পবনপত্র - পর্ব ২৯ - তাসনুভা আহম্মদ - ধারাবাহিক গল্প

পবনপত্র
          টেলিভিশনে দেশের খবর চলছে। মারুফ খন্দকার বেশ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন সেদিকে। সোফায় হেলান দিয়ে বসেছেন।
ওদিকে রাতের খাবারের প্রস্তুতি চলছে এখন। খাওয়ার ঘরে এসে দাঁড়ালো মৌমিতা, দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দটা শুনতে পারলো। দরজা খুলতেই একটা মেয়ে মিষ্টি স্বরে বলে উঠলো, “আসসালামু আলাইকুম।”

মৌমিতা বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলে, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”

মেয়েটার বয়স খুব বেশি মনে হলো না। বড়জোর মৌমিতার বয়সীই হবে। পরনে সুতি শাড়ি, তবে শাড়ি পরার ধরনটা সুন্দর। লম্বা ঘোমটা ভ্রু পর্যন্ত ঠেকেছে। চোখে যত্ন করে কাজল দেওয়া।
মেয়েটা আঁচলের নিচ থেকে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা একটা বাটি বের করলো। স্মিত হেসে বললো, “আপা, এটা আপনাদের জন্য।”

মৌমিতা সাত-পাঁচ ভাবলো না। হাত বাড়িয়ে পাত্রটা নিলো। মেয়েটা আবার মিষ্টি হাসে, “আমাদের বাড়িতে দাওয়াত থাকলো আপা।”

আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না সে। শান্তভাবে উল্টো ঘুরে উঠোন পেরিয়ে গেলো। মৌমিতা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো। তবে ঠাওর করতে পারলো না, মেয়েটা কোন বাড়িতে গিয়ে ঢুকেছে। আগে কখনও দেখা হয়েছে বলেও মনে পড়লো না।

রান্নাঘরে ঢুকে মৌমিতা ছোট টেবিলের উপর বাটিটা রাখলো, “আম্মা, একটা মেয়ে এসে এটা দিয়ে গেলো।”

রাবেয়া কেবল এক নজর দেখলেন। তারপর আবার কাজে মনোযোগ দিলেন, “ওহ।”

“মেয়েটা কে? আগে দেখেছি বলে তো মনে হলো না। কিন্তু আমার সাথে এমনভাবে কথা বললো যেন আমি ওনার পরিচিত। মাছের তরকারি দিয়েছে।”

“ও হ্যাঁ, তোমাকে তো বলা হয়নি। ওর নাম আসমা, জুনায়েদের বউ। বিয়ে হলো এক সপ্তাহ আগে।”

“কী!” মৌমিতা থতমত খায়, “জুনায়েদ ভাই... বিয়ে করেছে?”

“হ্যাঁ, হঠাৎ করেই শুনি বিয়ে হয়ে গেছে। ঘরোয়াভাবে হয়েছে তো, অতো আয়োজন করেনি। আমরাও দেরিতে জানলাম।”

মৌমিতার বিস্ময় কাটে না। সে কোনো কারণে পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়, “এভাবে, হঠাৎ করে... কেন?”

“মেয়েটাকে ওর মা-বাবা জোর করে বিয়ে দিতে যাচ্ছিলো, টাকার লোভে পড়ে। মেয়ের মত নেই। তাছাড়া ও নাকি আবার জুনায়েদকে পছন্দ করে। সে অনেক কাহিনী। জুনায়েদের কাছে শুনে নিও কখনো। ও ভালো বলতে পারবে।”

“থাক।” মৌমিতা কপাল কুঁচকালো, “মার্জুকে বলেছেন নাকি?”

রাবেয়া মাথা ঘুরিয়ে শীতল দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকালেন, “তোমার কী মনে হয়?”

মেয়েটা অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নেয়, মুখ শক্ত করে বলে, “না বলে থাকলে এখন থাক। একদিন তো জানতেই পারবে।”

রাবেয়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না, কাজে মন দিলেন।
হাড়ি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। মৌমিতা সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলো। মনে মনে অযথাই কিছু বক্তব্য সাজাতে লাগলো। ছোট বোনটার মনের কোথাও এখনও কি ঐ জুনায়েদ ভাইয়ের জন্য আগের মতোই জায়গা রয়েছে? খবরটা শুনলে কি খুব বেশি খারাপ লাগবে তার? সহ্য করতে পারবে?

জানালায় এখনও শিক লাগানো হয়নি। সেটার একটা কপাট খুলে দিলো মৌমিতা। ঘরের আলো নেভানো। জানালা খুলতেই ঠাণ্ডা কনকনে বাতাসের সঙ্গে চাঁদের আলো এসে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়লো ভেতরে।
পেছনের ফসলের খেত আর গাছপালা আবছা দেখা যাচ্ছে। জমির ঐদিকে জোনাকি উড়ে বেড়াচ্ছে। আকাশের তারাগুলোর সাথে হয়তো অসম প্রতিযোগিতা চলছে তাদের।
মৌমিতা বড় একটা শ্বাস টেনে নেয়। মাটির ঐ চেনা গন্ধটা অনেকদিন পর এসে ধাক্কা খেলো নাকে। হাওয়ার দাপট ক্রমেই বাড়ছে। আকাশের এক কোণে বিদ্যুৎ চমকালো, মাঠটাকে এক মুহূর্তের জন্য স্পষ্ট দেখা গেলো।

মেয়েটার মনে হলো, এদিকে প্রাচীর না তুললেই বোধহয় ভালো হয়। নাহলে দিন দুপুরে জানালা খুলে এই দৃশ্য আর দেখা যাবে না।
কামরাঙা গাছের পাতায় খসখস শব্দ হচ্ছে। বাতাসের সাথে এখন ধুলোও এসে ঢুকছে ঘরে। মৌমিতা কপাট লাগিয়ে দিলো।

—————

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ক্লাস শেষ হয়েছে টের পেতেই মার্জিয়া অস্থিরভাবে কাউকে খুঁজতে শুরু করলো। গরমে তার জামাকাপড় প্রায় ভিজে গেছে। ওড়নার কাপড়টা তুলনামূলক পাতলা হলে সুবিধা হতো। মুখ ঘেমে আছে, মাথার চারপাশে জড়িয়ে রাখা ওড়নাটা খুচখুচ করছে গলার কাছে। মেয়েটা চরম বিরক্ত হয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।
আশেপাশে সব প্রায় অপরিচিত মুখ। তাদের মাঝে হলদে সালোয়ার-কামিজ পরিহিত মেয়েটাকে দেখতেই মার্জিয়া তার হাত টেনে ধরলো, “মিনু? কতোক্ষণ ধরে খুঁজছি তোমাকে!”

মেয়েটার নাম মূলত মৃন্ময়ী, সে ‘মিনু’ বলেই নিজেকে পরিচয় দেয়। আসল নামটা শুনলে মানুষ ভেবে নেয়, সে হিন্দু। বিষয়টা একটু অস্বস্তিকর বটে। তাই সে এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। বন্ধু-বান্ধবেরা তাকে এই নামেই চেনে। মার্জিয়া তার এক বছরের সিনিয়র। এবং রুমমেট। দু'জনের বেশ ভাব হয়েছে অল্প দিনেই। অথচ মৃন্ময়ী পড়ে প্রথম বর্ষে, প্রকৌশল বিভাগে। আর মার্জিয়া খন্দকার আইনের ছাত্রী। 
ভিড় ঢেলে দূরে ছায়ায় গিয়ে দাঁড়ালো দু'জন। মার্জিয়া বলে উঠলো, “তুমি কি হোস্টেলে যাবা এখন?”

মৃন্ময়ী মাথা দোলায়, “না আপু।”

“তাহলে চাবিটা দাও তো। আমার চাবিটা ঘরেই আছে। টেবিলের উপর সুন্দর করে রেখে এসেছি।”

মেয়েটা কপালের ঘাম মুছে ব্যাগে ব্যস্তভাবে চাবি খুঁজতে শুরু করে। তার শুকিয়ে আসা মুখখানির দিকে তাকিয়ে মার্জিয়া ভ্রু কুঁচকায়, “মিনু? কিছু হয়েছে?”

“না আপু।” সে ব্যাগ থেকে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা বের করে, “এই যে চাবি।”

“পানি খাও ঠিকমতো। নাহলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবা। এখানে যে গরম!”

“জ্বী আপু।”

“আচ্ছা ক্লাসে যাও। পরে দেখা হচ্ছে।”

“আপু?”

“হ্যাঁ?”

মৃন্ময়ী শুষ্ক ঢোক গিললো। আমতা আমতা করে বললো, “আপু... আমার সাথে একটু ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট পর্যন্ত যাবেন?”

“কেন? তোমার কি শরীরটা খারাপ নাকি? মুখ দেখেও মনে—”

“না আপু। কয়েকজন সিনিয়র ভাই খুব জ্বালাতন করছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই। সকালে তাড়াহুড়োয় সালাম দিইনি। সেটার জন্য অনেক কথা শুনিয়েছে। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখলেই আবার ডাকবে। উল্টাপাল্টা কথা বলবে।”

মার্জিয়া তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকালো, “কতো ব্যাচের?”

“আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র। আপনাদের ব্যাচেই।”

“ওহ! তাহলে ভয় পাওয়ার কী আছে? চলো দেখি।”

সামনের ভবনটার দেয়াল ঘেঁষে কয়েকটা ছেলে আড্ডা দিচ্ছে। সংখ্যায় তেমন বেশি নয়, মোটে চার-পাঁচজন।
মার্জিয়ার মনটা হঠাৎ কেমন খচখচ করে উঠলো। এতো ঝুঁকি নেওয়ার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? এর চেয়ে পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়াটাই তো ঢের নিরাপদ, সময় যদিও বেশি লাগবে।
মেয়েটা তবু সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ছেলেগুলো তো সমবয়সীই, বড় হলে নাহয় ভয় করার একটা কারণ হতো। তাছাড়া জুনিয়র মেয়েটার সামনে সে ইতোমধ্যেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সেটাকে পরিবর্তন করতে তার একটু লজ্জাও বোধ হলো।

ছেলেগুলোর কাছাকাছি আসতেই মেয়ে দুটো হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। তবুও কোনো এক ব্যক্তির নজর যায় সেদিকে, “এই যে? এদিকে আয় তো। নামটা ভুলে গেছি তোর।”

মৃন্ময়ী হাঁটা থামালো, মার্জিয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে বলে তাকেও থামতে হলো। মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হলো মার্জিয়া। না থেমে হেঁটে যাওয়া উচিত ছিলো। আর যাই হোক, এমন ভিড়ের মধ্যে ছেলেগুলো আর কোনো বেয়াদবি করার সাহস পেতো না। তবে এখন?

মৃন্ময়ী আরেকবার ছোট্ট ঢোক গিলে ছেলেগুলোর দিকে ঘুরে তাকালো। তাদের মধ্যে একজন ভ্রু নাচিয়ে বললো, “এবারও তো সালাম দিলি না রে।”

মেয়েটা আমতা আমতা করে বলে, “আসসালামু আলাইকুম, ভাই।”

“থাক থাক। বলার পর দিয়ে লাভ কী? তোর সাথেরটা সালাম দেয় না কেন?”

মার্জিয়া বিরক্ত হয়ে বললো, “আমি নাইনটি সিক্স ব্যাচ।”

ছেলেটা থতমত খায়, তবে তা খুব বেশি না। পরক্ষণেই মাথা নাড়ে সে, “সেটা আগে বলবি না? আর ব্যাচমেটকে সালাম দিলে কি পাপ হবে? যাই হোক, জুনিয়রকে গার্ড দিচ্ছিস, দে। ম্যানার্সটাও শিখিয়ে দে একটু।”

“যাদের ম্যানার্স শেখা উচিত, তাদেরকে তো আর শেখাতে পারছি না।” মার্জিয়া মৃন্ময়ীর হাত ধরে মৃদু টান দেয়, “চলো।”

হোস্টেলে ফিরে মার্জিয়া টের পেলো, ঘাম শুকিয়ে যাচ্ছে শরীরেই। বিকেল হয়ে এসেছে। কাপড় জলদি বদলাতে হবে, নইলে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। কিন্তু ঐ সময়টুকুও পেলো না সে। জুলেখা একটা দুঃসংবাদ নিয়ে এলো ছুটতে ছুটতে, “মার্জু? আরেকটা ক্লাস আছে। নোটিশ দিয়েছে এক ঘণ্টা আগে। বের হ।”

মার্জিয়া বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকায়। তারপর ধপ করে বসে পড়ে চৌকিতে, “মেরে ফেলবে রে! সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলার পায়তারা করেছে।”

“আরে বের হ তাড়াতাড়ি! সবাই চলে গেছে এতোক্ষণে। দেরি হলেই স্যার কিন্তু অনেক অপমান করবে।”

“আমি যাবোই না!”

জুলেখা বিরক্ত হয়ে বললো, “আবার মিস দিলে গোল্লা পাবি পরীক্ষায়। থাক তাহলে। আমি গেলাম।”

“আরে আরে... একসাথে বের হই। দাঁড়া।”

হোস্টেলের দরজার কাছে দাঁড়াতেই টের পাওয়া গেলো, অস্বস্তিকর গরমটা নেই, রোদ তুলনামূলক কমেছে। মার্জিয়া তবু চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো, “দুপুরে কিছুই খেতে পারলাম না।”

“ব্যাগে একটু শুকনো খাবার রাখবি। এভাবে না খেয়ে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে যাবি। বাড়ি থেকে কেউ কিছু বলে না তোকে?”

“মাথা খারাপ! এসব কথা আমি বাড়িতে জানালে, আমাকে আর পড়তেই দিবে না এখানে। এমনিতেই আব্বার কোনো ইচ্ছা ছিলো না ঢাকায় পাঠানোর। আমি ঠিকমতো খাচ্ছি না—এই কথা শুনলে বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হবে।”

“আঙ্কেল তোকে খুব আদর করেন, তাই না?”

“তা তো করেনই। আপাকে বেশি আদর করেন!” মার্জিয়া হুট করে বেশ ভাবুক হয়ে গেলো, “আপা মনে হয় বাসায় গেছে। একবার যে টেলিফোন করে কথা বলবো, সেই উপায়ও নেই। সময়ই পাচ্ছি না ফালতু ক্লাসের জন্য।”

“বিকালের দিকে যাস। ঐ সময় অফিস প্রায় ফাঁকা থাকে।”

“ছেলেরা থাকে তখন। ও হ্যাঁ, ভালো কথা। মিনুর ডিপার্টমেন্টে র‍্যাগ দিচ্ছে। আমাদের ব্যাচের ছেলেগুলোই। এতো বেয়াদব একেকটা!”

জুলেখা হেসে ফেললো, “মোস্ট জুনিয়র থেকে কেবল সিনিয়র হয়েছে, একটু ভাব তো নিবেই। তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছেলেপেলেদের ঢং বেশি। নতুনগুলোও দেখিস কেমন আলগা ভাব নিয়ে চলে।”

“তা-ও ঠিক। আমি ভাবছি, আমাদের জুনিয়র যারা হবে, তাদের কতো বড় দুর্ভাগ্য!”

—————

ঘড়িতে এখন বিকেল ৫টা।
মৌমিতা অনেকটা জোর করেই রাবেয়াকে ঘরে পাঠিয়েছে। এই বয়সে তার এতো কাজ করা ঠিক না। কাজের লোক রাখা গেলে ভালো হতো। জোবেদা নাকি মাসে একবার করে নিজের মুখ দেখিয়ে যান, কাজকর্ম করেন না। তারও বয়স হয়েছে। নতুন কাউকে খুঁজতে হবে।

পুরো বাড়িটা একবার ঝাড়ু দিতে গিয়ে মৌমিতার শরীর ঘেমে একাকার। তাই আরেকবার গোসল করেছে সে। তারপর চা বানিয়েছে। বসার ঘরে মারুফ সাহেব একমনে পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছেন। সামনের টেবিলে চা-নাস্তা রেখে মৌমিতা পাশের সোফায় বসলো, “আপনি নাকি এখনও চিনি ছাড়া চা খান না? শরীরটার কী অবস্থা হয়ে গেছে, সেই চিন্তা আছে আদৌ?”

মারুফ খবরের কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন। চায়ের দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইলেন, “চিনি দাওনি?”

“না।”

তিনি অল্প হলেও হতাশ হলেন! তবু চায়ের পেয়ালা সযত্নে তুলে নিলেন হাতে, বিড়বিড় করে বললেন, “কী ভাবলে?”

“আপনি সকালে উঠেই খালি পেটে এক গ্লাস পানি খাবেন। আর খাবার খাওয়ার সময়ও কিন্তু তাড়াহুড়ো—”

“তোমার বিয়ের ব্যাপারে কী ভাবলে?”

মৌমিতা চুপ করলো। এই অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ কেন প্রতিবারই আনতে হবে? একবারও কি স্বাভাবিক কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া যায় না? সে তবু যথাসম্ভব শান্তভাবে বলে, “বিয়ে নিয়েও তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই আব্বা। কয়েকটা দিন আগেও তো আপনি চাইলেন, আমি যেন সব বাদ দিয়ে চাকরির কথা আগে ভাবি। বিয়েটা হঠাৎ এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো কেন?”

“বিয়ে তো গুরুত্বপূর্ণই, মা। আমার শরীরটা ভালো না। আমি একটা ব্যবস্থা করতে চাই, তুমি যেন ‘আব্বা’ বলে ডাকতে পারো কাউকে—”

অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়েটা হেসে ফেলে। তার হাসিতে খানিকটা কৌতুক মেশানো, “আব্বা বলে ডাকলেই তো কেউ আব্বা হয়ে যাবে না। আর আমি নাহয় ডাকলাম তবু। কিন্তু অন্য কোনো মানুষ কি আমাকে আপনার মতো করে ‘মৌ মা’ ডাকবে? ডাকলেও ডাকবে... বউ মা! কারও বউ মা হওয়ার আগে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।”

মারুফ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েটার দিকে ঘুরে তাকালেন না, তবে দৃঢ়স্বরে বললেন, “আমি ইয়ার্কি করছি না। যতোদিন নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কাউকে না কাউকে তো দরকার হবে। আমি যদি না থাকি—”

“এসব কথা আপনার মাথায় কেন আসবে?”

“আমার চিন্তা হয় মা।”

“চিন্তা করবেন না। আর আমাকে মা বলে ডাকবেন না। আমি আপনার মেয়ে। মা নই। আপনার যদি মনে হয়, ওভাবে ডেকে আপনি আমাকে বিয়েতে রাজি করাতে পারবেন, তাহলে আপনার ধারণা ভুল।”

মারুফ কোনো তর্কে গেলেন না। হাঁটুতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। মনে অস্বস্তি কাজ করছে। তিনি মেয়েটার সাথে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। আঙুল দিয়ে টেবিলে রাখা পত্রিকার দিকে ইশারা করলেন, “পেপার পড়ো। চাকরির সুবিধা হবে।”

“আপনি চাকরি করতে দিবেন আমাকে? যেভাবে বিয়ে বিয়ে করছেন!” আব্বাকে বিষণ্ন দেখে মৌমিতা একটু নরম স্বরে বললো, “চা কেমন হয়েছে?”

“ভালো লাগেনি, তবে ভালো হয়েছে।”

মারুফ ঘরে গেলেন। মৌমিতা সেদিকেই তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। আসলেই আব্বার শরীরটা ভালো না। বাকি সব চিন্তা বাদ দিয়ে এখন ভালো কোনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এটাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত সমাধান।

টেলিফোন বাজছে। মেয়েটা ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। সে চাইলো, টেলিফোন অবধি পৌঁছানোর আগেই ফোনটা কেটে যাক। তবে তেমন কিছু হলো না।
মৌমিতা রিসিভার তুলে কানের কাছে ধরলো, “হ্যালো? আসসালামু আলাইকুম।”

ওপাশ থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম। নাটোরে গেছেন তাহলে? যাওয়ার আগে একবার বলে যাবেন না যে আপনি বাড়ি যাচ্ছেন? কাল থেকে কতোবার আপনার হলের নাম্বারে ফোন দিয়েছি, জানেন?”

“বলতে পারিনি, একটু তাড়ায় ছিলাম। কিন্তু তুমি তো ঠিকই খুঁজে বের করেছো।”

“প্রতিবার আমিই খুঁজে বের করি আপনাকে। আপনার তো কোনো সিরিয়াসনেস নাই আমাকে নিয়ে!”

“ওহ, আচ্ছা! খুলনায় যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমাকে কয়টা চিঠি পাঠিয়েছো তুমি? একটু গুনে দেখো তো।”

বাদল মিনমিনে স্বরে বললো, “পাঠাইনি এখনও—”

“তাহলে? আমি প্রতি মাসেই তোমাকে চিঠি পাঠাই। আর তুমি এখন পর্যন্ত একটাও চিঠি পাঠাওনি। একেবারে একটাও না! এখন উল্টো আমাকেই এসে বলছো, আমি সিরিয়াস নই।”

“আরে... আপনি তো জানেনই, আমার হাতের লেখা ভালো না, গুছিয়ে লিখতেও পারি না আপনার মতো। ফোনই ঠিক আছে আমার জন্য। আপনি তো আবার আমার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দই করেন না।”

“বেশি জানো তুমি?”

“আমাকেও পছন্দ করেন না আপনি, আমি জানি।”

“তোমার নামটাও আমার পছন্দ না, বাদল।”

“ভালো!”

“কারণটা শোনো আগে। মানুষের চাল-চলন কিন্তু নামের উপরেও অনেকটা নির্ভর করে। এজন্য তুমি কোথাও স্থির থাকতে পারো না। সুযোগ পেলেই হারিয়ে যাও।”

বাদল একটু সময় নিয়ে বললো, “কী বোঝাতে চান আপনি? স্থির থাকতে পারি না মানে? আমি অন্য কোনো মেয়ের পেছনে ঘুরি, এটাই বলতে চান?”

“ঘুরতেই পারো! আমি তো আর চাইলেই খুলনায় যেতে পারছি না। জানতেও পারছি না, ওখানে কয়টা প্রেমিকা জুটিয়েছো তুমি।”

বাদল নিরুত্তর।

“হ্যালো?”

“এত্তো খারাপ মনে করেন আমাকে! ধ্যাৎ! আর কথাই বলবো না।”

“আরে—”

ফোন কেটে যাওয়ার শব্দ হতেই মৌমিতা হেসে ফেললো। ছেলেটার এই শিশুসুলভ রাগটুকু সে একপ্রকার উপভোগই করে। তবে এইবার একটা চিন্তা এলো মনে।
বাদল আসলেই আগের মতো সময় দেয় না, কিছুক্ষণ পরপর টেলিফোন করে না, চিঠি তো দেয়ই না। সে অন্য কাউকে পেয়ে যায়নি তো?

রিসিভারটা রেখে বাদল চুপচাপ কিছুক্ষণ বুথের ভেতরেই দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বেরিয়ে এলো ফুটপাতে। পানের দোকানটার একপাশে গিয়ে দাঁড়ালো সে। দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা লাইটারের সামনে সিগারেট ধরালো।
ব্যস্ত রাস্তা যানবাহনের হর্ন আর কোলাহলে মুখর। বাদল রাস্তা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিজের বাম হাতের দিকে তাকায়। ছয়টা বছর আগে, এই হাতেই সে প্রথম স্পর্শ করেছিলো তাকে। মেয়েটা সেদিন একটাই শর্ত দিয়েছিলো। আজ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই প্রসঙ্গ টেনে আনলো। হারিয়ে যাওয়া মানে কী? নাকি হারিয়ে ফেলার এতো ভয়!

১৯৯১ সাল।
বৃষ্টিভেজা নাটোর রেলস্টেশন।

“মৌমিতা?”

মেয়েটা তখন থেমে দাঁড়িয়েছিলো। বাদল কিছুতেই বুঝলো না, কী করবে।
সে অনুমতির তোয়াক্কা না করে হাত ধরেছে। সিনিয়র একটা মেয়েকে নাম ধরে ডেকেছে। আশেপাশে নাহয় দেখা যাচ্ছিলো না কাউকে। কিন্তু কেউ যদি দেখে ফেলতো? তারপর আর কিছু বাকি থাকতো কি?

ছেলেটা ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে আসে। মৌমিতা আগের মতোই স্থির দাঁড়িয়ে। তার মাথায় তখন ওড়না নেই। মুখটা দেখা যাচ্ছিলো না ঠিকই, কিন্তু আধখোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছিলো, বাদল সেদিকেই তাকিয়ে ছিলো একমনে।
কিছুক্ষণ আগে সে যা করেছে, তা কেবলই সীমালঙ্ঘন। মেয়েটার ব্যক্তিগত সীমানা ভেঙে সে চুরমার করে দিয়েছে। মৌমিতা ভুল বুঝলো? এমনিতেও সে ‘বেয়াদব’ বলেই জানে তাকে। এতোকিছুর পর তাকে নিয়ে মেয়েটার দৃষ্টিভঙ্গিটা যদি আরও কুৎসিত হয়ে যায়? এই অদ্ভুত কার্যকলাপের পেছনের কারণটা জানানো তখন আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়।
বাদল প্রায় চিৎকার করে বলে ওঠে, “আমি আপনাকে ভালোবাসি।”

মৌমিতা একচুলও নড়লো না। বাতাসে ঐ স্বীকারোক্তি প্রতিধ্বনিত হলো কয়েকবার। বাদলও দাঁড়িয়ে রইলো।
এবার যদি মেয়েটা চলে যায়, তার দিকে ফিরে না তাকায়, তবে সব শেষ। নিজের সবটুকু প্রাণশক্তি বাজি ধরে ফেলেছে বাদল। কিন্তু তা কি মৌমিতা খন্দকারকে আটকানোর জন্য যথেষ্ট?
ছেলেটা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। তার দৃষ্টি নিচের দিকে নামতে নামতে মেঝেতে গিয়ে ঠেকে।
অপরজনের অনুভূতি না জেনেই এই কথা বলে দেয়াটা বোকামি হলো কি? মৌমিতা তো আর জানে না, ছেলেটা তাকে কেবল খুঁজে পেতেই কতো কাঠ-খড় পুড়িয়েছে।
সে যদি এবার আরও দূরে সরে যায়? বাদল নিজেকে ভেঙে ফেলেছে, উন্মুক্ত করে দিয়েছে একেবারে; প্রত্যাখ্যাত হলে নিজেকে সামলে নেয়ার কোনো শক্তি সে অবশিষ্ট রাখেনি। মৌমিতা যদি তার না হয়? তবে? এটা তো ভাবা হয়নি!

মেয়েটা ঘুরে তাকালো। অভিব্যক্তি দেখে তার মনের খবর পাওয়া যায় না কখনোই, সেবারও তেমনটাই হলো। সে এগিয়ে এলো ধীরপায়ে। বেশ কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো।

দু'জনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। এই কিছুক্ষণের মধ্যে বাদল মনে মনে নানান পরিকল্পনা করলো। কিন্তু ভালো-মন্দ কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে পারলো না। কেবল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক।

মৌমিতার চোখের কাজলটা একটু ছড়িয়ে গিয়েছিলো। মাথায় ওড়না নেই, চুলগুলো উড়ছিলো এলোমেলো হয়ে। বাদল আগে কখনোই তাকে এভাবে দেখেনি। সে দিগ্বিদিক ভুলে হা করে তাকিয়েই থাকে।

“দুই মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে, মানলাম। কিন্তু কখনোই কাছে আসতে পারে না বাদল।”

ছেলেটা চমকে ওঠে, “ক... কী?”

“আমাকে একটা কথা দিতে পারবা?”

“কী কথা?”

মৌমিতা আগের মতো অনিশ্চয়তা নিয়েই ভাঙা স্বরে বলে, “তোমাকে মাঝে মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না। কেউই খুঁজে পায় না। ওভাবে কখনোই হারিয়ে যাবে না।”

বাদল কথাটা পুরোপুরি বুঝলো না, “আমি কবে হারিয়ে গেলাম?”

“তুমি... মাঝে মাঝেই নিখোঁজ হয়ে যাও। আমাকে শুধু এতোটুকু নিশ্চিত করো, হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে না কোথাও। আর যদি হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হয়, কাউকে না জানালেও অন্তত... আমাকে জানিয়ে দিও। আমি যেন খুঁজে পাই তোমাকে। এখন... এতোটুকু তো চাইতেই পারি?”

বাদল হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সে কিছুতেই বুঝতে পারলো না, মৌমিতা কী বোঝালো। হারিয়ে যাওয়া? মাঝে মধ্যে কাউকে না বলে কোথাও বেরিয়ে পড়াকেই কি হারিয়ে যাওয়া বলে?
বাদল সহজ হওয়ার চেষ্টা করলো, “আমি কখনও অতো দূরে যাই না তো। যদি মনে হয়, আপনি আমাকে খুঁজে পাচ্ছেন না, তাহলে এখানে আসবেন, রেলস্টেশনে। আমি কাউকে না জানিয়ে বের হলে... সচরাচর এখানেই আসি...”

মৌমিতা আর অপেক্ষা করেনি। দিশেহারা হয়ে পেছন ফিরেই চলে গিয়েছিলো সে। বাদল তাকে ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারেনি। কী বলেই বা ডাকতো? আপু? ম্যাডাম? মৌমিতা? তাদের সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নামকরণ তো সম্ভব হয়নি।
বাদলের মাথায় তখন হাজার চিন্তা। মৌমিতা যদি তাকে এড়িয়ে চলে এখন থেকে? যদি কথা না বলে আর? হ্যাঁ-না কিছুই তো বলেনি স্পষ্ট করে।
ছেলেটা বুঝতে পারলো না কিছুই। সে কেবল এতোটুকুই জানতো যে ঐ মেয়েটাকে তার দরকার, খুব দরকার।
মৌমিতা খন্দকার ততোক্ষণে দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছিলো। স্টেশনে রয়ে গিয়েছিলো শুধু বাদল; কিছু বিভ্রান্তি, অস্বস্তি আর আকুলতা নিয়ে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp