কালান্তরের কন্যা - পর্ব ১৬ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

কালান্তরের কন্যা - ইলমা বেহরোজ
ইউসুফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতামগুলো আটকাচ্ছিল।

দরজার ওপাশ থেকে সিমরান বলল, “আসব?”

ইউসুফ ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “অনুমতি নিচ্ছ কেন আপু? ভেতরে আসো।”

সিমরান ঘরে পা রাখতে রাখতে খোঁচা দিয়ে বলল, “আগে থেকেই অনুমতি নিয়ে আসার অভ্যাস করছি। তোকে কি আর এখন চেনা যায়? মা-বোনকে তো পাত্তাই দিস না! কোনোদিন আবার বলে বসবি, তোর ঘরে আসাই নিষেধ!”

ইউসুফের হাতের আঙুলগুলো শার্টের বোতামে থমকে গেল। বলল, “এভাবে কেন বলছ আপু?”

“মিথ্যা কী বলেছি? তুই নিজেই বল, তোকে কি আর আগের মতো চেনা যায়? আয়নায় দেখ, তুই নিজেকে চিনতে পারছিস?”

সিমরান খাটের এক কোণে বসল।  

ইউসুফ কোনো উত্তর দিল না। ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। 

সিমরান আবার বলল, “আম্মা কান্নাকাটি করছে। তোর নাকি এখন আর মায়ের ঘরে যাওয়ার সময় হয় না। আম্মার কোনো কথাই নাকি তুই কানে তুলিস না।”

ইউসুফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নার দিকে তাকাল। শান্ত গলায় বলল, “সব কথাই শুনি আপু৷ শুধু আম্মা আজকে যে গেঞ্জিটা পরতে বলেছিল, সেটা পরিনি।”

“কেন পরলি না? মায়ের পছন্দ তোর এত অপছন্দ হয়ে গেল কবে থেকে?”

ইউসুফ এবারও মৌনতা অবলম্বন করল। প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকলেও সেটা মুখে বলা সম্ভব নয়। এতদিন ও মায়ের পছন্দে ঢোলাঢালা, ওভারসাইজ গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরেছে। দেখতে খুব আদুরে লাগত। এখন ফিটিং শার্ট, প্যান্ট, কুর্তা আর পাঞ্জাবি পরে। এতে ওর ভেতরকার পুরুষালি ভাবটা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। আয়নায় বেশ পরিণত এবং সুদর্শন দেখায়। কাজলীর মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, পরিণত, জেদি মেয়ের মন জয় করতে হলে তো আর অবুঝ বাচ্চার মতো থাকা যায় না। তাকে ইমপ্রেস করতে হলে নিজের বাহ্যিক রূপে, ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন প্রয়োজন! এই ধারণা অবশ্য এআই চ্যাটবট দিয়েছে। তার নিজের মাথা থেকে বেরোয়নি।

সিমরান ইউসুফের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “গালে কী? দাড়ি রাখবি নাকি?”

ইউসুফ অবচেতনভাবেই নিজের গালে হাত বুলাল। ও সবসময় ক্লিন শেভড হয়ে থাকত। গত কয়েকদিন ধরে শেভ করেনি। ফর্সা চামড়ার ওপর হালকা কালো রঙের খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠেছে। খুব দ্রুতই পুরো গালে ছড়িয়ে পড়বে। ইউসুফ আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। মাথা নাড়িয়ে জানাল, হ্যাঁ, সে দাড়ি রাখবে।

সিমরান হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইউসুফের পোশাকে, চলনে, চেহারায় আমূল পরিবর্তন দেখে তাদের মা সাবিনা সকালে কদু কবিরাজকে ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেছেন। ওনার বদ্ধমূল ধারণা, আসাদুল চাচার অসমাপ্ত বিল্ডিংটার অশুভ বাতাস ইউসুফকে এখনো ছাড়েনি। অলক্ষুণে বাতাসের আছড়েই ইউসুফ দিন দিন এমন বদলে যাচ্ছে। তিনি কদু কবিরাজকে অনুনয়-বিনয় করেছেন, যেন এর একটা শক্ত বিহিত করা হয়। 

আগামী সপ্তাহে কদু কবিরাজ এসে বাড়িতে একটা বড়সড় ঝাড়ফুঁকের আসর বসাবেন। তিনি এখন বিশেষ কাজে চট্টগ্রামে আছেন৷ লোকটাকে এনে মা বাড়িতে আবার কী যে কুরুক্ষেত্র বাঁধাবে, তা ভেবেই সিমরান মনে মনে তটস্থ হয়ে আছে। 

সিমরান রুমের চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে মোক্ষম প্রশ্নটা করেই বসল, “বস্তিতে তোর কী?”

সরাসরি প্রশ্নে ইউসুফ খানিকটা ভড়কে গেল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলেও আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল, “বুঝিনি।”

“তোকে প্রায়ই বস্তির ভেতর ঢুকতে দেখা যায়, আবার বেরোতেও দেখা যায়। কেন যাস ওখানে? কী করিস ওই বস্তিতে?”

ইউসুফ নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল, ‘এমনিই যাই।’’

সিমরান আজ কোনো হুলস্থুল না করে মাথা ঠান্ডা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, ইউসুফ আগের মতো নেই। এখন ও’কে থাপ্পড় মেরে বা চিল্লাচিল্লি করে মনের কথা বের করা যাবে না। 

সিমরান গলার স্বর আরও খানিকটা নামিয়ে নরম সুরে বলল, “এমনি এমনি কেউ বস্তিতে যায় না। দেখ ইউসুফ, প্রেম-ভালোবাসা খারাপ জিনিস না। প্রেম আমিও করেছি। তার জন্য পুরো ফ্যামিলির মারও খেয়েছি। তোর দুলাভাইয়ের বংশ ভালো হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের চেয়ে টাকাপয়সা কম থাকায় আব্বা কিছুতেই আমাদের বিয়ে দিতে চাননি। দিনের পর দিন আমাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। শেষমেশ যখন তোর দুলাভাইয়ের লন্ডনের ভিসা হলো, তখন আব্বা বাধ্য হয়ে মাথা নিচু করে সম্পর্কটা মেনে নিলেন।”

সিমরান খাট থেকে উঠে ইউসুফের মুখোমুখি দাঁড়াল। বলল, “নিজের পরিবার সম্পর্কে তুই খুব ভালো করেই জানিস। তাই নিজের লাইফ পার্টনার সিলেক্ট করার ক্ষেত্রে তোর সতর্ক থাকা উচিত। বস্তির কোনো মেয়েকে আমাদের বাড়ির কাজের লোকও কোনোদিন তোর বউ হিসেবে মেনে নিবে না। আর সেটা যদি হয় ঝিলপাড় বস্তি...যেখানে শুধু নোংরামি, চুরি-চামারি লেগে থাকে, তাহলে তো কথাই নেই! আমাদের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে।”

ইউসুফ বরাবরের মতোই কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না। তর্কে না জড়িয়ে চুপচাপ মৌনতা অবলম্বন করাই ওর স্বভাব। তাছাড়া ও মনে মনে এমন একটা পরিস্থিতির আশঙ্কা আগে থেকেই করছিল। কেউ না বুঝলেও, তার চলন-বলন আর চেহারার পরিবর্তন দেখে সিমরান আপু যে ঠিকই অনেক দূর আঁচ করে ফেলবে, তা সে জানত। তার ওপর আপু তার অলক্ষ্যে ফোনটাও ঘেঁটে দেখেছে! সবটা ধরে ফেলা সিমরানের জন্য মোটেও কঠিন ছিল না।

সিমরান চোখ দুটো ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তখন তোর সামনে দুটো উপায় খোলা থাকবে। প্রথমটা হচ্ছে, বস্তির যে মেয়েই হোক, তাকে নিজের জীবন থেকে চিরতরে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে, এই বাড়ি, এই পরিবার ছেড়ে ওর সাথে গিয়ে আলাদা সংসার পাতা। তুই যদি বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভুলেও মাথায় আনিস, তবে কিন্তু এই বাড়িতে একসাথে কয়েকটা লাশ পড়ে যাবে। তুই ওদের কারণে কখনোই শান্তিতে সংসার করতে পারবি না।”

ইউসুফ এবারও পাথরের মতো নিশ্চল। 

ওর নীরবতা সিমরানের ভেতরের উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সিমরান দম নিয়ে বলল, “আম্মার আলমারি থেকে এ পর্যন্ত মোট কত টাকা খরচ করেছিস?”

ইউসুফ বাহানার আশ্রয় নিল না। বোনকে সরাসরি জবাব দিল, “এক লাখ ষাট হাজার।”

“সব টাকা ওই মেয়ের পেছনে ঢেলেছিস?”

“না। ওর জন্য এক লাখ চল্লিশ হাজার চারশো চল্লিশ টাকা খরচ হয়েছে।”

হিসাব ইউসুফ নিজে করেনি। জামিলের থেকে কাজলী পুরো হিসাবটা বের করেছিল। ও এমন দাপট নিয়ে জামিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল যে, জামিলকে বাধ্য হয়ে পাই পাই করে সব হিসাব বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল। কাজলীর কাছ থেকেই ইউসুফ পরে জানতে পারে যে তার জন্য ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছে। 

সিমরান জিজ্ঞেস করল, “বাকি টাকা কোথায়?”

“কিছু টাকা যাতায়াত আর টুকটাক প্রয়োজনে খরচ হয়েছে। আর বাকি বিশ হাজার টাকা আমার টেবিলের ড্রয়ারে রাখা আছে।”

সিমরান কপালে হাত দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “আম্মা কিন্তু এখনো আলমারির টাকার গড়মিলটা টের পায়নি। বড় মামাকে ধার দেবে বলে টাকাটা আলাদা করে জমিয়ে রেখেছিল। মাসশেষে গোনার সময় যখন দেখবে এতগুলো টাকা হাওয়া, তখন কী উত্তর দিবি তুই?”

ইউসুফ এবারও যথারীতি নিশ্চুপ। 

সিমরান কিছুক্ষণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “মেয়েটা কে? নাম কী ওর?”

ইউসুফ কোনো জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। ওর চুপ থাকার রোগটা আসাদুল চাচার অসমাপ্ত বিল্ডিংয়ের ঘটনার পর থেকেই পেয়ে বসেছে৷ কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে মন না চাইলে, একদম বোবাদের মতো নিশ্চুপ হয়ে যায়। 

সিমরান মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগল। মেয়েটা কি সত্যিই ঝিলপাড় বস্তিতেই থাকে? তার মনের ভেতরের সন্দেহটা ক্রমশ বিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। কারণ দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে আন্দাজে বস্তির কথা তোলার পর ইউসুফ একবারের জন্যও কোনো প্রতিবাদ বা অস্বীকার করেনি! তাছাড়া বস্তিতে কিছু সুন্দরী মেয়ে আছে। ওরা সহজেই ইউসুফের মতো সহজ-সরল ছেলেকে ফাঁদে ফেলতে পারে।

ঘর থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও সিমরান দরজার চৌকাঠে এসে থমকে দাঁড়াল। কী যেন একটা বিদ্যুৎ চমকের মতো ওর তীক্ষ্ণ মাথায় খেলে গেল। ও ঝট করে ঘুরে ইউসুফের মুখের দিকে তাকাল। বলল, “মেয়েটা যেন কোনোভাবেই কাজলী না হয়, ইউসুফ!”

ইউসুফের বুকের ভেতরটা ধড়াম করে কেঁপে উঠল। ভাবতে ভাবতে আপু গন্তব্যেই পৌঁছে গেল!  

ইউসুফ যেভাবে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো বসা ছিল, ঠিক ওভাবেই নিথর হয়ে রইল। 

ভাইয়ের চেহারায় নির্লিপ্ত ভাব দেখে সিমরান মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বাঁচা গেল! মেয়েটা অন্তত কাজলী না! কাজলীর এমনিতেই অনেক বদনাম। সারাক্ষণ বাইরে বাইরে ছুটে বেড়ানো স্বাধীনচেতা মেয়েদের না চাইতেও সমাজ অনেক চারিত্রিক কলঙ্ক লেপে দেয়। কাজলীর পুরো জীবনটাই লড়াইয়ের। এমন একটা মেয়ের সাথে যদি কোনোভাবে তার সরল-সোজা ভাইটার জীবন জুড়ে যায়, তবে ইউসুফের সুন্দর ভবিষ্যৎটা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাছাড়া কাজলীর মতো একরোখা, জেদি মেয়েকে ভালোবাসার মানে হলো, তার সাথে সাথে তার পঙ্গু বোন আর জরায়ু রোগে আক্রান্ত মায়ের আজীবনের ভরণপোষণের দায়িত্বটাও নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। এত কঠিন বোঝা তার মাসুম, দুনিয়াদারী না বোঝা ভাইটা কোনোদিনও বইতে পারবে না। বাস্তবতার কড়াঘাতে পিষ্ট হয়ে নিভে যাবে।

সিমরান মনে মনে কাজলীকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

ইউসুফ যখন মায়ের ঘরে ঢুকল, সাবিনা তখন জানালার পাশে গম্ভীর মুখে বসেছিলেন। ছেলে ঘরে এসেছে টের পেয়েই তিনি অভিমানে কাঁথা গায়ে দিয়ে উল্টো ফিরে শুয়ে পড়লেন।

ইউসুফ কোনো উচ্চবাচ্য করল না। ও নিজের শার্টটা খুলে মায়ের পছন্দের ঢোলাঢালা গেঞ্জিটা গায়ে চড়িয়ে নিল।

ইউসুফের বুঝ হবার পর থেকেই একটা নিয়ম ছিল, ইউসুফ গোসল করে বেরোনোর পর ও ঠিক কোন গেঞ্জিটা পরবে, কোন পোশাক পরবে সাবিনাই সেটা ঠিক করে বিছানায় রেখে যেতেন। অথচ গত কয়েকটা দিন ধরে ইউসুফ মায়ের রেখে যাওয়া পোশাক উপেক্ষা করে নিজের পছন্দমতো পোশাক পরছে। ওর এই খেয়ালখুশিমতো চলাটা সাবিনার মাতৃত্বের অহংকারে আঘাত করেছে। 

মায়ের বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে ইউসুফের মায়া হলো। সে সাবিনার পায়ের কাছে বসে ওনার ফুলে থাকা পা দুটো টেনে নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, “কষ্ট পাবেন না আম্মা। ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারিনি আমার সামান্য খামখেয়ালিতে আপনি এতটা কষ্ট পাবেন। আপনি যদি চান, আপনি যদি আদেশ করেন, আমি রাজকুমারীর মতো নেংটি পড়েও ঘুরে বেড়াতে পারব! প্লিজ আম্মা, এভাবে রাগ করে থাকবেন না।”

সাবিনা ওভাবেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে শুয়ে রইলেন, ছেলের দিকে ফিরেও তাকালেন না। 

ইউসুফও সহজে দমবার পাত্র নয়। ও মায়ের পা দুটো কোলে নিয়ে ওনার মান ভাঙাতে একের পর এক শৈশবের মজার মজার কাণ্ডগুলো বলতে লাগল৷ একের পর এক গল্প বলে যাওয়ার পরও যখন মায়ের মুখের অভিমানের বরফ গলল না, তখন ইউসুফ হুট করেই সাবিনার পায়ের তালুতে সুড়সুড়ি দিয়ে বসল!

আচমকা সুড়সুড়িতে সাবিনা চমকে উঠলেন। পা দুটো টেনে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলেন। ইউসুফ হো-হো করে হেসে উঠল। ছেলের মনভোলানো হাসির শব্দে সাবিনার বুকের ভেতর জমে থাকা সব রাগ, অভিমান পলকের মতো হাওয়া হয়ে উড়ে গেল। তিনিও হেসে ফেললেন। বিছানায় উঠে বসে ইউসুফের বাহুতে থাপ্পড় মেরে বললেন, “আহা ছাড়, ছাড়! মাকে আর কত জ্বালাবি? বদমাশ, ছাড়।”

“যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন জ্বালাব।”

“তাহলে একশো বছর বাঁচ।”

“আপনিও আরও একশো বছর বাঁচুন আম্মা।”

সাবিনা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, “কাল কিন্তু ভুল করেও কোথাও যাবি না। বাড়িতে অনেক মেহমান আসবে।”

ইউসুফ মায়ের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে ভরসা দেওয়ার মতো করে বলল, “কাল ইউসুফ একদমই বাড়ির বাইরে যাব না। প্রমিস!”

বিকেলবেলা। দুপুরের কড়া রোদটা মরে গিয়ে বিকেলটা এখন বেশ চমৎকার হয়ে এসেছে।
ইউসুফ সাতকাহন রেস্টুরেন্টের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। যেতে যেতে ও খেয়াল করল, দূরের চায়ের টং দোকানটায় আশিক তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ওরা সবাই মিলে গলা ফাটিয়ে একটা গান গাইছে, “বুকে চিনচিন করছে হায়, মন তোমায় কাছে চায়…”

গানটি অনেক পুরনো হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে আফরান নিশো ও মেহজাবিনের একটা নাটকের মাধ্যমে। বর্তমানে ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামের রিলসে রিলসে এই গানটাই ঘুরছে। 

আশিকের শরীরটা একদম জীর্ণ-শীর্ণ, চোখের চারপাশটা কোঠরে ঢুকে গেছে, গালের চাপা দুটো ভাঙা। নেশাখোরদের যেমন দেখায়, ঠিক তেমন দেখতে। তার ওপর মাথার চুলগুলো অদ্ভুত একটা কায়দায় কালার করা। 

ইউসুফকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আশিক উৎসুক হয়ে ওর পাশে বসা সাগরেদটার দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, “এই হালার পুতের সমস্যা কী? কয়দিন ধরে দেখতাছি, ও আমার দিকে কেমন ফ্যাঁকফ্যাঁক কইরা তাকায়া থাকে।”

পাশের ছেলেটা দাঁত বের করে হেসে বলল, “গে মনে হয়। তোরে পছন্দ করে।” 

আড্ডার সবাই একসাথে হো-হো করে হেসে উঠল৷ আশিকও হাসল। রেগে যাওয়ার বদলে মনে মনে গর্ববোধ করল। 

ইউসুফ সাতকাহনে ঢুকতেই জামিল ওর হাতে একটা চিরকুট গুঁজে দিল। চিরকুটের ওপর একটা ফোন নম্বর লেখা। ইউসুফ নম্বরটা পকেটে পুরে নিল। তারপর রেস্টুরেন্টের হইচই এড়িয়ে একটু নিরিবিলি হওয়ার জন্য পাশের পার্কে চলে গেল। 

নম্বরটা ওর স্কুলজীবনের বন্ধু সাদমানের বাবার। তিনি বর্তমানে র‍্যাবের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। কাজলীর বিষয়টা নিয়ে ওনার সাথে কথা বলবে বলেই ইউসুফ অনেক কষ্ট করে নম্বরটা জোগাড় করেছে। 

ওনার মতো ক্ষমতাধর আইনের লোক যদি কাজলীর পাশে দাঁড়ায়, তবে আর কোনো দুশ্চিন্তাই থাকবে না। ইউসুফকে উনি স্কুলজীবনে অসম্ভব পছন্দ করতেন। ইউসুফ ছিল ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত, ভদ্র আর মেধাবী ছেলে। সবাই কাজলীর চরিত্রে যতই কলঙ্ক লেপে দিক না কেন, ইউসুফ যদি নিজে গিয়ে ওনাকে পুরো সত্যটা খুলে বলে, তবে তিনি ইউসুফের কথার ওপর ভরসা করবেন। কাজলী আর ওর পরিবারকে আইনি নিরাপত্তা দেবেন। 

অনেক আশা নিয়ে ইউসুফ নম্বরটাতে কল করল। দুর্ভাগ্যবশত ওপাশ থেকে কেউ ফোনটা রিসিভ করল না। ও আরও কয়েকবার চেষ্টা করল।

কোনো উপায় না দেখে সাদমানকেই কল দিল। স্কুল ছাড়ার পর ওদের মধ্যে আগের মতো যোগাযোগ নেই। ওরা বেশ ভালো বন্ধু ছিল। ক্লাসে ওদের রোল নম্বরও থাকত একদম পাশাপাশি। ইউসুফের রোল যদি হতো এক, তবে সাদমানের রোল হতো দুই। 

সাদমান ফোন ধরেই বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। কুশল বিনিময়ের পর ইউসুফ যখন ওর বাবার ব্যাপারে জানতে চাইল, সাদমান জানাল, ওর বাবা বর্তমানে একটা বিশেষ অফিশিয়াল অপারেশনে ঢাকার বাইরে যশোরে আছেন। আগামী রোববার বিকেলের আগে ওনার সিলেট ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে সাদমান ইউসুফকে আশ্বস্ত করে বলল, “রোববার বিকেলে বাবা ফিরলেই তুই আমাদের বাসায় চলে আসিস। আমি বাবাকে আগে থেকেই তোর কথা বলে রাখব, চিন্তা করিস না।”

ইউসুফ সাদমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে কল কেটে দিল। মনটা কিছুটা দমে গেলেও হাল ছাড়ল না। পার্ক থেকে বেরিয়ে জামিলকে সাথে নিয়ে জিন্দাবাজারের দিকে রওনা দিল। রাজকুমারীর জন্য উপহার কিনতে হবে।

শুক্রবার। সিমরানের মেয়ে রাজকুমারীর অন্নপ্রাশন। সকাল থেকে বাড়িটায় উৎসবের ঢল নেমেছে। চারদিকে এলাহী কাণ্ড! বাড়ির কাজের লোকরা ব্যস্ত রুপোর থালাবাসন মাজতে, ক্যাটারিং সার্ভিসের কর্মীরা ব্যস্ত হরেক পদের রাজকীয় খাবার সাজাতে। 

দিনটি উদযাপনের জন্য সাবিনা-মুরতাজার বাকি পাঁচ মেয়েও তাদের স্বামী, ছেলেপুলে নিয়ে বাপের বাড়ি এসে হাজির হয়েছে। 

ছয় বোনের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী শ্বশুরবাড়ি জুটেছে মেজ বোন শবনমের কপালে। শবনমের শ্বশুর হলেন সিলেটের বিখ্যাত ‘চৌধুরী গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ওনার চার ছেলে ও এক মেয়ে। পুরো সিলেটে এক ডাকে সবাই ওনাদের চেনে। সিলেটে ওনাদের নিজস্ব ৭টি বিশাল চা-বাগান, একটি মাল্টিস্পেশালিটি বেসরকারি হাসপাতাল, দুটি আন্তর্জাতিক মানের পাঁচতারকা হোটেল আর বড় একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানি রয়েছে। শুধু দেশেই নয়, যুক্তরাজ্যেও (ইউকে) ওনাদের বিশাল আবাসন ও নামকরা হোটেল ব্যবসা আছে। পুরো সিলেট অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী, বিত্তবান পরিবারগুলোর একটি হিসেবে ওনারা গণ্য হন।

শবনমের শ্বশুর-শ্বাশুড়ি বিয়ের পর বেয়াই বাড়িতে সেভাবে আর আসেননি। সবসময় নিজেদের কর্পোরেট ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন ওনারা, বছরের বেশিরভাগ সময়টাই কাটে লন্ডনে। আজ অবসর মেলায় বেয়াই-বেয়াইনকে দেখতে হঠাৎ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন। 

চৌধুরী দম্পতিকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে সাবিনা-মুরতাজার আনন্দের সীমা রইল না! ওনাদের আগমনে পুরো বাড়িটা মুহূর্তের মধ্যে জমকালো বিয়ে বাড়ির মতো রমরমা হয়ে উঠল। 

শুধু ওনারাই নন, বাকি বোনদের শ্বশুর-শাশুড়ি, জা, দেবর, ননদরাও এসেছে। কুরেশি বাড়ি আজ লোকে লোকারণ্য, চারদিকে শুধু আনন্দ আর হই-হুল্লোড়।

মেহমানদারী পর্ব শেষ হলে সাবিনা বেশ গর্ব নিয়ে বেয়াই-বেয়াইনসহ অন্যান্য বিশেষ অতিথিদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হলেন। নিজেদের বিশাল জায়গা-জমি, সাজানো বাগানবাড়ি ঘুরে দেখানোর পাশাপাশি ওনারা কোথায় কী নতুন প্রজেক্ট করার পরিকল্পনা করছেন, সেসব আভিজাত্যের গল্প বেশ রসিয়ে রসিয়ে আলোচনা করছিলেন।

বিশাল দলটা যখন খোশগল্প করতে করতে বস্তির সীমানার কাছাকাছি বড় রাস্তাটা দিয়ে হাঁটছিল, তখন শবনমের ননদ নওমি হঠাৎ কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করে বসল, “আচ্ছা আন্টি, এই বস্তিতেই কি কাজলী বিনতে মালেক নামের ভাইরাল মেয়েটা থাকে?” 

ইউসুফের বাড়ির সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বাতাসটা আচমকা কেমন থমথমে হয়ে উঠল। পরিবারের সবার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, কাজলীর কারণে তাদের পুরো এলাকার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে!

শবনম গুমোট ভাবটা কাটাতে জোর করে হেসে বলল, “হ্যাঁ, এখানেই থাকে।”

সাবিনা নিজের ভেতরকার ক্ষোভ কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারলেন না। তিনি আঁচল ঠিক করতে করতে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, “ওরা যদি ভাড়াটিয়া হতো বেয়াইনসাব, এতদিনে ঘাড় ধরে, লাথি মেরে বস্তি থেকে বের করে দিতাম! কিন্তু আমাদের কপালটাই খারাপ, বাড়ি আর জায়গা দুটোই ওদের নিজেদের নামে কেনা। ওর বাপ-দাদা ছিল জুয়াখোর! জুয়া খেলে কোনোমতে জায়গা কিনে মালিক বনে গেছে।”

শবনম পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘোরাতে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওসব কথা বাদ দিন তো আম্মা! আব্বু, আম্মু চলুন না, আমরা ওদিকের বাগানটার দিকে যাই। ওখানে আব্বা একটা বিশাল পুকুর করেছেন। কত বড় বড় মাছ চাষ করা হয় সেখানে, দেখলে আপনাদের ভালো লাগবে।”

শবনমের কথায় সবাই কাজলীর প্রসঙ্গ ভুলে বাগানের দিকে হাঁটা ধরল।

ইউসুফ সাতকাহনের দিকে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে বড়দের সালাম দিয়ে গেল৷ নওমি অপলক চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ইউসুফের লম্বা, সুদর্শন অবয়বটা নওমির মনে দোলা দিল! 

শবনম নওমির মুগ্ধ দৃষ্টি খেয়াল করে হাসল। ওর প্রথম থেকেই মনে মনে ইচ্ছে ছিল, নওমি যখন বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছাবে, তখন ও ইউসুফের সাথেই নওমির বিয়ে দেবে। এতে দুই পরিবারের বন্ধনটা আরও বেশি শক্ত হবে। 

চৌধুরী সাহেবও সকাল থেকে ইউসুফের শান্ত, পরিপাটি আর বিনয়ী আচরণ লক্ষ্য করছিলেন। ছেলেটির চমৎকার মার্জিত রুচি আর শুদ্ধ কথাবলা দেখে তিনি মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। তিনি সবার সামনে মুখ ফুটেই বলে ফেললেন, “ইউসুফের মতো ছেলে আজকাল সত্যিই কম দেখা যায়। ভীষণ লক্ষ্মী আর শান্ত একটা ছেলে।”

বেয়াইয়ের মুখে ছেলের প্রশংসা শুনে সাবিনা গদগদ হয়ে উঠলেন। গর্বে বুক ফুলিয়ে বললেন, “আমার ইউসুফের মতো ছেলে এই দেশে তো দূর, পুরো পৃথিবীতেও আপনি আরেকটা খুঁজে পাবেন না বেয়াইনসাব। এত বাধ্য আর এত লক্ষ্মী একটা সন্তান আল্লাহ আমার কোলে দিয়েছেন! ওর সমবয়সী ছেলেদের কত রকম খারাপ সঙ্গ থাকে, কত বাজে অভ্যাস আর উগ্রতা থাকে, কিন্তু আমার ইউসুফের এসবের কিচ্ছু নেই। আজ পর্যন্ত এই এলাকায় ওর নামে কোনোদিন একটা বিচার পর্যন্ত আসেনি। ও জীবনে কোনোদিন কোনো মানুষকে কষ্ট দিয়ে চড়া গলায় কথা বলেনি। একদম নিরীহ আর নিষ্পাপ ছেলে আমার।”

চৌধুরী সাহেব মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে বললেন, “ওর চোখ দুটো দেখেই আসলে বোঝা যায় ভেতরটা কতটা পরিষ্কার।”

সাবিনা আবেগপ্রবণ হয়ে বলে যাচ্ছেন, “অল্প বয়সে ছেলেরা কত অবাধ্যতা করে, কত ছটফটে হয়। এটা চাই, ওটা চাই বলে মা-বাবার পকেট খালি করে ফেলে। কিন্তু আমার ইউসুফের মধ্যে কোনোদিন কোনো লোভ ছিল না, কোনো জেদ ছিল না। এই যুগে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়া ছেলেরা কত কী আজেবাজে কাজ করে বেড়ায়। কিন্তু আমার ছেলে কখনো একটা মেয়ের সাথে যেচে কথা পর্যন্ত বলেনি! এতটাই লাজুক ও। এমন যুগে আল্লাহ যে আমার গর্ভে এমন একটা মানিক দিয়েছেন, তার জন্য আমি আল্লাহর দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া আদায় করি।”

“শুকরিয়া বেয়াইন, শুকরিয়া। আসলেই আপনি ভাগ্যবান।” চৌধুরী সাহেব মৃদু হেসে মন্তব্য করলেন।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শবনমের শাশুড়িও এবার সাবিনার কথায় সুর মিলিয়ে বললেন, “সত্যিই বেয়াইন, আপনার তো প্রতিদিন নিয়ম করে শুকরানার নামাজ পড়া উচিত। আমি তো শবনমের মুখে প্রায়ই ওর ছোট ভাইয়ের গল্প শুনি। কী লক্ষ্মী আর সোনা একটা ছেলে পেয়েছেন আপনি! মায়ের গর্ভকে ধন্য তো আসলে এমন সোনার ছেলেরাই করে। আজকালকার ছেলেরা তো মা-বাবার রক্ত চুষে খায়!”

বাকি বোনরাও ভাইয়ের জয়জয়কার শুনে একে একে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে লাগল। 

সবার মুখে ইউসুফের গুণগানের জোয়ার দেখে সাবিনার মুখটা অহংকারে, সুখে চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। মা হিসেবে ওনার জীবনটা আজ যেন পুরোপুরি সার্থক হলো।

ঝিলপাড় বস্তির অন্য প্রান্তে তখন এক ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার মাঠকর্মী এসেছেন সপ্তাহের কিস্তির টাকা তুলতে। বস্তির অভাবী মানুষগুলো সারাদিন বাইরে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রাতে ঘরে ফেরে। তাই তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করে প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার দুপুরের পরই কিস্তি আদায় করতে আসেন তিনি। 

বস্তির মাঝখানের খোলা জায়গাটায় একটা পুরোনো কাঠের টেবিল আর চেয়ার নিয়ে বসেছেন সেই কর্মকর্তা। সামনে কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার জন্য লম্বা লাইন ধরে বস্তির মহিলারা মাটিতে পাটি বিছিয়ে বসে আছেন। একজন একজন করে নাম ডাকতেই তারা উঠে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে সই দিচ্ছে। পুরো লাইনে পুরুষ মানুষ মাত্র দুজন। তার মধ্যে একজন হলেন সাহেব চাচা।

দুজন মহিলা সাহেব চাচাকে নিয়ে নিচু স্বরে কানাঘুঁষা করছিল। একজন ফিসফিস করে বলল, “বু, সাহেব চাচার তো নিজের কোনো পরিবার নাই, বউ-পোলাপান কিচ্ছু নাই। উনি প্রতিবছর এত এত লোন নিয়া কী করে? লোন নেন, আবার কিস্তি শোধ করেন, তারপর আবার নতুন লোন তোলেন। এত টাকা উনি কারে দেন?”

সেখানে কিস্তি দিতে এসেছেন ঝুনুবিবিও। তিনি একটা বড় অঙ্কের লোন নিয়েছেন। কিছুদিন আগে ওনার ছেলে শাহপরান একটা জমি কিনেছে, সেখানে কিছু টাকা কম পড়ায় ঝুনুবিবি নিজের নামে লোনটা তুলেছিলেন।

ওনার পাশে বসা বস্তির এক মুখরা মহিলা ঝুনুবিবির মন পাওয়ার জন্য সাহেব চাচার দিকে ইঙ্গিত করে মুখ খুলল, “তোরা চোখ থাকতেও দেহোচ না, বুঝোচও না! সাহেব ভাই তো সব টেকা ওই জোহরারেই দেয়।
জোহরার ভাতার এই বুইড়া!” 

ঝুনুবিবি মুখের পানের লাল পিকটা মাটিতে থুঃ করে ফেলে তিতকুটে গলায় বললেন, “মায়ের মতোই হইছে দুইডা মাইয়া। বড়টারে তো জামাই পঙ্গু বানাইয়া পাঁচ বছর আগে ফালায়া থুইয়া গেছিল। এখন দেখি হুট কইরা পাঁচ বছর পর পেট বাধাইছে! কার বাচ্চা পেটে নিয়া ঘুরতাছে আল্লাহই ভালো জানে। মুখে কয়, ওর জামাইয়ের বাচ্চা। আরে পাঁচ বছর পর জামাই কি আকাশ থেইকা আইল নাকি? জামাই আইলে আমরা বস্তির একটা মানুষও ওরে দেখলাম না কেন? আর ছোটডি... ওই কাজলী তো আস্ত একটা বেশ্যা! আমার সোনার পোলারে চুইষা খাইতে চাইছিল। পারে নাই।”

পাশ থেকে বস্তির এক বুড়ি খোঁচা মেরে বলে উঠলেন, “তুমি তো দেহি ঝুনু কিছুরই খবর রাহো না। কাজলী এহনো তোমার ছেড়ারে চুইষাই খাইতাছে!”

ঝুনুবিবির মুখটা কালো হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। তিনি চোখ দুটো বড় বড় করে বললেন, “এই কথা কেন কইলেন বুবু? আশিক কি ওরে গোপনে কিছু দিছে? কোনো টাকা-পয়সা বা সোনা-দানা?”

ঝুনুবিবি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন। আশিক মেয়েদের পেছনে দেদারসে টাকা উড়ায়, এটা সত্যি। জীবনে নিজের জন্মদাত্রীকে একটা শাড়ি পর্যন্ত কিনে দেয়নি, অথচ মেয়ে পটাতে গেলে দামী সোনা-দানাও উপহার দিয়ে বসে। যদিও তিনি ভালো করেই জানেন, আশিকের সাথে কাজলীর কোনো গোপন সম্পর্ক কোনোদিনই ছিল না। কাজলীকে সমাজচ্যুত করার জন্য আর ওর জেদটা ভেঙে গুঁড়ো করার জন্য ঝুনুবিবি, আশিক আর কাশেম মিলে পুরো বস্তিতে মিথ্যা রটিয়েছেন। তবুও ওনার মনে খটকা লাগল, কাজলী কি ওনাদের ওপর জেদ ধরে, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আশিককে কোনো জাদু-টোনা বা বশ করিয়েছে? আশিক এমনিতে বেপরোয়া আর উগ্র হলেও ভেতরটা বড্ড সহজ-সরল। কাজলীর পেছনে ও গত কয়েকটা বছর ধরে প্রায় পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাজলী যদি নিজে থেকে একটুখানি ইশারাও দেয়, আশিক নির্ঘাত ওর পায়ে গিয়ে দাস হয়ে বসে থাকবে কিছুদিন। তারপর হয়তো নতুন কোনো সঙ্গ খুঁজবে, কিন্তু কয়েকটা দিন তো দাস হয়েই থাকবে!

বুড়ি লাইনে বসা বাকি মহিলাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের গলাটা আরও একটু উঁচিয়ে বললেন, “কয়দিন আগে কাজলী অত বড় পাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছিলো, হাসপাতালের এত বিল কে দিছে ভাইবা দেখছো কেউ? ওইডা তো তোমার পোলার টাকা দিয়াই শোধ হইছে!”

ঝুনুবিবি রাগে, বিস্ময়ে থমকে গেলেন। 

“কী আজেবাজে কতা কন বুবু! মাথা খারাপ হইছে আপনের? কাজলী যহন ডেঙ্গু হইয়া হাসপাতালে মরে মরে, তহন আমার আশিক এই এলাকায় আছিলই না। ও তো তহন বন্ধুদের লগে কক্সবাজারে আছিলো।”

“কক্সবাজার আছিলো না সিলেটেই লুকায়া আছিলো, হেইডা আল্লাই ভালা জানে।”

বুড়ির চোখে ছানি পড়েছে বহু বছর আগে। দূর থেকে যেকোনো আবছা অবয়ব দেখলেই তিনি নিজের কল্পনাশক্তির রঙ চড়িয়ে সেটাকে মনগড়া রূপ দিয়ে দেন। 

তিনি চোখের কোণটা কুঁচকে, আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগলেন, “আমি কইতাছি ঝুনু, ও সিলেটেই আছিলো। আমি নিজের চোখে হাসপাতালে দেখছি! আমার বড় ছেড়ির ভাসুরের না ডেঙ্গু হইল, ওরে দেখতে গেছিলাম না? আজকে সকালে তোমার পোলা আশিক যে বেগুনি শাট পরছে, ওইডাই পরা আছিলো। শাট দেইখাই আমি চিনছি ওইডা আশিক। আমি ভুল দেহি নাই।”

বুড়ি দূর থেকে হাসপাতালের ওয়ার্ডে বেগুনি রঙের শার্ট পরা যে ছেলেটিকে কাজলীর পাশে বসে থাকতে দেখেছিল, সে ছিল ইউসুফ! কাজলীর কাছে এক ছেলে বসে ছিল, সেটাই এতদিন ওনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আজ আশিকের পরনে একই রঙের শার্ট দেখে মাথার ভেতর দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষকে এক করে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছেন বুড়ি!

চুরানব্বই বছর বয়সের বুড়ির যে যেকোনো ঘটনা গুলিয়ে ফেলার স্বভাব সেটা সবারই জানা৷ তবুও ওনার বলার ঢং দেখে মাঝেমধ্যে সবাই বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ওনাকে নিয়ে একটা কাহিনি এখনো বস্তির মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। 

দুই বছর আগে শীতের রাতের ঘটনা। বস্তির মোড়টায় তখন আবছা অন্ধকার। বস্তির কাঞ্চন ছেলের আকিকার জন্য একটা বেশ হৃষ্টপুষ্ট সাদা রঙের ছোট খাসি কিনে রিকশা করে নিয়ে আসছিল। খাসিটা যাতে লাফিয়ে না পড়ে, সেজন্য সেটিকে একটা লাল রঙের চাদর দিয়ে ভালো করে মুড়িয়ে কোলে নিয়ে বসেছিলেন। বুড়ি দূর থেকে নিজের ছানি পড়া চোখ কুঁচকে ঝাপসা আলোয় শুধু লাল চাদরের পুটলি আর কাঞ্চনের সাদা পাঞ্জাবির অবয়বটা দেখেছিলেন। ব্যস, অমনি ওনার মাথার ভেতরের গল্পের মেশিনটা চালু হয়ে গেল! 

তিনি পরদিন পুরো বস্তিতে রটিয়ে দিলেন, “আমি নিজের চোহে দেখছি, কাঞ্চন রাইতের বেলা একটা ধবধবা ফর্সা বাচ্চারে লাল কাফনের কাপড়ে পেঁচাইয়া জবাই করার লাইগা নিয়া যাইতেছে! কাঞ্চনরে শয়তানে ধরছে। হারামজাদা শয়তানের পূজা করে।”

কানকথা শোনামাত্রই পুরো বস্তির হুজুগে মানুষজন কোনো কিছু না ভেবেই লাঠিসোটা আর ইটপাটকেল নিয়ে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছিল। তারা দল বেঁধে কাঞ্চনের ঘরে গিয়েছিল তল্লাশি চালাতে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, ঘরের কোণে একটা হৃষ্টপুষ্ট সাদা খাসি দাঁড়িয়ে আছে আর তার পাশেই পড়ে আছে লাল চাদরটা। 

মুহূর্তেই সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল৷ সে যাত্রায় বস্তির মুরুব্বিরা বুড়িকে আচ্ছা করে ধমক দিয়েছিলেন ওমন ভয়ানক গুজব ছড়ানোর জন্য। কিন্তু বুড়ির স্বভাব তাতে একটুও বদলায়নি৷  

আজও ঠিক তা-ই হলো। সব জেনেও ঝুনুবিবি সন্দেহের ঘূর্ণিপাকে পড়ে গেলেন। আশিক বড্ড অবাধ্য ছেলে। ও যখন বাড়ি থেকে বলে ও ঢাকায় আছে, তখন আসলে থাকে কক্সবাজার। যখন বলে শ্রীমঙ্গল আছে, তখন হয়তো বন্ধুদের সাথে জুয়া খেলতে চলে যায় রাজশাহী। কক্সবাজারে এতদিন ছিল বলে দাবি করলেও, ওখান থেকে তো ওনার সাথে আশিকের একটা দিনও ফোনে কথা হয়নি! তবে কি ও সত্যি সত্যি এতদিন সিলেটে আত্মগোপন করে ছিল? ও কি মা-বাবাকে না জানিয়ে কাজলীর চিকিৎসা করিয়েছে? নয়তো কাজলীর চিকিৎসার এত টাকা কে দিল? সামান্য অসুখ-বিসুখ হলেও জোহরা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ধারের জন্য হাত পাতে৷ এবার তো ও’কে পুরো বস্তির কারও দুয়ারে ঘুরতে দেখা যায়নি!

তাছাড়া আশিক কেন এখনো কাজলীর ওপর কোনো প্রতিশোধ নিল না? যে আশিক দিনদুপুরে মানুষের টাকা খেয়ে রামদা উঁচিয়ে মানুষ পেটাত, যে নিজের সামান্য অপমানের প্রতিশোধ নিতে কখনো ভুলে না, সে কাজলীর হাতে এত বড় অপমানের পর, নিজের বাপ-মাকে জেলে ভরার পরও এতগুলো দিন ধরে হাত গুটিয়ে শান্ত হয়ে বসে আছে কেন? 

বুড়ি হয়তো সত্যিই কিছু একটা দেখেছে। ওনার চোখ ছানি পড়া হতে পারে, কিন্তু ওনার সন্দেহটা তো মিথ্যে নাও হতে পারে! 

ঝুনুবিবি কিস্তির লাইনের মাঝখানেই ব্যাগ থেকে ফোনটা বের আশিকের নম্বরে ডায়াল করলেন। দুর্ভাগ্যবশত ওপাশ থেকে বারবার একটা আওয়াজই শোনা গেল, 

‘আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।’’

ঝুনুবিবির মাথার সব রক্ত এক নিমেষে চড়ে গেল। রাগে শরীর কাঁপতে লাগল। যে মেয়ের কারণে ওনারা পুরো সমাজে এত অপমানিত হলেন, জেল খাটলেন, ওনার নিজের পেটের পোলা নাকি এখনো আড়ালে আবডালে গিয়ে সেই মেয়ের পা চাটে! 

তিনি রাগে আগুন হয়ে ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে চারপাশের সবাই উৎসুক হয়ে তাকাল। ইউসুফদের বাড়ির এক কাজের মেয়েও ওখানে উপস্থিত ছিল। কিছুক্ষণ পর তার মাধ্যমেই এই সন্দেহের মঞ্চ রমরমা হয়ে উঠবে৷ এখানে এসে বাকবিতন্ডায় জড়াবে বনেদি পরিবারের মেয়ে-বউরাও৷ 

ঝুনুবিবি সবাইকে শুনিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দশ বছরের একটা মেয়েকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে বললেন, “সুমাইয়া, কাজলীর মারে গিয়া ক, আমি ওরে ডাকতাছি! এক্ষুণি আমার বাড়ির উঠানে আসতে ক।”

জটলার দুই-তিনজনের খুব বলতে ইচ্ছে করল, বুড়ির কথা বিশ্বাস না করতে। কিন্তু ঝুনুবিবির চণ্ডাল রাগ দেখে কেউ মুখে কিছু বলতে সাহস পেল না৷ এখন যদি ওনাকে থামাতে যায়, তবে ঝুনুবিবি উল্টো ভেবে বসবে, তারা কাজলীর পক্ষ নিচ্ছে! কী দরকার যেচে কারো ক্ষোভে পড়ার? 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp