আদিল মির্জাস বিলাভড - পর্ব ৫০ - নাবিলা ইষ্ক - ধারাবাহিক গল্প

আদিল মির্জাস বিলাভড - নাবিলা ইষ্ক
          নূরজাহান চমৎকার একজন নারী। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের। তাকে রোযার ভীষণ ভালো লেগেছে। আজকের পুরো বেলা জুড়ে রোযাকে সঙ্গ দিয়েছে। ঘুরিয়ে দেখিয়েছে পুরোটা ফার্মহাউজ। আপাতত নূরজাহান রান্নাঘরে কফি বানাচ্ছে রোযার জন্য। রোযা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে তার কফি বানানো ব্যস্ত শরীরটা। কফি বানাতে বানাতে ভদ্রমহিলা ছোটো ছোটো বিষয়ে গল্প করছে। মন দিয়েই শুনছিল রোযা। গল্পে গল্পে ফট করে নূরজাহান বলে বসল -

‘পরিস্থিতি মানুষকে পরিবর্তন করতে বাধ্য করে, ম্যাডাম। আমাদের স্যার তো এমন ছিলেন না। ভীষণ চঞ্চল —’

থমকাল নূরজাহান। সম্ভবত মুখ ফসকে বলে ফেলেছে! দৃষ্টি এড়িয়ে গেল কেমন! অথচ রোযা দুকদম এগিয়ে দ্রুতো জানতে চাইল -

‘কী হয়েছিল? কোন পরিস্থিতির কথা বলছেন নূরজাহান?’

নূরজাহান থতমত খেয়েছে। ভুলেও আর দৃষ্টি তুলে তাকাল না। বিষয়টা যে এড়াতে উতলা হয়ে আছে তা বেশ বুঝতে পারল রোযা। চাপা আগ্রহ দমল এতে। তবে চলে গেল না পুরোপুরি। আগ্রহ ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকল ক্রমশ। কী হয়েছিল আদিল মির্জার সাথে? যা তাকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে? তারমানে কী অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে নূরজাহান জড়িত? পুরাতন কর্মচারী বুঝি? জানে আদিলের অতীত? নূরজাহান কফির মগ নিয়ে এলো। বাড়িয়ে দিতেই মগটা নিলো রোযা। নূরজাহান স্বাভাবিক ভাবে হেসে জানতে চাইল -

‘খেয়ে বলুন ম্যাডাম, কেমন টেস্ট?’

ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক বসাল রোযা। কফিটা দারুণ হয়েছে। তেতো না, আবার মিষ্টিও না। দুটোর মাঝামাঝিতে। 

‘দারুণ… বেশি মিষ্টি না আবার তেতোও না।’

বিপরীতে মিষ্টি করে হাসল নূরজাহান। রোযা কফির মগ হাতে এসে বসল সোফায়। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে তখন ছ’টায়। কিছুক্ষণ আগেই ক্লান্ত জানিয়ে গিয়েছে তারা বের হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। সেই যে ভোরে আদিলকে দেখেছিল আর সারাদিনে তার দেখা মেলেনি। বাড়ির বাইরে ছিল। গতকাল রাতের ঘটনা সামলাতে কি এমন দৌড়ঝাঁপের মধ্যে আছে মানুষটা? জানা নেই রোযার। তবে আঁচ করতে পারছে একটু। কফির মগে চুমুক দিতে গিয়ে দৃষ্টি পড়ল হাতের ওপরে। মনে হলো এখনো উষ্ণ, খসখসে একজোড়া হাত তার হাত ধরে ব্যথা নিবারণের জন্য আদুরে ভঙ্গিতে বুলিয়ে যাচ্ছে! সে দৃশ্যও ভেসে উঠল আচানক! 

‘ম্যাডাম!’

রোযা ফিরে তাকাল। ক্লান্ত এসে দাঁড়িয়েছে। ডাকছে তাকে বেরুনোর জন্য। রোযা কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। তৈরি হওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলো। পছন্দ অনুযায়ী একটা কালো রঙের শর্ট হাতার ওয়ান পিস পরে নিলো। গোলগাল ওয়ান পিস এসে পড়েছে হাঁটুর বেশ খানিকটা নিচে। কালো রঙের হিল পায়ে। চুলটা ছাড়া রাখল। পারফিউম ছিটিয়ে নিল গলার কাছটায়। হাত ঘড়িটা পরে নিলো ডান হাতে। বা হাতে ব্রেসলেট। অবশেষে রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো। সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখল আদিল প্রবেশ করছে। পরনে কালো রঙের স্যুট। তার পেছনেই শান্ত, এলেন। কথা বলছিল, বলতে বলতে তাকাল ওপরে। রোযা না তাকিয়েও উপলব্ধি করতে পারে একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি। তাকেই দেখছে যে! রোযা সিঁড়িগুলো বেয়ে নেমে আসতেই আদিল ডাকল -

‘নূরজাহান!’

নূরজহানা কাছকাছি ছিলো। এগিয়ে এসে বলে, ‘জিই?’’

‘একটা শাল নিয়ে আয়।’

রোযা বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে নিঃশব্দে দেখল নূরজাহান ওপরে চলে গিয়েছে। আদিল বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে আপদমস্তক দেখতে দেখতে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পিঠ মানুষটা চওড়া বুক স্পর্শ করবে করবে ভাব! রোযা অনুভব করতে পারছে তপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের অস্তিত্ব। মৃদু বাতাসে উড়তে থাকা লম্বা চুলগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে আদিলের গম্ভীরমুখ। আদিল চোখ বুজল। মাথাটা এগিয়ে নিতেই লম্বা নাকটা ডুবে গেলো চুলের ভাঁজে ভাঁজে। রোযা নড়ল না। শুধু শুনল তার মন একটাই প্রশ্ন করে যাচ্ছে, কী চায় সে? কী? অন্যমনস্কতার প্রভাবে মনের প্রশ্নটা ঠোঁটেও চলে এলো বুঝি -

'আপনি আসলেই, কী চান?’

রোযার বাক্যের সাথে সাথেই জড়াল আদিলের প্রত্যুত্তর, ‘তুমি পুরোটা।’

লাল রঙের পাতলা শাল নিয়ে এসেছে নূরজাহান। এগিয়ে দিয়েছে আদিলের দিকে। ওটা হাতে নিয়ে রোযার দু-কাঁধে জড়িয়ে দিতে দিতে আওড়াল -

‘বাইরে ঠান্ডা। গায়ে রাখো এটা।’

বলেই রোযার ডান হাত নিজের খসখসে হাতের মুঠোয় ভরে নিয়ে কদম বাড়াল দরজার দিকে। রোযা পুতুলের মতো এগুচ্ছে। তার দৃষ্টি ওতপ্রোতভাবে ভাবে জড়ানো হাতজোড়ার দিকে। রোযা ডাকল -

‘শুনুন…’

আদিল সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকাল না। কদমও থামাল না। হাঁটা অব্যাহত রেখেই বলল -

‘বলো, কোনো সমস্যা?’

‘একটা আবদার ছিল!’

সঙ্গে সঙ্গে কোনো জবাব এলো না আদিলের। গাড়ির কাছাকাছি এসে তবেই তাকাল রোযার চোখমুখে। চোখের সামনে আসা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আওড়াল -

‘শুনিই?’

রোযা ইতস্তত করে সামান্য। আদিলের চোখে একপলক চেয়ে ঘাবড়ে গিয়ে অবশেষে বলে -

‘মিসেস নূরজাহানকে আমার ভালো লেগেছে।’

আদিল মাথা দুলিয়ে গলা তুলে ডাকল, ‘শান্ত! একটা চেক দিয়ে আয় নূরজা–’

আদিলের কথার মধ্যে ফোড়ন কেটে রোযা ফের দ্রুত বলে, ‘টাকা নয়, তাকে ভালো লেগেছে, কোনোভাবে কি তাকে আমাদের বাড়িতে ট্রান্সফার করানো যায়?’

আদিল সম্ভবত থমকেছে, থমকে গিয়েছে রোযা নিজেও! আমাদের বাড়ি! বারবার কথাটা প্রতিধ্বনি তুলছে কানের চারিপাশে! কী বলল এটা সে? আদিল ঢোক গিলল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথাটা নুইয়ে আনল রোযার সমান। গোলাপের মতন মসৃন চোখেমুখে চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আওড়াল -

‘আমাদের বাড়িতে ট্রান্সফার করানো যায়। তবে উত্তর দিন, এতো ভালো লাগার কারণ?’

রোযা সময় নিয়ে জানাল, ‘অনেস্ট, রেসপেক্টফুল, কাইন্ড।’

আদিল ফিসফিস করে বলে, ‘ঠিকাছে, দিয়ে দিলাম। নূরজাহান আজ থেকে আপনার।’

রোযা ঠোঁটে ঠোঁট টিপল। ভাবল, চোখ তুলে তাকিয়ে আওড়াল ফের, ‘উনার স্বামীকে এখানে রেখে তাকে নিয়ে গেলে মন খারাপ হবে না তার?’

‘কাজের সাথে স্বামীর সম্পর্ক কী?’

রোযা ভীষণ মনোযোগের সাথে বোঝাল, ‘এখানে তারা দুজন একসাথে ছিলো। তাকে নিয়ে গেলে তার স্বামীর থেকে আলাদা করা হলো না? কষ্ট পাবেন না নূরজাহান?’

আদিল ভীষণ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে গেলো, ‘স্বামী পাশে না থাকলে বুঝি কষ্ট হয়? আপনারও কী হয় মিসেস মির্জা?’

রোযা থমকে গেলো। চমকাল, লক্ষ্য করল তারা ভীষণ কাছাকাছি। আদিলের মাথাটা নুইয়ে একদম তার কাছে, সমান হয়ে এসেছে। রোযা পেছাল দু-কদম। জবাবে নিরুত্তর রইল। আদিল সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আওড়াল -

‘অপেক্ষায় থাকলাম, স্বামী হিসেবে আমিও মিস হতে চাই আপনার দ্বারা।’

ক্লান্ত গাড়ির দরজা মেলে ধরে রেখেছে। রোযা ব্যাকসিটে উঠে বসেছে চটজলদি। আদিল পাশে এসে বসেছে অনেকক্ষণ পরে। রোযা আড়চোখে দেখতে পেলো অন্য গাড়িতে নূরজাহান তার স্বামীকে নিয়ে উঠে বসেছে। আড়চোখে রোযার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। রোযার চিন্তা কমল এতে। সে ভাবছিল নূরজাহানের খারাপ লাগে কি-না? যদি ওখানে যেতে নাই চাইল? জোর করা হয়ে যাবে না? এখন হাস্যোজ্জ্বল তাকে দেখে অশান্তি দূর হলো। 

—————

গাড়িগুলো প্রবেশ করছে মির্জা ভবনের ভেতরে। রোযা প্রাণ ভরে দেখল আশপাশটা। একটা দিনের পরে ফিরে এসে মনে হচ্ছে কতকাল বাড়ি থেকে দূরে সে! চোখ জুড়িয়ে গেলো। মন ভরে এলো। গাড়িগুলো থেমেছে, তৎক্ষণাৎ কুকুরের চিৎকারের পাশাপাশি হৃদির ডাক ভেসে এলো -

‘মম…’

বাচ্চাটা সম্ভবত ওৎ পেতে ছিলো তাদের ফেরার পথ চেয়ে। কারও দরজা খোলার সময়ও দেয়নি রোযা। নিজেই দরজা খুলে নামল দ্রুতো। হৃদি দুয়ারের সিঁড়ি বেয়ে ছটফট ভঙ্গিতে নামছে। পরনে কটনের সফেদ রঙের ফ্রোক। চুলে দুটো ঝুঁটি বাঁধা। রোযা ঝুঁকে দু-হাত মেলে দিতেই হৃদি খিলখিল করে হাসতে হাসতে ঝাঁপিয়ে উঠল রোযার কোলে। দু-হাতে গলা জড়িয়ে ডেকে গেল -

‘মম…মা.. মাম্মা, আই মিসড ইউ সোওও মাচ।’

রোযা মাথা নুইয়ে সমানে চুমু খেল হাস্যোজ্জ্বল তুলতুলে মুখ জুড়ে। চুমু খেতে খেতে অধৈর্য গলায় বলে গেলো -

‘আই মিসড ইউ মোর মাই চাইল্ড। মম মিসড ইউ সো মাচ। দেখিইই…’

বলেই দুহাতে ছোটো মুখটা ধরে ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে আদর করে গেলো, ‘মমের অ্যাবসেন্সে গুড গার্ল হয়েছিল আমার সোনাটা, তাই না?’

হৃদি মাথা দুলিয়ে বলল, ‘হু, তুমি মরিয়ম আন্টিকে জিজ্ঞেস করো।’

মরিয়ম বেগম পেছনেই ছিলেন। হৃদির সুরে সুর মিলিয়ে বললেন -

‘একদম। লক্ষ্মীটি হয়েছিল। একটুও কান্নাকাটি করেনি।’

রোযা দেখল হৃদির ছোটো মুখটা হাঁসফাঁস করে উঠল। কান্নাকাটি করেছে তা তো রোযাই শুনে এসেছে! এখানে অস্বীকার করছে! রোযা মুচকি হাসছে দেখে হৃদি গাল ফোলাল। মুখ লোকাল রোযার ঘাড়ে। ফিসফিস করে বলল -

‘একটু কেঁদেছি মম। একটু, বেশি না।’

মেয়েকে পরম যত্নে বুকের সাথে মিশিয়ে পিঠ বুলিয়ে বলে গেলো, ‘হুম, আমার বেবি ভীষণ স্ট্রং। অল্প কাঁদে, বেশি না। আই নো।’

হৃদি পুনরায় খিলখিল করে হেসে উঠল। মুখ তুলে রোযার গালে কয়েকবার ঠোঁট ছুঁইয়ে তড়তড় করে নেমে গেলো নিচে। ওদিকে বডিগার্ডসদের সাথে আলাপে ব্যস্ত বাবার দিকে ছুটে এলো। আদিল আদেশ করতে করতে মেয়েকে তুলে নিয়েছে কোলে। 

নূরজাহান এসে দাঁড়িয়েছে রোযার সামনে। হাসছে মুচকি মুচকি। রোযা এভাবে হাসার কারণ বুঝল না। সন্দেহ নিয়ে তাকাতেই নূরজাহান আস্তে করে জানাল -

‘ম্যাডাম, আমার সাথে আপনি ভালো মিশেছেন তা স্যার লক্ষ্য করে সকালেই বলেছিল আমাদের এই বাড়িতে চলে আসতে। আপনাকে সঙ্গ দিতে।’

অর্থাৎ রোযা না বললেও তাদের সাথে এই বাড়িতে আসতো নূরজাহান। তার এতো কথা বলার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। রোযার ঠোঁট জোড়া উল্টে আসতে চাইল। কী অসহ্যকর! আড়চোখে ফিরে তাকাল একপল। পরপরই কদম বাড়াল ভেতরে। মুচকি হাসতে হাসতে নূরজাহানও চলল ম্যাডামের পিছুপিছু। 

—————

আদিল মির্জার ধূসর মণিজোড়া নিজের ওপর পড়তেই নড়েচড়ে ওঠে শান্ত। ডুবতে বসা নাবিকের ন্যায় অধৈর্য হয়ে বলে -

‘বাড়ি ফিরব, বস।’

আদিল ভ্রু তুলল, ‘এখুনি? কিছু হয়েছে?’

এলেন হঠাৎ শব্দ করে হেসে উঠল। এতে আদিলের ডান ভ্রু হিমালয় ছুঁলো বুঝি। ক্লান্ত বেফাঁস বলে বসল -

‘বস, শান্ত বউ রেখে আর থাকতে পারছে না! তাইতো?’

শান্ত অস্বীকার করল না। করুণ চোখে বসের দিকে চেয়ে অনুনয় করে গেলো -

‘ছুটি চাই একদিনের বস।’

এলেন ভাবুক হয়ে বলল, ‘একদিনে হবে? কম হয়ে গেলো না?’

শান্ত ওদের পাত্তাই দেয় না। শুকনো মুখে চেয়ে কপালে হাত দিয়ে নিজের গায়ের উষ্ণতা মেপে বলে, ‘বস, আমার মনে হয় জ্বর উঠে গেসে শরীরে।’

ধ্রুব ঠোঁট উল্টাল, ‘ভোজন হয় না কতকাল! স্বাভাবিক!’

শান্ত এবারে অশান্ত হলো। ধাওয়া করল সবগুলোকে। যাকে হাতের কাছে পেয়েছে মে রেছে। এলেনের পিঠে লাফিয়ে চড়ে গলাটা প্যাঁচিয়ে ধরল। এলেন হাঁসফাঁস করল না। উল্টো শান্তকে বাগে আনার জন্য কসরত করে যাচ্ছে। আদিল ধমকাতেই সব শান্ত হলো। শান্ত ফের এগিয়ে এসে দাঁড়াল বসের সামনে। আদিল বলল -

‘যা, তোকে তো বললাম সপ্তাহখানেক ছুটিতে থাক।’

এলেন পাশ থেকে যুক্ত করল, ‘কিন্তু বস, ওর ওয়াইফের বয়স কম।’

অর্থাৎ একসপ্তাহ শান্তকে সামলাতে পারবে না। আদিল চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই এলেন বেলুনের মতো চুপসে গেলো। শান্ত এতে অবশ্য খুশি হতে পারল না। আদিল ফট করে যাওয়ার আগে বলে গেলো -

‘দৌড়ে বাসায় যা। বউ কিন্তু থাকবে না তোর।’

সবগুলো শব্দ করে হেসে উঠল। হাসির শব্দে পুরো মির্জা ভবন বোধহয় কেঁপে উঠেছে। শান্ত নিজেও আশ্চর্য হয়। পরমুহূর্তেই চিৎকার করে উঠল -

‘বস!!’

ডাকতে ডাকতে শান্ত হঠাৎ হাঁচি দিয়ে উঠল। তাও বেশ কয়েকবার। নাক পিটপিট করছে। কে তাকে বকছে?

—————

ঝুমুর বিছানায় দুপা ঝুলিয়ে বসে আছে। কলায় কামড় বসাতে বসাতে ভাবছে রোযার শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়া কথাগুলো। সৌরভ জানাল আজ শান্ত ফিরবে। ঝুমুর নিজেকে প্রস্তুত করছে শান্তকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। রোযা যা যা শিখিয়েছে তাই করবে! বেশিকিছু তো না, ছুঁতে দিবে না নিজেকে। রিভিলিং ড্রেস পরে শান্তর আশেপাশে ঘুরবে কিন্তু নিজেকে ছুঁতে দিবে না, কাছেও যাবে না। ঘেঁষতে এলে শক্ত কথা শুনিয়ে দেবে তারপর এড়িয়ে এড়িয়ে বেড়াবে। এতে ঠিক কী শিক্ষা দেয়া হবে শান্তকে, ঝুমুরের জানা নেই। কিন্তু রোযা যেহেতু বলেছে তাতে নিশ্চয়ই কাজ হবে? এতটুকু বিশ্বাস রোযার প্রতি আছে মেয়েটার। রোযাকে গুরু ভাবে কি-না! গতকালই নুরী বেগমকে দিয়ে শপ থেকে নাইট ড্রেস আনিয়েছে। এতো চমৎকার! ওটা পরে গতকাল ঘুমিয়েছে ঝুমুর। কী যে আরামবোধ হলো! এখনো পরনে নাইট ড্রেসটাই। আয়নার সামনে থেকে কয়েকবার ঘুরেফিরে এসেছে। দারুণ লাগছে তো! ঝুমুরের তর সইছে না আর। লোকটা আসুক দ্রুতো। ঝুমুর চায় শান্তকে কঠিন শিক্ষা দিতে। তাকে, এই ঝুমুরকে কাঁদানো, এড়ানো!! আগেরবার তো থোতায় লাথি দিয়েছিল ভুলবশত। জোরপূর্বক তাকে ছুঁতে এলে এবারে ইচ্ছে করে থোতাতেই দিবে। দুষ্টু লোক কোথাকার! 

—————

‘হৃদিকে ঘুম পাড়িয়ে রুমে আসো।’

কোন রুমের কথা বলছে তা আর বুঝতে বাকি নেই রোযার। সে মিইয়ে গেলো। দৃষ্টি তুলে তাকাল না। দেখল আদিল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে। কোলের ওপরে হৃদি ঘুমে কাঁদা হলেও মাকে ছাড়তে নারাজ। আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। লিভিংরুমের টেলিভিশন তখনো চলছে। টেলিভিশন বন্ধ করে ঘুমন্ত হৃদিকে কোলে তুলে নিলো রোযা। দোতলায় উঠে এলো জলদি। হৃদির রুমের দরজা আটকে হৃদিকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। বললেই চলে যেতে হবে রোযার? কখনো না! হৃদি মুহুর্তে ঘুমিয়ে গেলেও রোযা ঘুমাতে পারল না। পরমুহূর্তেই নূরজাহানের কথা মনে পড়ল। তার খবর তো নেয়া হলো না! ভেবেই রোযা নেমে এলো নিচতলায়। নূরজাহান নিচতলার সিঁড়িগোড়ার এই গেস্টরুম বেছে নিয়েছে। আপাতত নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। রোযা এসে দাঁড়াল দরজার কাছে। নূরজাহান হেসে বলল -

‘আসুন ম্যাডাম, বসুন।’

রোযা ভেতরে এলো। তবে বসল না। ছোটো ল্যাগেজটার দিকে চেয়ে বলল -

‘এই জিনিসপত্র?’

নূরজাহাফিরে তাকায় না। ল্যাগেজ থেকে কাপড়চোপড় বের করতে করতে হেসে বলে, ‘ম্যাডাম, সব তো মালিকের। কাপড়চোপড় ব্যতীত আর কিছু লাগে না তো।’

রোযা রুমটা দেখল একপলক। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রুম। মাথার ওপরে ঘুরছে ফ্যান। একটা খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল আছে। নূরজাহান তখনো ব্যস্ত। রোযা চলে আসতে চাইল তখুনি নূরজাহানের ল্যাগেজ থেকে বেরিয়ে এলো অনেকগুলো পুরাতন ছবি। একটা ছবি উড়ে এসে পড়ল রোযার পায়ের কাছে। উল্টানো ছবিটা। রোযার দেখার আগ্রহ এলো না। কদম বাড়াবে, ছবিটা ফের উড়ল। এবারে দেখা গেল তিনজন মানুষের মুখ। রোযার কদম থামল। ছোটো মুখটা দেখে ঝট করে ছবিটা তুলে নিলো হাতে। একটা ছবি। সেকেলে, সাদাকালো! ছত্রিশ বছর পুরনো। তবে ভীষণ আদুরে ছবিটা। স্বপ্নের মতো, একটা তিন সদস্যের সুখী পরিবার! ছবিতে কারা? এই বাচ্চাটা কে? বাচ্চার সাথে তারা কি বাচ্চার বাবা-মা? বাচ্চাটাকে আদিল মির্জার মতো লাগছে! চেহারা, চোখ রোযা চিনেছে! হাস্যোজ্জ্বল এই বাচ্চাটা আজকের গম্ভীরমুখো আদিল মির্জা? রোযার বিশ্বাসই হলো না। নূরজাকোনো শব্দ শুনতে না পেয়ে পেছনে ফিরে ভড়কালেন ঠিক তবে পরমুহূর্তেই শান্ত হলেন। রোযা কম্পিত হাতটা বাড়িয়ে ছবিটা দেখিয়ে জানতে চাইল -

‘কারা?’

নূরজাহান ছবিটা নিলো। শাড়ির আঁচল দিয়ে ছবিটা ভালোভাবে মুছল। ভাবনায় ডুবল যেমন। ফিসফিস করে আওড়াল -

‘স্যার, আর তার বাবা - মা।’

রোযার অনড় দৃষ্টি তখনো ওই ছবিতে। নূরজাহান আওড়ে যায় -

‘ওসমান মির্জা তার স্ত্রী গুলনাহান এবং তাদের একমাত্র সন্তান আদিল মির্জা।’

রোযার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp