পবনপত্র - পর্ব ৩৫ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          আজ সকাল থেকে মারুফের শরীরটা বেশ ভালো। উচ্চারণে সমস্যা থাকলেও টুকটাক কথা বলছেন। এমনকি হাসাহাসিও করছেন। এদিকে রাবেয়াই বরং একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এতো দৌড়ঝাঁপ, তবু ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে না। মমতাজ খন্দকার তার চেহারার দিকে তাকিয়ে উদ্বেগ দেখালেন, “তুমি তো নিজেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছো! এক কাজ করো, দুপুরে আমাদের বাড়িতে চলো। গোসল করে খেয়ে-দেয়ে আসো। মৌ, তুমিও চলো।”

রাবেয়া ক্লান্তভাবে মাথা নাড়লেন, “আমরা গেলে ওনাকে দেখবে কে?”

মৌমিতা মায়ের পাশে এসে বসলো, “আপনি যান আম্মা। আমি থাকি। সমস্যা নেই।”

মমতাজ মাথা নাড়লেন, “আচ্ছা, মৌ থাকুক। ওষুধের ব্যাপারটা যেহেতু ও-ই দেখছে, ও থাকলে ভালো হয়। আর রতনও থাকলো নাহয়।”

রাবেয়া আপত্তি জানালেন, “না না, মৌয়ের একা একা থাকার কোনো দরকার নেই।”

“একা কোথায়? রতন তো আছেই।”

“মৌ গেলে আমিও যাবো। নাহলে যাবো না।”

মৌমিতা মারুফ সাহেবের দিকে তাকালো। তিনিও কোনো কারণে মেয়ের দিকে চেয়ে রয়েছেন। তার দৃষ্টিতে শিশুসুলভ কৌতূহল, চোখদুটো গোল গোল দেখাচ্ছে। দেখেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। মায়ের দিকে ফিরলো মৌমিতা, “একজনকে তো থাকতেই হবে আম্মা। পরে যদি আপনিও অসুস্থ হয়ে যান? আমি থাকতে পারবো, কোনো অসুবিধা হবে না।”

মমতাজ বললেন, “শোনো, ওষুধের দায়িত্ব নার্সকে দাও। দিয়ে দুইজনই চলো।”

রাবেয়া বিড়বিড় করলেন, “সবার তো চলে যাওয়া যাবে না।”

পাশে বসে থাকা মেয়েটা বুঝলো, কোনো যুক্তিতেই তার আম্মাকে এখান থেকে সরানো সম্ভব হবে না। তিনি মারুফকে ফেলে কোথাও যাবেন না। একই জেদ মৌমিতারও। আব্বাকে এই অবস্থায় কিছুতেই একা ফেলে যাবে না সে। মমতাজ অনেক চেষ্টা করলেন বোঝানোর, লাভ হলো না। মা-মেয়ে উভয়েই নাছোড়বান্দা।

—————

তখন ভরদুপুর।
মমতাজকে নিয়ে পাশের একটা হোটেলে ঢুকলো মৌমিতা। খাবার কিনে নিয়ে যেতে হবে। মমতাজের বাড়িতেও রান্নাবান্না হয়নি। রিতা শহরের বাইরে চলে গেছে, সে নাকি বিদেশে যাওয়ার জন্য পরীক্ষা দিচ্ছে এখন।
ফুপুকে নিয়ে মৌমিতা একটা ফাঁকা টেবিলে গিয়ে বসলো, ওয়েটারকে বললো খাবার দিতে। তারপর মমতাজকে উদ্দেশ্য করে বললো, “আম্মার খাবারটা পার্সেলে নেবো ফুপু। আমরা এখান থেকেই খেয়ে যাই।”

“আচ্ছা। রতনটা যে কোথায় গেলো। খাওয়া-দাওয়া নেই, ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়ায়।”

“হসপিটালেই আছে বোধহয়।”

“কী জানি?” মমতাজ চেয়ারে হেলান দিলেন, “দেখো, হোটেলে মেয়ে মানুষ কতো কম, তাই না? আমি তোমাকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি মৌ। এতোকিছু পারো এখন। কে বলবে, এটাই ঐ পিচ্চি মেয়েটা, কাউকে দেখলেই যে লুকিয়ে পড়তো?”

মৌমিতা টেবিলের ধারটা নখ দিয়ে খুঁটছিলো, ফুপুর কথায় একটু জোর করে হাসলো সে।

“এই বাচ্চাগুলো চোখের পলকে বড় হয়ে গেলো। ছোটবেলায় কতো কাহিনী করতে তোমরা! কিছু কিছু জিনিস এখনও মনে পড়ে।
তোমার বয়স তখন খুব কম। স্কুলে ভর্তি হয়েছো। বৃষ্টি হলেই রাস্তায় খুব কাদা জমতো তখন। এখনকার মতো পাকা রাস্তা হয়নি তো। যেদিক দিয়ে তুমি স্কুলে যেতে, ওদিকের রাস্তা কাঁচা ছিলো। আর যেদিনই বৃষ্টি হতো, মারুফ তোমাকে কাঁধে করে স্কুলে নিয়ে যেতো। মেয়ের জুতো যেন নোংরা না হয়!”

মৌমিতা চোখের পাতা ফেললো ঘনঘন, তার মাথা আপনাআপনিই আরও নিচু হয়ে আসে। ফুপুর আলাপে অংশগ্রহণ করার বিশেষ আগ্রহ দেখালো না সে।

“কী সুন্দর দিন ছিলো! এতো চিন্তা ছিলো না, রোগবালাই ছিলো না। তবু, মারুফটা অযথাই চিন্তা করতো। সবকিছুতেই ওর টেনশন।” মমতাজ ঝুঁকে বসলেন, “তুমি যখন পেটে, রাবেয়া অনেক অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলো। কিছু খেতে পারতো না, রাতে ঘুমাতে পারতো না। খুব কষ্ট পাচ্ছিলো। মারুফও তখন ঘুমাতো না। দেখতাম, দুইজনেরই চোখের নিচে কালি পড়েছে। তোমার দাদি খুব বকা দিতেন। বলতেন—নিজে পাগল, বউটাকেও পাগল বানিয়েছে, দুইজনকেই পান্ডার মতো দেখা যায়! চোখের চারপাশ কালো, সেজন্য বলতো পান্ডা। তোমার দাদি কখনও পান্ডা দেখেননি নিজ চোখে। কিন্তু বাড়িতে একটা পুতুল ছিলো, তোমার ফুপা এনেছিলো রিতার জন্য। পান্ডার পুতুল। ওটা দেখার পর থেকেই আম্মা বলতেন, মারুফ পান্ডা, ওর বউ পান্ডা!”

মমতাজ হেসে উঠলেন, নাদুস নুদুস শরীরটা দুলে উঠলো। মৌমিতাও সামান্য হাসলো। সে যে কখন মুখ তুলে ফুপুর দিকে তাকিয়েছে, মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনতে শুরু করেছে, নিজেও টের পায়নি।
ফুপুর সাথে আব্বার চেহারায় মিল আছে। হয়তো সেজন্যই, তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মেয়েটার সমস্ত অবসাদ ধুয়ে যাচ্ছে। সে ভাবছে, আয়নায় নিজের দিকে চেয়ে থাকলেও কি মন ভালো হবে? সে তো নিজেও মারুফের মতো দেখতে। সবাই বলে, আব্বার ‘কার্বন-কপি’।

“আমরা এগুলো নিয়ে হাসাহাসি করতাম খুব। রিতা হওয়ার পর আমি আড়াই বছর ছিলাম তোমাদের বাড়িতে। তোমার ফুপা ঢাকায়। মারুফ কতোকিছু যে করতো রিতা আর রতনের জন্য। ছোট বাচ্চা ওর খুব পছন্দ। রতনকে তো একদিন সাইকেলে উঠিয়ে পুরো নাটোর ঘুরিয়ে এনেছিলো। ঐদিন আমি যে কী চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিলো, তবু আসে না। আসার পর তোমার আব্বাকে ভালোমতো বকা দিয়েছি!”

মৌমিতা হাসলো। মমতাজ খন্দকারও হেসে উঠলেন, “রাবেয়ার যেদিন ডেলিভারি হবে, ঐ রাতের কথা আমার এখনও ভালোভাবে মনে আছে।
তখন সেপ্টেম্বর মাস। তোমার মা অনেক অসুস্থ। আমরা সবাই তো ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে ছিলাম। মারুফ মাঝরাতে মসজিদে গেছে, আর আসে না। রাবেয়ার অবস্থা খারাপ। বারবার জিজ্ঞেস করে, উনি কোথায়, উনি কোথায়? আমারও বয়স তখন কম। ওর অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলেছি। আমিও কাঁদি, রাবেয়াও কাঁদে। আম্মা দোয়া পড়ছিলেন। পুরো হাসপাতাল শান্ত।

তুমি হয়েছো একেবারে ভোরের দিকে, যখন সূর্য কেবল উঠছে। তোমার মুখ দেখতে মোমবাতি, হারিকেন, কিছুই লাগেনি। জানালার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আম্মা, দিনের প্রথম আলোতে তোমাকে দেখেছি। তারপর মারুফ আসলো। ওর মুখ দেখেই বুঝলাম, নামাজে খুব কান্নাকাটি করেছে। চোখ-মুখ ফুলে একাকার। তারপর তোমাকে ওর কোলে দিলাম।
ইশ! মনে হচ্ছিলো, কতো বছর পর ওকে আমি হাসতে দেখেছিলাম ঐদিন। তোমাকে কোলে নিয়ে বললো, আপা দেখেন, আমার মতো হয়েছে না?”

মৌমিতা একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করলো। এই অসময়ে কান্নাকাটি করার কোনো ইচ্ছে নেই তার। অশ্রু আটকাতে গিয়ে গলার রগ ফুলে উঠেছে। হাতদুটো টেবিলের উপর মুষ্টিবদ্ধ করে মেয়েটা চুপচাপ বসে রইলো।

“জানো? ঐ সময় বাচ্চা ডেলিভারির জন্য কেউ হাসপাতালে যেতো না। রাবেয়ার অবস্থা এতোই খারাপ ছিলো, আমরা ভাবছিলাম, বাঁচবেই কিনা। মারুফ জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। ভাগ্যিস নিয়ে গিয়েছিলো! নাহলে বিপদ হতো।
একটা হারিকেন জ্বালিয়ে গরুর গাড়িতে করে আমরা হাসপাতাল গিয়েছিলাম। সন্ধ্যা বেলায়। রাস্তায় কোনো মানুষ নেই। পুরো এলাকা তখন গ্রাম ছিলো, এতো ঘরবাড়ি ছিলো না। রাস্তার দুইপাশে বাঁশঝাড়। আর গাড়ির ভেতরে আমাদের সাথে রাবেয়া, ওর পেটে বাচ্চা। গ্রামের মানুষেরা অনেক রীতিনীতি মানতো, অনেক কুসংস্কারে বিশ্বাস করতো। কিন্তু ঐ সময় আর কিছুই ভাবার মতো অবস্থা ছিলো না। আমরা ভয় পেলে তোমার মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হতো। সেই রাতের কথা ভাবলে এখনও গা ছমছম করে।”

ওয়েটার টেবিলের সামনে দাঁড়ালো, চটপট খাবার পরিবেশন করলো। মমতাজ তাকে ধমক দিলেন, “এতো সময় লাগে এতোটুকু খাবার দিতে!”

মৌমিতা বলে উঠলো, “শোনেন, আমার খাবারটাও পার্সেল করে দেন।”

ওয়েটার মাথা নেড়ে খাবারের পাত্র হাতে নিয়ে চলে যায়। মমতাজ হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করলেন, “খাবা না?”

“আম্মার সাথে খাবো ফুপু। আপনি খেয়ে নেন।”

মমতাজ আর দ্বিরুক্তি করলেন না। তাছাড়া খিদেও পেয়েছে।
আম্মার সাথে খাওয়াটা মৌমিতার মূল উদ্দেশ্য নয়। তারা দুই বোন যখন খেতে বসতো, মারুফ এসে তাকিয়ে থাকতেন, প্লেটে কিছু না কিছু তুলে দিতেন। মেয়েদুটো ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে, এতোটুকু নিশ্চিত করেই যেন ভীষণ তৃপ্ত হতেন তিনি। ঐ সময়ে অনেক বোকামি করেছে মৌমিতা, অভিমান করেছে অকারণেই। সেগুলোর প্রায়শ্চিত্ত করা হয়তো সম্ভব নয়। তবু মেয়েটা সব ঠিক করতে চায়। মারুফ খন্দকারের যোগ্য মেয়ে হতে চায় সে। যদিও সে সন্তান হিসেবে নিজের যোগ্যতায় কালি মাখিয়েছে বহু আগেই।

মারুফ অল্প অল্প হাঁটতে পারেন। বাম পা নড়াচড়া করতে একটু অসুবিধা হয়। একজনকে ধরে থাকতে হয় ভালোভাবে হাঁটার জন্য। রতন আসার পর তার সাহায্য নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেছেন। তারপর আবার বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছেন। রতন তার মাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছে। আবার নাকি আসবে।
মারুফের কাছে এসে মৌমিতা বলে, “আব্বা? খেয়েছেন?”

মারুফ মাথা নাড়লেন, “হুম।”

রাবেয়াও মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন, স্নেহমাখা স্বরে স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন শরীরটা কেমন আছে, বলেন তো?”

“হুম।”

“ইশ! এটা জানতে চেয়েছি আমি?”

মারুফ হেসে মেয়ের দিকে তাকালেন, সে-ও হাসলো, কৃত্রিম ক্ষোভ দেখালো, “থাক তো আম্মা। বকা দিয়েন না।”

রাবেয়া আগ্রহ নিয়ে বললেন, “মার্জু ফোন করেছিলো। আপনার খোঁজ নিয়েছে। টিকিট পায়নি এখনও। পেলে রিপন ওকে নিয়ে আসবে। বুঝলেন?”

গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন মারুফ। মৌমিতা তার ডান হাতখানি নিজের দু'হাতের মাঝে নিলো। চামড়াটা কেমন যেন নরম হয়ে গেছে। মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিজের ডান হাত দিয়ে আব্বার তর্জনি চেপে ধরে অকারণে। এটা দেখে রাবেয়া মৃদু হেসে মারুফের দিকে তাকালেন, “আপনার মনে আছে? মৌ যখন ছোট ছিলো, আপনার দোকানে যাওয়ার সময় হলেই এভাবে আঙুল ধরতো। আর ছাড়তে চাইতো না।”

মারুফ বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কিছু একটা ভাবতে লাগলেন।

“ওষুধ দিতে হবে এখন। আমি এনে দিচ্ছি, পানি রেডি করে রাখো তো মৌ।” টেবিলের দিকে যাওয়ার সময় রাবেয়া আবার পূর্বের প্রসঙ্গ টানলেন, “কী জেদ ছিলো এই মেয়ের! আব্বাকে দোকানে যেতেই দিবে না।”

মৌমিতা এগিয়ে এলো সামনে, যেখানে এতোক্ষণ আম্মা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আঙুলটা ছাড়লো না। বাম হাতে মারুফের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো সে, “আব্বাকে মৌ কোথাও যেতে দেবে না।”

“মও মা।”

“জ্বী আব্বা?”

মারুফ ইশারায় মেয়েটাকে বসতে বললেন। মৌমিতা হেসে বলে, “বসছি। আপনার ওষুধটা দিয়েই বসছি।”

রাবেয়া ঘুমিয়ে পড়েছেন। রাতে ঠিকঠাক ঘুম হয়নি। মায়ের গায়ের উপর পাতলা কাঁথাটা বিছিয়ে মৌমিতা পাশে গিয়ে বসলো। মারুফ ঘুমাননি।
খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকার পর মৌমিতা দরজায় টোকা দেওয়ার আওয়াজটা শুনলো। মাথায় কাপড় দিয়ে সে দরজা খুলতে গেলো। সুজয় এসেছে। মারুফের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছিলো। সেটার রিপোর্ট নিয়ে নিজেই হাজির হয়েছে। মেয়েটা সরে দাঁড়াতেই সে রোগীর দিকে এগিয়ে গেলো। হাসিমুখে বললো, “আমাকে চিনতে পেরেছেন?”

মারুফ হেসে উপর নিচে মাথা নাড়লেন। তার চোখ গেলো পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। তিনি ডাকলেন, “মও মা।”

মৌমিতা এগিয়ে এলো, সুজয়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। আব্বার উদ্দেশ্য সে টের পেলো না। তবে সুজয় টের পেলো। একটু ইতস্তত করতে লাগলো সে।

“কী হয়েছে আব্বা?”

মারুফ কোনোপ্রকার ব্যাখ্যা দিতে গেলেন না। মানুষ দুটোকে একবার একবার করে দেখে বিগলিত হাসলেন। সুজয় মৌমিতার দিকে ঘুরে তাকায়, হাতের কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে বলে, “এই যে রিপোর্ট।”

সেগুলো হাতে নিতে গিয়ে মৌমিতা ভুলবশত তার আঙুল স্পর্শ করলো। সামান্য ব্যাপার। তবে এতোটুকুতেই মেয়েটার হৃদযন্ত্র ঝাঁপ দিয়ে উঠলো।
সুজয় মারুফের দিকে এক ঝলক দেখে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। মৌমিতা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ রিপোর্টের লেখাগুলোতে। কিন্তু মনোযোগ কোথায়—এটা সে নিজেও ঠাওর করতে পারলো না। মস্তিষ্কে বলপ্রয়োগ করলো। কিছু একটা নিয়ে তার চিন্তাভাবনা করা উচিত, যা সে এখন ভাবছে না। কী নিয়ে ভাবা উচিত? নিজের ভবিষ্যৎ? বাদল! বাদল কোথায়?
রিপোর্টটা টেবিলে রাখা ফাইলের ভেতরে ঢুকিয়ে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে।
কাউন্টারের লাল টেলিফোনে ক্ষিপ্রগতিতে একটা নাম্বার ডায়াল করলো মৌমিতা। বাদল মেসে আছে কিনা, এটা আরেকবার নিশ্চিত হওয়া দরকার।

“আসসালামু আলাইকুম।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। বাদল আছে?”

“বাদল? দেখি... ওনার তো চলে যাওয়ার কথা।”

“একটু দেখে জানান তো।”

“আচ্ছা।” লোকটা অন্যকারও সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে গেলো, তারপর ফোনে জানালো, “বাইরে গেছেন ম্যাডাম। চাবি রেখে গেছেন। ফিরবেন কিনা, বলতে পারছি না। উনি প্রায়ই বেরিয়ে যান।”

মুষ্টিবদ্ধ হাতে টেবিলের উপর একটা কিল দেয় মৌমিতা, ধন্যবাদ জানানোর মতো ছোটখাটো সৌজন্যতাও রক্ষা না করে ফোন কেটে দেয়। বাদল বেরিয়ে গেছে, কখন ফিরবে, লোকটা জানে না। কেন! কেন জানে না? বাদল এমন কেন? একে তো বয়সে ছোট। তার উপর এমন উদ্ভট স্বভাব। এক মুহূর্তের জন্য মৌমিতার মনে হলো, এই ছেলেটাকে ভালোবাসা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। মনের সাথে মেজাজটাও ভীষণ খারাপ হলো।
পায়চারি করতে করতে মেয়েটা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। ভেতরে যেন দম নিতে অসুবিধা হচ্ছে। বাদলও কি দম নিতে পারছে না? এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে? কে জানে!

—————

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। মারুফ শুয়ে শুয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। রাবেয়া ঘর জুড়ে পায়চারি করছেন। দরজাটা খোলা। ঐ খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলো রতন, “ভেতরে আসবো মামি?”

রাবেয়া মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ আসো।”

রতন পেছনে ঘুরে কারও উদ্দেশ্যে বললো, “আসেন।”

পেছনের মানুষটিকে দেখে রাবেয়ার চোখজোড়া ধীরে ধীরে বড় হয়ে গেলো। যার সাথে মৌমিতার বিয়ের কথা চলছে, এটা কি সেই ছেলেটাই? সুজয় সালাম দিলো। রাবেয়া সালামের জবাব দিয়ে বললেন, “তোমার সাথে আগেও দেখা হয়েছে মনে হয়।”

“জ্বী। আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম তো...” একটু আমতা আমতা করলো ছেলেটা, “আমি সুজয়। এখানে সবাই মাহফুজ নামে চেনে।”

“ওহ। তুমি এখানে...”

“পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছি। এফসিপিএস, নিউরোলজিতে।”

“আচ্ছা আচ্ছা।”

রতনকে একটু বিভ্রান্ত দেখালো। মুখে হাসি থাকলেও সে ভ্রু কুঁচকে বলে, “আগেও দেখা হয়েছে? পরিচয় আছে নাকি?”

রাবেয়া একটু সচেতন হয়ে বললেন, “ও হ্যাঁ, তোমাদেরকেও জানাতে চেয়েছিলাম, সময় সুযোগ হয়নি। সুজয়ের সাথে মৌয়ের বিয়ের কথা চলছে। কথা পাকা হয়নি এখনও... ওর মা মৌকে বালা পরিয়ে দিয়ে গেছেন।”

রতনের ভ্রুজোড়া কুঁচকানোই থেকে গেলো, শুধু হাসিটা থাকলো না। পাশে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার দিকে তাকালো সে। সুজয় বললো, “ডায়াবেটিস টেস্টের রিপোর্ট দিয়েছে। তাই ওনার ডায়েট চার্টে একটু চেঞ্জ আসবে। আর প্রেস্ক্রিপশনে কিছু ওষুধ বাদ যাবে, কয়েকটা নতুন যোগ হবে। ফাইলটা নিয়ে যাচ্ছি।”

রাবেয়া মাথা নাড়লেন, অনুমতি দিলেন। টেবিলের উপর থেকে ফাইলটা নিয়েই ছেলেটা তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলো। কেবিনটা বেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। রতন জিজ্ঞেস করলো, “মৌ কোথায়?”

“সেটা তো আমিও জানি না। দুপুরে একটু ঘুমিয়েছিলাম। উঠে দেখি মৌ নাই। এখন রাত হয়ে যাচ্ছে, তবু আসছে না।”

“কী বলেন!”

রতন দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো। তার দৃষ্টি অনুসরণ করতে গিয়ে রাবেয়ার চোখ পড়লো মারুফের দিকে। তিনি যে উপস্থিত আছেন, সেটা যেন কারো মনেই ছিলো না। লোকটার মুখ আতঙ্কে নীল হয়ে উঠেছে। তিনি বিছানা থেকে নেমে আসার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। রাবেয়া ছুটে গেলেন, দুই হাতে শক্ত করে ধরে বাধা দিলেন তাকে, “আরে আরে! অতো চিন্তার কিছু নেই। মৌ চলে আসবে এখনই।”

মারুফ ভয়ানক রেগে গেলেন। চরম আক্রোশ নিয়ে দু'-চারটে কথা বললেন, কিছুই বোঝা গেলো না। রতন অভয় দিলো, “মামা শান্ত হন। আমি দেখছি, মৌ কোথায় গেছে... দেখছি—”

ছেলেটাকেও ধমক দিয়ে চুপ করালেন মারুফ। রাগে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। রতন থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর একটু নিচুস্বরে বলে, “আমার ওপর বিশ্বাস রাখেন মামা। আমি ওকে খুঁজে আনছি।”

সে আর কোনোকিছুর জন্য অপেক্ষা করলো না। দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। রাবেয়া বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। এখন তিনি একা কীভাবে সামলাবেন এই মানুষটাকে? অবশ্য তাকে বেশিক্ষণ দুশ্চিন্তা করতে হলো না। দরজার দিকে তাকিয়ে মারুফ শান্ত হলেন। রাবেয়া ঘুরে দেখলেন, মৌমিতা এসেছে। সে বিস্মিত হয়ে ভেতরে ঢুকলো, “কী হয়েছে?”

“বুঝতে পারছো না কী হয়েছে!” রাবেয়া চাপা স্বরে বললেন, “তুমি জানো না, তোমার আব্বা অসুস্থ? সবাই কতোবার করে বলেছে, উনি যেন কোনোভাবেই টেনশন না করে...”

মেয়েটার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁসির আসামীর মতো নিশ্চুপ হয়ে রইলো সে।

“মও মা—”

মৌমিতা এগিয়ে আসে মারুফের কাছে, কাঁপা গলায় কৈফিয়ত দেয়, “আমি একটু বেরিয়েছিলাম আব্বা। চিন্তার কিছু নেই।”

মারুফ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। পাশ থেকে রাবেয়া অভিযোগ করলেন, “কী আর বলবো! তুমিও তোমার আব্বার মতোই হয়ে যাচ্ছো, না? কিছু না বলে কোথাও চলে গেলে কতো চিন্তা হয়, জানো তুমি?”

মেয়েটা তার আব্বার মুখের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলে, “জানি আমি। খুব ভালো করে জানি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp