বজ্রমেঘ - পর্ব ৩৮ - ফাবিয়াহ্ মমো - ধারাবাহিক গল্প

বজ্রমেঘ - ফাবিয়াহ্ মমো
          শোয়েব বৌভাত চাইছিল না। পরিবারকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে সে সময় দীর্ঘ করছিল। কিন্তু পরদিন সকালেই সেই আশঙ্কাটা সত্যি হলো। ফাতিমা ফাঁকা বাড়িতে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। অফিস রুমে ঠকঠক করাঘাত করে উঠলেন,

  - ফারশাদ, ব্যস্ত আছ? 

শোয়েব কম্পিউটার থেকে দৃষ্টি তুলে তাকাল। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল সে। ফাতিমা ভেতরে ঢুকে চারপাশ দেখতে দেখতে বললেন,

  - আরেক শুক্রবার চলে এসেছে। তুমি কী বৌভাত করবে না? 

শোয়েব কম্পিউটারে নজর স্থির করে রাখল। মাউস নাড়িয়ে ডকুমেন্টগুলো চেক করছিল সে। ফাতিমা নীরবতার অর্থ বুঝলেন। একটা চেয়ার টেনে বসতেই কথাটা উঠালেন, 

  - বিয়ের সময় কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ওগুলো ভুলে যেয়ো না। 

মাউসের হাতটা আচমকা থমকে গেল। শোয়েব কয়েক মুহুর্ত মনিটরে অপলক রইল। ডানদিকের চোয়াল অদ্ভুত ভাবে কেঁপে উঠতেই ভারি গলায় বলল, 

  - বৌভাতের প্রয়োজন দেখছি না। ওসব সামাজিক নিয়ম আমার মতো অসামাজিকের জন্য নয়। 

ফাতিমা নির্বাক চোখে তাকালেন। ছোটো থেকে এতো বড়ো হলো, কিন্তু কখনো কথার বরখেলাফ করতে দেখেনি। ফাতিমা অবাক গলায় শুধোলেন, 

  - বিয়ের আগে কথা ছিল শাওলিন ঢাকায় ফিরবে। ওর সবকিছু ঢাকায়। পড়াশোনা এখনো চলছে। তুমি প্রতিশ্রুতি রাখবে না? 

শোয়েব রিভলবিং চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। দাদীর চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলল, 

  - যখন ঢাকায় পোস্টিং হবে ভেবে দেখব। কিন্তু এখন আমার কাছেই থাকবে। 

ফাতিমা হতবাক হতে হতে একপর্যায়ে ক্রুদ্ধ হন। রাগত স্বরে বলেন, 

  - এটা অন্যায় করছ, ফারশাদ। রেবেকা যে অন্যায় করেছে, তুমিও একই ভুল করছ। 

শোয়েব না ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। দুহাতে কলম নাড়াচাড়া করতে বলল, 

  - রেবা নিয়মের ভেতর রাখতো। আমি কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেব না। এখানে ও স্বাধীনভাবে থাকবে। 

  - রেবা মানবে মনে করো? 

  - ওকে আউট অফ সিলেবাস মনে করি। 

ফাতিমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। যেতে পথে থমকে গেল চোখ। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নারীমূর্তিকে দেখে ফাতিমা অপ্রস্তুত হয়ে যান। সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকল শাওলিন। ট্রে হাতে কফির মগ। ফাতিমা ইতস্তত হেসে বললেন, 

  - নাশতা করেছ? 

শাওলিন ট্রে থেকে মগ নামিয়ে বলল, 

  - করেছি, দাদী। আপনার জন্য চা রাখা আছে। খাবার টেবিলে রাখা। 

ফাতিমা এতটুকু সমাদরে ভীষণ খুশি হলেন। তিনি চায়ের তেষ্টায় ভুগছিলেন, কিন্তু মেয়েটা স্বামীর জন্য কফি বানাতে গিয়ে চা করতেও ভুলেনি। মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন ফাতিমা। পেছনে দরজা বন্ধ হবার শব্দ হতেই শাওলিন সামনে ফিরে তাকাল। চরম বিরক্তির গলায় বলে উঠল, 

  - আমার ফোন থেকে শ্রেষ্ঠাকে ম্যাসেজ দিয়েছেন? 

শোয়েব ভ্রুঁ কুঁচকে জরুরি ফাইল দেখছিল। কথাটায় কোনো ভ্রুঁক্ষেপ করল না। শাওলিন ডেষ্কের ডানপাশ ঘুরে শোয়েবের কাছে গিয়ে বলল, 

  - আপনাকে কিছু প্রশ্ন করেছি! আপনি আমার ফোন ধরেছেন? 

শোয়েব কোঁচকানো ভ্রুঁ নিয়ে মাউসে পরপর ক্লিক করে বলল, 

  - কীসের ফোন? 

  - আমার ফোন! আপনি আমার ফোন ধরেছেন কেন? 

  - ওটা আমার ফোন। 

শাওলিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, 

  - আপনার ফোন মানে? আপনার কীভাবে হলো? 

  - তোমার ফোন আমার ফোন। আমার ফোন তোমার। 

শাওলিন বিস্ময়ে কথা বলতে পারল না। এ কেমন যুক্তি? কঠিন পাসওয়ার্ডও উনার কাছে ডালভাত হয়ে গেছে। চতুর এই লোক লকস্ক্রিনটা অদ্ভুত ভাবে সরিয়ে দিয়েছে। শোয়েব আড়চোখে শাওলিনের মূঢ় অবস্থা দেখে বলল, 

  - এখানে বসো। 

উরুর উপর হাত চাপড়ে দেখাল শোয়েব। শাওলিন একপলক দেখে নিয়ে দ্বিধা চোখে তাকাল। পিছিয়ে চলে যেতে নিবে, মেঝেতে লুটানো লম্বা আঁচলের প্রান্তে টান খেল শাওলিন। থমকে তাকিয়ে দেখল শোয়েব পা দিয়ে আঁটকে ফেলেছে। শাওলিন লম্বা আঁচলটা হাতে মুঠো পাকিয়ে বলল, 

  - ছাড়ুন। 

  - তোমাকে বসতে বলেছি। 

  - ওটা বসার জায়গা না। 

  - তুমি আগেও একবার বসেছ। 

মুহুর্তেই গাল দুটো গরম হয়ে গেল। শাওলিন লজ্জায় কথা বলতে পারল না। শোয়েব একপলক তাকিয়ে আশ্বস্ত করে বলল, 

  - কিছু করব না। বসো। 

শাওলিন তার ঠোঁটের কোণে হাসি মিলিয়ে যেতে দেখল। মন থেকে আশঙ্কাটা এখনো দূর হচ্ছে না। বিশ্বাস করবে? নাকি শেয়ালের কাছে মুরগী ধরা দেয়ার মতো কিছু ঘটবে? শাওলিনকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে শোয়েব হাত বাড়িয়ে দিল, 

  - আসো। 

শাওলিন নিঃশব্দে অগ্রসর হলো। শাওলিনকে বাঁহাতে টেনে নিজের কোলে বসালো শোয়েব। সরু কোমরটা ডানহাতে আবদ্ধ করে বলল, 

  - দরজায় দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনেছ? 

শাওলিন মুখের ওপর শোয়েবের শ্বাস টের পেল। চোখদুটো বন্ধ করে আবার তাকাল সে,

  - প্রতিশ্রুতি কী ছিল? 

শোয়েব একমুহুর্ত কালো চোখে চোখ মিলিয়ে রাখল। তারপর বাঁহাতে শাওলিনের ডান হাত তুলে চুমু খেয়ে বলল, 

  - তোমাকে ঢাকায় ফিরতে দেয়া। যেটা আমি চাই না। এখানে কিছুমাস থাকতে হবে না? 

  - ঢাকায় আপনাদের বাড়ি নেই? 

  - পুরোনো বাড়ি আছে। 

  - সেখানে দাদীর সঙ্গে যদি থাকি? 

  - আমার কী লাভ? 

শাওলিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামাল। খানিক হেসে আবারও তাকাল। শোয়েব চোখের তারা দুটো নাড়াচ্ছে। বাঁহাতে শাওলিনের কোমল হাতকে মুঠো পাকিয়ে নিচ্ছে। শাওলিন অন্যহাতে অসহ্য চশমাটা খুলে নিতে যাবে, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। শোয়েব দাঁত চিবিয়ে বলল, 

  - মাদা* ফা**। 

গালিটা ঠোঁটেই থেমে গেল। শাওলিনের হাসি যেন মুহূর্তেই সমস্ত রাগ গলিয়ে দিল। হাসির দমকে কপালের ওপর ছোটো চুলগুলো দুলছে। শোয়েব চারপাশ সম্বন্ধে ভুলে গেল। শাওলিন হাসছে! ও প্রাণ খুলে হাসছে! বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে গেল শোয়েবের। মনে হলো যেন, দীর্ঘ খরার পর শুকনো মাটিতে প্রথম বৃষ্টি নেমেছে। এই শান্তি, এই স্নিগ্ধতা শোয়েব প্রকাশ করতে পারল না। তবে কী এই মিষ্টি হাসির জন্যই অস্থির হতো মন? 

—————

সেদিন খাগড়াছড়িতে বুধবার সন্ধ্যায় সেগুফতা, মিথিলা চলে এল। মায়াবি লেক, আলুটিলা স্পট, ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে চলে আসে বাড়ির লোকদের সাথে। সেগুফতা একদিন যে আশঙ্কা করেছিল, সেটি সত্যি হয়েছে। উদ্ধার করে আনা সেই মেয়েটি আজ শোয়েবের বউ। বজ্রাহতের মতো শাওলিনের দিকে তর্জনী তুলে আহসানকে বলল, 

  - তুমি! তুমি এজন্যই নাম জানাওনি?  

মিথিলা শাওলিনকে দেখে কয়েক মুহুর্ত কথা বলল না। যখন শাহেদ মিথিলাকে টেনে নিয়ে যায় তখন জাবের অধরাকে ইশারা করে। জাবের চারপাশে তাকিয়ে দেখল শোয়েব নিচে নেই। স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ছাড়লে অধরা স্বামীর ইঙ্গিতে শাওলিনকে সরিয়ে নিয়ে গেল। শাওলিন সব বুঝতে পেরে অধরাকে জিজ্ঞেস করল, 

  - উনারা দুজন এমন করলেন কেন? 

অধরা আমতা আমতা করে উত্তরটা দিল, 

  - তারা ভাবেনি শোয়েব তোমাকে বিয়ে করেছে।

শাওলিন উত্তরটায় অসন্তুষ্ট হয়ে বলল,

  - আপনারা কিছু বলেননি? কেন, কীভাবে বিয়েটা হলো কিছুই জানাননি? 

অধরা ক্লান্ত গলায় বলল, 

  - আস্তে ধীরে সব জানবে, শাওলিন। এসব নিয়ে এখন মাথা ঘামিও না। 

  - ভাবী, এখন জানালেই ভালো হতো না?

অধরা যেতে পথে পা থামিয়ে তাকাল। ঠোঁটদুটো মৃদু টিপে বলল, 

  - শোয়েব বোধহয় চটে আছে, শাওলিন। তোমার এখন এদিকে মনোযোগ না দিয়ে উপরে যাওয়া উচিত। শোয়েব তোমাকে যেতে দিতে চাচ্ছে না। 

অধরা আর দাঁড়াল না। প্রশ্নের সমুদ্রে শাওলিনকে একা রেখে চলে গেল। শাওলিন দ্বিধা চোখে প্রতিটি মানুষকে বিচার করছে। কেমন খাপছাড়া লাগছে না? বাইরে থেকে যতটা হাসিখুশি দেখায়, সম্পর্কের ভেতর যেন ততটাই দ্বন্দ্ব। শাওলিন উপরে গিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। আশ্চর্য হয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। কী ব্যাপার? বাথরুম ফাঁকা। সংলগ্ন বারান্দা ফাঁকা। শোয়েব কখন নিঃশব্দে চলে গেছে, কেউ টের পায়নি।  

—————

বৃহস্পতিবার সকাল সাতটায় গাড়ির আওয়াজে শাওলিনের ঘুম ভাঙল। শাওলিন চোখ কচলে জানালা দিয়ে তাকাল। সোনালি রোদ্দুর ওর পেলব মুখে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে। চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে রাফানের কালো গাড়িটা দেখতে পেল। লোহার গেট দুটো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কালো গাড়িটার চারটা দরজা একসাথে খুলে গেছে। প্রথমে নামলেন মোর্শেদা। রেবেকা ছুটি না পাওয়ায় মাকে পাঠিয়েছে। তারপর একে একে শ্রেষ্ঠা, নাযীফ, সোহানা নামছে। দৃশ্যটা দেখে দ্রুত বিছানা থেকে নামলো শাওলিন। আঁচল ঠিক করতেই খুট করে একটা শব্দ হলে চমকে তাকাল। বাথরুমের দরজা খুলে সদ্য স্নান সেরে শোয়েব বের হচ্ছে। মসৃণ কপালে ভেজা চুল লেপ্টে আছে। সাদা তোয়ালে কোমরে প্যাঁচানো। ভেজা গায়ে শাওলিনের মুখোমুখি দাঁড়াল। কয়েক সেকেণ্ড তাকিয়ে রইল শোয়েব। তারপর এমনভাবে পাশ কাটাল, যেন ঘরে অন্য কারো অস্তিত্ব নেই। শাওলিন অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কণ্ঠে অবিশ্বাস নিয়ে শুধাল, 

  - কালরাতে কোথায় ছিলেন? 

শোয়েব উত্তর করল না। ড্রেসিংটেবিলের সামনে ওয়াইল্ড পারফিউমের বোতল তুলে নগ্ন দেহে স্প্রে করতে লাগল। শাওলিন এ পর্যায়ে ভ্রুঁ কোঁচকাল। এক কদম সামনে এগিয়ে বলল, 

  - আপনি কালরাতে কোথায় ছিলেন, অফিসার ফারশাদ? দয়া করে জানাবেন? রাতে আপনি বাড়ি ফিরেননি!

শোয়েব বাঁ কানে ব্লুটুথ লাগাল। শাওলিনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কলটা রিসিভ করতেই বলল, 

  - হুম, রাফান।... এখনই?... জরুরি হলে যাও। কিন্তু নাশতা করে গেলে ভালো হয়। .... আচ্ছা। ঠিক আছে, যাও। 

পারফিউমের বোতল রেখে আলমারি খুলল শোয়েব। পোশাক বের করল। আরেকটা তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছল। শাওলিনের মনে হলো এমন বরফশীতল অবজ্ঞা আজ পর্যন্ত পায়নি। একটা মানুষ ওকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য বানিয়ে দিয়েছে। শাওলিন পেছন থেকে কাঁধ খামচে ধরল। নিজের দিকে শোয়েবকে ঘুরাতে চাইল, কিন্তু দৈহিক শক্তিতে পেরে উঠল না। শোয়েব ডানকাঁধে স্পর্শ পেয়ে এক মুহুর্ত থমকে গিয়েছিল। কিন্তু পরমুহুর্তেই হাতটা সরিয়ে দিল সে। অস্বাভাবিক স্থির গলায় বলল,  

  - যে আমার চিৎকারের ভাষা বোঝেনি, সে আমার নীরবতার ভাষাও বুঝবে না।  

পোশাকের হ্যাঙার দুটো হাতে নিয়ে ক্লোজেট ঘরে ঢুকল শোয়েব। দরজা দুটো আঁটকে দিল শাওলিনকে দেখতে দেখতে। শাওলিন স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। কালরাতে সে কখন ফিরেছে টের পায়নি শাওলিন। বৌভাত পিছানোর কথা কীভাবে বলবে? বড়োদের কাছে এসব বলা যায়? ঢাকায় না ফিরলে ক্যামেরার ঘটনাটা অজানাই থেকে যাবে। আর মণির সঙ্গে কী হয়েছিল সেটাও জানা হবে না। শাওলিন করুণ চোখে তাকিয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটা দিল বাইরে। পায়ের শব্দ যখন ঘরের বাইরে মিলিয়ে গেল, ঠিক তখনই ক্লোজেট ঘরের দরজা খুলল শোয়েব। 

নিচে নামতেই তীব্র ঝাঁকুনি খেল শাওলিন। কয়েক পা পিছিয়ে ভারসাম্য ধরতে পারল। ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছে শ্রেষ্ঠা। একপ্রকার দম বন্ধ করে জাপটে ধরেছে ওর চেয়ে দুই ইঞ্চি খাটো শাওলিনকে। অস্থির, চঞ্চল স্বরে শ্রেষ্ঠার গলা ভেসে এল, 

  - তোকে জন্মের মিসটা করেছি!

শাওলিন হাঁশফাঁশ গলায় বলল, 

  - তুমি আমাকে পি..ষে ফেলছ, শ্রেষ্ঠা!

শ্রেষ্ঠা ফিক করে হেসে হাতদুটো ঢিল করল। শাওলিনকে জড়িয়ে রেখেই নত মুখটার দিকে বলল, 

  - কেমন আছিস? সবকিছু মানিয়ে নিতে পারছিস তো? 

শাওলিন পেছন থেকে আরেক জোড়া হাতের বন্ধন টের পেল। সোহানা দুজনকে জাপটে ধরেছে। শাওলিনের ঘাড়ে মাথা রেখে বলল, 

  - এখানে নেটওয়ার্ক খারাপ। তোকে যে কত হাজারবার কল করলাম, একটাও গেল না। 

শাওলিন চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে মৃদু হেসে বলল, 

  - তোমরা দুজন যদি রহম করো, আমি একটু শ্বাস নিতে চাই। 

শ্রেষ্ঠা আর সোহানা হাসতে হাসতে হাতজোড়া শিথিল করল। শাওলিন বুক ভর্তি দম টেনে ফুসফুস ভরে নিল। ফাতিমা নাজ অতিথিদের হাসিমুখে বরণ করে নিলেন। মোর্শেদাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। এখনো সবাই জেগে উঠেনি। নাযীফ ফোন হাতে হলঘরে একা বসে আছে। এমন সময় শাওলিন নাযীফকে দেখে শুধাল, 

  - কেমন আছ, ভাইয়া? 

নাযীফ পিলে চমকে তাকাল। অপ্রস্তুত ভাবে হেসে বলল, 

  - তুই কেমন আছিস? স্যার কোথায়? 

শাওলিন শরবতের ট্রে টেবিলে রেখে বলল, 

  - প্রথমে আমি জিজ্ঞেস করেছি। 

নাযীফ হালকা হেসে দ্বিধা ঝেড়ে বলল, 

  - ভালো আছি, জানা। বাবা হঠাৎ অসুস্থ না হলে তোর বিয়েটায় অ্যাটেণ্ড করতাম। 

  - তুমি যেবার আলিকদম গেলে, তার আগের দিন আঙ্কেল প্রচণ্ড অসুস্থ হলেন। ডেঙ্গু পজিটিভ ধরা পড়ল। তুমি ট্যূরটা ক্যানসেল করলে না। 

নাযীফ থতমত খেয়ে তাকাল। শরবতের গ্লাসটা ধরেও আঙুল সরে যাচ্ছিল, এমন সময় শ্রেষ্ঠা পেছন থেকে ডাকল, 

  - জানা? বাইরে কলপাড় ছিল না?

শাওলিন পিছু তাকিয়ে বলল, 

  - ছিল না, এখনো আছে। বাইরে যাও। হাতের ডানদিকে। 

  - তুই আয়। 

অগত্যা শাওলিন ওদের নিয়ে বের হলো। বাড়ির ডানদিকে বেশ কিছুটা হাঁটলে কলপাড়, তারপর রোকেয়াদের থাকার ঘর। তারপর ঘন বিস্তৃত জঙ্গল। শাওলিন ওদের কলপাড়ে নিয়ে গেলে সোহানা টিনের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, 

  - জায়গাটা এই সকালেও কেমন ছমছম করছে। কেউ আসবে না তো? 

শাওলিন চাপকল চেপে বলল, 

  - না। নিশ্চিন্তে থাকো। 

সোহানা বুকে ডানহাত রেখে স্বস্তি পেল। সিমেন্টে বাঁধানো পাকা কলপাড়ে শুকনো জায়গা দেখে বসলো। পা থেকে স্নিকারের ফিতা খুলতে খুলতে বলল, 

  - এই! স্যার, কোথায়? নিচে নামলেন না যে?

শ্রেষ্ঠা বালতির পানিতে মগ ডুবিয়ে শাষাল, 

  - কটা বাজে যে নিচে নামবে? মাত্র সাতটা!

শাওলিন ওদের ভুল ভেঙে দিয়ে বলল, 

  - পাঁচটায় উঠে গেছেন। 

শ্রেষ্ঠা মুখে পানি ছেঁটাতে গিয়ে থেমে গেল। শাওলিনের দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে বলল, 

  - কসম! উনি ভুলবশত কোনো সংগঠন করেন নাকি? জাশি আর মিলিটারিরা এই পর্যায়ে স্ট্রিক্ট হয়।

সোহানা পায়ের মোজা খুলে বলল, 

  - তোর মাথায় কী রাজনীতি ছাড়া কিছু থাকে না? গতবার যখন থাকলি, তখন টের পাসনি? সেলিম গতবার যা ভয় পেয়েছিল! 

শাওলিন কৌতুহল চোখে তাকাল। শ্রেষ্ঠা প্রশ্নটা করল, 

  - কী বলিস? ঘটনা তো জানা নেই। সেলিম এখানে আসার পর গুটিয়ে গুটিয়ে থাকতো। ভয়ের কারণ কী এটাই? 

সোহানা একপলক শাওলিনের দিকে তাকাল। এরপর শ্রেষ্ঠার দিকে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, 

  - সেলিম মাঝরাতে দোতলায় উঠছিল জানাকে দেখতে। শেষ সিঁড়িতে পা দিবে, অন্ধকারে স্যারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। স্যার শুধু বলেছিলেন, "এখানে কী করো?" তারপর আর উপরে ওঠেনি।

শাওলিন এই ঘটনা শুনে খুব অবাক হলো। পিঠের আঘাতে জ্ঞান হারানোর পর তেমন কিছু মনে নেই। কিন্তু এক রাতে খুব ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছিল। শুধু এটুকু মনে আছে, শোয়েব পাশে ছিল। মাথায় হাত রেখে শান্ত করে দিচ্ছিল। সোহানা দুই পা উন্মুক্ত করে বলল, 

  - আসার সময় প্রত্যেকটা চেকপোস্ট থেকে সালাম দিল। রাফানের গাড়ি দেখেই কী স্যারের রিলেটিভ বুঝল?

রাফানের নাম শুনে মুখ বিকৃত হয়ে গেল শ্রেষ্ঠার। শাওলিনের দিকে জেদি গলায় বলল, 

  - এই অসহ্যটাকে কীভাবে তোর জামাই সহ্য করে? এমন কুত্তার মতো গাড়ি চালায় ভাই! আমি সত্যিই খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম।

সোহানা দুই পায়ের জুতা দূরে রেখে বলল, 

  - ভালোর ভেতর খুঁত না ধরলে তোর চলে না! আরে গাঁধি! উনি স্পিডে না টানলে তাড়াতাড়ি পৌঁছুতি? 

শ্রেষ্ঠা হুংকার দিয়ে বলল, 

  - সোহার বাচ্চা, এখন রাফানের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে যাস? 

শাওলিন সোহানার দিকে একমগ পানি এগিয়ে শ্রেষ্ঠার দিকে বলল, 

  - এই, থামো! হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এসো। আমি নাশতা দিতে বলছি। 

কথাটা বলতেই শাওলিন চাপকলের হাতল ছেড়ে দিল। পানির শব্দ ছাড়া চারপাশ নিস্তব্ধ। দুই বান্ধবি ওর দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল। 

—————

মাঝে একদিন থেকে ঠিক দুপুরে ফিরে যাওয়ার বন্দোবস্ত হলো। পরিবারের সবার সঙ্গে পরিচিত হলো শ্রেষ্ঠারা। স্রেফ সেগুফতা আর মিথিলা কেমন যেন গোমরা মুখে রইল। শোয়েবের সঙ্গে কথাবার্তাও টুকটাক হলো। কিন্তু শ্রেষ্ঠার সুক্ষ্ম নজরে কিছু বিষয় এড়াল না। শাওলিন পানি ঢেলে দিলে শোয়েব অন্য গ্লাসে পানি ঢেলে নিল। কফির মগ সামনে দিলে শোয়েব স্পর্শ করল না। শাওলিন যখন লাগেজ বের করল, শোয়েব দোতলার বারান্দা থেকে দুহাত পকেটে দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শাওলিন গাড়িতে উঠল। কিন্তু শোয়েব তখনো তফাতে দাঁড়িয়ে চুপ। এগোল না, পকেট থেকে হাত দুটো বেরও করল না। শ্রেষ্ঠা ফিসফিস করে সোহানার চুল ঠিক করতে বলল, 

  - মনে মনে যা ভাবছি তাই। ওর ভাবী ভেজাল করছে। 

সোহানাও চুল ঠিক করার ভঙ্গি করে বলল, 

  - মহিলার মাথা ভর্তি গোবর। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি কত দূর! রিসেপশনটা দেরিতে হলে কী হতো? 

  - সেটাই। এক সপ্তাহ মাত্র হয়েছে। ওই মহিলা চাপ দিয়ে বলেছে জানার পরীক্ষা। এক্ষুণি আসা লাগবে। পার্বত্য অঞ্চলের পোস্টিং নিয়ে খোঁটাও দিয়েছে। 

সোহানা আশ্চর্য হয়ে বলল, 

  -. মহিলা পাগল নাকি? আর তুই এই খবর কোথায় পেলি? 

  - অধরা আপু জানাল। বুধবার দুপুরে বেশ বড়সড় ঝামেলা হয়েছে। জানার চাচাশ্বশুর মনে হয় স্যারকে দেখতে পারে না। 

দুই বান্ধবি একপর্যায়ে কথা বন্ধ করল। যাবার সময় হয়েছে। জানালা সংলগ্ন সিটে শাওলিন বসার পর রোকেয়ার দিকে হাত নাড়াল। রোকেয়া ঝুঁকে এলে শুধাল 

  - আমার নাম্বারটা সেভ করেছ না? 

  - করছি ভাবী।

এরপর মতিনের দিকে ইশারা করল। মতিন একইভাবে ঝুঁকে এলে শাওলিন বলল, 

  - মতিন ভাই, ওই অসভ্য পিয়নটাকে যদি না ছাড়ায়, আমাকে একবার কল দিবেন। 

  - আমার সমুস্যা নাই ভাবীজান। ওই পিয়ন হালায় আবার আইলে ছিঁ..ড়া ফালামু। 

শাওলিন হেসে রোকেয়ার দিকে বলল, 

  - কোনো দরকার হলে কল করবে। কেউ যদি নিষেধ করে, তবু করবে। 

রোকেয়া ইঙ্গিতটা বুঝে হাসি দিয়ে বলল, 

  - টেনশন কইরেন না ভাবী। ভাইজানের খবর আপনেরেই দিমু। 

  - আসি। 

মোশাররফ ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলছে। শাওলিন চট করে হাতের ফোনটা বের করল। এক মুহুর্তে ফটাফট টাইপ করে পাঠাল, 

  - ছুটি পেলে আসবেন। জাবি ঘুরাব। 

গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে। শাওলিন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। যেতে যেতে দেখল শোয়েব ফোনের ভাইব্রেশনে মাথা নিচু করেছে। ফোন বের করতেই বাঁহাতটাও পকেট থেকে বেরোল। শাওলিন স্তব্ধ চোখে শেষ দৃশ্যটা দেখল, বাঁহাতটা রক্তে ভেজা। আঙুলের ফাঁক বেয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। কীভাবে এমন হলো, বুঝে উঠতে পারল না শাওলিন। সে ডানহাতে কিছু একটা লিখছে, তারপরই গাড়ি বাঁক নিয়ে দৃশ্য হারালো। শাওলিন কোলের ওপর কম্পন টের পেতেই ফোন হাতে তুলল। বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। স্ক্রিনে মাত্র চারটি শব্দ ভেসে উঠল,  

  - ছুটি পেলেও যাব না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp