রানির কক্ষ জুড়ে মোহনীয় ঘ্রাণ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরাম কেদারায় বসে বহু জল্পনা-কল্পনায় ধ্যানমগ্ন তিনি। সন্ধ্যের মন্দা বাতাস তার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে এলোমেলো ভঙ্গিতে।
হেমলকের গায়ের পরিচিত সুবাসটা তার নাকে তীব্রতর হয়ে ছুঁতেই তিনি না দেখেও বুঝে নিলেন হেমলকের উপস্থিতি। দিনের ঘটনাটি যেন অত্যান্ত স্বাভাবিক, এমন করেই বললেন,
“বিস্তর সময় পর কক্ষে! কার্যাদি সম্পূর্ণ হলো?”
হেমলক রানির এই নরম কণ্ঠস্বরকে শুনে বিস্মিত হলো। রানি যেন ভুলেই গিয়েছেন মধ্যাহ্নের কথা! এত বড়ো ঘটনার পরেও কেমন করে তিনি এত স্থির? একটু দুঃখবোধ, যন্ত্রণা, বিষণ্ণতা নেই তার মুখ জুড়ে! এই যে তার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়সমূহ নিয়ে এমন খোলামেলা ভাবে যে বিস্তর আলোচনা হলো, তার এতে খারাপ লাগেনি? হেমলকতো এই ভাবনায় গুমরে মরছিলো প্রায়!
“রানি, জানি তোমার দুঃখবোধ হয়েছে। কিন্তু সকলেই তো উন্মুক্ত চিন্তার অধিকারী হয় না। তাই তোমাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলো। কিন্তু তারা পরবর্তীতে অনুতপ্ত অনুভব করেছে। তাদের থেমে যাওয়া কলরব দেখেই অনুধাবন করতে পেরেছি। তুমি…”
“আপনার বোধহয় স্নানাগারে যাওয়া উচিত। সারাদিনের ক্লান্তি কমবে।” মাঝপথে হেমলকের কথা থামিয়ে দিলেন রানি। এতটাই নরম কণ্ঠে থামালেন যে হেমলক সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। বাক্যহারার মতো হতবিহ্বল চোখে রানির দিকে তাকিয়ে রইল।
“সম্রাজ্ঞী, আমার দিকটা পরিষ্কার করতে দাও। আমি জানি রাজমাতা প্রাচীর বলা কথাগুলো তোমার অন্তরে এখনও জীবন্ত। আমি সেই কথার বিপরীতে আমারটুকু বলতে চাই। আমি…”
“আমি এমন অপরিষ্কার চালচলন পছন্দ করি না মোটেও। আমার কক্ষ আমি বিশুদ্ধ সুভাস, পবিত্রতায় মুড়িয়ে রাখতে পছন্দ করি। আপনি এখুনিই স্নানাগারে যান।”
বেশ অনায়াসেই বারংবার রানি হেমলকের কথা থামিয়ে দিতে লাগলেন। হেমলক হতাশ চোখে তাকাল রানির দিকে। রানির কণ্ঠ স্থির, শীতল। কোনো আহামরি রাগ নেই, ক্রোধ নেই যা তিনি অন্যান্য সময় দেখাতেন। এতটা শীতল স্বর যেন কিচ্ছুটি হয়নি। হেমলকের সেই গোপন সত্যটি শুনে কোনো ধাক্কা অনুভব হয়নি হৃদয়ে।
এর মাঝেই কক্ষের বাহির হতে হ্যাব্রোর কণ্ঠ ভেসে এলো, “রানি আসব?”
হেমলক তার কথাটি পুনরায় বলতে গিয়ে এবারের বাঁধায় বিরক্ত হলো। বিরক্তর ছাপ চোখমুখে ফুটিয়ে সে যেই না হ্যাব্রোকে অনুমতি দিতে নিষেধ করতে যাবে সেই মুহূর্তে রানি স্বয়ং অনুমতি দিলেন। হেমলকের মুখভঙ্গিকে নির্দ্বিধায় অদেখা করেই অনুমতি দিলেন।
রানির একের পর এক আচরণে হেমলক যেন অকূল পাথার পড়ল। রানির মন সে কোনোকালেই বুঝতে পারেনি। আর এই মুহূর্তেও পারছে না বলে তার নিজের উপর ক্রোধ জাগল। সে নিজের দিকটা বলতেই পারছে না?
অনুমতি পেয়েই হ্যাব্রো ভেতরে প্রবেশ করল। কুর্নিশ করল রানিকে। আগ্রহী কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“রাজকন্যা মৃন্ময়ীদের প্রাসাদে যে আপনাদের আমন্ত্রণ ছিলো সেটি নিয়ে কিছু ভেবেছিলেন? দিন তো ঘনিয়ে এলো!”
“হ্যাঁ, আমরা সেখানে পৌঁছাবো। সে এত করে অনুরোধ করেছে, যেতে তো হবেই।”
হেমলক উক্ত বিষয় সম্পর্কে অবগত নয়। তারা কোন আমন্ত্রণ সম্পর্কে আলোচনা করছে তাও সে জানে না। কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসল,
“রাজকন্যা মৃন্ময়ীদের রাজ্যে? কীসের আমন্ত্রণ?”
“কোনো বিশেষ আয়োজন আছে সেটিরই আমন্ত্রণ করেছিলো।”
হেমলক আর আগ বাড়িয়ে বিশেষ আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইল না। রানিকে হ্যাব্রোর সঙ্গে কথা বলতে দিয়ে নিজেই আলগোছে বেরিয়ে গেলো। মনের ভেতর কাঁটার মতো খচখচানিটা থেকে গেলো তার।
“রানি, অনুমতি দিলে একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব?”
হ্যাব্রোর কোমল স্বরে অনুমতি প্রার্থনায় রানি বোধহয় বুঝে নিলেন প্রশ্নটি। তিনি তাই অনুমতি দিলেন না। দীর্ঘ একটি হাসি বিনিময়ে বললেন,
“সকল প্রশ্ন তোলা রাখো, হ্যাব্রো। তোমায় না বললে, বলবো কাকে?”
হ্যাব্রো জানে তাদের রানির প্রতিটি কথার পেছনের অর্থ। তাই সে অনর্থক আর অনাধিকার চর্চা করল না। সঠিক সময়ের আর্জিটি গ্রহণ করেই প্রস্থান নিলো।
রানি সেভাবেই ঠাঁই বসে রইলেন আরামকেদারায়। বসে বসে কত কী ভাবলেন। হাসলেন চাপা! কেউ দেখলে নির্ঘাত ভেবে নিবে রানি সুখের কোনো ভাবনায় মগ্ন। অথচ এমন কিছুতো নয়। রানি নিজেকে শূন্য করার ভাবনায় মগ্ন। নিজের ব্রহ্মাণ্ডকে পুনরায় গড়ে তোলার ভাবনায় মগ্ন।
—————
প্রভাতের প্রথম কিরণ ভেদ করার পরের রশ্মিটুকু এসে তীর্যক ভঙ্গিতে প্রবেশ করেছে রানির স্নানাগারে। তার সবচেয়ে প্রিয় স্থান এই উষ্ণ জলের স্থানটি। কতটা সময় যে তিনি স্নানাগারে ব্যয় করেন তার হিসেব নেই।
যথারীতি রানির দাসীবৃন্দ অবস্থান করছে স্নানাগারে নিজ নিজ কর্মে। অলস হাতে প্রত্যেকে নিজের কার্য মনোনিবেশ করে থাকলেও প্রত্যেকের মনে উচাটন করছে একটি ভাবনা। কিন্তু রানিকে প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না করো।
তাদের হাতের গতি, মুখমণ্ডল রানি না দেখেও আন্দাজ করতে পেরেছেন বোধহয়। তাই বন্ধরত চোখেই শুধালেন,
“মন কোথায় প্রত্যেকের? ঠিকঠাক করছো না কিচ্ছুটি।”
চারজন দাসীই তটস্থ হয়ে গেলো। তড়িঘড়ি করতে লাগলো কাজে। রানি এবার চোখ মেললেন। খুব সাবলীল কণ্ঠে বললেন,
“মনে অন্য ধ্যান থাকলে কাজে মনোনিবেশ করা সম্ভব নয়। হয় ঐ ধ্যান বের কর নয়তো কাজ থেকে সরে যাও। স্নানাগারে অন্তত বিরক্ত করো না।”
রানির কাছ থেকে একটু বোধহয় প্রশ্রয় পেলো ওরা। রানি ওদের ভাবনা-ই যে শুনতে চেয়েছেন তা ওরা বুঝে নিলো। সেখানের একজন চট করে প্রশ্ন করল,
“আপনি কী সত্যিই রাজাসন ছেড়ে দিয়েছেন, রানি? আপনি আর রাজ্যের দায়িত্বে থাকবেন না?”
একজনের প্রশ্নে সাহস পেলো আরেকজন, “আপনি কি রাজ্য ছেড়েও চলে যাবেন?”
রানি সেই নত মুখগুলোর দিকে এক পলক তাকালেন। তাকে নিয়েই যে এই মেয়েগুলোর মনে বিস্তর ভাবনা চলছিলো তা তিনি বুঝতে পেরেছেন। কেবল এই মেয়েগুলো নয়, এই রাজ্যের প্রত্যেকের মনেই রানিকে নিয়েই এখন ভাবনা চলছে। রানি প্রকাশ্যে দেওয়া বিবৃতি মূলত আবেগের বশেই দিয়েছেন না সত্যি তা সকলের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
রানি একবার ভাবলেন কিছু বলবেন না। কিন্তু পরমুহূর্তেই কী যেন ভেবেই উত্তর দিলেন,
“কিছু উত্তর ছেড়ে দিতে হয় সময়ের হাতে। অপেক্ষার চেয়ে বড়ো ও সময়ের চেয়ে সত্য কিছু নেই। সময় আসুক, উত্তর পাবে।”
দাসীরা পুনরায় নীরব হয়ে গেলো। যার যার কর্মে মনোনিবেশ করল। তখনই বাহির থেকে দেহরক্ষীর হাঁক ভেসে এলো,
“রাজপুত্র হেমলক পিয়ার্স উপস্থিত হয়েছেন।”
হেমলককে এর পূর্বে কেউ রাজপুত্র বলে আখ্যায়িত করেনি এই রাজ্যে। হেমলক তাই ভুলতেই বসেছিলো তার বিশেষ্যটি। সে প্রায় অবাক হয়ে গেলো। রানির কথায় ঠিক কতটা গম্ভীরতা ও জোর থাকলে রাতারাতি এমন করে ডাকনাম বদলে যায়? রানির ভেতর অদ্ভুত কিছুতো আছেই।
স্নানাগার থেকে সেই ডাকটি রানি শুনলেন। কিন্তু বিশেষ হেলদোল দেখালেন না। নিষেধাজ্ঞা জ্ঞাপন করলেন,
“এখন নয়, এখন আমি কাউকে চাচ্ছি না।”
দাসীদের চোখাচোখি হলো নিষেধাজ্ঞার পর পর। তারা রানিকে যত দেখছে বিস্মিত না হয়ে পারছে না মোটেও। যে রানি নিজের সেনাপতিকে স্নানাগারে প্রবেশ করাতে এক মুহূর্ত সময় নেন না তিনি নিজের স্বামীর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন? এ কেমন নিয়ম তার? সমস্ত অনিয়মই যেন তিনি নিয়ম করে নিয়েছেন। এমন অদ্ভুত নারী তারা কখনো দেখেনি।
হেমলকের তীব্র মানে লাগলো এই প্রত্যাখ্যান। এতটাই পৌরুষত্বে ধাক্কা খেলো যে সে নিষেধাজ্ঞা মানল না। হনহনিয়ে প্রবেশ করল স্নানাগারে। হেমলকের সেই অপ্রত্যাশিত প্রবেশে দাসীরা পুনরায় একে অপরের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালো। তাদের প্রাসাদে যে একের পর এক ঘটছে কী, তারা বুঝেই উঠতে পারছে না।
হেমলক প্রবেশ করেই দাসীদের ইশারা করতেই তারা বেরিয়ে গেলো দ্রুত। এত দ্রুত যেন এক মুহূর্ত এখানে থাকলে কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে।
হেমলকের প্রবেশ যতটাই তীব্র, চঞ্চল ছিলো রানির প্রতিক্রিয়া ঠিক ততটাই শান্ত, শীতল।
“আমাকে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছ তুমি? আমাকে? আমি তোমার স্বামী, রানি! আমার কি প্রবেশ করার অধিকার নেই?”
হেমলকের কণ্ঠে কিছুটা ক্ষোভ উদয় হয়েছে। বেশ স্পষ্টই তা রানির কর্ণগোচর হয়েছে। কিন্তু তিনি উক্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন না বিন্দুমাত্র।
হেমলক রানির এই নীরবতা আরও মানতে পারল না। ক্রোধান্ধ হয়ে বলল,
“তুমি তোমার সেনাপতিকে স্নানাগারে প্রবেশের অনুমতি দাও অথচ আমায় করো প্রত্যাখ্যান? এরচে বড়ো অপমান আমার জন্য কী হতে পারে? আমি আমার অর্ধাঙ্গিনীর স্নানাগারে অব্দি প্রবেশের অধিকার রাখি না? হ্যাঁ?”
“অর্ধাঙ্গিনী হলেই যে তার স্নানাগারের প্রবেশের অনুমতি ও অধিকার আছে সেই কথাটি আপনাকে বলেছে? কোথায় তা লিখিত রয়েছে?” রানির কণ্ঠ এবার শক্ত বেশ।
হেমলক সেই শক্ত কণ্ঠে ভারি আশ্চর্য হলো,
“আমার অধিকার নেই তবে?”
“আমি যখন না করেছি তার মানে নেই। কোনো নারী সে আপনার অর্ধাঙ্গিনী হোক কিংবা মনোরঞ্জনের নর্তকী, সে যদি তার কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে আপনাকে নিষেধ করে, না বলে তার অর্থ না-ই হবে। এই পৃথিবীতে কোনো পুরুষেরই অধিকার নেই একজন নারীর না-কে হ্যাঁ ভাবার। এবং হ্যাঁ ভেবে অধিকার ফলানোর। কারণ প্রতিটা মানুষের নিশ্চয় ভাবনা, চাহিদা ও ব্যক্তিগত জায়গা থাকে। আপনি সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না তার অনুমতি ব্যতীত।”
রানির কথাগুলো হেমলকের কানে অগ্নির লেলিহান তরল পদার্থের মতোই জ্বালা তৈরি করেছে যেন। সে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলো,
“সেনাপতি হ্যাব্রো তবে অনুমতি পায় কীভাবে?”
“আমার একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে সে অনুমতি পায়। পার্থক্য স্পষ্ট, চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স। আপনি এখানে প্রেম বলি আর অধিকারবোধই বলি, সেসব থেকে আসেননি এসেছেন প্রতিযোগিতা থেকে। হ্যাব্রো আমার স্নানাগারে প্রবেশের অনুমতি পায় আপনি পান কি-না সেটা দেখতে। আপনি আমার সেনাপতির সাথে প্রতিযোগিতার মনোভাব রেখেছেন বলেই আমি আপনাকে আপনার স্থান দেখিয়ে দিলাম। হ্যাব্রো আর আপনার পার্থক্য দেখিয়ে দিলাম। আপনি বুঝতে পেরেছেন আপনি কী ভাবনা ভেবেছেন আমাকে নিয়ে? আমার দাসীগুলো যে ভাবনা ভেবেছে আপনাকে অনুমতি দিলাম না বলে একই ভাবনা আপনি ভেবেছেন। কে, কোন স্থানে থাকবে সেটা সম্পর্কের নাম নির্ধারণ করে দেয় না। নির্ধারণ করে দেয় আচরণ, মানসিকতা ও ভাবনা। হ্যাব্রো কখনো আমার স্নানাগারে অধিকারবোধ থেকে প্রবেশ করেনি, আমি কক্ষে থাকলে ওর কাছে যা স্নানাগারেও তা। সেই জন্য ও অনুমতি পেয়েছে প্রবেশের। কিন্তু আপনি স্নানাগারে আমাকে ভেবেছেন একান্তই ব্যক্তিগত নারী যাকে দেখার অধিকার কেবল আপনার। অন্য কেউ সেখানে প্রবেশ করায় আপনার পুরুষত্ব উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। আপনি প্রেম নিয়ে, সম্মান নিয়ে প্রবেশ করলে রানি কামিনীকাঞ্চন কখনো বাঁধা দিতেন না। আপনি করেছিলেন দম্ভ নিয়ে প্রবেশ। আমি আপনার অর্ধাঙ্গিনী, সেই দম্ভ। অথচ আমি কখনো কারো দম্ভের হতে চাইনি। এবং হবোও না। বের হন। এখুনি, এই মুহূর্তে। যান।”
শেষের শব্দটা এত তীব্রতর ছিলো যে হেমলক হতবিহ্বল হয়ে আর কিছু বলার প্রয়াসও করল না। নতজানু হয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলো। তার হৃদয়ের অগোচরের অনুভূতির প্রলোভনে পড়ে গিয়েছিলো সে কিন্তু এখন তার লজ্জা লাগছে। সত্যিই কেমন হীন কাজই না সে করে বসেছে! রানির সাথে চোখ মেলাবে কেমন করে এখন? তার নিজের প্রতিচ্ছবিকে ঘৃণ্য লাগছে। তার আচরণ, তার প্রেম এমন ভাবনা ভাবলো কী করে?
রানি আবার শান্তি হয়েই জলে চোখ বন্ধ করে নিলেন। বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। আঙুল গুলো কাঁপল মৃদু। কিন্তু সেই কম্পন দেখার সৌভাগ্য হেমলকের হয়নি।
—————
রাজকন্যা মৃন্ময়ীদের রাজ্যটি ভিন্নরকম। সবুজ, শীতল, প্রাণচঞ্চল রাজ্য। জৈতুন রাজ্যের এই এক আলাদাই বৈশিষ্ট্য যেন! সবুজের ঝলকানিতে চোখ অনন্য, অদ্ভুত সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে উঠে।
রানিদের ঘোড়া রাজ্যের প্রবেশদ্বার পেরুলেও গুরুগম্ভীর হেমলক প্রশ্ন করেনি মোটেও। কোনো কিছু জানতে চাওয়ার প্রয়াস করেনি। অন্যান্য সময় হলে তার সমস্ত উদ্রেগ সে উগ্রে দিতো। কিন্তু এবার তার কিছুই হলো না। হয়ত পূর্ববর্তী ঘটনার লজ্জার জের ধরেই এই অহেতুক নিস্তব্ধতা বাসা বেঁধেছে তাদের মধ্যিখানে!
তাদের ঘোড়ার রথ প্রাসাদের সামনে থামতেই দেখা গেলো অপেক্ষারত মৃন্ময়ীকে। উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিমায় তার মুখাবয়ব ঝলমল করছে।
তার পেছনে তার পিতাশ্রী-মাতাশ্রীসহ ইনান ণেকিতানের উপস্থিতিও পরিলক্ষিত হলো। এছাড়াও দূর দূর অব্দি দেখা গেলো বিভিন্ন রাজ্যের রাজা-রানিদের। রঙিন আলোকসজ্জা জ্বলজ্বল করছে প্রাসাদ জুড়ে। উৎসবের আবাহ চারপাশেই।
এবার হেমলকের মুখটিতে আগ্রহ ঘনীভূত হলো। সে মূলত জানেই না কীসের এত আড়ম্বরপূর্ণতা এখানে। সে তুমুল আশ্চর্য নিয়ে নেমে দাঁড়াল রথ থেকে। রাজকন্যা মৃন্ময়ীর সেই কী হাসি হাসি মুখমণ্ডল! এসেই আন্তরিকতার সঙ্গে জড়িয়ে ধরল রানিকে হেমলকের সাথে ভাব বিনিময় করল।
ইনান ণেকিতান এগিয়ে এলো। হেমলকের সাথে ভাব বিনিময় করল। কিন্তু হেমলকের এমন হতভম্ব মুখটি তার দৃষ্টিগোচর হলো না মোটেও। সে আনন্দ চিত্তে, প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“কী হে, চিত্রশিল্পী হেমলক? মুখটি এমন করে আছেন যেন এই প্রথম আমাদের সাথে আপনার আলাপ হচ্ছে?”
হেমলক তার আশ্চর্য ভাব কাটিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠে বলল,
“ঠিক তা নয় তবে জৈতুন রাজ্যে এত বিস্তর আয়োজন কীসের? আয়োজনের তো দেখছি কমতি নেই!”
“কেন তোমায় জানাননি রানি? রাজকন্যা মৃন্ময়ীর জন্য যে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করা হয়েছে!”
·
·
·
চলবে……………………………………………………