পবনপত্র - পর্ব ৩০ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          রাবেয়া খাতুন দুপুরের দিকে একটু শুয়েছিলেন। চোখদুটো কখন লেগে গেছে, টের পাননি। ঘুম থেকে উঠে মাথাটা বেশ ভারী ভারী লাগলো। তিনি একটু সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
বেলা পড়ে গেছে। উঠোন থেকে শুকনো কাপড়গুলো তুলে আনতে হবে।

রাবেয়া বারান্দায় এসে দেখলেন, জহির মিঞা এদিকেই আসছেন। তিনি মাথায় আঁচল টেনে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়ালেন। জহির ব্যস্তভাবে প্রশ্ন করলেন, “মারুফ আছে নাকি বাড়িতে?”

“না। দোকানে গেছে।”

“মারুফকে বাড়ি আসতে বলো। ছেলের আত্মীয় আসছে মৌকে দেখতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। ওদের হাতে নাকি বেশি সময় নেই। শুধু দেখেই চলে যাবে।”

রাবেয়ার পায়ের নিচটা কেমন যেন দুলে উঠলো। মেয়েটাকে তবে সত্যি সত্যিই ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। একদিন হয়তো মেয়েটাকে নিয়ে চলেও যাবে কেউ না কেউ। ঘুমটা পুরোপুরি কাটেনি, তার মাঝেই এমন একটা সংবাদ পেয়ে রাবেয়া হঠাৎ করে চোখে অন্ধকার দেখলেন। আমতা আমতা করলেন তিনি, “আরও আগে জানালে ভালো হতো, ভাই। এতোটুকু সময়ে—”

“কিছু করতে হবে না। তুমি মারুফকে ডাকার ব্যবস্থা করো। আর মৌকে তৈরি হয়ে থাকতে বলো।”

মৌমিতা ঘরে। মনোযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে। সামনে ১৯তম বিসিএস। স্বাবলম্বী হওয়ার যাত্রায় তার প্রথম পরীক্ষা। যদিও প্রস্তুতি আহামরি নয়। তবে একটু তাড়াহুড়ো করতেই হবে চাকরির জন্য। মনের ভেতরে বিপদের ঘণ্টা বেজে চলেছে প্রতিনিয়ত।
রাবেয়ার গলা শুনে সে সোজা হয়ে বসলো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। রাবেয়া ধীরে ধীরে হেঁটে এলেন, পুরোপুরি ঘরের ভেতরে ঢুকলেন না।

“মৌ? একটু ভালো জামা-কাপড় পরে থাকো তো মা।”

“কেন?”

“তোমাকে... দেখতে আসছে।”

মেয়েটা হতভম্ব হয়ে গেলো। প্রাথমিক বিস্ময়টা কাটতেই সে একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বলে, “দেখতে আসছে মানে?”

“জহির ভাই এখনই এসে এই খবর দিলেন। কী করবো, বলো? রেডি হও তাড়াতাড়ি।”

“আম্মা, আমি তো বললাম। এতো তাড়াতাড়ি আমি বিয়ে করবোই না।”

“দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাবে না। ওরা দেখুক। দেখো, পছন্দই হয় কিনা।”

মৌমিতা শান্ত হলো। তাই তো। দেখতে এলেই তো আর পছন্দ হয়ে যাবে না। নিজেকে নানাভাবে আশ্বস্ত করে সে উঠে দাঁড়ালো। জহির চাচার উপর হুট করেই খুব রাগ হলো। শুধু জহির না, লোকটার পুরো পরিবারটার উপরেই রাগ হলো। পরমুহূর্তেই মনে হলো, তারা কি আর জানেন, খন্দকার বাড়ির মেয়ে দু'টির মনের খবর? অযথা দোষারোপ না করে স্বাভাবিকভাবে দেখলে, তারা যা করছেন, সবই ঠিক। তাদের দ্বারা এর থেকে ভালো তো আর কিছুই করার নেই।

মারুফ বাড়িতে ফিরেই ঢকঢক করে কয়েক গ্লাস পানি খেয়েছেন। মুখটা তবু শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে আছে।
মেয়েটার সম্বন্ধ জলদি আসুক, এটা তিনি চেয়েছিলেন ঠিকই, তবে আশা করেননি। নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কিছু পরিকল্পনা করা, আর সেটাকে সময়ের আগেই বাস্তবায়ন হতে দেখার ব্যাপারটা বড়-ই নিষ্ঠুর।

বিকেলের দিকে খন্দকারদের বাড়ির সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামলো। ঘর জুড়ে তখন গমগমে পরিবেশ। মৌমিতা রান্নাঘরের এক কোণে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সে শুধু এতোটুকু বুঝলো, জহির চাচার সঙ্গে দু'জন মহিলা মানুষ এসে ঢুকেছে বসার ঘরে। পাত্র সম্ভবত আসেনি। আর অন্য কোনো পুরুষ মানুষও আসেনি? নাকি পরে আসবে?
রাবেয়া এসে মেয়ের হাত ধরলেন, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “চলো।”

মৌমিতা চোখে-মুখে ভয়ানক বিতৃষ্ণা দেখিয়ে বললো, “আমি এসব নাটক করতে পারবো না। আমার কোনোই ইচ্ছা নাই।”

“আরে, একটু সামনে গেলেই কি ধরে বিয়ে করাবে? দেখা করো একবার।”

চা-নাস্তার পাত্র রাখা পেছনে। মৌমিতা সেটা দু'হাতে ধরে ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বেরিয়ে এলো। মেহমানদের দিকে চোখ তুলে তাকালো না। টেবিলে খাবারের সরঞ্জাম রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সালামটা দিতে গিয়েও দিলো না। প্রথম দেখাতেই যদি পাত্রী সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়ে যায়, তাতেই সে খুশি।
তবে অতিথিরা অসন্তুষ্ট হলেন না! তুলনামূলক বয়স্ক মহিলা মিষ্টি হেসে প্রশ্ন করলেন, “তুমি মৌমিতা। তাই না?”

মেয়েটা এবারও এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু আড়চোখে মারুফের অসহায় মলিন মুখখানি দেখে তার অন্তরে কিছু একটা খচখচ করতে লাগলো। সে মাথা দুলিয়ে উচ্চারণ করলো, “জ্বী।”

ভদ্রমহিলা বললেন, “বসো।”

মৌমিতা বসে পড়লো। দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিলো, অস্বস্তি লাগছিলো। ভালোই হয়েছে, বসতে বলেছে!
সোফায় জড়োসড়ো হয়ে বসার পরেই সে প্রথমবার একটু ভালোভাবে লক্ষ করলো অতিথিদের। উভয়ের পরনেই জামদানী শাড়ি, সংখ্যায় কম হলেও দামী কিছু অলংকার।
অল্পবয়সী মেয়েটা হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কীভাবে যেন পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। তার সাথে চোখাচোখি হতেই মৌমিতা চটপট দৃষ্টি নামিয়ে ফেললো।

“জহির ভাইয়ের কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি, মারুফ ভাই। আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এদিক দিয়ে আসছিলাম। ভাবলাম, আপনাদের সাথে পরিচিত হই। আপনার মেয়েটাকে দেখে যাই। আবার কবে এদিকে আসতে পারবো, ঠিক নেই। আমার হাজবেন্ড ছুটি পান না সহজে। উনি আসতে পারলেন না।” মারুফের চেহারায় বিভ্রান্তি দেখে তিনি সোজা হয়ে বসলেন, “আমি শাহানা সুলতানা। ছেলের মা।”

কথা শেষ করে ভদ্রমহিলা মৌমিতার দিকে ঘুরে মুচকি হাসলেন। মারুফ কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। শাহানা হয়তো সেটাও খেয়াল করলেন, টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এতো আয়োজনের প্রয়োজন ছিলো না। আমরা শুধু মেয়ের সাথে কথা বলতে এসেছি। মৌমিতা, তোমার অনার্স কমপ্লিট হলো এবার?”

মৌমিতা মাথা দোলায়, “জ্বী।”

“কোথায় পড়েছো যেন?”

“রাজশাহী ভার্সিটিতে।”

“রাজশাহী?” ভদ্রমহিলা আড়চোখে পাশে বসা মেয়েটার দিকে এক ঝলক তাকালেন, “আচ্ছা। কোন ডিপার্টমেন্টে ছিলে তুমি?”

“কেমিস্ট্রি।”

“ওহ। এখন কী ইচ্ছা? বিসিএস দিতে চাও শুনলাম।”

“জ্বী।”

শাহানা পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, “ও হলো রূপা। তোমার থেকে একটু বড়। ওর তো তাড়াতাড়িই বিয়ে হয়ে গেছে, বিয়ের পরে পড়াশোনা শেষ করেছে। এখন জব করছে। অনেক বড় অফিসার—”

রূপা হাসলো, “সত্যি বলতে... মা আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন ঐ সময়। নাহলে পারতাম না।”

চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তবু শাহানা টেবিলে রাখা একটা পেয়ালা তুলে নিলেন হাতে, “মৌমিতা আপনার বড় মেয়ে, তাই না? খুব চুপচাপ। আমার ছেলেটাও চুপচাপ। দেখা যাবে, বিয়ের পরেও দু'জন একে অপরের সাথে পরিচিতই হতে পারছে না!”

কথাটা পুরোপুরি বোঝার আগেই মারুফ হেসে ফেললেন। মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছে। তিনি একটু কৌতূহল দেখালেন, জানতে চাইলেন, “রূপার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আপত্তি করেনি পড়াশোনায়? আপনার কাছে রেখেই পড়িয়েছেন?”

ভদ্রমহিলা এবার শব্দ করে হাসলেন, “আপনি বোধহয় ভুল বুঝলেন। রূপা আমার মেজো ছেলের বউ। তবে হ্যাঁ, ও আমার নিজের মেয়ের মতোই। তিনটা ছেলে আমার। খুব শখ ছিলো মেয়ে সন্তানের। আল্লাহর রহমতে আমার ছেলেদের বউয়েরা আমাকে নিজের মায়ের মতোই ভালোবাসে।”

মারুফ আর রাবেয়া পরস্পরের দিকে তাকালেন। তাদের ঐ দৃষ্টি বিনিময়ের মাধ্যমে কোন বিষয়ে আলাপ হলো—মৌমিতা সেটা বুঝলো না। সে মেঝের দিকে চোখ ফেরালো, ওড়নার পাড়টা আরও শক্ত করে খামচে ধরে বসে রইলো। যেন কোনোমতে এখান থেকে উঠে যেতে পারলেই, শ্বাসনালীতে জমিয়ে রাখা বিষাক্ত বাতাসটুকু বের করে দেওয়া যেতো, একটু দম নেওয়া সম্ভব হতো।
শাহানা ব্যস্ত হয়ে বললেন, “জহির ভাইয়ের কাছে বায়োডাটা আছে। তুমি একবার দেখে নিও মৌমিতা। তোমাকে কিন্তু আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এখন বলো, আমাকে তোমার কেমন লাগলো?”

প্রশ্নটা মৌমিতার কাছে উদ্ভট ঠেকলো। তার জানামতে, তাকে পছন্দ হওয়ার মতো কিছু হয়নি। সালামটা পর্যন্ত দেয়নি। সাজগোজও করেনি। কী দেখে পছন্দ হলো?
মেয়েটা সহজ থাকার চেষ্টা করে, মৃদু হেসে বলে, “এখনই... বলতে পারছি না।”

“তোমার এই উত্তরটাও আমার পছন্দ হয়েছে! থাক, এতো তাড়াতাড়ি বলতে হবে না কিছু। দিন তো পড়েই আছে সামনে।” তিনি মারুফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আজ তাহলে আসি ভাই। হাতে একেবারেই সময় নেই। আপনাদের কিছু বলার সুযোগই দিলাম না।”

অতিথিদের সাথে মারুফও উঠে দাঁড়ালেন, অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে বললেন, “না, সমস্যা নেই। আপনি বললেন বলেই অনেককিছু জানতে পারলাম।”

শাহানা বাকিদের পাশ কাটিয়ে হুট করেই মৌমিতার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন, “বায়োডাটা দেখে নিও, কেমন?”

মৌমিতা মাথা নাড়লো। সে আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভদ্রমহিলা নিজের হাত থেকে একটা সোনার বালা খুলে মৌমিতার ডান হাতে পরিয়ে দিলেন।
রাবেয়ার মুখটা সহসা ফ্যাকাসে হয়ে যায়, তিনি ঘুরে তাকালেন মারুফের দিকে। মারুফেরও প্রায় একই অবস্থা। তবে সবচেয়ে ভয়ানক দেখালো মৌমিতাকে। কোনো এক অজানা আশঙ্কায় আর অনিশ্চয়তায় তার মুখশ্রী কালচে বর্ণ ধারণ করেছে।
শাহানা সেটা দেখে অভয় দিয়ে বললেন, “আমার বড় দুই ছেলেরই বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটজন বাকি আছে শুধু। আর আমি আমার ছোট ছেলেকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি কনফিডেন্ট। ওর সাথে একদিন সামনাসামনি কথা বলো। দেখো, কেমন লাগে ওকে। তারপর যদি তোমার মত না থাকে, তখন দেখা যাবে। আর এমনিতেও তুমি আমার আত্মীয়, জহির ভাইয়ের প্রতিবেশী। তাই না? আমাকে নিজেরই মানুষ মনে করো।” মেয়েটার চিবুকে আঙুল ছুঁয়ে বললেন তিনি, “আসি তাহলে। আবার দেখা হবে।”

মারুফ এগিয়ে গেলেন দরজা পর্যন্ত, পেছনে রাবেয়াও। শাহানা বারান্দায় পা রেখেই জহির মিঞার দিকে ঘুরলেন, “কাল সুজয়ের নাটোরে আসার কথা। ওর নাকি কাজ আছে। যদি আসে, আমি আপনাকে জানিয়ে দেবো। ওকে একটু জোর করে হলেও এখানে আনবেন, জহির ভাই। আমি চাচ্ছি, ওদের নিজেদের মধ্যে পরিচয় হোক। পাত্র পাত্রী মত না দিলে তো কিছু সম্ভব হচ্ছে না। আর সবকিছু তাড়াতাড়ি হয়ে গেলেই ভালো।”

মৌমিতা এখনও সোফার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কে গেলো, কে এলো—কিছুই জানলো না সে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নিজের ডান হাতখানির দিকে। ঐ স্বর্ণের অলংকার তাকে স্পর্শ করার পর থেকে আর একটা শব্দও তার কানে প্রবেশ করেনি। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে যেন।

মেহমানদের গাড়ি চলে যাওয়া মাত্রই রাবেয়া দ্রুতপায়ে মেয়েটার কাছে এসে দাঁড়ালেন, উদ্বেগ প্রকাশ করে বললেন, “এসব নিয়ে চিন্তা কোরো না মা। ছেলে পছন্দ না হলে বালা খুলে ফেরত দিলেই হলো। বুঝলাম না... এই মহিলা এতো অধৈর্য কেন!”

ততোক্ষণে মারুফও ভেতরে এলেন। কারও দিকে তাকালেন না। ঘরের দিকে পা বাড়ানোর আগে তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “আমার মেয়ের আপত্তি থাকলে কোনো বিয়ে হবে না। ভালোভাবে কথাবার্তা বলতে না দিয়ে, একটা বালা পরিয়ে দিলেই তো আর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় না।”

হাজারটা দুশ্চিন্তার মাঝেও একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললো মৌমিতা। তবে কিছু বলার মতো শক্তি পেলো না। ঘরে চলে এলো। পরনের পোশাকটা যেন সূচের মতো বিঁধছে শরীরে। সব বদলে ফেলতে হবে।
ভেতরেও খুব অস্বস্তি কাজ করছে। বাদলের ব্যাপারে বাড়িতে জানানোর সময় হয়তো এসে গেছে। কিন্তু সময় লাগবে আরও! মৌমিতা কী করে জানাবে, তার সম্পর্ক একজন জুনিয়র ছেলের সাথে? যার গ্রাজুয়েশন শেষ হয়নি এখনও, আবার সেশন জটেও আটকে রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা—মারুফ এখন শুধু একজন পাত্র চাচ্ছেন না, তিনি রীতিমতো যোগ্য একজন অভিভাবক খুঁজছেন। এখনও অভিভাবক হওয়ার মতো বয়স কিংবা যোগ্যতা, কোনোটাই যে বাদলের হয়নি!

—————

বাইরে অন্ধকার নেমেছে। পশ্চিম আকাশে রক্তবর্ণ সূর্যটা ডুবে গেছে প্রায়।
বসার ঘরটা ফাঁকা পড়ে আছে। মৌমিতা গুটিগুটি পায়ে টেলিফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

বাদলের হোস্টেলের একটা ল্যান্ডফোন নাম্বার আছে তার কাছে। তবে তা থেকেও তেমন লাভ হয়নি। ছেলেটা দিনের বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে, ঐ নাম্বারে কল করলে তাকে পাওয়া যায় না। তবু আজ একবার চেষ্টা করা দরকার।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এই সময় সাধারণত কারো বাইরে থাকার কথা না। কিন্তু বাদল তো বাদলই! সে যে হোস্টেলে আছে, এটাও নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না।

মেয়েটা লম্বা শ্বাস নেয় একবার, কব্জিতে ঝুলতে থাকা স্বর্ণের বালাটার দিকে তাকায়। তারপর আর কিছু না ভেবেই দ্রুত ডায়াল করে নাম্বারটা। কিছু সময়ের মাঝেই ওপাশ থেকে একটা ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “হ্যালো?”

মৌমিতা তাড়াহুড়ো করে বলে, “আসসালামু আলাইকুম।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কাকে চাই?”

“ঐ যে... বাদল আছে? তিনশো চার নম্বর রুম?”

“অপেক্ষা করুন।”

“আচ্ছা।”

মৌমিতা রিসিভার শক্ত করে ধরলো। টের পেলো, হৃদস্পন্দন অযথাই বেড়ে যাচ্ছে। বাদলের সাথে তো গতকালও কথা হয়েছে। তবু হৃদয়টা এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে কেন?
সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। মনে মনে প্রার্থনা করতে থাকে, ছেলেটার সাথে যেন কথা হয়ে যায়। আজ কথা বলতে ব্যর্থ হলে নিজেকে শান্ত করার মতো মনোবল নেই তার।

“হ্যালো?”

হঠাৎ ঐ পরিচিত কণ্ঠটা শুনতেই মৌমিতার নিঃশ্বাস আটকে গেলো গলার কাছে। ধাতস্থ হয়ে নিচুস্বরে বললো সে, “ভালো আছো?”

“আমি তো ভালোই থাকি।”

মেয়েটা বিরক্ত হয়ে গেলো। কালকের রাগটুকু বাদল নির্ঘাত এখনও ধরে রেখেছে। সে এমন ক্ষুব্ধ আচরণ দেখালে তো কোনো গুরুতর আলাপে যাওয়া সম্ভব হবে না। মৌমিতা অস্থির হয়ে বলে, “আচ্ছা, তুমি নাটোরে কবে আসবা?”

“কেন? আমার কি নাটোরে যাওয়ার কথা?”

“প্লিজ! উল্টাপাল্টা কথা বলবা না। আমি একটা জরুরি কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি।”

“বলেন।”

“তুমি আমাকে আর ‘আপনি’ বলে ডাকবা না।”

“এটাই আপনার জরুরি কথা?”

“ধুর! বললাম, ডাকবা না, মানে ডাকবা না।”

“বিয়ের আগে হচ্ছে না ম্যাডাম, একটু সবুর করুন!”

মৌমিতা দ্রুত চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। আম্মা-আব্বা দেখে ফেললে ঝামেলা হয়ে যাবে। তার মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে, সে টের পাচ্ছে। কিন্তু এই লালিমাটুকু লুকোনোর উদ্দেশ্যে আশেপাশে তাকাতে গিয়ে মনে পড়লো, কী একটা অনিশ্চিত সম্পর্কে আটকে রয়েছে দুটো মানুষ! তবে খুব চেষ্টা করেও গুরুত্বপূর্ণ কথাটা সে বলতে পারলো না। আবার অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে বসলো, “তুমি কি ওখানে গিয়েও রেলস্টেশনে ঘুরঘুর করো? কী লাভ হয় স্টেশনে গেলে?”

“আপনার কী মনে হয়?”

“স্টেশনে তো বিড়িখোর লোকেরা আড্ডা দেয়। তুমিও আবার নেশা করো নাকি?”

বাদল সহসা কোনো উত্তর দিলো না। হঠাৎ ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলো, “রাখছি।”

“আরে, আরে! এরকম করছো কেন?”

“আজগুবি প্রশ্ন কেন করছেন?”

“এখনও রাগ করে আছো?”

ছেলেটা জবাব দেয় না। মৌমিতা একটু অপেক্ষা করে আবার বলে ওঠে, “নাটোরে আসতে পারবা একবার? প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো আমাদের দেখা হয় না।”

“আমার সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হবে এই সপ্তাহে, কাল-পরশুর মধ্যেই। দেখা যাক তারপর—”

“একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারবা?”

“তা নাহয় আসলাম। আপনি কিন্তু এই মাসে একটাও চিঠি দেননি।”

“দেবো না আর! আগে তুমি একটা চিঠি পাঠাবা। ছোট হলে চলবে না। অনেক বড় হতে হবে। নাহলে আমি আর কখনোই চিঠি পাঠাবো না তোমাকে। দুইটা বছরে একটাও চিঠি পাঠাওনি!”

ওপাশ থেকে বেশ কিছুক্ষণ সময় কোনো আওয়াজ এলো না। তারপর বাদলের শান্ত স্বরটা শোনা গেলো, “আমি পরীক্ষা শেষ হলে নাটোরে যাবো।”

“ট্রেনে আসার চেষ্টা করবা। ইদানিং খুব বাস অ্যাক্সিডেন্ট হচ্ছে শুনলাম। আব্বাও বললেন।”

“আচ্ছা।”

“রাখি তাহলে?”

“আচ্ছা... শোনেন। দেখা করার সময় এবার শাড়ি পরে আসবেন? আমি কখনও আপনাকে শাড়িতে দেখিনি—”

“বিয়ের আগে হচ্ছে না জনাব, সবুর করুন!”

রিসিভারের অপর প্রান্ত হতে সামান্য হাসির আওয়াজ শোনা গেলো। মৌমিতার ঠোঁটের কোণও প্রশস্ত হলো একটু। ওপাশের মানুষটিকে কল্পনা করার চেষ্টা করলো সে। দুই বছরে কি ছেলেটা খুব বেশি বদলে গেছে? বড় হয়ে গেছে? হাসলে তার গালে নিশ্চয়ই টোল পড়ে এখনও? গলার স্বরটা তো বদলে গেছে অনেকখানি, বাচ্চা বাচ্চা ভাবটা নেই।

মেয়েটা ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, “বাদল?”

“হ্যাঁ?”

“আজকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিলো আমাকে...” মৌমিতা একটু বিরতি নেয়, ছেলেটার প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করে। সাড়া না পেয়ে আরও আঁটসাঁট হয়ে বলতে থাকে, “পাত্রের মা আমাকে একটা... সোনার বালা পরিয়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু কথা পাকাপাকি হয়নি।”

টেলিফোনের ওপাড়ে নীরবতা। মেয়েটা একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বলে, “বাদল, শুনছো?”

“পরিয়ে দিয়েছে মানে? উনি চাইলেন আর আপনি পরাতে দিলেন?”

“পরিস্থিতিই এমন ছিলো! আর বললাম তো, কথা পাকাপাকি হয়নি। কিছু হওয়ার আগে চলে আসো তুমি।”

“আচ্ছা। রাখি।”

ফোনটা কেটে গেলো। মৌমিতা রিসিভার নামিয়ে রাখতে পারলো না সঙ্গে সঙ্গেই। ভেতরটা কেমন যেন চিনচিন করছে তার। বাদল কি ভুল বুঝলো? আবার রাগ করলো? এতো অভিমানী ছেলের সাথে সংসার করাই তো মুশকিল হয়ে যাবে!
মাথা চাপড়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায় মেয়েটা। একটু বিশ্রাম দরকার।

—————

মার্জিয়া বসেছে জানালার পাশের আসনে। বাসের সামনের দিকে একটা আসনও ফাঁকা নেই। পেছনে বসলে ওর একটু অসুবিধাই হয়। তবে এটা ছাড়া কোনো উপায়ও দেখা গেলো না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে সে হেলান দিয়ে বসলো। 

“এখানে বসা যাবে?”

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে পাশে তাকায়। প্রশ্নকর্তাকে সে আগেও দেখেছে। তার ব্যাচমেট, তবে প্রকৌশল বিভাগে পড়ে। আগেরদিন মৃন্ময়ীকে যারা বিরক্ত করেছিলো, তাদেরই একজন। ছেলেটাও হয়তো মার্জিয়াকে চিনে ফেললো, হেসে বললো, “ওহ আচ্ছা, আমি ভাবলাম সিনিয়র। যাই হোক, বসলাম।”

সে সত্যি সত্যিই বসে পড়লো। মার্জিয়া চরম বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, “আশ্চর্য! আমি কি পারমিশন দিয়েছি?”

“পারমিশন দেওয়ার তুই কে? বাস কি তোর বাপের?”

হঠাৎ এমন আক্রমণাত্মক কথায় মেয়েটা চুপসে যায়। পরক্ষণেই কটমট করে আবার জানালার দিকে তাকায়। সে বুঝে ফেলেছে, ছেলেটাকে এখান থেকে তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে কোনো তর্কে জড়ালো না। চুপচাপ বসে রইলো।
বাস চলতে শুরু করলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। দু'জনের মাঝখানে ব্যাগ রাখা। সময়টা শান্তিতেই কাটছিলো। ছেলেটা হঠাৎ শান্তিভঙ্গ করে বলে উঠলো, “আচ্ছা, তুই কোন ডিপার্টমেন্টে?”

মার্জিয়া আড়চোখে একবার দেখলো তার দিকে, “ল’তে।”

“ওহ। বাড়ি কোথায়?”

“বাংলাদেশ।”

“বাংলাদেশের কোথায়?”

“এতোকিছু জেনে কী হবে?”

“কী হবে মানে? তোদেরকে বলেনি সবার সাথে পরিচিত হতে?”

“সবার সাথে পরিচিত হওয়া সম্ভব?”

“যতোজনের সাথে সম্ভব আরকি। বলা তো যায় না, কখন কার দরকার পড়ে।”

“এখন কী দরকার?”

ছেলেটা ভ্রু কুঁচকায়, “এখন দরকার না থাকলে কি কখনোই দরকার হবে না?”

মার্জিয়া অলসতা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসলো, নিরাপদ দূরত্বটা বজায় রেখেই ছেলেটার দিকে ঘুরলো, “কখন দরকার হতে পারে?”

“যেকোনো সময়, বিপদে আপদে। বা কোথাও কোনো ঝামেলায় পড়লে। বিশেষ করে বিয়ের সময়।”

“আমি ব্যাচমেট বিয়ে করবো না।”

“ওমা, আমাকে বিয়ে করতে বলেছি নাকি? বেশি বুঝলে এমনই হয়! আমি বলছিলাম যে পরিচয় থাকলে সুধিবা। দেখা গেলো, তোর যার সাথে বিয়ে ঠিক হলো, তুই তাকে চিনিস না। আমি চিনি। হতে পারে না? তখন তো আমাকেই দরকার—”

“আমি মার্জিয়া। বাসা নাটোর।”

“বাহ! অবশেষে বিয়ের কথা শুনে মুখে কথা ফুটলো।”

মার্জিয়া সরু চোখে ছেলেটার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কোনো মানুষ এতোটা বিরক্তিকর কীভাবে হতে পারে?

“যাই হোক। আমার নাম হাসিব। বাসা নীলফামারী।” ছেলেটা সামনে তাকায়, “তুই মনে হয়, বুঝতে পাচ্ছিস না, আমাকে কীভাবে অ্যাড্রেস করবি। তুই, তুমি না আপনি বলে, তাই না? চিন্তার কিছু নেই। একটা বললেই হয়।”

মার্জিয়া চোয়াল শক্ত করে দ্রুত জানালার দিকে ঘোরে। ছেলেটা বুঝলো কী করে! কীভাবে টের পেলো, সে সম্বোধন নিয়ে দ্বিধায় ছিলো? বোঝার কথা তো নয়। তার জানামতে, ছেলে মানুষেরা এতো বেশি বোঝে না। এই ছেলেটা বুঝলো কেন?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp