কামিনী - পর্ব ১০০ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে ভর করেছে অযাচিত নিস্তব্ধতা। এত এত মানুষ অথচ সাড়া নেই কারো এক বিন্দুও। তাদের প্রথমে মনে হলো কর্ণগোচর হওয়া বাক্যগুলো তারা ভুল শুনেছে। সমস্তটাই ভ্রম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, সকলে একত্রে এমন ভ্রমের কথা শ্রবণ করল? এ-ও সম্ভব?

 সেই নিস্তব্ধ জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে রাজমাতা প্রাচীর মুখে পৈচাশিক হাসির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি যেই বজ্রপাত ঘটনারো জন্য কথাটি বলেছিলেন সেটি ঘটে গিয়েছে। সকলের চোখের বিস্মিত ভাব তাকে ঠিক সেই আশ্বাসটুকু দিচ্ছে। 
 তিনি পুনরায় চিৎকার করে নিজের কথাটিকে সত্য প্রমাণ করতেই বললেন,
 “আমি যা বলেছি, ঠিক বলেছি। রানি কামিনীকাঞ্চন নর্তকী ও গণিকার কন্যা। উনি যেই সুরসুন্দরীর কথা উল্লেখ করলেন সেই নারীই উনার মাতাশ্রী। এবং এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রাজা উনার পিতা বলেই সকলে জানে। অথচ উনার মাতাকে কখনো উনার পিতা বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধই করেননি। তিনি একাধিক রাজ্যের পুরুষের সঙ্গে সেই সময়ে রাত্রিযাপন করে ছিলেন। তাই সে হিসেবে বললে রানির পিতৃ পরিচয় সংকটে। অথচ তিনি আপনাদেরকে সেই তথ্যটি দেননি। কেন দেননি? প্রজাদের তো সবকিছুতেই তিনি রাখেন তবে নিজের বিষয়গুলোতে কেন রাখেননি?”

  রাজমাতা প্রাচী হয়ত আরও কিছু বলতেন কিন্তু তার আগেই ক্রোধান্বিত হেমলক তাকে থামিয়ে দিলো। দ্রুতই দেহরক্ষীদের ঘোষণা দিলো উপস্থিত স্থান থেকে যেন রাজমাতাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। 

  প্রজাদের ভেতর এবার কানাঘুষো শুরু হলো। তাদের মতামত বিভক্ত করলো তাদেরকে তিনটি শ্রেণিতে। 
প্রথম শ্রেণীর ধারণায় মতামত হলো— রাজমাতা কুটিল নারী। শেষ পর্যন্ত তিনি রানিকে ছাড় না দেওয়ার জন্য আরও একটি মিথ্যাের আশ্রয় নিচ্ছেন। তিনি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নন। যেহেতু এত বছর যাবত তিনি রাজ্যের ভেতর থেকে, রাজপ্রাসাদে থেকে এতকিছু করে ফেলেছেন তাহলে তার কথাকে আর বিশ্বাস করা মোটেও উচিত নয়। তিনি যা কিছু বলতে ও করতে পারার ক্ষমতা রাখেন।

 এই যৌক্তিক শ্রেণির বিপরীতে দাঁড়াল একটি দাম্ভিক, সংকীর্ণতায় মোড়ানো শ্রেণি। যাদের কাছে ধর্ম, জাত পরিচয়, বংশ পরম্পরা সর্ব প্রথমে স্বীকৃতি পায়। তাদের সেই বংশ পরম্পরার সহা সংকটে তারা হতবিহ্বল হয়ে গেলো— রানির জন্ম পরিচয়ই এত সংকীর্ণতায়? রানির তবে পিতৃ পরিচয় নেই? এমন একজন মানুষ কি-না তাদের পরিচালন করছেন?

 সেই দাম্ভিক, স্বল্প জ্ঞান ধারণ করা জাত অন্ধ শ্রেণির বিপরীতে দাঁড়ালো আরও একটি শ্রেণি। ওদের ভাষ্যমতে, জন্ম ও মৃত্যু কি কোনো মানুষের হাতে থাকে? কোনো মানুষ কি বেছে নেন নিজের জন্ম, মৃত্যু? সেসব হলো স্রষ্টার নিকট। তাই রানির জন্ম পরিচয় রানির ত্রুটি হতে পারে না অন্তত। 

 এই তিন শ্রেণির একেক মত ও মতের পার্থক্য এমন এক কোলাহল, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল যেখানে একটু আগে করা রানি কামিনীকাঞ্চনের সমস্ত বিচার যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো। তার মূলত কোন কারণে এখানে উপস্থিত হয়েছে সে সমস্তই প্রায় ভুলতে বসলো। 
 মন্ত্রীদের ভেতরেও যে চাপা চোখাচোখি চলছে তা বুঝতে বাকি রইল না কারোই। 

 হেমলক খুব সুক্ষ্ণ ভাবে রানির দিকে তাকালো। রানির স্থির মুখ, চোখ আগের ন্যায়ই আছে। তিনি কি এই সমস্ত কথাতে দুঃখ পাচ্ছেন, না যন্ত্রণা ঠিক বুঝে উঠা দায়। রাজ্যবাসীর গুঞ্জনতো হেমলকেরই কানে এসে বড়ো বাজে ভাবে লাগছে। তাহলে রানির না জানি কেমন অনুভব হচ্ছে! 

  রাজকন্যা লিলি নিজের মাতাশ্রীর এমন ঘটনার পর প্রাতঃকাল হতেই এত ভেঙে গিয়েছিলো! কিন্তু এই মুহূর্তে এসে রানির সম্বন্ধে মাতার বলা কথাটি তার নিজেরও যেন বিশ্বাস হলো না। মাতার সম্বন্ধে সে যা শুনেছে কিংবা মাতা এ অব্দি যা করেছে তার পর মাতার মুখের কথা বিশ্বাসযোগ্য হওয়ায় মতো নয়ই!
রাজ বৈদ্য লিলির অস্থির মুখমুণ্ডলের দিকে তাকিয়ে আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, 
 “আপনার কি মাতার জন্য রানির উপর ক্রোধ উৎপন্ন হচ্ছে?”

 লিলির তীব্র ভাবনার বাঁধন ছিন্ন হয়। রাজবৈদ্যর কথাটিতে নেহাৎই হাসি পায় তার। রাজবৈদ্য তাকে এতটাই জটিল ও খারাপ চিন্তার মানুষই ভাবে বোধহয়! নয়ত সবসময় সে মনে করবে কেন, লিলি রানির কিছুই পছন্দ করে না? 

 “মাতাশ্রী যা করেছেন তার জন্য তিনি স্বয়ং দায়ী এবং অপরাধের শাস্তি রানি এমনই দেন। এবং বলা যায় দেওয়া বোধহয় উচিত। আপনার প্রশ্নটিই বরং ভুল হয়েছে। আপনার বলা উচিত ছিল, আমার মাতার জন্য করুণা হচ্ছে কি-না। রানির উপর ক্ষোভ, রাগ, ক্রোধ জেগেছে কি-না সেই প্রশ্নটাতো সামঞ্জস্য নয়!”

  রাজবৈদ্য লিলির উন্মনা উত্তরে একটু দমে গেলো। সে ভেবেছিল রাজকন্যা যেমনটি! তার বোধহয় রানির উপর তীব্র রাগের সৃষ্টিই হবে। কিন্তু এ কী দেখছে সে?
“আপনি রাগেননি তবে?”

  “ক্রোধান্ধ এখন আর হই না। আগে হতাম যখন সত্যিকার অর্থে জগত সম্পর্কে আমি অবগত ছিলাম না। কিন্তু এখন বুঝি সব স্থানে ক্রোধ মানায় না। রানি যে কাজটি করেছেন সেটি সঠিক। তবে হ্যাঁ, রানিকে সঠিক বলার অর্থ এই নয় আমি তাকে পছন্দ করি। আমি তাকে মোটেও পছন্দ করি না। বরং ভীষণ ভীষণ অপছন্দ করি ও ভবিষ্যতেও বোধহয় করব। কিন্তু আমার এটা ভেবে ভালো লাগে যে আমার অপছন্দের মানুষের এত যোগ্যতা যে চাইলেও তার ভাবনাকে আমি হীন ভাবতে পারি না।”
 লিলির প্রসন্ন কণ্ঠে রাজবৈদ্য সন্তুষ্ট হলো যেন। সে প্রথম যে রাজকন্যাকে দেখেছিলো এবং এখন যেই রাজকন্যা তাদের ভেতর যেন বিস্তর পার্থক্য, ব্যবধান।

  প্রজাদের গুঞ্জন চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পেতেই হেমলক পিয়ার্সের কণ্ঠ ভেসে এলো। একই সঙ্গে রুষ্ট ও হতাশ কণ্ঠে বলল,
“প্রিয় রাজ্যবাসী, আপনারা থামুন এখন! আপনাদের এই গুঞ্জন দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি। এই সমাগমতো রানির পরিচয় নিয়ে আলোচনার জন্য ডাকা হয়নি! হয়েছিলো একটি অন্যায়কে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে এবং সেই অন্যায়ের শাস্তি ধার্য করতে। অথচ আপনারা কিনা রানি জন্মপরিচয় নিয়ে আলোচনা করতে বসে পড়লেন? এমন একজন রানির যিনি আপনাদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন সবার আগে! বিষয়টি বড়োই হতাশার নয়?”

 হেমলকের যে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে তা তার বাচনভঙ্গিতেই স্পষ্ট। কিন্তু প্রজাদের দাম্ভিক একাংশ শুনতে নারাজ। অবলীলায় ভুলে বসেছে সব। সেই একাংশের থেকে কেউ কেউ বলে বসল,
 “রানির ধর্মই প্রজাদের প্রতি কর্তব্য করা। কিন্তু তাই বলে আমরা দেখব না রাজাসনে প্রকৃতপক্ষে কে বিরাজমান? তার জাত, কূল, ধর্ম কী? রাজাসন যে সামান্য বিষয় নয়!”

 হেমলকের সে যুক্তি খণ্ডন করার প্রয়োজন হলো না। প্রজাদের ভেতরেরই আরেকটি অংশ প্রতিবাদ করে উঠল তীব্র,
 “রাজাসনে বসতে যোগ্যতা লাগে। রানি কামিনীকাঞ্চন যে যোগ্য তা তো আমরা সকলেই বুঝেছি এতদিনে! তাহলে এসব কথা বাড়াচ্ছেন কেন? কারো ব্যক্তিগত জীবনে আমরা আমাদের মন্তব্য দিতে পারি না!”

 মুহূর্তে আবারও বিস্তর তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হলো। মন্ত্রীরা চাইল, হেমলক চাইল কিন্তু কেউই তা থামাতে পারল না। 
 হ্যাব্রো এবার এসে রানির পাশাপাশি একটু নিচে দাঁড়িয়েছে। কিচ্ছুটি বলেনি সে। টু শব্দও না। রানির মতোই একভাবে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতর ভেতর যদিও তার খুবই চিত্ত চঞ্চল হলো। আর কেউ না জানলেও সে তো জানে রানি নিজের জন্মপরিচয় পাওয়ার পর কেমন করে ভেঙে পড়েছিলেন! সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হতে নিজের ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা সরিয়ে নিয়েছিলেন। আজ সেই ঘটনার আবারও পুনরাবৃত্তি না আবার হয়! রানির মন আবারও আঘাত না প্রায় এত তীব্র!

 হেমলক পুনরায় কিছু বলতে উদ্যোত হতেই রানি থামিয়ে দিলেন। তার চোখ, দৃষ্টি স্পষ্ট। কোনো সংকোচ, দ্বন্দ্ব, লজ্জা নেই। তিনি খুব শীতল চোখে প্রজাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, স্বচ্ছ কণ্ঠে বললেন,
 “আপনাদের বিস্তর আলোচনা স্থগিত করুন। এই মুহূর্তে আমার কথা শুনুন। আমি বলব এখন। সকলের বলার সময় সমাপ্ত।”
রানির ঝরঝরে কণ্ঠ ছন্দ তুলতেই এক লহমায় সত্যি সত্যি শান্ত হয়ে গেলো সেই জনস্রোত। যেটা এতক্ষণ এত মন্ত্রীবর্গ মিলেও করতে পারেনি। সকলের উৎসুক দৃষ্টি রানির দিকে। রানির দিকটি শুনতে তাদের যেন সে কী আগ্রহ!

  রানি উৎসুক দৃষ্টিগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে তার ঠোঁটের সেই জৌলুশ হাসিটি পুনরায় ফিরিয়ে আনলেন। রক্তহিম কণ্ঠ ছুঁড়লেন জনসমাগমের মাঝে,
 “এই পৃথিবীতে কোনো ব্যক্তির জন্মের উপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ঠিক একই রকম ভাবে নিয়ন্ত্রণ ছিলো না আমারও। আপনাদের রাজমাতা প্রাচী সঠিক। আমার মা একজন নর্তকী ও গণিকা ছিলেন। রাজা কেশবচন্দ্র, যাকে আমার পিতা বলা হয় তার প্রেমেই আমার মাতা সমস্ত বিসর্জন দিয়েছেন। সেসব বিষয়ে আমার আগ্রহ নেই। আমি জানতেও চাই না, আর না জানাতে। আমি যখন আপনাদের রাজাসনে বসে ছিলাম আপনারা জানতেন না আমি কে। আমাকে দেখেনওনি। কিন্তু ভরসা করেছিলেন। আর আমার জানামতে এ অব্দি আপনাদের ভরসা ক্ষুণ্ণ হতে আমি দিইনি। আমার জন্ম পরিচয় কী কিংবা আমি মানুষ হিসেবে কেমন সেসব বিতর্কে যাব না। তবে আমি রানি হিসেবে যে সর্বোচ্চ সঠিক ও দারুণ সেটির কোনো সন্দেহ নেই। আপনাদের বিচারের উপরও সেটি নির্ভর করে না। কারণ আমি জানি, আমি কী ও কে! আমার রাজ্য এ্যাজেলিয়াও আমাকে মান্য করেছে আমি যোগ্য বলে আর আপনারাও তাই। কিন্তু যেহেতু আপনাদের ভেতরে আমার জন্মই মুখ্য হয়ে উঠেছে তবে সেখানে আমার কিছুই মন্তব্য করার নেই। আমি কেবল একটি সিদ্ধান্ত জানাতে ইচ্ছুক।”
 লম্বা বচনের পর থামেন রানি। প্রজারা ততক্ষণে নীরব হয়ে গিয়েছে। আলোচনা থেমে গিয়েছে সেই কখন!

রানি নিস্তব্ধতা ভেদ করে জানালেন,
“আমি কোন রাজ্য শাসন করব তা একান্তই আমার সিদ্ধান্ত হয়ে এসেছে এ যাবতকালে। তবে যে রাজ্যই শাসন করি না কেন আমি শোষণ করি না। প্রজাদের মতামতকে আমি সর্বপ্রথম গ্রহণ করি। তাই আপনাদের এই পরিচয় নিয়ে সংকট কাটানোর জন্য আমি ঘোষণা দিচ্ছি যে, আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন, এই ক্যামিলাস রাজ্যের শাসনভার থেকে অবসর গ্রহণ করব। আপনাদের সকলকে সাক্ষী রেখে এই শাসনভার আমি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিলাম। আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন এমন কোথাও নিজের আসন পেতে বসি না যেখানে আমার চেয়েও মুখ্য হয়ে উঠে ভিন্ন কিছু। কারণ আমি মূল্যবান। আমাকে তারাই পাবে যারা প্রাপ্য। এবং আমি অনুভব করেছি ক্যামিলাস রাজ্যের প্রজারা রানি কামিনীকাঞ্চনকে পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের ব্যর্থতাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি বিদায় নিলাম। যুগ যুগ ধরে নারীরা নিজেদের প্রমাণের জন্য যে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে এসেছেন রানি কামিনীকাঞ্চন সেই পরীক্ষা দিবেন না। কারণ তার নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই। তার কথাই তার প্রমাণ, তার যোগ্যতাই তার প্রমাণ। আর, রাজাসনে রাজ্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র হেমলক পিয়ার্সের অভিষেক ঘটবে। আপনারা সকলে সুখী হোন। এবং জন্মের চেয়েও বৃহৎ করুন কর্মকে। কারণ জন্ম আপনার হাতে নেই কিন্তু কর্ম আছে। এই পৃথিবী থেকে আপনারা নিয়ে যেতে পারবেন কেবল এই কর্মকেই। তাই কর্ম মহৎ করুণ। ব্রাহ্মণের গৃহে জন্ম নিয়ে আচরণ চণ্ডালের মতো হলে সে যেমন আর ব্রাহ্মণের সম্মান পায় না তেমন চণ্ডালের গৃহে জন্ম নিলে তার আচরণ ও কর্ম ব্রাহ্মণের মতো হলে সে আর অশ্রদ্ধাও পায় না। কর্ম হোক আপনাদের কাছে সর্বোচ্চ। ক্যামিলাস রাজ্যের প্রজাদের বিবেকবোধের উন্নতি কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি। রানি কামিনীকাঞ্চন বিদায় জানালো। বিদায় আমার প্রজারা। বিদায়।”

 কথা শেষ করে রানি হনহনিয়ে প্রাসাদের ভেতরে চলে গেলেন। পেছন পেছন গেলো হ্যাব্রো। অথচ তখনও প্রজারা অত্যাধিক আশ্চর্যের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা ভাবতে পারেনি তাদের বাকবিতন্ডায় এত শীগ্রই রানি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবেন। তারা সত্যিকার অর্থে রানিকে হারিয়ে ফেলবেন, যোগ্য রানি ক্যামিলাসের উপর থেকে আশীর্বাদের হাতটি সরিয়ে নিবেন! 
  এবার প্রথম পক্ষ সেই ধর্মান্ধ শ্রেণির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। বাক-বিতন্ডা আবার চূড়ান্ত পর্যায়ের শুরু হলো। শুরু হলো শোরগোল, হা-হুতাশ। মন্ত্রী, রক্ষীরা সামলাতে হিমশিম খেলো সেসব।

রাজমাতা প্রাচীর পৈচাশিক হাসি দমে এলো। তিনি এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলেন তিনি জিতে গিয়েছেন। এই খেলায় জয় তার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রানি তার পরিকল্পনা সফল করে এমন ভাবে হারিয়ে দিবেন তিনি ভাবেননি। এমন করে রাজ্যে তুলকালাম বাঁধিয়ে সরে গিয়ে নিজেকে এত বেশি মূল্যবান করে ফেলবেন রাজমাতা ভুলক্রমেও ভাবেননি!

—————

 রানির হাঁটার ভঙ্গি দুর্ধর্ষ। হাঁটার তালে তালে তার কেশগুচ্ছ যেমন রাজকীয় ভঙ্গিতে উড়ে! মনে হয় যেন সিংহী। 
 তার হাঁটার তালে পা মেলালো হ্যাব্রো। বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনি রাজত্ব ত্যাগ করলেন সত্যি সত্যি?”

 “করলাম!”

“এই সংবাদটিতো এ্যাজেলিয়া রাজ্যেও পৌঁছাবে। সেখানের প্রজারাও যদি…”

 হ্যাব্রোর কথা সমাপ্ত হওয়ার আগেই রানি আকস্মিক থামলেন। হ্যাব্রোর দিকে তাকালের তড়িৎ গতিতে। এরপর ঠোঁটের হাসি বিস্তৃত করে বললেন,
 “তোমার কী মনে হয়, আমার প্রজারা আমি সম্পর্কে অবগত নয়? ওরা আমায় জানে, আমার জন্ম জানে, আমার জীবনও জানে। কিন্তু কখনো উচ্চারণ করতে শুনেছো তাদের এসব? এই প্রজারা তো হুট করে রাজ্যে আসেনি। যুগের পর যুগ তাদের বংশ পরম্পরায় তারা এ্যাজেলিয়াতে ছিলো। তারা কি অবগত নয় আমার অতীত? কখনো তাদের এসকল নিয়ে বলতে শুনেছো? এমনকি আমাকেও অব্দি কখনো তারা জানায়নি। কারণ তারা ভুলেই গিয়েছে আমার পিতা কে, মাতা কে। তারা কেবল স্মরণ রেখেছে আমাকে। প্রাধান্য দিয়েছে আমার কর্মকে। এ্যাজেলিয়ার আনাচে-কানাচেতে রানি কামিনীকাঞ্চনের নামের বাতাস বয় হ্যাব্রো, তারা জন্ম পরিচয় দিয়ে কর্ম পরিমাপ করে না। আমি করতে দিইনি কখনো। আমার সম্মতি ছাড়া আমার আশেপাশে কিছু ঘটে না, হ্যাব্রো। এই কথাটি ভুলে যেও না। বার বার তোমায় এক কথা আমি স্মরণ করাব না।”

শেষের বাক্যটি যেন বিশেষ ভাবেই হ্যাব্রোর কানে গিয়ে লাগল। সত্যিই তো! রানি না চাইলে তার আশেপাশে কিচ্ছুটি ঘটা সম্ভব নয়। তবে রাজমাতার এমন বড়ো কেলেঙ্কারি করার প্রয়াস কেমন করে হলো! রানি চাইলেই রাজমাতাকে প্রকাশ্যে না এনে সমস্তটা জানাতে পারতেন। কিন্তু রানি তা করেননি। তিনি ইচ্ছেকৃত রাজমাতাকে সকলের সামনে উপস্থিত করিয়েছেন। কেন? যেন এই কথাটি সকলের কাছে পৌঁছায়? এবং রানি ক্যামিলাস রাজ্য হতে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন? 
 হ্যাব্রোর মাথায় যেন সকল ভাবনা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। তার শিড়দাঁড়া বেয়ে শীতল কিছু একটা বয়ে গেলো যেন!
সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলল,
  “অর্থাৎ আপনিই চেয়েছিলেন রাজমাতা এই তথ্যটি প্রকাশ্যে আনুক। আর সেই কারণকে হেতু করে আপনি রাজত্ব ত্যাগ করবেন! আপনিই চেয়েছিলেন! হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনিই…”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp