কালান্তরের কন্যা - পর্ব ১৪ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
          কাজলী কিছুটা দূরে এসে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে লাগল, কী করবে এখন? বাসায় কীভাবে ফিরবে? এমন অসময়ে বস্তির মোড়টায় সাধারণ মানুষজন তেমন থাকে না। কার কাছে যাবে ও? এমন কোনো চেনা মানুষ তো নেই যার বাসায় গিয়ে অন্তত কয়েকটা দিন মাথা গুঁজে থাকা যাবে। আর কেউ থাকলেও কি? এমন পরিস্থিতিতে কেউই তাকে জায়গা দিত না৷ সবাই যার যার দুনিয়াবি নিয়ে ব্যস্ত৷ কেউই অন্যের বিপদ নিজের ঘাড়ে টানতে চায় না৷ 

দেশের অবস্থাও ভালো না, চারপাশটা পাপে আর অন্যায়ে গিজগিজ করছে। মানুষ এখন সামান্য কারণেও অন্য মানুষকে নির্দ্বিধায় মেরে ফেলছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় নিজের জন্মদাতা বাবা অবলীলায় মেয়েকে ধর্ষণ করছে! এমন কলিযুগে ও’কে কে জায়গা দিবে? কাকেই বা ও বিশ্বাস করবে?

কী অদ্ভুত! নিজের অজান্তেই ও মনে মনে কারো না কারো সাহায্য কামনা করছে। এটাই মানুষের স্বভাব! মুখে যতই স্বাবলম্বী হওয়ার বড়াই করুক না কেন, দিনশেষে প্রত্যেকেই কারো না কারো একটুখানি ছায়া আর একটুখানি ভরসার আশ্রয় খোঁজে।

মারিয়ামের ইনসুলিনের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ঘরে তো ও'কে ফিরতেই হবে৷ উপায়ান্তর না দেখে কাজলী সাহেব চাচাকে কয়েকবার কল করল। ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। পরপর তিনবার রিং হয়ে কেটে যাওয়ার পর হুট করেই কাজলীর মনে পড়ল, সাহেব চাচা নতুন একটা কাজ নিয়েছেন। তিনি এখন একটা ছোট মিনি ট্রাক চালান, ড্রাইভার হয়েছেন। অনেক বছর আগে যৌবনে তিনি ট্রাক চালাতেন, অভাবের তাড়নায় এখন বুড়ো বয়সে আবার সেই পুরনো স্টিয়ারিংটাই হাতে তুলে নিয়েছেন। হয়তো মাল নিয়ে সিলেটের বাইরে বা দূরে কোথাও গেছেন।

কাজলী হতাশ হয়ে পার্কের ভাঙা বেঞ্চিতে বসে রইল। জোহরা বা মারিয়ামকেও কল দিতে পারছে না। ওরা আশিকের চাপাতি নিয়ে বসে থাকার কথা শুনলে ঘরে বসেই স্ট্রোক করবে, অথবা চিন্তায় অস্থির হয়ে মারিয়ামকে নিয়ে যদি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, হিংস্র হায়েনাগুলো ওদের ওপরও আঘাত করতে পারে!

কাজলী দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে দুই হাত দিয়ে চুল খামচে ধরল। ওর আর কান্নাও পাচ্ছে না, চোখের সব জল শুকিয়ে গেছে। শুধু কপালের দু'পাশের শিরাগুলো দপদপ করছে।

একটা চলন্ত সিএনজি হুট করে পার্কের রেলিংয়ের পাশে এসে ব্রেক কষে দাঁড়াল। আকস্মিক শব্দে কাজলী চমকে চোখ তুলে তাকাল। সিএনজির পেছনের সিট থেকে মুখ বাড়াল ইউসুফ। বলল, “আমার সঙ্গে এসো কাজলী।”

কাজলী ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

“তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।”

“ওরা... আশিকরা কি মোড় থেকে চলে গেছে?”

“না, ওরা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।”

“তাহলে কীভাবে যাব?”

“আমার পাশে বসো, ওরা তোমাকে দেখতে পাবে না।”

চারপাশটা ততক্ষণে ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। সিএনজির ভেতরে চেপে বসলে বাইরে থেকে চট করে চেনা মুশকিল। কাজলী আর এক মুহূর্তও না ভেবে সঙ্গে সঙ্গে সিএনজির ভেতরে উঠে বসল। বসার সময় বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে একদম কোণ ঘেঁষে বসল। এই লোকটাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। গত তিন-চার দিন যাবৎ ছায়ার মতো পিছু পিছু ঘুরছে, বারবার পথরোধ করে কিছু একটা বলতে চাইছে।

কাজলী নিশ্চিত, ইউসুফ নির্ঘাত ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে চাইছে। আর ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজলীর সবচেয়ে বড় ভয়। ও যদি ইউসুফের কথা শোনে, যদি সত্যিই প্রপোজ করে বসে, তবে কাজলীকে বাধ্য হয়েই না বলতে হবে। 

যে মানুষটা দুঃসময়ে ওর পাশে দাঁড়িয়েছিল, যত্ন করেছিল… সেই মানুষটাকে বিপরীতে মুখের ওপর না বলে দিতে কোথাও যেন বাঁধছে৷ সহানুভূতি কাজ করছে। কথা শুনলেই তো জবাব দিতে হবে, তার চেয়ে কথা না শুনে ইগনোর করে চলে যাওয়াটাই ঢের ভালো! 

সিএনজিটা চলতে শুরু করল। সিএনজিটা যখন ঠিক টং দোকানের মোড়টার কাছাকাছি চলে এলো, কাজলী নিজেকে আরও আড়াল করার জন্য ইউসুফের দিকে ঘেঁষে বসল, যাতে বাইর থেকে কোনো আলো ওর ওপর না পড়ে। 

ইউসুফও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে, সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে বসল। নিজের চওড়া শরীরটা দিয়ে কাজলীকে পুরোপুরি ঢেকে দিল। তখনই ঘটল বিপত্তি।  

কাজলী ইউসুফের দিকে মিশে যেতেই ওর হাতের নরম বাহুটা ইউসুফের শক্ত বাহুর সাথে শক্ত করে চেপে বসল। স্পর্শটা পাওয়ামাত্রই ইউসুফের বুকের ভেতর প্রলয়ঙ্কারী তুফান শুরু হয়ে গেল। চেনা পৃথিবীটা কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। কাজলী এর আগেও হাসপাতালে ওর এতখানি কাছে ছিল। কিন্তু সেদিন অচেতন হয়ে ছিল। আজ কাজলী পুরোপুরি সচেতন! ও নিজের ইচ্ছায় ইউসুফের গা ঘেঁষে বসেছে। ইউসুফের হাত-পা কেমন অবশ হয়ে যেতে লাগল। চোখের সামনে একটা ঘোর লেগে গেল ওর। ও আলতো করে ঘাড় ঘুরিয়ে কাজলীর মুখের দিকে তাকাল। এত কাছ থেকে কাজলীকে দেখতে পাচ্ছে! কাজলী অবশ্য সেদিকে খেয়ালই করেনি, ও অস্থির চোখে বাইরের পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছে। 

ইউসুফের শ্বাস নেওয়াটাই দায় হয়ে উঠেছে। ও বুকভরে শ্বাস নিতে গিয়ে টের পেল, কাজলীর শরীর থেকে একটা মন মাতানো সুবাস ভেসে আসছে। ওটা কিসের ঘ্রাণ? কোনো পারফিউম? নাকি কোনো বডি স্প্রে? মোহাচ্ছন্ন ইউসুফ নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলে উঠল, “এটা কোন পারফিউমের ঘ্রাণ?”

হুট করে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে কাজলী সচকিত হয়ে উঠল। নিজের অবস্থানটা বুঝতে পেরে ও এক ঝটকায় ইউসুফের গা থেকে সরে একদম সিএনজির ওপাশের কোণে গিয়ে বসল। ওর কপালটা অস্বস্তিতে কুঁচকে গেল। 

ইউসুফের কিছু কার্যকলাপ সম্পর্কে জানার পর থেকেই কাজলীর অদ্ভুত এক অস্বস্তি হচ্ছে। সেদিন জামিল কাজলীর মেসেঞ্জারে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট ভিডিও রেকর্ড করা ক্লিপ পাঠিয়েছিল। ক্লিপগুলো ইউসুফ আর কাজলীর।

প্রথম ক্লিপটা, সিলেট ওসমানী মেডিকেলের সামনের। যেদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কাজলীকে পাঁজাকোলা করে তুলে ইউসুফ সিএনজিতে তুলছিল…ওই সময় হাসপাতালের সামনে এক টেলিভিশন সাংবাদিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে লাইভ খবর প্রচার করছিলেন। তার ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছিল ইউসুফের আকুল হয়ে ছুটে যাওয়ার দৃশ্যটা। যদিও সেখানে কাজলী বা ইউসুফের মুখ খুব একটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না, তবে যারা ওই দিনের দৃশ্যটা নিজের চোখে দেখেছে তারা দেখামাত্রই বুঝবে ওটা কাজলী আর ইউসুফই ছিল। 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ক্লিপটা জামিল ইউসুফের বাসার ড্রয়িংরুমে বসেই টেলিভিশনে আবিষ্কার করেছিল! সৌভাগ্যবশত, সেখানে আর কেউ ছিল না!

দ্বিতীয় ক্লিপে, হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছে কাজলী। হয়তো ঘুমে অথবা অচেতন। ওর বিছানার পাশে নিচু হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে পায়ের নখ থেকে একটা একটা করে ময়লা খুঁটিয়ে বের করছে ইউসুফ। অথচ ইউসুফ জন্মানোর পর কখনো নিজের নখ কাটেনি বা নখের কোণ থেকে ময়লা পরিষ্কার করেনি। 

তৃতীয় ভিডিওটা ঝাপসা হলেও কাজলীর বুঝতে অসুবিধে হয়নি। হাসপাতালে থাকাকালীন কাজলীর অবস্থা হঠাৎ খুব বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছিল এবং ডাক্তাররাও চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল… তখন ইউসুফ দেয়ালের সাথে মাথা ঠেকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কাঁদছিল। জামিল সেই দৃশ্যটাও দূর থেকে ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছে। এমন আরও ছোট ছোট অনেকগুলো মুহূর্তের কোলাজ ছিল মেসেঞ্জারে। 

কাজলী একবার ভেবেছিল, এগুলো কি জামিল-ইউসুফ প্রি-প্ল্যান করে ভিডিও করেছিল? নাকি ইউসুফ এসব সম্পর্কে জানেই না। জামিল শুধু বন্ধুর ভালোবাসাটা ধরে রাখার জন্য রেকর্ড করেছে? কে জানে! 

সন্দেহ বুকে নিয়েও কাজলী সেদিন সারারাত ধরে ঘুমহীন চোখে ভিডিওগুলো বারবার রিপিট করে করে দেখছিল। দেখতে দেখতেই ও টের পেয়েছিল, ইউসুফকে সরাসরি মুখের উপর না বলার যে মানসিক শক্তি ওর ছিল, সেটা ও একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে।

হয়তো সেটা কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে, কিংবা ইউসুফের প্রতি জন্মানো সহানুভূতি থেকে। এমন করে কেউ তো তার জন্য কখনো করেনি! কাজলী নিজেকে বোঝায়, এসব অনুভূতি মোটেও ভালোবাসা নয়! প্রেমে পড়ার মতো পরিস্থিতি ওর নেই। ও শুধুমাত্র নিঃস্বার্থ কিছু অনুভূতির ঋণে জড়িয়ে গেছে।

সিএনজিটা তখন রুমেল আর আশিকদের সামনে দিয়েই পার হচ্ছিল। ইউসুফ সাহস করে কাজলীর কাছ ঘেঁষে বসল, যেন বাইরে থেকে ওর অবয়বটাও কোনোভাবে দেখা না যায়। 

শব্দ শুনে রুমেল হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। দেখতে পেল, সিএনজির পেছনের সিটে ইউসুফ বসে আছে। সিএনজিটা ঝিলপাড় বস্তির ভেতরের গলির দিকে ঢুকছে। রুমেল মনে মনে একটু অবাক হলো। ইউসুফের বাড়ি তো বস্তির বাইরে, তাহলে ও অসময়ে সিএনজি নিয়ে বস্তির ভেতরে যাচ্ছে কেন? যদিও আর মাথা ঘামাল না। ইউসুফ বড্ড সরল আর ভালোমানুষ প্রকৃতির। বস্তির কম-বেশি সব স্থানীয় ছেলেপেলের সাথেই রুমেলদের কোনো না কোনো সময় গ্যাঞ্জাম হয়েছে, কিন্তু ইউসুফের সাথে আজ পর্যন্ত কোনো ঝামেলা হয়নি। 

সিএনজিটা যখন কাজলীদের বাড়ির সামনে এসে থামল, কাজলী চট করে নেমে গেল।

ইউসুফ কুণ্ঠিত সুরে বলল, “সরি। তোমাকে যেন দেখা না যায় তাই ওভাবে বসতে হয়েছে।” 

কাজলী ওড়না টেনে মাথায় বড় করে ঘোমটা দিল। সতর্ক চোখে চারপাশটা একবার দেখে নিল। তারপর ঝট করে ঘুরে ইউসুফের দিকে তাকাল। নিজের সাইড ব্যাগের চেইনটা খুলে ভেতর থেকে একটা পুরোনো মখমলের কৌটা বের করল। সেটা ইউসুফের কোলের ওপর বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “যতদিন না আপনার পুরো টাকাটা আমি ফেরত দিতে পারছি, ততদিন এটা আপনার কাছে বন্ধক রইল।”

কথাটা বলেই ও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। ইউসুফকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হনহন করে হেঁটে বাড়ির ভেতরের উঠোনে চলে গেল। 

ইউসুফ মখমলের লাল কৌটাটা খুলল। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে বেশ ভারী একটা স্বর্ণের চেইন। চেইনের সাথে একটা সুন্দর নকশা করা লকেট ঝুলছে, সেই লকেটের ঠিক মাঝখানে খুব যত্ন করে খোদাই করে লেখা ইংরেজী অক্ষর 'K'। ইউসুফ অবশ্য চেইনটার ইতিহাস জানে না। কাজলীর জন্মের পর ওর বাবা জুয়ায় বড় চাল জিতে এটা কাজলীকে উপহার দিয়েছিলেন। লকেটের ওপরের 'K' অক্ষরটা কাজলীর বাবা সে সময় আলাদা করে স্বর্ণকারকে দিয়ে বিশেষভাবে গড়ে নিয়েছিলেন। কাজলীর জীবনের একমাত্র দামি সম্পদ বলতে এটাই অবশিষ্ট ছিল, ওর বাবার জুয়ায় জেতা স্বর্ণ! ঘুরেফিরে অন্যের জিনিস অন্যের হাতেই চলে গেল। 

কাজলী ঘরে পা রাখতেই জোহরা উনুনের পাশ থেকে উঠে এসে প্রশ্ন করলেন, “সকালে সিন্দুক থাইক্যা তোর চেইনটা নিছস কেন ? বেইচা দিছস?”

কাজলী হাত-মুখ ধুয়ে জবাব দিল, “না, বেইচা দেই নাই। ওই ইউসুফ যে, উনারে দিছি। আমার চিকিৎসার পেছনে উনি অনেক টাকা খরচ করছেন। যতদিন উনার ওই টাকা ফেরত দিতে না পারি, চেইনটা উনার কাছেই বন্ধক থাকুক।”

“ও কি তোর কাছে টাকা চাইছে? নাকি চেইন বন্ধক রাখবার কইছে?”

“উনি চান নাই। কিন্তু নিজের একটা বিবেকবোধ আছে না? কারো করুণার ওপর তো আমি বাঁইচা থাকতে পারি না।”

জোহরা আফসোস করে বললেন, “বেক্কল ছেড়ি৷ ওইডা ছাড়া তোর আর স্বর্ণের দানাও নাই।”

“স্বর্ণ দিয়া আমি কী করমু আম্মা?”

“বিপদে-আপদে কাজে লাগত।”

“আপার বিয়ার সময় আপা কি নিজের গলার চেইনটা বেইচা দেয় নাই? ওইটা যদি সংসারের কাজে লাগতে পারে, তবে ধইরা নাও আমিও আমার দরকারে, আমার নিজের চিকিৎসায় এইডা দিয়া দিছি।”

জোহরা বিরক্ত হয়ে হাত নাড়লেন, “তুই বেশি সাধুগিরি দেখাছ। ওরা বড়লোক মানুষ, বিপদের দিনে তোরে একটু সাহায্য করছে। বড়লোকরা কি গরিবরারে সাহায্য করে না? তাই বইলা সেই টাকা আবার কড়ায়-গণ্ডায় ফেরত দিতে হইব?”

কাজলী পিঠ-জবাব দিল না। ও চুপচাপ ঘরের এক কোণে ভাতের থালাটা নিয়ে খেতে বসল। দু-এক গ্রাস মুখে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আশিক আর রুমেল বড় বড় দা-চাপাতি নিয়া মোড়ে দাঁড়ায়া ছিল।”

কথাটা শোনামাত্রই বিছানায় শুয়ে থাকা মারিয়াম ধড়ফড় করে উঠে বসল। জোহরা বুকের বাঁ-পাশটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন। আতঙ্কিত গলায় বললেন, “ তোরে মারনের লাইগা? তোরে কোপাতে চায়? ও আল্লাহ গো। কেমনে আইছস তুই?”

“সিএনজি দিয়া আইছি। এই বস্তিতে আমাগোর আর থাকা যাইব না।”

“কই যামু? কার কাছে যামু? এসব কী কস তুই।” জোহরা কান্নাকাটি শুরু করলেন।

“ঢাকায় চেনা-পরিচিত কেউ নাই?” 

“না। ঢাকায় কেউরে চিনি না।”

কাজলীর কপালে চিন্তার রেখা পড়ল। সব পথ বন্ধ। পেজটা ব্লকড, টাকা-পয়সার চরম সংকট, বোনের ডায়াবেটিসের ইনসুলিন কেনার খরচ, আর এখন মাথার ওপর ঝুলছে আশিকদের চাপাতির ভয়। তবুও ও খাওয়া থামাল না। জীবনটা একটা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে টিকতে হলে শরীরে শক্তি চাই। আগে শান্ত হয়ে খেয়ে নেয়া যাক, তারপর না হয় যুদ্ধ করে মরবে। 

জোহরা হঠাৎ চোখের জল মুছে বলে বসলেন, “কাজলী, তুই এক কাম কর। হাদিছে আছে, জান বাঁচানো ফরজ। আমগোর তো পিঠ ঠেকনের কোনো জায়গা নাই। এই ঘর ছাইড়া আমরা কোন চুলোয় যামু? ওরা বস্তির ছেংরা, রক্ত গরম। আবার ছেংরাদের মনে মায়াও বেশি থাকে। তুই কাল সকালে গিয়া আশিক আর রুমেলের পা ধইরা মাফ চাইয়া নে। পা ধইরা কান্দন জুড়লে ওগো মন একটু গললেও গলতে পারে।”

কাজলীর হাতের ভাতের গ্রাসটা থালাতে পড়ে গেল। আম্মা এটা কী বলল! কীভাবে বলল! পা ধরে মাফ চাইবে? নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য ও এতদিন ধরে যেই হায়েনাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করল…আজ নিজের জন্মদাত্রী মা ওকে সেই নরপশুদের পায়ে লুটিয়ে পড়তে বলছে? এই দিনের জন্য কি এত অপমান সহ্য করল?

জোহরা নিজের কথার পিঠে যুক্তি সাজিয়ে বলছিলেন, “অন্যখানে গেলেই যে ওইহানে এমন বিপদ হইব না, তার কি কোনো গ্যারান্টি আছে? তার থেইকা নিজের ঘরে থাহাই ভালা না? বস্তির দুই-চারজন মুরুব্বিরে নিয়া বসি? তুই একটা বার গিয়া ওগো কাছে মাফ চা কাজলী। দেখবি সব ঠিক হইয়া যাইব।”

কাজলী আর এক গ্রাস ভাতও মুখে তুলতে পারল না। মায়ের কথাগুলো ওর গলায় কাঁটার মতো আটকে গেল। অপমানে ওর বুকটা ভেঙে আসতে চাইল। ও থালাটা জোরে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিল। 

মেয়ের রাগ দেখে জোহরা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, “মাইয়া মানুষের এত তেজ, এত জেদ ভালো না কাজলী। পোলা মানুষ জেদ করলে হয় বাদশা। আর মাইয়া মানুষ জেদ করলে…”

“বেশ্যা হয়! এইডাই তো বলতে চাইতেছ?”

কাজলীর চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তাইলে আমি বেশ্যাই হইলাম!” 

বলেই ও বসার কাঠের টুলটাতে আক্রোশে একটা লাথি মেরে ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল। বাইরের পথের ধারের বুড়ো বড়ই গাছটার তলায় গিয়ে অন্ধকারে চুপচাপ বসে রইল। ওদের ঘরের জানালাটা দিয়ে বড়ই গাছটা একদম পরিষ্কার দেখা যায়। 

কাজলী বেরিয়ে যেতেই মারিয়াম জোহরার দিকে তাকিয়ে অভিমানে বলে উঠল, “এইডা কী কথা কইলা তুমি আম্মা? ওরে তো অপমান করলা? ওরে কি নিজের মতো পাইছ?”

“আমি তো তোগোর জান বাঁচানোর লাইগাই সব সহ্য করতাছি। আর আমারেই তোরা তেজ দেখাছ।”
জোহরা আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছলেন।

“তুমি নিজে গিয়া আজ দুপুরে ঝুনুবিবির পায়ে ধরছো, এখন কাজলীরেও ওগো পায়ে ধরাইতে চাও? এরপর কি আমারেও ওগো পায়ে ধরাইবা?”

“কুত্তার বাচ্চা, তোদের ভালোর জন্যই তো ধরছি! তোদের বাঁচানোর জন্যই তো মানুষের লাথি-ঝাঁটা খাইতাছি।” জোহরা ডুকরে কেঁদে উঠলেন

“আমরা কি তোমারে কইছি ওগো পায়ে ধরতে? কাজলী যদি কোনোভাবে জানতে পারে তুমি দুপুরে ঝুনুবিবির পায়ে ধইরা আসছো, ও এই বাড়ি ছাইড়া চইলা যাইব। আর কোনোদিন মুখ দেখাইব না।”

মারিয়াম মুখ ফিরিয়ে নিল। জোহরা আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতে লাগলেন। তিনি আর কী-ই বা করতে পারতেন? রুমেলের ছোট ভাই বস্তির দায়িত্ব নিতে আসেনি, দায়িত্ব পেয়েছে রুমেল। সারাদিন গাঁজা টেনে বুঁদ হয়ে থাকা উগ্র রুমেল সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বস্তিতে যা খুশি তাই করে বেড়াবে। কাজলীর জীবনটাকে ওরা নরক বানিয়ে ছাড়বে। 

রুমেল বস্তির দায়িত্ব পেয়েছে শোনার পর থেকেই জোহরা শান্তি পাচ্ছিলেন না। ভয় থেকেই তিনি লুকিয়ে ঝুনুবিবির কাছে একটু দয়া ভিক্ষা করতে গিয়েছিলেন, যাতে ওনার মেয়ে দুটোর কোনো ক্ষতি না হয়। আশিককে যেন বোঝায়৷ আশিক বুঝলে, রুমেলও বুঝবে।

জামিল বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছিল। দরজায় এসে দাঁড়াল সিমরান। আচমকা সিমরানকে দরজায় দেখে জামিল ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। অপ্রস্তুত বলল, “আপু? আপনি এখানে? আমাকে ডাক দিতেন, আমিই আপনার রুমে যেতাম।”

সিমরান ওসব ভদ্রতার ধার ধারল না। সরাসরি জামিলের চোখের দিকে চোখ রেখে বরফশীতল গলায় প্রশ্ন করল, “মেয়েটা কে?”

জামিল মনে মনে ধাক্কা খেল। চট করে নিজের চমকে যাওয়া ভাবটা লুকিয়ে বলল, “কোন মেয়ে আপু? কার কথা বলছেন?”

“ইউসুফ কোন মেয়েকে পটাতে চাইছে? কার পেছনে আঠার মতো লেগে আছে?”

জামিল জোর করে শুকনো হাসি মুখে ফুটিয়ে বলল, “আরে আপু, কী যে কন! ইউসুফ কেন মেয়ে পটাইতে যাইব? ওর লগে কি এসব ছ্যাবলামি যায়?”

“আমার সামনে নাটক করিস না জামিল। আমি ওর ফোন চেক করছি। ওর গুগলের সার্চলিস্ট দেখছি। 'কীভাবে মেয়ে পটানো যায়', 'মেয়েদের মন বোঝার উপায়' এসব ফালতু আইডিয়া খুঁজে বেড়াচ্ছে ও।”

জামিল বিস্ময় নিয়ে বলল, “কন কী আপু? আসলেই ও এসব সার্চ করছে?

“তোকে বলছি না নাটক করবি না? আমি খুব ভালো করেই জানি, তুই সবকিছু জানিস। ইদানীং ও ঘন ঘন বাইরে বের হয়, ওর হাঁটাচলার ঢং চেঞ্জ হইছে, জামাকাপড়ের স্টাইল চেঞ্জ হইছে। আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করিস না জামিল।” 

জামিল এবার সত্যি কঠিন সংকটে পড়ে গেল। কাজলীর হাসপাতালে থাকার দিনগুলোতে সিমরানের মেয়ের ভয়াবহ পেটের অসুখ হওয়াতে কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিল ওরা, নয়তো পরদিনই ইউসুফকে অনুসরণ করে ধরে ফেলতে পারত। এবার তো রীতিমতো প্রাইভেসি লঙ্ঘন করে ইউসুফের ফোন ঘেঁটে সব বের করে ফেলেছে! 

জামিলকে চুপচাপ ভাবতে দেখে সিমরান আঙুল উঁচিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল, “আমার চোখ থেকে কিছু আড়াল করে বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারবি না। আমি ঠিক খুঁজে বের করে নেব মেয়েটা কে। প্রেম দুনিয়ায় শুধু ও একাই করছে না, প্রেম আমিও করছি। মেয়ে যদি ভালো ঘরের আর ভালো স্বভাবের হয়, তবে আমি ইউসুফের পাশে আছি। কিন্তু মেয়ে যদি ভালো না হয়…খুব খারাপ দিন অপেক্ষা করতেছে। এটা মাথায় রাখিস। আমার ভাইয়ের জীবন নষ্ট করতে দুনিয়ার কাউকেই দেব না।”

কথা শেষ করে সিমরান যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। দরজার কাছ থেকে ঘুরে আবার বলল, “শুক্রবার রাজকুমারীর মুখে ভাত দেব। কদু কবিরাজ আসবেন। অনেক বাজার-সদাই করতে হবে। আম্মা তোকে ডাকছে, জলদি যা।”

জামিল হাঁফ ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, “রুমে নাকি ছাদে?”

“ছাদে।”

সিমরান চলে গেল। জামিল দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল। যেতে যেতে আকাশের দিকে মুখ তুলে বিড়বিড় করল, “এই জল্লাদ কবে যে দূর হইব আল্লাহ? জামাইয়ের কাছে কবে ফেরত যাইব? ধুমধাম করে বিয়া দিয়া বিদায় করে দিছে, তাও সারাবছর বাপের বাড়ি পইড়া কানকথা গিলে। হে আল্লাহ, তোমার কি এই বাড়ির মানুষগুলার ওপরে একটুও দয়ামায়া হয় না?”

বড়ই গাছটার গা ঘেঁষে একটা ঝোপঝাড়। সেখানে অসংখ্য জোনাকির মেলা বসেছে। যদিও জোনাকির চেয়ে ওখানে মশার উপদ্রবটাই বেশি। ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে কামড়ে কাজলীর পা ফুলিয়ে দিচ্ছে। কামড়ের চুলকানিতে ও অতিষ্ঠ, তবুও একচুল সেখান থেকে নড়ছে না।

রাগে ওর গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। রাগের মাথায় এটাও ভাবছে না, নির্জন অন্ধকারে আশিক যদি ওকে দেখে ফেলে, তবে কী হবে! আশিক যদি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওর ওপর চড়াও হয়? রাগে ভেতর কোনো ভয়, শঙ্কাই দানা বাঁধতে পারছে না।

একটু দূর থেকে ইউসুফ পলকহীন চোখে দাঁড়িয়ে দেখছিল ওকে। জামিল একটু আগে বস্তির ভেতরে ওদেরই মুদির দোকানটায় গিয়েছিল। ফেরার পথে কাজলীকে ওভাবে বড়ই গাছের তলায় বসে থাকতে দেখে ইউসুফকে ফোন করে খবরটা জানাল। ইউসুফ খবরটা শোনামাত্র আর ঘরে স্থির থাকতে পারল না। 

মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। নিজের বিছানায় জামিলকে শুইয়ে রেখে এসেছে ওর রিপ্লেস হিসেবে। যাতে সিমরান আপু এসে ডাকলে জামিল সামাল দিতে পারে।

আসার সময় তাড়াহুড়ো করে একটা অফ হোয়াইট রঙের ফতুয়া গায়ে চড়িয়ে এসেছে। অনেকক্ষণ হলো ও এসেছে। কিন্তু কাজলীর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছে না। মেয়েটা যেভাবে রাগে ফুঁসছে, সামনে গিয়ে কথা বলা কি ঠিক হবে?

ইউসুফ নিজেও জানে না ও ঠিক কবে, কোন শুভক্ষণে কাজলীর প্রেমে পড়েছিল। ওর শুধু মনে আছে, সওদাগর বাড়ির পেছনে একটাবড় শ্যাওলা পড়া পুকুর ছিল। সেই পুকুরের পাড় ঘেঁষেই ছিল একটা বিশাল সবুজ মাঠ। বিকেল হলেই সেই মাঠে এলাকার স্থানীয় ছেলেরা মিলে খেলাধুলা করত। ইউসুফও নিয়ম করে প্রতিদিন সেখানে খেলতে যেত। 

সওদাগরের ছোট ছেলে রুশদ ওদের সাথেই খেলত। তখন কাজলীর বয়স বড়জোর সাত বছর। কাজলীর মা আছিয়া বেগম মাঝেমধ্যে কাজলীকে মাঠে পাঠাতেন রুশদকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কাজলী এসে মাঠের এক কোণে চুপচাপ ঘাসের ওপর বসে থাকত আর একমনে ওদের খেলা দেখত। 

ইউসুফের মা, বোনেরা বড্ড স্নেহপ্রবণ থাকায় দুই ঘণ্টার খেলার মাঝে অন্তত দুইবার বাড়ি থেকে ইউসুফের জন্য নাস্তা পাঠিয়ে দিত। মাঠের বাকি ছেলেরা মাঝেমধ্যে ইউসুফের অলক্ষ্যে নাস্তার বাটি লুকিয়ে সাবাড় করে দিত। কাজলী এক কোণ থেকে সব দেখত। ও তখন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে ইউসুফকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ইশারায় দেখাত, খাবার খেয়ে নিচ্ছে তো!

ইউসুফ কিছু বলত না। ও একদৃষ্টে কাজলীর মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়া দেখত। কাজলী তখন ছোট ছোট রঙিন ফ্রক পরত। মাঠ থেকে দূরে গিয়ে ও আবার পেছন ফিরে তাকিয়ে সবার খেলা দেখার চেষ্টা করত। ইউসুফের খুব ইচ্ছে করত, একলা বসে থাকা মেয়েটাকে ডেকে একবার নিজেদের খেলায় নামিয়ে নিতে। কিন্তু কে কি ভাববে সেই ভয়ে ও কোনোদিনও তা পেরে ওঠেনি। 

আবার ইউসুফ যখন স্কুল ছুটির পর মায়ের সাথে হেঁটে বাড়ি ফিরত, দূর থেকে দেখত, কাজলীও তখন প্রাইমারি স্কুল থেকে ফিরছে। ফেরার পথে ও রাস্তার ধার থেকে প্লাস্টিকের পুরোনো বোতল কুড়াত। সেগুলো ভাঙারির দোকানে বেচে যে দু-চার টাকা পেত, তা দিয়ে একটা লালচে ছমছম মিষ্টি কিনে খেতে খেতে সওদাগর বাড়ির দিকে হেঁটে যেত। ইউসুফের তখন ইচ্ছে করত, নিজের জমানো সব টাকা দিয়ে কাজলীকে এক ঠোঙা ভরা ছমছম কিনে দিতে। কিন্তু সংকোচে সেটাও কোনোদিন করে উঠতে পারেনি। 

তখন কাজলীর বয়স বড়জোর নয় কি দশ। একদিন ভরদুপুরে হঠাৎ আকাশ ভেঙে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলো। ইউসুফ তখন হাইস্কুল থেকে ফিরছিল। ওর গায়ে ছিল রেইনকোট। মাথায় ছিল মস্ত বড় ছাতা। রাস্তার মোড়ে আসতেই ও দেখত পেল কাজলীকে। কাজলী স্কুল থেকেই বাড়ি ফিরছিল। ওর হাতে একটা পুরোনো, তালি দেওয়া কালো ছাতা। বাতাসের ঝাপটায় ছাতার একটা শিক ভেঙে কাপড়টা একপাশে ঝুলে পড়েছে। কাজলী ওই ভাঙা ছাতাটা দিয়েই কোনোমতে নিজের বইয়ের ব্যাগটা বুকের সাথে চেপে ধরে বৃষ্টি ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। ঝোড়ো হাওয়ায় ও কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিল না। ওর ফ্রক, মাথার চুল ততক্ষণে ভিজে লেপ্টে গেছে। বাতাসে ওর ছোট শরীরটা কাঁপছিল। অথচ মেয়েটার জেদ ছিল দেখার মতো৷ ও একবারের জন্যও রাস্তার কোনো দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নেয়নি। সবখানে ছেলেদের ভিড়! ভাঙা ছাতাটা মাথায় দিয়েই মাথা নিচু করে বৃষ্টির তোড় ঝাপটা সয়ে সয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ইউসুফের সেদিনও ইচ্ছে করছিল নিজের বড় ছাতাটা কাজলীর মাথার ওপর মেলে ধরতে, কিংবা নিজের রেইনকোটটা ওকে দিয়ে ও নিজে ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরতে। ও কাজলীর ঠিক কয়েক কদম পেছন পেছন আসছিল। কিন্তু ওই যে সমাজ আর লোকলজ্জার ভয়! 

ইউসুফ শুধু দূর থেকে দেখল, কাজলী ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে একসময় সওদাগর বাড়ির গলিতে ঢুকে গেল। সেদিন বাড়ি ফিরে ইউসুফের নিজের ওপর খুব রাগ হলো। কাজলীর জ্বর আসার বদলে ওর গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো।  

এভাবেই দূর থেকে অবহেলায় বড় হওয়া মেয়েটাকে দেখতে দেখতে, ওর প্রতি মায়া জমতে জমতে ঠিক কবে যে ইউসুফ কাজলীকে নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে, তা ও নিজেও টের পায়নি।

ইউসুফ এক পা, দুই পা করে সামনে এগোতে লাগল। কাজলী কি অনেক রেগে আছে? ছোটবেলা থেকে ওর জন্য কত কিছু করার ইচ্ছে হয়েছে, মনের কত কথা বলার সুপ্ত সাধ জেগেছে, কিন্তু কোনোদিন ও তা পেরে ওঠেনি। আজ ওর খুব বলতে ইচ্ছে করছে, বছর বছর ধরে বুকে চেপে রাখা ভালোবাসার কথা। আজ ও আর এক কদমও পিছপা হবে না। বড় জোর কাজলী রেগে গিয়ে ওর গালে একটা থাপ্পড়ই না হয় দেবে! দিক, ও সেই আঘাতও সুখ ভেবে বরণ করে নেবে।

শুকনো পাতার ওপর কারো পায়ের শব্দ পেয়ে কাজলী ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ইউসুফকে দেখে ও বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। চটজলদি দাঁড়িয়ে সোজা চলে যেতে নিল। 

অবস্থা বেগতিক দেখে ইউসুফ আকুল গলায় বলল, “কাজলী, দাঁড়াও। কিছু কথা বলতে চাই প্লিজ।”

কাজলী শিকারির মতো চোখ করে ওর দিকে তাকাল। ধারালো গলায় বলল, “এত রাতে কীসের কথা? আমার কপালে কি নতুন করে বদনাম জোটাতে চান?”

“কেউ নেই আশেপাশে। একটা কথা বলেই চলে যাব।” 

“আমি আপনার কোনো কথাই শুনব না। আপনি কি বুঝতে পারছেন না, আমি আপনাকে ইচ্ছে করে ইগনোর করছি?”

বলেই কাজলী বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

ইউসুফ মরিয়া হয়ে বলে উঠল, “কাজলী, কাজলী প্লিজ একটা বার দাঁড়াও…” ও গলার জোর কিছুটা বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “তুমি আমার দুই জাহানের ভালোবাসা হবে, কাজলী?”

’দুই জাহানের ভালোবাসা!’ শোনামাত্রই কাজলী থমকে গেল। ওর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি পলকের মধ্যে লুটোপুটি খেয়ে গেল। এই যুগে মানুষ তো বড়জোর এক রাতের বা কয়েকদিনের প্রেমের আশ্বাস দেয়, সেখানে দুনিয়া আর আখিরাত উভয় জাহানের জন্য কাউকে নিজের করে চাইতে পারে কয়জন? কাজলী ভেবেছিল ও হয়তো অন্য ছেলেদের মতো আই লাভ ইউ বলবে। বা বড়জোর, আমি তোমাকে ভালোবাসি।  

এই প্রশ্নের কোনো ইতিবাচক উত্তর দেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয়। ও তো ইউসুফকে ভালোবাসে না! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, অন্য কোনো ছেলে হলে ও এতক্ষণে মুখের ওপর কড়া ভাষায় রিজেক্ট করে তাড়িয়ে দিত, অথচ ইউসুফকে ও চট করে রিজেক্ট করতে পারছে না। ও ঠিক করল, কোনো উত্তরই দেবে না। মৌনতাই হোক ওর ঢাল। 

কাজলী আবার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল। ইউসুফ হাল ছাড়ল না। কাজলীর পেছন পেছন কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটতে হাঁটতে দ্রুত বলতে লাগল, “আমি ভাত রান্না করতে পারি, ডিম ভাজি করতে পারি, আলু ভর্তাও পারি। বাকি যা যা লাগবে, ইউটিউব দেখে শিখে ফেলব। তোমাকে রাঁধতে হবে না, তুমি চাকরি করবে৷”

কাজলী থামল না। শুধু ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল৷ মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে ছাদে পিকনিক করতে গিয়ে একটু-আধটু রেঁধে বা হাত লাগিয়ে, এখন লোকটার ভাবখানা এমন যেন মস্ত বড় কোনো শেফ হয়ে গেছে!

কাজলী বাড়ির মূল দরজার কাছে এসে পড়েছে। ও ভেতরে ঢুকেই যাবে, ইউসুফ ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে বলল, “আমি তোমার সঙ্গে মরতেও পারব।”

কাজলী দরজার চৌকাঠে হাত রেখে শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। বলল, “কিন্তু আমি তো বাঁচতে চাই।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp