আসমা চলে গেছে আগেই। জুনায়েদ ছিলো, রিপনকে সাহায্য করার জন্য। মারুফকে হুইল চেয়ার থেকে তুলে বিছানায় শোয়ানো হয়েছিলো। ঘাড়টা একেবারে বেকায়দা হয়ে পড়েছিলো বালিশে। মারুফ তখনই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললেন। শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। চোখ উল্টে গেলো প্রায়।
তখনই রাবেয়ার চিৎকার শুনে দুই মেয়ে এ ঘরে ছুটে আসে। কিছু মুহূর্ত হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর মৌমিতা দ্রুত গিয়ে মারুফের হাত মালিশ করতে শুরু করে। ভয়ার্ত স্বরে ডেকে ওঠে, “আব্বা?”
মারুফ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো তাকে ঠিকঠাক শোয়ানোর জন্য। মার্জিয়া দূরে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে। কনুইয়ের ভাঁজে দ্রুত চোখ মুছে সে টলতে টলতে আব্বার কাছে এসে দাঁড়ায়। দোয়া পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুই করা হয়ে ওঠে না ঠিকভাবে। সামনের সবকিছু অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, ভূমিকম্প হচ্ছে যেন।
মার্জিয়া শূন্য দৃষ্টি চেয়ে থাকে মারুফের দিকে। হুট করেই বলে ওঠে, “মামা? আব্বার মাথাটা একটু উঁচু করে ধরেন, বালিশসহ।”
রিপন পা মালিশ করছিলো। তার আসার অপেক্ষা না করে, জুনায়েদ নিজেই মারুফের মাথা উঁচু করে ধরলো। মার্জিয়া তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো, “ওভাবে না! ঘাড়সহ... আস্তে...”
জুনায়েদ তার নির্দেশ মতো ধীরে ধীরে মাথাটা উপরে তুললো। পিঠের নিচে বালিশ গুঁজে আধশোয়া করে বসানো হলো মারুফকে। কাঁপুনি থামলো না। বাকি মানুষগুলো উন্মাদের মতো হাত-পা মালিশ করে গেলো। রাবেয়া জোরে জোরে দোয়া পড়ে স্বামীর গায়ে ফুঁ দিলেন কয়েকবার।
মৌমিতা আঙুল দিয়ে আব্বার কব্জি চেপে ধরলো। উভয়ের হাতই কাঁপছে, হয়তো এ কারণেই নাড়ির কম্পন অনুভব করা গেলো না। মেয়েটা চোখের পানি মুছে আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করলো।
আপার মুখের দিকে তাকিয়ে মার্জিয়া দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। পরিশ্রান্ত দৃষ্টিতে চারপাশে তাকায়। কম পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতিটার ক্ষমতা আরও কমে গেছে। বাল্বটা বদলানো উচিত। একটা টিউবলাইট লাগানোর কথা ছিলো আব্বার ঘরটাতে। এখন সব কেমন যেন আলো-আঁধারি দেখা যাচ্ছে।
এ ঘরে কি আজরাঈল এসেছে? বিছানায় আধশোয়া হয়ে কাঁপতে থাকা রুগ্ন মানুষটার সময় কি ফুরিয়ে এসেছে?
রান্নাঘরের পাশে ফাঁকা জায়গা আছে একটু। সেখানে আব্বা একটা নতুন ঘর তুলতে চেয়েছিলেন, তার ছোট মা'র জন্য। আপার ঘরের জানালাটাতে শিক লাগানো হয়নি এখনও। বাড়ির পেছনে প্রাচীর করাও সম্ভব হয়নি। আপার বিয়ে হয়নি। চাকরি হয়নি। মার্জিয়া একটা সুন্দর দেখে একটা ঘড়ি কিনেছিলো। আব্বার জন্য। বড় গোল ডায়াল, কুচকুচে কালো ঘড়ি। আব্বাকে বলাই হলো না। আর কি বলা হবে না?
মারুফ কেশে উঠলেন। তার চোখ-মুখ সহসাই স্বাভাবিক দেখালো। শরীরটা যদিও মৃদু কাঁপছে। তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো একটু স্বস্তি পেলো এবার। রাবেয়া কাছে এলেন, মারুফের মাথায় হাত বুলিয়ে একটু ঝুঁকে এসে বললেন, “মৌয়ের আব্বা? শরীরটা কি খারাপ লাগছে খুব?”
মারুফ স্ত্রীর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালেন। তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে এখনও।
“কিছুক্ষণ বসে থাকেন এভাবে।” রাবেয়া সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, “জুনায়েদ, তুমি এখন যাও বাবা। অনেক রাত হয়ে গেলো। আসমা কি গেছে?”
ছেলেটা মাথা নাড়লো, “হ্যাঁ। চাচি, যদি কোনো অসুবিধা হয়, সাথে সাথে আমাকে ডাক দিবেন।”
“আচ্ছা।”
জুনায়েদ চলে যাওয়ার পর রিপন এসে তার জায়গায় দাঁড়ালো। মারুফের ঘাড়ের পেছনে রাখা বালিশটা টেনে ঠিকঠাক করলো; বিড়বিড় করে বললো, “আপনি কী যে করেন দুলাভাই। এমনে কেউ ভয় দেখায়?”
রাবেয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাড়া দেখিয়ে বললেন, “যাও, তোমরা খাওয়া-দাওয়া করো। রিপন, নিয়ে যাও তো ওদেরকে। তাড়াতাড়ি খেতে বলেছিলাম। কেউ—”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মৌমিতা বলে উঠলো, “আমি এখানেই থাকবো।”
“খেয়ে আসো মৌ। তারপর থেকো।”
“খিদে নেই।”
“এখানে প্লেট নিয়ে আসো।”
“বললাম তো। খিদে নেই।”
“ঝামেলা করবা না মৌ! যাও, খেতে বসো। মার্জু? তুমিও যাও তো মা।”
মার্জিয়া বাধ্য মেয়ের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। রিপনও গেলো। মৌমিতা নড়লো না। সে মারুফের পায়ের কাছে যেভাবে বসে ছিলো, সেভাবেই বসে রইলো শুকনো মুখে। রাবেয়া অসহায়ের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেন, চাপা স্বরে বললেন, “এসব জেদ করে কী বুঝাতে চাও তুমি? নিজের ক্ষতি করে কী বুঝাতে চাও? একটু ভালো করে বলো তো মৌ। আমি আর এতোকিছু নিতে পারছি না।”
“আমিও পারছি না।”
মেয়ের নির্লিপ্ত উত্তরটা রাবেয়ার পছন্দ হলো না। তিনি চুপ থেকে নিজের ক্রোধের আগুনটাকে একটু চাপা দিলেন। শান্তভাবে বললেন তারপর, “মৌ, এভাবে না খেয়ে থাকলে, নিজেকে কষ্ট দিলে কোনো লাভ হবে? এসব কেন করছো মা?”
মৌমিতার স্বরটা এবার বরফের ন্যায় ঠাণ্ডা শোনালো, “আমি আব্বার আগে মরতে চাই।”
রাবেয়া চমকে উঠলেন, “ধুর পাগলি!” তিনি মারুফের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে খুব সতর্কভাবে বললেন, “শোনো, একটা কথা বলি। কার আয়ু কতোটুকু আছে, কেউ জানি না। তোমার আব্বা কতোদিন বাঁচবে, আমিও জানি না, তুমিও জানো না। কিন্তু এটা আমরা দু'জনই ভালোভাবে জানি, তোমাদের দুই বোনকে নিয়ে এই মানুষটার কতো স্বপ্ন। আল্লাহ যদি তোমাকে সেই স্বপ্নগুলো পূরণ তৌফিক দিয়ে থাকেন, তাহলে চেষ্টা করা উচিত না? তোমার আব্বার ইচ্ছা তো এটাই, তোমরা যেন ভালো—”
“এখন আমাদের জীবন যে অবস্থায় আছে, এখান থেকে সবকিছু কি ঠিক হবে?”
“তোমার জন্য যেটা ঠিক, সেটাই হবে।” রাবেয়া খাটের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ালেন, “আচ্ছা মৌ, একটু ভালো করে বলো তো, তোমার সমস্যাটা কী? জীবনে যাই হয়ে থাক না কেন, এমন উল্টাপাল্টা চিন্তা তোমার মাথায় আসবে কেন? আমাকে বুঝাও!”
মেয়েটা সরু চোখে মায়ের দিকে তাকায়, “কী বোঝাবো আম্মা? আপনি বোঝেন? কখনও বুঝেছিলেন?”
“তুমি চুপ করে থাকলে কীভাবে বুঝবো? কথা তো বলতে হবে।”
“বলবো না। আমাকে দিয়ে কোনো সামাজিকতা সম্ভব না।”
“সামাজিকতার কথা কে বললো? আমি তোমাকে শুধু কথা বলতে বলেছি। তুমি এমন রাগ-অভিমান করে চুপ থাকো। সামনের মানুষটাকে তো বুঝাতে হবে, যে তুমি এই কারণে রাগ করেছো। নাহলে কীভাবে বুঝবে?”
মৌমিতা ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো, “আমার ভালো লাগছে না আম্মা।”
“এই স্বভাবটা বদলে ফেলো। বুঝেছো? ভবিষ্যতে পস্তাতে হবে।”
হাতের তালুতে ভর দিয়ে তৎক্ষণাৎ বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। রাবেয়া বলে উঠলেন, “যাও, রাগ না করে এখন খেয়ে নাও।”
সে খাওয়ার ঘরে গেলো না। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো।
রিপনদের খাওয়া-দাওয়া ততোক্ষণে শেষ। মারুফ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাকে ভালো করে শোয়াতে হবে এখন।
মার্জিয়া রাত-বিরাতে জানালা খুলে দিয়ে রাখে। বেশ বাজে একটা অভ্যাস হয়েছে। বিষয়টা যদিও এতো খারাপ না। শুধু সমস্যা হলো, জানালায় শিক নেই। আর এই ঘরে যারা থাকে, তারা মেয়ে মানুষ।
মৌমিতা ঘরে ঢুকলো। বৈদ্যুতিক বাতি চালু করা নেই, তবু ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। বাহির থেকে আলো এসে ঢুকেছে। সে নিজের ক্লান্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে গেলো জানালার পাশে। দেয়াল ঘেঁষে রাখা কাঠের চেয়ারটাতে বসে পড়লো।
আজ বোধহয় পূর্ণিমা। গোল থালার ন্যায় চাঁদ উঠেছে আকাশে। তার আশেপাশে অসংখ্য তারকারাজি হীরের মতো ঝিকমিক করছে। ঐ চাঁদ-তারার উজ্জ্বলতা গলিত সীসার মতো পুরো ঘরটাতে ছড়িয়ে পড়েছে রূপালি আভায়।
মেয়েটা দম আটকে বসে রয়েছে। দেহের সব শিরা-উপশিরা যেন ফুলে উঠেছে, ফেটে যাবে একটু হলেই। রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা অনুভূত হবে, কিন্তু উপশমের উপায় মিলবে না।
বেঁচে থাকাটাকে কেমন যেন বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে ইদানিং। শরীরে এতোটুকু শক্তি নেই, অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে, শুধু প্রাণটাই অবশিষ্ট রয়ে গেছে। ঐ প্রাণ ছাড়া সবকিছু হাতছাড়া হয়ে যেতে চাইছে।
একটা মানুষ শুরু করেছিলো এই হারিয়ে যাওয়ার খেলা। সে হয়তো ঝড় থামাতে গিয়ে যুদ্ধ বাঁধিয়ে গেছে। পুরোনো সেই শান্ত জীবনটা ফিরিয়ে দিয়েছে, সমস্ত শান্তি কেড়ে নিয়ে। কিন্তু ঝড় থামার পরের বিপর্যয় সামলানোর মতো মানসিক অবস্থা যে মেয়েটার নেই।
রাবেয়া খাতুন সস্নেহে তার মাথায় হাত রাখলেন। মেয়েটা মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই তিনি সিক্ত নয়নে মলিন হাসলেন, তাকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, “আমি আছি তো মা।”
মৌমিতার চোখ ফেটে অশ্রু নামলো হঠাৎ। দু'হাতে আম্মাকে জড়িয়ে ধরলো সে। শেষ কবে মায়ের এতো কাছাকাছি আসা হয়েছিলো? মনে পড়লো না। সে কেবল চোখ বুজে একটা শুষ্ক ঢোক গিললো, অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলো, “আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না, আম্মা।”
রাবেয়া এক হাতে তার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে আঁচল দিয়ে নিজের মুখটা মুছলেন, “সবকিছু ভালো লাগতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। শান্ত হও, বড় বড় শ্বাস নাও। সব খারাপ চিন্তা বের করে দাও মাথা থেকে। আমারও ভালো লাগছে না। সেজন্য বলছি, তুমি ভালো থাকো। নিজেকে অবহেলা করো না মা।
তোমার আব্বার চেহারার কী হাল হয়েছে, দেখেছো? অন্তত তোমার মুখটা দেখে একটু চোখ জুড়াই। আসো, অল্প হলেও একটু তো খেতে হবে। আমি খাইয়ে দেবো?”
—————
আজ বেশ রোদ উঠেছে। মার্জিয়া সকাল সকাল ঝাড়ু দিয়েছে বলে উঠোন মোটামুটি পরিষ্কার। বেলা হতে হতে আবারও কিছু শুকনো পাতা ঝরে পড়েছে। দেখতে অবশ্য মন্দ লাগছে না তেমন।
মারুফকে সকালের খাবার খাওয়ানোর পরপরই রিপন বেরিয়ে গেছে। আজ অনেকদিন পর দোকান খোলা হবে।
উঠোনে ভেজা কাপড় গুলো শুকাতে দিয়ে মার্জিয়া ঘরে এলো, “আপা? তোমাকে না আম্মা বললেন, ডক্টর আজিমকে ফোন দিতে?”
মৌমিতা টেবিলের সামনে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখছিলো। বোনের কথা শুনে সে ঘুরে তাকালো না, লেখা থামিয়ে একটু ভেবে বললো, “মামার ফোন দেওয়ার কথা ছিলো।”
“মামা তো দোকানে।”
“তাহলে আমি দেবো, একটু পর।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।” খাটের কোণে পা ছড়িয়ে বসে মেয়েটা কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো, “কী লিখছো?”
“বাজারের লিস্ট করলাম। মামাকে দেবো।”
মৌমিতা কাগজটা ভাঁজ করতে করতে উঠে দাঁড়ালো। সেটাকে বইয়ের নিচে চাপা দিয়ে রেখে বসার ঘরে চলে এলো।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ল্যান্ডলাইন নম্বরটা তার মনে আছে। একজনকে যোগাযোগের ঠিকানা পাঠাতে গিয়ে মুখস্থ করতে হয়েছিলো।
টেলিফোনে নম্বরটা ডায়াল করে মৌমিতা রিসিভার ধরলো কানে। শীঘ্রই সাড়া পাওয়া গেলো, “আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ডক্টর মাহফুজকে... একটু দেয়া যাবে?”
কথাটা বলার পরেই মৌমিতা চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। আজিম সাহেবের কথা বলতে গিয়ে এই ব্যক্তির নাম কেন বেরিয়ে পড়লো মুখ থেকে?
ওপাশের অজ্ঞাত ভদ্রলোক নিজের মতো বলতে লাগলো, “মাহফুজ? নিউরোলজি বিভাগ থেকে, আজিম স্যারের আন্ডারে আছেন যিনি; ওনাকে দেবো?”
“হ্যাঁ, ওনাকেই।”
“একটু অপেক্ষা করুন।”
মেয়েটা অজান্তেই নাক-মুখ কুঁচকে আঙুল দিয়ে ওড়নার পাড় প্যাঁচাতে লাগলো। বেশ ভালোই একটা কুকর্ম হয়েছে! সুজয়ের সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তার। ফোনটা কেটে দিতে পারলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হলো না। তার আগেই সুজয়ের কণ্ঠ শোনা গেলো, “হ্যালো?”
মৌমিতা একটু চমকে ওঠে। এতোক্ষণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভুগে প্রস্তুতি নিলেই বরং লাভ হতো। সে ভুলেই গিয়েছিলো, ছেলেটার কণ্ঠস্বরে অজানা কোনো বিশেষত্ব আছে। তার সাথে যখন-তখন কথা বলা বিপদজনক!
“হ্যালো, আমি মাহফুজ বলছি।”
“জ্বী, জানি!” আরেকটা বিব্রতকর জবাব দেওয়ার পর মৌমিতা একেবারে গম্ভীর ভঙ্গিতে বলতে লাগলো, “আব্বার আবার খিঁচুনি উঠেছিলো গতরাতে। অনেক খারাপ অবস্থা হয়েছিলো। তাই ভাবলাম... হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।”
“সমস্যা বলার আগে নিজের পরিচয় দিতে হয়।”
“আমি মৌমিতা। মৌমিতা খন্দকার।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন তো চিনেই ফেলেছি। আজকে কেমন আছেন আপনার আব্বা?”
“ভালো। খাওয়া-দাওয়া করেছেন সকালে।”
“আচ্ছা, এক কাজ করেন। খিঁচুনির ওষুধটা আপাতত দিতে থাকেন। বন্ধ করার দরকার নেই।”
“ডক্টর আজিম তো বললেন, আর দিতে হবে না। মামার সাথে কথা হয়েছিলো ওনার।”
“এখন যেহেতু খিঁচুনি হচ্ছে, আবার চালু করেন।”
“ঠিক আছে।”
“আর কোনো সমস্যা নেই তো?”
“না।”
“আচ্ছা। কোনো সমস্যা হলে জানাবেন।”
“জ্বী।”
ধীরে-সুস্থে রিসিভার নামিয়ে রাখলো মৌমিতা। একটা বড়সড় নিঃশ্বাস ফেললো, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন! জীবদ্দশায় আর এই লোকের সাথে কথা বলবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো সে। নিজের একটার পর একটা উদ্ভট কথাবার্তা স্মরণ করে তার প্রচণ্ড অস্বস্তি হলো।
আর আজ সুজয় এতো অস্বাভাবিকভাবে কথা বললো কেন? এতোটুকু জড়তাও কাজ করলো না? প্রথমত, তাদের মাঝে সম্পর্কটা এখনও নির্দিষ্ট নয়। তাছাড়া কতোদিন পর কথা হচ্ছে। অথচ ছেলেটার ভাবখানা এমন, যেন তাদের বিয়ে হয়ে গেছে বহুদিন আগে!
মৌমিতা বিরক্ত হলো। একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিলকে তাল বানিয়ে ফেলা খুবই খারাপ অভ্যাস। এই স্বভাবটা এবার ছাড়তেই হবে। যতো দ্রুত সম্ভব।
“আম্মা? ঐ ওষুধটা আবার দিয়েছে।”
রাবেয়া খাওয়ার ঘরে, চেয়ারে বসে ফল কাটছিলেন। মেয়ের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বললেন, “ঐটা? বন্ধ করতে বলেছিলো তো।”
“দিতে হবে। খিঁচুনি যেহেতু ঠিক হয়নি।”
“ওটা শেষ হয়ে গেছে।”
“মামাকে বলেন। দুপুরের আগেই যেন আনে।”
“রিপন দুপুরের আগে আসতে পারবে না।”
“ওহ।” মৌমিতা আর অপেক্ষা না করে মাথায় ওড়না তুলে দিতে দিতে বললো, “তাহলে আমি যাই।”
উঠোনে আরও কিছু শুকনো পাতা ঝরে পড়েছে। মেহগনি গাছটার ডালপালার ফাঁকফোকর দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে আঙিনা জুড়ে।
মেয়েটা উঠোন পেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। এই গলিতে ফাঁকা রিকশা পাওয়া মুশকিল। সে মোড়ের দিকে হাঁটতেই যাচ্ছিলো, তখন পেছন থেকে ডেকে উঠলো কেউ, “মৌমিতা?”
মৌমিতা পেছনে ঘুরে তাকায়। জুনায়েদ এগিয়ে আসে তার দিকে, “যাচ্ছো কোথাও?”
“হ্যাঁ।”
“একটা কথা ছিলো।”
“আমার সময় নেই।”
—————
বিকেলবেলা।
মারুফ কেবলই নাস্তা করেছেন। তার দুই মেয়ে তার ঘরে ঘুরঘুর করছে। রাবেয়া রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। এমন সময়ে বারান্দা থেকে জহির মিঞার ডাক ভেসে আসে, “মারুফ?”
মার্জিয়া আব্বার পায়ের নখ কেটে দিচ্ছিলো। সে তৎক্ষণাৎ পেছনে ঘুরে আপার উদ্দেশ্যে বললো, “শোনো, কেমনে ডাকলো। যেন আব্বাই গিয়ে দরজা খুলে দিবেন!”
মৌমিতা ওষুধপত্র গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো, “উনি এরকমই।”
সে ঘরের বাইরে পা ফেলার আগেই রাবেয়া গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন।
জহির একা আসেননি। জোবেদাকে সঙ্গে এনেছেন। মারুফের সাথে দেখা করানোর উদ্দেশ্যে। তাকে দেখেই মারুফের দুই মেয়ে পরস্পরের দিকে তাকালো।
ভদ্রমহিলাকে তারা অপছন্দ করে না, তবে ঠিক পছন্দও করে না।
জোবেদা বাচাল প্রকৃতির মানুষ। তার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিকটা হলো, তিনি ভালো-মন্দ না ভেবেই যেকোনো কিছু বলে বসেন। পরিস্থিতিও বোঝেন না।
অসুস্থ মারুফকে দেখে জোবেদা দোরগোরায় দাঁড়িয়ে রইলেন। জহির বললেন, “আসো, ভেতরে আসো।”
তিনি ভেতরে এসে মারুফকে সালাম দিলেন। উত্তরে মারুফ তাকিয়ে রইলেন ফ্যালফ্যাল করে। জহির উৎসাহ নিয়ে বললেন, “মারুফ? চিনতে পেরেছো? জোবেদা। আমাদের বাড়িতে কাজ করতো। পরে এই বাড়িতেও যে কাজ করলো অনেকদিন, চিনেছো? তোমাকে দেখতে এসেছে।”
জোবেদা একটু বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, “মারুফ ভাই, আমার ছোট ব্যাটা পাশ করলো এইবার। আপনি যে ওরে বই কিনে দিছিলেন, মনে আছে?”
মারুফ ভ্রু কুঁচকালেন।
“অয় ভালো রেজাল্ট করছে। সেজন্যে জানাইতে আসলাম। আপনি ভালা আছেন?”
মারুফকে নিরুত্তর দেখে, ছোট একটা শ্বাস ফেলে জহির বললেন, “মারুফ কথা বলবে না। বললেও বুঝবা না। ব্রেনে সমস্যা তো...”
জোবেদার চোখে যেন অশ্রু তৈরিই ছিলো। তিনি মুখে আঁচল চাপা দিলেন। মারুফ অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর আবার নিজের গায়ের কাঁথাটার দিকে তাকালেন, মন দিয়ে সেটার নকশা দেখতে লাগলেন।
লোকটার এমন করুণ প্রতিক্রিয়া দেখে জোবেদা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, “খোদা! মারুফ ভাই নাকি কথা কয় না! কী মানুষ ছিলো, আর কী হইলো! আমি আগে এতো কথা কইতাম। কেউ সহ্য করতে পারতো না। সবাই কইতো, চুপ থাক। এই একটা মানুষ খালি কইতো, জোবেদার কথা কওনের কেউ নাই। ওরে কথা কইতে দাও। আমি এই ঘটনা জীবনেও ভুলবো না।
আমার পোলার বই কেনার পয়সা ছিলো না, মারুফ ভাই বই দিছিলো। আমি চাই নাই। তবু দিছিলো। সবসময় পোলাটার খোঁজ নিতো। সেই মানুষ নাকি কথা কইতে পায় না।”
রাবেয়া নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি কোনোমতে জোবেদার বিলাপ থামালেন, শান্তস্বরে বললেন, “দোয়া করবা ওনার জন্য। কান্নাকাটি করো না।”
“দোয়া করি। মারুফ ভাই তাড়াতাড়ি সুস্থ হোক। আইজকে আসি ভাবী। সন্ধ্যা হয়া যাইতেছে। আরেকদিন পোলাটারে সাথে নিয়া আসবো।”
“আচ্ছা।”
মার্জিয়া কাঁপা কাঁপা একটা নিঃশ্বাস ফেললো। দু'হাতে চোখ মুছে দরজার দিকে তাকাতেই জুনায়েদকে দেখলো। সে কখন এসেছে, খেয়াল করা হয়নি। জহির আর জোবেদার সাথে রাবেয়া বেরিয়ে গেলেন, মৌমিতাও গেলো বিদায় জানাতে।
জুনায়েদ মারুফের কাছে এসে দাঁড়ালো, “ভালো আছেন চাচা?”
মারুফ খন্দকার হাসিমুখে উপর-নিচে মাথা দোলালেন। মার্জিয়া আড়চোখে আব্বার মুখখানির দিকে তাকায়। তারপর একটা শুষ্ক ঢোক গিলে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করে। সে দরজার কাছাকাছি যেতেই জুনায়েদ ডেকে ওঠে, “মার্জিয়া?”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়েটার পা ওখানেই থেমে গেলো। অপ্রস্তুত ভাবটা এড়িয়ে সে কোনোমতে মাথা ঘুরালো, “কী?”
“তোমার আপাকে একটা বিষয় জানাতে চেয়েছিলাম। তুমি জানিয়ে দিও।”
মার্জিয়া বড় একটা প্রশ্বাস টেনে দরজার দিকে আরেক পা এগোয়, ক্লান্ত স্বরে বলে, “পারবো না।”
“জরুরি বিষয়ে। ওকে কয়েকদিন খুঁজতে এসেছিলো একটা ছেলে—”
“সেটা আপনি নিজে জানাতে পারেন না আপাকে? আমাকে কেন বলছেন?”
কয়েকটা শব্দে সমস্ত ক্ষোভ আর অভিমান উগরে দিয়ে মেয়েটা বেরিয়ে গেলো। নিজের ঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই তার হৃদয়ের চারপাশে গড়ে তোলা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ছারখার হয়ে গেলো। চোখদুটো জ্বালা করতে লাগলো।
ঐ মানুষটা তার হতে পারতো। কিন্তু হলো না। আর হবেও না কখনো। অথচ ছেলেটার স্ত্রীকে দেখার আগ পর্যন্ত মার্জিয়ার অগাধ বিশ্বাস ছিলো, নিয়তি অন্তত জুনায়েদ ভাইয়ের ব্যাপারে কোনো প্রতারণা করবে না তার সঙ্গে। আর সেই জুনায়েদ ভাই হঠাৎ একেবারে পর হয়ে গেলো। বাহির থেকে তো কিছুই বদলায়নি। তবু তার কণ্ঠে আজ নিজের নামটা শুনতেও বিষের মতো লাগছে। কী আশ্চর্য!
·
·
·
চলবে……………………………………………………