মারুফ দোকানে যেতে গাফিলতি করছেন। কাউকে বলতেও পারেননি যে শরীরটা ভালো নেই। নিজের অসুস্থতা নিয়ে তিনি খুবই বিরক্ত, বিব্রত। মাথাটা ভারী হয়ে আছে, তবু তিনি বসার ঘরে পায়চারি করতে শুরু করলেন। রাবেয়া রান্নাঘরেই আছেন, বাসন ধুচ্ছেন। মেয়েটা বেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। বড় হয়ে গেছে তো, এখন বোধহয় বাজার করতে অসুবিধা হয় না তার।
বারান্দা থেকে ডেকে উঠলেন জহির মিঞা, “মারুফ? আছো নাকি?”
মারুফ সাড়া দিলেন না। ধীরে সুস্থে হেঁটে গিয়ে দরজা খুললেন।
জহির তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখিয়ে বলেন, “সুজয়কে নিয়ে আসলাম। কালকে আসেনি নাটোরে, আজকে এসেছে। কী যেন কাজ আছে—”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মারুফকে সালাম দিলো সুজয়। তার হাবভাব দেখে মনে হলো, ভীষণ তাড়ায় আছে। মারুফ মাথা নেড়ে বললেন, “ভেতরে এসো।”
জহির গিয়ে সোফায় বসলেন, ছেলেটাকেও বসতে ইশারা করলেন। সে আশেপাশে তাকালো একবার, তারপর বসে পড়লো। মারুফ তার তাকানোর ভঙ্গিটা খেয়াল করলেন, গম্ভীর হয়ে বললেন, “মৌমিতা একটু বেরিয়েছে, চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যে।”
সুজয় মাথা নিচু করে রইলো। ভদ্রলোক এভাবে সরাসরি মেয়ের কথা বলায় সে বেশ সংকোচে পড়ে গেলো।
রাবেয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ততোক্ষণে। মাথায় আঁচল টেনে চুপচাপ সামনে এসে দাঁড়ালেন। সুজয়কে বেশি খুঁটে খুঁটে দেখার প্রয়োজনবোধ হলো না। এক দেখাতেই মনে হলো, এই ছেলেটার পাশে মৌমিতাকে বেশ মানাবে।
মারুফ বলে উঠলেন, “রাবেয়া, বাসায় কি নেই কিছু? সুজয় কী পছন্দ করে, সেটা রান্না করো আজকে।”
ছেলেটা ভড়কে গেলো, “না না, কিছু করতে হবে না। আমাকে এখনই বের হতে হবে।”
কথা বলতে বলতেই উঠে দাঁড়ালো সে। জহির বাধা দিলেন, “আরে, পাত্রী দেখে যাও!”
পাত্রীর কথা উল্লেখ করায় সুজয় আরো দৃঢ়ভাবে বললো, “আমার ট্রেনের সময় হয়ে গেছে।”
“আহা!” জহিরও দাঁড়িয়ে পড়লেন, “মৌমিতা কোথায় গেছে?”
মারুফ বললেন, “বাজারে গেছে।” সুজয়ের দিকে তাকালেন তিনি, “অপেক্ষা করো কিছুক্ষণ, চলে আসবে। আর... ওর মা কিন্তু খুব ভালো বিরিয়ানি রাঁধতে পারে। আজকে খেয়ে যাও এখানে?”
সুজয় মাথা নাড়ে, “আজকে হবে না, আমার সময় নেই। আরেকদিন নাহয়...”
ছেলেটার অসম্পূর্ণ কথায় হাসলেন মারুফ, “আচ্ছা এসো আরেকদিন। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে সেদিন কিছু খাওয়াতে পারবো তোমাকে। কী বলো?”
লোকটার মলিন মুখখানির দিকে তাকালো সুজয়। মনটা খচখচ করলো হয়তো। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তেই অটল রইলো সে। সোফা থেকে ব্যাগটা তুলে নিলো কাঁধে। সালাম জানিয়ে খুব বিনয়ের সাথে বললো, “যাই তাহলে।”
মারুফ ছোট একটা শ্বাস ফেললেন, “যাই বলতে হয় না। বলো, আসি।”
“আসি।”
সুজয় বেরিয়ে গেলো। জহির দরজার দিকে তাকিয়েই বললেন, “মারুফ? ছেলেটা কিন্তু অনেক ভালো। ডাক্তারি পড়ছে। আর খুব ভদ্রও। কথা কম বলে।”
রাবেয়া বিড়বিড় করলেন, “সেটাই দেখলাম।”
পাত্র চলে গেলেও ঘটক সাহেব আবার বসে পড়লেন। চা-নাস্তা খেয়ে, মারুফের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে বিদায় নিলেন তিনি।
অল্প সময়ের ব্যবধানেই মৌমিতা বাড়ি ফিরলো। ক্লান্ত ভঙ্গিতে দুলতে দুলতে হেঁটে গেলো রান্নাঘরে, বাজারের ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখলো সেখানে। মেজাজটা কোনো কারণে একটু চড়াও হয়ে আছে। বাদলকে পাকড়াও করতে হবে। অন্য মেয়েদেরকে পাত্তা দেয় মানে!
হাত-মুখ ধুয়ে মেয়েটা ঘরের দিকে পা বাড়ায়। তার উপস্থিতি টের পেতেই রাবেয়া নিজ ঘর থেকে বের হলেন, খানিকটা হতাশা আর খানিকটা উত্তেজনা নিয়ে বলে উঠলেন, “কই ছিলা এতোক্ষণ? সুজয় এসেছিলো তোমার সাথে দেখা করতে।”
মৌমিতা আগ্রহ দেখালো না, “সুজয় আবার কে?”
“আরে... শাহানা আপার ছেলে। যার সাথে তোমার বিয়ের কথা হচ্ছে।”
“ওনার না গতকাল আসার কথা ছিলো?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আসতে পারেনি। ওর কাজ আজকেই ছিলো।”
“ওহ।” মেয়েটা কৃত্রিম কৌতূহল দেখায়, “কতোক্ষণ ছিলো?”
“বেশিক্ষণ না। ট্রেন নাকি আছে, একদম তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলো। একটা দানাপানি পর্যন্ত মুখে দেয়নি। অনেক কষ্টে একটু সোফায় বসানো সম্ভব হয়েছে, তাও কিছুক্ষণের জন্য।”
কথা বলতে বলতে রাবেয়া চোখের ইশারায় ঐ সোফার দিকে ইঙ্গিত করলেন, যেখানে সুজয় বসেছিলো। মৌমিতা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকায়। সোফাটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতেই তার মনে হলো, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, অস্বাভাবিক ধক ধক শব্দ হচ্ছে বুকের মাঝে। ছেলেটা কি কড়া কোনো পারফিউম ব্যবহার করে? অচেনা একটা সুবাস রয়ে গেছে এখনও। নাকি মনের ভুল? মৌমিতা ওদিক থেকে চোখ সরালো। কোনো অঘটন ঘটতে যাচ্ছে কি?
“আম্মা?”
“হ্যাঁ?”
“আব্বার কি... পছন্দ হয়েছে পাত্র?”
রাবেয়া একটু ভেবে বললেন, “জানি না। বলেনি কিছু। তবে পছন্দ না হওয়ার কিছু নেই। ছেলেটা দেখতে-শুনতে ভালোই। ডাক্তারি পড়ে। কিন্তু... তোমার মতোই চুপচাপ, শান্তশিষ্ট।”
মৌমিতা কথা বাড়ালো না। কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই ঘরে ফিরে এলো। ক্লান্তিটা একেবারে জেঁকে বসেছে শরীরে।
—————
শুক্রবার।
সকাল সকাল উঠেই মৌমিতা বাড়িঘর ঝাড়ু দিয়েছে। তারপর বাড়ির পেছনের জমিতে এসে পায়চারি শুরু করেছে। পুকুরের পাশ ঘেঁষে একটা সরু মাটির রাস্তা রয়েছে। সে ওখানেই অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনটা যেন অন্য জগতে চলে গেছে। পাশে মারুফ কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, সে টের পায়নি।
“মৌ মা?”
মেয়েটা একটু চমকেই পাশে তাকায়। আব্বাকে দেখে একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায় সে। মারুফ বেশ প্রস্তুতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “ছেলেটার সাথে তোমার কথা বলা দরকার। এখন এখানেই কথা চালিয়ে যাবো, নাকি অন্য কাউকেও দেখবো....”
মৌমিতা বাম হাতের তালু দ্বারা সোনার বালাটা চেপে ধরলো, “আব্বা... একটা কথা বলতাম।”
“বলো।”
বলতে গিয়ে দ্বিধা করলো মৌমিতা। বাড়ির বাইরে এভাবে বলা কি ঠিক হবে? তার চেয়ে বড় কথা, সত্যিটা শোনার মতো শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা কি আব্বার আদৌ আছে এখন? নিজের মনটাকে যথাসম্ভব স্থির করলো সে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে লাগলো, “আমি ওনাকে বিয়ে করতে পারবো না।”
“কেন মা?”
মৌমিতা দাঁতে দাঁত চাপলো। সে নিজের একটা অপরাধের বয়ান দিতে যাচ্ছে। অথচ মানুষটা কতো সুন্দর করে কথা বলছেন। এই আদরটুকু গ্রহণ করা সম্ভব না তার পক্ষে, সে এটা পাওয়ার অযোগ্য!
“আব্বা, আমাকে ‘মা’ বলবেন না প্লিজ।”
মারুফ আহত হলেন। সামনের পুকুরটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা আবারও প্রস্তুতি নিয়ে বলে, “একজনের সাথে আমার সম্পর্ক আছে। কিন্তু...”
মেয়ের দিকে এবার কৌতূহল নিয়ে ঘুরলেন মারুফ। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন তার পরবর্তী কথাটা শোনার জন্য।
“কিন্তু ছেলেটা আমার থেকে ছোট। গ্রাজুয়েট করেনি এখনও। আর ওর ফ্যামিলি—”
মৌমিতা আর এগোতে পারলো না। হুট করেই ধাক্কাটা অনুভব করলো সে। এই মুহূর্তে বাদলের পরিবার সম্পর্কে বলতে গেলে সত্যি সত্যি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। অন্তত এখন এ ব্যাপারে কিছু বলা উচিত হবে না, এখানে দাঁড়িয়ে, এভাবে।
মেয়েকে চুপ দেখে মারুফ ভ্রু কুঁচকালেন, “নাম কী ছেলেটার?”
“বাদল।”
“ছোট ছেলে?”
“বেশি ছোটও না। আমার থেকে এক বছরের ছোট।”
“ছোটই তো!”
মারুফ অস্বস্তিবোধ করলেন হয়তোবা। দেখে মনে হলো, শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছেন বাতাসের কাছে। মৌমিতা আব্বার বাহু জড়িয়ে ধরে দুই হাতে, “ভেতরে চলেন এখন। এসব নিয়ে পরেও ভাবা যাবে।”
আব্বাকে তার ঘরে রেখে মৌমিতা বসার ঘরে এলো। মাথায় হাত দিয়ে সোফার বসে রইলো অনেকক্ষণ। ফোন বেজে ওঠার আগপর্যন্ত ভয়ানক ঘোরের মধ্যে ছিলো সে। ফোনের আওয়াজ শুনতেই সেখান থেকে বেরিয়ে আরেক ঘোরে চলে গেলো। প্রায় ছুটে গিয়ে রিসিভার কানে ধরলো, “হ্যালো, বাদল?”
ওপাশে খিলখিল করে হেসে উঠলো মেয়েটা, “আপা... হি হি হি! আমি মার্জিয়া।”
মৌমিতা বেশ লজ্জায় পড়ে যায়, জিভে কামড় দিয়ে বলে, “সরি সরি। ভুল করে বলে ফেলেছি।”
“আমি না হয়ে অন্য কেউ হলে? একেবারে বারোটা বাজতো তোমার।”
“চুপ কর!”
“আচ্ছা শোনো, আমি মেলায় যাচ্ছি। তোমার জন্য কী নিবো, বলো?”
মৌমিতা একটু সহজ হওয়ার চেষ্টা করে, “আমার জন্য? লাগবে না কিছু।”
“আরে বলো না! আমি সবার জন্যই কিছু নিতে চাচ্ছি।”
“কী কী পাওয়া যায় ওখানে?”
“অনেককিছু। আগেরদিন গিয়েছিলাম, মোটামুটি সব ধরনের জিনিসই পাওয়া যাচ্ছে। আম্মার জন্য একটা শাল নিয়েছি। সামনে শীত তো। শালটাতে নকশা করা, সুন্দর আছে। আর কিছু নিলাম না ঐদিন। আচ্ছা শোনো আরেকবার, আব্বার জন্য কী নেওয়া যায়, বলো তো? আমি ভাবছি, একটা ঘড়ি কিনবো।”
“ঘড়ি?” মৌমিতা কিছুক্ষণ ভাবলো, “হ্যাঁ, ঘড়ি নিতে পারিস। ডায়ালটা একটু বড় আর গোল দেখে নিবি। আব্বার হাতে ভালো মানাবে।”
“আচ্ছা। আর তোমার জন্য?”
“লাগবে না।”
“ধুর আপা! তাড়াতাড়ি বলো তো। আমি ভাবছি, আমাদের প্রতিবেশীর জন্যও কিছু নেবো। সারপ্রাইজ—”
“বাড়িতে আয় আগে। দ্যাখ, তোর প্রতিবেশী কেমন সারপ্রাইজ দেয়।”
“হ্যাঁ?”
“এতো টাকা খরচ করতে হবে কেন? খালি অপচয়!”
“মামা এসেছিলেন, টাকা দিয়ে গেছেন আমাকে।”
“রিপন মামা? উনি তো আম্মার ফোন ধরেনই না। ওনার ব্যবসার কী খবর?”
“কী জানি। গত পরশু এসেছিলেন। জোর করে টাকা দিয়ে গেলেন।”
“সেজন্য এখন অপচয় করবি?”
“আরে না—”
“শোন। কিনলে শুধু আব্বা আর আম্মার জন্যই কিছু কিনিস, আর নিজের জন্য। অন্য কারও জন্য কিছু কিনতে হবে না।”
“ঠিক আছে। এখন রাখলাম, মিটার বেড়ে যাচ্ছে। পরে কথা হবে, আপা।”
মৌমিতা নিজের ঘরে চলে এলো। মার্জিয়াকে জুনায়েদের ব্যাপারে কিছু জানানো ঠিক হবে কি? হয়তো অপেক্ষা করাই শ্রেয় এক্ষেত্রে। মেয়েটা বাড়ি ফিরুক, তারপর নাহয় দেখা যাবে।
বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে পড়লো মৌমিতা। চোখ লেগে আসছে।
বাদলের সাথে কথা বলতে হবে, মেসে একবার ফোন করে খোঁজ নেওয়া উচিত—এসব ভাবতে ভাবতেই মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ে।
রাবেয়া ত্যক্ত মুখে রিসিভার কানে ধরলেন, “হ্যালো, কে বলছেন?”
কোনো সাড়াশব্দ নেই।
এ পর্যন্ত কয়েকবার এমন কল এসেছে আজ সারাদিন। ওপাশের ব্যক্তি কোনো আওয়াজ করে না, উত্তর দেয় না। বারবার এভাবে কে বিরক্ত করছে?
মৌমিতা আজকেও বাজারে গিয়েছিলো বিকেলের দিকে। বেশ খাটুনি হচ্ছে মেয়েটার।
এরই মাঝে রাবেয়া জানতে পেরেছেন, তার তথাকথিত বুদ্ধিমতী বড় মেয়েটা বয়সে ছোট একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এ কথা মারুফ তাকে জানিয়েছেন। ছেলেটার ব্যাপারে অন্যান্য তথ্য জেনে নিতেও তাগিদ দিয়েছেন।
রাবেয়া কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না। কোনো কারণে সাহস হলো না, তবে খুব মায়া হলো তার। মৌমিতা কেন জুনিয়র ছেলের সাথে অমন সম্পর্কে জড়াতে যাবে? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে। এমনিতেও বেশ কয়েক বছর হলো, মেয়েটার আচার-আচরণ দেখে তার একপ্রকার সন্দেহই হচ্ছিলো। সেটার সত্যতা পেলেন এতোদিনে।
কৈশোরের ঐ আবেগ এখনও জীবিত রয়েছে যেহেতু, এই সম্পর্কটা ভেঙে ফেলা কঠিন হবে। তবে টিকিয়ে রাখাটা হবে আরও কঠিন!
—————
সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে বাতাস উঠেছে খুব জোরে।
মৌমিতা আজ অনেকদিন পর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে। পড়ার আগ্রহ হচ্ছে না কেন যেন। লোডশেডিং হতে পারে। ঝড় আসার সম্ভাবনাও প্রবল। নভেম্বর মাসের ঝড়-বৃষ্টির ব্যাপারই আলাদা! আজ রাতে খুব শীত পড়তে পারে। একটা মোটা কাঁথা বের করে রাখতে হবে। টিনের চালে ছোট ছোট ডালপালা পড়ার শব্দ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যে।
এমন সময়ে দরজায় শব্দ করলো কেউ। জুনায়েদের বউ এসেছে বোধহয়। মৌমিতা পত্রিকা রেখে উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটার নাম কিছুতেই মনে করতে পারলো না সে। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। চৌকাঠের ওপাড়ের মানুষটাকে দেখে চমকে গেলো সে।
বাদল ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, “আপনাকে আমি এতোবার ফোন দিলাম আজকে। একবারও ধরলেন না। আমার কী অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো, ভাবতে পারছেন?”
মৌমিতা যেন খুব নিস্তেজ হয়ে পড়লো, দরজায় হেলান দিয়ে বললো, “তাই বাড়ি পর্যন্ত চলে এসেছো?”
“হ্যাঁ।”
“কেন? কী ভেবেছিলে?”
“আমি আপনার আব্বার সাথে দেখা করতে এসেছি।”
“কেন!”
“আপনিই তো বলেছিলেন। বলেননি?”
“হ্যাঁ, কিন্তু...”
শব্দেরা যেন ফুরিয়ে গেলো। মৌমিতা নিজেকেই বোঝাতে পারলো না, সে কেন এতো বিচলিত হচ্ছে। মাথায় সবকিছু গুলিয়ে এলো। সে আমতা আমতা করে বললো, “বাদল... তুমি কি নিশ্চিত যে, আমার সাথে তুমি ভালো থাকবা?”
“কী?”
“তোমার কি কখনও মনে হয়েছে... আমার মতো একটা সিনিয়র মেয়ের সাথে থাকার চেয়ে...”
মেয়েটা আর ভাষা খুঁজে পেলো না। বাদল ভ্রু কুঁচকালো, “মানে?”
“মানে, জানোই তো। আমার চুপচাপ থাকা স্বভাবটা তোমার পছন্দ না। তাছাড়াও আমার... এতো এতো খুঁত—”
“নিখুঁত মানুষ কে চাইলো? আমি তো আপনাকে চাই! আপনি যেমন, সেভাবেই। আর এসব কথা কেন বলছেন এখন? বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?”
“না না!” মৌমিতা ধাতস্থ হলো, “আমারই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আসো, তুমি ভেতরে আসো।”
বাদল একটু এগিয়ে আসে, ভেতরে তাকায়, তবে ঢোকে না। মৌমিতা তার মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কি ভয় পাচ্ছো?”
ছেলেটা প্রথমবার সত্যিটা জানানোর সিদ্ধান্ত নিলো। মাথা নাড়লো উপর নিচে, হ্যাঁ, সে ভয় পাচ্ছে। মৌমিতা এবারও বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো, “আসো।”
পেছনে উঁকি দিতেই দেখা গেলো, মারুফ বসার ঘরে, চোখে চশমা পরে মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা দেখতে শুরু করেছেন।
বাদল ধীরপায়ে ভেতরে আসে। সামনে বসে থাকা লোকটাকে দেখে আবার ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করলো তার! আজ সে মারুফ খন্দকারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। জোর করে একটু সাহস সঞ্চয় করলো বাদল। দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে বললো, “আসসালামু আলাইকুম।”
মারুফ চশমার উপর দিয়ে ছেলেটাকে দেখলেন। তিনি কিছু বলার আগেই মৌমিতা বলে উঠলো, “বাদল এসেছে।”
মারুফ দু'জনের দিকে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। পত্রিকাটি আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলেন টেবিলের উপর। মাথা নেড়ে ইশারায় ছেলেটাকে বসতে বললেন। বাদল কয়েক পা এগিয়ে আসে ঠিকই, তবু সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। টের পায়, কাজটা মোটেও সহজ না। একটু এদিক-ওদিক হলেই সর্বনাশ। এটা কোনো চাকরির সাক্ষাৎকার নয়। সে নিজের জীবনের সর্বাধিক মূল্যবান জিনিসটা বাজি ধরে এসেছে এখানে। এতো কষ্টের পড়াশোনা, সব চাকরি, সমস্ত সাক্ষাৎকার, কোনোকিছুই কাজে আসবে না আজ ব্যর্থ হলে।
মারুফ বললেন, “বসো।”
বাদল তখনই বসলো না, পেছনে মাথা ঘোরালো। ফাঁদে আটকা পড়া জন্তু যেভাবে তার ঘাতকের দিকে তাকায়, ছেলেটা তেমনি করে চেয়ে রইলো মেয়েটার পানে। মৌমিতা চোখ সরিয়ে নেয় সেদিক থেকে, দরজাটা লাগিয়ে দেয়। খুব নিপুণভাবে প্রেমিকের অসহায় দৃষ্টি থেকে আড়াল করে নিজেকে।
মারুফ আবার বললেন, “বসো।”
ছেলেটা প্রায় চমকে উঠে সামনে ঘুরলো। মৌমিতা খুব করে চাইলো, গতকাল সুজয় নামের ছেলেটা যে আসনে বসেছিলো, বাদল সেখানেই বসুক। তার ইচ্ছেটা পূরণ হলো না। বাদল অন্য একটা সোফায় বসে পড়ে।
মারুফ চোখ থেকে চশমাটা খুলে রাখলেন, “তোমার নাম বাদল?”
“জ্বী।”
“বাড়ি কোথায়?”
“বাড়ি... সিংড়া।”
ছেলেটার চোখ মেঝের দিকে, চোখাচোখি এড়াচ্ছে সম্ভবত। অস্থিরভাবে পা দোলাচ্ছে।
“এতো ভয় পাচ্ছো কেন?” মারুফ বিগলিত হাসলেন, “একটু আরাম করে বসো।”
বাদল একটু নড়েচড়ে বসে। তবে আক্ষরিক অর্থে আরাম করে বসতে পারলো না সে। খুব ব্যাকুলতা কাজ করছে তার মনে। মারুফ তাকালেন মৌমিতার দিকে, “তুমি ভেতরে যাও।”
আব্বার এমন স্পষ্ট আদেশে মৌমিতা ক্ষণিকের জন্য বিস্মিত হলো, তবু কোনো দ্বিরুক্তি প্রকাশ ছাড়াই নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। রাবেয়া পাশের ঘর থেকে সবটুকু দেখলেন। বাদলকে তিনি দেখলেন, পেছন থেকে। মুখটা দেখতে পারলেন না।
মৌমিতা চলে যাওয়ায় ছেলেটার অস্থিরতা যেন বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। তার এমন ছটফটানি দেখেও মারুফ শীতল স্বরে প্রশ্ন করলেন, “এখন কোথায় থাকো?”
“খুলনায়। আমি খুলনা ভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন করবো আগামী বছর। যদি সেশন জট না হয়।”
“তোমার বাবা-মা, কোথায় থাকেন?”
এটারই যেন অপেক্ষা ছিলো এতোক্ষণ! বাদল একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো, “আমার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে আগেই। মায়ের সাথে কথা হয় মাঝে মাঝে। মা বগুড়ায়, আমার নানাবাড়িতে। বাবার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমার বড় বোনের স্বামী, আমার পড়াশোনার সব খরচ দিতেন ছোটবেলা থেকে। আমি এখন টিউশনি করি, স্কলারশিপ পেয়েছিলাম... এগুলো দিয়েই আমি নিজের খরচ চালিয়ে নিতে পারি। আর পার্ট টাইম জবও খুঁজছি...”
মারুফ মাথা দোলালেন, “মৌমিতাকে নিয়ে তোমার ভাবনা কী?”
বাদল চুপ করলো। কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না। ভাবনা? তার সমস্ত ভাবনাই তো মৌমিতাকে নিয়ে!
“কতোদিনের সম্পর্ক তোমাদের?”
“প্রায় সাত বছর।”
মারুফের কপালে ভাঁজ পড়লো। বাদলের পারিবারিক, আর্থিক অবস্থা জেনেও মৌমিতা এতো বড় বোকামি করতে পারলো? তিনি উপলব্ধি করলেন, ছেলেটার প্রতি তিনি কঠোর হতে পারছেন না। তবে একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে।
“মৌ যে বয়সে তোমার থেকে বড়, সেটা জানতে না?”
বাদল একটু সময় নিলো উত্তর দিতে, “জানতাম।”
খন্দকার সাহেব অকারণে হাসলেন। সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন একবার, তারপর বলতে লাগলেন, “ধরো, তোমার বিয়ে হয়ে গেছে। চাকরি হয়নি এখনও। অভাবের সংসার। কোনোমতে টেনেটুনে খরচ চালাতে হয়। বউয়ের শখগুলো তুমি পূরণ করতে চাও, কিন্তু পারো না। এটা নিয়ে খুব কষ্ট হয় তোমার।
ঐ অভাবের মাঝেই একটা ফুটফুটে মেয়ে হলো তোমাদের। তার মুখ দেখলেই, পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, সব এনে দিতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু তুমি কিছু করতে পারলে না। কারণ, এতো সামর্থ্য নেই।
অনেক কষ্টে মেয়ের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করলে, একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করালে। ওকে নিয়ে তোমার বড় বড় স্বপ্ন। নিজের সব উপার্জন ঢাললে মেয়েটার পেছনে।
কিন্তু মেয়েটা একদিন রাস্তার ধারে একটা রঙচঙে ডায়েরি দেখে তোমাকে বললো, আব্বা, ওটা কিনে দাও। তোমার পকেটে তখন একটা টাকাকড়িও নেই। জিনিসটা আর কেনা হলো না।
এরপর থেকে তোমার ছোট্ট মেয়েটা হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেলো। তোমার কাছে আর কোনোকিছুর আবদার করে না।
সে জানে, আব্বা দিতে পারবে না। সে তোমার কাছে কোনোদিন আর কিছু চাইলো না। কিচ্ছু না। তোমার মনে হলো, মেয়েটার উপর থেকে সব রকম অধিকার হারিয়ে ফেলছো তুমি।
একসময় বুঝতে পারলে, তুমি বেশিদিন বাঁচবে না। হাতে সময় খুব অল্প। মাথার উপর এমন কোনো মানুষ নেই, যে মেয়েটাকে আগলে রাখবে। দিন দুনিয়া খারাপ। আর তোমার মেয়েটা... ও এখনও ছোট রয়ে গেছে তোমার কাছে। তুমি এমন একটা ঠিকানা খুঁজছো, যেখানে মেয়েটাকে পাঠিয়ে মৃত্যুর আগে আর অপরাধবোধ কাজ করবে না।
আর ধরো, তোমার হাতে দু'জন পাত্র। তোমার আদরের মেয়ের জন্য। একজনের কাছে সব রয়েছে। তুমি যা দিতে পারোনি, তার সব দিতে পারবে সে। তোমার সব অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করবে। ছায়া হয়ে দাঁড়াবে। মেয়েটার মতোই স্বভাব, ওরা একে অপরকে বুঝবে বলেই তোমার বিশ্বাস।
আরেকজন, যার কাছে আছে এক বুক ভালোবাসা। আর কিছুই নেই। তোমার অনুপস্থিতিতে মেয়েটা কাউকে ‘আব্বা’ বলে ডাকবে, সেই বাবাও তার কাছে নেই। তাকে পেতে গিয়ে সব হারাবে তোমার মেয়ে।”
বাদলের দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে অভয় দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো। মৌমিতা কিছুক্ষণ আগে যে ঘরটাতে ঢুকেছে, সেটার দরজাতেই তার চোখজোড়া ছুটছে বারংবার। তাকে এক ঝলক দেখার আশায়। আর যদি দেখা না হয়? কেন মনে হচ্ছে, জীবনটা এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে, আকাশটা ভেঙে পড়ছে মাথার উপর?
বাইরে বোধহয় ঝড় শুরু হয়েছে এতোক্ষণে। হয়তো সেজন্যই...
“মনে করো, তোমার ঐ মেয়েটা... মৌমিতাই। কী করবে তুমি?” মারুফের গলা ধরে এলো, “ওর একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ছেলেটা ডাক্তার। পরিবার বেশ সচ্ছল। বিয়ের পরেও ওকে পড়াবে, চাকরি করতে দিবে। বলো... আমার জায়গায় থাকলে কী করতে তুমি?”
বাদল শুকনো ঢোক গিললো, আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টাও করলো, “আমি নিজেকে আপনার জায়গায় রাখতে পারবো না। আমি বুঝেছি, আপনি কী বলতে চান। কিন্তু আমার কথা তো আমি আপনাকে বোঝাতে পারছি না। আপনি তো আর নিজেকে আমার জায়গায় রেখে দেখবেন না।”
মারুফ শব্দ করে হেসে উঠলেন, “তোমার কী মনে হয়, আমি কখনোই তোমার জায়গায় ছিলাম না?”
দরজা খোলার আওয়াজ কানে আসতেই মৌমিতা তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাদলকে বেরিয়ে যেতে দেখেও সে এক পা এগোতে পারলো না। মনটার সাথে শরীরটাও ভীষণ ভারী হয়ে এলো যেন। এই ঝড়ের মাঝে, চোখের সামনে ছেলেটা চলে গেলো। কেউই আটকালো না। একটু থামতে বললো না।
মৌমিতা কোনোমতে বসার ঘরে আসে, সোফা ঘেঁষে দাঁড়ায়, “আব্বা? কী কথা হলো?”
মারুফ ক্লান্ত স্বরে বললেন, “সিদ্ধান্ত তোমার। তুমি যা চাও, সেটাই হবে।”
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মেয়েটার শুকিয়ে আসা মুখখানি দেখেও দেখলেন না। বলতে পারলেন না, বাদল নাছোড়বান্দা। মৌকে সে কিছুতেই ছাড়তে রাজি না। সামান্যতম ইঙ্গিত পেলেও ছুটে আসবে আবার। তখন তাকে আটকানো আর সম্ভব হবে না।
মানুষ মাত্রই কি নিজেকে ধ্বংস করতে ভালোবাসে?
ঐ তেজ, ঐ জেদ যে মারুফের খুব চেনা। ঐ বিদ্রোহের আগুনে যে তিনিও এককালে পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিলেন, নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন নিজ হাতে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………