কামিনী - পর্ব ৮৯ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          ক্যামিলাস রাজ্যের রাজপ্রাসাদে যেই সুন্দর ও সুখী সংসারটি একসময় আনন্দ নিয়ে দিন কাটাতো সেই সংসারটিই উপোস করতে শুরু করল কেবল একটি নারীর কারণে। একটি নারীর আগমন এতটাই ঝড়ের মতো হলো যে পুরো সংসারটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হতে আরম্ভ করল চোখের সামনে। রানি তবুও চেষ্টা করতে চাইলেন। কিন্তু কতটুকুও বা চেষ্টা করবেন তিনি? যার সাথে সংসার বেঁধেছিলেন সেই পক্ষই যদি বাঁধন ছিঁড়ে উড়ে যায় একা কি আর সেই বাঁধন আটকে রাখা সম্ভব হয়? 

  থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজমান রাজা চর্যাপদের কক্ষে। দাঁড়িয়ে আছেন তিনি নত মস্তকেই। তার সামনে কেদারায় বসে দুলছেন মহারানি। চোখ দুটোতে তার শূন্যতা বাসা বেঁধেছে যত্ন করে। 

“তবে তা-ই ঠিক করলেন? আমার কথা রাখার চেষ্টাটুকুও করলেন না!”

 রানির প্রশ্নে রাজার নত মুখটি শুকিয়ে যায়। বিড়বিড় করে রাজা বললেন, 

“আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, রানি! তাকে প্রাসাদে এনে রাখব কিছু দিন।”

 “প্রতিশ্রুতি! তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মনে রইল আর আমার বেলা?” রানির কণ্ঠ মোলায়েম হয়ে আসে। 

রাজা আমতা-আমতা করেন,

“তুমিতো আমার রানি। তোমার স্থান কে নিবে? তাছাড়া সে কেবল অতিথি আমাদের।”

 “একজন বাইজি, গণিকা কি-না রাজা চর্যাপদের অতিথি! এমন দিনও দেখার ছিলো?”

রাজা দু’কদম এগিয়ে যান রানির দিকে। আলগোছেই রানির ডান হাতটা ধরেন। 

“তুমি মান করছো শুধু শুধু, রানি।”

 “আমি মান করব? আপনার সঙ্গে? সেই সম্পর্ক বোধহয় চুকেবুকে দিয়েছেন আপনি। আমি বড়োজোর আপনার প্রাণ নিতে পারি। অতটুকুই সম্পর্ক আমাদের রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, সেটিও করতে পারছি না।” তীব্র ঘৃণা ছুঁড়ে মারেন রানি। সাথে রাজার হাত থেকে ছাড়িয়ে নেন নিজের হাতটিও।

 রাজা আহত হন। রানি যে তার বড্ড রাগী সেসব তো তিনি জানেন। কিন্তু কী করার? সুরসুন্দরীর প্রতি তার যেই নিষিদ্ধ লোভ সেটাও যে দমন করতে পারছেন না। একদিকে সংসার তার রানি, আরেকদিকে নিষিদ্ধ স্বর্গ সেই সুরসুন্দরী। কাকে রেখে কাকে তিনি বেছে নিবেন বুঝেই উঠতে পারছেন না। 

 তাদের কথোপকথনের মাঝেই যাবর ছুটে এলো। বাহির থেকেই হাঁক ছেড়ে ডাকল,

“মহারাজ, উনি চলে এসেছেন। আসুন আপনারা।”

  রাজা চর্যাপদ সেই আসার সংবাদ শুনে তাকালেন রানির দিকে। রানি চোখ বন্ধ করে আছেন। কপালে দিয়ে রেখেছেন একটি হাত। মনে তার তীব্র আশা তখনও শেষবারের মতো জ্বলছিলো। তিনি ভেবেছেন হয়ত রাজা সংসার বেছে নিবেন নিষিদ্ধ স্বর্গ ছেড়ে। 

 কিন্তু রানিকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে রাজা বেরিয়ে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। নিষিদ্ধ সেই সুখকে তিনি বেছে নিলেন আপোষেই সংসারকে নির্বাসিত করে। 

রানি রাগ, অভিমান, ঘৃণায় ফেটে পড়লেন। ক্ষোভে জ্বলজ্বল করল তার অন্তর। সবকিছু মেনে নেওয়ার মতো মানুষ তিনি নন। তাই উঠে দাঁড়ালেন। তিনি একটিবার দেখতে চাইলেন সেই নারীকে যেই নারী এক নিমিষেই তার স্বামীর অন্তর থেকে সংসার, স্ত্রী কিংবা পুত্রকে মুছে দিয়েছেন। অন্য নারীর ঘর কীভাবে আরেকজন নারী ধ্বংস করে তা তার দেখার ইচ্ছে হলো। তিনিও অনেকটা সময় পর বের হলেন। নিজেকে যথা সম্ভব সামলে, সংযত করেই।

 —————

অতিথিশালাটার পাশে যেই বিশাল বাতায়নটি সেখানেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সুরসুন্দরী। হাতে তার রূপোলী পাত্র। কিছু একটা পান করছেন। মধ্যাহ্নের প্রথম কিরণটা সরাসরিই এসে লাগছে তার মুখে। 

তার সাথে এসেছে তাপসী। ও বসে আছে একটু দূরেই। সুন্দরীর সাথে আসা জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে রাখছে। তখনই বুক চওড়া করে, সশব্দে কক্ষে এলেন রানি। ক্যামিলাস রাজ্যের মহারানি। এসেই চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন প্রথমে তাপসীকে। সঙ্গে সঙ্গেই নাক উঁচু করে নিলেন তিনি। যেন কোনো নোংরা পতঙ্গ তার সামনে। তাপসী শ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়াল রানিকে দেখে। মাথা নামিয়ে কুর্নিশও জানাল। সেই শব্দেও ঘাড় ফিরালেন না সুরসুন্দরী। একই ভাবেই তাকিয়ে রইলেন বাহিরের দিকে। সেই সুক্ষ্ণ ঘটনাটিও খুব ভালোভাবেই খেয়াল করলেন রানি। তাকে দেখেও এই নারী কি-না ফিরে তাকালেন না? ক্ষোভে ভেতরটা ফেটে পড়ল তার। তবুও বাহিরে নিজেকে রাখলেন যথাসম্ভব স্থির। আগ বাড়িয়ে সুরসুন্দরীর পেছনে দাঁড়িয়ে নিজে থেকেই বললেন,

“রাজা চর্যাপদের অতিথিকে দেখতে এলাম। বিরক্ত করলাম না তো?”

 “আপনার প্রাসাদ আপনি যেকোনো সময়ই উপস্থিত হতে পারেন। এমন প্রশ্ন করে লজ্জা দিবেন না।”

 “লজ্জা আপনাকে আর দিবো কী? নিজেরই তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। রাজার অতিথি কিনা শেষমেশ একজন…” শেষ শব্দটি উচ্চারণ করলেন না রানি। তবে বাঁকা হেসে বুঝিয়ে দিলেন ঠিক। 

এবার সুরসুন্দরী তার সমস্ত ঐশ্বর্য নিয়েই ফিরলেন। দাঁড়ালেন একেবারেই রানির মুখোমুখি। ঠোঁটে তার অহং এর সেই হাসি ধরে রেখেই শুধালেন,

 “থামলেন যে? বাক্যটি সম্পূর্ণ করুন, রানি। নাকি লজ্জা পাচ্ছেন শব্দটি উচ্চারণ করতে। থাক, না-হয় আমিই উচ্চারণ করে দিচ্ছি। আমার তো আবার লজ্জা একটু কম। তা আপনার রাজার অতিথি একজন বাইজি ও গণিকা তা বলতে বড্ড লজ্জা করছে কি?”

 রানি হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলেন তার সামনে দাঁড়ানো নারীটির দিকে। কথার সে কী তেজ! রূপের সে কী বৈশিষ্ট্য! এ যেন পৃথিবীর বহির্ভূত কোনো দেবী, কোনো অপ্সরা! এত সুন্দর! এত সুন্দর রূপের নারীও হয় বুঝি! ঢোক গিললেন রানি। তিনি নিজে এত সুন্দর, লাবণ্যময়ী হয়েও এই নারীটির থেকে চোখ ফেরাতে পারলেন না। রাজার আর কি'বা দোষই দিবেন?

  “কী হলো চুপ করে গেলেন যে? নাকি আমার সাথে কথা বললেও পাপ?”

 রানি ঘোরগ্রস্তের মতো বললেন, “হু! হু?” এরপর নিজেকে সামলে নেন আলগোছে। মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলেন,

“পাপ কেন হবে? গঙ্গাতে আবর্জনা ফেললে যেমন গঙ্গা অশুদ্ধ হয় না তেমন আমার অন্তর ঠিক থাকলে আমার পাপ লাগারও কথা নয়।”

  “তা আবর্জনা কি আমায় বললেন? বেশ, বেশ। গঙ্গার মতোই তবে বহমান রবেন। শুভকামনা। আপনার সাথে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল। আপনার নিশ্চয় লাগেনি। স্বামীর ভাগ নিয়ে নিবো ভেবে নিশ্চয় ভীত আছেন।”

 

 সুরসুন্দরীর রাখঢাক বিহীন কথায় থতমত খান রানি। তবুও হেরে যাওয়ার পাত্রী যে তিনি নন। তাই কথার পৃষ্ঠে উত্তর দেন,

“এই বিস্তৃত পৃথিবীকে সাক্ষী রেখেই আমি এই রাজ্যের রানি হয়েছি। রাজার সমস্ত জীবনের ভার বহনের অর্ধাঙ্গিনী হয়েছি। আমাকে এই বিশ্ব চেনে রাজার পত্নী হিসেবে। সমস্তটাই দিনের আলোর মতোই স্বচ্ছ। আমার আর ভয় কীসের? ভীতিতো তার যার পরিচয় কেবল রাতটুকু। কয়েক প্রহরের সঙ্গী যে। বৈধতার কোনো ভীতি নেই, ভীতি অবৈধতার। ভীতি তৃতীয় পক্ষের।”

  “তাই? দিনের আলোর মতো এত স্বচ্ছতা থাকার পরেও যার রাতের অন্ধকারের কাছে যাওয়া লাগে তার আলোর আর কী ঐশ্বর্য রইল তবে? নেহাৎ ই সেই আলো ব্যর্থ নয়কি? নাহয় সে আটকে রাখতে পারল না কেন এত বৈধতা থাকার পরেও? রানি, আমি বড়োই পাপী, কিন্তু তারচে বেশি পাপী আপনার সাথে এক পালঙ্কে নিদ্রা যাওয়া মানুষটি। সে সুযোগ দিয়েছে বলেই তৃতীয় পক্ষ এসেছে। নয়ত তৃতীয় পক্ষের এমন কী সাধ্যি?”

 কথা শেষ করে চাপা হাসে সুরসুন্দরী। ভ্রু উঁচিয়ে ঘাড়ও নাড়ায় খানিক। রানি দমে আসেন। সুরসুন্দরীর কথা কোথাও তো একটা যৌক্তিক। তাই তিনি আর তর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেন না। যুদ্ধ যাকে পাওয়ার সে-ই তো হারিয়ে দিয়েছে তাকে, তাহলে আর এই সামন্য নর্তকীর সাথে কীসের এত তার সমঝোতা, বোঝাপড়া? 

  রানি বেরিয়ে যেতে উদ্যত হন। দোরের কাছ অব্দি পৌঁছাতেই পিছু ডাকে পুনরায় সুরসুন্দরী। আরও খানিকটা উঁচু গলায় বলেন,

“আমি আপনার প্রতিপক্ষ নই। আপনি রানি, আমি নর্তকী। আমাকে প্রতিপক্ষ ভাবা আপনার ক্ষমতা ও আসনেরই অপমান। আমাকে শত্রুও ভাবার প্রয়োজন নেই বোধকরি। আপনার শত্রুতো আপনার সাথে স্বয়ং সংসার করছে। আজও শত্রু চিনলেন না? এতই না বিচক্ষণ আপনি?”

  রানি সুরসুন্দরীরের শ্লেষাত্মক সত্যটি সহ্য করে হজম করতে পারেন না। মানুষ যে বড়ই অদ্ভুত প্রাণী। যেই সত্য তাদের সুখে হস্তক্ষেপ করে সেই সত্য এবং সত্য বলা মানুষকেও তারা অপরাধ ও অপরাধী মনে করে। রানিও তাই। 

তিনি সত্যটুকু গিলতে না পেরে আরও কঠিন কথা বলে উঠলেন,

“আমি বিচক্ষণ না বোকা তা পরে হিসেব করি। আপনি না-হয় আপনার পরিচয়টাই মাথায় রাখলেন। আমার স্বামীর মনোরঞ্জন ও বিনোদনের অংশ কেবল আপনি। আমি তো তার পুরো জীবনটাই।”

  সুরসুন্দরী মাথা নাড়ালেন। ঠোঁটে হাসি তার যথারীতি। ঘাড় কাঁত করে এমন ভাবেই সম্মতি দিলেন যেন রানিই সঠিক। তর্কে সে সমর্পণ করেছে আলগোছেই।

রানি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। হনহনিয়েই বেরিয়ে গেলেন কক্ষ ছেড়ে।

  সুরসুন্দরী সেই বেরিয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাপসীকে ইশারা করে বললেন,

“দেখলিতো? এত চতুর রানিও কি-না সংসারের মায়াজালে শত্রু চিনতে ভুলে গেলো। স্বামী প্রীতিতে ডুবে আছে। অধম, নির্বোধ সব। নারীদের ধ্বংস করেছে এই মায়া-ই।”

 

তাপসী হতাশ শ্বাস ফেলে। সুরসুন্দরীর এই সংসার ধ্বংস করার খেলাটি সে অপছন্দ করে ভীষণ কিন্তু মুখ ফুটে বলতেও পারে না। বলতে গেলেই সুরসুন্দরীর যুক্তির কাছে পরাস্ত হতে হয়। সুরসুন্দরীকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে প্রবেশ করতে না দিলেই তো আর সংসার ধ্বংস হয় না। কিন্তু পুরুষ গুলো সেটা পারে না। নিজেদের একটু সংযত রাখলে কী এমন ক্ষতি হতো এদের কে জানে?

 —————

  ক্যামিলাস রাজ্যের নড়বড়ে সংসারটি একদিন সত্যি সত্যিই তীব্র ঝড়ে উড়ে গেলো। এতটাই আচমকা একটি ঝড় এলো যে রানি বুঝেও উঠতে পারলেন না। তার আগেই রাজা চর্যাপদ দ্বিতীয় নারী বিবাহ করে প্রাসাদে তুললেন। এতটাই আচমকা হলো যে স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়ে গেলেন রানি। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp