সকালের দিকেই মমতাজ খন্দকার এসেছেন হাসপাতালে। রিতা এসেছে সাথে। রতন নাকি শহরের বাইরে আছে, ফিরতে সন্ধ্যা হবে। এ কারণেই জুনায়েদ নাটোরে যেতে পারেনি। অন্তত একজন পুরুষ মানুষকে থাকতে হবে।
বেলা ১১টার কাছাকাছি সময় এলেন ডাক্তার আজিম। মারুফ তখন চোখ খুলেছেন। সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, কোনো কথাবার্তা নেই। আজিম তার কাছে কোনো প্রতিক্রিয়াও চাইলেন না। বেশ কিছুক্ষণ রোগীকে নিরীক্ষণ করার পর তিনি কেবিনের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ইশারায় জুনায়েদকে ডাকলেন। তার পিছু পিছু মৌমিতাও বেরিয়ে এলো বাইরে।
“মাইনর স্ট্রোক। মাহফুজ বোধহয় জানিয়েছে?”
মৌমিতা মাথা নাড়ে, “জ্বী।”
আজিম কপাল চুলকে খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, “ওনার শরীর কিন্তু আরও আগে থেকেই খারাপ। আমি ধারণা করছি, এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একবার স্ট্রোক হয়েছে।”
কথাটা হজম করলো মৌমিতা, তবে প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে পারলো না। জুনায়েদ বলে ওঠে, “এখন? উনি কি সুস্থ হবেন না?”
“দেখুন। আমরা একশো ভাগ গ্যারান্টি দিতে পারছি না। ওনার ব্রেইনের ডান পাশে সমস্যা হয়েছে। শরীরের বাম পাশটা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। আর উনি হয়তো কথাও বলতে পারবেন না আগের মতো। কথায় জড়তা আসবে, কিছু বললেও আপনারা বুঝবেন না, উনি কী বলছেন। আপনাদেরকে চিনতেও বোধহয় অসুবিধা হবে ওনার।”
হাসপাতালের এই করিডোরটা একটু ভেতরের দিকে। দূরে একটা জানালা আছে, সেটা দ্বারা পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল হওয়ার কথা না। গুমোট হয়ে আছে চারপাশ, বায়ুপ্রবাহ যেন থমকে আছে। মৌমিতার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কারণটা বাহ্যিক নাকি অভ্যন্তরীণ, তার বোধগম্য নয়। আজিম সাহেব পরবর্তী কথাটা বলার আগে জুনায়েদ বড় একটা শ্বাস নিয়ে বললো, “উনি আর আগের মতো হবেন না? এসব আটকানোর উপায় নেই?”
ডাক্তার আজিম বললেন, “সম্ভবত... না।”
“তাহলে? চিকিৎসা করিয়েও কোনো লাভ হবে না?”
“উন্নতি হয়তো হবে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি, কোনো অবনতি যেন না হয়। আর আপনারাও চেষ্টা করবেন। ওনার মাথায় যেন কোনোভাবেই কোনো টেনশন না আসে। কোনো ব্যাড নিউজ যেন ওনার কানে না যায়। নাহলে কিন্তু সিচুয়েশন আর আমাদের কন্ট্রোলে থাকবে না। আমরা কিছুই করতে পারবো না।”
“জ্বী, বুঝেছি।”
“আমার ব্যস্ততা খুব বেশি, বুঝতেই পারছেন। যদি কোনো জরুরি অবস্থায় আমাকে না পান, মাহফুজের সাথে যোগাযোগ করবেন। আমি না থাকলে আমার কেইসগুলো ও-ই দেখে।”
জুনায়েদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ভদ্রলোক চলে যেতেই সে মৌমিতার দিকে ঘুরলো, “চিন্তার কিছু নেই। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আমাদেরকে দুশ্চিন্তায় দেখলে কিন্তু চাচা নিজেও ভেঙে পড়বেন।”
মৌমিতা কথাগুলো শুনেছে কিনা—বোঝা গেলো না। তার দৃষ্টিও অনড়। জুনায়েদ জিজ্ঞেস করে, “মার্জিয়া জানে কিছু?”
সে মুখ তুলে তাকালো জুনায়েদের দিকে, যান্ত্রিক স্বরে বললো, “না।”
“জানাতে হবে—”
“আমি জানিয়ে দেবো।”
ছেলেটা ‘আচ্ছা’ বলেই দ্রুত করিডোরের আরেকদিকে যেতে শুরু করলো। মেয়েটাও আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। কেবিনের ভেতরে চলে এলো। একজন সেবিকা তখনও কথা বলছে রাবেয়াদের সাথে। মৌমিতা চৌকির এক কোণে গিয়ে বসে পড়ে। সামনের চৌকিতে আধশোয়া হয়ে বসে থাকা মারুফের দিকে তাকায় সে। দেয়ালের কিছু জায়গায় রং খসে পড়েছে, সিমেন্টের মলিন আবরণ দেখা যাচ্ছে। ভদ্রলোক সেগুলোই দেখছেন মনোযোগ দিয়ে।
মমতাজ খন্দকার খুব কৌতূহল নিয়ে মৌমিতার পাশে এসে বসলেন, তার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “ডাক্তার কী বললো মৌ?”
মৌমিতা মাথা ঘুরিয়ে বোকার মতো প্রশ্ন করে, “কী?”
“ডাক্তার কিছু বলেছে?”
“ওহ। হ্যাঁ। বললেন, অনেককিছুই।”
“কী কী বললো?”
মেয়েটা শূন্য দৃষ্টিতে ফুপুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে, তারপর তার নজর যায় ফুপুর পাশে বসে থাকা রাবেয়ার কৌতূহলী মুখের দিকে। সে মোটামুটি সচেতন হয় পরিবেশ সম্পর্কে, “আব্বার সামনে দুশ্চিন্তার কথা বলতে বারণ করেছেন।”
মমতাজ আর কিছু বললেন না, ছোট ভাইটার মুখের দিকে দেখলেন।
রিতা চৌকির এক পাশে চলে এলো, মৌমিতার হাত ধরে বললো, “বাইরে চলো তো একটু।”
ইচ্ছে না থাকলেও সে উঠে দাঁড়ায়। দু'জনই কেবিনের বাইরে আসে। রিতা ব্যস্তভাবে প্রশ্ন ছোঁড়ে, “কী হয়েছে মৌ? কিছু বলতে চাচ্ছো না যে?”
মৌমিতা আর প্রতিরোধ করে না, বড় একটা শ্বাস ফেলে কাঁপা স্বরে বলে, “আব্বার বাম পাশটা নাকি অবশ হয়ে যেতে পারে। আব্বা কাউকে চিনতে পারবেন না, কথাও বলতে পারবেন না আগের মতো...”
রিতার ভ্রু জোড়া কুঁচকাতে থাকে। সে বেশ ধীরেসুস্থে বলে, “অতো চিন্তা করো না। আল্লাহ আল্লাহ করো, সব ঠিক হয়ে যাবে। মামা তো ভালো মানুষ, ভালো কিছুই হবে।”
রাবেয়া মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছেন। মাথা ধরেছে। চোখের পাতা জোর দিয়েই বন্ধ করে রেখেছেন। চোখ খুললেই তো স্বামীর ঐ মুখটা দেখতে হবে। সহ্যও হবে না, কিছু করাও সম্ভব হবে না।
স্বাস্থ্যবান মানুষটা এতো দ্রুত এভাবে শুকিয়ে গেলেন। এভাবে নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়েছেন। এতোকিছু মেনে নেওয়ার মতো সহনশীলতা রাবেয়ার নেই।
দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে তিনি আড়চোখে সেদিকে তাকালেন। মৌমিতা প্রায় টলতে টলতে পাশে এসে বসলো। রিতা এলো না, নিজের মাকে ইশারায় বাইরে ডাকলো। মমতাজ চলে যাওয়ার পর রাবেয়া ভালোভাবে ঘুরে বসলেন মৌমিতার দিকে, “মৌ? কী কথা হলো ডাক্তারের সাথে?”
মৌমিতা ওড়না দিয়ে মুখ মুছলো। আম্মার প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে আব্বার দিকে তাকালো। তিনি এখনও দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
“আপনি আব্বার সাথে কথা বলেননি একবারও?”
“বললাম তো কয়েকবার। তোমার আব্বা কোনো উত্তর দেয় না।”
মৌমিতা এতো সহজে বিশ্বাস করতে চাইলো না। এই শীতল পরিবেশে তার দেহের তাপমাত্রাও যেন তরতর করে কমে যাচ্ছে। চাদরটা ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে সে উঠে দাঁড়ালো, পাশের চৌকিটার দিকে এগিয়ে গেলো। তার চোয়ালদুটো যেন পরস্পরের মাঝে দৃঢ়ভাবে আটকে যাচ্ছে। তবু মেয়েটা বহু কষ্টে উচ্চারণ করলো, “আব্বা?”
মারুফ খন্দকার মেয়ের দিকে ঘুরে তাকালেন, অকারণে হাসলেনও একটু। ঐ হাসিটুকু দেখে মৌমিতার চোখ ভিজে আসে, সে ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলে কোনোমতে অশ্রু আটকায়, “এখন কি ভালো আছেন?”
রাবেয়া উঠে এসে মৌমিতার পাশে দাঁড়ালেন। মনোযোগ দিয়ে স্বামীর মুখখানির দিকে চেয়ে রইলেন। আদরের বড় মেয়েটা জানতে চেয়েছে, তিনি ভালো আছেন কিনা; এবার তিনি নিশ্চয়ই জবাব দেবেন!
মারুফ আবার হাসলেন, জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন। কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নিলেন খানিকক্ষণ। বলতে পারলেন না কিছু। মুখের হাসিটাও ম্লান হতে লাগলো ধীরে ধীরে। মৌমিতার অস্থিরতা দ্বিগুণ হয়ে গেলো। সে মারুফের ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে ধরলো, আবারও বললো, “কিছু একটা বলেন, আব্বা। চেষ্টা করেন।”
তিনি চেষ্টা করলেন। ঠোঁট নড়লো, কোনো আওয়াজ বের হলো না। রাবেয়া মুখে আঁচল চাপা দিলেন। তার মাথায় এখন ভয়ানক যন্ত্রণা হচ্ছে। মারুফ এসবের কারণ বুঝলেন কিনা—বোঝার উপায় নেই। তিনি কেবল স্ত্রী-সন্তানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন।
“আব্বা? আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
তিনি জোরে জোরে মাথা নেড়ে জানালেন, চিনতে পেরেছেন। মৌমিতা চোখ মুছলো, “তাহলে বলেন তো, আমি কে?”
মারুফ যথাসম্ভব নড়েচড়ে বসলেন, ঢোক গিললেন কয়েকবার। কপাল কুঁচকে নিঃশব্দে হয়তো বললেনও কিছু। দুই হাতের মাঝে থাকা আব্বার হাতখানি দৃঢ়ভাবে ধরে মৌমিতা বলে, “আব্বা, একবার 'মা' বলে ডাকেন তো দেখি? বলেন তো মৌ মা, বলেন?”
মারুফ মাথা নাড়লেন, সদ্য বলতে শেখা শিশুর মতো ডেকে উঠলেন, “মও মা... মও মা...”
মৌমিতা মারুফের হাতটা তুলে নিজের কপালে ধরলো, মুখ লুকিয়ে ফেললো, তার জামার হাতা ভিজতে লাগলো চোখের পানিতে। মারুফ এতোকিছু খেয়াল করলেন না, আর কিছু ভেবেও দেখলেন না। তিনি নিজ দায়িত্বে কপাল থেকে সরিয়ে হাতটা রাখলেন মেয়ের মাথায়; সস্নেহে, কাঁপতে থাকা হাতখানি তার মাথায় বুলিয়ে বললেন, “মও মা।”
মেয়েটার ভেতরে বাহিরে সব যেন ভেঙেচুরে গেলো একেবারে। রাবেয়া তাকে শক্ত করে ধরলেন, সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন। নিজের আঁচল দিয়ে তার চোখ-মুখ মুছে দিতে দিতে বললেন, “শান্ত হও মা। এখানে বসো দেখি।”
মৌমিতা আব্বার পায়ের কাছে বসলো। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টাও করলো। রাবেয়া তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। জোর করে হেসে বললেন, “আরে শোনো, তোমার আব্বা তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। সবাই আছি। আমি একা একা তো অতো দেখাশোনা করতে পারতাম না। এখন তুমি আছো। ওনাকে আর অনিয়ম করতে দেবো না।”
মৌমিতা ব্যথিত দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকালো, “আমি ছোট বাচ্চা নই আম্মা। আর আমার কান্না থামিয়ে কি আপনি সব ঠিক করতে পারবেন? আমি শান্ত হলে সব ঠিক হয়ে যাবে? আমার জন্য... আমার জন্যই আব্বার এই অবস্থা!”
“পাগলি!” রাবেয়া কৃত্রিম ক্ষোভ দেখালেন, “তোমার কোনো ক্ষমতা আছে মানুষকে অসুস্থ করার? সব আল্লাহর ইচ্ছা। আমাদের হাতে কিছুই নেই।”
মৌমিতা হতাশ হয়ে বসে রইলো। রাবেয়া মারুফের দিকে এগিয়ে এলেন, হাসিমুখে সহজভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু খাবেন আপনি? কাল রাত থেকে তো কিছুই খাননি।”
মারুফ চোখ দিয়ে মৌমিতার দিকে ইশারা করলেন। রাবেয়া বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, “কী?”
“মও।”
“হ্যাঁ। কী হয়েছে? মৌকে... খেতে বলবো?”
মারুফ খুশি হয়ে উপর-নিচে মাথা নাড়লেন, তারপর আঙুল দিয়ে রাবেয়াকেও দেখালেন। অন্যদিকে মুখ ঘোরালেন রাবেয়া, চোখ মুছে একটা মিথ্যে বললেন, “আমরা খেয়েছি। এখন আপনি কিছু খান। খালি পেটে কতোক্ষণ থাকবেন?”
মারুফ আর কিছু বলার চেষ্টা করলেন না। রঙচটা দেয়ালটার দিকে তাকালেন আবারও।
—————
ফোন অনেকক্ষণ ধরে বাজলো, কেউ ধরলো না। মৌমিতার ধৈর্যের বাঁধ প্রায় ভেঙেই যাচ্ছিলো, ঐ মুহূর্তে কেউ বলে উঠলো, “হ্যালো, কে আপনি?”
“আসসালামু আলাইকুম মামা। আমি মৌমিতা।”
রিপন হেসে বলে, “ওহ, মৌ! ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কী অবস্থা তোমাদের?”
“মামা... আব্বা খুব অসুস্থ।”
“কী হয়েছে? শোনো, ওনাকে বলো, টেনশন একটু কম করতে।”
“আমরা রাজশাহীতে। মেডিকেল কলেজ হসপিটালে।”
রিপন একটু সময় নিলো এবার, “হসপিটালে? কী হয়েছে মারুফ ভাইয়ের?”
“স্ট্রোক করেছে।” মৌমিতা মজবুত থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করলো, “মার্জিয়াকে একটু নিয়ে আসতে পারবেন? ওকে আগে আগে কিছু বলবেন না।”
“ঠিক আছে। কোনো চিন্তা করার দরকার নেই। দেখি, কাল-পরশুর মধ্যে যাওয়া যায় কিনা। আপা ভালো আছে?”
“হ্যাঁ, আম্মা ভালো আছেন।”
“আচ্ছা। আপাকেও বলো যেন বেশি চিন্তা না করে। নাহলে তো একসাথে সবাই অসুস্থ হয়ে যাবা। রাখি এখন। কাল-পরশুর মধ্যেই যাবো নাহয় ওকে নিয়ে। রাজশাহীতে, না?”
“জ্বী।”
“আচ্ছা আচ্ছা।”
ফোনটা কেটে গেলো। মৌমিতার মাথায় তখন আরেক ভাবনা এলো। বাদলের মেসের নাম্বারটা তার মুখস্থ। সেটাই ঝটপট ডায়াল করলো সে। অল্প সময়ের মধ্যেই কেউ ফোন ধরলো, “কে বলছেন?”
মৌমিতা তাড়াহুড়ো করে বলে ওঠে, “বাদলকে পাওয়া যাবে?”
“বাদল? উনি তো মেস ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন।”
“চলে গেছে?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায় গেছে?”
“সেটা বলতে পারছি না।”
“আচ্ছা। ধন্যবাদ।”
হাসপাতালের এই বিশ্রামাগারে আলোর সংকট। সামনের বাল্বদুটো নষ্ট। সবই কেমন যেন ঘোর ঘোর দেখায়।
মৌমিতা নলটা চালু করলো। জল পড়ার শব্দে বাইরের কোলাহল চাপা পড়লো কিছুটা। মেয়েটার উদ্দেশ্য ছিলো কান্নার শব্দটাও লুকিয়ে ফেলা। কিন্তু সে কাঁদতে পারলো না। সামনের আয়নায় নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইলো। হাত ধুতে গিয়ে চমকে উঠলো, পানিটা খুব ঠাণ্ডা। সে নল বন্ধ করে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বাহিরটা অন্ধকার হয়ে এসেছে।
নিজেকে আঘাত করার ইচ্ছে করলো মৌমিতার। তার অপরাধের শাস্তি পাচ্ছে আশেপাশের সবাই। এতোদিন তার জেদ আর একগুঁয়েমির আড়ালে চাপা পড়ে থাকা স্ববিরুদ্ধ যুক্তিগুলো একে একে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।
আসলেই তো! বয়সে ছোট একটা ছেলেকে নিয়ে কেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে হবে? আবেগের বয়সটা সে পেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। তবু বিবেক কেন কাজ করলো না এতোদিনেও? এখন প্রায়শ্চিত্তের উপায়?
বাদলের কোনো খোঁজ নেই। মৌমিতা শত চেষ্টা করলেও তার খোঁজ পাবে না। যতোক্ষণ না সে নিজে থেকে যোগাযোগ করবে। কিন্তু যোগাযোগ করবেই বা কীভাবে? সে তো আর জানে না, মৌমিতা কোথায়। বাড়ির ল্যান্ড লাইনে কল করে তো কাউকে পাওয়া যাবে না। তাছাড়া সে আদৌ যোগাযোগ করতে চায় কিনা, সেটাও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মৌমিতা চাদরের কিনারায় হাত মুছতে মুছতে কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজা খোলা। রতন এসেছে। মারুফের সাথে কথা বলছে, “আমাকে চিনতে পেরেছেন মামা?”
মারুফ মাথা নাড়লেন, চিনতে পেরেছেন। কিন্তু নাম জানতে চাইলে তিনি হা করে ভাগ্নের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। রতনও আর জোর করলো না।
মৌমিতা দেয়াল ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে তার আম্মার পাশে এসে দাঁড়ায়, নিচুস্বরে বলে, “জুনায়েদ ভাই চলে গেছে?”
রাবেয়া মাথা দোলালেন, “হ্যাঁ। একটু আগেই গেলো। তুমি কোথায় ছিলা এতোক্ষণ?”
মেয়েটা উত্তর দেয় না। অন্যমনস্ক হয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে কেবিন থেকে। সামনে রাখা বেঞ্চটাতে বসে পড়ে চুপচাপ।
কিছুক্ষণ পর রতনও বেরিয়ে এলো। মৌমিতাকে প্রথমে খেয়াল করলো না। খেয়াল করার পরেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো কিছুটা সময়। তারপর পাশে গিয়ে বসলো, “মৌ? কী অবস্থা?”
মেয়েটার চেহারায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেলো না। সে যান্ত্রিক স্বরে জবাব দিলো, “যেমন হওয়ার কথা।”
রতন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মেঝের দিকে তাকায়, “কী আর করবা? এসব তো আমাদের হাতে নাই। খেয়েছো কিছু?”
“খিদে নেই।”
“খেতে হবে তো। মামিও বোধহয় খাননি। এমন করলে তো গোটা পরিবার একসাথে অসুস্থ হয়ে যাবে। তখন কে কাকে সামলাবে?” রতন উঠে দাঁড়ালো, “চলো, বাইরে থেকে কিছু খেয়ে আসি।”
“আপনি যান।”
“না খেয়ে থাকবা?”
“পরে খাবো।”
রতন আর কথা না বাড়িয়ে হাসপাতালের ক্যাশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলো। সেখানেই কারও সাথে আলাপ করতে লাগলো। মৌমিতা শূন্য দৃষ্টিতে ওদিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আসলেই খিদে পেয়েছে। শরীরটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মাঝেই হয়তো চারপাশ দুলতে শুরু করবে। নতুন কোনো ঝামেলা তৈরি করা যাবে না এখন। যতো দ্রুত সম্ভব কিছু একটা খেতে হবে। রাবেয়াও কিছু খাননি।
মৌমিতা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। রতনকে আর দেখা গেলো না, বাইরে গেছে বোধহয়। মেয়েটা গভীর একটা শ্বাস টানলো। এদিকে কোথাও হোটেল আছে কিনা, দেখতে হবে। বেশ শীত পড়েছে। মনে করে কিছু গরম পোশাক আনা উচিত ছিলো।
করিডোরে কোলাহল, ভিড় কমেছে একটু। চারপাশে চোখ তুলে তাকাতে তবুও অলসতা কাজ করলো মৌমিতার। সে শুধু ঐ তরুণ চিকিৎসককে এগিয়ে আসতে দেখলো। তার পা দুটো চলাচল বন্ধ করে দিলো অকারণে।
সুজয়ের দুই হাতেই পলিথিনের ব্যাগ, সে মৌমিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, “এই কেবিনে আপনার পেশেন্ট না?”
মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়ে, “জ... জ্বী।”
“পেশেন্টকে বাইরের কিছু খাওয়াবেন না। সেন্স ফিরেছে যেহেতু, হসপিটাল থেকে ওনার ডায়েট চার্ট দেওয়া হবে, খাবারও দেওয়া হবে। আর...” হাতের ব্যাগ দুটোর দিকে ইঙ্গিত করলো সে, “এখানে দুইজনের খাবার আছে। আপনাদের দুইজনের। ভিজিটরদের জন্য কিছু দেওয়া যাচ্ছে না আপাতত।”
মৌমিতা ভ্রু কুঁচকায়, “মানে? আমাদের খাবারও হসপিটাল থেকে সাপ্লাই দিবে?”
“প্রতিদিন দেওয়া হবে না। আজ আপনারা ব্যস্ত ছিলেন, তাই আমি আনলাম।”
একটা শুষ্ক ঢোক গিলে মেয়েটি ঘাড়ে ঝুলতে থাকা ব্যাগটার চেইন খুলতে শুরু করে, “কতো টাকা লাগলো?”
“লাগবে না। আপনাদের মধ্যে একজন বিল দিয়েছেন। ঐ যে, রতন নামের একজন।”
“ওহ আচ্ছা।”
ব্যাগদুটো মেয়েটার হাতে দিয়ে সুজয় বলে, “আপনাকে একবার আজিম স্যারের চেম্বারে আসতে হবে। মনে করে চলে আসবেন।”
—————
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে বেশ দেরি হয়ে গেলো। মারুফ শক্ত খাবার খেতে পারছেন না। রাবেয়া নরম ভাত মেখে তাকে খাইয়ে দিয়েছেন।
মমতাজ খন্দকার খুব জোর করলেন রাতটা তাদের বাড়িতে থাকার জন্য। কিন্তু রাবেয়া বা মৌমিতা, কাউকে রাজি করাতে পারলেন না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, রতনও আজ হাসপাতালে থাকবে। হাসপাতালে দু'জন মহিলা মানুষ রাতে একা রোগীর সাথে থাকবে—ব্যাপারটা ভালো দেখায় না।
মমতাজ আর রিতা চলে গেছেন বেশ কিছুক্ষণ হলো। রাবেয়া বিছানা ঠিকঠাক করছিলেন, মৌমিতা প্রেসক্রিপশনে চোখ বোলাচ্ছিলো। এ সময়ে একজন সেবিকা এলো কেবিনে, বললো, “ম্যাম, আপনি কি একটু আসতে পারবেন?”
মৌমিতা পেছনে ঘুরলো, “জ্বী, আসছি।”
তারা দু'জন ডা. আজিমের চেম্বারে ঢুকলো। আজিম তখন সুজয়ের সাথে কথা বলছিলেন। মৌমিতাকে দেখে বললেন, “আসুন। আপনাকে কয়েকটা জিনিস বুঝিয়ে দেই।” তিনি একটা ফাইল হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন, “রিপোর্ট দেখেছেন?”
মেয়েটা মাথা দোলায়, “জ্বী।”
“আচ্ছা। এখানে আপনার সই লাগবে। যেদিন এসেছেন, ঐদিন জুনায়েদ নামের একজন সিগনেচার দিয়েছিলেন। কিন্তু উনি পেশেন্টের ফ্যামিলি মেম্বার নন।”
মৌমিতা ফাইলটা হাতে নিয়ে ভালোভাবে দেখতে লাগলো। আজিম বললেন, “কোনো সমস্যা দেখলে মাহফুজকে জানাবেন। আমি ডিউটিতে যাচ্ছি।”
ভদ্রলোক চলে যেতেই ফাইলের উপর থেকে মেয়েটার মনোযোগ সরে গেলো। সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে খানিকটা কঠোর স্বরে বললো, “আপনি ডক্টর মাহফুজ?”
“জ্বী।”
আজ সুজয়ের অ্যাপ্রোনে নেমপ্লেটটা নেই। তবে গলায় একটা আইডি কার্ড ঝুলিয়ে রেখেছে সে। সেটার নীল ফিতেটাই কেবল দেখা যাচ্ছে। কার্ডখানি বুকপকেটের ভেতর ঢুকিয়ে রাখা। তাকে অযথাই আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে মৌমিতা বলে, “আমাকে মিথ্যা না বললেও পারতেন।”
“কী?”
সুজয় প্রশ্ন করলো ঠিকই, কিন্তু কোনো কৌতূহল দেখালো না। মৌমিতা ফাইলের দিকে চোখ ফেরালো, “রতন ভাই দেননি খাবারের টাকা। ওনাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
ছেলেটা কিছু বললো না। আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা অবধি করলো না। যেন এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ারই কথা ছিলো তার!
চেম্বারে উপস্থিত অল্পবয়সী সেবিকা তাদের দু'জনের মুখের দিকে তাকালো একবার করে। তারপর এগিয়ে এলো সামনে, ফাইলের একটা অংশে আঙুল রেখে বললো, “এখানে সই করতে হবে ম্যাম।”
মৌমিতা টেবিলের উপরে ফাইল রাখে। নার্সের দেওয়া কলমটা দিয়েই আস্তে ধীরে নিজের নাম লেখে নির্ধারিত স্থানে। সেবিকা চাপা আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে, “ম্যাম, আপনি বাম হাতে লেখেন?”
“হুম।”
সুজয়ও মাথা কাত করে মনোযোগ দিয়ে দেখে, তার হাতের গতিবিধি। লেখা বেশ ভালো, নামটাও খারাপ না। মৌমিতা খন্দকার। কাবিননামাতেও কি মেয়েটা এমন সুন্দরভাবে স্বাক্ষর করবে? আদৌ করবে কি?
·
·
·
চলবে……………………………………………………