- প্যারিস, ফ্রান্স।
শরতের রোদময় সকাল। নরম রোদ এসে পড়েছে প্যারিসের পথে, বড়ো দালানকোঠার ওপরে। সরু পথের দুধারে সারিবদ্ধভাবে কয়েকটা দোতলা, তিন-তলা বাড়ি। বাড়িগুলো পুরানো কিন্তু এর সৌর্ন্দর্য এক ফোঁটা কমা তো দূর, উলটো দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই ছোটো এলাকা এখনো বড়ো, উঁচু অট্টালিকা ছুঁতে পারেনি। পুরানো, ভিন্টেজ বাড়িগুলোর ছাড় থেকে দেখা যায় এক টুকরো আইফেল টাওয়ার। এদিকটা দেখতে নিরিবিলি কিংবা পুরানো ভাব দেখা গেলেও এদিকে বাড়ি সহজে পাওয়া যায় না রেন্টে। ভাড়া নিলেও খরচ পড়ছে খুবই বেশি। তবুও মানুষ তাদের স্বপ্নের শহরে থাকার ইচ্ছেটা পূরণ করে নেয়। প্যারিস ভালোবাসার শহর। এই শহরে রোজ লাখ লাখ পর্যটক আসে তীব্র মায়া আর ভালোবাসার টানেই। আজ অবধি কেউ এখান থেকে খালি হাতে ফিরেনি। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে ভালোবাসা এবং সুখময় স্মৃতি।
এই এলাকার পথ ধরে বেশিরভাগই ক্যাফে আর রেস্টুরেন্ট। এখানে কোনোপ্রকার জঞ্জাল নেই, সড়গোল নেই। তবে রাত হলে পর্যটকরা এদিকে আসে, এই গলির সৌন্দর্য দেখে যায়, ক্যাফেতে বসে। একেক ক্যাফের ভাষ্কর্য বা ইন্টেরিয়র একটা থেকে অন্যটা আলাদা— সবশেষে সব ক্যাফেই ফটোজেনিক।
সাহিদ আড়মোড়া ভেঙে টেরেসে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখে তখনো ঘুমের ছাপ, ফ্রেশ হয়েও বিশেষ লাভ হয়নি। টেরেসে আসতেই সে বিভিন্ন বেকিং এর সুঘ্রাণ পেল। সম্ভবত বান, কেক বা ক্রস্যান্টের। অবশ্য, তারা যেখানে থাকছে এটার পুরো গলিই ক্যাফে, বেকারি দিয়ে ভরা.. ঘ্রাণ আসাটাই স্বাভাবিক।
গতকাল রাতে তারা ফ্রান্সে ল্যান্ড করেছে। এরপর গাইডের মাধ্যমে নির্ধারিত স্থানে এসে, টুকটাক খাওয়া-দাওয়া আর ফ্রেশের মধ্যেই কেটে গেল কতক্ষণ। কাজের মেয়েটা এসে চায়ের কাপ আর দুটো ক্রস্যান্ট টেবিলে রেখে গেছে। ইসমাত বাড়ি নেই, সেই মূলত বলে গেছিল সাহিদ উঠলেই যেন ব্রেকফাস্ট দিয়ে আসে। সাহিদ জিম না করলে সকালে ভারী নাস্তা খায় না।
সাহিদ চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। তার সম্মুখেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। সে গায়ে আকাশী রঙের মধ্যে সাদা চেক শার্ট পরিহিত, যার কয়েকটা বোতাম খোলা। এই টেরেস থেকে আইফেল টাওয়ার পুরোপুরি দেখা না গেলেও ভালো রকমই দেখা যায়। টেরেসটাও বেশ বড়ো। এখানে বসেই যেন আজীবন আইফেল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে ফেলা যাবে। এই বাড়িটা রেন্টে নেয়া। পুরো বাড়ি না হলেও দোতলা পুরোটা তাদের।
ইসমাত নেই। সে সকাল সকাল বেরিয়েছে একজন গাইডের সাথে। সে জগিং করেছে আইফেল টাওয়ারের আশপাশ দিয়ে। তার এখনো ভাবতে অবাক লাগছে সে প্যারিসে আছে। গাইড তাকে এটা সেটা দেখাচ্ছে এবং বর্ণনা করছে। গাইড বাঙালি, নাম শাবাব। বয়স খুব বেশি না, তবে পরিবার নিয়ে সে ফ্রান্সেই থাকছে। বর্তমানে মাহফুজ সাহেবের আন্ডারে কাজ করছেন। মাহফুজ সাহেবের অস্ট্রেলিয়ায় ব্র্যান্ডের কার্যক্রম সবে শুরু হলেও বছরখানেক যাবৎ শাবাবই একনিষ্ঠ হয়ে ফ্রান্সের ব্রাঞ্চে কাজ করে যাচ্ছেন। ফ্রান্সে তাদের ব্রাঞ্চ এখনো চালু হয়নি। সেটার কাজই চলছে বছরখানেক। ধারণা করা হচ্ছে আরও বছরখানেক লেগে যাবে এখানে। এজন্য ইসমাতকে মাহফুজ সাহেব পাঠালেন৷ বাংলাদেশের মিটিং গুলোতে নাহয় ইসমাত কনফারেন্স কলের মাধ্যমেই যুক্ত হবে। এ নিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হলো। এক, তাদের ব্যান্ডের কাজও হলো, সাহিদও সময় নিল।
তাদের এসব ভিসার কাজ আগে থেকেই করছিলেন মাহফুজ সাহেব। ওনার নিয়্যত ছিল তিনি ছেলে-বউমাকে একসাথে ফ্রান্সে পাঠাবেন। সাহিদও কাজ করবে, বুঝবে সাথে তারা একাকী ঘোরাফেরাও করতে পারবে। যেখানে কেউ তাদের বিরক্ত করবে না। আপাতত মাহফুজ সাহেব ফ্রান্সের ভার সাহিদের ওপর দিয়েছেন। যেহেতু সাহিদ এখনো মেন্টালি প্রিপায়ার্ড নয়, সেহেতু সেই দায়িত্ব পড়েছে ইসমাতের ওপরই। ইসমাতের অবশ্য সুবিধাই হয়েছে। কাজের মধ্যেও থাকতে পারবে সাথে ফ্রান্স জুড়ে ঘোরাফেরাও হবে।
শরতের ফ্রান্স আরও সুন্দর। গাছ-গাছালি রঙিন হয়ে ধরা দিয়েছে। গাছের পাতার রং সব হলুদ সবুজ। আবহাওয়া সবই সীমার মাঝে থাকে। আজ সকাল সকাল রোদ ফুটলেও এই রোদের তেজ নেই বাংলাদেশের মতো। এই তাপ এত বেশি না, সয়ে যায়। এছাড়াও ফ্রান্সে কখনোই আহামরি গরম পড়ে না। গ্রীষ্মে নাকি তাপমাত্র ২০°-৩০° ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ও না। এমন আরামদায়ক আবহাওয়া বাংলাদেশে হলে সারাদিন দাপিয়ে বেড়ানো যেত। এখনই তো দেখল, তাপমাত্রা মাত্র ১৯ এর ঘরে। শাবাবের থেকে শুনেছে এই সময়টায় দিনে কিছুটা তাপ অনুভব হলেও রাতে নাকি হালকা ঠান্ডা পড়ে। শাবাব আবার ইসমাতের থেকে পাঁচ বছরের বড়ো।
ইসমাত এখন সেইন নদীর পাশ দিয়ে হাঁটছে নিরিবিলি। শাবাব কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কলে ফ্যামিলির সাথে কথা বলে নিচ্ছে। তার স্ত্রী আর ছেলে এখানে থাকলেও দেশে তার মা। বাংলাদেশ আর ফ্রান্সের সময়ের পার্থক্য চার ঘণ্টার। এখন ফ্রান্সে সকাল নয়টা, আর বাংলাদেশে দুপুর একটা। সৌন্দর্যে সে এতই মুগ্ধ যে এই সেইন নদীর আশেপাশে কখন এক ঘণ্টা লেগে গেল নিজেও টের পেল না। শাবাবের ডাকে হুঁশ ফিরল। ইসমাত তাকাতেই বলল,
--"বাড়ি যাবেন না ম্যাম? স্যার তো বাসায় একা।"
ইসমাতের টনক নড়ল। সে শাবাবের দিকে ফিরে বিনয়ের সাথে বলল,
--"সরি, সময়ের খেয়ালই ছিল না। চলুন, প্লিজ।"
--"সাইক্রাইটিস্টের ব্যাপারটা?"
--"মি. হ্যারেন কল করেছিলেন?"
--"জি। আগামীকাল বারোটায় আসবেন জানিয়েছেন, লাঞ্চ টাইমে।"
—————
সাহিদ তখনও ঠান্ডা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। সে অন্যদিকে ফিরে একা একাই কথা বলছে। গলার স্বর খুবই চাপা। দূর থেকে দেখলে কেউ বুঝবে না। তেমনই ভেতরে থাকা দুইজন মেইড বুঝল না। সাহিদ তখন নিরিবিলি সাব্বিরের সাথে বলছে,
--"ভাই, দেখ। রোদ অথচ গরম ফিল হচ্ছে না। এই সময়টা পার্ফেক্ট ছিল সাব্বির।"
সাব্বির বলল, "হুঁ। সাথে যেই ঘ্রাণ আসছে মায়রে বাপ! খিদায় পেটের বারোটা বাইজা গেছে। আর বাসা-বাড়ি পাইলি না? এখানে এত খাওনের গন্ধ নিয়ে বাঁচা যায়?"
--"আমার হাতে কিছুই নেই। বাবাই সব ঠিকঠাক করে রেখেছে এখানে। দেখিস না, মেইডও যুগিয়ে ফেলেছে।"
--"তা করবে না? আমাদের ভাবী কয় দিক সামলাবে? তুই নিজে তো কখনো ভাবীকে হেল্প করিস নাই আবার মেইড দেখে নাক কুঁচকাস? ভাবী কই, আমি এখনই বিচারটা দিচ্ছি।"
সাহিদ আপনমনে হাসল। আজ সাব্বিরের মুখে ভাবী শুনতে মন্দ লাগছে না। বলুক ইসমাতকে ভাবী। সে তো ভাবীই লাগে সাব্বিরের। সাব্বির তা দেখে মুখ বাঁকাল,
--"যখন আমি বেঁচে ছিলাম তখন তো ভাবী ডাকলেই কুত্তার মতো চিল্লিয়ে উঠতি, এখন হাসছিস কেন?"
সাব্বিরের কথায় সাহিদের হাসি মিলিয়ে গেল। দুজনের মধ্যে নীরবতা খেলে গেল। সাহিদ সময় নিয়ে আবারও বলল,
--"সাব্বির?"
--"হুঁ?"
--"ফ্রান্সে এসে আমি কোনো ভুল করিনি তো?"
--"একদম না। পার্ফেক্ট টাইমিং।"
সাহিদ বিষণ্ণ হাসে। যেন সাব্বিরের মুখে সে এটাই শুনতে চাইছিল। এবার থেকে সেও চেষ্টা করবে ভালো থাকার, সাব্বিরকে নিয়ে ভালো থাকার। সে তাকাল আইফেল টাওয়ারের দিকে। সে কখনোই ফ্রান্সে আসেনি, সম্ভবত তার ঘোরাফেরা কিছু দেশের মধ্যেই ফ্রান্সের চিন্তা হারিয়ে গেছিল। শেষবার মনে পড়ল জন্মদিনে উপহারের পর। সাহিদ আপনমনেই সাব্বিরকে বলল,
--"এদিকে একটা ভালো ম দের পল্লি আছে। শুনলাম মি. শাবাবের থেকে।"
সাব্বির হো হো করে হাসল। সাহিদের মনে পড়ে গেল তার জন্মদিনের রাতের কথা। সাহিদ আনমনে বলল,
--"সময় কত দ্রুত চলে যায় তাই না? সেদিনও তোকে ছুঁতে পারতাম। আজ আর ছুঁয়ে দিতে পারি না। মনে হয় সবে কয়েকদিন। অথচ মাঝে দিয়ে দুই মাস পেরিয়ে গেছে।"
সাব্বির সে কথা এড়িয়ে বলল,
--"চোখে সানগ্লাস দিছিস কেন? সূর্যমামার ভয়ে? ইশ রে দোস্ত, এমন ওয়েদার যদি আমাদের দেশে হতো।"
সাহিদ সাব্বিরের সাথে হ্যালুসিনেশন বিরতিহীন করতে লাগল। সাহিদকে এই সময়টাতে খুব প্রাণবন্ত দেখা যায়। তার এই রোগ আজকের না, সেই শুরু থেকেই সে মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ। কিন্তু সে এই রোগ কখনোই সারাতে চায় না। সাহিদ প্রতিবারের মতো করেই কাউকে বুঝতে দেয় না তার এই আচরণের ব্যাপারে।
সাহিদ এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে রোদসীর বাড়ি গিয়েছে। সাহিদের চুপচাপ রূপই হঠাৎ কেমন হায়ে নার গর্জন করে উঠেছিল। ইসমাত না আটকালে বুঝি সেখানেই মে রে ফেলত রোদসীকে। সাহিদ রোদসীকে হুমকি দিয়ে এসেছে যেন এই কথা কেউ না জানতে পারে, চালাকি করলে তখনই তার ব্যবস্থা করবে সে। রোদসী বেশ ভয় পেয়ে যায়। কতবার সরি বলে, কিন্তু লাভ হয় না। সরি বললেই কি সাব্বির আর তার মা ফিরে আসবে? আসবে না তো! রোদসী যদি ওইদিন সাহিদের ওপর মিথ্যা অপবাদ না লাগাত, তাহলে সাব্বির কখনোই বিয়ের কাজ ফেলে আসত না, তারা তিনশো ফিটেও যেত না। সাব্বির একমাত্র সাহিদের মেজাজ ঠিক রাখতেই সব ফেলে এসেছিল, বন্ধুর মন ভালোও করেছিল। কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো লাভ হয়েছে? সাহিদ সবকিছুর মূল দোষী এখন রোদসীকেই ভাবতে শুরু করেছে। এতদিন চুপ করে থেকেছেও রোদসীর শেষ দেখে ছাড়বে বলে। মনে মনে বহু পরিকল্পনা সে ইতিমধ্যে সাজিয়ে ফেলেছে সে। শুধুমাত্র বাস্তবায়ন করা বাকি। এখন তো সবে ভয় দেখিয়ে এসেছে, কাটাক ভয়ের মাঝে কয়েক দিন। সাহিদ একদম এর সমস্ত নষ্টামি বের করে দিবে। চিনে তাকে? ভুল মানুষের সাথে লেগেছে এবার রোদসী। তার বন্ধুকে যে কেড়ে নিয়েছে তাকে সে এত সহজে ছাড় কেনই বা দিবে? প্রশ্নই আসে না।
সাহিদের হ্যালুসিনেশনে যখন ছেদ ঘটল তখন তার সামনে থাকা চায়ের কাপ আর প্লেট দুটোই খালি। সে পিছে ফিরে দেখে ইসমাত এসেছে। শাবাব বাড়িতে আর আসেনি, সে নিজের কাজে চলে গিয়েছে। বলে গেছে দরকার হলেই যেন তাকে ডাকা হয়।
ইসমাত সাহিদকে দেখল টেরেসে। সে নিজেও আসল। ভোরে ঘুম ভাঙার পর একবার এসেছিল। এখন আবারও এলো। এখানে সাহিদকে স্বাভাবিক দেখে সে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাতের প্যাকেটটা দেখিয়ে বলল,
--"কিছু ব্রেড আর ডেজার্ট এনেছি। খাবে?"
সাহিদ দেখতে চাইল। ইসমাত তাকে দেখাল। কয়েক ধরণের ডেজার্ট আইটেম। সবগুলোই রঙিন। রেড ভেলভেটের এমটা সুন্দর ডেজার্টও দেখল সে। সাহিদ কোনটা খাবে জানিয়ে দিল। সাথে বলল,
--"রেড ভেলভেটেরটা হাফ করে আমাকে দিন।"
--"পুরোটা খাও।"
--"হাফ ইজ এনাফ।"
ইসমাত আর লাগল না সাহিদের সাথে। ওদের লাঞ্চে ইসমাতই বাঙালি রান্না করল। শাবাব আগেই বাজার-সদাই করে রেখেছিল। মেইড দুজন উঁকি দিয়ে অবাক চোখে বাঙালি রান্না দেখছে। নাকে কেমন ঝাঁঝালো মশলার ঘ্রাণ আসছে। ওরা একজন ব্রিটিশ আরেকজন ফ্রান্সের নাগরিক। দুজনকে মূলত বাড়িওয়ালির থেকেই হায়ার করেছে। বাড়িওয়ালি আবার একজম বৃদ্ধা, তিনি নিচতলায় থাকেন। বৃদ্ধা হলেও তিনি বেশ কর্মঠ, বিচক্ষণ। ওনার আবার ম্যানেজারও আছে। সেই ম্যানেজারের সাথেই মূলত তাদের বেশিরভাগ ডিল হয়েছে।
সাহিদ বাঙালি খাবার দেখেও কিছু বলল না। চুপচাপ খেল। ইসমাতও ভালো মতোই খেল। সামান্য ব্রেডে কি আর পেট ভরে? সাহিদ প্রতিবারের মতোই প্রশংসা করল না। সে খাওয়া থেকে উঠে গেল তৈরি হতে। ইসমাতও একটু জিরিয়ে তৈরি হওয়া শুরু করল। তারা একটু পরই বেরুবে ঘুরতে। শাবাবকে বলা আছে।
ইসমাত যখন তৈরি হচ্ছিল সাহিদ বারবার ডাকছিল,
--"আপনার হলো?"
--"আরেকটু, দাঁড়াও।"
--"আপনার এই আরেকটু শুনছি পনেরো মিনিটের মতো।"
--"তো হাসবেন্ড হয়েছ কিসের জন্য? বউয়ের জন্য তো অপেক্ষা করাই বরদের কাজ।"
সাহিদ অপ্রস্তুত হলো এ কথা শুনে। সে ইসমাতকে বউ ডেকে জ্বালায় না আজ অনেক দিন। তাদের মধ্যকার দূরত্ব আহামরি না কমলেও কথাবার্তা সহজ হয়ে এসেছে। আর ইসমাত তো জান-প্রাণ দিচ্ছে এই বিয়ে আর সাহিদের জন্য। অগত্যা, সাহিদ অপেক্ষা করল। সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে চোখ বুজে রইলো।
তাদের রওনা দেওয়ার মুহূর্তেই বাড়িওয়ালির সাথে দেখা। ওনার হাতে একটা প্যাকেট। দেখেই মনে হচ্ছে হবে কোনো ডেজার্ট। উনি তাদের দেখে হাসলেন। ইংরেজিতেই বললেন,
--"এটা আমার মেয়ের ক্যাফের কিছু আইটেম। তোমাদের জন্য স্যাম্পল আনলাম। খেয়ে দেখবে কিন্তু। ভালো লাগলে আমার মেয়ের ক্যাফে থেকে ঘুরে আসবে কেমন?"
ইসমাত শাবাবের থেকে শুনেছে এই গলিতেই নাকি ভদ্রমহিলার মেয়ের ক্যাফে আছে। ইসমাত তাই হাসি-মুখেই সেই প্যাকেট নিয়ে নিল। ভদ্রতার সাথে বলল,
--"শিওর।"
বৃদ্ধা সন্তুষ্ট হলেন। পরপর ওদের কিছু সাধারণ টিপস দিলেন। এই যেমন সেইন নদীতে বৃষ্টি হলে পানি বেড়ে যায়, তখন রিভারক্রুসে না চড়াই ভালো। ফ্রান্সের নাগরিকরা অচেনা মানুষদের এড়িয়ে চলে, খুব একটা পছন্দ করে না। এই বিষয়েও বললেন। তবে ইসমাত টের পেল, এই বৃদ্ধা খুবই হাসি-খুশি। ওনার বর্ণনানুযায়ী ফ্রানদের নাগরিক সত্ত্বেও ওনাকে গম্ভীর লাগল না।
সাহিদ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। এখানেও তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলল না। ইসমাত সাহিদের দিকে এগিয়ে যেতেই সাহিদ বলল,
--"মি. শাবাবের অপেক্ষা করতে হবে না। আমরাই যাই। উনি নাহয় ওখানেই আসবে।"
ইসমাত মেনে নিল। ওরা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। এই বিকালের সময়টায় সে ব্যস্ত গলিটা দেখল। এখানে ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, বিভিন্ন স্টেশনারি ছাড়াও কিছু আউটলেট দেখা যাচ্ছে। ওরা আধঘণ্টার মতোই হাঁটতে হাঁটতে আইফেল টাওয়ারের কাছাকাছি একটা বাগানে এলো। চাম্প ডে মার্স নামের এরিয়া এটা। আইফেল টাওয়ারের দক্ষিণ দিকে। আইফেল টাওয়ারের আশপাশের বিস্তৃত জায়গা নিয়ে বাগান। এখানে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যাওয়া কথা।
সাহিদ কোনো কিছু না ভেবেই একটা গাছের নিচে বসে পড়ল, তার চারপাশে হলুদ-কমলা পাতা। ইসমাতও দূরত্ব নিয়ে বসল। দুজনেই হাঁপিয়ে গেছে এত এত পথ এসে। ওরা ঠিক করেছে সন্ধ্যার আগে দিয়ে সেইন নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে আসবে। সম্ভবত কিছুদিন আগে বৃষ্টি হয়েছিল, এজন্য সকালে নদীর পানি বেশিই দেখেছে সে।
প্যারিসের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে সেইন নদী। এটায় প্রতিদিন কতশত পর্যটক রিভারক্রুসে চড়ে নদী পথে ঘুরে। কেউ কেউ তো সিঙ্গেল বোটেও ঘুরে বেড়ায়। তবে ভাটার দিনে একটু সমস্যা পোহাতে হয়, কিন্তু পর্যটকদের কি আর ভাটা আটকে রাখতে পারে?
সাহিদ পানি চাওয়ার আগেই ইসমাত বোতলটা এগিয়ে দিল। সাহিদ আইফেল টাওয়ারের থেকে চোখ ফিরিয়ে ইসমাতের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। চোখে চোখ রেখেই সাহিদ বোতলটা নিজ হাতে তুলে নিল।
ইসমাত নিজের ব্যাগ খুঁজতে গিয়ে দেখল সে তার ফোনই বাড়িতে ফেলে এসেছে। বড্ড আশাহত হলো সে। এখন রোদ নেই, আবহাওয়া সুন্দর। কোথায় ভেবেছিল সে আইফেল টাওয়ারের সাথে ছবি তুলবে। ইসমাত তাকাল সাহিদের দিকে।
--"তোমার ফোনটা দিবে?"
সাহিদ তাকাল ইসমাতের দিকে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
--"কেন?"
--"আমার ফোন ফেলে এসেছি।"
সাহিদ কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দিল। এটা তার নতুন ফোন। আগেরটা এক্সিডেন্টের কারণে ভেঙে চুড়মার। ইসমাত সাহিদের ফোন থেকে সিঙ্গেল আইফেল টাওয়ারের ছবি তুলল। পরপর সাহিদের দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,
--"আমাকে ছবি তুলে দাও।"
সাহিদের মুখ দেখার মতো হয়েছে। চোখ কপালে তুলে বলল,
--"আমি তুলে দিতে যাব কেন?"
--"তুমি ছাড়া আর কে আছে? শাবাব ভাইয়াও নেই যে তুলে দিবেন।"
সাহিদের নাক কুঁচকে ফোন হাতে নিল। তুলে দিল কিছু ছবি। কিন্তু একটারও ঠিকঠাক ছিঁড়ি নেই। এতে ইসমাত রেগে বলল,
--"ওগুলোকে ছবি তোলা বলে?"
--"আপনাকে ছবি তুলে দিয়েছি এই অনেক।"
--"বাজে ফটোগ্রাফার! তোমার থেকে একটা বাচ্চাকে দিলেও সুন্দর করে তুলে দিবে।"
সাহিদও গরম চোখে তাকাল।
--"সো আনগ্রেটফুল। ইনসাল্ট করছেন? তুলে দিয়েছি এতে হয় না?"
ইসমাত সাহিদকে এড়িয়ে এক বিদেশিনীকে দিয়ে ছবি তোলাল। সেটা সাহিদকে দেখিয়ে বলল,
--"দেখো! এটাকে ছবি তোলা বলে।"
সাহিদ নাক কুঁচকাল আবারও। বিদেশিনী তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
--"আপনারা কাপল? ছবি তুলে দিই একসাথে, প্লিজ?"
বিদেশিনীর কাইন্ড আচরণের কি জবাব দিবে ভেবে পেল না ইসমাত। সাহিদ রাগের মধ্যেই ইসমাতের হাত ধরে টেনে আইফেল টাওয়ার বরাবর দাঁড়াল। তাদের পেছনেই টাওয়ারটা উঁকি দিচ্ছে। ইসমাত হতভম্ভ হয়ে তাকাতেই সাহিদ মিনমিন করে বলল,
--"ড্যাডকে এই ছবি দেখালে প্যারিসের বাইরে যাওয়ার সুযোগ দিবে। স্যে চিজ, ইসমাত।"
মুহূর্তেই বিদেশিনী সাহিদের রাগের মধ্যে ঠোঁটে হাসি আর ইসমাতের অবাক চাহনি নিয়ে ছবি তুলল।
—————
রাতে যখন ইফরা বাড়ি ফিরল তখন দেখল তার বোন তাকে ছবি পাঠিয়েছে। তবে সাহিদের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে৷ সেই ছবিতে স্পষ্ট আইফেল টাওয়ারের সাথে তার বোনকে দেখতে পায় সে। ইফরা হাসল। কতদিন পর তার বোনের হাসি-মুখটা দেখল সে। এখন বাংলাদেশের সময় আটটা। নিশ্চয়ই এখন ফ্রান্সে বিকাল?
·
·
·
চলবে……………………………………………………