কাজলী ঘরে ফেরার কিছুক্ষণ পর সাহেব চাচা এলেন চার-পাঁচটা আনারস হাতে। সম্ভবত ফেরার পথে সস্তায় পেয়ে নিয়ে এসেছেন। জোহরা আনারসগুলো এককোণে তুলে রেখে সাহেব চাচাকে খেতে দিলেন।
সাহেব চাচা গোগ্রাসে খেতে খেতেই জোহরাকে গম্ভীর গলায় বললেন, “জোহরা, ছেড়ি দুইডারে দেইখা রাইখো। আশিক, আসিফ পোলাপান নিয়া ঘুরঘুর করতাছে। বাতাস কিন্তু ভালা না।”
“কী করমু আমি ভাই? কই যামু আমরা? কার কাছে গিয়া মাথা গুঁজমু?”
সাহেব চাচা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি চুপচাপ ভাতের লোকমা মুখে তুলতে লাগলেন। সত্যি তো, এদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। উনার নিজেরও আপন বলতে কেউ ছিল না।
খাওয়া শেষ করে থালাতেই হাত ধুতে ধুতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি দেহি কী করন যায়। তোমরা ঘরের ভেতর থেইকা ভালা কইরা ছিটকানি আটকায়া দিও। গেইডে একটা বড় দেইখা তালা মাইরা রাহো।”
“ওই গেইডে তালা মাইরাই কী হইব, না মাইরাই কী হইব ভাই? লাথি মারলেই তো পইড়া যাইব।”
“তাও মনের সান্ত্বনা আছে না? আইচ্ছা, না পারলে নাই৷ ঘরের দরজা আর জানালার ছিটকানিগুলাই শক্ত কইরা আটকায়া দিয়া বাত্তি নিভায়া শুইয়া পড়ো।”
সাহেব চাচা গামছা দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
জোহরা উঠে গিয়ে সাবধানে সব কটা দরজা আর জানালার ছিটকানি টেনে দিলেন।
কাজলী দুই হাঁটু বুকের সাথে শক্ত করে ঠেকিয়ে কুণ্ডলীর মতো গোল হয়ে শুয়ে আছে। লোহার পাইপের বহুদিনের পুরোনো খাটটা একজনের বেশি ওজন নিতে পারে না। জায়গায় জায়গায় মরিচা ধরে লাল হয়ে আছে।
জোহরা রান্নাঘর গিয়ে টিনের প্লেটে কিছুটা ভাত নিলেন। ডাল আর আলু ভর্তা যেটুকু ছিল সাহেব খেয়ে গেছেন। একটা ডিমও নেই ঘরে। হাতড়ে একটা শুকনো পেঁয়াজ পেলেন। পেঁয়াজ কুচি কুচি করে কেটে, সামান্য হলুদ আর কাঁচামরিচ দিয়ে কড়াইতে ভেজে প্লেটটা নিয়ে কাজলীর খাটের এক কোণে রাখলেন।
ভাঙা জানালার ফাঁক গলে বাইরে থেকে চাঁদের আবছা আলো এসে পড়েছে কাজলীর ফ্যাকাশে মুখের ওপর। কাজলী একবারের জন্যও প্লেটের দিকে তাকাল না। জোহরা ভাঙা গলায় বললেন, “উইঠা খা। খাওনের লগে গুসা করলে নিজেরই ক্ষতি।”
কাজলী বরফশীতল গলায় জবাব দিল, “আমার ক্ষতি নিয়া তোমার এত ভাবতে হইব না।”
জোহরা কোনো উত্তর না দিয়ে খাটের পাশেই মেঝেতে চুপচাপ বসে রইলেন। ওনার তলপেটের ব্যথাটা এখন একটু কমতির দিকে, তিন-চার দিন যাবৎ নতুন করে কোনো রক্তপাতও হয়নি। তবে শরীরটা একদম ভেঙে পড়েছে, রক্তশূন্যতায় চোখ দুটো কোঠরে ঢুকে গেছে। কালো কুচকুচে চোখের চারপাশটা।
ত্রিশ মিনিট কেটে গেল। জোহরা প্লেটটা আগলে ওভাবেই বসে রইলেন। কাজলী একসময় বিরক্ত হয়ে বলল, “যাও তো আম্মা, এখান থেকে গিয়া ঘুমাও। আমারে একটু শান্তিতে ঘুমাইতে দাও।”
আবারও কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এলো ঘরে। জোহরা চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “তুই সত্যিই ঝিলপাড় বস্তি ছাইড়া চইলা যাইতে চাস?”
কাজলী হাঁটুতে মুখ গুঁজে রেখেই বলল, ‘ কী আর করমু ? আশিক-রুমেলদের সাথে তো আমার কোনো ব্যক্তিগত জমিজমার দ্বন্দ্ব নাই যে, ওগো সাথে যুদ্ধ জিইত্তা আমার জমি পাইতে হইব। আমি যা কিছু করছি, নিজের সম্মান আর জান বাঁচাইতে করছি। এখনও সেইটাই চাই। সম্মান নিয়া বাঁচার জন্য যদি বস্তি ছাড়তে হয়, ছাড়মু। আমি খালি তোমারে, আপারে নিয়া শান্তিতে দুই মুঠো ডাল-ভাত খাইয়া বাঁচতে চাই। সেইটা এই বস্তিতে না হইয়া অন্য যেখানেই হোক না কেন। সমস্যা নাই।”
জোহরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোগোর যাওয়ার মতো একটা জায়গা আছে। যাবি?”
কাজলী ঝট করে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকাল। ও অনেক ভেবেও এই শহরে বা তার বাইরে মাথা গোঁজার মতো কোনো আত্মীয়ের হদিস পায়নি। ওর বাবা ছিলেন একদম একা মানুষ। দাদা বহু বছর আগেই মারা গেছেন, আপন বলতে ছিলেন খালি বুড়ো দাদি। বাবা দেনার দায়ে বিষ খেয়ে কবেই আত্মহত্যা করেছেন। তার কিছুদিন পরই দাদিও অসুখে ভুগে মারা যান।
নানাবাড়ি সম্পর্কে কাজলী তেমন কিছু শোনেনি। ছোটবেলা থেকে শুধু একটাই কথা শুনে বড় হয়েছে, ওর আম্মার দুনিয়ায় আপন বলতে কেউ নেই, এতিম। নেত্রকোনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে ছিলেন জোহরা। কিশোরী বয়সে গ্রামের কিছু চেনা লোকের সাথে ভাগ্য অন্বেষণে সিলেটে কাজ করতে এসেছিলেন। কাজ করতে গিয়ে আব্বার সাথে পরিচয় তারপর বিয়ে। তাহলে আম্মা কার কথা বলছেন?
জোহরা চাঁদের আলোর দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “তোর নানাবাড়ি যাবি?”
কাজলী যেন আকাশ থেকে পড়ল। ও বিস্ময় নিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে বলল, “নানাবাড়ি? নানাবাড়ি কই থেকে? তুমি না এতিম?”
জোহরার চোখ দুটো কেমন জানি উদাস হয়ে গেল। কাজলী বিছানায় সোজা হয়ে উঠে বসে জোহরার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যিই নানাবাড়ি আছে আমার? কই আছে? নেত্রকোনা?”
জোহরা ওপর-নিচ মাথা নাড়ালেন। বললেন, “আমি তো আর কোনোদিন ওইহানে মুখ দেখাইতে যামু না। তোরা দুই বোন চইলা যা। নেত্রকোনার অতীতপুরে গিয়া হাজী বাড়ি কইলে যে কেউ দেখায়া দিব।”
কাজলী মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জোহরার চোখের জল দেখে মনে হচ্ছে না তিনি মিথ্যা বলছেন। ও রুদ্ধশ্বাস গলায় বলল, “সত্যিই আমার, আপার নানাবাড়ি আছে? এতদিন কও নাই কেন?”
জোহরা চোখের কোণের জলটা শাড়ির আঁচলে মুছে ম্লান হেসে বললেন, “কইলে তো যাওয়ার লাইগা কান্নাকাটি করতি, বায়না ধরতি।”
“তো যামু না? দুনিয়ার সব মানুষ নানাবাড়ি যায়, মামাবাড়ি যায়... আনন্দ করে। মামা... মামাও আছে?”
কাজলীর বুকটা অজানা আনন্দে দুলছে।
“হ, আছে। মামা আছে, খালাও আছে।”
কাজলী নিজের ভেতরের আবেগ, উত্তেজনা চেপে রাখতে পারল না। ও খাট থেকে চিৎকার করে ডেকে উঠল, “আপা, এই আপা! আম্মা এগুলা কী কইতাছে! এই আপা, আপা!”
মারিয়াম মাত্রই চোখটা বুজে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কাজলীর চিৎকার শুনে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। বুকটা আতঙ্কে ধড়ফড় করছে। আশিকরা কি ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েছে? ও কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কী... কী হইছে? ওরা কি আইয়া পড়ছে?”
ইউসুফ এক ফোঁটা ঘুমাতে পারল না। শেষ রাতের দিকে ওর গা-টা জ্বরে পুড়ে যেতে লাগল। এই পৃথিবীর কোনো মানুষকে ও কোনোদিন বুঝিয়ে বলতে পারবে না, কাজলীকে মাত্র কয়টা কথা বলতে গিয়ে ওর মনের ওপর দিয়ে কী ভীষণ ঝড় বয়ে গেছে, ঠিক কতটুকু মানসিক শক্তি আর সাহসের প্রয়োজন হয়েছে! এর চেয়ে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা বোধহয় ঢের সহজ ছিল।
বহু বছর ধরে জমিয়ে রাখা আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে নার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে। সেই চাপ শরীরটা নিতে পারেনি, হু হু করে গায়ে জ্বর এসে গেছে। তবে মনের কথাগুলো মুখ ফুটে বলে ফেলার পর থেকে বুকটা একদম হালকা লাগছে। ও একটা মোটা কমফোর্টার দিয়ে মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জ্বরের ঘোরেও ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে রইল। অবশেষে ও পেরেছে! বহু বছরের, বহুদিনের বুকের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে রাখা মনের কথাটুকু ও কাজলীর কানে পৌঁছে দিতে পেরেছে।
ও আশা করেনি, কাজলী হ্যাঁ বলবে। কাজলী আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতো ওমন হালকা স্বভাবের মেয়েই নয় যে ছেলের অনেক টাকাপয়সা আছে, গাড়ি আছে দেখেই প্রেম-ভালোবাসা ছাড়াই হুট করে তার গলায় মালা দিয়ে দেবে! তাছাড়া মেয়েটা সবেমাত্র নিজের প্রেমিকের থেকে অনেক বড় আঘাত পেয়েছে। ওদের বর্তমান পরিস্থিতিও ঠিক নেই। চারপাশ থেকে বিপদ ঘিরে রেখেছে। এমতাবস্থায় কাজলী যে ও’কে রিজেক্ট করে দেবে, তা ইউসুফ আগে থেকেই নিজের মনকে বুঝিয়ে গিয়েছিল। প্রত্যাখ্যান কবুল করেই ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েছিল। ও শুধু চেয়েছিল কাজলী জানুক, এই দুনিয়ায় কেউ একজন ওকে দুই জাহানের জন্য চায়। কেউ একজন বিশ্বাস করে, আজ হোক কিংবা কাল, কাজলী তারই হবে।
জ্বরের ঘোরে মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। ইউসুফ বিছানা থেকে উঠে একটা বাটিতে পানি নিয়ে নিজের ব্যবহৃত রুমালটা ভালো করে ভিজিয়ে নিল। তারপর আবার শুয়ে পড়ে কপালে ভেজা রুমালটা দিয়ে রাখল জলপট্টি হিসেবে। সাধারণত শরীর খারাপ হলে মানুষের মন মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কিন্তু ইউসুফের কাছে জ্বরটাকেও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর…আরামদায়ক অনুভূতি বলে মনে হতে লাগল।
সকালে কাজলী ফুরফুরে মন নিয়ে বিছানা থেকে উঠল। এতগুলো বছর নিজেদের বিশাল পৃথিবীতে একদম একা ভেবে আসা কাজলী গতকাল রাতে জানতে পেরেছে, ওর নানাবাড়ি আছে, মামা-খালা আছে। সেখানে নিশ্চয়ই মামিরা আছেন, ওর বয়সী ভাইবোনেরাও আছে। না, ও বোকা নয়। ও আশা করে না যে এই জীবনে কোনোদিন না দেখা মানুষগুলোর কাছে গেলেই ও অমনি সব ভালোবাসা পেয়ে যাবে, ওদের সব দুঃখ এক লহমায় দূর হয়ে যাবে। ও কোনো অবাস্তব প্রত্যাশা করছে না। ও খুব ভালো করেই জানে, এই দুনিয়ায় কত শত অভাগী মেয়ে আছে যাদের নানাবাড়ির মানুষ কিংবা নিজের মামারাই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়। ও শুধু এটা ভেবেই মনে মনে ভীষণ খুশি, এত বড় দুনিয়ায় অন্তত রক্ত সম্পর্কের চেনা কিছু মানুষ ওদের আছে। ওরা একদম একা কিংবা অনাথ নয়।
জোহরা পনেরো বছর বয়সে নেত্রকোনার অতীতপুরের বিখ্যাত হাজী বাড়ি-র কঠিন বেড়াজাল ভেঙে নিজের প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে এসেছিলেন। জোহরার বাবা নুরুল ইসলাম হাজী ছিলেন অত্যন্ত কট্টরপন্থী ধর্মপরায়ণ লোক। তিনি দুটো মেয়েকে যেন সিন্দুকের ভেতর রেখে বড় করছিলেন। সেই সিন্দুক ভেঙে জোহরা যখন পালিয়ে যান, নুরুল ইসলাম হাজীর আজীবনের কামানো সব মান-মর্যাদা, অহংকার এক নিমেষে ধুলোয় মিশে যায়।
নুরুল ইসলাম হাজী ছিলেন বিচিত্র চরিত্রের মানুষ। তিনি কসম করে যে কথাটা একবার মুখ ফুটে বলতেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও তিনি ঠিক তাই-ই করতেন। তার মুখের জবান কোনোদিন, কোনো পরিস্থিতিতে উল্টায়নি। তার কসমের কাঠিন্য বোঝাতে জোহরা কাজলীকে অতীতের কিছু হাড়হিম ঘটনা জানিয়েছেন৷
নুরুল ইসলাম হাজীর প্রথম স্ত্রীর পরিবার বিয়ের সময় সত্য লুকিয়েছিল। ওনার প্রথম স্ত্রী মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন, যা বিয়ের আগে হাজীকে জানানো হয়নি। বিয়ের দ্বিতীয় দিন সকালে যখন হাজী সাহেব এই সত্যটা জানতে পারেন, তখন তিনি কোরআন শরিফ ছুঁয়ে কসম কাটেন, ‘যে বংশ আমার সাথে প্রতারণা করেছে, সেই বংশের রক্ত আমি আমার ঘরে রাখব না। আজ সূর্যাস্তের আগে যদি এই মেয়েকে বাপের বাড়ি দিয়ে না আসি, তবে আমি আমার বাপের সন্তান নই।’
তিনি সত্যি সত্যিই বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই ওনাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন এবং চিরতরে তালাক দেন। ওনার শ্বশুরবাড়ির লোকজন পায়ে ধরে কাঁদলেও হাজীর মন এক চুলও গলেনি।
জোহরার নিজের মা, অর্থাৎ হাজীর দ্বিতীয় স্ত্রীর হাতের রান্না ভালো ছিল না৷ মনোযোগও ছিল না৷ সবসময় ভুল করতেন৷ বিশেষ করে লবণ দিতে ভুলে যেতেন। পরপর দুইদিন হাঁসের মাংসে লবণ দিতে ভুল করায় হাজী সাহেব রেগে গিয়ে থালা ঠেলে উঠে দাঁড়ান এবং কসম কেটে বলেন, “আর কখনো গোশতে লবণ কম হলে আল্লাহর কসম আর কোনোদিন তোমার হাতের রান্না করা গোশত আমার মুখে তুলব না।”
দূর্ভাগ্যবশত, মাসখানেক পরেই জোহরার মা একই ভুল করলেন৷ নুরুল ইসলাম হাজীও নিজের কসম রেখেছিলেন। জোহরা জন্মের পর মায়ের হাতের মাংস রান্না বাবাকে খেতে দেখেনি। অন্য কেউ রাঁধলে খেতেন, কিন্তু স্ত্রীর হাতের মাংস আর কোনোদিন ওনার পাতে ওঠেনি।
একবার ওনার ছোট ভাই পারিবারিক সম্পত্তির জমি নিয়ে হাজীর সাথে তর্কে জড়িয়েছিলেন। রাগের বশে সেদিন কসম কেটে ছোট ভাইকে বলেছিলেন, “আজ থেকে এই বাড়ির সীমানায় তোর আর আমার ছায়া যদি এক হয়, তবে আমি শুয়োরের মাংস খাব। আজীবন তুই আমার জন্য মৃত।”
এরপর বহু বছর উনি আর ওনার ছোট ভাই একই গ্রামে কাটিয়েছেন। ভাই যখন অল্প বয়সে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর শয্যায় শায়িত ছিলেন, তখনো হাজী সাহেব তাকে একবারের জন্যও দেখতে যাননি। এমনকি ভাইয়ের জানাজাতেও তিনি শরিক হননি। নিজের কসমের কাছে তিনি ভাইয়ের রক্তকেও তুচ্ছ করেছিলেন।
আজ থেকে প্রায় সাইত্রিশ বছর আগের কথা। জোহরার গর্ভে যখন বড় ছেলে ইয়ামিন এলো, তখন জোহরার মাতাল স্বামী মালেক প্রথমবারের মতো জোহরাকে পশুর মতো এলোপাতাড়ি মারধর করল। স্বামীর মার সহ্য করতে না পেরে অন্তঃসত্ত্বা জোহরা দোকান থেকে অনেক কষ্টে বাবার বাড়ির ল্যান্ডফোনে একটা কল করেছিলেন। ভেবেছিলেন বাবা হয়তো মেয়েকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু ওপাশ থেকে নুরুল ইসলাম বজ্রকণ্ঠে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, “জোহরা মরুক আর বাঁচুক, তাতে নুরুল ইসলাম হাজীর কিচ্ছু যায় আসে না। জোহরা যদি কোনোদিন এই বাড়ির সীমানায় পা রাখে, তবে যেন বিষ নিয়ে আসে। আমি বিষ খেয়ে মরব, এইটা আমার আল্লাহর দরবারে ওয়াদা।”
তারপর সাইত্রিশটা বছর কেটে গেছে। জোহরা আর কোনোদিন নিজের বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগের ধৃষ্টতা দেখাননি। ঝিলপাড় বস্তি, স্বামীর নির্যাতন আর অভাবকেই নিজের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন।
মায়ের মুখ থেকে নানার কাহিনি শুনে কাজলী মনে মনে ভীষণ অবাক হলো। মানুষ এতখানি রুক্ষ, অহংকারী আর জেদি কীভাবে হতে পারে! প্রথমে কাজলীর রাগ হলেও পরে সিদ্ধান্ত নিল, সে নেত্রকোনা যাবে। নানার সাথে মায়ের সম্পর্কটা যদি জোড়া লাগানো যায়, লাগাবে। কিন্তু নানা কি আদেও বেঁচে আছেন? এত বছর পরও কি বুড়ো মানুষটা জীবিত আছেন? জানতে হলেও ওখানে গিয়ে নিজের চোখে দেখতে হবে।
ক্যালেন্ডার দেখে দিনক্ষণ ঠিক করল কাজলী। আজ বুধবার। সে মনে মনে পরিকল্পনা করল, আগামী সোমবার ভোরে মারিয়ামকে সাথে নিয়ে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। একটি টিউশনি থেকে তার সাত হাজার টাকা পাওয়ার কথা। স্টুডেন্টের বাবা বলেছেন রবিবার বেতন পেয়ে কাজলীর বেতন পরিশোধ করে দিবেন। এখন ওর কাছে আছে মাত্র ছয়শো টাকা। এই টাকায় নেত্রকোনা যাওয়া অসম্ভব, তার ওপর মারিয়ামের ঔষধও প্রয়োজন। যেকোনো মূল্যে সোমবারের জন্যই তাকে অপেক্ষা করতে হবে। কাজলী যদি আগে থেকে জানত, রবিবার রাতেই তার এলোমেলো জীবনটা ভেঙে একেবারে খানখান হয়ে যাবে, তবে হয়তো সে এক মুহূর্তও দেরি না করে মা-বোনকে নিয়ে পরদিনই নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেত।
কাজলী দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে সাতকাহন রেস্টুরেন্টে দিকে হাঁটা ধরল সকালের নাস্তা আনতে। বের হবার আগে মনে করে ওড়নার আড়ালে সাইড ব্যাগের ভেতর একটা ছোট ধারালো ছুরি নিয়ে নিল। আশিক গাঁজাখোরটাকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। কখন কী করে বসে, তার ঠিক ঠিকানা নেই।
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।’
কাজলীর ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হলো। সাতকাহন রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি গলির মোড়টাতে আসতেই মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল আশিকের সাথে। কাজলী প্রথমে খেয়াল করল, আশিকের হাতে অস্ত্রশস্ত্র আছে কি না। নেই। ও মনে মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আশিকের পাশ কেটে চলে যেতে নিল। আশিক এক পা এগিয়ে এসে বদমাশের মতো হেসে বলল, “জান, কাইল রাইতে ঘরে ফিরলা কোন দিক দিয়া? মোড়ে তো কতক্ষণ অপেক্ষা করলাম, তোমার দেখাই পাইলাম না।”
কাজলী কোনো জবাব দিল না। ও নিজের গতি বাড়িয়ে চলে যেতে চাইল। আশিক ঝট করে ওর সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল।
চোখমুখ বিকৃত করে বলল, “এত কাহিনি কইরা কী লাভ হইল? সব বালই তো রইয়া গেল। বিশ্বাস না হইলে ক, দেখাই? ভিডিও করলেও সমস্যা নাই।”
কাজলী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “পথ ছাড় আশিক। ঝামেলা করবি না।”
আশিক হঠাৎ গলার স্বর খুব নরম করে দুই হাত ছড়িয়ে বলল, “দেখ কাজলী, তোরে আমি কোনো কষ্ট দিতে চাই না। আমি তোরে সত্যি ভালোবাসি। আই লাভ ইউ। তুই জেদ ছাইড়া আমারে বিয়া কর। তোরে রানীর মতো রাখমু। বস্তির সর্দারনি হইবি তুই।”
কাজলীর গা ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। ও সজোরে বলল, “জীবনেও না! মরণেও না।”
আশিকের মুখের কপট ভালো মানুষিটা মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো হিংস্র হয়ে উঠল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তুই তাইলে সহজে রাজি হবি না?”
“না, একশ বার না। তোরে বিয়া করার চেয়ে ফাঁসি দিয়ে মরণ ভালো।”
“এর ফল কিন্তু তোরে ভুগতে হইব কাজলী। মনে রাখিস, এইটা তোরে আমি শেষ সুযোগ দিছিলাম।”
কাজলীর রক্ত ততক্ষণে মাথায় চড়ে গেছে। আশিককে দেখলেই ওর ঘেন্না হয়। ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এক ঝটকায় ছোট ছুরিটা বের করে আশিকের চোখের সামনে ধরল। ধমকের সুরে বলল, “কী করবি তুই? রাস্তাঘাটে আমারে কুপাবি? আয় কোপা! আমিও কিন্তু কোপাইতে পারমু। আল্লাহর কসম খায়া বলতেছি, যদি আমার গায়ে একটা ফুলের টোকা দেওয়ারও চেষ্টা করছস, তুই মরবি আর আমি বাঁচমু। আর নয়তো আমারে একটা কোপ দিলে, আমি তোরে পাল্টা দশটা কোপ দিমু! মাইরা এরপরে মরমু।”
কাজলী আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হনহন করে রেস্টুরেন্টের দিকে চলে যেতে লাগল। আশিক পেছনে দাঁড়িয়ে নরপিশাচের মতো হেসে উঠল। চড়া গলায় বলল, “তাইলে কবরেই দেখা হইতাছে কাজলী! তুই আমারে কুপাবি আর তোরে আমি কুপামু। দেখমু কার হাত কত জোরে চলে!”
আশিক গটগট করে সওদাগর বাড়িতে ঢুকে সোজা রুমেলের ঘরে গিয়ে বসল। গতকাল রাতে দুজনের মধ্যে তর্কবিতর্ক হয়েছিল। রাগের মাথায় আশিক রুমেলকে অনেক আজেবাজে কথা শুনিয়েছে। রুমেল কোনোভাবেই চাচ্ছিল না আশিক এখনই কাজলীর ওপর কোনো প্রতিশোধ নিক, কারণ এর পেছনে কিছু রাজনৈতিক ও পারিবারিক জটিলতা জড়িয়ে আছে। তখন আশিক ক্ষোভে রুমেলকে বেইমান, প্রতারকসহ অনেক কিছু বলে গালিগালাজ করে।
সকাল হতেই মাথাটা একটু ঠান্ডা হওয়ায় রুমেলের সাথে মিটমাট করতেই সওদাগর বাড়িতে এসেছে। রুমেল সবেমাত্র ঘুম থেকে চোখ ডলতে ডলতে উঠেছিল। ঘরে আশিককে বসে থাকতে দেখে ওর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে গেল। ও বিছানা থেকে উঠে বাথরুমের দিকে যেতে নিলে আশিক নরম গলায় বলল, “কাইল রাইতে মাথাটা গরম আছিল দোস্ত।”
রুমেল ওখানেই থমকে দাঁড়াল। আশিককে মা-বাপ তুলে একটা বিশ্রী গালি দিয়ে গটগট করে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। অবশ্য এই ধরনের মা-বাবা তুলে গালিগালাজে ওদের মতো ছেলেদের কিছুই যায় আসে না, এগুলো ওদের নিত্যদিনের খাসলত।
কিছুক্ষণ পর রুমেল বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই আশিক সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ উগরে দিল, “তুই আমারে বুঝার চেষ্টা কর রুমেল! এতদিন ধইরা আমি কুত্তার মতো সব সইতাছি। ওই খানকি আমারে প্রথমবার রিজেক্ট করছে। এরপর আবার আমার ছবি-ভিডিও ফেসবুকে দিয়া ভাইরাল করছে। আমার বাপ-মারে পর্যন্ত পুলিশে ধরাইয়া জেল খাটাইল! এত কিছুর পরও ও এখনো বুক ফুলায়া আমার সামনে দিয়া হাইটা যায় এইটা আমার সহ্য হয় না রে ভাই! ওরে দেখলে আমার কইলজা ফাইট্যা যায়। আর তুই আমারে আরও ধৈর্য ধরতে কস? আমার মাথা গরম হইব না?”
রুমেল নিজের হাতের তোয়ালেটা বিছানায় ছুড়ে মেরে তেড়ে এল, “এই শালা! তোরে আমি কয়টা দিন ধৈর্য ধরতে বলছি? মাত্র চারটা দিন তুই তোর নিজের পাছা চাপ দিয়ে বসে থাকতে পারবি না? আমি মারিয়ামরে তোর প্রতিশোধের থেকেও অনেক বেশি চাই, বুঝছস? এখন কোনো ঝামেলা করা যাবে না। বড় চাচারা এমনি আমাকে অপদার্থ ভাবে। আব্বার কলোনিগুলোর দায়িত্ব যদি আমার একার নামে নিতে হয়, তবে ওই চাচাগো মত আর সাপোর্ট লাগবে। কয়টা জরুরি কাগজে ওদের সাইন লাগবে। শনিবার আমি ওদের থেকে যেমন করেই হোক সাইনগুলা নিয়ে নিই। এরপর তুই যা ইচ্ছা করিস, আমি নিজে তোরে সেই ব্যবস্থা কইরা দিব।”
রুমেল হিংস্র জানোয়ারের মতো চোখ করে আশিকের কাঁধে হাত রেখে বলল, “শনিবারের পর তুই কাজলীরে নেংটা করে বস্তির মোড়ে ফালায়া রাখবি, কেউ তোরে আটকাইতে যাবে না। মারিয়ামরে আমি নিজে দেখব। ও ওর পেটের জারজ বাচ্চাসহ মরব। আর ওদের বুড়ি মা রাস্তায় রাস্তায় পাগল হয়ে ভিক্ষা করব! তুই খালি শনিবারের পর আমার খেলাটা মিলিয়ে নিবি।”
আশিক পাল্টা কথা বলল না। ওর ভেতরের ছটফটানিও কমল না। চারটা দিন ও কীভাবে সহ্য করবে কাজলীর দেমাগ নিয়ে চলা? এতো অহংকার ওই মেয়ের!
আজ সকালে ও কাজলীকে নিজের ইগো বিসর্জন দিয়ে আবারও বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, অথচ কাজলী বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে উল্টো ওর চোখের সামনে ছুরি উঁচিয়ে রিজেক্ট করে দিয়ে চলে গেল! হুমকিও দিল কোপানোর! বস্তির ছেলেপেলেরা আড়ালে হাসাহাসি করে। যে আশিক মানুষের থেকে টাকা খেয়ে দিনদুপুরে মানুষ পিটিয়ে হিরো সাজত, সেই আশিক কিনা কাজলীর মতো একটা সাধারণ মেয়ের এত বড় অপমান সহ্য করে চোরের মতো বসে আছে! অপমানে, ক্ষোভে আশিকের দম আটকে আসছিল। ও টেবিলের ওপর থেকে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো এক বোতল পানি খেয়ে নিজের ভেতরের আগুনটা শান্ত করার চেষ্টা করল।
সাতকাহন রেস্টুরেন্টের ভেতরটা মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করছে। পরোটা, রুটি আর ডালভাজি নেওয়ার জন্য মানুষজন রীতিমতো সিরিয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কাজলী সবার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। এমন সময় হঠাৎ ক্যাশ কাউন্টারের ওপাশ থেকে একজন কর্মচারী গলা উঁচিয়ে ডাক দিল, “এই যে আপা!”
ভিড়ের মধ্যে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে চারদিকে তাকাল। কর্মচারীটি এবার ভিড় ঠেলে হাত উঁচিয়ে আবার বলল, “ওই যে কাউন্টারের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, কালা থ্রিপিস পরা আপা! আপনার কথাই বলতেছি।”
কাজলী অপ্রস্তুত হয়ে নিজের দিকে তাকাল। ও ই তো কালো রঙের থ্রিপিসটাই পরে এসেছে! কর্মচারীটি ওরে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনার কী লাগবে? কী নিবেন?”
এত মানুষের সিরিয়াল ভেঙে হুট করে এভাবে ডাক পাওয়ায় কাজলী সবার সামনে ভীষণ থতমত খেয়ে গেল। চারপাশের অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর চোখ তখন ওর ওপর এসে পড়েছে। ও হতভম্ব হয়ে কুণ্ঠিত গলায় বলল, “ছয়টা পরোটা আর ডালভাজি দেন।”
“আচ্ছা, একটু দাঁড়ান। দিতেছি।”
কর্মচারীটি ভেতরের দিকে চলে গেল। কাজলী চারপাশের মানুষের বাঁকা ফিসফিসে চাহনি দেখে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। এমনিতেই লোকজন ওকে খুব একটা ভালো চোখে দেখছে না, নানা মুখরোচক কুৎসা রটছে। এখন আবার সিরিয়াল ভেঙে এভাবে খাতির পাওয়ায়, মানুষজন মনে মনে ভাবছে না তো যে, এই রেস্টুরেন্টের কর্মচারীর সঙ্গেও কাজলীর কোনো সম্পর্ক আছে?
কাজলীর কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার তাগিদে ভিড়ের মাঝখান দিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে তাকাল। কাউন্টারে তো ইউসুফ বসে নেই! অন্য একজন বয়স্ক লোক হিসাব মেলাচ্ছেন। ইউসুফ যদি রেস্টুরেন্টে থাকত, তাহলে না হয় বুঝত, তার ইশারাতেই কর্মচারী এমনটা করেছে। কিন্তু ইউসুফ তো আজ অনুপস্থিত!
কাজলী লাইন থেকে সরে একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। ওর মাথায় কালো ওড়নার ঘোমটাটা বেশ খানিকটা টানা। চারপাশের উৎসুক মানুষের চাউনি এড়াতে ও মাথা নিচু করে রইল। একটু পরেই ভিড় ঠেলে একটা হাত এগিয়ে এলো ওর দিকে, হাতে বেশ বড় একটা খাবারের পার্সেল। কাজলী পার্সেলের দাম মেটানোর জন্য ব্যাগ থেকে টাকা বের করে তুলে তাকাতেই ইউসুফকে দেখতে পেল।
ইউসুফ কাজলীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে৷ এমনভাবে অধিকারবোধ জড়ানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন গতকাল রাতেই ওদের ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেছে! কী আশ্চর্য! কাজলী এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ইউসুফের হাতে টাকাটা গুঁজে দিয়ে গটগট পায়ে রেস্টুরেন্ট থেকে চলে গেল।
ইউসুফ কাজলীর দেওয়া নোটগুলো নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। কাজলী মাসে বড়জোর এক কিংবা দুইবার ওদের রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাস্তা নিতে আসে। সেই নির্দিষ্ট দিনটা ঠিক কবে হবে, তা ইউসুফের জানা নেই। এই কারণেই ইউসুফ প্রতিদিন সকাল সাতটা বাজলেই এসে রেস্টুরেন্টের ক্যাশ কাউন্টারে বসে থাকে। বাইরে ঝড়, তুফান কিংবা শরীরে অসুস্থতা যাই থাকুক না কেন, ও নিয়ম করে এসে বসে থাকে শুধু কাজলীর দেখা পাওয়ার আশায়।
কাজলীর হাড়ভাঙা খাটুনির টাকাগুলো ও কোনোদিন রেস্টুরেন্টের ক্যাশ বাক্সে রাখে না৷ ওটা যত্ন করে রেখে দেয় নিজের ব্যক্তিগত আলমারির ড্রয়ারে। ওর কাছে একটা মাটির ব্যাংক ভর্তি হয়ে গেছে শুধু কাজলীর দেওয়া নাস্তার টাকায়। ও মনে মনে ভেবে রেখেছে, জমানো প্রতিটা কয়েন আর নোট ও কাজলীকে ওদের বাসর রাতে উপহার হিসেবে দেখাবে! বাসর রাতের কথা মনে আসতেই ইউসুফের ফ্যাকাশে গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
কাজলী হনহন করে হেঁটে ঘরে এসে খাবারের পার্সেলটা জোহরা হাতে দিল। জোহরা কাগজের প্যাকেটটা খুলতেই সুবাসে পুরো ঘর ম ম করে উঠল। তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন, “কাজলী, গরুর মাংস আনছস কেন?”
কাজলী নিজের ঘর থেকে তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো।
সাতকাহনের সবচেয়ে বিখ্যাত আর সেরা খাবারই হচ্ছে গরুর মাংসের ভুনা। বিশেষ করে সকালের নাস্তায় গরম গরম খিচুড়ি আর পরোটার সঙ্গে এই মাংসের স্বাদ নেওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। কাজলীর নিজেরও কতবার যে ইচ্ছে করেছে একটু টেস্ট করতে, কিন্তু টাকার টানাপোড়েনে সেই সাহস ও করে উঠতে পারেনি।
গরুর মাংস দেখে ও ভীষণ রেগে গেল। ইউসুফের আগ বাড়িয়ে দেওয়া আদিখ্যেতা ওর একদমই পছন্দ না। ও রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে পলিথিনে ভরা মাংসের ব্যাগটা জোহরার হাত থেকে ছোঁ মেরে কেড়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ওরা ভুলে দিছে মনে হয়। আমি ফেরত দিয়া আইতেছি।”
ও ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই মারিয়াম হুইলচেয়ার টেনে এক ঝটকায় কাজলীর হাত থেকে পলিথিনের ব্যাগটা টেনে নিল। মারিয়ামের চোখ দুটো তখন চকচক করছে। ও ব্যাগটা বুকের সাথে চেপে ধরে বলল, “ভুলে দেয় নাই। ইউসুফ ইচ্ছা কইরাই দিছে। দিয়া আসবি কেন? দুপুরে ভাত খাওয়া যাইব।”
বোনকে লোভীর মতো মাংসের ব্যাগ আঁকড়ে ধরতে দেখে কাজলীর আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। ও চেঁচিয়ে উঠে বলল, “ছোঁচা, ফকিন্নি! ফ্রি-তে খাবার পাইলেই জিভ থেইকা লালা পড়ে ? দে, ফেরত দে।”
মারিয়াম ব্যাগটা ছাড়ল না। ও কাজলীর দিকে তাকিয়ে অভিমানী গলায় বলল, “আমরা কি চুরি কইরা আনছি ? ও তো নিজে থেইকা ইচ্ছা কইরা দিছে। তুই সামান্য একটু মাংসের জন্য নিজের বোনের সাথে এমন কেন করতাছস?”
কাজলী যখন জোর করে ব্যাগটা কেড়ে নিতে চাইল, তখন মারিয়াম ছোট বাচ্চার মতো মাংসের পলিথিনটা নিজের ওড়নার নিচে লুকিয়ে ফেলল। আহারে দরিদ্রতা! আহারে মানুষের অভাব! কাজলীর চোখের কোণটা যন্ত্রণায় জ্বলে উঠল। রাগটা মুহূর্তের মধ্যে বিষাদে রূপ নিল।
ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে মারিয়ামের দিকে তাকাল। গর্ভধারণের চব্বিশ সপ্তাহে এসে ওর বোনটার না জানি কত কী খেতে ইচ্ছে করে! কিন্তু অভাবের সংসারে ও কোনোদিন মুখ ফুটে নিজের কোনো সাধের কথা বলতে পারে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………