা, তার ওজন আর চারপাশের পানির পরিমাণ কেমন আছে, তা জানার জন্য সাথে একটা আল্ট্রাসনোগ্রামও করে নিয়ে আসবে। ঠিক আছে?”
পরদিন কাজলী গেল সঙ্গে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সকাল থেকে ল্যাবে বসে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে দুপুরের পর রিপোর্ট হাতে পেল ওরা। বিকেলে সেই রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকল। রুমানা হক চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, “মারিয়াম, তোমার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। রক্তে সুগারের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।”
ডায়াবেটিস শব্দটা শুনেই মারিয়াম ভয়ে কুঁকড়ে গেল। ওর চোখে জল টলমল করে উঠল। ডায়াবেটিস মানে! এতো বুড়ো মানুষদের রোগ, ওর মতো তেইশ-চব্বিশ বছরের একটা মেয়ের কেন এই রোগ হবে? তবে কি পেটের বাচ্চাটার কোনো বড় ক্ষতি হয়ে গেল?
ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে রুমানা হক নরম গলায় বললেন, “ কান্নাকাটি করো না মারিয়াম। কান্নাকাটি করলে, মানসিক চাপ নিলে রক্তে সুগারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। যা হবার তা তো হয়েই গেছে তাই না? আমাদের লক্ষ্য এখন, পেটের বাচ্চার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। সেজন্য এখনই চিকিৎসা শুরু করতে হবে। তোমার সুগারের মাত্রা যা এসেছে, তা শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ বা হাঁটাচলা করে কমানো সম্ভব না। গর্ভকালীন অবস্থায় খাওয়ার ওষুধ বাচ্চার জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে, তাই তোমাকে প্রতিদিন নিয়ম করে ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হবে।”
দুশ্চিন্তায় কাজলীর কপাল কুঁচকে গেল। ডায়াবেটিস রোগটা নিয়ে ওর কিছুটা ধারণা আছে। সওদাগরের মায়ের ডায়াবেটিস ছিল, ওর পড়ানো একটা ছাত্রের মায়েরও এই রোগ ছিল। মারিয়ামকে প্রতিদিন নিয়ম করে ইনসুলিন দেওয়া, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ কেনা আর সপ্তাহে অন্তত দুই-তিনবার সুগার মাপার জন্য গ্লুকোমিটারের স্ট্রিপ কেনা… সব মিলিয়ে প্রতি মাসে একটা বড় অঙ্কের টাকা খরচ হবে। নতুন করে বাচ্চার আল্ট্রাসনোগ্রাম, নিয়মিত ফলোআপ টেস্ট আর ওষুধের খরচ জুড়লে এই এক মাসেই প্রায় পনেরো থেকে বিশ হাজার টাকার ধাক্কা!
মারিয়ামের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কাজলী নিজের দুশ্চিন্তা লুকিয়ে ফেলল। মারিয়ামের কাঁধে হাত রেখে বলল, “টাকা আমি যোগাড় কইরা নিমু। তুই চিন্তা করিস না।”
হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ইনসুলিন, স্ট্রিপ কেনার সময় হঠাৎই ইয়ামিনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ইয়ামিনের কোলে একটা ফুটফুটে পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে। কাজলী পলকের মধ্যে অচেনা মানুষের মতো অবহেলায় চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মারিয়াম পারল না৷ ওর সরল মন পুরোনো সম্পর্কের টান ভুলতে পারে না। হুইলচেয়ারে বসেই ডেকে উঠল, “ভাইয়া, ভাইয়া!”
কাজলীর চোখের ঘৃণা দেখে ইয়ামিন কিছুটা মিইয়ে গিয়েছিল। মারিয়ামকে আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে দেখে ওর অপরাধী ঠোঁটে হাসি ফুটল। ও এগিয়ে এসে বলল, “মারিয়াম! কেমন আছিস?”
কাজলী এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। ও শক্ত হাতে মারিয়ামের হুইলচেয়ারের হাতল ধরে টেনে চলে যেতে উদ্যত হলো। ইয়ামিন ঝট করে সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল, একটু চড়া গলায় বলল, “দাঁড়া কাজলী।”
কাজলী কাঠখোট্টা গলায় বলল, “কী চাই?”
“তুই আমার সাথে কথা বলবি না, সেটা তোর ইচ্ছে। কিন্তু মারিয়ামতো বলতে চায়, ওর সাথে কথা বলব আমি।”
ইয়ামিনের গলায় জেদ, সঙ্গে তেজও। বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই ওর মধ্যে। কাজলী ওর অহংকারী রূপ দেখে মনে মনে বাঁকা হাসল।
ইয়ামিন মারিয়ামের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল, “তোর চেহারার এই অবস্থা কেন? সামিউল কোই? এখানে কেন আসছিস?”
কথা বলতে বলতেই ইয়ামিনের চোখ গেল মারিয়ামের চাদরে ঢাকা পেটের দিকে। বেশ উঁচিয়ে থাকা পেট! ও কি সন্তানসম্ভবা? বিস্ময় নিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইল, তার আগেই কাজলী হনহন করে হুইলচেয়ার ঠেলে ভিড়ের মধ্যে দূরে চলে গেল। ডাক্তারের সিরিয়ালের সময় হয়ে গেছে দেখে ইয়ামিন পিছু নিতে পারল না। ওর মেয়েটার ভীষণ শরীর খারাপ, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের চেম্বারে নিয়ে যেতে হবে।
কাজলী বড় গলায় আশ্বস্ত করে বলেছে টাকা নিয়ে চিন্তা না করতে, কিন্তু মারিয়াম কোনোভাবেই নিজের ভেতরকার অস্থিরতা, মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তা থামাতে পারল না। ও খুব ভালো করেই জানে, সংসার আর চিকিৎসার এত বড় খরচ চালানো একা কাজলীর পক্ষে সম্ভব না। কাজলীর এখন মাত্র দুটো টিউশনি, যা দিয়ে কোনোমতে ডাল-ভাত চলে যাবে।
ইদানীং ওদের অনলাইন বিজনেস পেজটাতে বেশ ভালো কিছু কাপড়ের অর্ডার আসছিল। সবগুলো ক্রেতার কাছ থেকে যদি অগ্রিম টাকা নেওয়া যেত, তবে হয়তো সাময়িকভাবে ইনসুলিন আর টেস্টের বড় খরচটা উঠে আসত। কিন্তু বিধি বাম! পেজটাতেও অনেক মানুষ রিপোর্ট করেছে, যার কারণে কোনো কাস্টমারের মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া যাচ্ছে না, নতুন কোনো অর্ডারও নেওয়া যাচ্ছে না। পেজের টেকনিক্যাল ব্লকেডের কারণে আয়ের শেষ পথটাও বন্ধ হয়ে গেল। তাহলে এতগুলো টাকা এখন আসবে কোথা থেকে? চিন্তাটা মারিয়ামের মাথার ভেতর উইপোকার মতো কামড়াতে লাগল। সারারাত ও এক ফোঁটা ঘুমাতে পারল না। সারাটা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে, ভোরের আলো ফোটার পর ঘরের এক কোণে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে ও থম মেরে বসে রইল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওর আঙুলগুলো কাঁপছে। ভাবছে, সামিউলকে একটা কল করবে কি করবে না?
সামিউল, ওর স্বামী, ওর গর্ভে বেড়ে ওঠা অনাগত সন্তানের বাবা। একই সাথে একজন প্রতারক, মিথ্যাবাদী আর দায়িত্বহীন মানুষ। যে মানুষটা বিপদের দিনে এভাবে ফেলে চলে যেতে পারে, তাকে কোনো সুস্থ মানুষ মনে রাখবে না। কিন্তু মারিয়াম তাকে ভালোবাসে, নির্লজ্জের মতো ভালোবাসে। এতো অবহেলা, প্রতারণার পরও মনের কোনো এক গোপন কোণে সামিউলের জন্য দুর্বলতা রয়েই গেছে।
সামিউল মূলত একটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ফিল্ড এজেন্ট হিসেবে কাজ করত। ঝিলপাড় বস্তির অভাবী, দিনমজুর অনেক পরিবার সামিউলের মিষ্টি কথায় ভুলে ওর মাধ্যমে ছোট ছোট বীমা পলিসি খুলেছিল। প্রতি মাসে ও নিয়ম করে বস্তির বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কিস্তির টাকা সংগ্রহ করত এবং কোম্পানির জাল রসিদ বুঝিয়ে দিত। মারিয়ামের মা জোহরাও ওই কোম্পানির একটা বীমা পলিসি করিয়েছিলেন। সেই টাকা তোলার সূত্র ধরেই নিয়মিত ওদের ঘরে সামিউলের যাতায়াত শুরু হয়। আর সেখান থেকেই মারিয়ামের সাথে পরিচয়, সখ্যতা এবং পরবর্তীতে প্রেম।
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় ছয়-সাত বছর আগের। তখন কাজলীর বয়স ছিল তেরো কি চৌদ্দ বছর। কিশোরী বয়স থেকেই ও সামিউলের মিষ্টি কথা, চাউনি সহ্য করতে পারত না। মারিয়ামকেও মিশতে বারণ করত।
মারিয়াম আর সামিউলের প্রেম দেখে জোহরা নিজেই একদিন সামিউলকে ডেকে বলেছিলেন, “বাবা, দুইজন দুইজনারে যহন এতই পছন্দ করো, বিয়ার কথা ভাবো।”
মারিয়ামও মনে মনে ঠিক এটাই চাচ্ছিল। সামিউল কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “আমার বাবা-মা এই বিয়ে কোনোদিনও মানবে না। তার চেয়ে ভালো হয়, আমরা আগে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলি। তারপর যখন মারিয়ামকে নিয়ে ওদের সামনে দাঁড়াব, তখন বাধ্য হয়েই মেনে নেবে।”
জোহরা শুরুতে মত না দিলেও মেয়ের আকুলতা আর সামিউলের মতো একজন শিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত যোগ্য পাত্র হাতছাড়া হওয়ার লোভে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন।
বিয়ের পর সামিউল মারিয়ামকে নিয়ে শহরের একটা দুই রুমের ভাড়া বাসায় উঠল। নতুন বাসায় ওঠার পর সে মারিয়ামকে জানাল, “বাবা-মা আমাদের বিয়ে মেনে নেয়নি মারিয়াম, ওরা আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছে। এখন থেকে আমাদের আলাদাই থাকতে হবে।”
প্রেমে অন্ধ, মোহগ্রস্ত মারিয়াম সেই মিথ্যেটাই মেনে নিল। দুই চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শুরু হলো ওর নতুন সংসার। কেটে গেল আটটি মাস। সামিউল একদিন হুট করে এসে বলল, হানিমুনে যাবে, কক্সবাজার। মারিয়ামের মনে তখন সে কী আনন্দ! সমুদ্র দেখার কত্ত সাধ ছিল ওর মনে।
কক্সবাজার যাওয়ার পথেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ওলটপালট করে দিল মারিয়ামের পৃথিবী। বাসের ধাক্কায় মারিয়ামের মেরুদণ্ড এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো যে, ও চিরতরে নিজের পায়ে হাঁটার সক্ষমতা হারাল। উচ্ছ্বল মেয়েটা রাতারাতি হয়ে গেল বিছানাশায়ী। সামিউল এক মাসও পঙ্গু মারিয়ামকে সইতে পারল না।
একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে, গভীর রাতে মারিয়ামকে আবার এনে ফেলে রেখে গেল ঝিলপাড় বস্তিতে। সিম কার্ডটা পাল্টে ফেলল, বীমা কোম্পানির চাকরিটাও রাতারাতি ছেড়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল। জোহরা কাজলীকে নিয়ে হন্যে হয়ে তাকে খুঁজল। সামিউলকে ওরা যেখানে যেখানে দেখেছে, চেনা-অচেনা সব ঠিকানায় গেল। কোথাও তার কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। শেষে সামিউলের এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারল, সামিউল আগে থেকেই বিবাহিত ছিল! গ্রামে তার এক স্ত্রী এবং দুটো সন্তানও আছে। শোনার পর মারিয়াম এক সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
সেই লোকটাই যখন পুলিশের তাড়া খেয়ে পাঁচ বছর পর হুট করেই একদিন রাতে ওদের ঘরে এলো, মারিয়াম কোনোভাবেই নিজের কঠোরতা দেখাতে পারল না। গলে জল হয়ে গেল। সামিউল এসে মারিয়ামের বিছানার পাশে বসল, ওর ফ্যাকাশে হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ভীষণ আবেগপ্রবণ গলায় বলল, “মারিয়াম, পাঁচটা বছর আমি প্রতিটা সেকেন্ড তোমাকে মিস করেছি। আমি জানি আমি অন্যায় করেছি, অনেক বড় ভুল করেছি। তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলাম যে সত্যি কথাটা বলার সাহস পাইনি। যেভাবে হোক, যেকোনো মূল্যে আমি তোমাকে নিজের করে চাচ্ছিলাম। আমার প্রথম সংসারে আমি একটুও সুখী ছিলাম না। ওখানে কোনো ভালোবাসা ছিল না৷ তুমিই আমার একমাত্র ভালোবাসা, মারিয়াম।”
মারিয়ামের চোখের কোণ বেয়ে তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। ও বুকভরা হাহাকার নিয়ে প্রশ্ন করল, “যদি এতই ভালোবাসতে, তাহলে পঙ্গু বলে কীভাবে ফেলে চলে যেতে পারলে? আবার এত বছরে একটা বার খোঁজও নিলে না।”
সামিউল সব দোষ চাপিয়ে দিল ওর প্রথম স্ত্রীর ওপর। মুখটা অপরাধী করে বলল, “আমার প্রথম বউয়ের বাবা একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। ওরা কোনোভাবে জেনে যায়, আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। ওর বাবা আমাকে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানোর, এমনকি গুম করে ফেলার পরিকল্পনা করে। ওদের অনেক ক্ষমতা মারিয়াম, চাইলে ওরা আমাকে ফাঁসির দড়িতেও ঝুলাতে পারত! নিজের জীবন বাঁচানোর ভয়ে, আতঙ্কে আমি তোমাকে রেখে এতগুলো বছর ওই নরকে, প্রথম বউয়ের পায়ের নিচে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার আত্মাটা তোমার কাছে পড়ে ছিল বিশ্বাস করো। প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমার জন্য ছটফট করেছি। কবে তোমার কাছে আসব৷ কিন্তু সুযোগ পাইনি৷ ওদের চোখ ফাঁকি দিতে পারিনি৷ আমি এলে ওরা তোমারও ক্ষতি করত।”
সামিউলের অভিনয়, সাজানো মিথ্যে গল্প শুনে মারিয়াম আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল। সামিউল ওর প্রথম ভালোবাসা। প্রথম প্রেম কী ভোলা যায়? যদি সে এভাবে এসে পায়ে পড়ে। মারিয়াম ভুলেই গেল এই মানুষটাই একদিন ওকে নরক যন্ত্রণায় ফেলে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ও সব ভুলে সামিউলকে নিজের কাছে আসতে দিল, জড়িয়ে ধরল। সেই অন্ধ আবেগেরই ফসল, ওর পেটের অনাগত সন্তান।
সামিউল অবশ্য পরেই আবার রূপ বদলে উধাও হয়ে গিয়েছিল। মারিয়াম পরবর্তীতে যখন বুঝতে পেরেছিল, ও আবারও ফাঁদে পা দিয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওর গর্ভে তখন সামিউলের চিহ্ন বড় হতে শুরু করেছে। লোকটার ওপর ঘৃণা এলেও নিজের পেটের সন্তানটার ওপর তো ঘৃণা আনা যায় না! অবশ্য ওর ঘৃণা বেশিদিন টিকেও না!
এবার যাওয়ার আগে সামিউল একটা ফোন নম্বর দিয়ে গিয়েছিল। সেইসাথে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে শাসিয়ে গিয়েছিল, তাকে যখন-তখন কল দেওয়া যাবে না। যদি কথা না শুনে, তবে সে নম্বর ব্লক করে দেবে, সিম কার্ড পাল্টে ফেলবে। ভালোবাসায় অন্ধ, বোকা মারিয়ামও স্বামীর শর্ত গত কয়েক মাস ধরে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। লোকটা নিজের থেকে গত ছয় মাসে মাত্র একবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল, ব্যস ওইটুকুই। তবুও মারিয়ামের ধারণা একদিন সামিউল ঠিক তার ভালোবাসা বুঝবে৷ তার কাছেই ফিরে আসবে৷ সিনেমার মতো একটা সুন্দর সমাপ্তি হবে।
সামিউল ভালো টাকাপয়সা কামায়। নিজের অনাগত সন্তানের চিকিৎসার জন্য একটু আকুতি জানালে ও নিশ্চয়ই কিছু টাকা দেবে! লোকটা মুখে যতই কঠিন হোক, নিজের রক্তের প্রতি কি একটুও টান থাকবে না? ভাবতে ভাবতে মারিয়াম কাঁপাকাঁপা আঙুলে সামিউলের নম্বরে কল করল। প্রথমবার পুরো রিং হয়ে কেটে গেল, কেউ ধরল না। বুকের ভেতর দুরুদুরু দড়ফড়ানি নিয়ে ও দ্বিতীয়বার ডায়াল করল। এবার ওপাশ থেকে পরিচিত গমগমে কণ্ঠে সামিউল বলে উঠল, “বলো মারিয়াম।” যেন প্রতিদিন কথা হয়।
মারিয়াম গদগদ গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভালো আছো তুমি?”
“হুম। তোমার কী অবস্থা?” সামিউলের কণ্ঠে তাড়াহুড়ো।
মারিয়াম অভ্যাসের বশে বলে ফেলল, “ভালো।” পরক্ষণেই ডাক্তারের কথাগুলো মনে পড়তেই ও শুধরে নিয়ে বলল, “না, আসলে ভালো না। একটু জরুরি কথা ছিল। একটু সময় হবে তোমার?”
সামিউলের সঙ্গে কথা বলার সময় মারিয়াম সবসময় নিজের আঞ্চলিক টান লুকিয়ে যতটা সম্ভব শুদ্ধ আর স্পষ্ট ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করে।
“আমি এখন ব্যস্ত, তোমাকে পরে কল করছি।”
মারিয়াম বুঝল লাইনটা কেটে যাবে। ও ফোনটা কানের সাথে চেপে ধরল। নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বলে ফেলল, “তোমাকে খুব মিস করি।”
ওপাশ থেকে কোনো জবাব এলো না। শুধু কিছু অফিশিয়াল কাগজের খসখস শব্দ শোনা গেল। মারিয়ামের আকুলতা ওপাশের মানুষটাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করল না। কিছুক্ষণ পর শীতল জবাব এলো, “রাখছি।”
কল কেটে ফেলবে সেই আতঙ্কে মারিয়াম আবেগপ্রবণ হয়ে দ্রুত বলে উঠল, “প্লিজ একবার আসবে? আমি তোমার… “
কথা শেষ হলো না। তার আগেই ওপাশ থেকে ফট করে কলটা কেটে গেল। টুট-টুট শব্দটা মারিয়ামের কানে এসে তীরের মতো বিঁধল। চুপচাপ নিষ্প্রাণ ফোনটার দিকে তাকিয়ে ও পাথর হয়ে রইল। চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সামিউল কি আর কল দেবে?
কিছু মুহূর্ত যেতেই ওর নিজের ওপর নিজেরই ধিক্কার এলো। লোকটা ওকে পঙ্গু অবস্থায় ফেলে গেল, গর্ভবতী অবস্থায় খোঁজ নিল না, একটা মিথ্যুক, একটা প্রতারক…তবুও ও কিনা আবার সেই কণ্ঠ শুনে গলে জল হয়ে গেল! নিজের সন্তানের দোহাই দিয়ে এমন একটা পাষাণের কাছে ও নিজেকে কতটা সস্তা করে ফেলল! এ তো ছেঁছড়ামি! ছিহ্! নিজের আত্মসম্মানহীন অবক্ষয়ের কথা ভেবে ও লজ্জায় নিজেই নিজের ভেতরে কুঁকড়ে যেতে লাগল।
কাজলী বাড়ি ফিরতেই মারিয়াম কাঁটা কাঁটা গলায় বলল, “আমি সামিউলরে ডিভোর্স দিতে চাই, কাজলী।”
কাজলী চমকে তাকাল৷ বেহায়া, আত্মসম্মানহীন, আবেগে অন্ধ মারিয়ামের মুখে এই একটা বাক্য শোনার জন্য ও পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে!
রুমেল সামাজিক সম্মান আর লোকলজ্জার ভয়ে বাপের কুৎসিত মরণব্যাধির কথা লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু পাপ তো আর চাপা থাকে না! তিন দিনের মাথায় পুরো শহর আর বস্তি জুড়ে চাউর হয়ে গেল আলাউদ্দিন সওদাগরের এইডসের খবর৷
আইসিইউ-এর যান্ত্রিক সাপোর্টে ও চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় আলাউদ্দিনের ফুসফুস আর হার্টের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও স্ট্রোকের কারণে তার শরীর প্যারালাইজড হয়ে গেছে। ডাক্তারদের ধারণা, তিনি হয়তো আরও কয়েক মাস বা কয়েক বছর বেঁচে থাকবেন। কিন্তু এখন থেকে ওনাকে ২৪ ঘণ্টাই বিছানায় শুইয়ে রেখে নবজাতক শিশুর মতো সেবা করতে হবে। স্ট্রোকের আঘাতে ওনার গলার খাওয়ার নালী বা খাদ্যনালীও পুরোপুরি অবশ হয়ে গেছে, ফলে মুখ দিয়ে কোনো শক্ত খাবার ওনার পেটে যাবে না; ওনার পেটে কৃত্রিম টিউব ঢুকিয়ে তরল খাবার খাওয়াতে হবে। এমনকি স্বাভাবিক প্রস্রাব-পায়খানার ক্ষমতাও হারিয়েছেন, তাই অনবরত ক্যাথেটার পাইপ ও ডায়াপার পরিয়ে ওনাকে বিছানায় ফেলে রাখতে হবে।
আলাউদ্দিনের এইডসের কথা শোনার পর ওনার চেনা বিশ্বস্ত কাজের লোকেরা এইডসকে ছোঁয়াচে ভেবে আতঙ্কে একে একে কাজ ছেড়ে পালিয়ে গেছে৷ এমনকি রুমেলও দুর্গন্ধের চোটে এখন আর বাপের বিছানার ধারেকাছে ঘেঁষে না। যে মানুষটা সারা জীবন অন্যকে শাসন করেছে, সে আজ জীবন্ত লাশে পরিণত হয়ে নিজের বিছানায় পড়ে আছে।
পাশের ঘর থেকে টুটুলের পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। টুটুল কাজলীর সবচেয়ে আদুরে স্টুডেন্ট। ওর মা স্বর্ণালিই একজন সিঙ্গেল মাদার। শহরে একা থাকেন শুধু মা আর ছেলেকে নিয়ে। কাজলী ভীষণ ডেডিক্টেড একজন টিচার। টুটুল যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ত, তখন থেকেই ও ওকে পড়াচ্ছে। টুটুল যে ক্লাসে এত ভালো রেজাল্ট করে, তার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, সে কাজলী।
আজ স্বর্ণালির অফিস বন্ধ। তাই ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে অলসভাবে ফেসবুক স্ক্রল করছিল। কৌতূহল থেকে কাজলীর ফেসবুক আইডিতে ঢুকল। কাজলীর শেষ পোস্টটা ছিল কিছুদিন আগের। হাসপাতাল থেকে জ্ঞান ফেরার পর ও পোস্টটা করেছিল।
সব আলোচনা, সমালোচনা, অপবাদের বিপক্ষে ও মাত্র দুটো লাইনে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল,
‘আমি জানি, আমি সৎ। স্বচ্ছ৷ পুরো পৃথিবী আমার বিরুদ্ধে চলে গেলেও, আমি একা আমার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকব এবং লড়ে যাব।’
পোস্টে প্রচুর মানুষ হাহা রিয়েক্ট দিয়েছে, সাথে অনেক লাভ রিয়েক্টও পড়েছে। স্বর্ণালি স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। বিশ বছরের একটা মেয়ের বুকে এত মানসিক শক্তি! ভাবাই যায় না।
পড়া শেষে ছুটি হতেই স্বর্ণালি কাজলীকে জোর করে ডাইনিং টেবিলে নাস্তা খাওয়াতে বসাল। কাজলী চুপচাপ খাচ্ছিল। স্বর্ণালি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, “তোমার ক্লান্ত লাগে না কাজলী?”
কাজলী চিবানো থামিয়ে চোখ তুলে তাকাল। শান্ত গলায় বলল, “কী নিয়ে আপু?”
“এই যে এত মানুষ, এত আজেবাজে কথা... সবাই মিলে তোমাকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। কারো ছায়া নেই মাথার উপর। একটুও ভেঙে পড়তে ইচ্ছে করে না?”
কাজলী ম্লান হাসল। বলল, “ক্লান্ত লাগবে না কেন? লাগে। ভীষণ খারাপ লাগে। কান্না পায়। কিন্তু একটা সময় পর না, অভ্যাস হয়ে যায়।”
স্বর্ণালি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সত্যিই সবকিছুই একসময় অভ্যাস হয়ে যায়৷ আমাদের শুধু টিকে থাকতে হয়৷ কী যেন একটা চিন্তায় মগ্ন হলো ও। তারপর টেবিলের ওপর ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এই মুহূর্তে তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করো? উত্তরটা নিশ্চয়ই আশিক হবে, তাই না?”
কাজলী মাথা নাড়ল। বলল, “নাহ্।”
স্বর্ণালি অবাক হয়ে চোখের চশমাটা ঠিক করল। বিস্ময় নিয়ে বলল, “না? আশিক না? তাহলে কে? তোমার ওই বয়ফ্রেন্ড?”
কাজলী এবারও সোজা তাকিয়ে বলল, “না ফারাজও না।”
স্বর্ণালি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। তাহলে কে? কাজলীর বর্তমান তো এই দুজন মিলেই নরক বানিয়েছে। নাকি ওর স্বার্থপর ভাইটা?
কাজলী নিজেই উত্তর দিল, “নির্দিষ্ট কাউকে না আপু। আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি ওই মানুষগুলোকে, যারা কানকথা শোনামাত্রই সেটা চারদিকে রটিয়ে দেয়। একটা বারও ভাবে না কথাটা আদেও সত্যি নাকি মিথ্যা? প্রমাণ খোঁজার ন্যূনতম চেষ্টাটুকুও করে না। উল্টো নিজেদের মতো আরও দু-একটা মুখরোচক কথা বানিয়ে গল্পটাকে আরও রসিয়ে রসিয়ে ছড়ায়। খুব মজা পায়, ফেসবুকে পোস্ট দেয়। সত্যটা জানার কোনো আগ্রহই থাকে না।”
কাজলী থেমে ওর নাস্তার প্লেটের দিকে তাকাল। নিজের জীবনে ঘটা সবকিছু একবার স্মৃতিচারণ করে বলল, “এই মানুষগুলোর জন্যই নিরীহ, ভালো মানুষগুলোর জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। এরা সত্য-মিথ্যা বিচার না করে কথা রটায় বলেই কত মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে শেষ পর্যন্ত সুইসাইড অবধি করে ফেলে! ওরা অপরাধী, কিন্তু ওদের অপরাধটাকে সমাজের কেউ কোনোদিন অপরাধ বলে গণ্যই করে না। ওরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে, বুক ফুলিয়ে এই কাজটা করে। নিজেদের জীবনের বিনোদন আর টাইমপাস হিসেবে নানা কথা রটিয়ে হাসতে হাসতে মানুষ মেরে ফেলে! স্বপ্ন ভেঙে দেয়! কী ভয়ংকর না আপু?”
কাজলীর কথাগুলো স্বর্ণালির বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। নিজের অজান্তেই ভেতরটা লজ্জায় মোচড় দিয়ে উঠল। এই তো একটু আগে সোফায় বসে ফেসবুক স্ক্রল করার সময় টাইমলাইনে একটা পোস্ট এসেছিল, এলাকার একজন জনপ্রিয় মাওলানার নাকি পরকীয়ার চ্যাট ফাঁস হয়েছে। স্বর্ণালি কোনো কিছু না ভেবেই, কৌতুহলের বশে পোস্টটা নিজের ওয়ালে শেয়ার করেছে। অথচ ও নিজে চোখে দেখেনি, বা কোনো প্রমাণও পায়নি যে ওই মাওলানা সত্যিই এমনটা করেছেন কি না!
যদি কথাটা মিথ্যে হয়? তবে তো কাজলীর বলা সেই অপরাধীদের দলে ও নিজেও একজন হয়ে গেল! স্রেফ বিনোদনের জন্য অন্য একজনের জীবন নষ্ট করার ভাগীদার হয়ে উঠল! স্বর্ণালি কথা বলতে বলতে শেয়ার করা পোস্টটা ডিলিট করে দিল।
কাজলী স্বর্ণালির ওখান থেকে বিদায় নিয়ে যখন ঝিলপাড় বস্তির মোড়ে এসে পৌঁছাল, তখন অন্ধকার হতে শুরু করেছে। বস্তির মুখে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে হঠাৎ দূর থেকে আশিক আর রুমেলকে দেখে পায়ের গতি থমকে গেল।
রাস্তার মোড়ের পুরোনো চায়ের টং দোকানটার সামনে বেঞ্চিতে বসে আছে ওরা। আশিকের হাতে চকচক করছে একটা ধারালো চাপাতি! ও সেটা দিয়ে অবহেলায় বেঞ্চের এক কোণ কোপাচ্ছে আর রুমেলের সাথে নিচু স্বরে কী যেন শলা-পরামর্শ করছে।
ওদের ঘিরে আরও চার-পাঁচটা বেপরোয়া চেহারার ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মারমুখী জমায়েত দেখে কাজলীর চোখের সামনে চারপাশটা কেমন দুলতে শুরু করল। কেন ওভাবে বসে আছে ওরা? ওর জন্য অপেক্ষা করছে? ওদের সামনে দিয়ে যাওয়া মানে নিজের জীবনটাকে ওদের হাতে তুলে দেওয়া। আতঙ্কে কাজলীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল, হাত-পা কাঁপতে লাগল অবশ হয়ে। ও কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে উল্টো দিকে প্রায় দৌড়ানোর মতো করে হাঁটতে শুরু করল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………